চিঠি

বসন্ত! আমার গঙ্গাজল (বসন্তকে ) 

বসন্ত! আমার গঙ্গাজল (বসন্তকে ) 

-শিবানী গুপ্ত

ওগো, চিরসখা বসন্ত, সেই মেয়েবেলার সন্ধিক্ষণ হতেই তুমি আমার সই—-আমার গঙ্গাজল! মনে পড়ে কি.তোমার! সেদিনের শুভলগ্নের শুভ—- মুহূর্তের অনুরাগময় একান্ত নিভৃত আলাপচারিতার কথা! বিচিত্র রঙবাহারী ফুলে বাগানটা যেন হেসে হেসে আমায় ইশারা করে ডাকছিলো আমি কাছে যেতেই তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি আমায় বিমুগ্ধ করে। কি সুন্দর কস্তুরী সুবাসে ছেয়ে আছে ফুলেরা, তোমার কবোষ্ণ স্পর্শে। ফুলেরা বললো, তুমি যখনই আসে, এমনি করেই ওরা সুশোভিত, সুবাসিত হয়ে ওঠে,তোমার অমলিন সৌহার্দ্যে——– আমার মনেও কেমন একটা অনুরণন! তুমি মিষ্টি মিষ্টি হেসে দুষ্টুমি করে আমার চুলগুলো একটু নাড়িয়ে দিলে, ‘কিগো, মিতা হবে আমার ‘? আমি তো আহ্লাদে একপায়ে খাড়া—‘হ্যাঁ, হ্যা, হবো ,আজ হতে তুমি কিন্তু আমার গঙ্গাজল! সত্যি, কি দারুণ চনমনেই না ছিলো মেয়েবেলার শাপলা্ – শালুক দিনগুলি! আমরা দু’জনে আপনমনের উচ্ছলতায় পার করেছি দিন-মাস–বছরের মধুমাখা অপরূপ দিনগুলো -কৈশোর–যৌবনের কৃষ্ণচূড়ার সুরভিতদিনগুলো- জীবনখাতার পরতে পরতে কতোনা স্মৃতির পশরা– তোমার অনুরাগের ছোঁয়ায় প্রাণমন ভরে উঠেছে পুলকে— শুধু কি আমি ! তোমার অনাবিল স্নিগ্ধপরশে বিশ্বজগৎ জুড়েইতো তোমার বন্দনাগীতি গো! কতো কতো কাব্য–কবিতা—-নাটক,আর -গীতিমালাসৃজিত হয়েছে -তোমাকে ঘিরে ,তোমারি আলোক। অনবদ্য, অনুপম লাবনীসুধায় সকলকে আকর্ষণ করেছো। ভ্রমর যেমন ফুলের মধুর আশে উন্মত্ত হয়ে ছুটে আসে, তেমনি আকুলতা জাগে সবার প্রাণে-, তোমাকে ঘিরে, তোমার স্পর্শে সঞ্জীবিত হয়ে শুকনোগাছেও কুঁড়ির ইশারা জাগে! এমনি মোহময়,প্রাণময়,প্রেমিক স্পর্শ তোমার গো সখা! ওইযে, কবি বলেন—- ‘ ‘সবারে বাসরে ভালো নইলে,মনের কালো ঘুচবেনা রে আছে তোর যাহা ভালো ফুলে মতো দে সবারে–‘ সখা বসন্ত! তুমি যে তাই গো! ভালবাসারঅমিয় ধারা সুরধুনী হয়ে বইছে তোমার উদার হৃদয়ে—-তাইতো, সবার মাঝে ,সবকিছুর মাঝে তুমি স্বরূপে উদ্ভাসিত। প্রকৃতি অপরূপ সাজে মনোলোভা হয়ে ওঠে তোমারই অকৃপণ অনুরাগে। গঙ্গাজল! সখা বসন্ত আমার! তোমার মনে পড়ছে কি সেদিনের কিশোরীটিকে? যার সাথে ফুলেরা তোমাকে সখ্যতায় বেঁধেছিল! হ্যাঁ,সেই কিশোরীতার অবোঝ সরল মনের ঊচ্ছাসটুকু তোমাকে জানাতে ব্যাকুল হয়ে হৃদয়ের সবটুকু সৌরভ ঢেলে চিঠি লিখে জানিয়েছিল তার কুমারীমনের ভালবাসার কথা—প্রথমঅনুরাগের প্রথম কদম ফুলের নির্য্যাসে——- চিত্র আষ্টেপৃষ্ঠে গম সেঁটে ফুলেদের দিয়েছিল, তোমাকে দেবার জন্য। ফুলেরা তো চিত্র বাইরের লেখা পড়ে হেসে কুটি কুটি– ‘ওমা, কি লিখেছিস এসব! –‘সাগুর দানা, বেলের পানা মালিক ছাড়া খুলতে মানা যে খুলবে তার চক্ষু কানা তবুও, যে খুলতে যাবে তিনসত্যি, চক্ষুকানা হবে’— ওদের হাসি দেখে আমি লজ্জায় ছুটে পালাই। গঙ্গাজল! সখাবসন্ত! তুমি কিন্তু চিঠিটা পেয়ে ফুলেদের মতো হাসোনি। বরং আবেগে আমায় জড়িয়েধরে সর্বাঙ্গে এঁকে দিয়েছিলে মধুর সোহাগচুম্বন! কি অপরূপ মাদকতার ছোঁয়া ছিল তোমার সেবা আলিঙ্গনে! আমি ভেসে গিয়েছিলাম গো! আর, চিঠি! সেতো আমি শুধু তোমাকেই লিখিগো, প্রতিদিন–মনেমনে! আর, সত্যি বলতে কি, বয়সের এই পড়ন্ত বিকেলে এসেও তোমার প্রতি আমার সভ্যতা, অনুরাগ, প্রীতিময়তা, ঠিক আগেরমতোই সতেজ, গাঢ়। তোমার উপস্থিতিই যে এমন, যাকে কেউ কখনো অবহেলা করতে পারে না। তাইতো তুমি বিশ্ববন্দিত !চির-ইপ্সিত, চির-আকাঙ্খিত, চিরসবুজ——-চিরসুন্দর ! যদিও, আমি এতোসব কঠিন কথা বুঝতে পারিনে সখা। আমি শুধু জানি, তুমি আমার বেঁচে থাকার অমূল্য রসদ! আমার সুহৃদ, আমার মিতা। আমার কলমকে তুমিই করো উজ্জীবিত–অনুরাগে,প্রীতিতে- ভালবাসায়— বসন্ত সখা! তুমি যে আমার গঙ্গাজল!

 

ইতি–তোমার গঙ্গাজল।

Loading

Leave A Comment

<p>You cannot copy content of this page</p>