• গল্প

    গল্প- জ্বালা

    জ্বালা
    মুনমুন রাহা

     

     

                                  কলেজের দেরি হয়ে গেছে দেখে ঝটপট পা চালায় সৃজনী। গ্রামের খালের পোলের উপর দাঁড়ানো প্রতীক ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের দেখে একটু থমকে যায় সৃজনী। এই এক উৎপাত শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন ধরে । রাস্তাঘাটে যেখানেই দেখা হয় এই প্রতীক সৃজনীকে তার ভালোবাসা জানায়। কতবার সৃজনী বুঝিয়েছে এই ভালোবাসা এক তরফা। কিন্ত কে শোনে কার কথা! তার উপর আবার প্রতীক হল এখানকার গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানের ছেলে। তাই বেশি কিছু বলতেও পারে না সৃজনী। যতটা পারে এড়িয়ে চলে।  সৃজনী কিছুদিন হল ঐ শিবতলার পথটা ছেড়ে এই পথ দিয়ে কলেজে যায় কেবলমাত্র এই প্রতীকের পাল্লায় পড়বে না বলে। কিন্ত আজ এখানেও ধাওয়া করেছে প্রতীক।

                সৃজনী একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এগোলো পোলের দিকে। পোলের মাঝামাঝি আসতেই প্রতীক বাইক নিয়ে একদম সৃজনীর গায়ের কাছে চলে আসে তারপর  বলে – ” কি সুন্দরী , আমার কাছে ধরা দেবে না বলে এই রাস্তা নিয়েছ তো! কিন্ত সোনা আমার কাছ থেকে যে পালানো এত সহজ নয়! আমার যে চোখ চারদিকে আছে। দেখ আমি তোমাকে ভালোবাসি বিয়ে করব । এই সোজা কথাটা কেন ঢুকছে না তোমার মাথায়? ভালো কথা অনেক দিন বলছি, এবার মটকা গরম হলে কিন্ত বিয়ের আগেই সব কিছু করব শুধু বিয়েটা করব না। “

    কথা বলতে বলতে প্রতীক বাইক থেকে নেমে সৃজনীর হাতটা চেপে ধরছে। প্রতীকের চটুল কথায় তার বন্ধুরা হায়নার মতো হাসছে পিছন থেকে। যেন কোন মুখরোচোক ঘটনার সাক্ষী থাকবে বলে প্রাণ আনচান করছে তাদের। সৃজনী নিজের হাতটা ছড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে- “দেখো প্রতীকদা আমি তো তোমায় কতবার বলেছি, আমি কল্যাণকে ভালবাসি। কেন বারবার তুমি এক কথা বল বলতো ?”
    -শালী বড্ড তেল বেড়েছে তোর, ভালো কথায় কিছু হবে না।

        এই কথা বলে প্রতীক সৃজনীর ওড়নাটা ধরে টান দেয়। সৃজনী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। শেষে না পেরে প্রতীককে এক ধাক্কা মারে আর গালে একটা সজোরে চড় কষায়। প্রতীক আর তার বন্ধুরা বোধহয় এতটা আশা করেনি। তাই মুহুর্তের জন্য একটু বিচলিত হয়ে পড়ে এই সুযোগে সৃজনী ছুটে পালায়। প্রতীকরা কি ভেবে আর পিছু নিল না সৃজনীর।

                    কলেজের ক্লাসগুলোর একটাতেও মন দিতে পারে না সৃজনী । ক্লাস শেষ হতে কল্যাণের সাথে দেখা করতে যায় গঙ্গার ঘাটে। কল্যাণকে সব কথা বলতে, কল্যাণ বলে- “তুমি ঠিক করো নি সৃজা। ওরা অনেক পাওয়ারফুল লোক। এইভাবে ওদের সাথে ঝামেলায় জড়ানো ঠিক হল না সৃজা।”

       – ছিঃ কল্যাণ, তুমি একথা বলছ! তাহলে আমি কি করতাম নিজকে ওদের হাতে সমর্পণ করতাম?

       – না না আমি ঠিক তা বলতে চাইনি।

       -দেখ কল্যাণ তুমি তো বলেছিলে তোমার বাবা মাকে তুমি আমার কথা বলেছ। এবার তাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যাবস্থা কর। আমার মনে হয় এটাই এই সমস্যার সমাধান।

        -একদম চিন্তা করো না সৃজা।  আমিও ঠিক এটাই ভেবেছি। কালই তোমার বাড়িতে যাওয়ার কথা বলব বাবা-মাকে । বিয়ের কথা কালই পাকা করে আসুক ওরা।

                   মনের ভারী ভাবটা একটু হাল্কা লাগছে সৃজনীর। যাক বিয়ের কথা যদি কালই হয়ে যায় তবে আর প্রতীক নিশ্চয়ই জ্বালাবে না । সারা রাস্তা সৃজনী স্বপ্ন বুনতে থাকে ওর বিয়ের। ভাবনা চিন্তার মাঝেই সৃজনী পৌঁছে যায় গ্রামের সরু রাস্তার ধারে। আচমকাই কতগুলো বাইক এসে পড়েছে। শেষ বিকেলের আবছা আলোয় আর হেলমেটের জন্য ঠিক করে মুখ দেখা যাচ্ছে না কারও। হঠাৎই একটা বাইক আরোহী দ্রুত বেগে চলে যাওয়ার আগে একটা বোতল ছুঁড়ে মারল সৃজনীর মুখ লক্ষ্য করে।

                     আজ তিন দিন বাদে নার্সিংহোমের বিছানায় চোখ মেলে তাকালো সৃজনী। সেদিনের প্রচন্ড জ্বালার স্মৃতি ছাড়া আর কিছু মনে পড়ছে না তার। সেদিন সৃজনীর মনে হয়েছিল কেউ একদলা আগুন ছুঁড়ে দিয়ে গেল। তারপর আর কিছু মনে নেই। বোধহয় জ্ঞান হারিয়েছিল। চোখ খুলে দেখতে পেল সৃজনীর অসহায় বাবা মায়ের মুখ । আরও জানতে পারল কেউ বা কারা তার মুখের উপর অ্যাসিড ফেলে দিয়ে গিয়েছিল সেদিন। ভগবানের অশেষ করুনা যে সৃজনীর চোখ দুটো কিছু হয় নি। ঠোঁটের উপর থেকে গলার কিছুটা অংশ ঝলসে গেছে।

                  আজ প্রায় একমাস পর বাড়ি ফিরছে সৃজনী। এখনও ওষুধ চলছে। বাড়ি এসে দেখল বাবা মা বাড়ির সব আয়নাগুলো সরিয়ে দিয়েছে। কারণটা সৃজনীর অজানা নয়। প্রথম বার নিজের ঝলসে যাওয়া চেহারাটা দেখে নিজেই চিৎকার করে ওঠে সৃজনী। এই একমাস সাক্ষী হয়ে আছে সৃজনীর এমন অনেক লড়াইয়ের। অবশ্য লড়াইয়ে সৃজনীর পাশে সব সময় তার বাবা মা ছিল। কিন্ত আরও একজনকে আশা করেছিল সৃজনী । কল্যাণকে,  না তাকে দয়া করে বিয়ে করার জন্য নয় কেবল পরিচিতির খাতিরেই একবার দেখা করবে আশা করেছিল সৃজনী। কিন্ত কল্যাণ বোধহয় ভয় পেয়েছে, ভেবেছে দেখা করতে গেলে যদি সৃজনীর মতো আধ পোড়া মেয়ের দায়িত্ব নিতে হয়! তাই বোধহয় আর সাহস হয় নি তার সৃজনীকে নার্সিংহোমে দেখতে যাওয়ার।

                   ক্রমে দিনগুলো পার হতে থাকে । লড়াইটাও কঠিন হতে হতে একপ্রকার গা-সওয়া হয়ে গেছে সৃজনীর। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার লড়াই। লোকের চোখে নিজেকে কুৎসিত করে দেখার লড়াই। আইনের কাছে নিজের হার মেনে নেওয়ার লড়াই। পুলিশ এসে বেশ কয়েকবার জেরা করে গেছিল সৃজনীকে। নার্সিংহোমে কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না সৃজনীর তাই বাড়িতেই জিজ্ঞেসবাদ করে পুলিশ। সৃজনী জানায় তার সন্দেহের কথা। বলে , প্রতীক আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের ওকে বিরক্ত করার কথা। পুলিশ ‘দেখছি দেখছি’ করে কাটিয়ে দিল বেশ কিছুদিন। তারপর বলে, প্রতীকদের বিরুদ্ধে প্রমাণের অভাব তাই তাকে কেবল জিজ্ঞেসবাদ করে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেইদিন নাকি প্রতীক এই গ্রামেই ছিল না। সৃজনী এখন রাস্তায় বেরলে মুখ ঢেকে বেরোয়। যেন নিজেকে আড়াল করতে চায় সবার থেকে।

                এইসব ঘটনার পর কেটে গেছে প্রায় ছমাস। সবার সবটা কেমন অভ্যাস হয়ে গেছে। সৃজনীর ঐ পোড়া মুখ দেখে গ্রামের লোক আর তেমন আতঙ্কিত হয় না। লোকের ঠুনকো সহানুভূতিগুলোও কেমন যেন তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। গ্রামে বেশ উৎসবের হাওয়া পঞ্চায়েত প্রধানের ছেলের বিয়ে বলে কথা যে! প্রতীকের সাথে সৃজনীর বাল্য বন্ধু তমশার বিয়ে হচ্ছে। কথাটা শোনার পর সৃজনীর বাবা মা সৃজনীকে তার মাসির বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। মেয়েটাকে আর কষ্ট পেতে দেখতে চায় না তারা।

                  পরবর্তী ঘটনাটা যেন ঘটে গেল আকস্মাৎ। বিয়ের আগের দিন প্রতীক সন্ধ্যার পর বাইক নিয়ে বেরোয় নিজস্ব কিছু কাজে। কিন্ত সেই সরু গলির মুখটাতে আসতেই মুখের উপর বোতল বন্দি আগুন এসে পড়ল। অ্যাসিড। ঝলসে যাওয়ার যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে জ্ঞান হারায় প্রতীক। সবাই তাকে নিয়ে ছুটল নার্সিংহোমে। চোখ দুটোই বোধহয় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

               সৃজনীর মা বাইরে ছিলেন, খবরটা শুনে ঘর আসে সৃজনীর বাবাকে খবরটা দিতে। কিন্ত এসে তাকে পায় না। হয়তো বাজারে গেছে। কিন্ত ঘরে পেল সৃজনীকে। তার হাতের কিছু কিছু জায়গা পুড়েছে । তাতেই মলম লাগাচ্ছিল সে। সৃজনীর মায়ের কিছু বুঝতে বাকি থাকে না। এসে দরজাটা বন্ধ করে মেয়েকে চেপে ধরে।

    -কেন, কেন সৃজা এসব করতে গেলি? কি পেলি? এখন যদি পুলিশ এসে ঝামেলা করে? তখন আমারা কি বলব? তাছাড়াও তমশা তোর ছোট বেলার বন্ধু,  তার কথাটাও একবার ভাবলি না রে? আইন নিজের হাতে নেওয়াটা যে ঠিক নয় রে মা।

         সৃজনী তার পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া ঠোঁটটা শক্ত করে চেপে নিল একবার তারপর বলে- “হ্যাঁ মা তুমি ঠিকই বুঝেছ, আমিই প্রতীকের মুখটা অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছি। ওদের মতো বাবার ক্ষমতায় বলীয়ান জানোয়ারগুলো আইনের ফাঁক গলে ঠিক বেরিয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়েই এই কাজ করলাম। তবে কি জানতো মা এদিকে ভালোই হয়েছে পুলিশ ওকে সাজা দেয়নি। ওর কি আর শাস্তি হতো বল? জেল হেফাজত! কিন্ত তাতে ও বুঝতো না আমার জ্বালাটা, আমার সেদিনের পুড়ে যাওয়ার মর্মটা। কিন্ত আজ ও বুঝেছে। মা এই জ্বালা বড় বেদনা দেয়। শরীরের পুড়ে ঝলসে যাওয়া অংশগুলো হয়তো ডাক্তারের চিকিৎসায় ক্রমে সেরে ওঠে কিন্ত মনটা জ্বলতে থাকে জ্বলতেই থাকে। এই সমাজ মনের আগুনটাকে কিছুতেই নিভতে দেয় না। তবে আজ অনেকদিন পর আমার মনের ভিতর জ্বলতে থাকা আগুনে একটু হলেও জল পরেছে। আর হ্যাঁ মা, কি বলছিলে তমশার কথা ভাবতে? মা, আমি ওকে বাঁচিয়ে দিলাম গো । ঐ রকম একটা জানোয়ারের হাতে সারা জীবন বাঁধা পড়ার থেকে।”

        -সব বুঝলাম, কিন্ত পুলিশ! কি বলব পুলিশ কে?
    – কেন মা , তোমরা তো আমাকে গ্রামের কত লোকের মাঝখান দিয়ে বেশ কিছুদিন আগে মাসির বাড়ি রেখে এসেছ ! আমি তো ওখানেই ছিলাম। তাই না? যেমন সেদিন প্রতীক বাড়ি ছিল না। আর পুলিশ অবিশ্বাস করলে গ্রামের লোকেরা বলবে তারা আমাকে মাসির বাড়ি যেতে দেখেছে কিনা? এখন আমি আসি মা। তবে এবার ফিরে এসে আবার নতুন করে জীবনটা সাজানোর চেষ্টা করব। আর তার শুরু করব আমার পড়াশোনা দিয়ে। আবার আমি কলেজে যাব। জানি লোকের চোখ, লোকের মুখ অনেক কিছু দেখবে, বলবে। কিন্ত আজ আর তাতে আমার খুব একটা কিছু যায় আসে না। আমি বাঁচাব আমার মতো, আমার শর্তে।

  • গল্প

    গল্প- রং- বেরং

    রং- বেরং
    -মুনমুন রাহা

     

    আকাশ জুড়ে রংয়ের মেলা। কোথাও ধূসর কোথাও বেগুনি আবার কোথাও এখনো লালচে আভা। সারাদিনের পরিশ্রমের পর বিদায় নিচ্ছেন সূর্য দেব । এই ক্লান্ত জৌলুসহীন সূর্যকে আর দরকার নেই পৃথিবীর। যতক্ষন পর্যন্ত তার তেজ ছিল , পরিশ্রমের ক্ষমতা ছিল ততক্ষন সে ছিল ভারী অমূল্য , ভারী প্রয়োজনের। আজ সে নিজের শক্তির সাথে নিজের প্রয়োজনীয়তাও হারিয়েছে। ঠিক সুচিত্রা দেবীর মতো ।

    নিজের ঘরের বড় জানলাটার সামনে রাখা চেয়ারে বসে অস্তাচল সূর্যের দিকে তাকিয়ে এ কথাই ভাবছিলেন সুচিত্রা দেবী। আজকাল তার জীবনটাকে বোঝা মনে হয়। যত বার্ধক্য ঘিরে ধরছে ততই যেন পুরোন দিনের কথা গুলো বেশি বেশি মনে পড়ছে। আগে যে সংসারের ঊন কোটি চৌষট্টীটা কাজ তাকে ছাড়া হতো না সে সংসারের এখন সব কিছুই তাকে ছাড়াই হয় । নাঃ , অমর্যাদা নেই তার এই সংসারে । ছেলে , বৌ , নাতি বা সদ্য আসা নাত বৌ সবাই সম্মান করে । কিন্ত সব কিছুতেই যেন তিনি ব্রাত্য। কোন কিছু রান্না করতে গেলে বৌমা রে রে করে ওঠে , ঝাঁজ লেগে এখনই কাশি উঠবে বলে , বড়ি দেওয়া , সেলাই করাও বন্ধ হয়ে গেছে । চোখের অপারেশন আর কোমরের অপারেশনের পর ছেলের স্ট্রিকলি নির্দেশ তিনি যেন এসব কাজ না করেন। তবে সত্যি কথা আরও একটা আছে , কেবল সবাই বকাবকি করেন বলে যে তিনি এসব কাজ থেকে বিরতি নিয়েছেন তা নয় , তিনি নিজেও বুঝতে পারেন তিনি আর আগের মতো পারেন না , কষ্ট হয় বড়। তাই মেনেই নিয়েছেন সব কিছু।

    এই যে কদিন আগে নাতির বিয়ে হল , তাতে কোন কাজে লাগলেন তিনি ? কেবল নাত বৌ বাড়ি আসার পর আশীর্বাদ করা ছাড়া! অথচ বিয়ে বাড়িতে কত কাজ , তার কাছে এসব কাজ এককালে নস্যি ছিল। আজ ইচ্ছা থাকলেও ক্ষমতার অভাব! আজকাল আর কিছুই ভাল লাগে না । খেতেও ইচ্ছা করে না , নানা রোগে ঘুম তো কবেই ছেড়ে গেছে। রাতে খুব জোর ঘন্টা দুই তিন ঘুমান । আজকাল মনে হয় এই বিশ্ব সংসারে তিনিই কর্মহীন। অন্তহীন সময় তাকে গ্রাস করতে আসে। তিনি যেন একটা ভার হয়ে বসে আছেন এই পৃথিবী বক্ষে। তার একমাত্র কাজ মুক্তির অপেক্ষা। এসব ভাবতে ভাবতে দুচোখ দিয়ে কখন যেন বারিধারা নেমে এসেছে । তিনি ক্লান্ত মনটাকে একটু আরাম দিতেই চোখ বুঝলেন।

    সুচিত্রা দেবীর নাত বৌ পরমা এসে থেকেই দেখছে তার দিদি শাশুড়ি তেমন ভাবে কথা বলেন না , খান না । গল্প করা , হাসি আনন্দ এসবের যেন তার জীবনে কোন অস্তিত্বই নেই। আজ সুযোগ বুঝে তার বর মানে সুচিত্রা দেবীর নাতি রক্তিমকে জিজ্ঞেস করল,

    ” আচ্ছা আমি এসে থেকেই দেখছি তোমার ঠাম্মা ভারী রিজার্ভ। তাই না! আমি যে এত হাহা হিহি করে বেরাই সারাদিন তোমাদের বাড়িতে উনি কি তাতে রাগ করেন গো! মানে তেমন ভাবে তো কথাই বলেন না , তাই ঠিক বুঝতেও পারি না। “

    রক্তিম নতুন বৌকে একটু কাছে টেনে বলল,

    ” তুমি আমার ঠাম্মাকে চেনোই নি। ভারী ভাল মানুষ। ছোটবেলায় কত মজার মজার গল্প বলতো জানো ! মা তো চাকরিতে যেত , আমাকে খাইয়ে দেওয়া , ঘুম পাড়ানো সব ঠাম্মা করত । এতকিছু করেও সুন্দর সুন্দর সেলাই করত, বড়ি আচার আরও কত কিছু বানাত। আর সব থেকে ভাল ছিল ঠাম্মার রান্না। রান্নার লোক থাকলেও আমি ছোটবেলায় ঠাম্মার হাতের রান্না ছাড়া খেতেই চাইতাম না! জানো ঠাম্মা একটা গলদা চিংড়ির মালাইকারি করত দা_রুণ । তারপর আস্তে আস্তে সব বদলে গেল। ঠাম্মার শরীর ভেঙে পড়ল। মা ঠাম্মার খেয়াল রাখতে চাকরি থেকে বিরতি নিল সংসারের হাল ধরল। আমিও পড়াশোনা , চাকরিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম। ঠাম্মাও আস্তে আস্তে কেমন যেন নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে লাগল। এখন তো আরও চুপচাপ হয়ে গেছে। ভাল করে খাওয়া ঘুম কিছুই করে না । ডাক্তার তো বলছে ডিপ্রেসানের দিকে চলে যাচ্ছে । দেখা যাক কি হয়!
    তবে এত কিছুর পরেও, আজও সেই গলদা চিংড়ির মালাইকারির জন্য মন কেমন করে । “

    সুচিত্রা দেবী সবে স্নান সেরে উঠেছেন। পরমা গুটিগুটি পায়ে এল তার ঘরে ,

    ” আসব ?”
    ” কে ? “
    এক ঝলক পরমা দেখে খানিক বিরক্ত হয়েই বললেন,

    ” কি ব্যাপার! তোমার আবার কি চাই? হঠাৎ আমার কাছে ?”

    ” কেন আসতে পারি না ?”

    ” আমার এত কথা ভাল লাগছে না ! কোন দরকার থাকলে বল ?”

    ” তোমার নাতি কাল তোমার গল্প করছিল! তোমার রান্নার গল্পও করল । শোনালো তোমার হাতের গলদা চিংড়ির মালাইকারির স্বাদের গল্প। ঠাম্মা , আমি এসব রান্না তেমন জানিনা । কিন্ত শিখতে চাই। শেখাবে আমাকে ?”

    সুচিত্রা দেবী কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন পরমার দিকে। তারপর বলেন,

    ” রতির এখনও মনে আছে আমার রান্নার কথা !”

    ” হ্যাঁ গো। শুধু মনে নয়, প্রাণে জিভে সবেতেই আছে । শেখাবে গো আমাকে ?”

    ” বলছ রান্না জানো না ? কিন্ত তোমার শাশুড়ি মা যে বলেছিলেন, তুমি নাকি খুব ভাল রান্না কর ! “

    ” করি তো । তবে ইন্ডিয়ান পারি না। আমি খুব ভাল চাইনিজ আর থাই করি ।”

    সচিত্রা দেবী একটু থেমে বললেন,

    ” সেসব না হয় বুঝলাম, কিন্ত আমার তো আর সেই ক্ষমতা নেই যে তোমাকে রান্না করে শেখাব ! শরীর জানান দিচ্ছে এসব আর আমার জন্য নয়!”

    ” রান্না করতে হবে কেন ! তুমি বলবে আমি লিখে নেব , তারপর যখন রান্না করব তখন তুমি একটু করে চেখে দেখবে আর কি ভুল হয়েছে বলবে ,তাহলেই হবে।”

    আজকাল সুচিত্রা দেবীর ভারী জ্বালা হয়েছে পরমাকে নিয়ে। সেই যে সেদিন মালাইকারি খেয়ে সবাই খুব প্রশংসা করল, সেই থেকেই মেয়েটা মাঝেমাঝেই চলে আসে সুচিত্রা দেবীর কাছে রান্নার রেসেপি জেনে নিতে । সত্যি বলতে কি সুচিত্রা দেবীরও বেশ ভালোই লেগেছিল যখন নাতি রক্তিম মালাইকারি খেয়ে সোজা হাজির হয়েছিল সুচিত্রা দেবীর ঘরে । সেই ছোট্ট বেলার মতো গলা জড়িয়ে বলেছিল,

    ” ঠাম্মা অনেকদিন পর আবার তোমার হাতের মতো রান্না খেলাম । তোমার তালিমে পরমা বেশ ভালোই রেঁধেছিল বল ! জানো কতবার ভেবেছি একবার বলি একদিন মালাইকারি করতে , কিন্ত ভয় হতো যদি আবদার সামলাতে গিয়ে তোমার শরীর খারাপ হয়!”

    সুচিত্রা দেবীর ছেলে আনন্দ আর বৌমা শীলাও বেশ খুশি , রক্তিমের তো কথাই নেই । এখন ছুটির দিন হলেই সুচিত্রা দেবীর তালিম নিয়ে পরমা মাঝেমাঝেই সাবেকি রান্না করে । অবশ্য মাঝেমাঝে থাই বা চাইনিজও হয়। শীলা রোজকার রান্নাতে থাকে । দিন গুলো এগোতে থাকে । সুচিত্রা দেবী এখন আর দুঃখ বিলাসের খুব একটা সময় পাননা। পরমার জন্য রান্নার রেসিপি ভেবে রাখতে হয় যে !

    শীত হাল্কা হাল্কা পরতে শুরু করেছে সবে । নিজের ঘরে দুপুর বেলা পানের ডিবেটা সবে বার করেছেন সুচিত্রা দেবী এমন সময় বাড়িতে হৈ হৈ শব্দ শুনে একটু থমকালেন। গলাটা যে পরমা আর রক্তিমের তাতে সন্দেহ নেই। কিন্ত কি এত চেঁচামেচি করছে কে জানে ! আজ ছুটির দিন হলেও দুজনের টিকির দেখা নেই সকাল থেকে। অবশ্য নতুন বিয়ে এটাই তো সময় একে অপরের হাতে হাত রেখে ঘোরার! এসব ভাবনার মাঝেই পরমা , রক্তিম, শীলা, আনন্দ সবাই হৈ হৈ করে ঢুকে পড়েছে সুচিত্রা দেবীর ঘরে । আনন্দ এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে ,

    ” দেখ তোমার নাত বৌ কি করেছে! “

    পরমা এগিয়ে এসে সুচিত্রা দেবীর হাতে তুলে দেয় একটা বই । কিছু না বুঝতে পেরে সুচিত্রা দেবী চোখে চশমা এঁটে দেখেন বইয়ের মলাটে বড় অক্ষরে লেখা ” সাবেকি রান্নার সম্ভার ” লেখিকা , সুচিত্রা স্যানাল। খান চারেক বার নিজের নামটা পড়লেন সুচিত্রা দেবী , তারপর ভেজা দুচোখে পরমাকে বললেন,

    ” এসব সত্যি! আমার রান্নার রেসিপির বই ! এসব করলি কখন! “

    ” কেন মনে নেই তোমার থেকে রেসেপি জেনে একটা খাতায় লিখতাম! কেমন লাগছে বল ! রাইটার সুচিত্রা স্যানাল!”

    রক্তিম বলে ,

    ” উঁ হুঁ , ওসব চোখের জলটলে কিচ্ছু হবে না । ট্রিট চাই ব্যাস! আজই অর্ডার করব মন যা চায়, পেমেন্ট কিন্ত তুমি করবে ঠাম্মা। “

    সুচিত্রা দেবী তখনও তাকিয়ে আছেন পরমার দিকে , বললেন,

    ” জানিস আমার মনে হত আমার বুঝি সব কাজ শেষ হয়ে গেছে এই পৃথিবীতে । কিন্ত তোর জন্য আবার একটা কাজ খুঁজে পেয়েছিলাম! যাক শেষ জীবনে নিজের নামটা তো বইয়ের পাতায় দেখতে পেলাম তোর জন্য। আমার আর কিছু দরকার নেই রে ! “

    পরমা এবার সুচিত্রা দেবীর কাছে গিয়ে বলে ,

    ” ঠাম্মা এতবড় পৃথিবীর মাঝে আমাদের এইটুকু জীবনে সব কাজ ফুরানো এত সহজ নয়। কেবল কাজের দিক পরিবর্তনের দরকার হয় সময় মতো । বই লেখার কাজ শেষ তো কি ! আমি প্ল্যান করেছি আমরা , মানে আমি আর তুমি একটা রান্নার স্কুল খুলব। আমি থাই আর চাইনিজ শেখাব আর তুমি সাবেকি রান্না । অবশ্য আমি তোমার হেল্পারও হব। বয়স হলেই সব কিছু ফুরিয়ে যায় না ! পুরোন কে পিছনে ফেলে নতুনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নামই তো জীবন! আর তাছাড়াও ঠাম্মা ইউ আর আ স্টার। ঠিক সূর্যের মতো।”

    সুচিত্রা দেবী এতক্ষন অবাক হয়ে পরমার কথা শুনছিলেন এবার বললেন,

    ” আমিও নিজেকে সূর্যের সাথে তুলনা করি জানিস ! অস্তচলে যাওয়া সূর্যের মতো যার সব কাজ শেষ , যার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে , যার তেজ শেষ হয়ে গেছে , তেমন সূর্য আমি ! “

    পরমা হেসে বলে ,

    ” তোমার তো কনসেপ্টটাই ভুল। যার নিজস্ব আলো আছে তার তেজ কি ফুরায়? না তার প্রয়োজন কখনও কমে। আসলে সূর্য তো অস্ত যায় না , পৃথিবীর একদিকে আলো দেওয়া হয়ে গেলে সে চলে অন্যদিক আলোকিত করতে । দিক পরিবর্তন। তুমিও তেমন। সংসারের জন্য তুমি অনেক কাজ করেছ এককালে গায়ে গতরে। এখন অন্য ভাবে পরিশ্রম কর । যা তোমার শরীরে সহ্য হয়। অন্যভাবে আলোকিত কর আমাদের। আমাদের জীবনের রং আমরাই ঠিক করি । আমরা চইলে তা রঙিন আর না চাইলে তা বেরঙিন । শরীর বয়স তো আটকানো যাবে না তাই সে বাড়ুক নিজের মতো কেবল লক্ষ্য রাখবে মনের বয়স যেন না বাড়ে। ব্যাস , তাহলেই তুমি ইয়ং। বুঝলে ডারলিং!”

    সুচিত্রা দেবী কপট রাগ দেখিয়ে বললেন,

    ” মেয়ের সাহস তো কম নয় দিদি শাশুড়ির সাথে মশকরা হচ্ছে!”

    রক্তিম আবার ফুট কাটে ,

    ” আমার প্রস্তাবের কি হল ?”

    সুচিত্রা দেবী এবার আদেশের সুরে বলেন,

    ” তোমার প্রস্তাব ক্যানসেল করা হল । পরমা , খাতা নিয়ে আয় আজ রাতের মেনুর রেসিপিটা লিখে নে , বাসমতি পোলাও আর নবাবী মটন। “

  • গল্প

    গল্প- কুটুম্ব

    কুটুম্ব
    -লোপামুদ্রা ব্যানার্জী

     

    তনিমা দেবী খুব যত্ন করে তার বেয়াই আর বেয়ানে -এর জন্য দুপুরের খাবারের আয়োজন করছেন। তনিমা দেবীর মেয়ে তৃপ্তির বিয়ে হয়েছে বছর পাঁচেক হয়ে গেল। কিন্তু এই প্রথম তৃপ্তির শ্বশুর, শাশুড়ি আসছে তৃপ্তির বাপের বাড়িতে।
    আসলে তৃপ্তির বিয়ের দেখাশোনা, পাকা কথা সবই হয়েছিল ওর পিসতুতো বোন রাজন্যার বাড়ি কলকাতা থেকেই। তৃপ্তির শ্বশুর শাশুড়ির মনে হয়েছিল গোপাল মাঠ বড্ড দূরে। যদিও রাজন্যা বারবার বলেছিল, আন্টি কলকাতা থেকে দূর্গাপুর মাত্র তিন ঘন্টার রাস্তা। সিটি সেন্টার থেকে আধ ঘন্টাও লাগবে না গোপাল মাঠ পৌঁছাতে।
    আপনি আর আঙ্কেল নিজে গিয়ে একবার দেখে আসুন তৃপ্তি কেমন ঘরের মেয়ে।
    রাজন্যার কথা শুনে তৃপ্তির শাশুড়ি লীনা দেবী বলেছিলেন, তোমার মুখে তো শুনেছি তোমার মামার তেমন অবস্থা নয়। আর সত্যি কথা বলতে কি তৃপ্তিকে আমাদের সবার ভীষণ পছন্দ। এটাই বড় কথা। তৃপ্তির বাবার কি আছে তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। তাছাড়া অমিতের বাবাকে তো জানোই তুমি। উনি হচ্ছেন একজন জন দরদি কাউন্সিলর। গরিব মানুষের প্রতি ওনার একটা আলাদা অনুভুতি কাজ করে সবসময়।
    রাজন্যার মুখ থেকে লীনা দেবীর এই কথাগুলো শুনে তৃপ্তি ও তার মা বাবা এক বাক্যে স্বীকার করে নিয়েছিল যে তৃপ্তির শ্বশুর বাড়ির লোকজন অত্যন্ত ভদ্র ও নিরহংকারী।
    তৃপ্তির বিয়েতে ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে আসা গায়ে হলুদের তত্ব দেখে পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজনের একেবারে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল। তৃপ্তির পিসি মানে রাজন্যার মা বলেছিল, ভাগ্যিস তৃপ্তি আমাদের রাজুর বাড়িতে থেকে রবীন্দ্র ভারতীতে ক্লাস করতে যেত। তাই তো এমন বড়লোক, শিক্ষিত, রুচিশীল শ্বশুরবাড়ি পেল।
    তৃপ্তির বর অমিত পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। বেশ নম্র ভদ্র ও দায়িত্ববান ছেলে। তৃপ্তির সুখ স্বাচ্ছন্দ্য এর দিকে সজাগ দৃষ্টি। এই পাঁচ বছরে নিজে হয়তো খুব বেশি শ্বশুর বাড়িতে রাত কাটায়নি। কিন্তু তৃপ্তি যখনই গোপাল মাঠ আসতে চেয়েছে তখনই গাড়ী করে পৌঁছে দিয়ে গেছে।
    বিয়ের পর কনসিভ করতে তৃপ্তির বেশ সমস্যা হচ্ছিল। অনেক গাইনোকলজিস্ট দেখানোর পর সে বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় অন্তঃস্বত্তা হয়। তৃপ্তির বাবা মা-এর একান্ত অনুরোধে অমিত ও তার মা বাবা তৃপ্তিকে রাখতে এসেছে গোপাল মাঠে।
    শক্তিগড়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে একটা ভদ্রস্থ মাপের রেস্টুরেন্টে সকালের টিফিনটা সেরে নিয়েছে ওরা। তৃপ্তি যদিও একবার ওর শাশুড়িকে বলেছিল, মা এখন তো সবে আটটা। আর দু’ ঘন্টা র মধ্যে তো বাড়ি পৌঁছে যাব। বাড়িতে গিয়ে না হয় মায়ের হাতে লুচি তরকারি খাব।
    লীনা দেবী মিষ্টি হাসি দিয়ে মিষ্টি করে বলেছিল, জানো তো তোমার বাপি নটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট সেরে নেয়। গোপাল মাঠে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে গেলে বেশি দেরি হয়ে যাবে। তাই এখানেই খেয়ে নেওয়া ভালো।
    প্রাতঃরাশ খেয়ে হালকা মিউজিক চালিয়ে গাড়ি চালাতে লাগল অমিত। দশ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করার পরই চোখে পড়ল একটা ডাবওয়ালা। অমিতের বাবা চন্দ্রশেখর বাবু গাড়ী থেকে নেমে চারজনের জন্য চারটা ডাব কিনে আনলেন।
    ডাবটা হাতে নিয়েই তৃপ্তির চোখের সামনে ভেসে উঠল ওর বাবার মুখটা। ডাবের জল খেতে বড্ড ভালোবাসে। তবুও দাম দিয়ে ডাব কিনে খেতে চায় না। গরমে ক্লান্ত হয়ে সবজি বাজার থেকে ফিরে এসে নুন চিনির শরবত খাবে রোজ দিন। তবু টাকা খরচ করে ডাব কিনবে না।
    তৃপ্তি এক চুমুক ডাবের জল খেয়ে অমিতের উদ্দেশ্যে বলে, অ্যাই আরো দু’টো ডাব কিনে নাও না বাড়ির জন্য। এখানে তা’ও চল্লিশ টাকা করে পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের গোপাল মাঠে আরো দাম।
    লীনা দেবী তাড়াতাড়ি বলে, তাই বুঝি। তোমার বাপের বাড়ির ওদিকে ডাবের খুব দাম। এই অমিত দুটো বড় দেখে ডাব কিনে নে তোর শ্বশুর শাশুড়ির জন্য।
    জাতীয় সড়ক-এর বুকে ছুটে চলেছে অমিতের দামী চার চাকা। স্বামীর পাশে বসে হালকা মিউজিক শুনতে শুনতে তৃপ্তি ভাবে, সত্যি সে ভীষন লাকি। অমিতের মতো দায়িত্ববান স্বামী, মামনি আর বাপির মতো উদারমনষ্ক শ্বশুর, শাশুড়ি পেয়ে। কত সহজে ওনারা আমার অত্যন্ত ছাপোষা মা- বাবাকে আপন করে নিয়েছেন। আমার বাবা যে একটা সামান্য গুমটি দোকান আছে। তার জন্য কিন্তু ওনাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। পাঁচ বছরে কখনো শুনিনি কোনো অসম্মান জনক বাক্য। বরং প্রতি বছর পুজোতে মামনি নিজে গিয়ে আমার মা বাবার জন্য দামি জামা কাপড় কিনে উপহার হিসেবে পাঠায়। প্যাকেটের উপর সুন্দর করে লিখে দেন, ‘আমার দাদা দিদির জন্য ছোট্ট উপহার এই বোনের বাড়ির তরফ থেকে।’
    এইসব আন্তরিক কথাবার্তা ভাবতে ভাবতে কখন যে নিজের বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছি তৃপ্তি যেন টের পায় নি।
    অমিতের গলার স্বর শুনে ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এলো তৃপ্তি।
    কি গো এসে গিয়েছি তো? এবার তো নামো।
    লাজুক হাসি দিয়ে তৃপ্তি নামল খুব সাবধানে। লীনা দেবী তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, দেখো বৌমা সাবধানে। বাপের বাড়ি এসে বেশি ছোটাছুটি করতে যেও না যেন।
    তনিমা দেবী তাড়াতাড়ি দুটো চেয়ার এনে উঠানে পেতে দিল। চেয়ারের উপর বিছিয়ে দিয়েছে পুরানো শাড়ির পাড় থেকে তোলা সুতো দিয়ে নিজের হাতে বোনা আসন।একটা নড়বড়ে টুলের ওপর এনে রাখল শরবতের গেলাসগুলো।
    লীনা দেবী হাত নেড়ে বলল, দিদি ব্যস্ত হবেন না। তিন চার ঘন্টা তো বসেই এলাম। এখন বরং একটু দাঁড়িয়ে থাকি। পা টা ছাড়ুক একটু।
    তৃপ্তির বাবা তার সারল্য মাখা হাসি দিয়ে বলল, সেই ভালো দিদি। চলুন আমরা বরং একটু হেঁটে স্কুল বাড়ির দিকটা দিয়ে। জানেন তো ওখানে গাছ গাছালি প্রচুর। গরমের দিনে ওই জায়গাটা ছেড়ে ঘরে আসতেই মন চায় না।
    চন্দ্রশেখর বাবু বললেন, সেই ভালো। এই তো প্রথমবার এলাম। তল্লাটটা বরং ঘুরে দেখি।
    তৃপ্তির বাবা বেয়ান, বেয়াই, জামাই সবাইকে নিয়ে এলাকা পরিদর্শন করাতে গেলেন। নড়বড়ে টুলটার ওপর পরে রইলো শরবত-এর গেলাসগুলো।অতিথিদের কাছে শরবত-এর গেলাসগুলো কোনো সমাদরই পেল না।
    তৃপ্তি বরং ওর মায়ের হাতে ডাব দুটো দিয়ে বলল, মা তোমার আর বাবার জন্য নিয়ে এসেছে তোমার জামাই। খুব টেস্টি জলটা। আমরা সবাই তো খেলাম।
    ওওওও তাই বোধহয় আর কেউ শরবত এর গেলাসগুলো ছুঁয়ে দেখল না। এতক্ষণে বিষয়টা পরিষ্কার হলো আমার কাছে।
    যাক গে। ও তৃপ্তি তুই আমার সঙ্গে একবার রান্নাঘরে আয় মা। দেখ তো সব জোগাড় ঠিকঠাক আছে কিনা।
    রান্না ঘরে ঢুকে তৃপ্তি তো অবাক হয়ে যায়। দেরাদুন রাইসের গন্ধে ভরে উঠেছে টালির ছোট্ট রান্নাঘরটা। একে একে তনিমা ঢাকা খুলে দেখাতে লাগল কি কি সে বানিয়েছে দুপুরে খাওয়ার জন্য।
    তৃপ্তি বলে, ও মা এত কেন রান্না করতে গিয়েছ। মাটনটাই তো ঠিক ছিল। আবার গলদা চিংড়ি করার কি খুব দরকার ছিল।
    হ্যাঁ গো মা বাবার তো পকেটের খুব চাপ হয়ে গেছে। যে মানুষটা নিজেদের জন্য সচারাচর গলদা চিংড়ি কেনে না শুধু মাত্র দামের জন্য।সেই মানুষ একসঙ্গে খাসী আর গলদা কিনে এনেছে।
    দেখ তৃপ্তি যতই হোক তোর শ্বশুরবাড়ির লোকরা বড়লোক। বড়লোকদের পাতে কি কুচো চিংড়ি দেওয়া যায়? না ওনাদের পাতে রেশনের চালের মোটা ভাত দেওয়া যায়?যারা যেমন মানুষ তাদের কে তো তেমন আপ্যায়ন করতে হবে তাই না।
    তৃপ্তি ওর মোবাইলটা অন করে দেখলো বেলা একটা বাজতে চলেছে। তনিমার উদ্দেশ্যে বলে, মা বাপির দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। ওরা এখনই এসে পড়বে। চল আমরা পাকা ঘরের বারান্দায় জল, জায়গা করে ফেলি।
    মিনিট দশেকের মধ্যেই তৃপ্তির বাবা অমিতের মা বাবাকে না ফিরে এল। এসেই বললেন- তনিমা বেয়াই বেয়ানরা একটু দূর্গাপুর ব্যারেজ দেখতে যাবে বলছেন। তাই বলছি এখন আর খাবার বেড়ে কাজ নেই।
    লীনা দেবী মিষ্টি হেসে বললেন, যেতে আসতে যেটুকু সময় লাগবে। চিন্তা করবেন না। আমরা দূর্গাপুর থেকে ফিরে এসে কব্জি ডুবিয়ে খাব দিদির হাতের টেস্টি সব রান্না।আর হ্যাঁ, তৃপ্তির সঙ্গে আপনারও খেয়ে নিন কিন্তু। না হলে কিন্তু সবার খেতেই দেরি হয়ে যাবে। তখন আবার হজমের সমস্যা হবে।
    তৃপ্তি বলে, মামনি বাপি তো একটার মধ্যে খাবার খান বাড়িতে। দেরি হলে বাপির তো কষ্ট হবে।
    তৃপ্তির কথাটা জাস্ট হাওয়াতে উড়িয়ে দিয়ে লীনা দেবী বললেন, একদিন অনিয়ম করলে তোমার বাপির কিছু হবে না। তাছাড়া তো ঘন্টা খানেক-এর তো মামলা।
    অমিতরা চলে যাওয়ার পর তৃপ্তির মা বলল, তৃপ্তি চল আমরা সবাই এক মুঠো করে খেয়ে নিই। তোর তো এইসময় অনিয়ম করা উচিত হবে না।
    তৃপ্তির বাবা বলল, বুঝলে তৃপ্তির মা আগে জামাই বাবাজীবন, বেয়াই আর বেয়ানের পাতে মাংস, চিংড়ি পড়ুক। ওনারা খাওয়ার পর যদি কিছু বেঁচে থাকে তখন না হয় রাতে আমরা খাব। এই বেলা ডাল, আলু চচ্চড়ি দিয়ে খেয়ে নিই আমরা।
    খাওয়া দাওয়ার সেরে বিছানায় শুয়ে বারবার তৃপ্তি জানালার দিকে উঁকি মারতে লাগল।বেলা গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেল। ঘড়িতে যখন সাড়ে তিনটে তখন অমিতদের গাড়িটা এসে থামলো তৃপ্তিদের বাড়ির সামনের রাস্তায়।
    তনিমা, তৃপ্তির বাবা হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। লীনা দেবী মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন, সরি সরি খুব দেরি হয়ে গেল আমাদের ফিরতে।
    তনিমা বলে ,হ্যাঁ দিদি বড্ড অবেলা হয়ে গেল যে। চলুন একটু করে খেয়ে নেবেন কিছু।
    লীনা দেবী তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, না না দিদি আপনাদেরকে ব্যস্ত হতে হবে না। আমরা সিটি সেন্টার থেকে লাঞ্চ করেই ফিরছি। আধ ঘন্টার মধ্যেই আমরা বেরিয়ে পড়বো। বুঝতেই তো পারছেন বেশি দেরি করা যাবে না। অমিত নিজেই তো ড্রাইভ করবে।
    লীনা দেবী কিছুক্ষণ তৃপ্তিকে এটা ওটা প্রেগন্যান্সি সংক্রান্ত জ্ঞান দিয়ে তারপর রওনা দিলেন। অমিত যাওয়ার সময় তৃপ্তিকে একটা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে গেল। তৃপ্তির হাতের ওপর আলতো নিজের হাতটা ছুঁইয়ে চোখ বন্ধ করে জানান দিল ওর আবেগকে।
    অমিতরা চলে যাওয়ার পর তৃপ্তির মা প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, হ্যাঁ রে তৃপ্তি তোর শ্বশুর, শাশুড়ি আমাদের ঘরের এক গ্লাস জল পযর্ন্ত মুখে তুলল না।
    তৃপ্তি একটা তিতো হাসি দিয়ে বলল, ছাড় না মা। ওনারা তো মাটন, চিংড়ি রোজ খাচ্ছে। বরং আজ আমরা তিনজনে জমিয়ে রাতে খাওয়া দাওয়া করব।
    তনিমা দেবী হালকা ধমকের সুরে বলল, একি অসভ্যের মতো কথা তৃপ্তি। ওনাদের জন্য খাবারের আয়োজন করলাম। আর ওনারাই কিছু না খেয়ে চলে গেলেন।
    তৃপ্তি বলে, মা গরিব ঘরের মেয়েকে বড়লোকরা নিজেদের পুত্রবধূ করে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু পুত্রবধূর মা বাবাকে নিজেদের সম গোত্রীয় ভাবতে পারে না কিছুতেই। দোষ কি কখনও বড়লোকদের হয় না। দোষ তো আমাদের মতো গরীবদের।যারা বড়লোকদের সঙ্গে কুটুম্বিতা করতে ছুটি। এই জন্যই তো বলে আত্মীয়তা করতে সমানে সমানে।
    তনিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তৃপ্তি কতবড় কঠিন কথাটা তুই কি অবলীলায় বললি রে মা। গরিবরা চিরকালই বড়লোকদের দয়ার পাত্র হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না।

  • গল্প

    গল্প- মাধু

    মাধু
    -সুজিত চ্যাটার্জি

     

     

    মাধু বিয়ের দশদিনের মাথায় বিধবা হল। বর রতন মাঠে চাষ করতে গিয়ে সাপের ছোবল খেল।
    ধন্বন্তরি ওঝার যাবতীয় ঝাড়ফুঁক কেরামতিকে নিষ্ফল প্রতিপন্ন করে শেষ নিঃশ্বাস ফেলে সব্বাইকে আকুল পাথারে ভাসিয়ে রতন চলে গেল।
    কপাল লিখনে অবিশ্বাসী গুটিকয় অনামুখো যারা বলেছিল হাসপাতালে নিয়ে গেলে ছেলেটা প্রাণে বেঁচে যেত, রতনের সর্বজ্ঞানী মুখরা মা শীতলা, তাদের সাতগুষ্টির মৌখিক শ্রাদ্ধ করে পিন্ডি চটকে নিদান দিয়েছিল, তাদের ছেলেমেয়েদের সাপে কাটলে যেন তারা তেমনই করে।
    কেননা কপালের লেখন খন্ডায় কারো বাপের সাধ্যি নেই।

    মাধু বিধবা হবার দশদিনের মাথায় তারই মেজ দেওরের সঙ্গে মাঝরাতে একই ঘরে একসঙ্গে পাকড়ে গেল।
    পাকড়াও করার অসাধ্য সাধন করল কে?
    সেই সর্বজ্ঞানী মুখরা মা শীতলা।
    মাধু চোখের জলে নাকানিচুবানি খেয়ে প্রাণান্তকর ভাবে বোঝাতে চেষ্টা করল, সে কোনও ভাবেই দায়ী না ।
    একলা ঘরে সুযোগ বুঝে মেজ দেওর এই কান্ড ঘটিয়েছে, সে সম্পূর্ণ নির্দোষ।
    ভোবি ভোলবার নয়।
    শীতলার অকাট্য প্রমাণ, তার নির্ভুল অনুমান দক্ষতা এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
    সে নিশ্চিত জানতো, এ মেয়ে অপয়া, এক ছেলেকে খেয়েছে এবার নির্বংশ করে তবেই ছাড়বে এই রাক্ষসী ডাইনির বংশধর।
    সুতরাং এই কালনাগিনীকে কোনোমতেই আর এ ভিটেতে রাখা চলেনা।
    বিধবা মাধু শ্বশুর ঘর ছাড়া হল।

    উঠতি ধনী দাসু বাবুর দয়ার শরীর, তার ওপর তিনি সদ্য বিপত্নীক।
    মাধু দেখতে শুনতে বেশ। বয়স কম, এমন ডাগরডোগর বিধবাকে তো আকুলে ভাসিয়ে দেওয়া যায় না। সুতরাং মোসাহেবদের মান এবং মুখ রাখতে মাধু এখন দাসু বাবুর আশ্রিতা।

    মাধু এখন অনেক পরিণত।
    প্রতি রাতেই তার ঘরে পুরুষ ঢোকে। দয়ালু দাসু বাবু, রসালো বাবু হয়ে রাত বিতোয় নধর নারী শরীরের সঙ্গে।
    তবে একেবারে খালি হাতে নয়।
    মাধুর দেওয়া শর্ত পূরণের অঙ্গীকারে।
    প্রতি রাতেই পুরনো তবুও নতুন খেলা।
    প্রতি রাতেই নতুন নতুন শর্তের অঙ্গীকার।
    আজ অলংকার, কাল টাকা, পরশু জমির দলিল আরও আরও আরও…
    দূর্বল মুহূর্তে পুরুষেরা বড়ই দাতা হয়ে ওঠে।
    মাধু বুঝেছে বোবা আর বোকা থাকার অনেক জ্বালা। তাছাড়া যৌবনের জৌলুশ বড়ই ক্ষণস্থায়ী।
    মেজ দেওরের ধাষ্টামো আর সর্বজ্ঞানী মুখরা মা শীতলার নির্মম আচরণ তাকে চতুর হতে শিখিয়েছে।

    সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চুলে পাক ধরা মাধুর এখন নিজস্ব ঘর।
    মেয়ে ঐশ্বর্য আর কিছুদিনের পরেই ডাক্তার হয়ে যাবে।
    ভাগ্যিস সেদিন প্রবল চাপের মধ্যেও অবিচল থেকেছিল মাধু।
    না, সে গর্ভত্যাগ করেনি।
    সবই দয়ালু দাসু বাবুর দান।
    শুধু একটাই আফসোস,
    দয়ালু দাসু বাবু মান আর মুখ বাঁচাতে স্বেচ্ছায় কড়িকাঠে ঝুলে প্রাণত্যাগ করেছিল।

  • গল্প

    গল্প- মরিচিকা

    মরিচিকা

    -মুনমুন রাহা

     

     

    অন্তু আজ বড় ব্যাস্ত। এবাড়ির কর্তা অর্থাত অন্তুর বিপিন মামা মেয়ে ঝুমুরের বিয়ে আজ।তিনি বড় ভরসা করেন অন্তুর উপর। অন্তুও যথাসাধ্য চেষ্টা করে তাকে খুশি রাখার। করারই কথা বিপিন মামা বড় বিপদের সময় আশ্রয় দেন অন্তুকে। অন্তু সে ঋণ কোনদিন ভুলতে পারে নি। তাই তো আজ সানাইয়ের শব্দটা যতই তেতো লাগুক এই বিয়ে বাড়ির জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবটাই সে হাসি মুখে করছে।

    প্যাণ্ডেলের লোককে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছিল অন্তু এমন সময় ডাক পড়ল অন্দরমহল থেকে। বিপিন বাবুর স্ত্রী নয়না দেবী ডাকছেন। গায়ে হলুদ নিয়ে আসা বরের বাড়ির লোকজনের খাবারের ব্যবস্থা করতে । জলখাবারের ব্যবস্থা আগেই করা ছিল। অন্ত পরিবেশনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছিল। তখনই চোখ পড়ল ঝুমুরের দিকে। আজ ইচ্ছা করেই অন্তু ঝুমুরের সামনে আসেনি। কি দরকার নিজের ব্যাথা কে নিজে খোঁচানোর ! কিন্ত এখন যখন ঝুমুরের গলার আওয়াজ পেল তখন অবাধ্য চোখটাকে আর আটকাতে পারল না অন্তু।

    গায়ে হলুদের জন্য তৈরী হয়েছে ঝুমুর । সেজেছে হলুদ রাঙা শাড়িতে। ভারি সুন্দর লাগছে তাকে। তার অঙ্গের সব অলঙ্কার যেন ফিকে লাগছে ঝুমুরের রূপের আলোর কাছে। হেসে হেসে হবু শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সাথে কথা বলছে সে। অন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে মন দিল নিজের কাজে। ঝুমুরকে তার এখন মরিচিকার মতো মনে হয়। বড় কাঙ্খিত , কিন্ত ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

    দুপুর বেলাটা অন্তু নিজের ঘরে এল । উদ্দেশ্য একটু বিশ্রাম। মানসিক, শারীরিক দুই ক্ষেত্রেই দরকার। এই ঘরে অনেকদিন পরে এল সে।
    ঘরটা কেমন অন্ধকার অন্ধকার লাগছে আজ ।
    ভেবেছিল ঘরে এসে বিশ্রাম দেবে শরীরের সাথে মনটাকেও। ঝুমুরের সামনে না থাকলে হয়তো অতীত স্মৃতির থেকে মুক্তি পাবে। কিন্ত তা আর হল কৈ! ঘরে আসতেই মাথার মধ্যে ভির করে এল একরাশ স্মৃতিকথা। এই ঘরটাই একসময় বরাদ্দ ছিল তার জন্য। প্রথম যখন অন্তু এবাড়িতে এসেছিল তখন তার বয়স খুব বেশি ছিল না । বাবা মা মারা যাওয়ার পর মামার বাড়ি থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছিল অন্তু। কিন্ত মাধ্যমিকে খুব ভাল রেজাল্ট হওয়ার পরেও মামা বাড়ির হতদরিদ্রতার জন্য যখন অন্তুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল তখন তার ছোট মামা নিজের বাল্য বন্ধু বিপিন বাবুকে অনুরোধ করেছিল অন্তুর পড়াশোনাতে সাহায্য করতে । বিপিন বাবু অন্তুর রেজাল্ট দেখে তাকে নিজের বাড়িতে নিজের খরচে পড়াশোনা করেছিলেন। প্রথম দিকে যে মামি নয়না দেবী খুব ভাল ব্যবহার করেছিল অন্তুর সাথে তা ঠিক নয়। তবে ক্রমেই অন্তুর আর নয়না দেবীর দুজনেরই অভ্যাস হয়ে যায় দুজনের ব্যবহার।

    ঝুমুর তখন ক্লাস সেভেন। অন্তুর সাথে ঠিক বন্ধুত্ব হয়েছিল বলাটা ঠিক নয়। বরং ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া স্মার্ট ঝুমুর মফস্বলের নিরীহ এবং আপাত আনস্মার্ট অন্তুকে নানা ভাবে অপদস্থ করে বেশ মজা করত। অবশ্য তাতে অন্তু কিছু মনে করে নি কোনোদিন। তবে আস্তে আস্তে অবস্থার বদল ঘটল। বিপিন বাবুর কল্যাণে সব রকম সুযোগ সুবিধা পেয়ে অন্তু উচ্চমাধ্যমিকে তৃতীয় হল। সেইদিন ঝুমুরের চোখে অন্তু প্রথমবার নিজের জন্য কেমন একটা সম্মান দেখেছিল। কলেজের পরিবেশ আর ঝুমুরের বদান্যতায় অন্তুও বেশ স্মার্ট হয়ে উঠল ।

    তারপর আস্তে আস্তে ঝুমুরের সাথে সমীকরণ গুলো কেমন যেন পাল্টে যেতে লাগল। বন্ধুত্ব থেকে ভাললাগা তারপর ভালবাসা ।
    অবশ্য এই ব্যপারে পদক্ষেপটা ঝুমুরই প্রথম নিয়েছিল। অন্তুর মধ্যে বিপিন বাবুর প্রতি যে কৃতজ্ঞতা ছিল সেটাই বারবার রাশ টানত অন্তুর মনের। কিন্ত ঝুমুরের জেদ আর জোরের কাছে টিকতে পারে নি সে সব । ঝুমুর বলত,
    ” দেখ , কলেজে পড় ! আর গার্ল ফ্রেন্ড থাকবে না ! তাও কি হয়! লোকে কি বলবে ! আর আমারও একটা বয় ফ্রেন্ডের দরকার । না হলে বন্ধুদের সামনে মান সম্মান থাকছে না । তাই সস্তার সেন্টিমেন্ট সরিয়ে রেখে জীবনে এনজয় কর ।”

    সুন্দরী রূপসী স্মার্ট ঝুমুরের ভালবাসার ডাককে অগ্রাহ্য করতে পারেনি অন্তু । মন প্রাণ দিয়ে ভালবাসেছিল ঝুমুরকে। আঁকড়ে ধরেছিল মনের সবটুকু দিয়ে । তবে অন্তুর বরাবরই মনে হত ঝুমুরের যেন ভালবাসার থেকে অধিকার বোধটাই বেশি। যখন বলবে যে ভাবে বলবে সেভাবেই সব কিছু করতে হবে । বিশেষ করে ঝুমুরের বন্ধুদের সামনে অন্তুকে যেতে হলে অন্তুর জামা থেকে জুতো সবটাই পড়তে হত ঝুমুরের পছন্দের। এমন কি অন্তু কাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে তাও ঠিক করত ঝুমুর । ঝুমুরের এই অধিকার প্রধান ভালবাসায় মাঝেমাঝেই হাঁপিয়ে যেত অন্তু । তবুও পরিজনের ভালবাসা না পাওয়া অন্তু তার আর ঝুমুরের সম্পর্কটাকে আগলে রাখতে চেয়েছিল।

    কিন্ত এই ভালবাসা যে কেবল অন্তুর কাছেই দামী ছিল তা জানা গেল কিছুদিন পরে । অন্তু তখন সবে একটা চাকরি পেয়েছে । মাইনেটা অন্তুর কাছে বেশ সন্তোষ জনক। সে আর দেরী না করে ঝুমুরকে প্রস্তাব দেয় বিয়ের। ঝুমুর তখন কলেজের লাস্ট ইয়ারে পড়ছে । বিয়ের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ে ঝুমুর । বলে ,

    ” তুমি ভাবলে কি করে যে তোমাকে বিয়ে করব ! তোমাকে বিয়ে করলে আমার বাবার মান সম্মান কিছু থাকবে ? “

    ” কিন্ত আমরা তো ভালবাসি একে অপরকে ! “

    ” ভালবাসা ! ” খুব অবাক হয়েছিল ঝুমুর । বলে ,
    “আরে বাবা সমাজে চলতে গেলে কিছু দেখনদারী লাগে । তেমন আমার ও দরকার ছিল কাউকে বয় ফ্রেন্ড বানানো , তো ব্যাস তোমাকে তাই বলেছিলাম। এর মধ্যে এই সব ভালবাসা টালোবাসা টাইপের সেন্টিমেন্ট এনো না প্লিজ। “

    নাঃ , কথা গুলো মেনে নিতে পারে নি অন্তু। জীবনের প্রথম ভালবাসার নারীকে বাঁধতে চেয়েছিল আপ্রান। অন্তুর নাছোড় জেদ দেখে ঝুমুর কটাক্ষ করে তাকে। বলে ,

    ” তোমার স্বপ্ন কোনদিনও পূর্ণ হবে না অন্তু। তুমি ঙ কি ভেবেছিলে আমাকে বিয়ে করে আমার বাবার সম্পত্তি হাতাবে! তা হচ্ছে না । তোমার মতো একজন ছেলেকে আমি বিয়ে করতে যাবই বা কেন? আমার বাবার আশ্রিতকে বিয়ে করার ভিমরতি আমার হয় নি। তাই তোমার স্বপ্ন অধরাই রয়ে যাবে । “

    কথা গুলোর মধ্যে যে লুকনো বিষের ফলা ছিল তা সেদিন ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল অন্তুর সব স্বপ্ন গুলোকে। অন্তু আর ঝুমুর কে বোঝাতে যায় নি সে সত্যিই কি স্বপ্ন দেখেছিল । কোন সম্পত্তির লোভে নয় বরং একটু ভালবাসার আকাঙ্খাতেই ঝুমুর কে তার জীবনে চেয়েছিল অন্তু । এরপর অন্তু চাকরির অজুহাতে চলে যায় ঝুমুরদের বাড়ি থেকে। তবে ঝুমুরের সাথে যাই হোক বিপিন মামার উপকারের কথা ভোলে নি অন্তু। তাই বিপিন মামা যখনই অন্তুকে ডেকেছেন কোন কাজে অন্তু এক কথায় চলে এসেছে। কিছুদিন আগে অন্তু এবাড়িতে এসে জেনেছিল ঝুমুরের বিয়ে পাকা হওয়ার কথা । বিপিন মামা দেখেছিলেন তার হবু জামাইয়ের ছবি। বেশ অবস্থাপন্ন ঘরে বিয়ে হচ্ছে ঝুমুরের। অবশ্য বিয়ের পর জামাই আর মেয়ে বিপিন মামার বাড়িতেই থাকবে । এমনই ইচ্ছা ঝুমুরের, আর জামাই তো ঝুমুরের কথাতেই ওঠে বসে তাই তারও কোন আপত্তি নেই। এসব কথা বিপিন বাবুই গর্ব করে জানিয়েছিলেন অন্তুকে। ঝুমুরের বিয়ের কথাতে বুকটা মুচড়ে উঠেছিল ঠিকই তবে মনে হয়েছিল এই ছেলেই ঝুমুরের জন্য আদর্শ। যে ঝুমুরের প্রতি কথার তামিল করতে পারবে । এরপর অন্তুর আবার ডাক পড়েছিল বিয়ের অনুষ্ঠানটা সামলে দেওয়ার জন্য। আসলে বিপিন মামার অর্থ বল থাকলেও ভরসার লোক বলতে অন্তুই। অন্তুও না করে নি , যথাসাধ্য দায়িত্ব পালন করছে সে ।

    আজ একলা ঘরে অন্তুর মনে হচ্ছিল অন্যরকম কিছু কথা । আচ্ছা যদি ঝুমুর সেদিন তার প্রস্তাব মেনে নিত! যদি সত্যিই তাদের বিয়ে হত ! তবে অন্তু হয়তো তখন খুশি হত ঠিকই কিন্ত সুখী হত কি ? না কি ঝুমুর কে সুখী করতে পারত ! অন্তু বোধহয় নিজের সব আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে সারা জীবন কেবলমাত্র ঝুমুরের দাস হতে পারত না ! আর তাতে অন্তু বা ঝুমুর কেউই সুখী হত না। তাই যে যদি গুলো হয় নি তা বোধহয় ভালোই হয়েছে। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই দরজায় ঠকঠক শব্দ। মিষ্টি আনতে যেতে হবে যে ! তাই আবার ডাক পড়েছে অন্তুর। অন্তু মনের ভিতর থাকা সব যদি গুলোকে পুরোনো ঘরের অন্ধকারে ফেলে রেখে বেরিয়ে আসে । ঠিক করে আর ছুটবে না মরিচিকার পিছনে। এবার পালা সামনে তাকানোর।

  • গল্প

    গল্প- বিষ

    বিষ
    -মুনমুন রাহা

     

    আজকের রবিবারটা অন্য রবিবারগুলোর মতোই শুরু হয়েছিল। কিন্ত সকালে বাজার থেকে এসে নিশিত যা খবর দিল তাতে মান্তুর মনটা খারাপ হয়ে গেল। মান্তুদের পাড়ায় অম্বিক আর তার বৌ নীতা নাকি একসাথে বিষ খেয়েছে। সকালের রান্নার লোক এসে অনেক ডাকাডাকি করেও যখন তুলতে পারেনি তখন পাড়ার ছেলেদের খবর দেয় আর তারপর তারাই দরজা ভেঙে দুটো মৃতদেহ উদ্ধার করে।

    খবরটা শুনে থেকে মান্তুর মনটা কেমন যেন খচখচ করছে। খুব যে আলাপ ছিল ওদের সাথে তেমন নয়। কিন্ত নীতা মেয়েটাকে অফিস যাওয়ার পথে মাঝেমাঝেই দেখত মান্তু । কেমন যেন উদাস চোখে জানলার বাইরে দেখত। মুখ চেনা ছিল তাই চোখাচোখি হলে হাসি বিনিময় হত। কিন্ত ঐটুকুই। এর বেশি সেভাবে আলাপ ছিল না মান্তুর সাথে । আরও ভালো করে বলতে গেলে নীতার সাথে পাড়ার কারোরই সেভাবে আলাপ ছিল না । কেমন যেন ঘরকুনো প্রকৃতির মেয়েটা। অম্বিক বরাবরই নিজেকে নিয়েই থাকত । পাড়াতে খুব একটা মিশত না। কিন্ত সবাই ভেবেছিল ওর বৌ এসে এই দূরত্ব ঘোচাবে। কিন্ত বৌ নীতাও স্বামী অম্বিকের পথই অবলম্বন করল।

    তবে মান্তু অম্বিকদের খবর মাঝেমাঝেই পেত পম্পার কাছ থেকে। পম্পা হল মান্তুদের বাসন মাজার লোক । সে আবার নীতাদের বাড়িতেও কাজ করত। সে মাঝেমাঝেই বলত অম্বিকের পয়সা থাকলেও নাকি তার মন খুব ছোট। নীতার আর অম্বিকের নাকি মিলমিশ নেই। আরও নানান কথা বলত কিন্ত মান্তু কোনোদিনই উৎসাহ দেখাত না এসব কথায়। অন্য লোকের হাঁড়ির খবর শুনতে কেমন যেন রুচিতে বাধত মান্তুর।

    পরদিন সোমবার হলেও অফিস যায় নি মান্তু । ইচ্ছা একবার মায়ের কাছে যাওয়ার। পম্পা রবিবার দিন কাজে আসেনি । আজ একটু তাড়াতাড়িই এসেছে। পম্পা একটু চুপচাপ। চোখগুলোও কেমন ফোলাফোলা। মান্তু আজ আর নিজেকে সামলাতে পারে না । সব দ্বিধা দূর করে মান্তুকে জিজ্ঞেস করে, “কি রে, নীতার এমন কথা শুনে কাল খুব কেঁদেছিস বুঝি ! কি করবি বল সবই নিয়তি। আচ্ছা, এই তো তুই বলতিস স্বামী স্ত্রীর বনিবনা হতো না ! তাহলে একসাথে বিষ খেল কেন? জানিস তুই কিছু? আমি অফিস যাওয়ার পথে দেখতাম নীতা জানলার দিকে তাকিয়ে থাকত। হ্যাঁ রে প্রেমটেম কিছু ছিল না তো? না মানে, হয়তো নীতার সেই প্রেমিকই কোন অশান্তির জেরে দুজনকে বিষ দিয়েছে! এমন তো কত কথাই শুনি আজকাল!”

    পম্পা কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “বৌদি, বিষ দিতে কি শুধু বাইরের লোকই লাগে? অথবা বিষ কি শুধু দোকানেই কিনতে পাওয়া যায়? না গো , অনেক সময় কাছের মানুষটাই বিষ দিতে পারে । আর জান তো সব থেকে শক্তিশালী বিষ মানুষের ভিতরেই থাকে। ইচ্ছা করলেই সেই বিষ ঢেলে সামনের মানুষটার জীবন বিষাক্ত করে দিতে পারে কিছু বিষাক্ত মানুষ।”
    – মানে! কি বলতে চাইছিস ?
    -বৌদি আমার তো আর নীতা বৌদির বাড়ি যাওয়ার তাড়া নেই। আজ তোমাকে একটা গল্প শোনাই। নীতা বৌদির জীবনের গল্প। খানিকটা তার কাছ থেকে শোনা কিছুটা নিজের চোখে দেখা । পম্পা শুরু করল- পম্পা মান্তুর কাছে বসে কথা বললেও তার দৃষ্টি যেন বহু দূরের। সেই দৃষ্টির দূরত্ব মাপার বৃথা চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে মান্তু মন দিল পম্পার কথায়।

    নীতাকে ভগবান রূপ গুনে সুন্দর করে পাঠালেও, কপালটা তার সুন্দর ছিল না । খুব কম বয়সেই বাবা মাকে হারায় নীতা । বয়স তখন মাত্র বারো বছর। আশ্রয় হয় মামার বাড়িতে। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ থাকলেও বাবা মা পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সাথে পড়াশোনাও বিদায় নেয় নীতার জীবন থেকে। কারণ নীতার মামি মনে করতেন নীতার পিছনে পড়াশোনার জন্য টাকা নষ্ট না করে মামা যদি ঐ টাকা জমায় তবে নীতার বিয়ের একটা হিল্লে হয়। তাই বারো বছরের নীতা পড়াশোনার পাঠ ছেড়ে মামির সংসারে ঝি বৃত্তি করতে লাগল।
    এসব দেখে ভিতর ভিতর বড় কষ্ট পেত নীতার দিদিমা। কিন্ত তার কিছু করার ছিল না ছেলে বৌয়ের সংসারে। তাই তিনি যা করতে পারতেন তাই করলেন। চেনা পরিচিতদের পাত্র দেখার কথা বলেন। তখনই এক পরিচিত নীতার জন্য অম্বিকের সম্বন্ধটা আনলেন। অম্বিক বেশ অবস্থা সম্পন্ন। দাদুর কাছে মানুষ ছোট বেলা থেকে । বাবা মা নেই। দাদুও বেশ কিছু বছর হল স্বর্গবাসী। তাই এ হেন ভাল সম্বন্ধ হাত ছাড়া করতে চাইলেন না নীতার দিদিমা। তাই এগারো বছরের বড় অম্বিকের সাথেই পনেরো বছরের নীতার বিয়ে হয়ে গেল।
    একরাশ স্বপ্ন বুকে বেঁধে দিন বদলের আশা নিয়ে নীতা অম্বিকের সাথে তার ঘরে এল। কিন্ত নীতার সেই স্বপ্ন আশা ভাঙতে বেশি সময় লাগল না। কিছুদিনের মধ্যেই অম্বিকের আসল রূপ সামনে এল। অম্বিক নীতাকে বিয়ে করেছিল কেবল তার রূপ দেখে। রূপে মজে গিয়ে নয়! বরং নীতার রূপকে কাজে লাগিয়ে নিজের কাজ হাসিল করার মতলবে। নিজের প্রমোশনের জন্য নীতাকে বসের কাছে ঠেলে দিত। নীতা রাজি হয়নি। কিন্ত অম্বিকের মার আর অত্যাচার তাকে বাধ্য করল অম্বিকের কথা মানতে।
    নীতার রূপের মোহতে অম্বিকের বসও মাঝেমাঝেই বাড়িতে আসতে লাগল। প্রথম প্রথম একটু চটুল কথা। হাতে হাত রাখা। পার্টিতে বসকে নিজের কোমরে হাত দিয়ে নাচতে অনুমতি দেওয়া বা তার প্রিয় ড্রিংকটা হাতের সামনে এগিয়ে দেওয়াতেই খুশি ছিল অম্বিকের বস। তাই অম্বিকও তার কাজ হাসিল হচ্ছে দেখে এতেই সন্তুষ্ট ছিল।
    কিন্ত ঐ যে কথায় আছে না, নেশা আর পাপ এদের গতি সর্বদাই ঊর্ধ্বমুখী হয়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটল না। বছর খানেক পরেই বসের চাহিদা বাড়তে লাগল। কেবল এই ছোঁয়াছুঁয়ি খেলায় তার মন ভরল না। সে এবার বিছানায় একান্তে পেতে চাইল নীতাকে। অম্বিকের কোন কিছুতেই আপত্তি নেই। কিন্ত নীতা এই প্রস্তাব শুনেই ককিয়ে উঠল। তখন সে অম্বিকের সন্তানের মা হতে চলেছে। তার এক বুক নতুন স্বপ্ন সাজিয়েছে। মা ডাক শোনার অধির অপেক্ষারত সে। অম্বিকের হাতেপায়ে পড়ল। কিছুতেই কাজ হল না দেখ নীতা এবার আত্মহত্যার ভয় দেখায় অম্বিককে। এই কথায় অম্বিক থেমে যায়। কথা বাড়ায় না। নীতা নিশ্চিন্ত হয়।
    তারপর হঠাৎই নীতার প্রতি অম্বিকের ভালবাসা আদর যত্ন বেড়ে যায়। মা হতে চলেছে বলে নীতার যত্নের ত্রুটি রাখে না সে। নীতা খানিক নিশ্চিন্ত বোধ করে । ভাবে যাক, সে তার স্বামীর ভালবাসা না পেলেও তার সন্তান নিশ্চয়ই তার বাবার ভালবাসা পাবে । যে আগত সন্তানের জন্য অম্বিকের এত যত্ন , সেই সন্তান ভুমিষ্ট হলে না জানি কি করবে অম্বিক ! সুখের দিনের ভাবনায় আবার বুক বাঁধল নীতা। কিন্ত বোকা মেয়েটা এটা জানত না যে ছল কপট এইভাবেই আসে আশা ভরসার রূপ নিয়ে।

    নির্বিঘ্নে কাটল দুটো সপ্তাহ। একদিন সন্ধ্যার সময় অম্বিক নীতাকে বলে তার বন্ধুর বাড়িতে পার্টি আছে। আর অম্বিক চায় নীতা যেন তার সাথে যায়। নীতা খুব খুশি হয়েছিল। এতদিন পার্টি মানেই অফিস পার্টি । বসের নোংরা হাতের ছোঁয়া আর লালসার দৃষ্টি দেখে এসেছে নীতা। তাই এমন ঘরোয়া পার্টিতে যাওয়ার কথা শুনে দ্বিমত করে না নীতা।
    নির্দ্বিধায় সে অম্বিকের সাথে যায় পার্টিতে। বাড়িটা ছিল অম্বিকের বসের বাগান বাড়ি । অম্বিকের ষড়যন্ত্রে সেদিন নীতার উপর সারা রাত অত্যাচার চালানোর সুযোগ পেল অম্বিকের বস ও তার কিছু বন্ধুরা। সকালে নীতা যখন ঘরে ফিরল তখন সে জীবন্ত একটা লাশ ছাড়া কিছু নয়। আমি কাজ করতে গিয়ে দেখলাম নীতার দু’পা বেয়ে বয়ে যাচ্ছে রক্তধারা। সব কথা শুনে শিউরে উঠলাম আমি । বুঝলাম নীতার গর্ভপাত হয়েছে। আমি আকুল হয়ে কাঁদলাম। কারণ আমি তো জানি নীতার কত আশা ছিল এই সন্তানকে নিয়ে। কিন্ত অদ্ভুত, নীতার চোখে এক ফোঁটা জল নেই। যেন একটা মৃতদেহ।
    অনেকক্ষণ পর আমাকে নীতা বলে, “পম্পাদি একটু বিষ এনে দিতে পার ? ভাল বিষ, যেন আমার সম্পর্কের মতো ভেজাল না হয়। অনেক পুণ্য করার বৃথা চেষ্টা করলাম। এবার পাপ করতে চাই। ঐ জানোয়ারটাকে যদি আমি নিজে হাতে শাস্তি না দি তবে আমার সন্তান যেখানেই থাকুক শান্তি পাবে না।”
    আমারও মনে জেদ চেপে গেল। বললাম নিশ্চয়ই দেব। আর দেরি না করে এনে দিলাম কিছু সেঁকো বিষ। আমি অজপাড়া গাঁয়ের মেয়ে আমার বিষ চিনতে ভুল হয় না। তাই বারবার সাবধান করে এলাম বড় সাংঘাতিক বিষ। কিন্ত আমি বুঝিনি নীতা অম্বিকের খাবারে বিষ দিয়ে সেই খাবার নিজেও খাবে। ও তো অম্বিকের জন্যই আনতে বলেছিল এই বিষ কিন্ত নিজে কেন খেল কে জানে?”

    চুপ করল পম্পা। মান্তুর দুচোখ জলে ভেসে যাচ্ছে। সে জেন কিছুটা আপন মনেই বলে, “নীতা কি আজ মরেছে রে? নীতা তো সেদিনই মরে গেছিল যেদিন অম্বিকের কুচক্রে তার বস আর বসের বন্ধুরা মিলে ওর শরীরটাকে বিষিয়ে দিযেছিল। সেই বিষের এত জ্বালা যে ভিতরের ছোট্ট প্রাণটাও সেই বিষ সইতে পারেনি। নীতা তবুও নিজের মতদেহটাকে টেনে বাড়িতে এনেছিল বোধহয় অম্বিককে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই। ওর কাজ শেষ করে ও নিজের শরীর থেকে মুক্তি নিয়েছে। হয়তো এই বিষাক্ত দুনিয়ার বাইরে ওর সন্তানের সাথে ওর আবার দেখা হবে!

    যদিও আত্মহত্যা মহাপাপ। কিন্ত পরিস্থিতির চাপে। আর মানসিক যন্ত্রণায় নীতা কতটা মানসিক ভাবে সুস্থ ছিল আমার তাই নিয়ে খানিকটা সংশয় আছে । তবে একটাই শান্তি যে অম্বিকের মতো একটু জানোয়ার শাস্তি পেল। ইংরেজীতে একটা কথা আছে , চোখের বদলে চোখ। আর এখানে বিষের বদলে বিষ। অম্বিক যেমন নিজের বিষ দিয়ে নীতার জীবনটা বিষিয়ে দিয়েছিল ঠিক তেমনই নীতা অম্বিকের খাবারে বিষ মিশিয়ে শাস্তি দিল তাকে।

  • গল্প

    গল্প – কলিকালে

    কলিকালে
    -শচীদুলাল পাল

    স্নিগ্ধ বাতাসে ও ভোরের আলো এসে চোখে লাগতে ঘুমটা ভেঙে গেলে অনিরুদ্ধ দেখলো ঘরের দরজা খোলা।
    বিছানা থেকে নেমে ঘর, উঠান, বেড়ার ধার, রাস্তা খুঁজে স্ত্রীকে না দেখতে পেয়ে চিন্তিত মনে বিছানায় বসে ভাবতে লাগলো। গতকাল রাতে স্ত্রী উশ্রীর সাথে কথাকাটি হয়েছিল।
    — আমি এ বাড়িতে থাকবো না। তোমার সাথে ঘর করবো না।
    — আমি তোকে ভালোবাসি।
    — ভাত কাপড় দেবার মুরোদ নেই শুধু ভালোবাসি বললেই চলবে।
    — আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। কিন্তু কি করবো বল। আয় কিছুতেই বাড়ছে না। বাড়ি বাড়ি টিউশনি করে, ঘরে ঘরে পেপার দিয়ে কতটুকু আয় হয়!
    কিন্তু উশ্রী যে কোথায় গেল!
    এভাবে দিন দুয়েক কেটে গেল। অনিরুদ্ধ ভেবেছিলো হয়তো কোথাও আত্মীয়স্বজনের কাছে গিয়েছে, ফিরে আসবে। কিন্তু উশ্রি আর ফিরে আসেনি।

    আজ থেকে বছর দুয়েক আগে একদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে টিউশন সেরে ফেরার পথে এক গাছ তলে দেখা হয়েছিল উশ্রীর সাথে। বছর ষোলোর কুমারী সদ্য যৌবনা সুন্দরী উশ্রী কোলে বাচ্চা নিয়ে কাঁদছে।
    কৌতুহল বশত কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে বলেছিিল,
    — আমি এক পুরুষের লালসার শিকার। আমি গরীব বিধবা মায়ের সন্তান। পেটের দায়ে এক বাড়িতে কাজ করতাম। আমার তখন চৌদ্দ বছর বয়স।সে বাড়ির মালিক আমাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাকে সম্ভোগ করতো দিনের পর দিন। সে অনেক টাকা দিতো। হাভাতে অবস্থা থেকে আমাদের অবস্থা সচ্ছল হয়েছিল। কিন্তু যখন পেটে বাচ্চা এলো তখন ওই শয়তানটা বলেছিল,
    — বাচ্চাটাকে অন্য কোথাও অন্য শহরে জন্ম দে। অনেক টাকা দেব। তোকে বিয়ে করব। মালিকের কথামতো অন্য শহরে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে মা ও আমি থাকতাম। সেখানেই জন্ম হলো আমার বাচ্চার।
    তারপর আমি ও মা একদিন বাচ্চা নিয়ে তার কাছে গেলে ‘বেশ্যা মাগী” বলে লাথি মেরে দূর করে দিলো। এখন আমার মাথার উপর এক বিরাট বোঝা। আমি অন্ধকার দেখছি। আমি বাচ্চটার মোহে আত্মহত্যা করতেও পারছিনা।

    আমি তখন দয়া পরবশ হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম,
    — আমি তোকে আত্মহত্যা করতে দেব না। আমি তোকে আশ্রয় দেব।
    — কিন্তু কুমারীর এই সন্তান কি তোমার পরিবার মেনে নেবে?
    — আমি তোকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দেব।
    আমি উশ্রী আর তার সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে গেলাম। মা-বাবা দাদা-বৌদি ভাইপো-ভাইজিকে নিয়ে আমাদের পরিবার। পরিবারের সবার সামনে ঘটনাটা খুলে বললাম। সব শুনে তারা কেউ ঠাঁই দিতে রাজি হলো না। বাবা বললো,
    — এই বেশ্যা মেয়েকে আমার ঘরে আশ্রয় দেব! তুই ভাবলি কি করে! মেয়েটাকে ত্যাগ কর। ছেড়ে দে।

    — তা হয়না বাবা। আমি মেয়েটাকে কথা দিয়েছি আমি বিয়ে করবো।

    — বেরিয়ে যা। কুলাঙ্গার। তোর মুখ আমি দেখতে চাই না।
    -এই বাড়ির কিছু অংশ আমার প্রাপ্য। সেখানে একটা ঘর নিয়ে থাকতে দাও। আমি আলাদাই থাকবো।
    –এই বাড়ির ত্রিসীমার মধ্যে তুই ঢুকবি না। তোকে আমি ত্যজ্যপুত্র করলাম।
    এই বলে লাথি মেরে দূর করে দিল।

    এক কাপড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বস্তিতে এক দরমার ঘরে আশ্রয় নিলাম দুজনে।
    অষ্টাদশী উশ্রী ছিলো উগ্র যৌবনা। যতো না সুন্দরী ছিল তার চেয়ে বেশি রূপসী মনে করতো নিজেকে। সাজগোজ করতে ভালোবাসতো। বাচ্চাটাকে খাটের সাথে বেঁধে সে কোথায় যেন যেত। অনেকদিন অধিক রাতে ঘরে ফিরতো। নিত্যনতুন নিজের জন্য অত্যাধুনিক সাজপোশাক বিলাস সামগ্রী কিনতো। সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমাতো। আমি কিছু বলতাম না।
    বাচ্চাটাকে যত্ন করা, দুধ খাওয়ানো,  পরিস্কার করা ইত্যাদি কাজ আমিই করতাম।
    আমার কেমন যেন একটা মায়া জন্মেগেছিল বাচ্চাটার উপর।
    একদিন রাত্রি আটটা নাগাদ ঘরে এসে দেখি উশ্রি ফেরেনি। কিন্তু বাচ্চাটা গেল কোথাায়! দুশ্চিন্তায় আমি আচ্ছন্ন হলাম। এদিক ওদিক অনেক খুঁজলাম। দেখতে পেলাম না। অনেক রাতে উশ্রী এল। মুখে মদের গন্ধ। জিজ্ঞেস করলাম,
    — তুই মদ খেয়েছিস?
    — হ্যাঁ। বেশ করেছি।
    — বাচ্চাটা কোথায়?
    — বেচে দিয়েছি।
    — মানে!
    — মানে বিক্রি করে দিয়েছি।
    এই দ্যাখো কত টাকা।
    বাঁচতে গেলে টাকা চাই। বুঝলে। আমি আমার যৌবন এমন ভাবে হেলায় তোমার কাছে গচ্ছিত রাখতে পারব না।
    — আমি তোকে আশ্রয় দিতে গিয়ে আমার মা-বাবা, সংসার, বংশ, স্থাবর- অস্থাবর সম্পত্তি সব ত্যাগ করলাম। আর তুই কিনা টাকার জন্য নিজেকে আর বাচ্চাটাকে পর্যন্ত বিক্রি করে দিলি!
    সেই থেকে বুঝতে পেরেছিলাম উশ্রী উগ্র যৌবনা দেহ স্বর্বস্ব এক মেয়ে।তার মন বলে কিচ্ছু নেই। সে আমার সাথে ছলনা করেছে।
    তবুও তাকে আমি ভালোবাসতাম।তার স্বাধীনতাকে মেনে নিয়েছিলাম।
    কোনো দিন প্রতিবাদ করিনি।
    ওর পাপের টাকা কোনো দিন ছুঁইনি। আমার স্বল্প আয়ে সংসার চালিয়েছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও একদিন আমার সংসার ছেড়ে আমার বুকে তীর মেরে কোথায় যে চলে গেলো।
    কিন্তু তার এই আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারিনি।
    বস্তির লোকেদের সাথে রঙ মিস্তিরির কাজ করি। প্রায় প্রতিদিন কাজ থাকে। কাজের মধ্যে ডুবে থেকে অতীত ভুলবার চেষ্টা করি।

    এক ধর্মীয় সংস্থার সাথে যুক্ত হলাম। সেখানে বছরভর নানান অনুষ্ঠান হতো। খুব স্বল্প সংখ্যক লোকজন আসতো। মানুষের সনাতন ধর্মের প্রতি টান একেবারে তলানিতে। একদিন এক ধর্মীয় উৎসবের অনুষ্ঠানে এক প্রবচন প্রবক্তা বলছিলেন কলিযুগ প্রসঙ্গে —

    কলিযুগ হল হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী চার যুগের শেষ যুগ। অন্য যুগগুলো হল সত্যযুগ, ক্রেতাযুগ ও দ্বাপরযুগ। বেদব্যাস রচিত বিষ্ণু পুরানে বলা হয়েছে, যেদিন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবী ত্যাগ করেছিলেন সেদিন থেকেই পৃথিবীতে কলিযুগের সুচনা হয়েছে। পুরানে আছে—
    ছলনা, মিথ্যা, আলস্য, নিদ্রা, হিংসা, দুঃখ, সুখ, ভীতি, দীনতা
    লোভ, শঠতা, ঠকবাজি, অমানবিকতা কলি যুগের বৈশিষ্ট।

    বিষ্ণু পুরান অনুযায়ী ব্রহ্মা সত্যযুগে সব কিছু সৃষ্টি করেন এবং কলিযুগে সমস্ত কিছু ধ্বংস করেন। বিষ্ণু পুরান অনুযায়ী কম ধনের অধিকারী হয়ে মানুষ এই যুগে বেশি অহংকার করবে। ধর্মের জন্য অর্থ খরচ করবে না। ধর্ম গ্রন্থের ওপর মানুষের আকর্ষণ থাকবে না।মাতা পিতাকে মানবে না।

    পুত্র পিতাকে হত্যা বা পিতা পুত্র হত্যা করতে কুণ্ঠিত হবে না। ধর্ম অনুসারে কেউ বিবাহিত থাকবে না। স্ত্রীলোকেরা নিজেকে সুন্দরী মনে করবে। ধনহীন পতিকে মহিলারা ত্যাগ করবে। আর ধনবান পুরুষরা সেই নারী গনের স্বামী হবেন।

    কলিযুগে মানুষ ধর্মের জন্য অর্থ ব্যয় না করে কেবল গৃহ নির্মাণের জন্য অর্থ ব্যয় করবে। মানুষ পরকালের চিন্তা না করে কেবল অর্থ উপার্জনের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। কলিযুগের নারীরা সাধারণত স্বেচ্ছাচারিণী ও বিলাস উপকরণে অতিশয় অনুরাগিণী হবে এবং পুরুষেরা অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন করতে অভিলাষী হবে।

    অসমর্থ মানুষেরা ধনহীন হয়ে পেটের জ্বালা ও ক্লেশ ভোগ করবে। কলিযুগে মানুষ যা কিছু ভোজন করবে। কলিকালে স্ত্রীলোকেরা নিতান্তই লোভী হবে, বহু ভোজনশীলা হবে। মহিলারা অনায়াসে পতি আজ্ঞা অবহেলা করবে।

    নারীরা নিজের দেহ পোশাকে ব্যস্ত থাকবে, কঠোর ও মিথ্যা কথা বলবে। কলিকালে চোদ্দ থেকে ষোল বছরের বালকরা সহবাসে, বারো থেকে চোদ্দ বছরের বালিকারা সন্তান প্রসব করবে। কলিকালে মানুষের বুদ্ধি অতি অল্প হবে, তাদের ইন্দ্রিয় প্রভৃতি অতিশয় অপবিত্র হবে।

    যখন পাষণ্ড লোকের প্রভাব অত্যন্ত বাড়বে তখন সমাজের ভালো লোকেরা কোন দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকবে না। সুন্দরী স্ত্রী যার তার সাথে বন্ধুত্ব করবে।

    একদিন কাজ শেষ করে ঘরে ফিরছি।দেখলাম পাড়ারই এক বাড়ির সামনে জটলা। বাড়ির মালিক মারা গেছে। তার শব পড়ে আছে।
    মৃতদেহ স্টিফ হয়ে গেছে। সকাল থেকে বেশ কয়েকজন ডাক্তার এসে ফিরে গেছে। কেউ ডেথ সার্টিফিকেট দিচ্ছে না।
    লোকটা ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত ছিল। ঘরে স্ত্রী, যোয়ান মেয়ে ও ছেলে।
    লোকে বলাবলি করছে, লোকটার ছেলেটা বোনের সাথে এক বিছানায় শুতো। ঘনিষ্ঠ হয়ে মিলিত হতো। লোকটা প্রতিবাদ করতো। তীব্র প্রতিবাদ করায় গতকাল রাতে তুলকালাম ঝগড়াঝাটি হয়েছে। পাড়ার লোকেরা শুনেছে। অবশেষে গতকাল রাতে স্ত্রী পুত্র কন্যা মিলে গলা টিপে লোকটাকে মেরে দিয়েছে। সকালবেলা শুনলো লোকজন রাতে চলে গেলে এক হাতুড়ে ডাক্তার এসে অনেক টাকা নিয়ে নরম্যাল ডেথ সার্টিফিকেট দিলে পাড়ার লোকজনের সহায়তায় রাতারাতি শ্মশানে নির্বিঘ্নে দাহ সম্পন্ন করেছে।

    আমি রঙ মিস্ত্রির কাজ করি এক বড়ো প্রমোটারের অধীনে। একদিন এক নির্মিয়মান ফ্ল্যাটে কাজ করছি। হঠাৎ অত্যাধুনিক সাজে স্বল্পবাস পরিহিতা এক মেয়ের উপর নজর পড়লো। গাড়ি থেকে নামছে। সাথে এক মধ্য বয়সী ধোপদুরস্ত লোক। দূর থেকে দেখলেও চিনতে কোনো অসুবিধা হয়নি। ওইতো উশ্রী।  ফর্সা সুন্দরী উশ্রী আরও সুন্দর হয়েছে। পরিপুষ্ট নির্মেদ শরীর। শরীরে এক চমক, এক মাদকতা। এই দুবছরে অনেক পরিবর্তন।
    পাশের এক বিল্ডিংএ যাচ্ছে।
    উশ্রী অশালীন পোশাকে লোকটার ঘনিষ্ঠ হয়ে এক ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়লো। আমি দূর থেকে নিয়মিত অনুসরণ করে ও আবাসনের এক সিকিউরিটি গার্ডের সাথে ভাব করে জানতে পারলাম —
    উশ্রী এক নষ্ট মেয়ে শুধু নয় এক চিটিংবাজ। এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে তার শিশু পুত্রটিকে অনেক টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছিলো। পরে বেইমানি করে জোর জবরদস্তি করে শিশুটিকে ছিনিয়ে এনে অন্য একজনকে মোটা টাকায় বিক্রি করে। ফ্ল্যাট কিনেছে, গাড়ি কিনেছে। বহু টাকার মালকিন। এখন সে এক কুখ্যাত মাফিয়ার রক্ষিতা। অশিক্ষিত মাফিয়াটি এ অঞ্চলের বেতাজ বাদশা। তার এই প্রকাশ্য ব্যভিচার এই আবাসনের সবাই সহ্য করতে বাধ্য হয়েছে।উশ্রীকে সবাই ভয় করে।
    -আচ্ছা। ওই যে লোকটা উশ্রীকে নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকলো সেই কি মাফিয়া?
    –না। উনি মাফিয়া নন। উনি এক বিখ্যাত শিল্পপতি। উশ্রীর নতুন শিকার।
    -কেউ কিছু বলে না?
    -বলবে কি? এখন উশ্রী ধন ও মদমত্তে গর্বিত এই হাজার ফ্ল্যাট সমৃদ্ধ আবাসন সোসাইটির প্রেসিডেন্ট। তার অঙ্গুলিহেলনে সবাই উঠবোস করে।

  • গল্প

    গল্প- শীতল পরশ

    শীতল পরশ
    – মুনমুন রাহা

     

    আজ রায় বাবুদের বাড়িটা সেজে উঠেছে আলোয় আলোয়। আনন্দমুখরিত পরিবেশ। সবাই এমন এলাহি আয়োজনে ধন্য ধন্য করছে। পাড়া প্রতিবেশি থেকে আত্মীয়, সবার মুখেই ভেনু থেকে মেনুর প্রশংসা। হবে নাই বা কেন রায়বাবুর একমাত্র ছেলে নীলাদ্রির বৌভাত আজ । রায়বাবু যে বিস্তর সম্পত্তির মালিক তা সবাই জানে তাই তার ছেলের বিয়েতে এমন আয়োজনই প্রত্যাশিত।
    কেবল আয়োজন দেখেই নয়, লোকে প্রশংসা করছে নীলাদ্রির বৌ তাপসীরও। রঙে , রূপে, শিক্ষায় সব কিছুতেই অসামান্য সে। নীলাদ্রি আর তাপসী, যেন মেড ফর ইচ আদার। কেবল নীলাদ্রি আর তাপসীই নয় মিল আছে ওদের পরিবারেও। নীলাদ্রির মতো তাপসীরাও খুব বড়লোক। কানাঘুষো এটাও শোনা যাচ্ছে বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়েকে নীলাদ্রির বিয়ে করার কারণ হচ্ছে তাপসীর বাবার সম্পত্তি। যার মালিক হয়তো ভবিষ্যতে বকলমে নীলাদ্রিই হবে।
    অতিথিরা ফিরে গেছে যে যার বাড়ি। তাপসী ফুলের সাজে অপেক্ষা করছে নীলাদ্রির জন্য। প্রথম রাতের উত্তেজনা আর ভয় দুটোই গ্রাস করছে তাকে। ঘরে এসে ঢুকল নীলাদ্রি । তার অবশ্য তেমন ভয় বা উত্তেজনা কোনটাই নেই। কারণ সে বিছানায় এর আগেও বহুবার খেলেছে। সে এবিষয়ে পাকা খেলোয়াড়। আস্তে আস্তে সে এগিয়ে যায় তাপসীর দিকে। মুখটা তুলে ধরে তারপর তার কোমোল ঠোঁটে একটা গভীর চুম্বন এঁকে দেয়। তাপসী তার জীবনের প্রথম পুরুষের ছোঁয়াতে কেঁপে ওঠে। লজ্জায় রাঙা হয়ে নীলাদ্রির বুকে মুখ লুকায়।

    নীলাদ্রি আরও শক্ত করে তার বাহুডোর। নীলাদ্রির হাত খেলা করে তাপসীর পিঠের উপর আস্তে আস্তে নামতে থাকে হাত শিরদাঁড়া বেয়ে কোমর পর্যন্ত আসতেই তাপসী হাত সরিয়ে দেয় নীলাদ্রির। লজ্জায় আরক্ত হয়ে বলে, চেঞ্জ করে আসি। নীলাদ্রি আরও একবার বুকে টেনে নেয় তারপর পকেটে রাখা হীরের আংটিটা পরিয়ে দেয় তাপসীর অনামিকাতে আর হাতে একটা প্যাকেট দেয়। বলে, আজকের রাতের জন্য স্পেশাল নাইট ড্রেস। তাপসী হেসে চলে যায় বাথরুমে চেঞ্জ করতে।

    নীলাদ্রি ব্যালকনিতে এসে একটা সিগারেট ধরাল। মনটা তার ভারী ফুরফুরে লাগছে আজ। সুন্দরী বৌ আর সাথে তার অগাধ সম্পত্তি, আর কি চাই জীবনে। হঠাৎই ঘরের লাইটটা অফ হয়ে যায়। নীলাদ্রি দেখে রাস্তার আলোগুলো সবই জ্বলছে কেবল অন্ধকারে ঢেকে গেছে তার ঘরখানা। নিশ্চয়ই শর্ট সার্কিট। দেখতে যাবে বলে ব্যালকনি থেকে ঘরে আসে। ঘরের বাইরে বেরোনোর আগেই পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে একটা মেয়েলি হাত, হাতটা হীম শীতল। বোধহয় সবে স্নান সেরেছে বলে । নীলাদ্রি ঘুরে দাঁড়ায়। অন্ধকারে ভাল করে না দেখা গেলেও রাস্তার আবছা আলোয় বোঝা যাচ্ছে নীলাদ্রির দেওয়া লাল ফিনফিনে নাইট ড্রেসটা। নীলাদ্রি আর দেরি করে না । তাকে কোলে নিয়ে সোজা বিছানায় চলে যায়।
    নীলাদ্রি বিছানায় নিয়ে গেলেও নীলাদ্রি কিছু করার আগেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ে নীলাদ্রির উপর। ঠান্ডা হাতটা দ্রুত নিরাভরণ করে নীলাদ্রিকে। তারপর দখল নেয় তার শরীরের উপর। এক মিনিট, দুই মিনিট, পাঁচ মিনিট… ছিটকে উঠে নীলাদ্রি একি! এ ছোঁয়া যে তার বড় চেনা। এই স্পর্শ সে তো ভুল করবে না! এ যে নয়নার স্পর্শ। এই উন্মাদনা তো নয়নার স্পর্শে সে পেত! কিন্ত নয়না! কিভাবে, কিভাবে সম্ভব! এবার দিল্লী থেকে পাকাপাকি কোলকাতায় আসার সময়েই তো নিজের হাতে গলা টিপে মেরে এসেছে নয়নাকে। বডিটারও ঠিকানা লাগিয়ে এসেছে। তাহলে , তাহলে! এসব কি হচ্ছে!

    ভাবনার মধ্যেই ঠান্ডা শরীরটা আবার দখল করেছে নীলাদ্রিকে। নীলাদ্রি চাইলেও নিজেকে ছাড়াতে পারছে না। অতিমানবিক শক্তির কাছে পরাস্ত সে। তার সর্বাঙ্গ লেহন করছে সাপের মতো ঠান্ডা শরীরটা। নীলাদ্রির মনে পড়ে ঠিক এইভাবেই নয়নাকে আদর করতে বাধ্য করত নীলাদ্রি। প্রথমে সে আদর করত নয়নাকে তারপর নয়নাকে বলত তাকে এইভাবে আদর করতে। নয়না লজ্জা পেত, সংকোচ করত। কিন্ত নীলাদ্রি বলত এই খেলাতে কেবল ছুঁতে ভাল লাগে না অন্যজনের ছোঁয়াতেও ভালো লাগে।

    নীলাদ্রিদের দিল্লীর অফিসে মাঝারি পোস্টে চাকরি করত নয়না। প্রথম দিকে তেমন ভাবে নীলাদ্রির নজরেও পড়েনি সে। একদিন বৃষ্টির রাতে অফিসের বাইরে নয়নাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লিফট্ দেয় নীলাদ্রি। অফিসের বসের যাচা লিফট্ অগ্রাহ্য করার মতো ক্ষমতা ছিল না নয়নার। তারপর নীলাদ্রি শুরু করে তার প্রেমের অভিনয়। যা এর আগেও সে বহুবার করেছে মেয়েদের বিছানায় তুলতে। নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে নয়নার সংস্কার একটু বেশিই ছিল। তাই খানিক সময় লাগে তাকে পার্ক, রেস্টুরেন্ট থেকে বিছানায় তুলতে । নয়না বিয়ের আগে নিজেকে সঁপে দিতে চায় নি নীলাদ্রির হাতে। কিন্ত নয়না আপত্তি জানালেই নীলাদ্রি সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার ভয় দেখাত, তাতেই নয়না কাবু হয়ে যায়। কারণ নীলাদ্রি অভিনয় করলেও নয়না কিন্ত প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছিল নীলাদ্রিকে। দিল্লীতে ভালোই টাইম পাশ কাটছিল নীলাদ্রির। কিন্ত শেষের দিকে নয়না খালি ঘ্যানঘ্যান করত বিয়ের জন্য। তারপর যেদিন নয়না জানাল সে নীলাদ্রির বাচ্চার মা হতে চলেছে এবং এই বাচ্চা সে কিছুতেই নষ্ট করবে না। দরকার হলে নীলাদ্রির বাবা মাকে সব জানাবে, সেদিন আর নীলাদ্রি কোন রিস্ক নেয়নি। ততদিনে নীলাদ্রির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে তাপসীর সঙ্গে। নীলাদ্রি বোঝে নয়নার এই পদক্ষেপে বাধা পড়তে পারে তাপসীর সাথে বিয়েটা। তাই নয়নাকে সেই রাতেই গলা টিপে মারে সে।

    নীলাদ্রির ঘুম ভাঙাল তাপসীর ডাকে। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে তাপসী বলে, ওঠো এবার, নীচে সবাই আমাকে কত খ্যাপাচ্ছে জানো, তুমি বেলা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছ বলে! মুখে একটা দুষ্টু হাসি খেলে যায় তাপসীর। নীলাদ্রি তাপসীর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বলে, আচ্ছা কাল রাতে তুমি কিছু টের পেয়েছিলে? মানে, কাল রাতে কি হয়েছিল মনে আছে তোমার? তাপসী হেসে বলে, না গো কিচ্ছু মনে নেই। কাল এত ক্লান্ত ছিলাম কখন যে বাথরুম থেকে ঘরে এসেছি আর ঘুমিয়ে পড়েছি মনেই নেই। সকালে দেখলাম তুমি পাশে ঘুমাচ্ছ ! নীলাদ্রির মাথায় কিছু ঢুকছে না। তাহলে কি হল কাল রাতে! তার যে অনুভূতি সেগুলো কি তবে সব কল্পনা! কিন্ত কল্পনা এত স্পষ্ট হয় কি?
    মনের সব দ্বন্দ্ব কাটিয়ে রাতের ঘটনাটা কল্পনা বলেই মেনে নেয় নীলাদ্রি। সকালটা ভালোই কাটে। কোন অস্বাভাবিকতার লেশ মাত্র নেই। তাই নীলাদ্রি আরও নিশ্চিত হয় রাতের ঘটনা কল্পনা ছাড়া কিছু নয় বলে। কিন্ত রাতে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। সেই অন্ধকার, সেই লাল ফিনফিনে রাত পোষাক, সেই ঠাণ্ডা শরীরের ছোঁয়া, সেই সাপের মতো সর্বাঙ্গ লেহন, নীলাদ্রির শরীরের উপর ঠান্ডা শরীরটার আধিপত্য বিস্তার। তাপসীর রাতের কোন স্মৃতি না থাকা। একরাত নয় দু’ রাত নয়, প্রতিরাতে একই ঘটনা ঘটতে থাকে। কিন্ত সমস্যা হল নীলাদ্রির এই কথা কেউ বিশ্বাস করে না। সবাইভাবে নীলাদ্রি ভুল বকছে। আর তাপসী নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত থাকে তাই কখন ঘুমিয়ে পড়ে খেয়াল থাকে না তার। অবশ্য তাপসীর নিজেরও তাই ধারণা। শুধু ওর একটাই অস্বাভাবিকতা লাগে প্রথম রাতে নীলাদ্রির দেওয়া নাইট ড্রেসটা এত করে খোঁজার পরও খুঁজে পায় না সে।

    কেটে গেছে একটা বছর। এই একটা বছরে পাল্টে গেছে অনেক কিছু। নীলাদ্রি এখন বদ্ধ উন্মাদ। তাপসীর সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে তার । নীলাদ্রি যতবার রাতের অভিজ্ঞতার কথা তাপসীকে বলেছে ততবারই তাপসীর মনে হয়েছে নীলাদ্রির মাথায় নিশ্চয়ই কোন দোষ আছে। নীলাদ্রি প্রতিরাতের অত্যাচারে আর সবার অবিশ্বাসে দিশেহারা হয়ে পড়ে। আস্তে নীলাদ্রির আচরণে পাগলামোর লক্ষণ দেখা যায়। নীলাদ্রিকে নিয়ে ওর বাবা সাইকোলজিস্টের কাছেও গিয়েছিল কিন্ত লাভ হয় নি কিছু। ডাক্তারের দেওয়া কড়া ঘুমের ওষুধেও ঘুম হয় না তার। এখনও প্রতিরাতে তাকে সহ্য করতে হয় ঐ ঠান্ডা শরীরের ছোঁয়া। সেই ছোঁয়া যেন প্রতিরাতে নীলাদ্রিকে বুঝিয়ে দেয় অযাচিত ভাবে ছুঁলে ঠিক কেমন লাগে। প্রতিরাতে নীলাদ্রিকে শাস্তি পেতে হয় তার কৃতকর্মের। কতদিন পেতে হবে তা জানা নেই, হয়তো আজীবন নীলাদ্রিকে ভোগ করতে হবে ঠান্ডা শরীরের স্পর্শ।

  • গল্প

    গল্প- জিজীবিষা

    জিজীবিষা
    -লোপামুদ্রা ব্যানার্জী

     

     

    তিন টে দিন কেটে গেল তবু রুমকির একটা খবর পেলাম না।যখনই ফোন করছি তখন ই ফোন সুইচ অফ বলছে। অগত্যা দুশ্চিন্তা ছাড়া আমার হাতে আর কিছু রইল না।
    আমার পতিদেব বরুন কে বললাম,হ্যাঁ গো তুমি আমাকে একবার রুমকির জেঠুর বাড়িতে নিয়ে যাবে।
    বরুন বলল, রুমকির জেঠুর বাড়িতে কেন যাবে তুমি?
    _ ও মা তোমাকে তো বলাই হয় নি যে রুমকি ওর বাবা মায়ের কাছে থাকে না। থাকে না বললে ভুল বলা হবে। বরং বলতে পারো ওর মা মানে ওর সৎ মা থাকতে দেয় না।
    জানো রুমকি বলছিল ওর সৎ মা প্রতি মাসে ওর থেকে পাঁচ ঘরে কাজ করে যা পায় ।সেই টাকা টুকু ও কেড়ে নিয়ে নেয়। তার ওপর ঠিকঠাক করে খেতে পর্যন্ত দেয় না।
    তবে রুমকির জেঠিমা টা ভালো। সকালের টিফিন,ভাত তো এর ওর ঘর থেকে খেয়ে নেয়। শুধু রাতের খাবার টুকু আর শোওয়ার জায়গা টুকুর জন্য জেঠিমার কাছে কাছে রুমকি।
    বরুন বলে,কত আর মেয়েটার বয়স হবে।এই বয়স থেকে কত সংগ্ৰাম করে বাঁচছে। তবে ওদের এই ধরনের জীবন সংগ্ৰাম গুলো ওদের কে বড্ড তাড়াতাড়ি স্বাবলম্বী হতে শেখায়।
    তা যা বলেছো।রুমকি গত মাসে আঠারো তে পা দিয়েছে। সেদিন আমাকে জিজ্ঞাসা করছিল,বীথি দিদি পোস্ট অফিসে বই খুলতে গেলে কি করতে হয় গো?
    তাই নাকি? বাঃ রুমকি তো চালাক চতুর ও আছে।
    আমি মুখ টিপে হেসে বললাম,চালাক বলে চালাক।ওর জেঠু তুতো দিদির দেওরের সঙ্গে প্রেম ও করছে।যদিও বাড়িতে কেউ কিচ্ছুটি জানে না।
    বল কি গো! তবে আর রুমকি কে নিয়ে চিন্তা করো না। রসিকতা করে বলল বরুন।

    মানে ভ্রু জোড়া বেঁকিয়ে বললাম,মানে?
    মানে অতি সোজা।রুমকি বিয়ে টিয়ে করে বসে নি তো?
    আমি রীতিমতো লাফিয়ে উঠে বললাম,এই রে বাবা। তাহলে আমি এখন কি করব? তিন দিন তো হয়েই গেল।আর কদিন রুমকির পথ চেয়ে বসে থাকবো।প্লিজ লক্ষ্মী টি। আমাকে আজ সন্ধ্যা বেলায় একবার নিয়ে চলো ওর জেঠিমার বাড়ি। ইচ্ছে তো করছে তুমি অফিস বের হলেই আমি বেরিয়ে পড়ি ওর জেঠুর বাড়ির উদ্দেশ্যে। কিন্তু আমি তো কোনদিন ও নীচু পাড়ায় যাই নি।ওর জেঠুর বাড়ি টাও চিনি না।
    ঠিক আছে ঠিক আছে।এত উতলা হয়ে লাভ নেই।আমি অফিস থেকে ফিরে এসে তোমাকে নিয়ে যাবো ক্ষণ।
    বরুন অফিসে বের হয়ে গেলে আমি আবার রুমকির নাম্বার টা ডায়েল করলাম। অপর প্রান্ত থেকে রিং আওয়াজ শুনতে পেয়ে আমার হৃদ যন্ত্রটা যেন লাফাতে শুরু করলো।
    কিন্তু আমার আনন্দ নিমেষে নিরানন্দে পরিনত হল। রিং হয়ে হয়ে ফোন টা থেমে গেল।যেমন অন্ধকারে ছিলাম ঠিক তেমনি অন্ধকারে রইলাম।
    ঘর দোর পরিষ্কার করে স্নান সেরে পূজায় বসলাম।ফুল দিয়ে ঠাকুর কে সাজাতে সাজাতে আবার মনে পড়ল রুমকির কথা।এর ওর বাড়ি থেকে আমার জন্য পলিথিন ভরে শিউলি ফুল কুড়িয়ে আনতো।আর বলত,দিদি আমার তো নিজের ঘর নেই যে ঠাকুরের আসন পারবো। আমার হয়ে তুমি ই ফুল গুলো ঠাকুর কে দিয়ে দিও।
    আমি বেশ বুঝতে পারতাম রুমকির একটা নিজস্ব ঘরের লোভ আছে। ছোট থেকেই আশ্রিতা হয়ে কাটছে যে ওর জীবন। আশ্রিতা দের জীবনে ভালোবাসা কম অনুকম্পা থাকে বেশি।
    পূজো সেরে সোফায় বসে একটা মাসিক ম্যাগাজিন পড়ছিলাম। হঠাৎ আমার মোবাইল টা বেজে উঠলো।স্ক্রীনে ফুটে উঠল রুমকির ছবি ও নাম।
    তাড়াতাড়ি পত্রিকা টা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মোবাইল টা হাতে তুলে নিয়ে বললাম,হ্যালো
    অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো, দিদি আমি রুমকি বলছি।
    হ্যাঁ রে রুমকি তোর ব্যাপার কি? শরীর ঠিক আছে তো?
    হ্যাঁ দিদি শরীর ঠিক আছে।
    তাহলে তিন দিন ধরে কাজে এলে নি না কেন?
    একটু একটু আমতা আমতা করে রুমকি বলল,দিদি আমি বিয়ে করে ফেলেছি।
    বলিস কি রে!তা কাকে বিয়ে করলি?
    তোমাকে বলেছিলাম না আগে। আমার জেঠ তুতো দিদির দেওরের কথা।ওকেই বিয়ে করলাম।
    এ তো খুব আনন্দের খবর রে।
    না দিদি আনন্দ করে তো আর বিয়ে টা করতে পারলাম না।
    মানে?
    আসলে আমরা বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে মন্দিরে চুপিচুপি বিয়ে টা করলাম।
    কেন রে? তোর জেঠুর মেয়ে তো সব জানতো তোদের ব্যাপারে।
    দিদি আর কি করবে? দিদি ওর শাশুড়ি কে বলেছিল আমাদের সম্পর্কের কথা। তাই শুনে বুড়ি বলল, আমার ছোট ছেলের বিয়ে তে আমার পঞ্চাশ হাজার টাকা বর পণ চাই। তবেই তোমার খুড়তুতো বোন কে আমি ঘরে তুলব।
    তারপর?
    তারপর আর কি। আমার বাবা তো থেকে ও নেই।জেঠু ও বললো , আমার পক্ষে এতগুলো টাকা বর পণ দেওয়া সম্ভব নয়। তখন আমার বর অজিত একটা উপায় বের করল।
    কি উপায়? অবাক হয়ে বললাম আমি?
    অজিত বলল,রুমকি চল আমরা ঘর ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করি। তাহলে তো আর বর পণ দিতে হবে না।তারপর কোথায় ঘর ভাড়া করে থাকবো।
    আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, আমার মতো অভাগী কে বিয়ে করার জন্য কোনো ছেলে নিজের ঘর ও ছাড়তে রাজি ! সেদিন রাতে জেঠিমার ঘরের মেঝেতে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম আমার করনীয় কি? আকাশ পাতাল ভাববার পর ঠিক করলাম, আমার আবার জেঠুর ঘর ছাড়তে ভয় কিসের? নিজের সব খরচ নিজেই করি। শুধু রাত টুকু জেঠুর বাড়িতে ঠাঁই নিই।
    আমি জিজ্ঞেস করলাম,রুমকি এখন কোথায় আছিস তাহলে?
    দিদি দূর্গাপুর ইসটেশনের কাছে যে বস্তি আছে সেখানে একটা ঘর ভাড়া নিয়েছি।
    তা বেশ।তাহলে আগামীকাল একবার আয় বর কে নিয়ে।দেখা করে যাস একবার।
    পরেরদিন অজিতের সাইকেলের সামনে বসে রুমকি এলো আমাদের বাড়িতে। সিঁথি তে মোটা সিঁদুর,হাতে শাঁখা পলা পরে কি সুন্দর দেখাচ্ছে যেন রুমকি কে।
    রুমকি একগাল হেসে আমাকে বলল,দিদি আমাকে বউ এর সাজে কেমন দেখাচ্ছে?
    আমি ও রসিকতা করে বললাম,তোর বর এখন ও বলে নি মনে হচ্ছে।
    রুমকি মুচকি হেসে বললো,ওর তো দুচোখে এক প্রেম ঝরছে।না হলে আমার মতো মেয়েকে বিয়ে করতো।
    অজিত লাজুক হাসি দিয়ে বললো,দিদি তোমার বোন টার মন টা পরিষ্কার নয়। কেবল ফালতু কথা বলে।
    আমি অজিত কে বললাম, রুমকি কিন্তু তোমার প্রেমে হাবুডুবু খেয়েই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে।ও এখন আর কারোর আশ্রিতা নয়।ও এখন তোমার ঘরের ঘরনী। মেয়েটাকে তোমার প্রেম দিয়ে সারাজীবন আগলে রেখ ভাই।

  • গল্প

    গল্প- আদর্শ

    আদর্শ
    – সঞ্চিতা রায় (ঝুমকোলতা)

     

    আজ ছোট্ট রাইমাকে নার্সিংহোম থেকে বাড়িতে নিয়ে যাবে তার বাবা মা। এই কয়েকদিন যমে মানুষে টানাটানি হয়েছিল ওকে নিয়ে। ডাক্তার আদর্শ সেনের তত্বাবধানে একটা অপারেশান হয়েছে। বেশ বড় অপারেশান। ওইটুকু মেয়ের পক্ষে বেশ ভয়েরই ছিল। অপারেশন সফল। জয়ীর হাসি ডাক্তার আদর্শের মুখে। একজন চিকিৎসক যখন মানুষকে নতুন জীবন দেন, তাঁর মনে যে অপূর্ব অনুভূতি হয়, সেই অপূর্ব অনুভূতিতে আদর্শ র মন ভরে যাচ্ছে। সত্যি কথা বলতে বাচ্চাটির ওষুধ, অন্যান্য দরকারী জিনিস অনেকটাই আদর্শ সেনকে কিনে দিতে হয়েছে। কারণ রাইমাদের আর্থিক অবস্থা খুবই সাধারণ। অবশ্য ‘মানবিক’ নামক এই নার্সিংহোমের এইটাই রীতি । যতটা কম খরচে রোগীর চিকিৎসা করা যায়,ততটা কম খরচেই চিকিৎসা করা হয়।
    আদর্শ সেন একজন বিখ্যাত চিকিৎসক। সবাই তাঁকে ধন্বন্তরি বলে। তাঁর চেম্বারে সব সময় রোগীদের ভীড়। তাঁর সাম্মানিক বা পারিশ্রমিক অত্যন্ত কম। করোনার সময় ও তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তিনি একজন সমাজসেবক। অভাবী মেধাবীদের জন্য তিনি একটি সংস্থা গড়ে তুলেছেন। মেধাবীই বা বলি কেন সব রকম মেধার মানুষকেই তিনি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেন। যার যা প্রতিভা আছে তিনি সেই প্রতিভা বিকশিত হতে সাহায্য করেন। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা তাঁর কাছে এলে তিনি তাদের কথা শোনেন ঠিকই, কিন্তু তাদের থেকে কোনো রকম উপহার গ্রহণ করেন না। রোগীর প্রয়োজন অনুয়ায়ী একদম কম দামের ওষুধ তিনি ব্যবস্থা পত্রে লেখেন। এ ক্ষেত্রে তিনি কোনো রকম ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি দ্বারা প্রভাবিত হন না। তাঁদের কথা তিনি শোনেন শুধুমাত্র জ্ঞান বৃদ্ধি বা বাজারে রোগীর জন্য উপকারী কি ওষুধ আছে, কি কি নতুন ওষুধ এল শুধুমাত্র সেইটুকু জানার জন্য। একবার তিনি অতি সামান্য ভিসিট বাড়ানোর কথা ভেবেছিলেন, তাঁর মা তাঁকে বলেন,জীবিকার প্রয়োজনে, জীবনের ন্যুনতম চাহিদা পূরণের জন্য তোর যা দরকার সেইটুকুই ব্যাস,তার বেশী বাড়াবি না, তুই মানুষের ডাক্তার মানবিকতার প্রতিভূ। না,ভিসিট বাড়ানো হয়নি তার। – ডাক্তারবাবু আমাদের কাগজের জন্য একটা সক্ষাৎকার চাই যদি একটু সময় দেন।
    – আমার রোগী দেখার পরে আসুন।

    -শুভ দুপুর ডাক্তারবাবু
    -শুভ দুপুর
    – অভিনন্দন ডাক্তার বাবু, আদর্শ চিকিৎসক হিসাবে সরকার আপনাকে পুরস্কৃত করতে চলেছে। – ধন্যবাদ
    – এটা কি ঠিক, আপনি খুব অল্প দামী ওষুধ দেন আর তাতেই আপনার রোগীরা সুস্থ হয়ে যায়।
    – চেষ্টা করি
    – আপনার মনে হয় না এতে ওষুধ কোম্পানিগুলোর লোকসান হতে পারে?
    – একজন চিকিৎসক হিসাবে আমার তো মানুষের কথা ভাবার কথা, রোগীদের ভালো করার কথা ভাবার কথা, তাদের সামর্থের কথা ভাবার কথা, কোনো কোম্পানির সুবিদার্থের কাজ করার কথা তো নয়।
    – তাহলে বাজারে একই কম্পোজিশনে একই রকম কর্যকরী কম দামী ও বেশীদামী দুইরকমই ওষুধ থাকে, এই কথা কি ঠিক?
    – আমি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। রোগীকে সুস্থ করার জন্য আমার যা করণীয় আমি তাই করি এবং তাই করবো।
    – আচ্ছা ডাক্তারবাবু আপনার মেয়ে ইতিহাস নিয়ে পড়ছে, আপনার মনে হয় না বিজ্ঞান শাখায় পড়লে জীবনে উন্নতি করতে পারতো, হয়তো বা ডাক্তার হতে পারতো।
    – না আমি তা মনে করিনা, আমি মনে করি প্রতিটি মানুষের সেই কাজই করা উচিৎ,যা সে ভালোবেসে করতে পারবে, ছোট থেকে ইতিহাসের প্রতি ওর অগাধ ভালোবাসা। আমি মনে করি, ইতিহাস নিয়ে কাজ করেই ও জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে।
    – তাহলে আপনার একমাত্র সন্তান ডাক্তার হল না বলে আপনার কোনো আপসোস নেই, যেখানে আপনি ও আপনার স্ত্রী দুজনেই ডাক্তার।
    – একেবারেই না, আর ও যদি ডাক্তারিতে আগ্রহীও হত, তাহলেও ওর যোগ্যতা থাকলে তবেই আমি পড়াতাম । ডোনেশান দিয়ে কখনই পড়াতাম না। আমি যোগ্যতায় বিশ্বাসী। ওর যোগ্যতা অনুযায়ী ও কাজ ঠিক খুঁজে নেবে।
    – আপনাকে সরকার একজন আদর্শ ডাক্তার হিসাবে পুরস্কৃত করতে চলেছে, আপনি খুশি? -পুরস্কারের জন্য তো কিছু করি না, মানুষ হিসাবে যা করণীয় তাই করি, তবে হ্যাঁ পুরস্কার মূল্যের ওই টাকাটা আমি মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করবো।

    -পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে আপনার মতামত?
    – প্রয়োজন হলে করাব, কিন্তু অকারণে নয়। সবাই বলে আপনার ক্লিনিকাল আই ভীষণ ভালো, অপ্রয়োজনে পরীক্ষা করান না। মৃদু হাসি, কোনো মন্তব্য নেই।
    -আপনি কি কোনো চিকিৎসক দ্বারা অনুপ্রাণিত?
    – বলতে পারেন বোলপুরের একজন ডাক্তার, যাকে মানুষ ‘একটাকার ডাক্তার’ বলতেন তাঁর দ্বারা। তাছাড়া শ্যামনগরের একজন ডাক্তার, যিনি করোনায় চলে গেলেন, আপনারা নিশ্চয় সংবাদে মানুষের তাঁর প্রতি ভালোবাসা দেখেছেন। ওই করোনাকালেও তার শেষযাত্রায় মানুষের চোখের জল নিয়ে নীরবে তার সাথে সাথে চলেছিল। বাড়িগুলো থেকে ফুল বর্ষণ হচ্ছিল । এছাড়াও আরো অনেক ডাক্তার আজও আছেন, যারা মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করেন, ডাক্তারীর স্বীকৃতি র সময় নেওয়া পণের মান রাখতে পারেন, বয়স নির্বিশেষে তারাই আমার আদর্শ।
    – আপনি কি মনে করেন এখনও এইরকম ভালো ডাক্তার অনেক আছেন?
    – নিশ্চয়, এই তো আজকের খবরের কাগজেই দেখলাম ,ট্রাফিক জ্যামে আটকে যাওয়া একজন ডাক্তার সঠিক সময়ে অপারেশন থিয়েটারে পৌঁছাবার জন্য গাড়ি থেকে নেমে ছুটে নার্সিং হোমে পৌঁছেছেন। কদিন আগে দেখলাম একজন ডাক্তার নিজে রক্ত দিয়ে একজন প্রসূতিকে বাঁচিয়েছেন। আমার প্রিয় লেখক বনফুল, যিনি নিজেও ডাক্তর ছিলেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ‘অগ্নিশ্বর’-রা বাস্তবেও আছেন।
    – যারা ডাক্তার হতে চলেছে তাদের প্রতি আপনার বার্তা!
    – মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াক, সাম্মানিক বা পারিশ্রমিকটা মানুষের সাধ্যের মধ্যে রাখুক,অনেক মানুষ শুধু অর্থের কারণে আজও ওঝা, ঝাড়ফুঁক, হাতুরড়দের কাছে যেতে বাধ্য হয়, তাদের কথা ভাবুক। চিকিৎসা ব্যবস্থাকে মানুষের সাধ্যের মধ্যে রাখার চেষ্টা করুক। সৎ ভাবে কাজ করুক।

    – সম্প্রতি আপনার মেয়েকে বোধ হয় লোভনীয় কিছু উপহার দিতে চেয়েছিল কোনো কোম্পানি, আপনার মেয়ে প্রত্যাখান করেছে একথা কি সত্যি?
    – হ্যাঁ আমি গর্বিত, ওকে আমি ছোট থেকেই শিখিয়েছিলাম স্বার্থসিদ্ধির জন্য কেউ কিছু দিতে গেলে সেটা গ্রহণ না করতে, ও আমার মান রেখেছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। তা সে যেভাবেই হোক। রক্ত বা জিন সত্যিই বোধ হয় কথা বলে। উচ্চ মাধ্যমিকে মেধা তালিকায় আছে আদর্শ সেন। ডাক্তারির জয়েন্টে এন্ট্রাস পরীক্ষাতেও প্রথম পাঁচজনের মধ্যে। কিন্তু চরম দারিদ্র্য তাদের পরিবারের। কিভাবে পড়াবে মুকুল সেন ছেলেকে ডাক্তারি! পুরো পরিবার চিন্তায়। এতদিন তো স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা খুব সাহায্য করেছেন তাকে। বাড়িতে এসে পর্যন্ত পড়া দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। না কোনো গৃহশিক্ষক বা গৃহশিক্ষিকা তার ছিল না। কোনো নামী কোচিং সেন্টারেও তার পক্ষে পড়া সম্ভব হয়নি। সম্পূর্ণ নিজের ক্ষমতায় সে আজ সফল। বাতাস কোচিং সেন্টার থেকে তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাকে শুধু বলতে হবে, যে সে বাতাস কোচিং এ পড়ে সফল, অনেক অনেক টাকা ডাক্তারী র বই সব দেবে তারা। মানিনি প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে,তাকে শুধু বলতে হবে তাদের বই পড়েই তার এই সাফল্য। বাড়ি সারিয়ে দেবে। ডাক্তারী পড়ায় আর্থিক ভাবে সাহায্য করবে। আত্মীয়দের অনেকে, পাড়া প্রতিবেশীদের অনেকেই এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে বলছে। তা নাহলে পড়বে কি করে। ছাদ ফেটে গেছে। জল পড়ছে মাথায়। দেওয়ালের জীর্ণ দশা। সামনে বিরাট অনিশ্চয়তা। কি করবে আদর্শ? বাবা মা তোমরা কি বলো?
    – তোর নাম আদর্শ রেখেছিলাম,অনেক আশা নিয়ে, জানি আমি তোকে হয়তো পড়াতে পারবো না, তবুও বলি অনেক আশায় তোর নাম আদর্শ রেখেছিলাম, বাবা বললেন। বাবার ইঙ্গিতবাহী কথা বুঝতে আদর্শর কোনো অসুবিধা হয় নি সেদিন। আর সত্যি তো সে নিজেও সততা ও সত্যের আদর্শে বিশ্বাসী । পরের দিন বাড়িতে আসা সাংবাদিকদের সে দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়ে দিল,বাবা,মা আর স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা তাকে সাহায্য করেছে, আর যে বইগুলো সে সত্যি করে পড়েছে, সেই বই গুলোর নাম বললো। আরো বললো পাঠ্যবই খুঁটিয়ে পড়া তাকে স্কুল শিক্ষক শিক্ষিকারাই শিখিয়েছে। আর স্পষ্ট জানিয়ে দিল কোনো কোচিং সেন্টারের সাহায্য সে নেয়নি। হ্যাঁ, সেদিন তার শুরুটা খুব কঠিন হয়েছিল, অনেক প্রতিকূল অবস্থার সাথে লড়াই করে আজ তিনি সফল ডাক্তার। সেদিন যে আদর্শকে তিনি জীবনের আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন, আজও সেই আদর্শ তাঁর সাথে আছে। থাকবে চিরকাল। হ্যাঁ বাবার মায়ের দেওয়া আদর্শ নাম সার্থক ।
    ( সঞ্চিতার ছোট্ট বক্তব্য- এই গল্পে ব্যবহৃত চরিত্রের নাম বা সংস্থার নাম সম্পূর্ণ কাল্পনিক । বাস্তবের সংস্থা বা চরিত্রর নামের সাথে মিল থাকলে তা অনিচ্ছাকৃত। তবে এই রকম আদর্শরা, এই রকম ভালো চিকিৎসকরা আছেন, ছিলেন ,থাকবেন আমাদের সমাজে। আর হ্যাঁ আদর্শের আদর্শ হিসাবে যে চিকিৎসকদের কথা বলা হয়েছে, তাঁরা প্রকৃতই আছেন বা ছিলেন। আর সে জন্যই সমাজটা পৃথিবীটা আজও এত সুন্দর।)

<p>You cannot copy content of this page</p>