প্রবন্ধ

  • প্রবন্ধ

    প্রবন্ধ- ভাষার গতি

    ভাষার গতি
    অমরেশ কুমার

     

     

    ভাষায় যত জটিলতা আসবে ভাষা ততো জটিল হবে । ভাষা যত সহজ সরল হবে ততই সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে উঠবে; নতুবা জটিলতা থেকে পৃথক সত্তায় নতুন ভাষার আবির্ভাব ঘটবে ।

    জটিলতার সুবিধা হলো নতুন ভাষার উৎপত্তি , কোন কিছুতে জটিলতা না থাকলে নতুন কিছু পাওয়া যায় না ।

    অসুবিধা হলো ভাষার খন্ডীকরণ, ফলে পুরানো ভাষা অনেক সময় বিপন্নের মুখে পড়ে ।

    বর্তমানে একাধিক ভাষা বিপন্নের সম্মুখীন । যে সকল ভাষায় আগে মানুষ কথা বলতেন এখন সেই ভাষার অর্থ প্রচুর মানুষ বোঝেন না । দীর্ঘকাল ধরে ভাষা সুপ্ত থাকতে থাকতে লুপ্ত হয়ে যায় । বিলুপ্ত ভাষা পুনরুদ্ধারের জন্য আমাদের ভাষাবিদরা একের পর এক গবেষণা চালিয়ে চলেন । বাস্তবে দেখা গিয়েছে এই গবেষণার ফল বইয়ের পেজ এ ছাড়া আর কোথায় ব্যবহৃত হয় না । কেননা সেগুলোর কোন কথ্য রূপ জন সম্মুখে ব্যবহৃত হয় না । ভাষার এই বহুবিধ গতির ফলে একাধিক ভাষার জন্ম হয়, যা থেকে জন্ম নেয় পৃথক ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত জাতি । যা পৃথক সত্তার অধিকারী । যা মনুষ্যজাতির খন্ডীকরণ এর প্রধান হাতিয়ার । এই হাতিয়ারকে কেন্দ্র করে মানুষ নিজের সত্তা টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করে চলে, যা উন্নয়নের গতিকে অনেক সময় স্তব্ধ করে দেয় ।

    সুতরাং , ভাষার অগ্রসর এর পথে গতিও রয়েছে আবার বাধাও রয়েছে । ভাষাবিদরা যদি প্রথম থেকে ভাষার উপর পূর্ণ দক্ষতার সহিত বাধা গুলি উপলব্ধির মাধ্যমে সেগুলি দূর করার চেষ্টায় ব্রত থাকেন তাহলে ভাষার গতি বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে ।।

  • প্রবন্ধ

    প্রবন্ধ- নারীর অগ্রগতি নারীর হাতে

    নারীর অগ্রগতি নারীর হাতে
    – অমরেশ কুমার

     

     

    পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের পাশে থেকে তাদের অধিকারের জন্য আমাদের লড়তে হবে, লড়তে হবে সেই সকল অত্যাচারিত মহিলা, শিশু, বৃদ্ধা, বৃদ্ধদের জন্য। যাদের ইচ্ছা থাকলেও প্রকাশের ভাষা নেই, যাদের মুখ বুজে সব সহ্য করতে হয়। আজ আমরাই নারী সমাজের ভবিষ্যৎ, আমাদের উচিত আমাদের মাতৃ সমাজের পাশে দাঁড়ানো, আমাদের উচিত আগামী দিনের সমাজকে সুস্থ রাখা। কিন্তু, তা আমাদের একার দ্বারা সম্ভব নয়, দরকার সমষ্টি। আজ আমাদের ভাইদেরকে বলতে হবে বোঝাতে হবে, যে নারীরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ; নারী ছাড়া সমাজ কখনো সুষ্ঠ ভাবে চলতে পারে না, তাই দরকার নারী সমাজের অগ্রগতি ।

    প্রত্যেক নারীকেও মাথায় রাখতে হবে যে কিছু পাইয়ে দেওয়া যায় না, তা ছিনিয়ে নিতে হয়। প্রয়োজনে নিতে হবে। নারীর উন্নতিতে বহু পুরুষ কৃতিত্বের পরিচয় রাখে। তবে যতদিন না সকল নারী সমাজে একত্রিত হয়ে আন্দোলনে নামবে ততদিন সমগ্র ভাবে বাঁধা কাটানো সম্ভবপর হয়ে উঠবে না। আজও সমাজে পণপ্রথা চালু, লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, যে নারী সমাজের উন্নয়নের জন্য লড়ছে সেই নারী নিজের ঘরে ছেলের হয়ে পণ আনার জন্যও লড়ছে। নারীর এই দ্বিচারিতা আচরণ নারী সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সকল নারীকে এক বাক্যে বলতে হবে।

    আজও বহু ভাইয়েরা আমাদের এগিয়ে চলার জন্য সর্বদা হাত বাড়িয়ে হাত ধরতে প্রস্তুত থাকে। যখন তারা আমাদের পাশে দাঁড়ানোর শপথ নিয়েছে তখন আমরা পিছিয়ে থাকলে চলবে না, আমরা নারী সমাজ,আমাদের তা বুঝতে হবে। আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। শুধু এগিয়ে এলে হবে না সবাইকে আরো এগিয়ে আনতে হবে ।

    গ্রাম বা শহর প্রত্যেকটি অলিতে গলিতে দেখলে বোঝা যায় আজও পুরুষ শাসিত সমাজে নারী অবহেলিত, এর জন্য আমরাই দায়ী আমরা কখনো এগিয়ে আসিনি, আমরা কখনো প্রতিবাদ করিনি।
    আমাদের বিশ্বাস, আমরা সবাই মিলে একটা সুস্থ সমাজ গড়ে তুলবো। হয়তো আজ আমরা ক্ষুদ্র, তবে তুচ্ছ তো নয়। হ্যাঁ, আমরা চেষ্টা করলে আরো কিছুজনের মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত বাসনার জাগরণ ঘটাতে পারবো। তাই আমাদের লক্ষ্য, সুস্থ সমাজ। একটি সমাজকে তখন সুস্থ বলা যায় যখন সমাজের নারীরা সুরক্ষিত থাকে, নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটে, আর আগামী দিনের শিশুরা মাতৃ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে।
    সেই জন্য আমরা সবাই চেষ্টা করবো একত্রিত ভাবে কাজ করার।

  • প্রবন্ধ

    প্রবন্ধ- আইসক্রীম

    আইসক্রীম
    -সঞ্চিতা রায় (ঝুমা )

     

     

    আইসক্রীম আমাদের প্রায় সকলেরই একটি বিশেষ ভালবাসার খাবার। আইসক্রীম ভালবাসেনা এমন মানুষ বেশ বিরল। তাই আমাদের এই পুজো সংখ্যায় আইসক্রীম নিয়ে ছোট প্রবন্ধ হিসাবে কিছু লিখতে মন চাইলো। তথ্যগুলো যথাসম্ভব সংগ্রহ করে শব্দ দিয়ে গেঁথে ফেলার চেষ্টা করছি। আচ্ছা আইসক্রীম শব্দের কোনো সঠিক বাংলা আছে কি?অনেকে আইসক্রীম কে কুলফী,মালাই,বা একসঙ্গে কুলফিমালাই ইত্যাদি বলে থাকেন। আবার আক্ষরিক ভাবে বললে আইস মানে বরফ আর ক্রীম মানে ননী ,নবনী ইত্যাদি ,অর্থাৎ একসঙ্গে বললে বরফ নবনী। কিন্তু এই কথাটি প্রচলিত নয়। যাই হোক না কেন,আইসক্রীম কে যে নামেই ডাকো তা খেতে সুস্বাদু এবং সুন্দর।
    এবার আসি,আইসক্রীম এর ইতিহাসে। কবে কিভাবে পৃথিবীতে প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল তা খুব স্পষ্ট ভাবে জানা না গেলেও বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ ঘেটে মোটামুটি একটা ধারণা করা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইওরোপের মানুষ বরফের সাথে মিষ্টি মিশিয়ে একধরণের পানীয় গ্রহণ করতো সেটাই আইসক্রীমের আদি রূপ। তথ্য ঘেঁটে অনেকে বলেছেন প্রাচীন গ্রীসে নাকি বরফের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। গ্রীক চিকিৎসক হিপ্পোক্র্যাটস নাকি বরফে মধু মিশিয়ে খাওয়ার কথা বলতেন রোগীদের। আবার অনেকে মনে করেন, যে খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দী তে রোম সম্রাট নিরো র রাজদরবারে পাহাড় চূড়া থেকে বরফ আনিয়ে সুরা ফলের রস ,মধু মিশিয়ে এক ধরণের পানীয় গ্রহণের যে রেওয়াজ ছিল, সেটাই আইসক্রীমের আদিরূপ। কেউ কেউ বলেন,মার্কো পোলো প্রাচ্য পরিক্রমা সেরে ইতালিতে ফেরার সময় নাকি বরফ থেকে পানীয় বা আইসক্রীমের রেসিপি নিয়ে এসেছিলেন। তিনি যখন চীন সম্রাট কুবলাই খানের দরবারে এসেছিলেন,একদিন বেজিং(পিকিং) এর রাস্তার বেড়ানোর সময় দেছেন, একজন লোক ঠেলাগাড়ি তে করে বরফ জমাট বাঁধা দুধ আর ফলের রসের মিশ্রণ বিক্রি করছেন। খাবার টি মার্কো পোলোর ভাল লাগে। তাই তিনি রেসিপীটি ইতালিতে নিয়ে আসেন। ইতালির মেয়ে ক্যাথেরিন ফ্রান্সের রাজপুত্রকে বিয়ে করে যখন ফ্রান্সে আসেন তখন সঙ্গে নিয়ে আসেন কিছু পাচক। তারা ক্যাথরিনের শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে আইসক্রীম খাওয়ান। ফ্রান্সেও জনপ্রিয় হয় আইসক্রীম। ফ্রান্সের মেয়ে হেনরিয়েটা মারিয়া ইংল্যাণ্ডে যখন বিয়ে করে আসেন,তার সাথে আইসক্রীমের রেসিপী পৌঁছায় ইংল্যাণ্ডে।
    ইংরেজরা আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করলে আমেরিকায় প্রচলন হয় আইসক্রীমের। ১৭৪৪ সালে ১৭ই মে মেরিল্যাণ্ড প্রদেশের গভর্নর উইলিয়াম ব্লাডেন এর বাড়ির নৈশভোজে জনৈক ব্যক্তি আইসক্রীম খেয়ে তাঁর স্ত্রীকে আইসক্রীম এর প্রশংসা করে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সম্ভবত ওটাই ওদেশে আইসক্রীম এর সূত্রপাতের সময়। শোনা যায় প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন নাকি আইসক্রীমের পিছনে অনেক টাকা ব্যয় করেছিলেন। আমাদের দেশে প্রথম দিকে বরফ স্যাকারিন কৃত্তিম রঙের মিশ্রণকে আইসক্রীম হিসাবে খাওয়া হ’ত। মোঘল রাজারা নাকি হিন্দুকুশ পর্বত থেকে বরফ আনিয়ে তার সঙ্গে ফল কেটে মিশিয়ে একধরণের সরবতের মত খেতেন। কুলফি আইসক্রীম কে ভারতের আদি আইসক্রীম বলে মনে করা হয়। এটাকে “দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যপূর্ণ আইসক্রীম ”বলে বর্ণনা করাহয়েছিল। মনেকরা হয় এটি পার্সিয়ান আইসক্রীম বাসটানি সোন্নাটিকে অনুকরণ করে করা হয়েছিল। একসময় কাঠি চুষে খাওয়া হ’ত। ঠেলাগাড়ি আইসক্রীম আইসক্রীম বলে হাঁক দিয়ে যেত। খিদিরপুরে এল ম্যাগনেলিয়া। সম্ভবত ৬০এর দশকে কোয়ালিটি আইসক্রীম এসে আইসক্রীম কে জনপ্রিয় করে। এরপর একে একে রলিক,তুলিকা,আমূল ভাইস মেট্রো ইত্যাদি আইসক্রীম বাজারে জনপ্রিয় হয়। ১৮৫১ সালে মেরিল্যাণ্ডে জেকব ফুসেল নামে এক ব্যাক্তি আইসক্রীম এর প্রথম বিপনন কেন্দ্র চালু করেন। ক্রমে তা শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে। ১৮৫১ সালে বাল্টিমোরে প্রথম কারখানায় আইসক্রীম উৎপাদন শুরু হয়। কারখানায় আইসক্রীম তৈরীর জন্য সাধারণত দুধ,ক্রীম(দুগ্ধজাত ফ্যাট),দুগ্ধজাতীয় প্রোটিন,জল,গ্লুকোজ,মাখন বা মাখন তেল,চিনি,সুগন্ধী ,স্টেবিলাইজার ও ইমালসিফায়ার (জল তৈলাক্ত পদার্থ মিশতে সাহায্য করে ও আইসক্রীমকে মসৃণ থাকতে সাহায্য করে)আইসক্রীমে বৈচিত্র আনতে ভ্যানিলা,স্ট্রবেরী,চকোলেট ,কাজু কিসমিস ,অরেঞ্জ ফ্লেভার,বাটার স্কচ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।
    প্রাথমিক উপাদান বা উপকরণ গুলোকে প্রথমে মিক্সিং মেশিনে ভাল করে মেশানো হয়। তারপর উচ্চ উষ্ণতায় পাস্তুরাইজেশান পদ্ধতিতে জীবানুমুক্ত করে পরিশোধন করা হয়। এরপর স্টেবিলাইজার ও ইমালসিফায়ার মিশিয়ে হোমোজিনাইজার যন্ত্রের মাধ্যমে ফ্যাটকে সূক্ষাতিসূক্ষ করে ভেঙে মসৃণ করাহয়। এরপর ফলের চূর্ণ বা সুগন্ধী রঙ ইত্যাদি মেশানো হয় এবং মাইনাস ৪ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে কিছুক্ষণ রাখা হয়। এরপর একটানা হিমায়ক(কন্টিনিয়াস ফ্রিজার)এ মোটামুটি মাইনাস ৫ ডিগ্রী তে রেখে ঠাণ্ডা হাওয়া দেওয়ার পর বেরিয়ে আসে আইসক্রীম । এরপর কাপ ,ব্লক ইত্যাদিতে প্যাকিং করে মাইনাস ৩০ মাইনাস ৪০ সেন্টিগ্রেড ডিগ্রী তে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এরপর প্রয়োজন মত বিপণন করা হয়। যেহেতু ছোট থেকে বড় সকলেরই খুব প্রিয় খাবার এই আইসক্রীম ,তাই ঘরে আইসক্রীম তৈরী করার একটা প্রাথমিক ধারণা দিয়ে লেখাটা শেষ করছি। ধরা যাক ঘরে ভ্যানিলা আইসক্রীম তৈরী করছি,প্রথমে মিল্ক পাউডার ও জল ভাল করে মিশিয়ে ফেটিয়ে নিতে হবে। আঁচে বসাতে হবে। ফুটে উঠলে চিনি ভালোভাবে মেশাতে হবে। এক্ষেত্রে চিনির সাথে যদি জি এম এস ও সি এম সি মেশালে ভাল হয়। এগুলো বড়বাজার,এজরা স্ট্রীটে পাওয়া যায়। এতে আইসক্রীম মোলায়েম হয়। এবার ভাল করে নেড়ে নিতে হবে। এবার একটু এরারুট বা কাস্টার্ড পাউডার মিশাতে হবে। এবার মিশ্রণটা ঠাণ্ডা করতে হবে। ঠাণ্ডা হলে ভ্যানিলা এসেন্স মিশিয়ে আর একবার ভাল করে নাড়তে হবে। এবার নির্দিষ্ট কৌটো বা আইসক্রীম কাপে রেখে ,ডিপ ফ্রিজে (ডিপ ফ্রিজকে কোল্ডেস্ট পয়েন্টে রেখে )রাখতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পরে পরিবেশন করা যাবে। এটা একটা প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হ’ল মাত্র। ভ্যানিলার বদলে যে যা ফ্লেভার পছন্দ করেন,ব্যবহার করতে পারেন। যেমন স্ট্রবেরী ফ্লেবার বা চকোলেট আইসক্রীম তৈরী করতে চাইলে কোকো পাউডার। চাইলে ঘরে কাসাটা আইসক্রীম ও তৈরী করতে পারেন। সেক্ষেত্রে আগে থেকে ভ্যানিলা ও স্ট্রবেরী আইসক্রীম চকোলেট আইসক্রীম তৈরী করে রাখতে হবে পূর্ব বর্ণিত পদ্ধতি অনুযায়ী। আর আনতে হবে ফ্যাটলেস স্পঞ্জ কেক। ঠাণ্ডা কেকটার উপর প্রথমে ভ্যানিলা তারপর স্ট্রবেরী তারপর চকোলেট স্তর দিতে হবে। ডিপফ্রিজের পয়েন্ট আগে থেকেই ঠাণ্ডা করে রাখতে হবে। ঠাণ্ডা করে রাখতে হবে আইসক্রীম রাখার পাত্রটাও। ঢাকা দিয়ে ডিপফ্রিজে রাখতে হবে। সম্পূর্ণ জমে গেলে কেটে পরিবেশন করা যাবে।
    কাঠি আইসক্রীম বা ললিপপ আইসক্রীম ও তৈরী করা যায় বাড়িতে। এক্ষেত্রে দুধ,কনডেন্সন্ড মিল্ক,জিলেটিন,অরেঞ্জরঙ,অরেঞ্জ এসেন্স,চিনি ইত্যাদি লাগবে। দুধ,কনডেন্সন্ড মিল্ক ও চিনি মিশিয়ে ফুটিয়ে নিতে হবে নেড়ে নিতে হবে। নামিয়ে জিলেটিন মিশিয়ে দুধ ঠাণ্ডা করতে হবে। ফ্রিজের পয়েন্টকে সব চেয়ে ঠাণ্ডা করে মিশ্রটি কিছুক্ষণ রেখে অল্প জমলে বাইরে এনে অরেঞ্জ এসেন্স ও রঙ মিশিয়ে স্টিক আইসক্রীম তৈরীর পাত্রে(কিনতে পাওয়া যায়)ঢেলে কাঠের স্টিক লাগিয়ে জমতে দিতে হবে। নির্দিষ্ট পাত্রটি না থাকলে কাগজের কাপ ব্যবহার করা যেতে পারে। জমে গেলে কাগজটা খুলে নিতে হয়।
    পরিশেষে একটা মজার কথা বলে শেষ করছি। আইসক্রীম সাধারণত কোনো পার্টিতে ডেসার্ট হিসাবে খাওয়া হয়। Stressed কথাটার উল্টালে desserts কথাটি পাওয়া যায়। তাই বলা যেতে পারে Stressed ও desserts পরস্পরের পরিপূরক বা desserts খেলে Stressed হওয়া থেকে বাঁচা যায়। এটা মজা। কিন্তু এটা সত্য যে আইসক্রীম খাওয়ার মধ্যে সত্যিই একরাশ মজা ও আনন্দ পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে আরো সুন্দর স্বাদে ভরপুর আরো অনেক আইসক্রীম আমরা পাব,এই আশা রাখি।
    তথ্য সংগ্রহ ইন্টারনেট ও কিছু পত্রপত্রিকা

  • প্রবন্ধ

    প্রবন্ধ- স্মৃতি প্রসঙ্গে

    স্মৃতি প্রসঙ্গে
    – শচীদুলাল পাল

     

     

    প্রথমতঃ স্মৃতি এক প্রাচীণ হিন্দু শাস্ত্র গ্রন্থ।বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় গ্রন্থের এক বিশাল সংকলন।মুখে মুখে প্রচারিত নানান বিষয়কে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল ‘স্মৃতি ‘ গ্রন্থে।মূলত তার মধ্যে স্থান পেয়েছে ছয় বেদাঙ্গ,রামায়ণ, মহাভারত, ধর্মশাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র, পুরান, কাব্য,বিভিন্ন গ্রন্থের পর্য্যালোচনা ও মন্তব্য, সাহিত্য,নীতিশাস্ত্র,রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিল্প ও সমাজ সমন্ধীয় বিস্তারিত ইত্যাদি। যা বার বার সংশোধন করা হয়েছিল। এক অবাধ গ্রন্থ। ১৮ জন পন্ডিত যারা স্মৃতি শাস্ত্র লিখেছিলেন। আবার ভাষাগত দিক থেকে শ্লোকের একপ্রকার ছন্দের নাম স্মৃতি। পুরান মতে ধর্ম ও মেধার কন্যা স্মৃতি। সংস্কৃতে স্মৃতি মানে মস্তিষ্কে ধরে রাখা। ছান্দ্যোপনিষদে বলা হয়েছে মনের কথা বলা, স্মৃতিচারন বা মনের মধ্যে ধরে রাখায় স্মৃতি।
    বিজ্ঞানভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক পর্য্যালোচনা করলে দেখা যায় স্মৃতি এক অন্তর্নিহিত শক্তি।
    অনেকে মনে করেন স্মৃতি শক্তি জন্মগত এক গুন। তাই কেউ কেউ মেধাবী হয়। ব্রাহ্মীশাক বা ব্রাহ্মী শাকের নির্য্যাস থেকে তৈরি ওষুধে স্মৃতি শক্তির বৃদ্ধি করে। সিনেমায় আমরা দেখেছি স্মৃতি বিলুপ্ত হয়েছে এমন ব্যাক্তির মাথায় আঘাত লেগে পুনরায় স্মৃতি শক্তি ফিরে এসেছে। ( সন্ন্যাসী রাজায় উত্তম কুমার) নিজের লোকজনকে চিনতে পারছে। পুরানো সব কথা তার মনে পড়ছে।ভাওয়াল সন্ন্যাসীর এই কাহিনি সত্য ঘটনা অবলম্বনে।
    স্মৃতি আর মেধা একে অপরের পরিপূরক নয়।
    শৈশবে আমরা অনেক বড়ো বড়ো কবিতা মুখস্ত করে দিতাম। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই স্মৃতি শক্তি কমতে থাকে। অবশ্য স্মৃতি শক্তি বাড়াবার জন্য অনেক টিপস আছে। তার মধ্যে ধ্যান সর্বশ্রেষ্ঠ।আইনস্টাইন সহ বিভিন্ন মেধাবী ব্যাক্তির মস্তিষ্ক সংরক্ষিত আছে।বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন গ্লিয়া নামে এক স্নায়ুকোষ আছে তারই অবদান হলো এই মেধাশক্তি। নিউরনের ঘনত্ত্ব বাড়লেই স্মৃতি শক্তি বাড়বে এর কোনো মানে নেই।
    প্রত্যেকটা ভাবনা মস্তিষ্কে ছাপ ফেলে। ঠিকপথে গেলে সেই স্মৃতি কে তুলে আনা যায়। হারানো স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনার জন্য ইলেক্ট্রিক শক বা সম্মোহন বহুকাল থেকে প্রচলিত।
    স্মৃতি বিলোপের কথা প্রসঙ্গে—- যা প্রায় সব মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় তাহলো সর্ট টার্ম মেমোরি লস। অর্থাৎ অনেক পুরানো স্মৃতি তার মনে থাকে কিন্তু এই মুহুর্তের অনেক কাজে ভুল করে বসে।বিজ্ঞানী নিউটন ঘড়ি ধরে হাফ বয়েল ডিম সেদ্ধ করছিল।
    কিছুক্ষন পরে সে দেখলো হাতে ডিমটি ধরা আছে আর ফুটন্ত জলে ঘড়িটি ফুটছে।
    সচরাচর অনেকেই কোথায় কি রেখেছে মনে করতে পারেনা।মোবাইল, চাবি,ব্যাগ বিশেষ করে ছাতা বাইরে কোথাও গিয়ে রেখে আর মনে করতে পারেনা। হারিয়েও যায়।
    ছাতা যাতে না হারায় সে বিষয়ে একটা কথা মনে পড়লো,। “শীতের কাঁথা,বর্ষার ছাতা আর ফুলসজ্জার বউ কখনো হাত ছাড়া করতে নেই।”
    বয়স্কদের ডিমেনশিয়া থেকে আলঝাইমার্স ভুলে যাওয়া রোগ সৃষ্টি হয়।
    কোনো একটা কিছু খুঁজতে রান্না ঘরে গেলো সেখানে গিয়ে সে মনে করতে পারেনা কিজন্যে সে এসেছিল।
    আর্কেমিডিস চৌবাচ্চার জলে স্নান করতে গিয়ে তার থিয়োরি খুঁজে পেয়ে নগ্ন অবস্থায় ইউরেকা ইউরেকা বলতে বলতে একেবারে রাজসভায় হাজির হয়েছিল।
    ঈশ্বর দর্শন করলেও বাহ্যিক জ্ঞান শূণ্য হয়। সেইসব মহাপুরুষদের আমরা পাগল বলি।
    এবার কিছু বাস্তব ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরি।
    অতীতের সব ঘটনা আমাদের স্মৃতি পটে থাকেনা। কয়েকটি বিশেষ ঘটনা যেমন ভ্রমণ, মনোরম দৃশ্য,আনদঘন মুহুর্ত, দুর্ঘটনা, প্রিয়জনের মৃত্যু ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী থেকে যায়।আমি তখন বাইশ। একবার প্রয়াগ গিয়েছিলাম ত্রিবেণীতে যমুনা থেকে মাঝনদীতে এক নৌকা ভাড়া করে তীর্থযাত্রীদের সাথে।গঙ্গা যমুনা সরস্বতীর সঙ্গম।মাঝ নদীতে যমুনা থেকে দিলাম এক ঝাঁপ গঙ্গায়। যমুনার জল বড়ো স্থির কিন্তু গঙ্গার তীব্র স্রোতে আমি ভেসে গিয়েছিলাম অনেকটা। সাঁতারে অনেক দূর গিয়ে অন্য নৌকায় উঠে ছিলাম। এমনি স্নান কেউ করে করে কিনা জানা নেই। আমার উদেশ্য ছিলো যমুনা সরস্বতী যেখানে গঙ্গার সাথে মিশেছে সেখানে স্নান করা।
    এই স্মৃতি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
    পুরিতে সুর্যোদয়ের অপরূপ দৃশ্য, নুলিয়ার সাথে ঢেউয়ের ওপারে স্থির জলে চলে যাওয়া,
    বিশাল বিশাল ঢেউ এর মধ্যে ফিরে আসা এক দুঃ সাহসিক অভিযান।
    বালিকার প্রথম প্রেমের স্মৃতি চির অক্ষুন্ন থাকে।ফুলসজ্জা বা প্রথম মিলনের স্মৃতি মনের মণিকোঠায় থেকে যায়।
    স্মৃতি নিয়ে এক মজার ঘটনা। তখন আমাদের পাড়ায় চুল কাটার সেলুন ছিলনা। ইটের উপর বসে চুল কাটতে হতো।মজা করে বলতাম ইটালিয়ান সেলুন। আমার এক বন্ধু তেমনি এক নাপিতের কাছে গিয়ে বললো ওই যে দেওয়ালে সিনেমার পোস্টার দেখছেন ওই আর্টে চুল কেটে দাও।সেখানে ছিল উত্তম কুমারের স্মৃতি টুকু থাক সিনেমার পোস্টার। নাপিতের কাছে কোনো আয়না ছিলনা। বন্ধুটি চুল কেটে বাড়ি গিয়ে আয়নায় দেখে এত ছোট করে কেটেছে প্রায় মুন্ডনের মত।আর একটা টিকি রেখে দিয়েছে। বন্ধুটি রেগে আগুন। নাপিতের কাছে গিয়ে বললো এমনি কেন কেটেছো? ধূর্ত নাপিত বলল তুমিই ত বলেছিলে পোস্টারের দিকে আগুল দেখিয়ে। ওখানে ত ” স্মৃতি টুকু থাক ” লেখা আছে। তাই ছোট করে কেটে টিকি রেখে দিয়েছি।
    প্রকৃতি যে কত মনোরোম এখনো চোখ বুঝে মনকে সেইসব স্থানে নিয়ে গেলে উপলব্ধি করি।
    মারাত্মক দুর্ঘটনা ছিন্নভিন্ন দেহাংশ
    ইত্যাদি দেখলে সেই সব ভয়ংকর স্মৃতি মনে থেকে যায়।
    প্রিয়জন বিয়োগ ব্যাথায় বেশি করে মনে পড়ে।মনে পড়ে বাবা মায়ের স্নেহের সান্নিধ্য। জ্বর হলে মায়ের সেবা শুশ্রূষা, শয্যা পাশে রাত্রি জাগরণ।
    শৈশব থেকে আজ অবদি নানান আনন্দ, দুঃখ, বেদনা ইত্যাদির স্মৃতি মনে পড়ে।মনে পড়ে বিভিন্ন মানুষ অকপটে যখন তাদের অন্তরের অত্যন্ত গোপন কথা, দুঃখের কথা বলে সেইসব কথাগুলির স্মৃতি। তারা যখন আমার দ্বারা উপকৃত হয় তাদের সমস্যার সমাধান হয়েছে সংবাদ দেয় ও ধন্যবাদ জানাই সেই সব স্মৃতি মনে পড়ে।
    ঈর্ষান্বিত এই সমাজ। যখন কেউ অপমান করে আঘাত দিয়ে কথা বলে তখন স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে মনিষীদের জীবন কাহিনী আর বাণী। “যে সয় সে রয়,যে না সয় সে নাশ হয়”। “তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন”।”কুকুরের কাজ কুকুর করেছে কামড় দিয়েছে পায়, তাই বলে কুকুরে কামড়ানো কী মানুষের শোভা পায়।” ইত্যাদি,ইত্যাদি।

  • প্রবন্ধ

    প্রবন্ধ- নবান্ন

    নবান্ন

    -ইন্দ্রনীল মজুমদার  

     

    সেই কবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “দুরন্ত আশা” কবিতায় বলে গেছেন-
    “অন্নপায়ী বঙ্গবাসী
    স্তন্যপায়ী জীব”
    অর্থাৎ বাঙালীজাতি অন্নকে এতোটাই ভালোবাসে যে এরা অন্নকে বিশেষ করে অন্নের ফ্যানকেও পান করে নেয়। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের সময় যখন কলকাতা শহরের রাস্তায় রাস্তায় দুর্ভিক্ষ পীড়িত অঞ্চলের অর্ধকঙ্কাল মানুষ যখন খাবারের ভিক্ষে করে ভাতও পেল না তখন ভাত থেকে বর্জিত ফ্যানটুকু চাইলেও ফ্যান দিতেও কৃপনতা করেছিল এই জাতি। হায়! এই না বলে “রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করনি।” কিন্তু আপাতত এইসব ‘নেতি,নেতি’ ব্যাপার বন্ধ থাক কারণ সুখের কথা বাঙালীর বারো মাসে তেরো পার্বণ। উৎসবে ভরা আমাদের এই গোটা বঙ্গদেশ-পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ। তেমনি একটি উৎসব এই অন্নকে ঘিরেই যার নাম “নবান্ন”। “নবান্ন” শব্দটির অর্থ “নতুন অন্ন”।এই উৎসব আসলে দুই বাংলার ঐতিহ্যবাহী শস্যোৎসব।গ্রামবাংলার কৃষক সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন তাদের মধ্যে অন্যতম।

    অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারিতে বোনা এবং রোপা হয় আমন ধান। তাই এর স্থানীয় নাম জলিধান বা পৌষধান। এই আমন ধানকেই ঘিরে নবান্ন উৎসব। আসলে নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব এই নবান্ন। তাই এই উৎসব সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর অনুষ্ঠিত হয়। আবার কোথাও কোথাও মাঘ মাসেও নবান্ন উদযাপন হয়। এই অনুষ্ঠানের রীতি হল নতুন অন্ন প্রথমে পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাক ইত্যাদি প্রাণীকে উৎসর্গ করা হয় এবং আত্মীয়-স্বজনকে পরিবেশন করার পর কৃষি ঘরের গৃহকর্তা ও পরিবারবর্গ নতুন গুড় সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন।

    এবারে আসি কাককে অন্ন উৎসর্গ করার প্রথায়। এই উৎসবের এক লৌকিক প্রথা অনুসারে নতুন আমন চালের তৈরি খাদ্যসামগ্রী কাককে নিবেদন করা হয়। এটা আসলে এই উৎসবের একটি অঙ্গবিশেষ। “বিশ্বাসে মিলায়ে বস্তু তর্কে বহুদুর।” তাই লোকবিশ্বাস অনুযায়ী কাকের মাধ্যমে ওই খাদ্য মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়। কাকের জন্য এই নৈবেদ্যকে বলে “কাকবলী”।

    নবান্ন উৎসব হিন্দুদের একটি প্রাচীন প্রথা। হিন্দুশাস্ত্রে নবান্নের উল্লেখ ও কর্তব্য নির্দিষ্ট করা রয়েছে। সেই শাস্ত্র অনুসারে, নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃপুরুষ অন্ন প্রার্থনা করে থাকেন। এই কারণে হিন্দুরা পার্বণ বিধি অনুযায়ে নবান্নে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করে থাকেন। শাস্ত্রমতে, নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হয়।আবার অতীতকালে পৌষ সংক্রান্তির দিনও গৃহদেবতাকে নবান্ন নিবেদন করার প্রথা ছিল।

    এবার আলোচনা করা যাক “নবান্ন” উৎসবের সামাজিক তাৎপর্য নিয়ে। একদা অত্যন্ত সাড়ম্বরে নবান্ন উৎসব পালিত হত সেখানে সকল মানুষের সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে নবান্ন উৎসব সমাদৃত ছিল। ১৯৯৮ সন থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে নবান্ন উৎসব উদ্যাপন শুরু হয়েছে। জাতীয় নবান্নোৎসব উদ্যাপন পর্ষদ প্রতিবছর পহেলা অগ্রহায়ণ তারিখে নবান্ন উৎসব উদ্যাপন করে। ইদানীং বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে আনুষ্ঠানিক নবান্ন উৎসব উদযাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমী তাদের প্রকাশিত “শিশু” পত্রিকায় নবান্নের উপর একটি পৃথক সংখ্যা বের করে।বিজন ভট্টাচার্যের লেখা একটি বাংলা নাটকের নাম “নবান্ন” যা ১৯৪৪ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রযোজনায় ও শম্ভু মিত্রের পরিচালনায় এই প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল।এরপর ১৯৪৮ সালে বহুরূপী নাট্যদলের প্রযোজনায় ও কুমার রায়ের পরিচালনায় নবান্ন মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকটির বিষয় পঞ্চাশের মন্বন্তর (১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ যাতে বাংলার ২০ লক্ষ মানুষ অনাহার, অপুষ্টি ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছিল।গণনাট্য সংঘ এই নাটকটিকে ভারতের নানা জায়গায় তাদের ‘ভয়েস অফ বেঙ্গল’ উৎসবের অঙ্গ হিসেবে মঞ্চস্থ করে দুর্ভিক্ষের ত্রাণে লক্ষাধিক টাকা তুলতে সক্ষম হয়েছিল।নাটকের প্রধান চরিত্র বাংলার এক চাষি প্রধান সমাদ্দার। এই নাটকের বিষয়বস্তু হল প্রধান সমাদ্দারের পরিবার ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে অনাহারে কেমন কষ্ট পেয়েছিল তাই নিয়ে।

    এই উৎসব কালেক্রমে আরো অনুষ্ঠিত হোক এই কামনাই রইলো।

  • প্রবন্ধ

    প্রবন্ধ- “বাংলার নিঃশব্দ আর্তনাদ”

    “বাংলার নিঃশব্দ আর্তনাদ”
    – তন্ময় সিংহ রায়

     

    সাত হাজার অতিক্রান্ত এ গ্রহের ভাষা বৈচিত্রে ব্যবহৃত ভাষা প্রায় হাজার সাড়ে ছয় মতন ও তার মধ্যে বাংলা বোধকরি একদম প্রথম সারিতে এক অকৃত্রিম রাজকীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ!
    পৃথিবীর মধুরতম ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষার মর্যাদা আজ সমগ্র ভূপৃষ্ঠকে বেষ্টন করেছে বায়ুচাপ বলয়ের মতন বললেও নিতান্তই অযৌক্তিক কিছু বলা হবেনা। প্রকৃত বাংলা ভাষাপ্রেমী সংখ্যালঘিষ্ঠ কিছু শ্রেণীর মানুষ বোধকরি এক চরম দুশ্চিন্তায় প্রহর গুনছেন, বলাবাহুল্য এর একাধিক যুক্তিসংগত কারণও আছে বৈকি!
    সর্বোপরি রাষ্ট্রের শাসক সম্প্রদায় থেকে ফিল্মি ও খেলার দুনিয়ার সেলিব্রিটিরা সবাই আজ ইংরিজিমুখি। অপুষ্টি ও চরম অবহেলায় জীর্ণ ও শীর্ণকায় বাংলা-টা ক্রমশই হয়ে উঠছে শুধুই কথ্য ভাষা।
    বছর চার-পাঁচ এ ধরিত্রীর অক্সিজেন গ্রহণকারী নবপ্রজন্মের এক বৃহদাংশের আজ শিক্ষা শুরু ইংরিজি মিডিয়াম থেকে। শিক্ষায় জন্ম যে ছেলেটার বাংলা মিডিয়ামে, তার কদর সমাজে অপেক্ষাকৃত অনেকাংশে কম, এমনটাই একবিংশের জীবন্ত চিত্র! খুচরো হোক বা আস্ত, ইংরিজি বলে যতটা আত্ম-গর্বিত ও সোসাইটি এক কেলাস উঁচুতে উঠে গেলো বলে আমরা মনে করি, এমন অনুভবটা বাংলায় প্রায় মৃত্যুবরণ করেছে! আমদের বাহ্যিক আচরণ হয়তো বলে দেয় যে আমরা ভুলতে বসেছি, আমরা শুদ্ধ বাঙালী ও আমাদের অবিচ্ছেদ্য নাড়ির মূখ্য অপর প্রান্ত আজও বাংলা মায়ের নাড়িতে সংযুক্ত।

    এক পরিচিত দৃশ্য হলেও, আন্তরিক সাক্ষাতে মানসিক প্রতিক্রিয়া কিছুটা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলো সেদিন! খুব সম্ভবত বৃহস্পতি অথবা শুক্রবার ও বেলা তখন বারোটা-টারোটা বাজবে, হঠাৎ দেখি আমার বেশ কিছুটা সামনের দিক থেকে একটা বাধাহীন গতিশীল মালভূমি দুরন্ত গতিতে এদিকেই হনহনিয়ে এগিয়ে আসছে! কাছে আসতেই দেখি চরম উত্তেজিত ও উৎফুল্ল আননের সুমন্তদা, এক নাতিদীর্ঘ কথপোকথন আবিষ্কারে সক্ষমের ফলাফল এমন যে তার একমাত্র ছেলে এবারে নামী ইংরিজি মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস থ্রি-তে দুশো ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে ফার্স্ট হয়েছে।
    অনুভব করলাম পুত্রের এরূপ সাফল্যে পিতার বুক গর্বে মালভূমি হওয়াটাই স্বাভাবিক, অগত্যা প্রশংসা বিনিময়ে মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম!

    সমগ্র বিশ্ব জুড়ে ইংরিজির দাদাগিরিতে অনেক ভাষার-ই জীবন বিপন্নপ্রায় এমনকি জাতিসংঘের কাজকর্মের ভাষাও ইংরিজি! আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অথবা একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা প্রেমের বিপুল আকস্মিক উন্মাদনা কিংবা পহেলা বৈশাখ বাংলায় দুটো-একটা স্ট্যাটাস….’আমি গর্বিত, আমি বাঙালি’ ইত্যাদি…. ব্যস! অতঃপর সারাবছর রক্ষণাবেক্ষণবিহীন বাংলা-টা মুখ থুবড়ে পড়েই থাকে রাস্তার এক কোণায়! দুদিন পরেই বাংলায় কোন মাস ও বিশেষত কত তারিখ সব অতল গভীরে তলিয়ে যায় মনের!
    চুড়ান্ত যত্নহীন ও অবিবেচক হয়ে নিজেরাই নিজেদের ভাষার ইজ্জতকে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে বাজারের সস্তা পণ্য বানিয়ে নির্দ্বিধায় আফশোষবিহীনভাবে বেচে দিচ্ছি! এভাবে চলতে থাকলে…..
    আমরা সবাই এখন বুদ্ধিজীবী, হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ভিতরটা দেখাবার কোনো মানেই হয়না। এখন প্রশ্ন হল, এ বিষয়ে কপালে প্রকৃত দুশ্চিন্তার কালো মেঘের অন্ততপক্ষে সিংহভাগ বাঙালীর আবির্ভাব হবে কবে? ডুবন্ত বাংলা ভাষাকে বাঁচাতে ক’জন বিশেষত বাঙালীই বা আত্মাহুতি দেবে তাতে? ও কতদিনই বা তার আয়ু??

  • প্রবন্ধ

    প্রবন্ধ- এ যেন এক নতুন ইতিহাস

    এ যেন এক নতুন ইতিহাস

    ইন্দ্রনীল মজুমদার 

     

    আমাদের দেশ প্রাচীন দেশগুলির মধ্যে অন্যতম।বহু ইতিহাস ঘিরে রয়েছে এই দেশ। ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যাবে চমক দেওয়া সব ঘটনাগুলির সাক্ষী আমাদের দেশও।

    আমাদের দেশে যেরকম সাহিত্যচর্চা,বিজ্ঞানচর্চা ও ইত্যাদি চর্চার সাথে যাদুচর্চাও কিন্তু আছে। সবকিছু জিনিসই কোনো না কোনো ঘটনা বা ভাবনা থেকে সৃষ্টি হয়েছে, অদ্ভুতভাবে কিছু সৃষ্টি হয়নি। পাশ্চাত্য পুলিশের সাথে আমাদের পার্থক্য অনেক।জ্ঞানী ব্যক্তিদের সংখ্যা আমাদের দেশে থাকলেও পাশ্চাত্য দেশে আছে অনেক।আমাদের দেশ কুসংস্কারের মতো ঘন অন্ধকার জিনিস থেকে এখনো মুক্তি পায়নি, তার ছাপ আজও অনেক গ্রামে-গঞ্জে এমনকি শহরেও লেগে রয়েছে।বলাবাহুল্য, আজও কিছু মানুষ কাউকে জেতানোর জন্য হোম-যজ্ঞ করে, বৃষ্টি না পড়লে দেবদেবীর পূজো আরম্ভ করে, রোগ থেকে নিরোগ হওয়ার বা পরীক্ষায় সাফল্য বা কোনো কর্মে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য নানান তন্ত্র-তুকতাক ইত্যাদি অপকর্ম আরম্ভ করে। এরজন্য মানুষ নানান অ-মানুষের পাল্লায় পড়েছে যা্রা কেউই নয় শ্রেফ ঠকবাজ বা ভণ্ড এবং তাদের উদ্দেশ্য সাধারণ,সরল মানুষকে ধর্মের নামে ঠকিয়ে পকেট ফাঁক করে মুখ লুকানো।এর কাছে ঠকে যাওয়া লোকেদের দেখেছি, এদের দেখলে মনে হয় এরা নিজেদের পরম ভুল বুঝতে পেরেছে এবং এদের করুণ মুখ ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’-এই বিখ্যাত প্রবাদটির অর্থ-র সত্য প্রতিফলিত করে।নানান বিজ্ঞান ও ধর্মীয় অজুহাত দিয়ে এই ভন্ডগুলো টাকা সংগ্রহ করছে, এরা সভ্যতার অগ্রগতির বাঁধা সৃষ্টি করে এবং সমাজে অন্যায় করা ব্যক্তি বা অপরাধী হিসেবে গণ্য হয়।যেসব রাজনীতিবিদ বা প্রভাবশালী ব্যক্তি এইসব ভণ্ডদের মদত দেয় তারাও সমান দোষে দুষ্ট সেটা খেয়াল রাখতে হবে।

    বিজ্ঞান বরাবরই কুসংস্কারের পরম শত্রু। যেখানে কুসংস্কার সেখানে বিজ্ঞানের আলো ফেললে দেখা যাবে সব যাকে বলে ‘Nonsense’। তাই বিজ্ঞান হয়ে উঠছে এত শক্তিশালী এবং সভ্যতার পরম বন্ধু।বিজ্ঞানের ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যাবে কোন জিনিসের মূলে কোন ঘটনা আর তখনই বোঝা যাবে যে এই ভূত-প্রেত, জীববলি ইত্যাদি কুসংস্কারগুলি কিছুই নয় শ্রেফ গাঁজা। তো এবার, আমরা চলে আসি মূল বক্তব্যের দিকে। ‘জ্ঞান’ একটি মহা মূল্যবান জিনিস।কথায় আছে, ‘অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করি’।আমাদের দেশে জ্ঞানী বা পণ্ডিত ব্যক্তিদের অলৌকিক শক্তির অধিকারী এবং তাঁদের জ্ঞানকে ‘অলৌকিক বস্তু’ বলে মনে করা হত। পাশ্চাত্য দেশ মধ্যযুগে ‘জ্ঞান’-কে বা জ্ঞানী ব্যক্তিকে ধর্মবিরোধী বলে গণ্য করা হত এবং চার্চের পোপ তাঁদের নিষ্ঠুরভাবে শাস্তি দিতেন।গ্যালিলিও, ব্রুনো, কপারনিকাস ইত্যাদি বিজ্ঞানী ব্যক্তিদের যে কিভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল তা ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বলভাবে লেখা আছে।৩৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ক্রো-ম্যাগনন মানুষ পাথর ঘষে আগুন সৃষ্টি করেছিল এবং এই কৌতূহল থেকেই সৃষ্টি হল বিজ্ঞান।আমাদের দেশের কথায় এবার ফিরে আসা যাক।আমাদের দেশে বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিজ্ঞানচর্চা করা হত।বলাবাহুল্য, আমাদের দেশ প্রাচীন আয়ুর্বেদ,বেদ ও ইত্যাদি নানান শাস্ত্রের উৎসস্থল।আমাদের দেশে আগে অনেক ঋষি,মুণিদের স্থান ছিল।সেসব ঋষি,মুণিরা জঙ্গলে পাহাড়-পর্বতে ইত্যাদি স্থানে যোগ সাধনা করতেন।তাঁরা ছিলেন জ্ঞানী-গুনী মানুষ।তো, এঁরা নানান গাছ-গাছরার উপর পর্যবেক্ষণ করে সৃষ্টি করলেন এদের ভেষজ গুনাবলী যেসব গুন আজও আমাদের চমকে দেয়। তাঁরা নানান যোগ, মুদ্রা, প্রাণায়াম ইত্যাদি নিয়ে চর্চা করতে লাগলেন এবং তাঁদের চর্চিত জিনিস নানান শাস্ত্রে লিখে রাখতেন।এই বিভিন্ন গাছ-গাছরার, লতা-পাতার, শাকসবজি, মৎস্য ও তৈল-এগুলোর ভেষজগুন হল বর্তমান ঔষধ ঔষধি বা রোগ সারানোর প্রথম পর্ব।কবিরাজেরা এই ভেষজগুণ দিয়ে নানা ওষুধ তৈরি করতেন। আধুনিক ঔষধের মত ভেজাল বা স্টেরয়ড যুক্ত না হয়ে খাঁটি ওষুধ ছিল। শোনা কথা, আগেকার কবিরাজেরা নাড়ি টিপে বলে দিতে পারতেন কারা আয়ু কবে শেষ হয়ে যেতে পারে।এইগুলো এখন কোন বিস্মৃতির জলে তলিয়ে গেছে তার ঠিক নেই। আমাদের দেশে ইংরেজরা আসার পর তারা নানান শাস্ত্র নয় লুট করে চলে গেছে, নয় জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিয়েছে যার ফলে এই আয়ু মাপার পদ্ধতি আমাদের মন থেকে লোপ পেয়ে গেছে।

    আমাদের দেশে আগে বিজ্ঞানীরা বা বলাবাহুল্য দার্শনিকেরা কি করতেন? তাঁরা আকাশের মানচিত্র গঠন করেছিলেন।তাঁরা রাজসভায় সমাদর পেতেন।শোনা যায়, প্রাচীন কালে এই সব বিজ্ঞানীদের কিছু কুসংস্কারী মানুষ ‘তান্ত্রিক’ বলে আখ্যা করেছিলেন তাঁরা নানারকম জিনিস নিয়ে ভাবতেন এবং নানানরকম কাজ করতেন যা সাধারন কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের ভাবনার বাইরে।তাঁরা রাজসভায় রাজার কাছে থেকে কোনো মৃতদেহ নিয়ে জলে ডুবিয়ে রাখতেন।তার দু-তিনদিন পর যখন শবটি নরম হয়ে যায় তখন তাকে তুলে তার শরীরের চামড়া ছাড়িয়ে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন-মানব দেহ কি দিয়ে তৈরি? দেহের মধ্যে কি কি আছে? কোনটার কি কাজ? ইত্যাদি। এটাই হচ্ছে হাল আমলের ‘Anatomy’-র প্রথম ধাপ। ভাবা যায়! অথচ শোনা কথা দেশ নাকি ‘Anatomy’ এসেছে ইংরেজদের হাত ধরে।

    আমাদের আগে এবং এখনও পাওয়া যায় অনেক মাদারী।এরা রাস্তাঘাটে এবং রাজসভায় নানা মায়াজালের খেল দেখাতেন। মানুষকে শূন্যে ভাসানো, একটা দড়িকে খাড়া করে দেওয়া ও তারউপর মানুষকে শোয়ানো,শূন্য থেকে জিনিস আনা-কোনো কিছুকে অদৃশ্য করে দেওয়া ইত্যাদি কত কি।অথচ বিদেশীরা এসব খেলা তাদের দেশের বলে যুগ যুগ ধরে প্রচার করে এসেছে।বিজ্ঞান নাকি তাদের,আমাদের দেশ কুসংস্কারী- মানতে বাধ্য নই। বহু যুগ আগে আর্যভট্ট নানান পরীক্ষা করে বলেছিলেন, ‘সূর্য স্থির এবং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে’। তাই আমরা সূর্যকে পূর্ব দিকে উদিত হতে দেখি এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যেতে দেখি।‘শূন্য’-র ধারণা তাঁর থেকেই আসে।এই শূন্য ছাড়া গণিত এগোত না,কম্পিউটার আবিস্কার হত না, দুনিয়াটাই ফ্যাকাশে হয়ে যেত।ইউরোপীয়দের কয়েক হাজার বছর আগে, কণাদ মুনি বলেছিলেন কোনো বস্তুকে খন্ডিত করতে করতে এমন একটা জায়গায় আসবে যখন সেটাকে আর খন্ডন করা সম্ভব হবে না, সেই অবস্থাটির নাম দিয়েছিলেন ‘পরমাণু’।নাগার্জুনকে ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’-র আদিপিতা বলা যায় কারন তিনি আপেক্ষিকতার ধারণাটি বলেছিলেন। শ্রীধর আচার্য,লীলাবতী,ব্রহ্মগুপ্ত ইত্যাদি সবাই প্রাচীনকালের নামকরা গণিতজ্ঞ ছিলেন।স্থাপত্যে এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন কুতুব মিনার, যেখানের লোহায় এতো হাজার বছরেও মরচে ধরেনি।জন্তর মন্তর জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।এগুলি সারা বিশ্বের নামকরা বিজ্ঞানীদের কৌতুহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শোনা যায়, পিথাগোরাসও নাকি ভারতে এসেছিলেন-কে জানি সত্যি না মিথ্যা।সে যাই হোক, বিজ্ঞানের জগতে, আমাদের অবদান ছিল,আছে এবং থাকবে।হাল আমলের ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাস সবাই জানেন,আমি শুধু প্রাচীনকালের ভারতীয় বিজ্ঞানের কথা অল্প কথায় শোনালাম।

    মেহেরগড় সভ্যতা থেকেই আমাদের সভ্যতার সেইসাথে বিজ্ঞানের যাত্রা শুরু এবং আমরা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ, কুসংস্কার নই,বুঝেছেন।কুসংস্কার যব জাতির মধ্যেই কম-বেশি আছে বিজ্ঞানের আলো যতোই বেশী ছড়াবে ততোই কুসংস্কার উবে যাবে।

  • প্রবন্ধ

    প্রবন্ধ- নতমুখী

    নতমুখী
    – সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

     

    “কলম” কথাটার মধ্যে মাত্র তিনটি অক্ষর। অথচ বাংলা স্বররর্ণে ও ব্যঞ্জন বর্ণের ব্যাখ্যায় এর তুলনা ভগ্নহৃদয়ে প্রেমহীন হয়ে বেঁচে থাকার সামিল।
    Pen is mighter than sword. মানে করলে দাঁড়ায় ” অসির চেয়ে মসি দড় “;! তবু , অসি বা তরবারি সর্বদা ঊর্ধমুখী।সে বিপ্লবে হাত না লাগিয়েও বিক্ষিপ্ততায় ধ্বংস করে কারোর চূড়ান্ত সফলতা কিংবা জীবন। আর “কলম” প্রতিনিয়ত বিপ্লবী। বিপ্লব যেন তার ঘনিষ্ঠতম আপন। তবু সে নম্র স্বভাবী, বিনয়ী, এবং শ্রান্তি হীন প্রেমিকা।
    যে বা যারা এই কলম নিয়েই ক্ষমতা বান হতে চায় বা চান সে বা তাঁরা ভাবেন কি কলমের সততা আয়ত্বা ধীন নয়? ভাবেন না। বোধহয়। তাই “ভালবাসি” -টুকুও নিছক অভিমানে তাদের কলম থেকে বেরিয়ে আসতে অবসাদগ্রস্ত হয়।
    কলম তো নতমুখী। সোজা করে ধরলে কিংবা উঁচুতে তুলে ধরলে”কলমে”র অপঘাতে মৃত্যু ঘটে। সেখানে উপেক্ষা, নির্লিপ্ততায় অহংকার জন্মায় না। বিচ্ছেদ ঘটে। অর্থাৎ’কলম’ বিনম্রচিত্তে বিপ্লবাত্মক হয়েও ভালবাসা পেতে ও দিতে চায় সকলকে সবসময়ই।
    যারা এই কলম ধারী তারা বোঝেন নিশ্চয়ই কোথায় প্রেম আর কোথায় অবসাদগ্রস্ততা থেকে পিছু হটার ডিপ্রেশন।ঠেলতে ঠেলতে যখন কেউ কুয়োর কিনারে মৃত্যুকে খুব সামনে থেকে দেখতে পায় তখনও সে কলমকে সাথী করে তার মৃত্যুর প্রমানপত্র হিসেবে রেখে যেতে চায় জটিলতার অহংকারহীন ভালবাসা। এবং সেটা অবশ্যই নতমুখীনতারই পরিচয় বহন করে। তাই নয় কি!?
    এখানে সংস্কৃতিচর্চার সুর – তাল- লয়- ছন্দ যেমন আছে তেমনি আছে “মা”হয়ে”স্ত্রী”হয়ে ভালোবাসা মাপার যাদুকরী মানদণ্ড স্বরূপ উন্মোচন। এখানে বেড়ে ওঠা দেদীপ্যমান জ্যোতির সাথে পূরুষতান্ত্রিকতার ছোঁয়া থাকলেও সে নারী স্বরূপা মৃন্ময়ী । অবজ্ঞা তার অজানা। সে নিথর হয়েও, প্রেমাভিলাষী হয়েও ছলাৎ ছল অবহেলাকে “তুড়ি মেরে দৃঢ়তায় এগিয়ে নিয়ে চলে। তবু তার মুখ নয়। বিনম্রতায় বিশ্বের ধুলোবালিছাই থেকে ঘরে ফিরে”ভালবাসতে'”চায়। সে সামনে না থেকেও পূর্ণ প্রেমিক হত্যায় পূর্ণতা পেতে চায়। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত সে অভিনয় করে বিনম্রচিত্তে। তাতেই চির জনপ্রিয়তা এবং স্বাচ্ছন্দ্য লক্ষ্য করি। বিদূষী স্ত্রী হয়েও কোমল কঠোর রূপী সহচরী। প্রশংসা, নিন্দা সবই তার জানা।
    তবু, চরিত্রাঙ্কনে, স্বদেশ প্রেমে, অশ্রুময়তায় এবং প্রবলতায় সে মা গান্ধারী যেন। তিনি পুত্রশোকে মূল্যমান হয়েও সদা ধর্মের জয়গান গেয়েছেন নতমুখে। এটাই তো মহা-ভারত।
    অথচ, সেই ভারতেরই জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী একদিন pen strikeবা কলম ধর্মঘট ডেকেছিলেন। এবং তাতেই দুর্ধর্ষ প্রবল প্রতাপশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও ভয় পেয়েছিল। নতমুখী কলম বোঝাতে চেয়েছিলেন অবগুণ্ঠন ঢাকা প্রেয়সী স্ত্রীও পুরুষকে হার মানাতে সক্ষম।
    অতএব হে কলমচীগন, উপেক্ষিতা না হয়ে নিজস্ব নন্দন চর্চায় সামিল হতে জীবনসঙ্গী রূপী লেখাকে পরকীয়া না ভেবে ট্র্যাজিক সম্পর্কের বিফলতা য় প্রসারিত প্রতিভা, উদ্দীপনায় অনিবার্যভাবে অভিশপ্ত অনিন্দ্য সুন্দর অসহনীয় সৌভাগ্যের শিকড়ে আত্মবিশ্বাস প্রস্ফুটন করাকেই নতমুখে পাহাড়ের চূড়া স্পর্শ করার বিতর্কিত নিত্যসঙ্গী করার যুদ্ধে প্রাণের মানুষের অসহায় পরিণতি কে না দেখার প্রয়াস করে কলমের নীড় বাঁধাকে সাথী করার লক্ষ্যে ছবি আঁকলে কেমন হয়! অপূর্ব “সাহিত্যকুঞ্জ” তখন যথার্থই প্রযোজ্য মনে হবে এ নতমুখী কলমের পুষ্পবৃষ্টিতে।
    আর আমি ও তাই সেই কলম নিয়েই এখন নাটুকে কলমচি হবার বাসনায় বিষাদকে ভুলে আইনসিদ্ধ পরকীয়ার মোহে নতমুখে প্রমানিত করতে চেয়েছি কলমের নম্রতা ভরা দৃঢ়তা ওপ্রত্যয়ভরা উপলব্ধির জমিদারীত্ব। দেখেছি তুলনাহীন বাংলা তথা বিশ্বসাহিত্যের দরবারে মহামানব বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, শরৎ চন্দ্র, সুকান্ত, জীবনানন্দ, নজরুল, শেলী, কীটস্ , বায়রণ পৃভৃতি অসংখ্য যাঁরা কলম ধরেছেন এবং সাহিত্য সেবায় মনোনিবেশ করে সম্মানের শিখরে পৌঁছেছেন প্রত্যেকেই ঐ নতমুখী কলমের অনায়াস অনর্গলতার আশ্চর্য গুনে ও শিল্পিত সভ্যতায়।
    তবু কলম চিরকালীন নতমূখী।
    সোনাদানা হীরে জহর, মনি মুক্তা দি রত্ন ই কেবল অলংকার নয়। অলংকার মানে তো নারীর ভূষণ। নারীদেহের অলংকার যেমন নমনীয়তা। তেমনি কলম থেকে উদ্গীরণ হোলো লেখকের মনের একান্ত অভিব্যক্তি- যা লেখাটিতে নানা রকম ফুলে ভরিয়ে প্রত্যয় ঘণীভূত করে; অলংকারে পরিণত হয়। সৌন্দর্যের ড্রইংরুমে রসসৃষ্টি করে। এবং স্থানীয় স্বীকৃতি অর্জন করে
    রূপ ও দামে যাই হোক না কেন “কলম” তবু কলম ই এবং অতিবিনয়ী নতমুখী।
    অস্বীকার করার উপায় নেই কলমের শিল্পিত মনের আদিগন্ত বিস্তৃতি অসাধারণ অলংকার —যা বাজারে কেনাবেচা চলে না!

  • প্রবন্ধ

    প্রবন্ধ- ” মানবিকতার ধ্রুবক “

    ” মানবিকতার ধ্রুবক “
    – অমরেশ কুমার

     

    কখনো কখনো অর্থের কাছে সামর্থ্যের পরাজয়, কখনো অর্থ মানুষ হতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, কখনো প্রয়োজনে সেই অর্থ মানুষ চিনতে শেখায়।
    আর যখন অর্থের কাছে সামর্থ্যের জয় হয় তখন চারিদিকে জয় জয়কার রব । ব্যাপারটা অনেকটাই শিক্ষা আর অশিক্ষার লড়াই, বলা যেতে পারে শিক্ষিত আর অশিক্ষিতর সংক্ষিপ্ত পরিচয় । কেননা গল্পের সারমর্ম তো সবার জানা-” ‘ওই যাবি?’ ‘কোথায় যাবেন বাবু’।

    আরো গুছিয়ে বললে বলা যায় , শিক্ষাই শিক্ষিতের পরিচয় নয় , শিক্ষাই একমাত্র যোগ্য মানুষের নির্ধারক নয় , অশিক্ষিতও শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে যদি মানবতাবোধ বজায় থাকে । তেমনি ধনকুবের হলেই লক্ষ্মীর বরপুত্ৰ হবে এমনটা নয়, গাধা ঘাড়ে করে লক্ষাধিক অর্থ বহন করা মানে অর্থের মালিক হয়ে যায় না । আর অর্থের মাধ্যমে মনুষ্যত্ব ক্রয় বিক্রয়ও করা যায় না ; হ্যাঁ , মানুষ কেনা যায় বটে তবে ‘বোধ’ কেনার মতো অর্থ সারাজীবন ধরে পরিশ্রম করলেও জমানো সম্ভবপর নয় , আর সে ‘বোধ’ যেদিন কিনতে পারবেন সেদিন অবশ্যই ‘বোধগম্য’ হবেন তার জন্য ধনকুবের হতে লাগে না । যার মনুষ্যত্ববোধ নেই তার কাছে অর্থ থেকে লাভ কি ? অর্থের পাহাড়ে বসে থেকেও গাধার মতো মাল বহন করছি মনে হওয়াটা অবাঞ্চিত নয় ।

    শিক্ষিত বা অশিক্ষিত , ধনকুবের বা দিনমজুর যাই হোন না কেন এগুলির কোনোটিই আপনার পরিচয়ের চূড়ান্ত মাপকাঠি বলা বাঞ্ছনীয় নয় , মানুষের মানবিকতার ধ্রুবক নির্ধারিত হয় মনুষত্ববোধের উপর । এই ‘ধ্রুবক’ পেন্ডুলামের মতো দোদুল্যমান । কারো কাছে বোধগম্য কারো কাছে অবোধগম্য হয়ে কখনো সুগম কখনো দুর্গম হয়ে ওঠে ; সুগম হতে পারলেই প্রকাশ —- প্রকৃত মানুষের ।।

  • প্রবন্ধ

    প্রবন্ধ- কুসুম কুমারী দাস

    কুসুম কুমারী দাস
    -সঞ্চিতা রায়

    ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ ছোটবেলা থেকে শুনে আসা এই কবিতা(আদর্শ ছেলে) র লেখিকা কবি সাহিত্যিক কুসুমকুমারী দেবীকে এই লেখার মাধ্যমে শ্রদ্ধাঞ্জলী জানাতে চাই।
    কবিপুত্র জীবনান্দ দাশ বাংলার এক বিখ্যাত কবি। কিন্তু জীবনানন্দের মা হিসাবে নয়, তাঁর নিজস্ব প্রতিভাতেই তিনি বাংলার সাহিত্য জগতে অমর।
    কবি কুসুমকুমারী দাশ বাখরগঞ্জের বরিশালে ১৮৭৫(বাংলা ২১শে পৌষ ১২৮২) সালে এক বিদ্যোৎসাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম চন্দ্রনাথ দাশ ও মাতার নাম ধনমানী দাশ। ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করায় তাঁর বাবা চন্দ্রনাথ দাশকে গ্রামের পৈতৃক ভিটা গৈলা ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল। কবি কুসুমকুমারী বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন। এরপর অর্থাভাবে স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেলে তাঁর বাবা তাঁকে রামানন্দ চট্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে রেখে বেথুন স্কুলে ভর্তি করান। বোঝা যাচ্ছে তখনকার দিনের তুলনায় তাঁর পরিবারের মানসিকতা অনেক উচ্চ ছিল। বেথুন স্কুলে তিনি দশমশ্রেণী পর্যন্ত পড়েন।
    উনিশ বছর বয়সে ১৮৯৫ সালে বরিশালের ব্রজমোহন ইনস্টিটিউশন এর প্রধান শিক্ষক সত্যানন্দ দাশের সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর স্বামী ছিলেন অত্যন্ত সাহিত্য অনুরাগী। এখানে এসে তিনি জ্ঞান চর্চার একটি প্রশস্ত ক্ষেত্র পেলেন। বরিশালের ব্রাহ্মদের সভা অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত যোগ দিতেন। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ তাঁর ছোট থেকেই। রামানন্দ চট্যোপাধ্যায়ের রচিত শিশুদের গ্রন্থের প্রথম ভাগে তিনি যুক্তাক্ষর বিহীন ছোট পদ্যাংশ লিখেছিলেন। তাঁর লেখা ‘পৌরানিক আখ্যায়িকা’ তাঁর গদ্যগ্রন্থ। প্রবাসী, মুকুল, ব্রহ্মবাদী প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি প্রায়ই লিখতেন। শিশুদের জন্য ‘কবিতা মুকুল’ বইটি রচনা করেছিলেন। ‘নারীত্বের আদর্শ’ প্রবন্ধ লিখে তিনি স্বর্ণপদক পান। বহু সমাজ সেবামূলক কাজ করেছেন। ১৯৪৮ সালে কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউর বাড়ীতে তিনি শেষ স্বর্ণপদক পান। বহু সমাজ সেবামূলক কাজ করেছেন। ১৯৪৮ সালে কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউর বাড়ীতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এমন একজন কবি সম্পর্কে আমাদের সকলের অবশ্যই জানা উচিৎ, তাই এই প্রবন্ধ লেখা।

    (তথ্যসূত্র ইন্টারনেট ও সাহিত্য সংসদের ‘বাঙালী চরিতাভিধান’।)

You cannot copy content of this page