• গল্প

    গল্প- কুয়াশা

    কুয়াশা
    -পাপিয়া ঘোষ সিংহ

     

     

    সকালে উঠে বাইরের দিকে তাকায় রুমেলা। চারিদিক কুয়াশাচ্ছন্ন। কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। এরপর বিছানা ছেড়ে আয়নার কাছে এসে দাঁড়ায় রুমি, চোখ গুলো খুব ফুলেছে তার। আসলে গতরাতে সে ঘুমোতে ই পারেনি। মাথার মধ্যে একটা কথায় ঘুরছে, কি এমন বলেছিল রুমি, যে দীপন ওরকম করে খেঁকিয়ে উঠলো??

    রুমেলা মিত্র, ইউনিভার্সিটির বাংলা এম এ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, ছোট থেকেই রুমেলা খুব শান্ত,ধীর স্বভাবের। সবার সাথে খুব ভালো ব্যবহার করার জন্য তাকে ভালোবাসে সবাই। বাবা-মায়ের আদরের রুমি জীবনে কখনও কোনো আঘাত পায়নি। বেশ আদরে, আবদারে দিন কাটতো তার,খুব রিজার্ভ হ’লেও রুমেলার বন্ধুর অভাব ছিল না। তবে একটু অন্য ইঙ্গিত পেলেই রুমেলা সেই সব ছেলে বন্ধুদের থেকে দূরেই থাকতো।

    হঠাৎ সেদিন কি হলো?? রুমি মনে মনে ফিরে গেল বছর পাঁচেক আগের সেই দিনে। খুব ঠান্ডা, রুমি তখন টিউশন থেকে ফিরছিল।একে শীতকাল,তাইতে আবার টিপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় পাশে চায়ের দোকানটায় দাঁড়ালো। সাইকেলে এই রাস্তায় রুমি রোজ‌ই যায়, এই দোকানে একদল ছেলেদের আড্ডা দেওয়া দেখতে পায়। তবে আজ সেই দল নেই। আছে একজন। এগিয়ে এসে রুমিকে প্রশ্ন- আমরা একে অপরকে চিনি?? রুমি বলে হ্যাঁ দেখেছি তো। তবে সেভাবে চেনা জানা হয়নি। অপরজন আবার বললো বন্ধু হ’তে পারি? এই বলে এক কাপ কফি এগিয়ে দিয়ে সে বললো তুমি খুব ভালো কবিতা বলো। রুমি র মুখে লাজুক হাসি। তারপর সে বললো আমি দীপন, দীপঙ্কর চ্যাটার্জি, বি-টেক ফাইনাল ইয়ার। রুমি বললো আচ্ছা। দীপন কথা বলতেই থাকে। সুন্দর, সাবলীল, আন্তরিক কথা বলা রুমিকে কেমন মোহিত করে দেয়। বৃষ্টি থেমেছে, সময় অনেক পেরিয়ে গেছে, রুমি ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ে। রুমিকে উঠতে দেখেই দীপন বলে এখনই চলে যাচ্ছো? আবার কবে দেখা হবে?? রুমি হাসে, বলে অনেক দেরি হয়ে গেছে, দেখা প্রায়ই তো হয় আসতে-যেতে। এবার দীপন এগিয়ে এসে বলে রুমেলা আমরা আলাদা দেখা করতে পারি না?? রুমেলা চুপ করে যায়। কিছু না বলেই বেরিয়ে আসে বাড়ির উদ্দেশ্যে।

    বাড়িতে আসার পর থেকেই রুমেলার কানে একটাই কথা প্রতিধ্বনিত হতে থাকে-“আমরা আলাদা দেখা করতে পারি না”? দীপঙ্কর চ্যাটার্জি হ্যান্ডসাম, কর্মদ্যোগী, ছটফটে, অদ্ভুতভাবে কথা বলে মানুষকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখে। রুমি অনেক মেয়ের কাছে দীপনের নাম শুনেছে। কেউ বলে আমাদের দীপনদা এরকম, তো কেউ বলে দীপন তো আমার খুব ভালো বন্ধু। অত্যন্ত মেধাবী, সু-বক্তা ছাত্রনেতা দীপঙ্কর চ্যাটার্জি যে এভাবে রুমেলার বন্ধুত্ব চায়বে সেটা রুমেলা কখনও ভাবেই নি। সেই ডাক তার কানে বাজছে,কেমন করে ফেরাবে সে?

    না ফেরানোর ক্ষমতা রুমির নেই, শুরু হলো তাদের আলাদা দেখা করা, কথা বলা, প্রেম-ভালোবাসা। রুমি হায়ার সেকেন্ডারি, কলেজ পেরিয়ে আজ ইউনিভার্সিটিতে। দীপন বি-টেক,এম-টেক করে বড়ো কোম্পানির অফিসার, জীবন পাল্টেছে,শহর পাল্টেছে, তবুও তাদের সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হয়নি। দু’জনে দু’জনকেই খুব ভালোবাসে। রুমির মাস্টার্স কমপ্লিট হলেই দু’জনের বিয়ে হবে।
    সম্পর্কের গভীরতা অধিকারের জন্ম দেয়।রুমির প্রতি দীপনের অধিকার রুমি সবসময়ই সাদরে মেনে নেয়। কিন্তু রুমি যদি কোনসময় দীপনকে অধিকার নিয়ে কিছু বলে দীপন মেনে তো নেয় না উপরন্তু রেগে যায়। কথা বন্ধ করে দেয়। দীপনকে ছেড়ে থাকতে পারে না বলে রুমি নিজেই মানিয়ে নেয়।

    এভাবে চলছে আজ একবছর। রুমির মনে কিছু প্রশ্ন জমা হয়। প্রশ্নহীন আনুগত্য কি ভালোবাসা? কেন এমন হচ্ছে মাঝে মাঝে? কেন দীপন ভুল বুঝছে রুমিকে? আগের দীপন তার রুমির কাছে কবে ফিরবে কুয়াশা কাটিয়ে ? মনের জমাট বাঁধা প্রশ্ন আজ প্রাক বরষার মেঘে পরিণত। রুমির মন চায়ছে বৃষ্টি নামুক। ধুয়ে দিক দুজনের মনের সমস্ত জটিলতার কালো। রুমি কে বুঝতে পারবে দীপন,অবশ্যই পারবে। রুমির ভালোবাসা তার দীপনকে ঠিক কুয়াশার চাদর থেকে বের করে আনবে ঝলমলে রোদ্দুরে।

  • গল্প

    গল্প- সাদা বেনারসি

    সাদা বেনারসি
    -লোপামুদ্রা ব্যানার্জী

    একি কাণ্ড গো! নিজের বিয়ে তে কেউ সাদা বেনারসি পরে? বেশি বয়সে বিয়ে হওয়ার জন্য ছোট পিসি মনির মাথাটা বোধহয় খারাপ হয়ে গেছে।
    হীরা পিসির মুখ থেকে এমন ব্যঙ্গাত্মক কথা শুনে আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। আমি হীরা পিসিকে বললাম, কারোর সম্বন্ধে কোনো মন্তব্য করার আগে একবার ভাবা উচিত নয় কি পিসি মনি?
    হীরা পিসি ভ্রু কুঁচকে বলল,মানে কি বলতে চাইছিস তুই বুলা? আমি কি এমন ভুল বললাম? বাঙালি ঘরের বিয়ের কনে সাদা বেনারসি পরে কি বিয়ের পিঁড়িতে বসছে কোনোদিন? আমি তো বাবা এই প্রথম দেখলাম এমন দৃশ্য তাও আমাদের মতো যৌথ পরিবারে।
    একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বললাম, হীরা পিসি ছোট পিসির সাদা বেনারসি পরার পিছনে একটা ইতিহাস আছে ।যেটা বোধহয় তোমার কান পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায় নি এতদিনে ও। ঘটনা টা তাহলে শোনো তুমি , তোমার বিয়ের বৌভাতের দিন আমি দেখি ছোট পিসি ঠাম্মা প্রায় পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে এলো বাইরে থেকে। কি ব্যাপার তা দেখতে আমি ছোট পিসির ঘরে গিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি ভিতর থেকে দরজায় খিল এঁটে দিয়েছে ছোট পিসি ঠাম্মা।আমি যদিও ঠাম্মা শব্দ টা ব্যবহার করি না।আমি শুধু ছোট পিসি বলি।
    খিল এঁটে দেওয়া র এই কথা টা শুনে রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে মেজ পিসি ঠাম্মা বিশাখা বলে উঠেছিল,সে কি কথা রে! এমন অসময়ে দরজায় খিল এঁটে দেওয়া কি কথা!
    চল তো বুলা আমার সঙ্গে তোর ছোট পিসি মনির ঘরে একবার। হঠাৎ মেয়েটার কি হলো একবার জিজ্ঞেস করে আসি।
    এই তো সন্ধ্যা বেলায় লাল বেনারসি পরে , খোঁপায় বেল ফুলের মালা জড়িয়ে কি সুন্দর করে সাজলো।কি মিষ্টি দেখতে লাগছিল আমার ছোট বোন টাকে।
    আমার দাদুরা পাঁচ বোন এবং ছয় ভাই।বড় পিসি ঠাম্মা ফাল্গুনীর মেয়ে হীরা এবং বড় দাদু মানে আমার দাদুর বড় ছেলে মানিক এবং অরুন্ধতী এরা তিনজনে সমবয়সী। আর আমি হলাম সেই মানিকের মেয়ে বুলা।
    বড় পিসি ঠাম্মার মেয়ে হীরা এবং ছোট পিসি ঠাম্মা অরুন্ধতী একসাথে পড়াশোনা করেছে একি স্কুল থেকে।মাসী বোন ঝি এর মধ্যে ছোট বেলা থেকেই পড়াশোনা নিয়ে বেশ কম্পিটিশন লেগেই থাকত।
    তবে কলেজে ওঠার পর হঠাৎ করেই হীরা পিসির বিয়ে হয়ে যায় এক অধ্যাপক পাত্রের সঙ্গে।আসলে হীরা পিসির রূপের ছটা ও দেখার মতো।যেমন ফর্সা তেমন চোখ মুখ।
    সেদিনটা ছিল হীরা পিসির বৌভাত। তাই ছোট পিসি অরুন্ধতী ঠিক করেছিল বেনারসি শাড়ি পরে বৌভাত খেতে যাবে। তাই সে তার মেজ দি বিশাখার বিয়ের লাল বেনারসি টা পরেছিল। কিন্তু হঠাৎ বাইরে থেকে কাঁদতে কাঁদতে এসে ঘরে ঢুকে দরজায় খিল এঁটে দিয়েছিল।
    মেজ পিসি ঠাম্মা বারবার দরজায় ধাক্কা মারার পর থমথমে মুখে ছোট পিসি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল। বেনারসি র ভারি আঁচল লুটোপুটি খাচ্ছে মেঝেতে। খোঁপার বেল ফুলের মালা টাও যেন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে শতরঞ্জি র ওপর। চোখের কাজল,আই লাইনার গেছে একেবারে থেবড়ে।
    অরুন্ধতীর এমন আলুথালু বেশ দেখে বিশাখা স্তব্ধ হয়ে চেয়ে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর মৃদু স্বরে বলেছিল,বোন তোর সাজগোজ এর একি অবস্থা করেছিস? সেই সন্ধ্যা বেলা থেকে রেডি হচ্ছিস।আর এখন সব নিজের হাতে ভন্ডুল করে দিলি?
    অরুন্ধতীর বক্ষদেশ এর দ্রুত ওঠানামা দেখে বেশ যাচ্ছে সে ভীষন রকমের রেগে আছে।রাগে,অভিমানে কাঁদতে কাঁদতে চোখ গুলো জবা ফুলের মতো লাল করে ও ফেলেছিল।
    বিশাখার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষন। তারপর বলেছিল,মেজ দি আমার কি অপরাধ বলতে পারিস কেন আমি হীরার ছোট মাসী হলাম?
    অস্ফুট স্বরে বিশাখা বলে,মানে?
    আমি রেডি হয়ে কনে যাত্রীর গাড়িতে বসে ছিলাম।কোথা থেকে মানিক এসে বলে, ছোট পিসি তোমার কি এমন লাল টুকটুকে বেনারসি, খোঁপায় বেল ফুলের মালা এইসব দিয়ে সাজা চলে? হীরার শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলবে কি!যতই হোক তুমি তো এখন মাসী শাশুড়ি হয়ে গেছো। শাশুড়ির সাজ কি এমন হয়?
    মানিকের কথা শুনে ওখানে আরো যারা ছিল তারা ও বলে উঠল,সব সাজগোজ এর একটা নির্দিষ্ট সীমা থাকে।বয়স যাইহোক অরুন্ধতী তুই যে এখন মাসী শাশুড়ি হিসাবে হীরার শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিস সেটা ভুলে গেলে চলবে না।
    পাশ থেকে মানিক দার বৌ বলল, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো র চেষ্টা করছে গো আমাদের অরুন্ধতী।ওর যে আদৌ কোন দিন বিয়ে হবে কিনা কে জানে? তাই বোধহয় এমন সাজগোজ করেছে আজ।
    শেষ কথাগুলো বলতে বলতে ছোট পিসি মনি আবার কেঁদে ফেলেছিল।আর সেই থেকেই ছোট পিসি মনি ডিপ কালারের শাড়ি পরা ও ছেড়ে দিয়েছিল।
    তাই বলে নিজের বিয়েতে ও এমন সাদা বেনারসি পরে বসে কেউ? দুঃখ মেশানো গলায় বলল হীরা পিসি।
    আমি বললাম, এখন বুঝতে পারি পারিবারিক সম্পর্কের গন্ডীর মধ্যে আমাদের সাজ পোশাক ও জড়িয়ে আছে যেন তাই না হীরা পিসি? অনেক পরিবারে এখন যদিও পরিবর্তন এর আলো ঢুকে পড়েছে। সেখানে শাশুড়ি,বৌমা একসাথে নাইটি, চুড়িদার পরে ।
    কিন্তু আমাদের পরিবারে এখন ও গুমোট হাওয়া। এখন ও আমরা যৌথ পরিবারের সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ততটা খুঁজি না।যতটা নিষ্ঠা খুঁজি সম্পর্কের বাহ্যিক আচার আচরণের মধ্যে।
    আমার কথা গুলো শুনে হীরা পিসি বলে,সে কি রে এত সব কান্ড হয়েছিল আমার বিয়ের সময়। বৌভাতের দিন ছোট মাসীর শরীর খারাপ হয়েছিল এটাই আমাকে বলেছিল সবাই। এত বছর পর বুঝতে পারলাম এর পিছনে অন্য গল্প ছিল।
    কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকার পর হীরা পিসি ছোট পিসির ঘরে গেল।গিয়েই ছোট পিসিকে জড়িয়ে ধরে বলল,আজ তোমার নিজের বিয়ে তে ও সাদা বেনারসি পরবে ছোট মাসী?
    ছোট পিসি লাজুক হাসি দিয়ে বলল,একে তো চল্লিশ বছরে বিয়ের পিঁড়িতে বসছি ,তার ওপর তোর বর মানে আমার জামাই ও এসেছে । সেখানে কি ভালো দেখায় শাশুড়ি হয়ে লাল বেনারসি পরে ঘুরে বেড়াতে।
    হীরা পিসি বিরক্ত হয়ে বলে,শোনো ছোট মাসী যৌথ পরিবারের এই জগা খিচুড়ি মার্কা সম্পর্কের জেরে কি নিজের শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিতে হবে নাকি।আমি শুধু মাত্র তোমার বোন ঝি হই তা নয় কিন্তু।আমি তোমার বান্ধবী ও হই।আর সেই বন্ধুত্বের জোরে বলছি,যতই তুমি সম্পর্কের দিক থেকে শাশুড়ি হয়ে যাও না কেন সাদা বেনারসি পরে নয়,লাল বেনারসি পরে ই বিয়ের পিঁড়িতে বসবে আজ।
    মনের সব দ্বন্দ্ব দ্বিধা কে দূরে সরিয়ে দিয়ে এবং হীরার মতো উদার মনষ্কা বোন ঝি কে পাশে পেয়ে অরুন্ধতী কুড়ি বছর পর আবার পরল মেজ দি বিশাখার সেই লাল বেনারসি টা।যৌথ পরিবারের জটিল সম্পর্কের সীমানা কে অতিক্রম করে অরুন্ধতী আজ ফুরফুরে মেজাজে শুরু করল তার বৈবাহিক জীবন।

  • গল্প

    গল্প- চন্দ্রপ্রভা

    চন্দ্রপ্রভা
    -সুব্রত হালদার

     

     

    ছেলেটা সেই উড়িষ্যা বর্ডার, হাতিবাড়ি থেকে উঠেছে। কোথায় নামবে তা কে জানে। কখন থেকে ভাড়া চাইছি। প্রত্যেকবারই নির্বিকারে তার দিকে তাকিয়ে আবার জানালা দিয়ে বাইরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। যাবতীয় প্রকৃতিপ্রেম কি বাসে উঠে চাগাড় দেয়। তার কথায় কোন আমলই দিচ্ছে না। মনে হচ্ছে ছেলেটার ভাবগতিক ঠিক নেই। ভাড়া মেরে দেবার ধান্ধা কি না বোঝা যাচ্ছে না। বাচ্চা ছেলে। তেরো থেকে পনেরোর মধ্যে হবে। একবার জিজ্ঞেস করেছে, তার সঙ্গে আর কেউ আছে কি না। ডাঁয়ে বাঁয়ে দু’দিকে বড় করে মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দিয়েছে তার সঙ্গে কেউ নেই। তাদের বাসটা যাবে সেই ঝাড়গ্রাম। পঁচাত্তর টাকা ভাড়া। অত টাকা মাগনা ছেড়ে দেওয়া যায় নাকি ! ওই সিটে অন্য কেউ বসলে তো পুরো ভাড়া পাওয়া যায়। তার উপর ছেলেটা তাকে কিছু বলছে না। ছেলেটাকে নিয়ে কি করবে ভেবে উঠে পারছে না। ইতিমধ্যে বেশ ভিড় হয়ে গেছে বাসে। তা সামলাতে বেশ হিমসিম খেতে হচ্ছে তাকে। একজন অপোক্ত প্যাসেঞ্জারের জন্যে ভিড়ে কাজ করতে তাকে বেশ অসুবিধা হচ্ছে। চোখ গেল সেই ছেলেটার দিকে, “এই ছেলেটা, তুই কোথায় যাবি, কখন থেকে জিজ্ঞেস করছি উত্তর দিচ্ছিস না। ভাড়া দে, ভাড়া দে !” মনে হচ্ছে এ ছোঁড়ার কাছে পয়সা নেই। তাই পকেটে হাত ঢুকছে না। বরং ওকে তুলে এই দুর্বল মানুষটাকে ওই সিটে বসালে তার সুবিধা হবে। এবার শক্ত হল কন্ডাক্টর, “এই খোকা, ওঠ সিট থেকে। ওঠ ওঠ ! আর এক মুহূর্ত তোকে সিটে বসতে দেব না। ওঠ।” তারপর অসুস্থ ভদ্রলোককে বলল, “দাদা, আপনি ওই সিটে গিয়ে বসুন।” পরিস্থিতি যে তার অনুকুলে নেই সেটা বুঝতে পারে বাবুল। কোন বিরূপতায় না গিয়ে সিট থেকে উঠে গেটের কাছে চলে আসে। কন্ডাক্টর আবার তাকে ভাড়া চাইলে চুপ করে থাকে। একটা সময় গাড়ি এসে থামে বেলপাহাড়ি পেরিয়ে বেশ খানিকটা দূরে শিলদা হাইরোডের মোড়ে। তখনই কন্ডাক্টর বাবুলের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “এই ছেলে, তোর কাছে ভাড়া নেই তো? জানিস না, ভাড়া না দিয়ে বাসে চড়া যায় না? যা, নেমে যা। সারা দিন তোদের মত কয়েকজনকে যদি মাগনা বাসে চড়তে দিতে হয় তো মালিক ফেল হয়ে যাবে। মালিক ফেল হলে আমারও চাকরি থাকবে না। তোর মত বেয়াড়াদের জন্যে আমি কাজ খোয়াতে যাবো কেন?” বলে কন্ডাক্টর ছেলেটার ডানা ধরে বাস থেকে নামিয়ে দেয়। এতে বাবুল কোন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সেইসময় বাস থেকে নামছিল এক ভদ্রমহিলা। এই ঘটনার সবটাই সে পরখ করে ছেলেটার প্রতি দয়াপরবশ হল, “এই ছেলে, তোর কাছে পয়সা নেই ? কোথায় যাবি তুই ? বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিস নাকি? পড়াশোনা করিস?” উত্তরে বাবুল বলল, “ক্লাস এইটে।”
    -মানে বাবা-মার বকাবকি খেয়ে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিস। তাই তো ? বাচ্চারা ভুল করলে বড়রা তো শাসন করবে। তাই বলে বাড়ি ছেড়ে চলে আসে কেউ ? যা। মাথা গরম না করে বাড়ি যা। কোথায় বাড়ি তোর ?
    -হাতিবাড়ি।
    -সে তো অনেক দূর রে ! সেই গোপিবলস্নভপুর পেরিয়ে আরও কত দূর ! তোর মনে বাড়ির প্রতি এত রাগ যে এই বয়সে কোন ভয়ডর না পেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিস ! তারপর নিজের ব্যাগ থেকে ছোট্ট মানিব্যাগটা বার করে সেখান থেকে টাকা বার করে বলল, এই নে, এই টাকাটা রাখ। পরোটা দোকানে কিছু টিফিন করে ফিরতি বাসে বাড়ি ফিরে যা। এই টাকায় তোর গাড়ি ভাড়া হয়ে যাবে। বলে ভদ্রমহিলা নিজের কাজে চলে যায়।
    দিদিটা তাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলল বটে কিন্তু সে কিসের টানে বাড়ি ফিরবে? মা তো তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। বলল, “যে ছেলে তার বাবাকে মারধর করে সে ছেলে কুলাঙ্গার। সে ছেলে বাড়িতে থাকার থেকে না থাকাই ভাল।” অথচ মা খুব ভাল করে জানে কেন সে বাবার গায়ে হাত তুলেছে। তবু মা তার সঙ্গে না গিয়ে বাবার হয়ে কথা বলল আর তার সঙ্গে এমন খারাপ আচরণ করল। মা তার সন্তানকে কাছে টেনে না নিয়ে মাতাল বরের হয়ে কথা বলল। তাকে দূরে যখন ঠেলে দিল তখন সে কেমন করে বাড়িমুখো হবে ? কোনদিন সে আর বাড়ির ও-মুখ হবে না। তাতে তার যা হয় হবে।
    সেই ভোর-রাতে সে বাড়ি ছেড়েছে। এতটা বেলা হয়ে গেল। পেটে কিছু পড়েনি। খিদেও পেয়েছে। দিদিটা যে টাকা দিয়েছে হাত দিয়ে পকেটে চেপে নিশ্চিত হয়ে একটা পেটাাই পরোটার দোকাছে ঢুকে জানলো এক’শ গ্রাম পরোটার দাম দশ টাকা। এই পরোটা খেলে পরে পেটে গিয়ে তা ফোলে, মানে পেটটা ভরাট হয়ে যায়। অনেকক্ষণ আর খিদে লাগে না।
    এবার বাসটায় উঠে বসার জায়গা থাকলেও বসল না বাবুল। সিটের সামনে হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে রইল। কন্ডাক্টর বসতে বলেছে কয়েকবার। তার কথা সে কানে নেয়নি। সে তো জানে বাসের ভাড়া দিতে পারবে না। তাই মাগনা সে সিট দখল করবে না। খানিক পরেই ফাঁকা সিটগুলো ভরে গেল। মনে মনে আশ্বস্ত হল, এবার আর কন্ডাক্টর বলতে পারবে না ভাড়া না দিয়ে সিট দখল করে আছে। তবু ভাড়া না দিয়ে যে বাসেই চড়া যায় না তা সে জানে। কন্ডাক্টর তাকে যেখানে সেখানে নামিয়ে দিতে পারে। ভাবতে ভাবতেই তার কাছে ভাড়ার তাগিদ এসে গেল। তার কাছে থেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে কন্ডাক্টর অন্যদিকের কাজ সেরে এসে আবার চাইল। তখন বাবুল বলল, “আমার কাছে পয়সা নেই।”
    -কোথায় যাবি ?
    -ঝাড়গ্রাম।
    -ঝাড়গ্রাম অনকটা রাস্তা। ভাড়াও অনেক। এতটা রাস্তা মুফতে আমি তোকে নিয়ে যেতে পারবো না। সত্যি কি তোর কাছে পয়সা নেই? দেখি তোর পকেট ! বলে প্যান্টের উপর চাপ দিয়ে দেখতে দেখতে বলে, এই তো পকেটে টাকা আছে খুচরো পয়সা ঝনঝন করছে। দে গাড়ি ভাড়া ?
    -না, ওই ক’টা টাকা আমার আছে। শিলদায় এক দিদি আমাকে দিয়েছে। ওটা দিলে আমার আর খাওয়া হবে না। ওটা আমি দিতে পারবো না। বলে পকেটের যে অংশে টাকা ক’টা আছে সেখানে মুঠো মেরে ধরে রাখল বেপরোয়া বাবুল।
    -ভাড়া যখন তুই দিতে পারবি না তখন আমিও তোকে বাসে চড়তে দিতে পারবো না। একটু বড় তো হয়েছিস। চোদ্দ-পনেরো হবে। পকেটে পয়সা যখন নেই খেটে খেতে পারিস না। গতর খাটালে পয়সার অভাব হয়? না লোকের মুখ-ঝাপটা খেতে হয়! এক্ষুণি নেমে যা তুই। এই লোধাশুলি মোড় এসে গেছে। নাম-নাম-নাম? গাড়ী তোর জন্যে কতক্ষণ দাঁড়াবে, নাম ?
    বাস থেকে নেমে খানিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল বাবুল। কোনদিকে যাবে বা কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। চার মাথার মোড়ের বাঁদিকের রাস্তা ধরে বাজার পেরিয়ে খানিকটা এগিয়ে যেতে যেতে বাজার শেষ হয়ে গেল। এরপর রাস্তার দুপাশে গাছগাছালি আর তার ফাঁকে মাঝে মাঝে লোকের ছোটবড় কাঁচা পাকা বাড়ি। অট্টালিকাও উঁকি মারতে দেখে সেই গাছপালার ভেতর থেকে। সামনে প্রশস্ত রাস্তা জঙ্গল পেরিয়ে দিগন্তে মুখ লুকিয়েছে। আর এগিয়ে কি বা হবে। ফিরে আসে জমজমাট দোকান-বাজার এলাকায়। একটা চা-দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চে এসে বসে। খানিকক্ষণ বসে থাকার পর দোকানির চোখ যায় ছেলেটার দিকে। ছেলেটা চা-বিস্কুট কিছু খাচ্ছে না আবার বেঞ্চ দখল করে বসে আছে। অর্ডারি খদ্দেররা বসতে পারছে না। গ্লাসে চা ঢালতে ঢালতে দোকানি বলল, “এই ছেলেটা তখন থেকে বসে আছিস। চা খাবি? না খেলে যারা খাবে তাদের বসতে দে।” শোনা মাত্র উঠে পড়ল সে। আবার উল্টো পথে বাজার ফুঁড়ে এগিয়ে চলল। এইদিকটা বাজার রাস্তার দু’ধার দিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে। ছোটবড় নানান সামগ্রীর দোকান। দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে এসেছে। ওর জানা জঙ্গল এলাকায় সূর্যমামার সতেজ বিকিরণ হঠাৎ নিভে সন্ধে নামার পথ করে দেয়। আবার ফিরে আসে চার মাথার মোড়ে। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই এদিকে প্যসেঞ্জার বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তার আগে যদি কোন বাসে চড়ে ঝাড়গ্রাম চলে যাওয়া যায় তো শহরে একটা কোথাও মাথা লুকোতে পারে।
    বাবুলের কপাল খারাপ, ঝাড়গ্রামে যাওয়ার কোন বাসই এল না। সন্ধে নেমে গেছে। খিদেও পেয়েছে। একটা চপ-ঘুঘনি-মুড়ির দোকানের সামনে এল। দোকানটায় বেশ ভিড়। ও লক্ষ্য করছে খদ্দেররা চপ-মুড়ি, ঘুঘনি মুড়ি বা মুড়ি আলুরদম কত দাম দিয়ে কিনছে। যেটা সবচেয়ে কম হবে সেটা ও কিনে খাবে। ঘুঘনি-মুড়িই সবচেয়ে কম, আট টাকা। দোকানদারকে বলল,“ঘুঘনি-মুড়ি দিন তো?” বলে অনেকক্ষণ হয়ে গেল সে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরের লোক এসে নিয়ে চলে যাচ্ছে দোকানদার তাকে আর দিচ্ছে না। দোকানদারটা একা লোক। ওদিকে আবার সে চা-ও বিক্রি করছে। সবদিকের খদ্দের ছাড়তে সে হিমসিম খাচ্ছে। তারপর খদ্দেরের খেয়ে যাওয়া এঁটো ডিশও তাকে ধুতে হচ্ছে। সেইজন্যে খদ্দেরও জমে যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে এলাকায় এই দোকানের নাম আছে। নাহলে এতটা অপেক্ষা করে লোকে মাল কিনতো না। এবার একটু গালা বাড়িয়ে অনুরোধ করে বাবুল “আমারটা দিন না। খিদে পেয়েছে” বলাতে এবার দোকানদার ভদ্রলোকের দৃষ্টি তার দিকে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে তাকে একবাটি মুড়ি-ঘুঘনি দিয়ে অন্যদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তার কাছ থেকে পয়সাও নেবার যেন সময় যেন তার নেই। অথচ এই পয়সার জন্যেই তার দোকানদারি।
    খাওয়া শেষ করে বাবুল তার এঁটো ডিশটা পড়ে থাকা অন্য ডিশের উপর রাখতে গিয়ে কেন যেন থমকে গেল! রাখল না সেখানে। কয়েক মুহূর্ত থমকে থেকে কি ভাবল কে জানে নিজেই নিজের ডিশটা ট্যাব কলের কাছে নিয়ে গিয়ে ধুয়ে অন্য ধোয়া বাসনের সঙ্গে রেখে দিয়ে পকেটে হাত ঢোকালো খাবারের দাম দেবার জন্যে।
    এত ব্যস্ততার মধ্যেও ছেলেটার আচরণ দোকানি, পান্নালালের নজর এড়াল না। মনে তার খটকা লাগল! এত খরিদ্দার আসছে খাচ্ছে ঠকাস ঠকাস করে এঁটো বাটি-ডিশ রেখে হাতধুয়ে হাতজল ঠোঁটে মুখে বুলিয়ে দাম মিটিয়ে চলে যাচ্ছে। এ ছেলের মনে কি বোধ জেগে উঠল যে সকলের একদম উল্টো পথে হাঁটল! নিশ্চয়ই ছেলেটা অন্য ধাঁচের। আর মনে হচ্ছে এ এখানকার নয়। পরিযায়ী। বাচ্চাটার কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে পয়সা নিতে গিয়েও না নিয়ে বলল, “দাঁড়া খোকা, তোর কাছ থেকে একটু পরে দাম নিচ্ছি। তোর তাড়া নেই তো? বাস তো বন্ধ হয়ে গেছে। কাছাকাছি কোথাও যাবি। এই ভিড়টা সামলে নিয়ে তোরটা নিচ্ছি।”
    খানিক অপেক্ষা করে বাবুল উপযাচক হয়ে বলল, “বাবু, আমি এই এঁটো ডিশগুলো পরিষ্কার করে দেবো?” বলেই সে বাবুর অনুমতির অপেক্ষা না করেই ডিশগুলো পাঁজা মেরে নিয়ে কলধারে গিয়ে মাজামাজি করতে শুরম্ন করল। পান্নালাল এই অপরিচিত ছেলেটাকে বাধা দেবার সুযোগই পেল না। আবার ব্যস্ততায় তার কাছে গিয়ে কিছু বলা কওয়ার সময়ও এখন তার নেই। কাউন্টারে এখনো এতটা খদ্দেরের চাপ। মনে মনে ঠিকই করে নিল, ছেলেটার সঙ্গে পরে যা কথা বলার বলবে। ও এখন কিছু বাসন ধুয়ে তাকে যোগান দিলে বরং তার দোকানদারি করার সুবিধাই হবে। সে একটু দম নিয়ে কাজ করতে পারবে। হুড়োহুড়িতে কোন খদ্দের পয়সা মেরে দিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে না। ভিড়ের সময় এমন কেস তো রোজই হয়। ছুটকোছাটকা কিছু বদ খদ্দের থাকে যারা এই ভিড়ের সুযোগটা নিয়ে খাবার খেয়ে পালিয়ে যায়। পয়সা মারার উদ্দেশ্য নিয়েই তারা আসে। ছেলেটা তার ভালই করল। এমন ছেলে তো সে কোনদিন দেখেনি ! এত বছর সে এই কারবার করছে। কোনদিন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি সে হয়নি। একটু অবাকই হল পান্নালাল।
    দেখতে দেখতে কতগুলো বছর পার হয়ে গেল। পান্নালালের বয়স প্রৌড়র সীমা পার হয়ে বার্ধক্যের পথে। আর বাবুল ভরা যৌবনে টৈটুম্বুর। মালিক আর বেশি খাটাখাটনি করতে পারে না বলে বাবুলের কাঁধে দোকান সামলানোর পুরো ভার। বাবুল ছাড়া একটা দিন দোকান চলে না। কাঁচামাল আনা থেকে মাল তৈরী করা খদ্দের সামলানো, সব দায়ভার তার উপর। সে নিজেই পান্নলালাকাকুকে খাটাখাটি করতে দেয় না। ক্যাশ সামলাবার দায়িত্ব দিয়ে মালিকের যথাযথ সম্মানের আসনে বসিয়ে রেখেছে। বাস্তবে নিজের বাবার থেকেও বেশি সম্মান এবং শ্রদ্ধার আসনে সে তার মণিবকে বসিয়ে রেখেছে। একটা দিনও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। ঘটাবে বা কেন! এই মানুষটা তাকে সেদিন আশ্রয় না দিয়ে তার জীবন কোন দরিয়ায় ভেসে যেত তা কে জানে। মালিক যেমন জানতো না একটা উটকো ছেলেকে তার দোকানে ঠাঁই দেবে আর বাবুলও একটা আশ্রয়ের খোঁছে বেপরোয়া হয়ে পড়েছিল। ঘটনাক্রম যেন কেমন করে দুই বিন্দুকে এক করে দিল।
    কত অশান্তিকে গায়ে মেখে কেবলমাত্র পড়াশোনা চালিয়ে যাবার মোহে সে দাঁতে দাঁত চেপে বাড়িতে টিকে ছিল। না হলে বাড়ির ওই পরিবেশে কোন সুস্থ মনের কেউই থাকতে পারে না। একটা ঝরঝরে সাইকেল ভ্যান টেনে সারাদিন বাবা যা রোজগার করে দিনের শেষে মদ-চুল্লু গিলে টলতে টলতে বাড়িতে আসে। ওই পর্যন্ত যদি হত তাহলে সমস্যা তেমন তীব্রতর ছিল না। কিন্তু বাড়ি এসেই মায়ের উপর হম্বিতম্বি, মারধোর, অকথ্যভাষায় গালাগালি। তার মা-ও যেন বাবার হাতে অকারণে মার খেয়ে খেয়ে মার-ঘ্যাঁচড় হয়ে গেছে। গালাগালি দেয় আবার ঘরেও ঢুকতে দেয়। খাবার মনমত না হলে থালা উল্টে ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার করে দেয়। কাঁইমাই করে মা আবার সেগুলো কুড়িয়ে ঘর পরিষ্কার করে দেয়। তবে বাবা কিন্তু কোনদিন তাকে কোন কথা বলত না। বরং উল্টে টলতে টলতে তার সামনে এসে বলত,“পড়ছিস বাবা। পড়।” সংসারে টাকাপয়সাও দিত না। ঝি খেটে মা যা রোজগার করত তাতেই তার পড়াশোনা আর খাওয়াদাওয়ার খরচ চলত। সেদিন কেন যেন বাবা অন্যদিনের মত মাতাল-বাবা ছিল না। সন্ধেতে মা রান্না করছে। হঠাৎ বাবা, “তুই শালী লোকের কাছে বলে বেড়িয়েছিস, আমি মাতাল? আমি মাতাল তার প্রমাণ দিতে পারবি? না দিতে পারলে এই হাতে কি আছে দেখতে পাচ্ছিস? এটা দিয়ে মেরে তোকে শেষ করে দেব।” বলে একটা গরু বাঁধার খোঁটা নিয়ে মায়ের পিঠে বাড়ি মারতে শুরু করে। আর মা যন্ত্রণায় তারস্বরে চিৎকার করতে থাকে। মায়ের এই অবস্থা দেখে কোন সন্তান চুপ করে থাকতে পারে? পড়া ছেড়ে দৌড়ে এসে বাবুল টলমলে মাতাল বাবার হাত থেকে খোঁটাটা কেড়ে নিয়ে যে হাত দিয়ে তার মাকে মারছিল সেই হাতে সপাটে দুটো বাড়ি মারতে বাবা একদম কাবু! গায়ে তো এতটুকুও শক্তি নেই। কাবু তো হবেই। যন্ত্রণায় কাৎরাতে কাৎরাতে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে বাবা। বাবুল অবাক হয়ে গেল, এত মার খাওয়ার পরও মা মাটির কলসি থেকে জল নিয়ে বাবার হাতের উপর একটা সূতির কাপড় চেপে তার উপর জল ঢালতে ঢালতে তাকে তীব্রভাবে বকাবকি করতে লাগল, “লজ্জা করে না। এই তুই লেখাপড়া শিখছিস। বইয়ে লেখা আছে বুঝি, গুরুজনদের এইভাবে পেটাতে হয়! তাই যদি থাকে তো অমন লেখাপড়া তোর করতে হবে না। ছিঁড়ে ফেল বইয়ের ওই পাতাগুলো। আমি তোর পড়ার খরচ দিতে পারব না। বেরিয়ে যা তুই আমার বাড়ি থেকে। অমন বেয়াদপ ছেলের মুখ আমি আর দেখতে চাই না। এক্ষুণি তুই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবি।”
    বাড়ি থেকে তার পালিয়ে আসার কারণ শুনে মলিকের হৃদয়টা তখন কেমন যেন বিগলিত হয়ে পড়েছিল তার প্রতি। নিজের সন্তানের মত বুকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, “জানিস ছেলে, মোটামুটি ঠিক তোর বয়সী আমার একমাত্র সন্তান পল্লব আজ দু’বছর হল ভেদবমিতে চিকিৎসার অভাবে আমাদের কোলছাড়া হয়ে উপরে চলে গেল। এই অজ পাড়াগাঁয়ে কোথায় এইসব চিকিৎসার ব্যবস্থা ? সঙ্গে সঙ্গে স্যালাইনের দরকার ছিল। সারারাত পায়খানা-বমি। নুন-চিনির জলে বাগ মানছে না। হাতুড়ে বলল, ঝাড়গ্রাম হাপাতালে নিয়ে যেতে। অত রাতে গাড়িঘোড়া কোথায় পাবো! সন্ধে নামলেই তো এলাকা সুনসান। এখান থেকে ঝাড়গ্রাম তো দু-এক কিলোমিটার নয়। কুড়ির মত। নিরম্নপায়ে ধানঝাড়া আগড়ে খড় পলিথিন আর বিছানা বিছিয়ে আমরা জনা চারেক মাথায় করে ছুটলাম। অতটা রাস্তা উজিয়ে যখন হাসপাতালে গেলাম তখন ছেলে আমার নেতিয়ে একদম নিঃসাড়! ডাক্তার জবাব দিয়ে দিল। এখন মনে হচ্ছে উপরওয়ালা আমার সেদিনের আর্তনাদ শুনেছিল। তাই আমার পল্লবের পরিপুরক করে তোকে পাঠিয়েছে।
    সেই দিন থেকে বাবু তাকে ছেলের মত ভালবাসে। একটা একটা দিন গড়ানের সাথে সাথে নিজের হাতে ধরে তাকে কারবারের যাবতীয় অলিঘুঁজি শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে। সময় সময় আবেগতাড়িত হয়ে বলেছে, “আমার যাবতীয় বিদ্যাবুদ্ধি তোকে উজাড় করে দিলাম। তুই যদি তা গ্রহণ করতে পারিস তো আজীবন টেকসই রাখতে পারবি নিজেকে। আমাদের আর কে বা আছে। এখন তুই তো আমাদের সর্বস্ব। আমাদের অস্থাবর স্থাবর যা কিছু আছে সবই তোর জিন্মায় চলে যাওয়াটা যে কেবল উপযুক্ত সন্ধিক্ষণের অপেক্ষায়।” ইনিই তার জীবনের আসল শিক্ষাগুরু। তাই সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে, কোনদিন কোন অনুকুল-প্রতিকুল পরিস্থিতিতে সে তার এই শিক্ষাগুরুকে ভুলে যাবে না। প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে সে রক্ষা করবে। নাহলে এত বছর এখানে থেকে তার ধর্ম-বাবার কাছ থেকে যে শিক্ষা সে পেল তা তো বৃথা হয়ে যাবে। অনেকদিন থেকেই বাবুল মনে মনে পান্নালাল কাকুকে ধর্ম-পিতা হিসেবে মেনে নিয়েছে। অপেক্ষা করছে সেইদিনের জন্যে যেদিন সে মুখ ফুটে ওনাকে ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারবে। কাকিমাকে ‘মা।’
    এই বাবা-মায়ের কথা যখন ভেতর থেকে উগরে বেরিয়ে এল তখনই তার চোখের সামনে ভেসে এল আজন্ম কৈশোরের জীবনকথা এবং তার জন্মদাত্রী মায়ের কথা সঙ্গে বাবাও ! মনে নাড়া দিতেই অবসাদের একটা দমকা প্রবাহ যেন তার সত্ত্বাকে গলিয়ে দিতে লাগল ! ভেতর থেকে একটা তীব্র বেগ যেন তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে লাগল। কেমন আছে, কোথায় আছে তার মা? তার বাবা? যে মানুষটা সর্বার্থে মাতাল হলেও তার উদ্দেশ্যে একবারও কটু শব্দ উচ্চারণ করেনি!
    একটা বলিষ্ট চেহারার সুদর্শন যুবক তাদের বাড়ির সামনে এসে ঘোরাঘুরি করছে। বেড়া ঘরের জানালা দিয়ে সেটা দেখতে পাচ্ছে বৃদ্ধা সরলাবালা! তারপর আবার পাড়ার ওইদিকে চলে গেল। আবার ফিরে এসে তাদের বাড়ি টপকে অন্যদিকে। এই চলে যাবার সময় তার বুকটা কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মত চড়াৎ করে উঠল। কে এই চাঁচাছোলা সুন্দর ছেলেটা ? এ কি তার কেউ হবে। ভেতরটা তোলপাড় করতে শুরম্ন করেছে ! এ তার সেই ছোট্ট খোকা নয়তো ? এবার সরাসরি তার ঘরের আগড়ের দরজার সামনে এসে ক্যাঁচ করে শব্দ করে ঠেলে ফাঁক করে মুখ বাড়াতে বৃদ্ধা বলল, “কে বাবা তুমি? কাদের বাড়ি খুঁজছো তুমি? মনে হচ্ছে তুমি অন্য কারোর নয় আমাদের বাড়ি খুঁজছো। বুড়ো হয়েছি। চোখে তেমন দেখি না। তাই।” এবার একটা যুবক হাত তার পা দুটো স্পর্শ করতেই যেন রক্ত-আগুনে পা থেকে মাথা পর্যন্ত চলকে উঠলো! “কে রে বাবা! তুই আমার বাবুল! তুই আমার সেই ছোট্ট খোকা, বাবুল!” বলে তার ওই বিশাল শরীরটাকে জড়িয়ে ধরতে না পেরে পরনের জামা মুঠো মেরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল! সঙ্গে সঙ্গে পাশে পুরোনো কাঁসার ঘটিতে রাখা জল নিয়ে মায়ের কোলে শুইয়ে চোখে মুখে ঝাপটা দিতে থাকে। চোখ-মুখে হাত বুলোতে বুলোতে বলে, “মা, আমি বাবুল নই আমি তোমার সেই ছোট্ট বাবু গো মা। যে নামে তুমি আমায় ডাকতে। আমি সেই বাবু। তোমার কিচ্ছু হয়নি মা। এই দেখো না তুমি এক্ষুণি ঠিক হয়ে যাবে। ভাল হয়ে যাবে। আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি মা। আর তোমাকে এত কষ্ট করতে হবে না মা।” সন্তানের সেবায় মা আত্মস্থ হয়ে সুস্থ হলে বাবুল জিজ্ঞেস করে,“মা, বাবা ?” কাঁদতে কাঁদতে বলল, “মা কি বলল না বলল আর তুই রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলি বাবা। একবারও ভাবলি না যে মা-বাবা কোনদিন সন্তানকে মন থেকে দুচ্ছাইভাবে বকাবকি করে না। সন্তানদের বাবা-মা বকে। সে অধিকার তাদের আছে। ওরাই তো সন্তানদের প্রথম গুরু। তুই চলে যাবার পর তোর বাবা যেন পাগলের মত হয়ে গেল। মদ খাবার বহর আরও অনেকগুণ বাড়িয়ে দিল। সব সময় আমাকে গালাগাল দিয়ে বলতে থাকল, “আমার ছেলে আমায় মেরেছে তা তোর বাবার কি শালী। আমি মদ খেয়েছি, অন্যায় করেছি। আমার বাবা আমাকে শাস্তি দিয়েছে। তাতে তোর চোদ্দপুরুষের কি আসে যায়। ওটা আমার বাপ বেটার ব্যাপার। তুই আমার বাবাকে ঘর থেকে দূর করে দিলি কেন আগে বল।” তার আগে তুই তো দেখেছিস কত উল্টোপাল্টা বলে আমাকে বকা দিত। আর তুই চলে যাবার পর রোজ রাত্রে এসে ওই একইা কথা বলে চিৎকার করে। সেদিন রাতে বাড়ি ঢুকে অনর্গল বমি করতে থাকে আর তোকে টেনে আমাকে গালাগাল দিয়ে চলে। বমিও থামে না, গালাগালও না। একটা সময় দুটো কাজই একসঙ্গে থমকে গেল। আর বোজা চোখ তার খোলা হল না। এমনিতেই হয়তো ওনার আয়ু বেশিদিন ছিল না। চোলাই ভেতরের কলকব্জা সব জ্বালিয়ে দিয়েছে। তার উপর তোর চলে যাওয়াটা উনি কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পারলেন না।”
    ওদের মা-ছেলের দুঃখ-জ্বালার এই বিনিময় কখন যেন ইথার তাদের ঘরের ছিটেবেড়ার ফাঁক দিয়ে চর থেকে চরাচরে ভাসিয়ে দিয়েছে। পাড়াগাঁয়ের মানুষজন একে একে জড়ো হতে থাকে তাদের ঘর উপচে বাইরে পর্যন্ত। কত ভালমন্দ গুনগুন গুঞ্জন মতামত আলোচনা বার্তা চালাচালি হল কতক্ষণ ধরে যেন। বাবুল তাদের যতটা সম্ভব তার অবস্থানের কথা জানিয়েছে। একটা সময় পর সেই ভিড় পাতলা হতে হতে খালি হয়ে যায়। বাবুল ঘর থেকে দেখে কেউ কোত্থাও নেই। এবার কিছুটা স্বস্তিবোধে হাতপা ছাড়াতে বাড়ির বাইরে আসতে দেখে সামনে মোটা আমগাছের আড়ালে একজন দাঁড়িয়ে! বাবুলের ডাকে আড়াল থেকে নিজেকে প্রকাশ করে পরমাই বলল, “আমাকে চিনতে পারছো বাবুলদা? বলোতো আমি কে? বলেই বাবুলের উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে বলল, আমি পরমা! স্কুল থেকে ফেরার পথে তুমি আমাকে কত বিরক্ত করতে মনে আছে? আমি কপট রাগে তোমার সঙ্গে মাঝে মাঝেই কথা বন্ধ করে দিতাম। তুমি তখন আমার পথ আটকে ভূল মেনে নিতে। আমি বলতাম,“হয়েছে হয়েছে। দুষ্টু বেটাছেলে আবার ভুল স্বীকার করে। কত যেন বাধ্য শিশু।”
    সেদিনের সেই ছোট্ট পরমা আজ এত বড় হয়েছে ! ও এত সুন্দরী ! যেন চন্দ্রপ্রভা তার মধ্যে থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে ! মনে হচ্ছে একটা পরী ডানা কেটে স্বর্গ থেকে নেমে এসে তার সঙ্গে কথা বলছে। মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল বাবুলের। মনে মনে ভাবল, পাড়াগাঁয়ের কত মানুষ এসেছিল। সবাই চলে গেল। পরমা কেন গেল না। তার সঙ্গে কথা বলবে বলে গাছের অবগুন্ঠনে আশ্রয় নিয়েছিল ! সে কি গড়িয়ে আসা এতটা বছর তার জন্যে অপেক্ষা করছিল ? নিশ্চিত ছিল একদিন না একদিন দুষ্টু বাবুলদা ফিরে আসবে ! পরমা তাকে ভালবাসে? প্রকৃতি যদি অখিলে লীন হতে চায় তো সে তার ওমের আধারে সযত্নে লালন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।

  • গল্প

    গল্প- শুভ দৃষ্টি

    শুভ দৃষ্টি
    সুনির্মল বসু

    জায়গাটা বেশ নির্জন, বিশাল নিম গাছের ছায়া, নদীর তীরে পালতোলা নৌকা দাঁড়িয়ে, অমল নদীর পাড়ে চাতালে বসে, একটু বাদেই নন্দিনী এলো।
    আমি এসে গেছি, ছাত্রটা এত ডাল হেডেড একটু সময় লেগে গেল। অমল রুমাল পেতে দেয়, নন্দিনী পাশে এসে বসে।
    -তোমার চাকরির কতদূর?
    -নাহ্ কোন খবর নেই। সবাই অভিজ্ঞতা চায়, আরে বাবা, চাকরি না পেলে অভিজ্ঞতা হবে কিভাবে!
    -এদিকে বাড়িতে আমার বিয়ের জন্য খুব চাপ দিচ্ছে,
    -আমি কি করবো বলো,
    -কিছু একটা তো করো,
    -অতই সহজ,
    -আমি কতদিন অপেক্ষায় থাকবো,
    -একটু সময় দাও, দেখি,
    -পাড়ার লোকেরা আমাদের সম্পর্ক নিয়ে নানা কথা বলছে,
    -বলুক, আই ডোন্ট কেয়ার,
    -সমাজে থাকি, একটু ভাবতে হবে বৈকি,
    -তাহলে ভালোবেসেছিলে কেন!
    -বলতে পারব না, অংক করে ভালোবাসা হয় না।
    -তুমি কি থামবে, না ঝগড়াই চলতে থাকবে,
    দুজনেই চুপ।
    -দ্যাখো নন্দিনী, সূর্য ডুবছে। আকাশটা লাল। পাখিরা ঘরে ফিরছে।
    -হ্যাঁ একটা দিনের শেষ,
    -তার মানে,
    -তার মানে আরেকটা দিনের শুরু,
    -এরপর অন্ধকার নামবে। আকাশে চাঁদ উঠবে। তারপর সকাল হবে, সূর্য উঠবে।
    পৃথিবীটা বড় সুন্দর, কেন ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে দিন খারাপ করব?
    -তুমি আবার চেষ্টা করো, আমি অপেক্ষায় থাকবো।
    -মনে হয় স্কুলের চাকরিটা হয়ে যাবে। চলো এবার উঠি।
    সপ্তাহ তিনেক পর অমল আজ খুব খুশি। মাস চারেক আগে একটা স্কুল ও ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছিল, সেখান থেকে আজ অ্যাপোয়েন্টমেন্ট লেটার এসেছে দুপুরে।
    বিকেলবেলা অমল নন্দিনীর বাড়ি এই শুভ সংবাদটা জানাতে ছুটল।
    কলিং বেল বাজাতেই নন্দিনী দরজা খুলে দিল, এসো।
    -নন্দিনী, আমার চাকরি হয়েছে। এবার আর আমাদের বিয়েতে কোন বাধা নেই। এই দ্যাখো, আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার।
    -অমল, তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি, আজি রাতে ফোন করে জানাবো ভেবেছিলাম, আগামী বাইশে অগ্রহায়ণ আমার বিয়ে। পাত্র বহরমপুরে ডাক্তার। এই যে বিয়ের কার্ড, তোমাকে আসতে হবে কিন্তু।
    এতবড় আঘাত আসবে, স্বপ্নেও ভাবেনি অমল। সামলে নিয়ে ও কথা দিল, আসবো।
    বিয়ের দিন লাল চেলি আর কপালে কুমকুম টিপে, লাল বেনারসি শাড়িতে নন্দিনীকে যে কি ভালো লাগছিল।
    তপোব্রতর সঙ্গে নন্দিনীকে মানিয়েছে বেশ। ওরা ভালো থাকুক, সুখী হোক, অমল
    মনে মনে প্রার্থনা করলো। নন্দিনীর শ্বশুরবাড়ি অভিজাত বড়লোক। সুখী হবে নন্দিনী। যদি ওকে ভালোবেসে থাকি, তাহলে ওর সুখটুকুই তো চাওয়া উচিত।
    অমল আজ নন্দিনীর জন্য মায়ের দেওয়া
    হার এনেছে। ওর মা চেয়েছিলেন, এটা তিনি অমলের হবু বউকে দেবেন।
    নন্দিনী বলল, এসব আনতে গেলে যে…
    -আমি তো কখনো কিছু তোমাকে দিতে পারিনি তাই।
    নন্দিনী হারটা গলায় পরেছে। ভিড়ের মধ্যে দূর থেকে অমল চেয়ে দেখল। মনের মধ্যে ওর তখন ঝড় চলছে। বাইরে থেকে এসব ঝড় দেখা যায় না।
    কলেজ লাইফে অমল কবিতা লিখতো। এখন লেখার সময় পায়না। বেকার জীবন টিউশনিতে কেটেছে। আজ মনে হল, জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আজ আবার ওকে লেখা টেবিলটাকে ভালবাসতে শেখাবে।
    অন্যমনস্ক অমল হঠাৎ শুনল, শঙ্খ ধ্বনি ও উলুর শব্দ। শুভদৃষ্টি হচ্ছে ওদের। পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে নন্দিনী স্বামীর দিকে চেয়ে।
    অমল ভাবলো, এই শুভদৃষ্টি নন্দিনীকে পর করে দিল। আজ থেকে ওদের দ্বৈত জীবন শুরু।
    অমল ভাবলো, এবার আঁধার ঘরে আমার একলা থাকা, আমিতো ওকে ঠকাইনি, নিজে ঠকে গেছি। মনে মনে বললো, যদি সত্যিই তোমাকে ভালোবেসে থাকি নন্দিনী, তবে লেখায় বারবার তোমাকে আনবো। ভালোবাসা হারে না, ভালোবাসা মরে না। নদীর পাড়, শহরের নিয়ন আলো, এই সবুজ পৃথিবী তোমার আমার ভালোবাসার সাক্ষ্মী থাকবে। এই সোনালী বিকেলগুলো কোনদিন স্মৃতি থেকে মুছে যাবে না।
    অমল মনে মনে বলল, নাহ, আমার লেখায় তোমাকে আনবো না, তোমার ছায়াকে আনব। বার বার বলবো, ভালোবাসা মরে না, ভালোবাসা মরেনি।
    বিয়ের আসরে রজনীগন্ধা ফুলের একটা শুকনো ডাঁটা পড়েছিল।
    অমল শুকে দেখলো, ফুলটার কি পবিত্র সুবাস।

  • গল্প

    গল্প- একগুচ্ছ চিঠি

    একগুচ্ছ চিঠি
    অঞ্জনা গোড়িয়া সাউ

    “তাকে “এখন রাখা হয়েছে মানসিক হসপিটালে। একটা অন্ধকার বন্ধ ঘরে। আলো দেখলেই তার দৌরাত্ম বেড়ে যায়।
    এম.এস.সি পাশ ছেলে।নাম কুন্তল।
    যার চোখে ছিল একরাশ স্বপ্ন।
    চাকরিটা পেলে, বোনের বিয়ে, ভায়ের পড়াশোনা, ডিভোর্সি দিদির ভবিষ্যৎ, বাবার চিকিৎসা করা – সব সম্ভব হবে।
    কিন্তু দিনের পর দিন চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত অবসন্ন।
    এমনই একদিন চাকরির পরীক্ষা দিয়ে ফিরছিল ট্রেনে। বেশ কিছু অপরিচিত মানুষ তার বন্ধু হয়ে ওঠে।
    সারাদিন ট্রেনের কামরায় গল্প আড্ডায় জমে ওঠেছিল আসর।
    কার মনে কী আছে কেউ জানে না।
    একসাথে ডিনার করার পর যে যার শুয়ে পড়ে।
    কিন্তু সকালে আর ঘুম ভাঙলো না কুন্তলের। জানি না কীভাবে কুন্তলের খাবারে কেউ কিছু মিশিয়ে দিয়ে ছিল।
    তাই কুন্তল অজ্ঞান হয়ে যায় ।
    সেই ফাঁকে বন্ধু বেশে মানুষ গুলো ততক্ষণে কুন্তলের কাছে যা কিছু ছিল সব কিছু নিয়ে ট্রেন ত্যাগ করেছে।
    কোনো এক সহানুভূতিশীল ব্যক্তি এই অবস্থা দেখে রেল পুলিশে জানান।
    তারাই কুন্তলকে হসপিটালে ভর্তি করেন।
    কুন্তল সাময়িক সুস্থ হলেও তারপর থেকে মাথার সমস্যা দেখা দেয়। যা কিছু সার্টিফিকেট কাগজপত্র ছিল,সবই সেদিন হারিয়ে ফেলে। তারপর থেকে আরও হতাশায় ভেঙে পড়ে।
    ভাবছেন এত কথা জানলাম কীভাবে?
    আসলে কুন্তলের বাড়ি আমার গ্রামে। আমার স্কুলের বিষ্টু মাস্টারের ছেলে। স্যারের ছেলেকে অনেক দিন থেকেই চিনি। শুধু চিনি বলব না, যে আমাকে প্রাণের চেয়েও বেশী ভালোবেসে ছিল। সেই কুন্তলই আমার বিবাহিত জীবনে ঝড় তুলে ছিল। অতিষ্ঠ করে দিয়েছিল আমার জীবন। তার কারণ “একগুচ্ছ চিঠি”।

    কুন্তলের সাথে আমার পরিচয় চড়কের মেলায়। আমি তখন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি।
    মুখ চেনা কিন্তু কখনো কথা হয় নি । এই প্রথম আলাপ।
    আমার কাছে এসে পরিচয় দিয়ে বলল,তুমি তো পড়াশোনায় ভালো। একটা ব্যাংকের চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে। তুমি কি দেবে? আমি সব ফর্ম ফিলাপ করে দেব। “ও “এমনই ছেলে। নিজে শুধু পরীক্ষায় বসে না,অন্যদের ও সুযোগ করে দেয়।
    তারপর থেকে প্রায় দেখা, কথা, গল্প হত।
    এরই মধ্যে আমার বেসিক ট্রেনিং শুরু।
    একবছরের জন্য চলে যেতে হলো মিশনে।ছুটি তেমন ছিল না।
    কুন্তল, বন্ধুত্বের হাতটা ধরে বলেছিল, তোমার যা কিছু নোটস লাগবে নির্দ্ধিধায় বলো।
    তখন থেকেই আমার সাথে ওর বন্ধুত্বটা আরও গভীর হল।
    মাঝে মাঝেই বৌদির হাতে পাঠিয়ে দিত চিঠি। অবশ্য পোস্ট কার্ডে।ক্রমশ চিঠির আকার বড়ো হতে লাগলো। মাঝে মাঝে চার – পাঁচ পাতার বিশাল একটা চিঠি বৌদির হাতে পাঠিয়ে দিত যত্ন করে।
    বিষয় ছিল খুব সাধারণ জ্ঞানের কথা, তবে পড়তে খুব ভালো লাগত ।
    আমিও লিখে দিতাম প্রতিটি চিঠির উত্তর।
    এভাবেই জমে গিয়েছিল একগুচ্ছ চিঠি।
    ফোন তো ছিল না। শুধু চিঠি আর চিঠি।
    যে কথা বলা যায় না মুখে,সহজেই লিখে ফেলা যায় চিঠিতে।আবেগে ভালো ভালো কথা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন সব লিখতাম মন খুলে। কুন্তলও খুব যত্ন করে লিখে পাঠাত শুধু জ্ঞানের কথা। আমাকে অনুপ্রেরণা দিত ওর লেখা চিঠিতে।
    জানি না কখন এই চিঠিই একদিন প্রেমপত্র হয়ে গেল।
    যেদিন প্রথম ও বলল, তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছি,সেদিনই ভয় পেয়েছিলাম।
    আমাকে নিয়ে স্বপ্ন! এমন ভাবে তো ভাবিনি কখনো।
    তাছাড়া আমার জেঠু কোনদিনও মেনে নেবে না এ সম্পর্ক। কারণ কুন্তল তখনো বেকার শিক্ষিত।তার চেয়েও বড় কথা ওরা নিচুশ্রেণীর।তাই আমার বাড়ি থেকে কিছুতেই মানবে না। আমার জেঠুর কথায় শেষ কথা।
    তবু ওর এই বন্ধুত্বটা হারাতে খুব কষ্ট হচ্ছিল।
    নিজেকে দূরে সরিয়ে নেবার চেষ্টা করেও তাই পারিনি। ওর চিঠির অপেক্ষায় থাকতাম।
    তবে চিঠির আর উত্তর দিতাম না।
    ট্রেনিং শেষ। বাড়ি ফিরলাম।
    একদিন দেখা আমতলার চারমাথায়। শুধু বলল,আমাকে পছন্দ করো না জানি, তাবলে অচেনা হয়ে যেও না। বন্ধুত্বটা রেখো।
    যেদিন মাস্টারী পাবে,সেদিন আমায় চিনতে পারবে তো?
    আমি চুপ করে ছিলাম। “ও “চলে গেল একরাশ বেদনা নিয়ে।
    ভালোবেসেছি কিনা জানি না, তবে ওর চোখদুটো দেখে সেদিন খুব কেঁদে ছিলাম। স্বার্থপরের মতো আমি ওকে শুধু ব্যবহার করেছি। তারপর আর খোঁজ রাখিনি।
    আমার লেখা চিঠিগুলো অনেকবার ফেরত চেয়েছিলাম ওর একবন্ধুর দ্বারা।কিছুতেই ফেরত দিল না।
    শুধু জানিয়ে ছিল এগুলোই আমাকে লড়াই করার শক্তি যোগাবে।

    দীর্ঘ দশ বছর পর–
    এখন আমি দুই ছেলের মা।সংসারী। স্কুল শিক্ষিকা। সুখের সংসার আমার।
    হটাৎ দেখা স্কুলের সামনে চায়ের দোকানে।
    উস্কোখুস্কো চুল,মুখ ভর্তি দাঁড়ি।
    সেই চোখ। সেই চুল।টিকালো নাক। পরনে ঢোলা চোস্তা-পাঞ্জাবি। প্রচন্ড ভয় পেলাম।
    আমি দ্রুত এগিয়ে এলাম স্কুলের দিকে।পিছন থেকে সাইকেল নিয়ে সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো।
    হাতে একটা চিরকুট দিয়ে বলল, পড়ে দেখো। আমার ৩০ হাজার টাকা চায়।
    ভায়ের পড়ার জন্য। না পেলে তোমার লাশ পড়ে যাবে। তোমার লেখা সব চিঠি এখনো আমার কাছে। ”

    তারপর থেকে দিনের পর দিন আমাকে ভয় দেখিয়েছে।এ কুন্তল তো আমার সেই বন্ধু কুন্তল নয়। এত ভয়ঙ্কর হতে পারে কখনো ভাবতে পারিনি ।
    আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিল। কী করব? কাকে বলব? কিচ্ছু জানি না। স্বামীর কাছেও কিচ্ছু বলতে পারিনি।
    হঠাৎ একদিন আমার বাড়ির সামনে এসে হাজির।একই নাম ধরে ডাক দিল। ভয়ে আঁতকে উঠি।
    আমার স্বামী চিৎকার শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ওর কাছে গেল। কিছু বলার আগেই দু চার ঘা কষিয়ে দিল। সেই সঙ্গে বলল,
    এখুনি যদি চলে না যাও,পুলিশকে জানাতে বাধ্য হবো।
    সেদিন লোক জমে গিয়েছিল। সবাইকে জানালো টাকা ধার নিতে এসেছে, পাড়ার মেয়ের কাছে। দেবে না বলতেই রাগ দেখিয়ে উল্টো পালটা গালাগালি দিচ্ছিল। তাই গায়ে হাত তুলতে বাধ্য হই।
    বালিশে মাথা গুঁজে তখনও কাঁদছি। আমার স্বামী কাছে এসে বলল,চিরকুটটা আমি পড়েছি। ভয় পেও না, পাশে আছি। তোমাকে বিশ্বাস করি। কার কাছে কী চিঠি আছে,তা এখন অতীত। তুমিই আমার বর্তমান। চোখের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম।

    জানি না স্যার কীভাবে খবর পেলেন? ঠিকানা খুঁজে ছেলের হয়ে ক্ষমা চাইতে এলেন আমার বাড়িতে।
    আমাকে বললেন,আর চিন্তা করো না। ও আর আসবে না। নিশ্চিন্তে সংসার করো।
    পাঞ্জাবীর খুঁটে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন।
    স্যারের মুখেই শুনলাম শিক্ষিত বেকার পরোপকারী কুন্তলদার বাকি কাহিনী। আমি দশ হাজার টাকা দিয়ে বলেছিলাম, কুন্তলদার ভালো করে চিকিৎসা করান স্যার। এটা আমার গুরুদক্ষিণা ভেবেই গ্রহণ করুন। স্যার মুচকি হেসে বললেন,”ছেলের চিকিৎসার খরচ আমি একাই করতে পারব। তুমি ভালো থেকো মা। ”
    সে এখন মানসিক হসপিটালের ১৩ নম্বর রোগী।1

  • গল্প

    গল্প- পুরুষ সিংহ

    পুরুষ সিংহ
    – লোপামুদ্রা ব্যানার্জী

    -মৈনাককে এই পারমিশনটা দেওয়ার আগে তোমার কি একবারের জন্য মনে হল না আমার সঙ্গে একবার পরামর্শ করা উচিত।

    -মিথ্যা বলব না। মনে যে একদমই হয়নি তা কিন্তু নয়। আর মনে হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। এই চল্লিশ বছরে আমি নিজের সিদ্ধান্তে কোন কাজটা করেছি বল তো?

    -এ তো তোমার অভিমানের কথা হয়ে গেল সেজ বউ।

    একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখার্জি বাড়ির সেজ বউ নিরুপমা বলল, এই বয়সে আবার অভিমান! হতো এককালে খুব অভিমান হতো তোমার ওপর। যখন তুমি তোমাদের পরিবারে সমানাধিকারের তত্ব প্রয়োগ করতে ব্যস্ত ছিলে। তোমার রোজগার ছিল সবচেয়ে বেশি। আর তোমার আদর্শও ছিল ঝুড়ি ঝুড়ি। তাই তো সমান দৃষ্টিতে সকলকে দেখার জন্য নিজের স্ত্রী, সন্তানদের সবসময় ভালো কিছু থেকে বঞ্চিত করে এসেছো।
    গেরস্তে সবাই একই খাবার, একই জামা কাপড় পরলেও অন্দরে চলত অন্য খেলা। তোমার তিন ভাই সবাই হরলিক্স, বিস্কুট, ফল আলাদা করে এনে তাদের ছেলেমেয়েদের খাওয়াতো। আর আমার মৈনাক, মিঠি এরা শুধু শশা চিবিয়ে বড় হয়ে গেল। আর আমি যেহেতু বড়লোক ঘরের মেয়ে ছিলাম তাই তো তোমার ধারনা ছিল, বড়লোকের মেয়ে মানেই হিংসুটে।
    ভাগ্যিস আমার বাবা একরকম জোর করেই মৈনাক আর মিঠিকে নিয়ে চলে গিয়েছিল ওনার কাছে। তাই ওরা এই রকম নামকরা স্কুল থেকে পড়াশোনা করে আজ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে।
    হিমাংশু বাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, তাহলে বাবা হিসাবে আমার কোনো অবদানই নেই দেখছি।
    পুনরায় মুখ ঝামটা দিয়ে নিরুপমা বলল, অবদান আবার নেই। ওরা জীবনে যেটুকু অভাব কষ্ট পেয়েছে সে তো তোমার দৌলতেই পেয়েছে।
    -আমি কি শুধু ওদের কে কষ্টই দিয়েছি সেজ বউ?
    নিরুপমা আরো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, থাক না আর মনে করিও না সেইসব পুরানো দিনের কথা। তার চেয়ে বরং বাজারে যাও। ছেলেমেয়েগুলোর জন্য ভালো মন্দ বাজার করে নিয়ে এসো। আজ আমাদের কতবড় আনন্দের দিন বলো। আমাদের মৈনাক এম এস এ চান্স পেয়েছে।
    হিমাংশু বাবু বললেন, আনন্দের সঙ্গে দুঃখটাও তো পেছন পেছন এলো।
    দেখো তুমি যেটাকে দুঃখ ভাবছো সেটা কিন্তু আমার কাছে মোটেই দুঃখের নয়। স্বামীর পড়াশোনাতে স্ত্রী পয়সা খরচ করবে এতে লজ্জিত হওয়ার তো কিছু নেই!
    মৈনাকের সমস্ত লেখাপড়ার খরচ তো আমার বাবা চালিয়ে এসেছে এতদিন। কৈ তখন তো তোমার খারাপ লাগেনি ? তাহলে আজ হঠাৎ শোক করছ কেন?
    -দেখ দাদুর টাকায় পড়াশোনা করা আর বউ এর টাকায় পড়াশোনা করার মধ্যে যথেষ্ট তফাৎ আছে।
    -একদম ঠিক বলেছো তুমি। তফাৎ আছে দুটো ভাবনার মধ্যে। শ্বশুরের পয়সার ওপর কেমন যেন একটা জোর থাকে বেশিরভাগ পুরুষ মানুষের। কিন্তু পুত্রবধূর পয়সার ওপর সেই জোর নেই। বরং তোমার মনে হচ্ছে তুমি অপারগ বলেই তোমার বৌমার কাছ থেকে অর্থ সাহায্য নিতে হচ্ছে। এম বি বি এস পাশ করেই তো ছেলেটা আর্মিতে জয়েন করেছিল। যা উপার্জন করেছিল তা তোমাদের মুখার্জি পরিবার আলাদা হওয়ার পর ধারদেনা মেটাতেই শেষ করে ফেলল। ভবিষ্যতের জন্য কিছুটি সঞ্চয় করেনি মৈনাক।
    তারপর এম এস এ চান্স পেতেই রীতিমতো চিন্তা পড়ে গিয়েছিল মৈনাক। কোথা থেকে জোগাড় হবে পড়াশোনার খরচ। দাদুর কাছ থেকে আর নতুন করে কোনো টাকা নিতে চাইছিল না ও। আমি তখন বলেছিলাম আমার যে কুড়ি ভরি গয়না বেঁচে আছে তা বিক্রি করে কিংবা বন্দক দিতে। তখন তিথি বলল, মা এত কেন ভাবছেন? আমি আছি তো? আমি যা পেমেন্ট পাই তাতে কষ্টশিষ্ট করে আপনার ছেলেকে আমি ঠিক পড়াতে পারব।
    দেখলাম মৈনাকও রাজি হয়ে গেল। ওদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যখন সুন্দর সমঝোতা আছে তখন আমরা শ্বশুর শাশুড়ি হয়ে আপত্তি করতে যাবো কেন? দেখ মৈনাক যেমন আমাদের সন্তান। ঠিক তেমনি তিথির স্বামী। স্বামীর জীবনে স্ত্রীর অবদান কি শুধু হেঁশেল ঠেলা তে? স্ত্রীরা যেমন রেঁধে বেড়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের খাওয়াতে পারে ঠিক তেমনি বিপদে অর্থ সাহায্যও দিতে পারে।
    হিমাংশু বাবু আবার বলেন, তুমি ঠান্ডা মাথায় একবার ভেবে দেখো বৌমার কাছে আমি কতটা ছোট হয়ে গেলাম?
    রাখ তো তোমার ঠুনকো মান সম্মান। তিথি সব জানে। মৈনাক ওকে সব বলেছে। যৌথ পরিবারটা ধরে রাখতে গিয়ে তুমি যে আজ নিঃস্ব সেটা তিথির অজানা নয়।
    আর শোনো তোমার সেকালের ভাব ধারনা এবার ত্যাগ করো। স্ত্রী দিবারাত্রি সংসারের জন্য পরিশ্রম করে যাবে তার বেলায় তোমাদের মতো পুরুষ মানুষের তেমন একটা খারাপ লাগে না। কিন্তু স্ত্রী পরিশ্রম করে টাকা এনে সংসারের হাল ফেরালে তখন মান সম্মানে লাগে খুব!
    হিমাংশু বাবু বেশ বুঝতে পারছেন বিষয়টা এবার নিরুপমার দিকে ঘুরে যাচ্ছে। নিরুপমা বিয়ের পর হিমাংশু বাবুদের গ্ৰামের স্কুলে পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল। তখন কিন্তু হিমাংশু বাবুর মা বাবা চরম আপত্তি করেছিলেন। ওনাদের যুক্তি ছিল বউ এর রোজগারের টাকায় খাওয়ার থেকে উপোস থাকা ভালো। আর হিমাংশু বাবুও চুপচাপ তার মা বাবা কেই সমর্থন করেছিলেন।
    সেই পুরোনো ঘা থেকে রক্তক্ষরণ হওয়ার আগেই চুপচাপ বাজারে চলে যাওয়াই শ্রেয় মনে করলেন হিমাংশু বাবু।
    হিমাংশু বাবু বাজারে বেরিয়ে গেলে তিথি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে, মা তুমি বাবাকে এত কড়া কথা শোনালে তবুও বাবা কিন্তু সব কিছু চুপচাপ সহ্য করে গেল। আমি তো ভাবতেই পারছি না বাবার মতো রাশভারী মানুষ একান্তে তোমার কাছে যেন কত অসহায়!
    নিরুপমা বলল, বৌমা স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটাই হচ্ছে বোঝাপড়া বা সমঝোতার ভিতের ওপর তৈরি। যৌবনে পুরুষ মানুষের থাকে অন্য উদ্দীপনা। নিজেকে পুরুষ সিংহ মনে করে। কিন্তু চামড়ার শিথিলতা আসার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে যৌবনের ভুলগুলো। বুঝতে পারে, মা বাবা, ভাই বোন, আত্মীয় স্বজন সবাইকে ছাপিয়ে বার্ধক্যে সবচেয়ে বেশি দরকার পড়ে স্ত্রী’কে। তাই তখন বুড়ো সিংহের মতো মাঝে মধ্যে হুংকার ছাড়লেও আস্ফালন করার ক্ষমতা থাকে না। চুপচাপ স্ত্রীর বাক্য শিরোধার্য করা ছাড়া উপায় থাকে না আর।

  • গল্প

    গল্প- কেশ কীর্তন

    কেশ কীর্তন
    সুমিতা দাশগুপ্ত

    সে ছুৃটছিলো, ছুটতে ছুটতে বে-দম হয়ে যাবার উপক্রম। দরদরিয়ে ঘাম ঝরছে, গলা শুকিয়ে কাঠ, কয়েক ঢোক জল খেতে পারলে ভালো হ’তো, কিন্তু এখন সে উপায় নেই। এক মুহূর্তের ব্যবধানও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সামনে দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে, একখানা ভ্যানগাড়ি, নিজেকে প্রায় ছুঁড়ে দিয়েছিলো তার উপরে, কিন্তু হায় শেষ রক্ষা হলো না। চুলের মুঠি ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে টেনে নামিয়ে নিলেন বটুক স্যার, তারপর রাস্তার উপর দাঁড় করিয়েই আচ্ছা করে গোটা কতক উত্তম মধ্যম দিয়ে , তার বড়ো সাধের চুলের টেরিখানা বাগিয়ে ধরে কাঁচি দিয়ে কচাৎ—
    আঁ আঁ করে চিৎকার করতে করতে ঘুম ভেঙে গেল করঞ্জাক্ষবাবুর। হাঁফাতে হাঁফাতে সটান উঠে বসলেন বিছানায়।
    নিজের অজান্তেই হাত চলে গেল মাথায়, হায় কোথায় সেই ঘন চুলের গোছা, টাকের উপরে গোটাকতক চুল ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ঝোপঝাড়ের মতো খাড়া হয়ে আছে।
    নাইট ল্যাম্পের মৃদু আলোয় ঘরের সবকিছু দৃশ্যমান। পাশে শোয়া গিন্নি একবার চোখ মেলে চেয়েই ব্যাপারখানা বুঝে নিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠলেন– “মরণ”,
    তারপরই আবার পাশ ফিরে শুলেন, নাক ডাকতে লাগলো তাঁর।
    পাশের টিপয়ে রাখা জলের বোতল থেকে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে, বড়োসড়ো একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এখন মধ্যরাত,অগত্যাই আবার শুয়ে পড়তে হলো।
    মনটা এই বয়সেও উথাল পাথাল, কেন যে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে বারে বারে ফিরে ফিরে আসে স্বপ্নটা! মনের অবদমিত বাসনা আজও পিছু ছাড়লো না!
    বিছানায় শুয়ে ঘুম আসে না, কেবলই এপাশ ওপাশ করতে করতে স্কুলজীবনে ফিরে যাচ্ছিলেন তিনি।
    তখন ক্লাস এইট-নাইন, দুপুরে স্কুল পালিয়ে ম্যাটিনি শো, ধীরে ধীরে রপ্ত করে ফেলছেন তাঁদের ক্লাশের কয়েকজন। না পালিয়ে উপায়ই বা কী। চকবাজারের নতুন সিনেমা হলে দেবানন্দের নতুন নতুন সিনেমা আসে। দেবানন্দ তখন তাঁদের আইডল, কী তাঁর চেহারা, কী কথাবার্তা বলার স্টাইল, আর ঘন একমাথা চুলের দুর্ধর্ষ টেরিখানা!! ওফফ্… ঐ রকম চুলের স্টাইল থাকলে যে কোন মেয়েকে ইমপ্রেস করা তো বাঁয়ে হাত কা খেল!!
    শয়নে ,স্বপনে , জাগরণে তখন একটাই বাসনা, কীভাবে দেবানন্দ হওয়া যায়।একটু হেলে দাঁড়ানো, কথা বলার ধরন ,সবকিছুই আয়ত্ত করার আপ্রাণ প্রয়াস তাদের অনুক্ষণ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। প্রত্যেকের পকেটেই একখানা করে গুপ্ত চিরুনি লুক্কায়িত থাকে, সুযোগ পেলেই টুক করে একবারটি…
    ব্যাপার স্যাপার বুঝতে বটুক স্যারের দেরি হলো না। কম ধুরন্ধর ছিলেন তিনি! সবসময় তক্কে তক্কে থাকতেন, হাতে চিরুনি দেখেছেন কি কেড়ে নিয়ে একখানা বিরাশি সিকদার চপেটাঘাত। উঃ ভাবলে এখনও গালটা টনটন করে ওঠে।সেই বটুক স্যার আজও পিছু ছাড়েননি।

    স্কুলের পরে কলেজ, ভেবেছিলেন এখন আর কে কার তোয়াক্কা করে, ওয়েলকাম দেবানন্দ ওয়েলকাম টেরি, কিন্তু হায় ততদিনে এন্ট্রি নিয়ে নিয়েছেন অমিতাভ, রাজেশ খান্নারা। মেয়েরা আর টেরির দিকে ট্যারা চোখেও চায় না। প্রথমে ভেবেছিলেন নাইবা রইলো ফ্যাশন, তিনি আকৈশোর লালিত ইচ্ছেখানা ত্যাগ করবেন কেন! কালে দিনে বেশ জম্পেশ করে একখানা টেরি বাগিয়েও ছিলেন , ওমা তাই দেখে সকলে মিলে বিশেষ করে মেয়েরা সেকি প্যাঁক দেওয়া শুরু করে দিল!
    তাও তিনি অকুতোভয় ছিলেন, একা কুম্ভ হয়ে রক্ষা করে যাবেন দেবানন্দের স্টাইল, এই ছিল তাঁর পণ। কিন্তু হায় ,এরপরই এলো চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্সখানা। বিয়ের পিঁড়িতে বসে শুভদৃষ্টির সময় নববধূর ভ্রুকুটি কুটিল দৃষ্টি আর কুঞ্চিত ওষ্ঠাধরের মানে বোঝা গেল ফুলশয্যার রাতে । আংটির সঙ্গে সঙ্গে টেরি বিসর্জনের প্রতিশ্রুতিখানাও দিয়ে দিতেই হলো, করঞ্জাক্ষবাবুকে।
    ব্যাস্ টেরির কিসসা খতম। এখন স্বপ্নেই তার বাসা, তাতেও কি রেহাই মিলেছে! কোনোদিন বটুক স্যার, কোনও দিন মুখরা গিন্নি ছুটে এসে ঝুঁটি নেড়ে দিয়ে যায়।

  • গল্প

    গল্প- “রইবো দোঁহায় মুখোমুখি”

    “রইবো দোঁহায় মুখোমুখি”
    -শম্পা সাহা

     

     

    আহা! বাঙালি রান্নার কথা বলবে, ভাববে, ভাবতে ভাবতে জিভে জল চলে আসবে, অথচ সেখানে ইলিশ নেই, তাও আবার হয় নাকি? এ যেন টক ছাড়া চাটনি, তেল ছাড়া তেল পটল!
    যদিও ইষ্টবেঙ্গল মোহনবাগানের খেলা হলে এক দল ইলিশ ঝোলাতো আর অন্য দল গলদা চিংড়ি তা বলে রসনা রঞ্জনে কোনোটাই যে বাঙালি ব্রাত্য করে রেখেছে, তা বাঙালির অতি বড় শত্রুও বলতে পারবে না! যদিও এই মাগ্গিগন্ডার বাজারে ইলিশ, চিংড়ি খেলার মাঠে ঝোলানো হয় না, তা বলে ইলিশ দেখলে বাজার ঘোরতা বাঙালির নোলা যে নালেঝোলে হয় না , এ বদনাম দেয় কার হিম্মত! তাই ফাঁক পেলেই সুখেনের বিরাট আঁশবটির পাশে , চিৎ হয়ে শুয়ে “জলের রূপোলী” শস্যকে সুখে মিটিমিটি হাসতে দেখে, বুক পকেটে একটা ঘষা দিয়ে নোটের ধার ভার বুঝে সামন্তদা লুঙ্গিটা একটু উঁচু করে, সামনের কাদা জল বাঁচিয়ে থলে এগিয়ে দেয়,
    -দে, ওইটা!
    আঙুল দিয়ে দেখায় সেই মাছের রানীকে, যার গায়ে সকাল আটটার রোদ পিছল খাচ্ছে! সুখেন মনযোগ দিয়ে মাছ ওজন করে কাটতে যেতেই সামন্তদার প্রাণ ফাটানো চিৎকার,
    -থাক, থাক কাটিস না। ও তোর বৌদি কাটবে খনে!
    বলতে গিয়ে কি জিভটা একটু বেশি লালাসিক্ত!
    সামন্ত গিন্নীর মাছ কাটায় বড্ড অনীহা। এখন বয়সের ভারে, ভারী শরীর নিয়ে মেঝেতে বসাই দুষ্কর, তাই অন্যান্য দিন সামন্তদা মাছটা কেটেই আনেন। কিন্তু আজ গল্পটা অন্য রকম। আদরে যত্নে ব্যাগের ভেতরকার মহার্ঘ্য বস্তুটি মোটেও অন্যান্য দিনের মত ডাইনিং স্পেসের সিংকের পাশে পড়ে থাকে না। আজ সামন্তদা, নিজে হাতেই একখানা বড় গামলা বের করে তাতে শোয়ান সে সুন্দরীকে। বৌদি,
    – কি মাছ আনলে, দেখি?
    বলে, বাইরে বেরিয়ে অতখানি বড় নধরকান্তি ডিম ভরা ইলিশ দেখে অলস ধিক্কার জানিয়ে, বঁটি নিয়ে থেবড়ে বসেন মেঝেতে। হাঁক পড়ে,
    – ও ময়নার মা, দেখ তো, নেপালের চায়ের দোকানে ছাই পাস নাকি? দুটো টাকা নিয়ে যাস।
    এই গোটা এলাকায় একমাত্র নেপালেরই কয়লাতে চা হয়, আর বাকি সব দোকানগুলোতে তো গ্যাস সেই কবে থেকেই। তাও কি এই কাঠ কয়লা থাকতো নাকি, তন্দুরী চা না কি একটা বিক্রি করে , পঁচিশ টাকা করে দাম, তাই এখনো ওই মাটির উনুন টিকে রয়েছে। না হলে কবে সাফ্ হয়ে যেত! এই এলাকার সব বাড়িতে বিশেষ প্রয়োজনে ছাই সাপ্লায়ার একমাত্র নেপালই।
    ছাই আসার আগে মাছ ভালো করে ধুয়ে সাফ হবে। কানকোর ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে, ঘষে ঘষে ল্যালপ্যালে ব্যাপারটা ধুয়ে তারপর মাছ কাটা। সন্তর্পণে, যাতে একটুও বাড়তি ফেলা না যায় আঁশটুকু বাদে। কানকো, মাথা, মায় নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত রয়ে যায়, ভাজা হবে বলে। মাথাটা, লাউ দিয়ে জমে যাবে। তবে কত্তা গিন্নী দুজনেরই অম্বলের ধাত, তাই সর্ষে ভাপার লোভ ছাড়লেও খুব বেশি দুঃখ নেই! সামান্য কালো জিরে ফোড়ণ, গোটা কয়েক কাঁচা লঙ্কা আর কয়েক ফালি লম্বা করে কাটা কালো বেগুন। কর্তার আবার সুগার, না হলে আলু লম্বা করে কাটা, দুফালি দিলে বেশ জমতো ব্যাপারখানা! তা কি আর করা যাবে? দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবনা মতন হয়ে যায়, ইলিশের নাড়িভুঁড়ি আর তেলটুকু ভাজা। সাদা ধবধবে ভাত আর কাঁচা লঙ্কা, এক চিমটে নুন। যতই হাই প্রেশার থাক, একদিন খেলে কি আর হবে? তারপরে থকথকে মাছের মাথা দিয়ে লাউঘন্ট! ফোরণ শুধু সাদা জিরে আর তেজপাতা।ঝালের জন্য গোটা কয় কাঁচা লঙ্কা! বিরিয়ানি পোলাও মাৎ! শেষে বেগুন দিয়ে পাতলা করে ইলিশের পেটি, গাদার ঝোল। ল্যাজাটাও বা কি করে? সেও এদের সঙ্গেই কড়াতে! ব্যস, এই দিয়ে এক পেট ভাত খাবার পর, সামন্তদা যখন এসে বসেন খাটের ধারে, ফ্যানের হাওয়া, আর হাল্কা বর্ষা শেষের মেঘাচ্ছন্ন ভাব, গিন্নী হেলতে দুলতে এসে পাশে বসে বলেন, আজ মাছটা কিন্তু খুব স্বাদের ছিল, ডিমভরা হলে কি? তখন ডিম সহ পেটির স্বাদের সঙ্গে পঁয়ত্রিশ বছরের দাম্পত্য মাখো মাখো হয়ে সুগন্ধ ছড়ায়। এই দিনের জন্যেই বোধহয় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,”রইবো দোঁহায় মুখোমুখি মিলন আগ্ৰহে!” বাইরে তখন বৃষ্টি নেমেছে ঝিরঝিরিয়ে!

  • গল্প

    গল্প- আলাদা খাট

    আলাদা খাট
    – লোপামুদ্রা ব্যানার্জী

    সবে মাত্র রাতের অন্ধকার ঠেলে দূর থেকে দিবাকর উঁকি মারছে পুবের আকাশে। দূর থেকে কানে ভেসে এলো আজানের ধ্বনি। মামাবাড়ির বিছানায় ঘুমটা বেশ পাতলা হচ্ছিল সারারাত। তাই আজানের ধ্বনি কানে আসতেই ভাবলাম আজ ভোরের সূর্য দেখবো দুই বোনে। কতকাল সূর্য ওঠা দেখিনি।
    আগে কিশোরী বেলায় আমি আর নিপা দিদি কালী পূজার এক সপ্তাহ আগে থাকতেই মামাবাড়িতে চলে আসতাম। দিনের আলো ফোটার আগেই মামাদের কালী তলায় গিয়ে গোবর দিয়ে মাড়ুলি দিয়ে আসতাম। তারপর ফ্রকের কোঁচড় ভরে শিউলি ফুল কুড়িয়ে মাড়ুলিটা সাজাতাম খুব সুন্দর করে। কি অনাবিল আনন্দ ছিল তখন!
    তাই ভাবলাম আজ ভোরে নিপা দিদিকে তুলে নিয়ে যাবো মামাদের কালী তলায়। কিন্তু পাশ ফিরে দেখি দিদি নেই। মনে মনে ভাবলাম, দিদি কি তাহলে আমার আগেই উঠে চলে গিয়েছে কালী তলায়।
    কালকে রাতে শুয়ে শুয়ে দিদি বলছিল, কতদিন শিউলি ফুল কুড়িয়ে ঠাকুরকে দিইনি। আর শিউলি ফুল দিয়ে হাতে কেমন মেহেন্দি করতাম। মনে আছে বোন তোর?
    আমিও আর বিছানায় পড়ে না থেকে তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে মেঝেতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মশারির খুঁটগুলো খুলতে লাগলাম। এমন সময় দেখি নিপাদি ঘরে ঢুকছে। গায়ে রয়েছে রাতের আকাশী রঙের সুতির নাইটিটা। হাউস কোট বা ওড়না কিছুই নেই।
    আমি বললাম, কি রে দিভাই কোথায় গিয়েছিলি এতো ভোরে? আমি তো ভাবলাম তুই কালী তলায় গিয়েছিস। নিপাদি আমার থেকে তিনেকের বড় হলেও তুই তুকারি করেই ডাকি ছোট থেকে।
    নিপাদি বলল, থাক তোকে আর মশারি খুলতে হবে না। এখনও বেশ মশা আছে।বলেই ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
    আমিও পুনরায় মশারির খুঁটগুলো লাগিয়ে দিলাম যথারীতি। তারপর কাঠের চেয়ারটা ঘরের কোণ থেকে টেনে এনে বিছানার পাশটিতে বসে আবার জিজ্ঞাসা করলাম কি রে কোথায় গিয়েছিলি বললি না তো?
    – কোথায় আবার যাবো! গিয়ে ছিলাম রিমি আর তিসির ঘরে সেই মাঝরাতে।
    – কেন রে?
    – আসলে কি জানিস তো। আমার তিসিকে ছাড়া একদম ঘুম আসতে চায় না।
    -ওওওও তাই বল। হ্যাঁ রে দিভাই তুই যে তিসিকে নিয়ে আলাদা ঘুমাস তাতে জামাইবাবু আপত্তি করে না? মানে আমি বলতে চাইছি তোর আর জামাইবাবুর বয়স তো এখন চল্লিশের কোঠায়। এই বয়স থেকেই স্বামী স্ত্রী আলাদা আলাদা জায়গায় তোরা রাতে ঘুমাচ্ছিস?
    নিপাদি হাত নেড়ে বলল, না না তোর কি মাথা খারাপ? এই বয়স থেকে আমি স্বামীসঙ্গ ত্যাগ করবো! আমার বিয়ের ডবল বেডে আমরা তিনজনই শুয়ে পড়ি।
    – আমি প্রশ্ন করলাম, মানে তুই, জামাইবাবু আর তিসি এক বিছানায় ঘুমাস রাতে। তাই তো?
    – হ্যাঁ তাই তো। কেন তুই তোর মেয়েকে রাতে তোদের কাছে নিয়ে ঘুমাস না?
    – না রে দিভাই। রিমি পাঁচ বছর বয়স থেকেই আলাদা ঘরে শোয়।
    রীতিমতো আঁতকে উঠে নিপাদি বলল, সে কি কথা। এইটুকু ছোট মেয়ে রাতে একা একা ঘুমায় কি করে।
    কিছুটা ধমকের সুরে বলল, হ্যাঁ রে নিশা তোর কি কান্ডজ্ঞান নেই। রাত্রি বেলায় মেয়েটা যদি ভয় টয় পেয়ে বসে।
    -ভয় পেলে আমি ছুটে যাই তো পাশের রুম থেকে। সেদিন হয়তো ওর কাছেই সারারাত শুয়ে রইলাম।
    – ঠোঁট বেঁকিয়ে নিপাদি বলল, বাপু এতো নাটকের কি আছে। দশ বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তোরা স্বামী স্ত্রীতে বড় খাটে আরাম করে ঘুমাতেই পারিস।
    – সে হয়তো পারি। কিন্তু আমার মন সায় দেয় না। মা বাবার ঘনিষ্ঠতা ওর কিশোরী মনে প্রভাব ফেলুক এটা আমরা চাই না।
    – ওরে ছোট মেয়ে ওরা, ঘুমিয়ে পড়লে ওদের কোনো জ্ঞান থাকে না। বেশ বিরক্ত হয়ে বলল নিপাদি।
    – দেখ দিভাই তুই যাই বলিস না কেন আমি তোর যুক্তি মানতে পারলাম না। কিশোর বয়স থেকেই ধীরে ধীরে যৌবনের দিকে যায় মানব শরীর। এই সময় ওদের মনে নানা রকমের কৌতুহল জেগে ওঠে। আর বিদেশে তো আঠেরো মাস বয়স থেকেই বাচ্চার জন্য আলাদা বিছানার ব্যবস্থা করা হয়। একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে যে সব বাচ্চা ছোট থেকে আলাদা ঘুমায় তাদের রাতে ঘুমের পরিমাণও যথেষ্ট ভালো হয়। ফলে তারা সারাদিন অনেক বেশি চনমনে থাকে।
    আমার শেষ কথাগুলো নিপা দি খুব মন দিয়ে শুনছিল লক্ষ্য করলাম। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল, এটা কিন্তু তুই ঠিক বলেছিস। বিছানায় কেউ বারবার পাশ ফিরলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। সেখানে বিছানার মধ্যে …না রে নিশা আমি এবার বাড়ি গিয়েই তিসির জন্য আলাদা ঘরে একটা খাটের ব্যবস্থা করব। ওকে রাতে একা শোয়াবো। দেরী যা হওয়ার হয়ে গেছে আর নয়। আমি না হয় মাঝে মধ্যেই তিসির রুমে গিয়ে শোবো। সুঅভ্যাস এর বিকল্প নেই।
    আমি মনে মনে বললাম, যাক বাবা। শেষ পর্যন্ত বড় দিদি হয়ে যে ছোট বোনের কথা শুনল এটাই আমার সৌভাগ্য। আগে যৌথ পরিবারের বিধবা ঠাকুমারা নাতি নাতনীদের নিয়ে শুতো। কিন্তু এখনকার পরমাণু পরিবারগুলোতে সেই সুবিধা নেই। তাই বলে কি থেমে যাবে এতদিনের সায়েন্টিফিক পন্থা।না কখনো না। আমরা অভিভাবকরাই পারি আমাদের সন্তানদের জন্য একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে নিজের বাড়ি থেকেই। শুধু আবেগ নয় সন্তানকে বড় করতে হবে বিবেক বুদ্ধি দিয়ে।

  • গল্প

    গল্প- মহানুভবতা

    মহানুভবতা
    -শচীদুলাল পাল

     

     

    স্টেশন শ্রীরামপুর । প্রায় ছুটতে ছুটতে ট্রেনে উঠে পড়লো ফিজিক্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মনীষা। আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই ট্রেনটি ধরতে না পারলে তার সঠিক সময়ে ফিজিক্স স্যারের কাছে লিলুয়ায় টিউটোরিয়ালে ঠিক সময়ে উপস্থিত হওয়া সম্ভব ছিলো না। অন্যদিন লেডিসে ওঠে।লেডিস কম্পার্টমেন্ট দূরে ছিল তাই
    আজ সামনেই জেনারেল কম্পার্টমেন্টের ভীড়ে ঠাসা লোকালে উঠতে বাধ্য হলো সে।
    ১৯ বছরের ফর্সা সুন্দরী ছিপছিপে গড়ন, আকর্ষণীয় বুদ্ধিদীপ্ত চোখ।সে ট্রেনের রড ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে এক রুক্ষ শুষ্ক চুল,মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, আধ ময়লা পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধ।সে অনেকটা কাছে এসে তার হাত চেপে ধরল।মুখে যেন কি সব বলছে।মনীষা রেগে চীৎকার করে উঠলো।
    — অসভ্য! জানোয়ার!
    লোকটা আরও জোরে হাত চেপে ধরলো। মনীষা বললো
    — ছাড়ুন। হাত ছাড়ুন।
    সাথে সাথে ট্রেনের লোকজন বুড়োটাকে মারতে মারতে বললো
    –বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছে। কামুক বুড়ো! মার শালাকে।
    বুড়োকে মেরে তারা বীরত্ব প্রকাশ করতে লাগলো। মেরে তার পাঞ্জাবি ছিড়ে দিল।মুখে এমন ভাবে মারলো কপাল কেটে ঝরঝর রক্ত ঝরতে লাগলো। ঠোঁট ফেটে রক্তের ধারা বইতে লাগলো।
    আরও যাদের হাত নিসপিস করছিল তারাও এসে মারতে মারতে পরের স্টেশনে ট্রেন থামতেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল।মনীষা ট্রেনের জানালায় এক ঝলক দেখলো রক্তাক্ত বৃদ্ধটি গোঁগাচ্ছে।
    পুরো কম্পার্টমেন্ট বুড়োটার বিরুদ্ধে নানান কটুক্তি ও আদিম রসের রসদ পেয়ে কুৎসায় মসগুল হয়ে গেলো।
    একজন বুদ্ধিজীবী বলছিল
    –এক রকমের পুরুষ আছে এই পৃথিবীতে। কামনার আগুনে জ্বলছে।মেয়ে দেখলে তাদের স্পর্শ পেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
    এইসব বিকৃত মস্তিষ্ক পুরুষ জাতি দেশ ও সমাজের শত্রু।

    সপ্তাহে একদিন সে টিউশন পড়তে আসে লিলুয়ায়। লিলুয়ায় নেমে আজ সে একটা রিক্সা নিল। অন্যদিন পায়ে হেঁটেই যায়। সারা শরীর কাঁপছে।
    তার মনে হলো আজ তারই জন্য বৃদ্ধটির এই হাল হলো। সে নিজেকে ভীষণ অপরাধী ভাবতে লাগলো। বুড়োটা কি যেন তাকে বলছিল!

    টিউটোরিয়াল কক্ষে সে আজ সব শেষ বেঞ্চে বসলো। আনমনা।কিছুই তার ভালো লাগছে না।৯৫% মার্কস পেয়ে সে ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে পড়ছে।টিউটোরিয়াল হোমে ও কলেজের ক্লাসের সেরা স্টুডেন্ট।
    স্যার তাকে গতকালের পড়ানো থেকে প্রশ্ন করলেন। মনীষা থতমত হয়ে বলতে পারলো না। ভাবতে ভাবতে সে বাড়ি ফিরে আসবার জন্য তাড়াতাড়ি ট্রেন ধরলো। জানালা দিকে তাকিয়ে দেখছিল। হঠাৎ তার নজরে এলো উল্টো দিকের সেই প্লাটফর্মে সেই বৃদ্ধটি পড়ে আছে। সে তড়িঘড়ি করে নেমে বৃদ্ধটির কাছে গিয়ে দেখলো শীতে জুবিথুবি হয়ে প্লাটফর্মেই পড়ে আছে। বৃদ্ধটির কপাল ও ঠোঁট দিয়ে রক্তটা জমাট বেঁধে আছে। উস্কোখুস্কো চুল, শতছিন্ন পাঞ্জাবি ।কেউ ভিখারি ভেবে কিছু রুটি দিয়েছিল। সেগুলো কুকুরে টানাটানি করছে। মনীষা ব্যাগ থেকে চাদর বের করে বৃদ্ধটির গায়ে জড়িয়ে দিল।
    রুমাল দিয়ে বৃদ্ধর রক্ত মুছে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো আপনার নাম কি?
    বৃদ্ধটি বললো
    — জানি না
    বাড়ি কোথায়?
    — জানিনা, ভুলে গেছি।
    আপনার বাড়িতে কে কে আছে?
    — মনে নেই।
    এবার সে মনীষাকে বললো
    — আমি বাড়ি যাবো।
    এবার মনীষার মনে হলো এই কথাটাই সে হাত ধরে ক্ষীণ ও অস্পষ্ট স্বরে বারবার বলতে চাইছিল কিন্তু চলন্ত ট্রেনের শব্দে ও পাবলিকের চেঁচামেচিতে সে শুনতে বা বুঝতে পারেনি।
    এবার মনীষা বৃদ্ধটিকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলো।এবার সে নিজেই শক্ত করে তার হাত ধরলো। আপ ট্রেনের প্লাটফর্মে নিয়ে গিয়ে ট্রেনে উঠালো। তার নিজের স্টেশন শ্রীরামপুর আসলে বৃদ্ধটিকে নিয়ে হাত ধরে নামিয়ে একটা রিক্সা নিয়ে ঘরে এলো।
    মা বাবাকে সব কথা বর্ণনা করে শুনালো।আদর্শবাদী পিতা তার বর্ণনা শুনে মেয়ের প্রশংসা করে বললো
    — উপযুক্ত কাজ করেছিস মা।
    — বাবা, আমিতো তোমার কাছ থেকে আদর্শ মানবিকতা ও শিষ্ঠতার জ্ঞান লাভ করেছি।
    — কিন্তু ঘরে রাখলে কোনো সমস্যা হবেনা তো?
    — না বাবা। আমি দেখবো বৃদ্ধকে।
    মাকে বললো জল গরম করতে।
    নিজে হাতে দুধ সুজির হালুয়া বানালো। জল গরম হয়ে গেলে বৃদ্ধটিকে স্নান করালো। ঘসে ঘসে শরীরের নোংরা উঠিয়ে দিল।বাবাকে বললো একটা তোমার পাজামা পাঞ্জাবি পরিয়ে দাও।ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দিল।
    লক্ষ করলো বৃদ্ধটির চোখমুখে এক আভিজাত্যের ছাপ।
    ডাইনিং টেবিলে নিয়ে গিয়ে
    চামচে করে খাওয়াতে গেলো।
    –খান।
    বৃদ্ধটি ঘাড় নেড়ে বললো
    খাবেনা।
    এবার মনীষা আপনি থেকে তুমিতে নামিয়ে আনলো। ধমক দিয়ে বললো
    — খাও। তোমাকে খেতেই হবে।
    এবার ধমক খেয়ে বাচ্চা ছেলের মতো এক চামচ খেলো।
    দ্বিতীয় চামচের বেলায় আবার ধমক। এভাবে তাকে পেট পুরে সবটাই খাওয়ালো।
    মুখ মুছিয়ে দিয়ে সিঙ্গল বেডের ঘরটিতে নিয়ে শুইয়ে দিল। মশারী খাটিয়ে চারিদিক গুঁজে দিল।
    কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো।
    মনীষা সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে বৃদ্ধটির ঘরে গিয়ে দেখলো, অকাতরে ঘুমাচ্ছে।
    সে তাকে বিরক্ত না করে পড়তে বসলো। ফিজিক্সের একটা অঙ্ক সে কিছুতেই পারছে না। অন্যদিন ঝটপট করে ফেলে। আজ তার মনে বিরক্তির ভাব।
    হঠাৎ তাকিয়ে দেখলে গুটি গুটি পায়ে কখন এসে পাশে দাঁড়িয়ে আছে বৃদ্ধটি। সে খাতাটি টেনে নিল। পেন নিয়ে অবশিষ্ট অঙ্কটি কাঁপা কাঁপা হাতে করে দিল।
    মনীষা হতবম্ব হয়ে গেলো। এটা কি অলৌকিক! এ কিভাবে সম্ভব। ইনি কে? কি তার পরিচয়? ইনি তো সাধারণ মানুষ নন। ছুটে গেলো বাবা মার কাছে। সমস্ত ঘটনাটি খুলে বললো। তারা এসে জিজ্ঞেস করলো।
    –কি নাম আপনার? কোথায় থাকেন? বাড়িতে কে কে আছে? বৃদ্ধ লোকটি বললো
    — ভুলে গেছি। মনে করতে পারছিনা।
    আপনার বাড়ির ফোন নম্বর বলুন।
    এবার সে কষ্ট করে স্মৃতি হাতড়ে মনে করে একটা নম্বর বললেন।
    মনীষা সামনে ফিজিক্স খাতাতেই লিখে নিলে।
    অমিত মিত্র কল করলেন। রিং হচ্ছে।
    একবার দুবার কিন্তু কেউ উঠাচ্ছে না।
    কিছুক্ষণ পর তৃতীয় বার চেষ্টা করতেই অপরপ্রান্ত থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো
    — আমি প্রফেসর সম্বুদ্ধ রায়ের ছেলে ডাঃ হিমাদ্রি রায় বলছি। অমিত বাবু ভাবলো, যে ছেলে নিজের নামের আগে পিতার নাম আগে বলে সে নিশ্চয়ই কোনো আদর্শ পুত্র।
    — কাল থেকে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমার ঘরে রয়েছেন। উনি নাম বাড়ির ঠিকানা কিছুই বলতে পারছেন না। মনে হয় স্মৃতি শক্তি লোপ পেয়েছে। কিন্তু বহু চেষ্টা করে এই নাম্বারটা উনি বলতে পেরেছেন।
    — আপনি লোকটার বিবরণ বলুন।
    অমিতবাবু সংক্ষেপে বর্ননা করলেন।
    ডাঃ হিমাদ্রি অপরপ্রান্ত থেকে বললেন
    — হ্যাঁ। আমার বাবা।প্রফেসার সমুব্ধ রায়।আমি তার পুত্র ডাঃ হিমাদ্রি রায়। বাবা আজ দিন কয়েক থেকে নিখোঁজ। খুঁজেছি নানাভাবে অনেক। কিন্তু পাইনি।আপনার ফোন পেয়ে অনেক আনন্দিত। আমি মাকে নিয়ে এখনই আসছি।
    মনীষা ধীর পায়ে ঘরে গিয়ে বললো
    —এই যে স্যার। আপনার নাম কি প্রফেসর সম্বুদ্ধ রায়?
    ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন।
    আপনার ছেলের নাম কি ডাঃ হিমাদ্রি রায়?
    — কিছুই মনে পড়ছে না।
    মনীষা স্নান করিয়ে ধোপদুরস্ত পাজামা পাঞ্জাবি পরিয়ে, চুল আঁচড়ে ব্রেকফাস্ট খাইয়ে দিয়ে বললো
    —এখুনি আপনার ছেলে আসবে আপনাকে নিতে।
    বাধ্য শিশু যেমন মায়ের দিকে নির্ভয়তায় চেয়ে থাকে তেমনি ভাবে অপলকে চেয়ে রইলো বৃদ্ধটি।
    অনেকক্ষণ পর এক দামী গাড়ি এসে থামলো বাড়ির গেটের সামনে। নেমে এলেন ডাঃ হিমাদ্রি রায় ও তার মা।
    ঘরে এসে অমিত বাবুকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানালেন।
    অমিতবাবু বললেন
    — এ সব সম্ভব হয়েছে আমার কন্যার জন্য।
    এবার সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাবার হাত ধরে গাড়ীতে উঠাতে যাবেন তখন প্রফেসর সম্বুদ্ধ রায় হাত ছাড়িয়ে পিছন ফিরে দেখলেন মনীষাকে।তার চোখ দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়লো,বললেন
    — আমি বাড়ি যাবো।
    এরপর একবছর কেটে গেছে।
    প্রফেসর সম্বুদ্ধ রায়, একদিন স্ত্রী মনোরমা, পুত্র ডাঃ হিমাদ্রিকে নিয়ে এক বিশাল গাড়ি নিজে ড্রাইভ করে মনীষাদের বাড়িতে এলেন। সেদিন ছিলো ছুটির দিন।মনীষা ও তার বাবা মা বাড়িতেই ছিলো।
    মনোরমা বললেন
    — আজ আমার স্বামীকে ফিরে পেয়েছি আপনাদের মহানুভবতার জন্য।
    অমিত বাবু বললেন
    — সব কৃতিত্ব আমার কন্যার।
    ডাঃ হিমাদ্রি বললেন
    — বাবার সর্ট টার্ম মেমোরি লস হয়েছিলো। এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।
    এবার প্রফেসর সম্বুদ্ধ রায় এগিয়ে এসে বললেন
    — আমি একটা ভিক্ষা চাইছি।
    আপনারা রাজি থাকলে দেবেন।
    –বলুন। কি চাইছেন?
    — আমি আপনার মেয়ে মনীষাকে আমার পুত্রবধূ করে নিয়ে যেতে চাই।
    মনীষার বাবামা বললেন
    — এতো আমাদের সৌভাগ্য।
    আনন্দে মনীষার দুচোখে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
    প্রফেসর সম্বুদ্ধ স্যার ও মনোরমাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলো।সম্বুদ্ধ স্যারের হাত শক্ত করে ধরে বললো
    ” আমি বাড়ি যাবো “।
    নিদিষ্ট দিনে মনীষা ও হিমাদ্রীর মহা ধূমধামে বিয়ে হয়ে গেলো।

<p>You cannot copy content of this page</p>