-
কবিতা- মনের আনন্দে চলুক কলম
মনের আনন্দে চলুক কলম
– রাণা চ্যাটার্জীভাবনা যখন আসবে মাথায় কি সাধ্যি থামানো তাকে,
ঘুরবো ফিরবো করছি কাজ,ব্যস্ততাও কলমকে ডাকে।প্লট যখন আসে এভাবেই,বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসের মতো,
আঁকড়ে জাপ্টে না ধরলেই কলমের গোঁসা অবিরত।ওঠে খিল খিলিয়ে,কিল বিলিয়ে ভাবনার কতো ঢেউ,
অবাক লাগে কি ভর করে যেন লিখিয়ে নিচ্ছে কেউ।পড়াশোনা শেখো,ভালোবেসে লেখো,অহংবোধকে আড়ি,
উচিত কথা প্রয়োজনে বলতেই হবে যতই হোক না মুখ হাঁড়ি।বড় দুর্দিন ভ্যানিস সুদিন মুখে মানবতা মিছরির ছুরি,
দেখে যাও শুধু,মুচকি ঠোঁটে মধু,পিঠ চাপড়ানো বাহাদুরি।সব কিছুতে হিংসা-রেষারেষি,ভারী বয়েই গেলো তাতে,
টাট্টু ঘোড়া কলম ছুটুক, তুমিও যে নিশাচর হচ্ছো রাতে!! -
অণুগল্প- স্বপ্নপুরণ
স্বপ্নপুরণ
– রাণা চ্যাটার্জীচৌরাস্তা মোড়ে ভিক্ষা পাত্র নিয়ে বসা ছেলেটাকে ভীষণ ধমক দিয়েছে আজ অয়ন। “এই হাত পাতা কেন রে, বাজে অভ্যাস-কাজ করে খেটে খেতে পারিস না!”
আজও বাবা বাড়িতে তুমুল চিৎকার শুরু করেছিল। মাকে শুনিয়ে বললেও উদ্দেশ্য যে অয়নকে ধাক্কা দেওয়া বেশ বোঝে সে। “তোমার লাডলাকে বলো বাপের হেঁসেলে আর নয়, চেষ্টা করুক, এত স্বাধীনতা ভালো নয়! “কথাগুলো যখন খোঁচা দেয় আরও অস্থির হয়ে ওঠে। চেষ্টা কিন্তু অয়ন করছে একটা ভালো কাজ যা তার বিবেককে পরিশ্রুত রাখে মাথা উঁচু রাখতে সাহায্য করে নাহলে এত পড়াশোনা সে করলোই বা কেন যদি দোকানে খাটতে হয়।
কখনো কখনো রেগে যায় মা, “উফ তুমি এবার একটু থামবে-ছেলেটা খেতে বসলেই শুধু বাজে বাজে কথা। তুমি বাবা নও যেন একটা পিশাচ!”
আবার একটা স্বাধীনতা দিবস, টিভিতে নেতার উন্নয়ন ফিরিস্তি কিচ্ছু ভালো লাগে না অয়নের।
অন্যরকম কিছু যদি করা যায়, ভেবেই সকালে হাজার পিস মাস্ক কিনে এনেছে পাইকারি দামে ১২০০টাকায়। পাঁচজনকে টার্গেট করে একটু একটু করে সৎ পথে উপার্জন করার খিদেটা জাগিয়ে তুলেছে। ভিক্ষা নয়, কাজ করে সম্মান আদায় অনেক বেশি স্বাধীনতার এটা বুঝছে ওরা।প্রতি মাস্ক ৩ টাকা লাভে সরবরাহ করছে অয়ন।আরো কিছু ছেলে মেয়ে যোগাযোগ করেছে ইতিমধ্যে, যারা বিক্রি করতে রাজি। অয়নের ইচ্ছা ভিন্ন অথচ চাহিদা যোগ্য জিনিস সময়ের সাথে সাথে এদের হাতে সরবরাহ করে। এমন ভালো কিছুজনকে ইতিমধ্যেই অয়ন তার বিক্রেতা টিমের অন্তর্ভুক্ত করার কাজে নেমে রীতিমতো সাড়া পেয়েছে। অয়ন বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যাদের পেটে খিদে আছে, চোখে আছে স্বপ্ন তারা অন্তত ভালভাবে বাঁচুক কাজের মধ্য দিয়ে। যদি তারা বিক্রি করতে পারে হাত পেতে ভিক্ষা চাওয়ার থেকে এ পথ অনেক সম্মানের। এর ফলে এদের পরিবার যেমন বাচঁবে অয়নেরও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নপূরণ । -
অণু গল্প- ভোরের ফুল
ভোরের ফুল
-রাণা চ্যাটার্জীকি করলে মা,চমকে বুম্বা!
বাচ্চাটা ফুল কুড়াচ্ছে তাবলে জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ ছুঁড়বে?ঝি পুতুল কঁকিয়ে ওঠা ফুলকিকে নিয়ে দৌড়ালো। রত্না রেগে অস্থির,এমন মানুষ নিয়ে সংসার সম্ভব ? নিজের নাতনি মালা গাঁথবে তাতেও গজ গজ।
পুতুল ভয়ে মেয়েকে আনে না।আজ দুর্ভাগ্য।খেলছিল উঠোনে হঠাৎ ঠাকুমার চিৎকার,মেয়ের কান্না!
ছেলে-বৌ থাকতেও কাঠের জ্বালে নিজের রান্না করে অবিশ্বাসী শাশুড়ি। ফুলকি ফুল কুড়াতেই জ্বলন্ত কাঠ ছুঁড়েছে!বুম্বা ভাবে মা কি সাইকো!
হসপিটাল নিয়ে যেতে হবে ফুলকিকে।গাড়ি বের করে স্টার্ট দিলো বুম্বা।শুধু হাত পুড়েছে তাই নয়,কানের নিচে জোর আঘাতে এখনো অজ্ঞান।
তিন রাত্রি যমে মানুষে টানাটানি শেষে মৃতদেহ গ্রামে এলো রাত্রে।কান্নার রোল আর গোটা গ্রাম ফুঁসছে ঘেন্নায় রাগে।কেউ বলছে জ্বালিয়ে দাও বুড়িকে,ও ডাইনি।
সবাইকে অবাক করে ধীর পায়ে ঠাকুমা হেঁটে এলো-এক আঁচল ভোরের ফুল ঢেলে দিলো মৃত ফুলকির শরীরে,ঢলে পড়লো নিজেও। স্তব্ধতা! লুকানো ছুরি নিজের বুকে সজোরে বিঁধেছে বুড়ি!সাদা ফুল গুলো রক্তে ভাসছে।
-
অণু গল্প- ডঃ সেন- জীবন্ত ভগবান
ডঃ সেন- জীবন্ত ভগবান
– রাণা চ্যাটার্জী“দেখুন ম্যাডাম আপনাকে বহুবার বলেছি আপনার ছেলের শরীরের কন্ডিশন ভীষণ খারাপ, icu তে আছে, ওভাবে প্রত্যেক ঘন্টায় ‘কেমন আছে’ জিজ্ঞেস করে বিরক্ত করবেন না, বাইরে বসুন।”
মৃদু ধমক খেয়ে নিজেকে সামলাতে পারল না রজনী, হাপুস নয়নে কেঁদে ফেললো। রাত জাগা ক্লান্ত ক্ষীণ শরীরে সুপার স্পেশালিটি হসপিটালের বাইরে সারারাত প্রতীক্ষার প্রহর গুনেছে মা। কত কি যে বাজে স্বপ্ন এসেছে সঙ্গে তন্ময়ের শৈশব, হামাগুড়ি, অন্নপ্রাশন, স্কুল যাওয়া সব ভিড় করে আসছিল জলের ধারায়।কাল সন্ধ্যায় বাড়ির সামনের ঠেকে অন্য দিনের মতোই আড্ডা দিচ্ছিল তন্ময়। সেই পুরনো অভ্যাসে বাইক স্ট্যান্ড করে তাতে বসে ঘন্টাখানেক আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফেরে।সন্ধ্যা নামলেই সুনসান শহর রাস্তা ঘাট কিন্তু কাল আচমকা সবাইকে চমকে পাথর বোঝাই ভারী ট্রাক এসে ব্রেক ফেলে ধাক্কা মারে সরাসরি। অল্পের জন্য বাকিরা বাঁচলেও ছিটকে পড়ে তন্ময়, মাথা ফেটে রক্তপাত।বন্ধুরা ঘাবড়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনলে ব্যান্ডেজ চিকিৎসা, বাড়ি পৌঁছে দিয়ে স্বস্তি। দু’বছর আগে স্বামী হারিয়ে সময়ের গর্ভে তলিয়ে যাওয়া পরিবারটা যখন সন্তানের মুখ চেয়ে দাঁড় করাচ্ছিলো রজনী, আচমকা দুঃসময়ের কড়া নাড়া!
“একি রে রক্ত যে থামছে না, বালিশ ভিজে চুঁইয়ে”-কেঁপে উঠল মা। কাল বিলম্ব না করে পাড়ার অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাজির হলো চল্লিশ কিমি দূরে একমাত্র ভরসার বড় হসপিটালে।ভর্তি করিয়ে অপেক্ষার রাত জাগরণ এই বুঝি সুস্থতার খবর, কিন্তু কোথায় কি!
কে যেন একজন হেঁটে আসছেন করিডোর দিয়ে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত সাদা ড্রেস দীর্ঘ বলিষ্ঠ, হাতে স্টেথো! পাশে দু-চার জন নার্স, ওয়ার্ড বয়, গাড়ির ড্রাইভার ব্যাগ হাতে উদ্বিগ্ন।ম্যানেজার দৌড়ে এসে বললেন, “স্যর এমন মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনায় আপনার সন্তানের আজ ভোরে স্পট ডেথের খবরে আমরা ব্যথিত, মর্মাহত, জাস্ট ভাবতে পারছি না স্যর। কদিন বাড়িতেই থাকুন স্যর, আমরা সামলে নেব”।
এই হসপিটালের জীবন্ত ভগবান ডক্টর সেনের ছেলে দুর্ঘটনায় মৃত-ছড়িয়ে পড়ল খবর। অভাগী মা হাতজোড়ে সামনে চলে আসতেই থমকালেন ডাক্তার বাবু। খবর নিয়ে জানলেন রাতে ভর্তি হওয়া এনার ছেলের অপারেশন তিনিই আজ সকালে করতেন, দুর্ঘটনার খবর কেউ জানাতে সাহস করে নি। বিরক্ত মুখে গতিমুখ পাল্টে ভেতরে গেলেন। ওই ভেঙে পড়া মা’কে ভেতরে বসানোর নির্দেশ দিয়ে দেড় ঘন্টার অপারেশনে সফল হয়ে বেরিয়ে এলেন।বললেন “মা আপনার সন্তান দীর্ঘজীবী হোক!” চোখের কোল দুটো ডক্টর সেনের অশ্রু বিন্দুতে ভিজেছে এক সন্তান বাঁচিয়ে নিশ্চয় মনে পড়ছে নিজের ছেলের মুখটা।
-
কবিতা- পুরুষ পক্ষ
পুরুষ পক্ষ
– রাণা চ্যাটার্জীবেশ তো ডাকবো না আর,
উশখুশ করা মন’কে “কেমন আছো তুমি”
জানতে চাইলে থাবরে বসাবো।
বুঝিয়ে দেবো, এতটা উদগ্রীব হওয়া সাজে না,
মাথায় রেখো তুমি না “পুরুষ”।
তুমি আগে খারাপ, যাবতীয় সন্দেহের মধ্যমণি,
তারপর না হয় আস্থা, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ!মনে রেখো বেশি কৌতূহল ভালো নয়..
“মতলবী” তকমা সাঁটাবে সমাজ-নাক উঁচুর দল।আগ বাড়িয়ে তোমার তথ্যের আদান-প্রদান,
আপন ভেবে সদুপদেশ বুমেরাং হয়ে
তোমাকেই হয়তো নাকাল, খেলো করতে উদ্যত,
অপদস্থের নানান সম্ভার মজুদ আনাচে-কানাচে।না এমন অস্থিরতা ছিল না সমাজ ভাবনায়।
খারাপের মাঝেও রসাতলে না যাওয়ার ভাল কিছু ছিল অবশিষ্ট, আজও তা সমুজ্জ্বল।এসবই আজকের অতি আধুনিকতার কদর্যতা।
সামগ্রিক খারাপের মাঝে ভালোরা আছে বলেই
আজও সমাজ স্থিতাবস্থায় পথ হাঁটি।ট্রেন লেট করার রাতে কখনো ঘাবড়ে যাওয়া
যুবতীকে অভয় দেন সামান্য হকার।
নিশ্চিন্তে বাড়ি ছেড়ে দেয় রিক্সা-টোটোওয়ালা।
সাইকেল চেনে ওড়না জড়িয়ে বিশ্রী পরিস্থিতিতে
মুক্তি দেয় কোন অচেনা যুবক, দোকানী কাকু।আবার মাঝ রাস্তায় পড়ে গেলে চটজলদি সাহায্য
করতে যেতে, যাব কি যাব না চিন্তায় পা ঘষে কেউ!
নিছক ভালো বন্ধুত্বের জন্য কোন কিছুর বিনিময়
ছাড়াই অনেকে এগিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায়।জাগ্রত রাখো বরং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়,
ঠিককে ঠিক, ভুলকে ভুল চিনে সরুক সন্দেহ পর্দা।
সহজ ভাবনায় তবেই না আলো-ঝলমল দুনিয়ার স্বাদ গ্রহণ করে পৌঁছাবে কাঙ্খিত লক্ষ্যে।নাই বা প্রয়োজন পুরুষের, ত্যাগ করো জাতটাকে,
তবু খারাপ অভিজ্ঞতায় সবাইকে এক লাইনে
দাঁড় করানো আদতে ভাবনার পশ্চাদগামীতা। -
কবিতা- তান্ডব ঝড়
তান্ডব ঝড়
-রাণা চ্যাটার্জীএলোমেলো ঝড় এলো ভেঙে গেল ঘর
বাপরে কি দস্যিরে ঝড়!
উপড়ালো গাছ খুঁটি, প্রকৃতিরও ভ্রূকুটি,
জেগে সারারাত ভয়ে চিন্তাতে কাৎ,
কি করে কি হবে জলে ভেসে যাবে!
আর কত কাল প্রকৃতিকে ভোগ করে
দেবো অজুহাত, মুখে ফুলঝুরি বাত!ভাসে কত লাশ, বলি হায় এ কি সর্বনাশ।
নেই জল আলো আঁধার ডোবালো,
প্রায় চারদিন, সব আশা ছিল ক্ষীণ,
অবশেষে স্বাভাবিক জল,আলো উজ্জ্বল।
ফণী, বুলবুল, আমফান ক্ষত, দাগ অবিরত।
মনে বড়ো ভয়, এমনও কি হয়!
আমাদেরই দোষ, তাই প্রকৃতির রোষ।
করি ভোগ আর ক্ষতি, নাম দেই প্রগতি,
দুর্গতি আনলো যা ভীতি, যেন শেষ পরিণতি।সব জানি বুঝি তবু শুধু সুখ খুঁজি
করি হায় হায়, শুনি কান্না অসহায়।
মরি আজ খুব ত্রাসে অদৃষ্ট যে হাসে
তবু আধুনিক দম্ভে মানুষ যেন না ফাঁসে। -
অণুগল্প- সব শেষ
সব শেষ
– রাণা চ্যাটার্জী“আরে চাচা মুঝে ড্রাইভ করনে দো না, আপকা নিঁদ আ গয়া”- খলিল দু’ চার বার অনুরোধ করলো ড্রাইভারের আসনে বসা বছর পঞ্চাশের তামিল ড্রাইভারকে। তামিলনাড়ুর নাম্বার প্লেটের বাসটা ত্রিশ জন পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে গত কাল ভোরে বেরিয়েছে । একজন ড্রাইভার সঙ্গেই আছে, সে কাল প্রায় সারাদিন একাই চালিয়ে এতটাই কাহিল, রাতে ধুম জ্বর।
ভোর চারটের সময় কোনো এক অজানা অচেনা জায়গায় হাই রোডের ধারে বাস থামলো। ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙতেই চাচা সকলকে নেমে ব্রাশ প্রাতকর্ম করার নির্দেশ দিতেই নজরে পড়ল একটা টহলরত ওড়িশা পুলিশের ভ্যান এসে খবরাখবর নিচ্ছে। দু’জন কনস্টেবল ফ্লাস্কের গরম চা, পাঁউরুটি, কলা প্রভৃতি দিয়ে দায়িত্ব পালনের দারুণ নজির রেখে গেল। বাসযাত্রীর প্রায় কুড়ি জনই নির্মীয়মান বহুতলের রাজমিস্ত্রি ও জোগাড়ে। বাকিরা চেন্নাইয়ের কাপড় কলের শ্রমিক। দীর্ঘ অপেক্ষা ও মানসিক বঞ্চনায় কেন্দ্র রাজ্য দড়ি টানাটানি শেষে ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারায় শ্রমিকদের বাড়ি ফেরা আর কিছু ঘন্টার অপেক্ষা।
চা খেয়ে ক্লান্তি সাময়িক কাটলেও আবার চোখ জুড়ে ড্রাইভার চাচার ঘুম নামতেই পেছনের সিটে বসা বছর কুড়ির খলিলের অনুরোধে সিট ছাড়লো চাচা। গ্রামের মোরাম রাস্তায় ট্রাক্টর চালানোয় অভ্যস্ত হাত আজ ভোরের শূন্য হাই রোডে স্পিড তুলতেই অসুস্থ ড্রাইভারটি হাঁ হাঁ করে সাবধান করে উঠলো, ক্লান্ত চাচা ঘুমিয়ে গেছে। খলিলের মনের মধ্যে বাড়ি ফেরার আনন্দ, ভাইপোর মুখ ভাসছে তার ওপর কাল ঈদ উৎসব পালন।
হঠাৎ এক বিকট শব্দ-ধোঁয়ায় একাকার, কিচ্ছুটি চোখে দেখা যাচ্ছে না। পুলিশ এম্বুলেন্স স্থানীয় উদ্বিগ্ন লোকজনের ভিড় বাড়ছে, সবার মুখে চরম আফসোস। চাপ চাপ রক্তে এতগুলো মানুষের মৃত দেহে আচমকা বাতাস ভারী করেছে। একটা ভারী ডাম্পার সজোরে এসে ধাক্কা মেরেছে আশি স্পিডে ছোটা এই পরিযায়ীদের বাসটাকে। যে যেখানে খলিল, চাচা কেবিনে আর দু’জন সহ এতজন শ্রমিকের বেশির ভাগই স্পট ডেথ। বাকিদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভদ্রক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও বাঁচার আশা খুবই ক্ষীণ। বাড়ি ফেরার এত অপেক্ষা, বাসে করে এত দীর্ঘ যাত্রা, চাচাকে সাহায্য করতে যাওয়া সদ্য গোঁফ বেরুনো ছেলেটার কপালের দোষে কি যে হয়ে গেল । এতগুলো মানুষের বাড়ির লোকজনদের দুশ্চিন্তা যেন ঘূর্ণাবর্তে তলিয়ে গেল।
-
অণু গল্প- নাড়ির টান
নাড়ির টান
-রাণা চ্যাটার্জী“আমি কি ক্ষ্যাপা কালা যে ঘেরাটোপে রাখবি”- বলেই মুড়ির বাটিটা রেগে সরালেন মলিনা দেবী।
স্বামীর মৃত্যুর পর, বড্ড চোখে রাখা শুরু করেছে ছেলে বউ। যতবার, মেয়ের বাড়ি গেছে, ওদের সন্দেহবাতিক মন, এই বুঝি মা,মেয়ে-নাতনিকে টাকা, গয়না বিলিয়ে দেবে!” শুধুই আশঙ্কার কালো মেঘ মনে।
স্বামী প্রচুর গয়না বানিয়ে দিয়েছিলেন। বাড়ি, সম্পত্তি, ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স সব ওনারই নামে।ইদানিং ‘মা অসুস্থ’,’মাথা খারাপ’,এসব রটনা ছড়ানো হয়েছে নিজেদের স্বার্থে।
বাবার তৈরি কারখানার মালিকও মা তাই, ভবিষ্যতের কথা ভেবে ছেলে টুবাই চঞ্চল হয়।”কি ব্যাপার মা, টিফিন করো নি, তুমি কাঁদছো”! সম্বিৎ ফিরলেও ফ্যাল ফ্যাল করে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে, চোখের জল মুছে জানালেন, “আজ মঙ্গলচণ্ডীর পূজা, গত বছরও তোর বাবা নিয়ে গেছিল,পুজো না দিয়ে খাই কি করে!” ওহ, এই ব্যাপার, দাঁড়াও রিকশা ডাকছি বলে, মোড়ের হারু রিকশাওয়ালাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয় মন্দিরে যাবার।
“আরে ও মাসিমা, এখানে নামছেন কেন, আপনার বাড়ি দূর আছে” বলে হারু যতই বলুক না কেন নাছোড়বান্দা উনি। “একটু আসছি দাঁড়া” বলে নেমে হাঁটতে লাগলেন। টুবাই বলে দিয়েছিল,”মায়ের মাথা খারাপ, হারু যেন কোন কিছুতে তর্ক না করে।” অগত্যা হারু চুপ করে রাস্তায় অপেক্ষা করে এই বুঝি মাসিমা ফিরবেন।
দরমা ঠেলে এক জীর্ণ রং চটা বাড়িতে মলিনা দেবী ঢুকে হাঁকতেই, জন শূন্য উঠোন পেরিয়ে এক মধ্যবয়সী মহিলা এসে পা ছুঁয়ে প্রণাম করলো। কত আপন জন যেন উভয়ে জড়িয়ে ধরল পরস্পরকে। মুহূর্তে এক অদ্ভুত আন্তরিকতায় দু’টি হৃদয় স্তব্ধ হলো।
পূজার পুষ্প পরম স্নেহে কানীন সন্তানের মাথায় ছুঁইয়ে, প্রসাদ খাওয়ালেন মলিনা দেবী, পুরুষতন্ত্রের লাল চোখ এড়িয়ে। আবার ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে এলেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে, বড়লোক প্রতিষ্ঠিত প্রেমিকের মিথ্যা ভালোবাসার প্রলোভনের ফসল এই কন্যা। প্রথম সন্তানের প্রতি মায়ের এই নাড়ির টান আজও যে অমলিন তা মঙ্গলচণ্ডীর পূজার পুষ্পের ছোঁয়ায় পুনরায় প্রাণ সঞ্চারিত হলো। মায়ের অপার স্নেহ বরাবর সন্তানদের জন্যই বরাদ্দ থাকে, সমাজ সংসারের নানা বাধা প্রতিবন্ধকতা যতই প্রাচীর তৈরি করে, মা তো মা’ই হয়।
-
গল্প- এ তুমি কেমন তুমি
এ তুমি কেমন তুমি
– রাণা চ্যাটার্জীনা বাবা, তুমি মাকে ওভাবে বাজে লোকের হাতে তুলে দেবে না। প্লিজ বাবা, তোমার দু’টি পায়ে পড়ি। আমায় নিয়ে চলো বরং যা বলবে শুনবো। মায়ের লাগছে বাবা, ছাড়ো। টানা হ্যাঁচড়ায় প্রত্যাঘাত করতে ব্যর্থ লতা কান্নায় হতাশ কিন্তু তার মাকে রক্ষা করবে কি করে বাবা রূপী মানুষটার ভয়ঙ্করতা থেকে!
মাধবীর শরীরটা উত্তেজনায় থরথর কাঁপছে। এই মানুষটাকে কিনা ভরসা করে ভালবেসেছিল! অবিশ্বাস যত কড়া নাড়ছে, অসীমের পুরুষালী হাতটা ততো বাগে আনতে চাইছে মাধবীকে। আজ মাস দেড়েক পর মদে টইটম্বুর হয়ে পাশবিক আচরণের শক্তি সঞ্চয়ে অঘটন ঘটাতে মরিয়া।
উল্লসিত দেঁতো হাসিতে অসীম পাঁজাকোলা করে বাইরে নিয়ে যেতে উদগ্রীব শান্ত নিরীহ মাধবীকে। লতা কোথা থেকে আধলা ইঁট কুড়িয়ে মাথার ওপর সজোরে মারতেই আঁক করে বসে দৌড় দিলো বিশ্বাস ঘাতক। মুহূর্তেই মা-মেয়ে ভয়ে আশঙ্কায় পরস্পরকে জড়িয়েও কান্না মুছে ঝেড়ে মেরে উঠলো, যেন এক মৌন শপথ
“অনেক হয়েছে-আর নয়”।রেল কলোনির প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়া মাধবীর মেয়ে লতা, কি ভাগ্যিস দুপুরে বাড়ি এসেছিল বাথরুম করতে। স্কুলে ওইটুকু সব ছাত্ররা থাকলে কি হবে, মেয়েদের বাথরুমের ভাঙা দরজার দিকে হাঁ করে এমন তাকিয়ে থাকে, মেয়ের মুখে কথাটা শুনেই মায়ের পরামর্শে টিফিনে বাড়িতে বাথরুম আসে। আজ ঝুপড়ি ঘরের চৌকাঠে পা রাখতেই এ দৃশ্যে হতচকিত লতা। বাবার হম্বিতম্বি,”এডভান্স নিয়েছি, মুখ পুড়বে যেতেই হবে শালী তোকে, কলকাতার শেঠ-ইস কি ভাষা, মানুষটা কিনা এত নোংরা, ভাবতেও কষ্ট!
এ বয়সেই একি দেখছে লতা! এই মানুষটাই কিনা ভালো করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছিলো তাদের। পরোপকারী হাত বাড়িয়ে বাঁচার রসদ, তবে কি এই নোংরামি দেখার জন্য, শিশুমনে হাজার প্রশ্নের ঢেউ!
বছর খানেক আগে অসীম আলিপুরদুয়ার জংশনে আলো-আঁধারি জনমানবশূন্য সন্ধ্যায় মাধবী ও শিশুকন্যাকে অঝোরে কাঁদতে দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ছিল।সুনসান স্টেশন মোটেই নিরাপদ নয় বুঝে সাথ দিয়ে এনেছিল মালদায়। সত্যি তার মধ্যে এমন নোংরামি, অসাধু উদ্দেশ্য ছিল না। প্রথম দেখায় কারুর ওপর এমন সন্দেহ আসা স্বাভাবিক হলেও ব্যবহারের আন্তরিকতায় পেয়েছিল ভরসার আশ্রয়। কপালের দোষে ঘর থেকে শাশুড়ি যেভাবে স্বামীর মৃত্যুর তিনরাত্রি পার হতে না হতেই ঝেঁটিয়ে বিদেয় করেছিল, গ্রামের এতগুলো মানুষের মাঝে তখনই লজ্জায় ঘেন্নায় অপমানে মাথা নিচু করে এক কাপড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয় মেয়েকে নিয়ে মাধবী। সেদিনের এক রাশ আশঙ্কার কালো মেঘ, চোখের জল সঙ্গী করে অজানার উদ্দেশ্যে তার পাড়ি শহর আসার শেষ বাসে ঘোমটা আড়ালে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে।
একমাত্র সহায় সম্বল ভরসার মানুষ, তার স্বামী টানা দশ দিনের জ্বরে বেঘোরে মারা যেতেই অথৈ জলে পড়ে লক্ষী প্রতিমার মতো শান্তশিষ্ট মাধবী। দু’চোখে স্বপ্নের জাল বুনে, মেয়েকে অনেক আশা ভরসায় স্কুলে ভর্তি করানো যে এভাবে হোঁচট খাবে কল্পনাতেও ভাবে নি। একটা মৃত্যুই সব শেষ করে দিলো! পাছে দু’ মুঠো খাবারের দায় নিতে হয় ,”যা বেরিয়ে যা ঘর থেকে অলক্ষী মাগী, আমার জ্বালা জুড়াবে, পারবো না বসিয়ে খাওয়াতে” স্বামীর মৃত্যু যন্ত্রণা সঙ্গে শাশুড়ির এমন ঘাড়ধাক্কা অপমান নিতে পারেনি তিনকুলে কেউ না থাকা মাধবীর।
কোথায় যাবে কি করবে বাইরের দুনিয়াটা কেমন বিন্দুমাত্র ধারণা না থাকা দু’টোতে গুটিগুটি পায়ে স্টেশনে আসতেই ধূলিঝড়ে থমথমে চারিদিক। সামান্য দু’ চার জন কুলি, প্যাসেঞ্জারের জটলা। দূর থেকে অসীম ঠিক কিছু একটা আন্দাজ করেছে। একসময় আর্ট কলেজে পড়া খামখেয়ালি ছেলেটি পয়সার অভাবে স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলেও প্রকৃতির প্রতি অমোঘ আকর্ষণে বেরিয়ে পরে। আজ দুপুরে চা বাগানে এক আদিবাসী কন্যার ছবি এঁকে মালিককে বিক্রি করে কিছু টাকা পেয়ে উৎফুল্ল। রাতের ট্রেনে ফিরবে সে জন্য স্টেশনে আসা।
শুনশান সান্ধ্য পরিবেশে মহিলা-শিশুকন্যাটি দেখে থমকে অসীম। “আরে না না ভয় পাওয়ার কিছু নেই- কাঁদছো কেন তোমরা? বাচ্চাটি ভয়ে মায়ের কোলে সেঁধিয়ে, অসীম পরিবেশ হালকা করতে বললো, “কোন অসুবিধা না থাকলে বলতে পারেন ভরসা করে।” নিরুপায় মাধবীও বুঝতে পারছে রাত বাড়বে এখানে মেয়েকে নিয়ে থাকা বেশ চাপের। ভরসায় অল্প কিছু বলতেই স্তম্ভিত হয়ে অসীম জানালো “যদি কিছু মনে না করেন, যখন বেরিয়ে পড়েছেন দুগ্গা দুগ্গা করে চলুন আমার সঙ্গে, কথা দিলাম ক্ষতি করবো না”।
স্বামী মারা যাবার পর কেউ এভাবে আন্তরিকভাবে ভরসা দেয় নি। ভেতর থেকে বুক ফাটা কান্না কেউ যেন উস্কে দিলো। অসীম বলেই চলেছে,”আমার বাড়ি বলতে কিছু নেই, পিছুটানও। পরিবার-পরিজন না থাকার কষ্টটা আমি বুঝি”-বলে হেঁকে দুটো ঝালমুড়ি বানাতে দিলো,”নে ধর,এ নিন ধরুন” বলে মা মেয়ের হাতে গুঁজে দিলো।জীবন যে নদীর মতো এঁকে বেঁকে কোথায় যাচ্ছে উদাস ভাবনার মাঝেই ট্রেনের ঘোষণায় ঝেড়ে মেরে ওরা। নিরুপায় হয়ে অজানা অচেনা মানুষের সাথে রাতের ট্রেনে মালদা অভিমুখে রওনা, তবু কেন জানি না অচেনা হয়েও এ যেন এক আপন জনের সান্নিধ্য।
বৃষ্টিভেজা জেনারেল ভিড় কামড়ায় কোনরকমে মা বেটিকে বসিয়ে সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে ক্লান্তিতে ঢুলতে ঢুলতে অসীম যেন অসীম ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছিল। খুব মনে পড়ছিল বিয়ের পর একবার বরের সাথে ট্রেনে ফেরা,স্বামী এভাবেই গার্ড দিচ্ছিল।স্মৃতির ধাক্কায় ভেতরটা আবার ভারাক্রান্ত হলো মাধবীর। তবে কি পুরুষ মানুষগুলো এমনই দায়িত্বশীল হয়! অন্যদিকে নিজের শাশুড়ি মায়ের রুদ্রমূর্তি যেভাবে রক্তের সম্পর্কের নাতনিকেও তাড়াতে পারে তা নারী জাতির কলঙ্ক। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে চোখ জুড়িয়ে এসেছিল। একটা হ্যাঁচকা টানে গলার একমাত্র বিয়ের হারটা ছিনতাই হতেই অসীম চেন টেনে পিছু নিলো। ওই পটু ছিনতাই বাজদের সাথে টক্কর দিতে।
তারপর এত বড় শহরে ভাঙাচোরা টালির ঘরে অসীমের পাতানো দিদির বাড়ি ওঠা।কাজ না করে বসে বসে খেতেও লজ্জা করছে মাধবীর। বড্ড বেশি নিজেকে বোঝা মনে হচ্ছিল তার। অসীমের নিজের প্রতি কেয়ারলেস জীবন কিন্তু মাধবী ও লতার প্রতি দায়িত্বশীল পুরুষের পরিচয় দেওয়ার মধ্যে কোথায় যেন এক চিলতে ভালোবাসার জন্ম নিচ্ছিল। এক মাঝরাতে লতার অসহ্য পেটের যন্ত্রণায় হাসপাতাল-ডাক্তার নিয়ে দৌড়ঝাঁপ। বাড়ি থেকে নিজে হাতে রান্না করে খাবার পৌঁছানোর মানুষটা অজান্তে হৃদয়ের কাছে চলে আসে। ফিকে হতে থাকা অতীত সরিয়ে মন্দিরে দু’জনে স্বামী স্ত্রীর মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সংসার শুরু করে। বাবার কথা মনে পড়লেও লতাকে অসীম বাবার শূন্যস্থান পূরণ করে দেয়।
সব ঠিক ঠাক চলছিল, মাধবী সেলাই মেশিন কিনে বাড়িতে টুকটাক অর্ডার পাচ্ছে। লতা নতুন করে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। এরই মাঝে সংসার জীবনে হঠাৎ ছন্দপতন। অসীম কিনা আফিম পাচারে যুক্ত, হাতে নাতে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। জেল খেটে এসে আর বেশি আসতো না বাড়িতে অসীম, কেমন যেন এক উশৃঙ্খল ঝিমুনি জীবন। কত বুঝিয়েছে মাধবী, আঁকার স্কুল খোলো বাড়িতে, চলো সুস্থ জীবন যাপন করি কিন্ত কোথায় কি! এরপর একদিন অসীমের বেশ্যা পাড়ায় যাবার খবরে দগ্ধ হয় মাধবী। যার জন্য জীবনে আজ একটু আশার আলো সেই কিনা এভাবে বখাটে হয়ে যাচ্ছে! একটা চাপা মনোকষ্ট, মেয়েটাকে ভালো জীবন দেবার লক্ষ্য না জানি মুখ থুবড়ে পড়বে! এমন বিহ্বল দিন গুজরানের মাঝে আজ সুনসান দুপুরে নোংরা উদ্দেশ্যে অসীমের এমন অসৎ টানা হ্যাঁচড়ায় বিস্ফারিত চোখে মাধবীর একটাই শব্দ বেরিয়ে আসে “বিশ্বাস ঘাতক”।
-
অণু গল্প- চক্ষুদান
চক্ষুদান
– রাণা চ্যাটার্জীকি রে ভাই কাঁদছিস! আয় আমার কাছে বলে মৌ হাত বাড়িয়ে ভাই রণিতকে খোঁজার চেষ্টা করলো। ভাইয়ের ফোঁপানোর কান্না মোটেও ভুল শোনেনি সে যতই জন্মান্ধ হোক, ঘ্রাণ শক্তি তার প্রখর। মা ঘরে ঢুকে জানালো ভাই স্কুলের স্পোর্টসে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বড়ো ট্রফি পেয়েছে। গোটা গ্রাম ঘুরে হিপ হিপ হুররে করে বাড়ি ফিরতেই কান্না দিদি তো দেখতে পাবে না তার এই উপহার। আহারে যে দিদি সকাল সন্ধ্যা তাকে উৎসাহ দেয় তার কিনা এত কষ্ট-এটা ভেবেই হাপুস নয়নে কান্না আসছে।
মৌ জানে তাকে নিয়ে ভাইয়ের উদ্বেগের কথা। যখনই আক্ষেপ “ইস দিদি যদি দেখতে পেত “-প্রতিবারেই মৌ ভাইকে সান্ত্বনা দিয়েছে, “তুই বড় হয়ে ডাক্তার হয়ে না হয় আমার চোখে আলো ফেরাবি।”
আজ হঠাৎ সুযোগে হাসপাতালের বেডে উৎকন্ঠায় সারাদিন শুয়ে মৌ। চোখের জটিল অপারেশন তার সফল হয়েছে। এ এক দারুণ তৃপ্তির খবর। আজ কিনা সে প্রথম পৃথিবীর আলো, মা, বাবা,ভাইকে দেখবে! এ আনন্দানুভূতি কাউকে সত্যই বোঝানো দুস্কর।
এতদিন শুধুই অন্ধকার চোখে ভালোবাসা, স্নেহের অনাবিল স্রোত, দারিদ্রতার পাঞ্জা লড়াই, তাচ্ছিল্য সব লিপিবদ্ধ আছে। বাবার মৃত্যু যেন তার ইচ্ছাতে আরো অন্ধকার আনে।
আজ কড়া নাড়লো ইচ্ছেরা। এতগুলো বছরের অনুভূতি, স্পর্শ আক্ষেপ যেন এক লহমায় বানভাসি!
বুট জুতোর আওয়াজ। তবে কি ডাক্তার কাকু এলেন, এই বুঝি আসবে শুভ মুহূর্ত “চোখ খোলো, তাকাও-বলো কাকে প্রথম দেখতে চাও?”
বাপরে, ঝলমলে পৃথিবী, এত্ত সুন্দর! এতোকাল অন্ধকার জগতে বিচরণ, কল্পনায় এই আলোর জগৎ সম্পর্কে ভাবনা আর আজ আলোর দ্যুতি যে কি জোরালো তা দেখেই শিহরিত মৌ। একি মা উনি কে?কাঁদছেন এভাবে?
অঝোর ধারায় এক মহিলা কেঁদেই চলেছেন তখনো। উদ্বিগ্ন মৌ, মা তুমি বলো উনি কাঁদছেন কেন?
গর্ভধারিনী মা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“উনি তোমার আর এক মা। দুর্ঘটনায় ওনার ছেলের মৃত্যু হলেও উনি এগিয়ে এসেছেন কারুর চোখে আলো ফেরাতে। ওনারই মৃত সন্তানের চক্ষুদানের আলোয় তুমি আজ উদ্ভাসিত।