-
গল্প- বিরতি
বিরতি
-রীণা চ্যাটার্জীঠিক সকাল নটা সাঁইত্রিশ, না না আরো দুই থেকে চার মিনিট আগেই দেখা হয় রোজ।
দেখা হয় মানে দেখতে পাওয়া। চোখাচোখি হওয়ার সুযোগ নেই, কারণ ভঙ্গীটা রোজের একইরকম- চোখে চশমা, কাঁধে ব্যাগ, হাতে খবরের কাগজ, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নিয়ে একদম নির্লিপ্ত। মধ্যপঞ্চাশের অফিসযাত্রী। হাতে খবরের কাগজটা নিয়ে তাতে চোখ রেখেই পেরিয়ে যান মেট্রোরেলের এক একটা ধাপ- লিফটে ওঠা, গেটের বিধিনিষেধ পেরিয়ে প্লাটফর্মে হাঁটা, ট্রেনের অপেক্ষা, ট্রেন এলে উঠে বসা সবকিছুতেই কাগজ থেকে কিন্তু চোখটা সরে না। যেন কাগজটার প্রতিটা ইঞ্চিতে গভীর অনুরাগ। কখনো এ পাতা, কখনো ও পাতা, এই দু’ ভাঁজ তো পরক্ষণেই চার ভাঁজ, তারপর আটভাজা, শেষে কোনও বিশেষ একটা জায়গা খামচে ধরে চোখের সামনে রাখা। ‘কাগজ ভিজিয়ে’ পড়ছে এই কথাটা অনেকবার শুনেছে মৃদুল। কিন্তু এ তো ভেজানো নয়- ভাজাভাজি করা, খবর কবর থেকে বের করে আনা প্রায়। উৎসুক মন প্রায় মাস দুয়েক দেখতে দেখতে উৎসাহে আরো উৎসুক হয়ে উঠলো। কি এতো পড়তে পারে মানুষ? কোনও দুই একটা বিশেষ বিষয়ে আগ্ৰহ থাকতে পারে, কিন্তু… যাই হোক না কেন, ইচ্ছেটা পাশে থেকে দেখা, কি এতো যুদ্ধ করেন নিরীহ খবরের কাগজের সঙ্গে ভদ্রলোক! সুযোগ খুঁজলেই পাওয়া যায়, মিলে গেল। একদিন পাশে বসার জায়গা পেয়েই গেল মৃদুল, শুধু দেখার কাজটাই বাকি। কিন্তু দুর্ভাগ্য কাগজটি তখন ভাজাভাজির পালা সেরে প্রায় আট ভাঁজে, দশ আঙুল আর চোখের কবলে। অন্য কারোর দেখার উপায় নেই। পাশে বসেও বিশেষ সুবিধা করতে পারলো না। তবে চেষ্টা চালিয়ে গেল রোজের যাতায়াতের সময়। মেট্রোরেলে মিনিট ছয়েক জার্নি, সময় বড়ই কম। মেট্রো থেকে নামার পরেও এক ভঙ্গীতে তিনি এগিয়ে যান অটোস্ট্যান্ডের দিকে। ওই ফাঁক গলেই তিনি চোখছাড়া হয়ে যান, এক অটোতে বসার সুবিধা হয়ে ওঠে না। হয় তিনি আগে, নয় মৃদুল আগে, এই আগে-পরের চক্করে খবরের কাগজ ব্যবহারের শেষ পর্যায় আর দেখা হয়না। পরের ব্যাপারে নাক গলানোর ভীষণ বদ অভ্যাস জেনেও স্বভাববিরুদ্ধ এই বদ অভ্যাসে দিন দিন অস্বস্তি বাড়তে থাকে। ভেতরে একটা খচখচানি- একটা কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার অস্বস্তি। এমন অবস্থা হলো- ওনার চোখ কাগজে, মৃদুলের চোখ ওনার ওপর। আশেপাশের লোক যে তার আচারণেও কিছু ভাবতে পারে- সেই বোধ মেট্রোরেলের চাকায় বোধহয় পিষে গেছে।সবদিন তো আর সময় যায় না। কথায় আছে “উদ্যোগিনং পুরুষ সিংহ…” লক্ষ্মীলাভ এখানে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু উদ্যোগ প্রায় সফল। অটোয় পাশাপাশি বসার জায়গা হয়েই গেল। মৃদুলের মনে স্ফুর্তির স্ফুলিঙ্গ, ‘যাই করো বাপধন এখানে আর রেহাই নেই, তোমার ভাজাভাজি আজ দেখবই।’ যখন গুছিয়ে পাশে বসলো, ওনার চোখ ততক্ষণে আবার কাগজে। আশ্চর্য! চোখটা রাখলো ওনার কাগজে, কিন্তু এতো কাছাকাছি, পাশাপাশি বসেও… নাহ্, শুধু কালো পিঁপড়ের সারি, কাগজটা তখন প্রায় মুঠোবন্দী। মৃদুলের গন্তব্য এসে গেল ওনার আগেই। এমন সময়েই মুচমুচে কাগজটা প্রায় মন্ড পাকিয়ে ব্যাগে ভরে রাখছেন। এতোক্ষণে মনোযোগী পঠনে বিরতি পড়লো। দীর্ঘশ্বাস…মৃদুলের। মুখ ফস্কে বলেই ফেললো, শেষ হলো যুদ্ধ? উনি তাকালেন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে। বললেন, ‘আমাকে কিছু বললেন?’ চুপচাপ ভাড়াটা মিটিয়ে নেমে গেল- বাকযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই। অবশ্য আর দেখা হয়নি ওনার সঙ্গে বেশ কিছুদিন হলো। ট্রেনের টাইমটা বদলে নিয়েছিল মৃদুল। ভয়ে? হতেই পারে- প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেওয়ার পর আর মুখোমুখি হতে চায়নি। হয়তো-বা বিরতি দিয়েছিল এই অহেতুক উৎসাহে, বদভ্যাসের বিরতিও বলা যেতে পারে।
-
গল্প- ভবিতব্য
ভবিতব্য
-শচীদুলাল পালবিভাস তার জীবনকাহিনী বলছে তার এক অতি ঘনিষ্ঠের সামনে —–
আমার বয়স তখন ২৮,ম্যাথেমেটিক্সে এম.এসসি পাশ করে কোনো চাকরি বাকরি পায়নি। বেকার। দু একটা টিউশানি করে কতটুকু বা আয় হয়?হাত খরচাটাও আসেনা। প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষা দিচ্ছি চাকরি পাবার আশায়।
এক খ্যাতনামা জ্যোতিষ যিনি আমার কুষ্টি তৈরি করেছিলেন তার কাছে একদিন গেলে কুষ্টি দেখে ভবিষ্যৎ বাণী লিখে দিলেন, প্রবল ধনযোগ আছে।নবমাধিপতি স্থিত অংশ অধিপতি, ভাগ্যস্থানে উচ্চস্থ পঞ্চমাধিপতির সহ যুক্ত থাকায় লক্ষীযোগ হয়েছে।ফলে কীর্তিবন্ত, রাজসদৃশ ধনবান হবে।উত্তমা স্ত্রীলাভ হবে।
আকস্মিক অর্থলাভ যোগ আছে।
অষ্টমপতি অষ্টমস্থানে, মৃতব্যাক্তির সম্পত্তি প্রাপ্তি যোগ আছে। বর্তমান সময় কষ্ট কর। শনি- চন্দ্রের দশা-অন্তর দশা ও শনির সাড়ে সাতি চলছে।মাস দুয়েক পরেই দীর্ঘ সাড়ে সাত বছরের সাড়ে সাতি শেষ হবে।বর্তমানে প্রবল দারিদ্র্য যোগ।
স্ত্রী স্থান খুব শুভ। খুব সুন্দরী স্ত্রী লাভ হবে। স্ত্রী বিনয়ী,নম্র,সর্বসুলক্ষনযুক্তা, সুচরিত্রা,স্বামীপ্রিয়া হবে।
আমি বিয়েই করবো না মনস্থ করেছি স্ত্রী লাভ কি করে হবে?
ভাতৃস্থান অতি অশুভ। সন্তান স্থানে দেখা যাচ্ছে এক কন্যা হবে।
অনেক শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। কর্মস্থান মধ্যম।চাকুরি লাভ হবে।
জ্যোতিষের ভবিষ্যৎ বাণী বিশ্বাসই হলো না।একান্নবর্তী পরিবারে দুই দাদা দুই বৌদি তাদের একটি করে সন্তান। ঘরে নিত্য অশান্তি।একে অপরের সাথে শুধু উচ্চগ্রামে কলহ কচকচি । প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসতে গেলে অনেক স্টাডি করতে হবে।কিন্তু দিন দিন বাড়ির বাতাবরণ ঝগড়াঝাঁটিতে এমন পর্যায়ে পৌছে যাচ্ছে যে কান ঝালাপালা হয়ে যায়।মা বাবা ঠাকুরমা অনেকদিন আগেই পরলোকে। শুধু ঠাকুরদাদা আছেন। বৌদিরা শুধু দাদা- শ্বশুরের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে আছে। বাড়ীটা ছেড়ে যেতে পারছেনা। যদি অন্য কাউকে লিখে দেয়। বুড়োটা যে কবে মরবে?
বেকার বলে একবৌদি একদিন বলেই দিল
— বিধবা মেয়ের মতো ঘরে বসে বসে অন্নধংস করছো।
আর এক বউদি বললো
— সংসারে টাকা দাও নাহলে রাস্তা দেখো। আমরা পারবোনা এভাবে তোমার পেট চালাতে।
ধুমসো যোয়ান মরদ! কুলি মজুরি করেও তো দুটাকা আয় করতে পারো?
ভাইপো ভাইঝিরাও অবজ্ঞা করে।অবহেলা করে সবাই।আমি যেন এক গলগ্রহ।ভবিষ্যৎ চিন্তায় একেই চিন্তাগ্রস্ত বিমর্ষ থাকি। তার উপর নানা সব কথার বাণে জর্জরিত।একদিন আমি আশার এক চিলতে আলো দেখতে পেলাম।
একদিন ” আমার শহর ” নামে এক পাব্লিক ফেসবুক গ্রুপের বিজ্ঞাপনে দেখলাম “একটা টিউশন টিচার চাই।”
উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। নীচে ফোন নং। কিছুদিন আগে এইরকম বিজ্ঞাপন খবরের কাগজে ও OLx এ-ও দেখেছি। একদিন ফোন করলাম।ফোন নাম্বারটি একই। অপরপ্রান্ত থেকে বলল
— বলুন কি বলতে চান। আমি তখন বিজ্ঞাপনের কথা সবিস্তারে বললাম।
— আপনি সন্ধ্যা বেলায় বাবুর সাথে কথা বলবেন। আমি তার বাড়ির খাস চাকর নিবারণ।
এখন আপনি আপনার সম্বন্ধে কিছু বলুন। তাতে যদি বাবুর পচ্ছন্দ হয় তবেই আপনার সাথে কথা বলবেন। এইটি আপনার নং?
— হ্যাঁ।আমি সবিস্তারে আমার বায়োডাটা বললাম।
— আপনি অনেক শিক্ষিত। বাবু আপনাকে ফোন করবে।
সন্ধ্যাবেলা ফোন এলো। ফোনে দু একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে আমি উত্তর দিলাম।
বাবু বললেন
— তুমি কাল সন্ধ্যা বেলা তোমার কাগজ পত্র, বায়োডাটা ইত্যাদি নিয়ে চলে এসো।
পাশের শহরে আমি ঠিকানা খুঁজে পৌঁছে গেলাম।বিশাল বাড়ি। পুরানো আমলের অনেকটা জমিদার বাড়ির মতো। সংস্কার করে ঝাঁ তকতকে করা হয়েছে।অনেকটা জমি। জমিতে বিভিন্ন ধরনের গাছ গাছালিতে পূর্ণ।
চুল রুক্ষশুষ্ক।খোচাখোচা দাড়ি।অনেকবার কাচা হয়েছে এমন এক রঙচটা শার্ট-প্যান্ট পরে দরজায় বেল বাজাতে সেই খাস চাকর নিবারণ দরজা খুলে বললো —
–আপনি বিভাস চৌধুরী? বাবু আপনাকে গতকাল আসতে বলেছিলেন?
— হ্যাঁ। আমিই বিভাস চৌধুরী।
আমাকে সোফায় বসতে বলে ভিতরে চলে গেলো।
কিছুক্ষণ পরে বাবু এলেন।
সন্দেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে জরিপ করলেন, কাগজপত্র খুঁটিয়ে দেখে বললেন।
–আমার নাম দর্পনারায়ণ সিংহ। একডাকে এ অঞ্চলের সবাই আমায় চেনে।
তুমি আমার মেয়েকে পড়াবে।সে তার নিজের সময় অনুযায়ী সময় দেবে।
আমি বললাম কিন্তু স্যার আমার বাড়ি অনেক দূরে।
— সে তোমায় ভাবতে হবেনা। তুমি থাকবে আমার বাড়ির প্রাচীরের বাইরে আমারই জমিতে একটা ঘরে।তুমি উপযুক্ত বেতন পাবে।
তোমার বাক্স পেঁটরা নিয়ে কাল থেকে চলে এসো।ওখানে তোমাকে নিজেই রান্না বান্না করে খেতে হবে।
আমি রাজি হয়ে গেলাম।পরদিনই এক অজানা ভবিষ্যতের উদ্যেশ্যে পাড়ি দিলাম।
একটা কিটস ব্যাগে জামাকাপড় আর বইপত্র নিয়ে হাজির হতেই নিবারণ আমায় প্রাচীর সংলগ্ন সেই ঘরটিতে নিয়ে গেলো। টালির ছাউনি দেওয়া ঘরে একটায় রুম। ভাঙা নড়বড়ে তক্তাপোশ। একটা নড়বড়ে টেবিল ও চেয়ার। রান্না বান্না করার সরঞ্জাম গ্যাসস্টোভ চাল ডাল নিবারণ আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছে। ঘরটাতে একটা জানালা। জানালা খুলতেই পোকামাকড় টিকটিকি গিরগিটি হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকতে শুরু করলো। ল্যাজ তুলে একটা কাঁকড়া বিছেও ঢুকে পড়েছে। নিবারণ সেটাকে বেশ কায়দা করে মারলো।টালি ভাঙা পরিত্যক্ত ঘরটিতে জলও পড়ে। মেঝেতে জলের দাগ দেখে বুঝলাম।দূরে একটা কুঁয়া, তারপাশে পায়খানা। আলো নেই। টর্চের আলোয় ভরসা।ঘর দেখিয়ে নিবারণ চলে গেলো। কিছুক্ষণ পরে আবার এসে বলল
—বিভাসবাবু চলুন, আপনার ছাত্রী আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছে।
আমি গিয়ে বসে আছি। ছাত্রীর দেখা নেই। নিবারন এসে চা ও জলখাবার দিয়ে গেলো। অনেকগুলো আইটেম। ক্ষুধার্ত আমি একে একে সব খেয়ে ফেললাম। রাতে আর না খেলেও চলবে।
বেশ কিছুক্ষণ পর ছাত্রীটি এলো। আধুনিকা বলতে যা বোঝায় সেই রকম পোশাক আশাক।মেয়েটি এসে বললো
— আমার নাম প্রিয়ংকা। পড়াশোনায় আমার মন নেই।ওগুলো আমার মাথায় ঢুকে না।আপনাকে পড়াতে হবেনা। আমার সব সাবজেক্টের হোমওয়ার্ক আপনি এই খাতায় লিখে দেবেন। আমি কপি করে স্কুলে জমা করব।
— সামনে তোমার মাধ্যমিক পরীক্ষা। তুমি কিভাবে পাশ করবে?তোমার ভবিষ্যৎ?
— সে আপনাকে ভাবতে হবেনা। আমার বাবার প্রচুর টাকা। বিশাল লম্বা হাত। আপনি চুপচাপ নিজের কাজ করবেন। আমি মোবাইলে চ্যাট করবো। যদি রাজি থাকেন তাহলে ভালো, নাহলে উল্টো আপনাকে ফাঁসিয়ে দেব। এর আগে মিথ্যে বদনাম দিয়ে অনেক মাষ্টারকে আমি তেড়েছি।
আমি অনিচ্ছাকৃত রাজি হলাম।
রাত এগারোটা নাগাদ আমার জন্য বরাদ্দ সেই ভুতুড়ে ঘরে ফিরে এলাম। গা ছমছম পরিবেশ।বহুকাল এই ঘরে কেউ বাস করেনি।বাইরে নিশাচর পাখির কর্কশ আওয়াজ।আমি মনকে শক্ত করে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ঘরদোর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে, যা ছিলো তাই রান্না বান্না করে পড়াশোনায় মন দিলাম। প্রতিযোগিতা মূলক পরিক্ষায় বসার পড়াশোনার জন্য এই নিরিবিলি ঘরটি আমার কাছে খুব উপযুক্ত।
আসার সময় চার্জেবল টেবিল ল্যাম্পটি নিয়ে এসেছিলাম।রাতে মেয়েটিকে টিউশন পড়িয়ে ফিরে এলাম ঘরে। দিনের রান্না করা খাবার গুলো খেয়ে পড়তে বসলাম। পড়তে পড়তে রাত হলো। নিশুতি রাত।হঠাৎ লোড সেডিং।আলো চলে গেলো। চাপ চাপ অন্ধকার। বাইরে থেকে কুকুরের আর্তনাদের শব্দ ভেসে আসছে। নিশাচর পাখির কর্কশ আওয়াজ। টেবিল ল্যাম্পে চার্জ দেওয়া হয়নি। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে তক্তাপোশে শুয়ে পড়লাম।চোখদুটো লেগে এসেছে। একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব। হঠাৎ একটা ফিসফিস মেয়েলি কন্ঠস্বর।আমি কান খাড়া করে শুনবার চেষ্টা করলাম। মেয়েটি কাঁদছে। হঠাৎ অস্পষ্ট দেখলাম আমার সামনে সাদা শাড়ি পরা ঘোমটা মাথায় একটা মেয়ে। আমি চীৎকার করে বললাম কে ওখানে?
হাতড়ে টর্চের আলো ফেলতেই মেয়েটি অদৃশ্য হয়ে গেলো।আমি অনুভব করলাম এই ঘরে প্রেত আছে। আমার নার্ভাস সিস্টেম খুব স্ট্রং। ভূত প্রেতে আমি বিশ্বাস করিনা। তাই সেরাতের মতো ঘুমিয়ে পড়লাম।ঘুম থেকে উঠে দিনের বেলা ভাবছি গতরাতের কথা। ভ্রম ভেবে উড়িয়ে দিলাম।
পরের দিন যথারীতি কাজকর্ম করে, টিউশনি পড়িয়ে, ঘরে এসে কাজকর্ম করে খাওয়া দাওয়া সেরে পড়তে বসলাম।
টেবিল ল্যাম্পের আলোতে পড়ছি।হঠাৎ শুনলাম খিলখিল হাসির শব্দ।আকস্মিক দেখলাম আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাদা শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা।
সে বললো
—আলো জ্বালবে না।
আলো আমার সহ্য হয়না। কি এতো পড়ছো?
আমার খুব কৌতুহল হলো বললাম
–বেশ আলো জ্বালবো না।কিন্তু আপনি কে? আমার কাছেই কেন বা আসেন?
সে তখন কাঁদতে কাঁদতে বললো
— আমার দীনদরিদ্র নাতির-ছেলের এক কন্যা আছে। কন্যাটি সুন্দরী। পাড়ার বখাটে ছেলেরা তাকে সম্ভোগ করতে চায়। শিয়াল কুকুরের মতো তাকে ছিঁড়ে খেতে চায়।
শিয়াল কুকুরের হাত থেকে তুমি
মেয়েটিকে বাঁচাও। তুমি ভালো ছেলে।তোমার কাছে একটা অনুরোধ তুমি মেয়েটিকে বাঁচাও।
— আমি হো হো হেসে বললাম, আমার দ্বারা সেটি অসম্ভব। কারণ আমি বিয়েই করবো না। আমার নিজেরই চালচুলো নেই।বিয়ে করে খাওয়াবো কি? তাছাড়া আপনি বলছেন আপনার নাতির ছেলের কন্যা।তাহলে আপনার বয়স কত? একশ বছরের বেশি!
— আমার বয়সের গাছপাথর নেই।ওই মেয়েটির সৎপাত্রে বিয়ে দিয়ে আমি মুক্তি পেতে চায়। আমার অতৃপ্ত আত্মা শান্তিলাভ করবে।
— এবার বুঝেছি আপনার মতলব। আপনি আমার কাছে আসবেন না। এই বলে টর্চের আলো ফেলতেই বৃদ্ধা অদৃশ্য হয়ে গেলো।এরপর দিন কয়েক তার দেখা নেই।
শুধু ভাবি বৃদ্ধাটি অশরীরী হলেও তার সাথে কথা বলতে ও শুনতে বেশ ভালো লাগে।একাকি এই ঘরে একা একা থাকতে থাকতে কেমন যেন মনমরা লাগে।অশরীরী হলেও একজন সাথী তো ছিল।
দিন দশেক পরে। বাইরে তুমুল ঝড় জল বৃষ্টি।শুনশান রাতের নিঃস্তব্ধতা ভেঙে এক সাঁপে ধরা ব্যাঙের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে।আমি ভয়ে বিবর্ণ। প্রবল বেগে হাওয়া বইছে। মনে হচ্ছে হাওয়ার দাপটে পুরানো জরাজীর্ণ দরজাটা ভেঙে যাবে।অন্ধকার। লোডশেডিং। সামনে দেখি সেই বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। আজ তাকে বললাম বসুন।তিনি আমার তক্তাপোশের পাশেই বসলেন।
এ কদিন আসেননি কেন? আপনার অব্যক্ত কথা শুনতে ভালো লাগে। আমি সাহিত্যচর্চা করি। একটু আধটু লিখি বিভিন্ন পত্রিকাতে।
আপনার কাহিনি লিখবো।
বৃদ্ধার খিলখিল হাসির শব্দে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ হলো। ।ও সব ছাইপাঁশ লিখে কিচ্ছু হবেনা। ধান্দাবাজ।
— বেশ বলুন। আমি শুনবো।
বৃদ্ধা তখন তার কাহিনি বলতে শুরু করলো
—-আমার নাম বিষ্ণুপ্রিয়া আমার স্বামীর নাম লক্ষীপতি।আমাদের ছিল লোহা লক্করের ব্যবসা।মনোপলি ব্যবসা।এই তল্লাটে এ ধরনের ব্যবসা করে আমাদের চেয়ে কমদামে কেউ দিতে পারতো না। তাই রমরমিয়ে চলতো।আমাদের ঘরে রাধামাধবের নিত্য পূজা সেবা হতো।হরি কীর্তন হতো। গীতা ভাগবত পাঠ হতো। খুব ধার্মিক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন আমার স্বামী।ছেলের নাম রেখেছিলেন মদনমোহন। মদনমোহন খুব বিলাসী ছিল।ঘরে বাঈজী নাচ করাতো। মদ খেয়ে মেয়েছেলে নিয়ে ফুর্তি করতো।আমার স্বামীর এসব অনাচার একেবারেই সহ্য করতে পারতোনা।একদিন ছেলেকে শাসন করতে গিয়ে হার্ট এটাকে মৃত্যু হলো। বাবার মৃত্যুর পর ছেলে মদনমোহন তার বিলাসিতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল।কর্মচারীরা চুরি করতে লাগলো।
ব্যবসা পড়তির দিকে। কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
আমার পুত্রের এক পুত্র হলো অর্থাৎ আমার নাতি, নাম রাখলাম মুরারিমোহন।সেতো বড়ো হয়ে আরও বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিল।বেশ্যাপল্লীতে রাত কাটাতো। রেস খেলতো। জুয়া খেলতে গিয়ে
সর্বস্বান্ত হলো। ব্যবসা লাটে উঠলো। জমা টাকায় হাত পড়লো। ব্যবসা আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। দেনার দায়ে সব একে একে বিক্রি হয়ে গেলো। একদিন সিঁদুকের চাবি চাইলো নাতি মুরারিমোহন।আমি চাবি দিতে রাজি না হলে সে আমাকে মারধোর শুরু করলো। আমি এক গভীর রাতে সিঁন্দুক থেকে একশোটা মোহর একটা ঘটিতে পুরে ভালো করে মুখ বন্ধ করে বাড়ির কোনায় অশ্বত্থ গাছটির নীচে পুঁতে দিয়ে এলাম। পরবর্তী বংশধরেরা ভোগ করবে এই ছিল মনস্কামনা।এরপর নাতি মুরারিমোহনের এক পুত্র হলো। নাম তার পুরঞ্জন।
তার জন্মের পর ঘরে ডাকাতি হলো।যা কিছু অবশিষ্ট ছিল সেগুলো সব নিয়েও তারা সন্তুষ্ট না হয়ে আমার কাছে সিঁন্দুকের চাবি চাইলে আমি দিয়েও দিলাম। দেখলো সিন্দুক ফাঁকা।তখন তারা আমার নাতিকে জোর জবরদস্তি করতে গেলে আমি প্রতিবাদ করলাম। আমার নাতিকে গুলি করতে গেলে আমি বুক চিতিয়ে রক্ষা করতে গেলে গুলিটা আমার বুকে লাগলো। সাথে সাথেই আমার মৃত্যু হলো।
অভাব অনটনের সংসারে নানান রোগভোগে বিনা চিকিৎসায় একে একে পরিবারের সবাই পরলোকে চলে গেলো। পারিবারিক দেনা শোধ করতে পুরঞ্জন বাড়িটি বিক্রি করতে বাধ্য হলো। এক চিটিংবাজ এসে পুরঞ্জনকে বললো
— এই দেখো তোমার বাবা আমার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলো। সুদে আসলে বিশাল টাকা। এইটাকা তুমি দিতে পারবেনা জানি তবে তুমি যদি জমি জমা সমেত পুরো বাড়িটা বিক্রি করে দাও আমি তোমার পিতৃপুরুষের ঋণ মকুব করে কিছু টাকাও তোমাকে দেব। অগত্যা পুরঞ্জন জমি বাড়ি সব বেচে দিয়ে নামমাত্র কয়েকটি টাকা ও একমাত্র কন্যা মনোরমাকে নিয়ে বস্তিতে ঘরভাড়া নিয়ে থাকতে লাগলো।
পুরঞ্জন নানান জটিল রোগে আক্রান্ত। যেটুকু অবশিষ্ট ছিল সব প্রায় শেষ। মেয়ে মনোরমা ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে বিবাহ যোগ্যা। কিন্তু কি করে বিয়ে দেবে। মনোরমা বলে, “তার বিয়ে হয়ে গেলে বাবাকে কে দেখবে। “
এতক্ষন বৃদ্ধা প্রেত কথা বলেই যাচ্ছিলো। আমি চুপচাপ শুনছিলাম। বৃদ্ধা একটু কথা বলা বন্ধ করলে আমি জিজ্ঞেস করলাম।
পুরঞ্জন তার মেয়েকে নিয়ে কোথায় থাকে?
— এই শহরের দক্ষিনে এক বস্তিতে থাকে।
— আর যে বাড়িতে আপনি ও আপনার বংশধরেরা থাকতো সেটি কোথায়?
— যে বাড়িতে আপনি টিউশন পড়ান সেই বাড়িটায় আমাদের বাড়ি ছিলো। চিটিংবাজ দর্পনারায়ণ সিংহ আমার প্রপৌত্রকে মিথ্যে দেনার দায়ে জাল নথি দেখিয়ে বাড়িটা কিনে নিয়েছে নামমাত্র কয়েকটা টাকা দিয়ে।
— মোহরের ঘটিটা কোথায় পুঁতে রেখেছেন?
— পূর্বে যেটা আমাদের বাড়ি ছিল এখন দর্পনারায়ণ সিংহের বাড়ি, সেখানে দক্ষিণ দিকে প্রাচীরের গায়ে যে অশ্বত্থ গাছ আছে তার তলায়। আমি এখনো ওই গাছেই থাকি। যতদিন ওই মোহরগুলো পুরঞ্জনের হাতে পৌঁছে দিতে পারছি এবং মনোরমা সৎপাত্রস্থ হচ্ছে ততদিন আমার মুক্তি নাই।
আমার অনুরোধ তুমি বাবা ও-ই মোহরের ঘটিটা উদ্ধার করে পুরঞ্জনের হাতে তুলে দাও।
— ওরে বাবা! আমি পারবো না। ওই ভুতুড়ে জায়গায় আমি যেতে পারবো না।তাছাড়া দর্পনারায়ণ বা তাদের বাড়ির কেউ যদি দেখে ফেলে তাহলে আমাকে মেরে দেবে।
— তোমার কোনো ভয় নেই। রাত্রের বেলা সবাই যখন ঘুমাবে তখন যাবে।
— এতবড় দুঃসাহসিক কাজ করে আমার কি লাভ হবে?
— তোমাকে সাতটি মোহর দেওয়া হবে? বলে বৃদ্ধা প্রেত অদৃশ্য হয়ে গেলো।
আমি সারারাত ভাবলাম ৭ টি মোহরের অনেক দাম। আমি বেকার। টিউশানি করে খাই।তাও অনিশ্চিত। ছাত্রীটির মর্জির উপর নির্ভর করছে।
বাড়িতেও কেউ ভালোবাসেনা। আমার জীবনের কোনো দাম নেই।
এই দুঃসাহসিক কাজ করে এক কন্যাদায়গ্রস্ত বাবার কিছু উপকার করলে ঈশ্বর সদয় হবে। তাঁর কৃপায় একটা চাকরি পেতে পারি। কিন্তু কয়দিন থেকে বৃদ্ধা প্রেতটি আর আসেনা।অনেক রাত জেগে পড়াশোনা করি। সবটাই ভ্রম ভেবে ভাবি, আমি বোধহয় হ্যালুশিনেশনের শিকার।
বৃদ্ধার আসার আশা ছেড়ে আমি পড়াশোনায় মন দিয়েছি। রাত জেগে পড়ি।
একরাত শুতে দেরি হলো। অন্ধকার ঘর। হঠাৎ ফিসফিস মেয়েলি শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। দেখি বৃদ্ধা সামনে দাঁড়িয়ে আছে।বলছে,
— চলো শিগগির। আজ উপযুক্ত অমাবস্যার রাত।দর্পনারায়ণ মদ খেয়ে বেহুঁশ। ওর স্ত্রী বাত বেদনায় যন্ত্রণা কাতর।কড়া ডোজের ঘুমের অষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছে। নিবারন শ্মশান কালির পুজাতে সারারাত ওখানে থাকবে।প্রিয়ংকা মেয়েটি একটা ছেলের সাথে আবদ্ধ ঘরে কুক্রিয়ারত হয়ে রাত কাটাবে।
আমি ধড়ফড় করে উঠে পড়লাম। একটা কালো রঙের জামা প্যান্ট পরে প্রেতের পিছনে পিছনে অনুসরণ করলাম। প্রাচীরের সামনে থমকে দাঁড়ালাম। বললাম
–ভয় করছে।
প্রেতটি বললো
— কোনো ভয় নেই। আমি তোমার সাথেই আছি। পুরো ঘটনাটি তদারকি করবো।
প্রাচীরের উপর উঠে একলাফ দিলাম।দেখলাম এক বিষধর কেলে খরিস ফনা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
ভয়ে আমার শরীর হিম হয়ে গেলো।প্রেতটি বললো
— ওটি আমার পোষা সাপ। ও তোমাকে কিচ্ছু করবেনা।
তারপর প্রেতটি ঈশারা করতেই সাপটি ফনা নামিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেলো। ওই দেখো তোমার সামনে একটা শাবল ও কোদাল।
এই দেখো এই জায়গায় খুঁড়বে।দুহাত খুঁড়তে হবে।
আমি এখন প্রেতের আজ্ঞাবহ এক ক্রীতদাস। শরীরে অযুত শক্তি সঞ্চার হলো। শাবল চালাচ্ছি। কোদাল দিয়ে মাটি অপসারণ করছি। হাত দেড়েক খুঁড়বার পর একসময় টং করে শব্দ হলো। আমি উপু হয়ে হাত ঢোকাতেই এক ঘটিতে হাত লাগলো। আমি ঘটিটি তুলে প্রেতের হাতে তুলে দিতে হাত বাড়ালাম।
প্রেত বললো
— আমাকে কেন দিচ্ছ? তোমাকে যা যা বলেছি তাই করো।বলেই প্রেত অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমি ঘটি হাতে প্রাচীর টপকে নিজের ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে বিছানার উপর ঘটিটি উপুড় করতেই ঝকঝকে মোহরের আলোতে ঘরটি আলোকিত হলো। গুনে দেখলাম। হ্যাঁ একশোটাই আছে। আমি সেখান থেকে ৭ টি মোহর আলাদা করে রেখে দিলাম। ১৮৭০ সালের ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার মোহর। নেট ঘেটে দেখলাম অক্সন প্রাইস তিন থেকে সাড়েতিন লাখ প্রতিটি।পরেরদিন সকাল বেলা ৯৩ টি মোহর এক পুঁটলিতে বেঁধে নিয়ে বের হলাম প্রেতের দেওয়া পুরঞ্জনের ঠিকানায় সেই বস্তিতে।দেখি বস্তির ঘরের সামনে একটি বোখাটে ছেলে পায়চারি করছে। শিস দিচ্ছে। আমাকে দেখে ছেলেটা চলে গেলো।
আমি দরজায় কড়া নাড়তে দরজায় ফুটো দিয়ে আমাকে নিরীক্ষণ করে একটি মেয়ে দরজা খুলে দিল।মেয়েটির পরনে শতছিন্ন শাড়ি।সে তার ছিন্ন আঁচল দিয়ে তার যৌবন ও দারিদ্রতা ঢাকবার চেষ্টা করলো।কিন্তু পারলো না। মেয়েটি ফর্সা ও সুন্দরী। তার অপরূপ রূপ যৌবন দেখে আমার বুকের ভিতর এক আলোড়ন তৈরি হলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম।
–এটি পুরঞ্জনবাবুর বাড়ি?
মেয়েটি ক্ষীণ স্বরে বললো
— হ্যাঁ।কিন্তু বাবাতো বাড়িতে নেই।হাসপাতালে গিয়েছে। আপনি বিকেলে আসুন।
— তোমার নাম কি?
—আমার নাম মনোরমা। আপনি আমাকে বলতে পারেন। বাবা খুব অসুস্থ। বাঁঁচবার আশা নেই।
— আমি যা বলার বিকেলে এসে বলবো। তুমি দরজা লাগিয়ে দাও।আমি ঘরে এসে পুঁটলি খুলে আমার ভাগের অংশের ৭ টি মোহরও তার সাথে ঢুকিয়ে রাখলাম। ১০০ মোহরের পুঁটিলিটি একটা ব্যাগে ঢুকিয়ে বিকেল হলেই বেরিয়ে পড়লাম।
পুরঞ্জন বাবুর বাড়িতে কড়া নাড়তেই মনোরমা দরজা খুলে বললো
—বাবার অবস্থা ভালো না। প্রবল শ্বাসকষ্ট।
আমি বললাম
— আমি কিছু টাকা তোমার বাবার কাছ থেকে ধার নিয়েছিলাম।সেই টাকা ফেরত দিতে এসেছি। তুমি গিয়ে তোমার বাবাকে বলো।
মনোরমা বাবাকে গিয়ে বলতেই
বললো
— ওকে ঘরে আমার কাছে আসতে বল।
আমি গিয়ে দেখলাম পুরঞ্জনবাবু হাঁপাচ্ছেন। বললেন
— আমি কাউকে টাকা ধার দিয়েছি বলে মনেতো হয়না।
আমি ব্যাগ থেকে পুঁটলি বের করে একশোটা মোহর বিছানায় ঢেলে দিয়ে বললাম
— এগুলো সব আপনার।
মৃত্যুপথযাত্রী পুরঞ্জন বাবু মোহরে হাত দিয়ে বললেন
— এগুলো সব আমার?
— হ্যাঁ।সব আপনার।
— তোমার নাম কি বাবা?
— আমার নাম বিভাস চৌধুরী।
আমি বললাম
— আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে।
— আমার আপত্তি থাকবে কেন? এতো সৎ ভদ্র ছেলে আমার জামাই হবে আমিতো বিশ্বাস করতেই পারছিনা। এতো ঈশ্বরের অসীম কৃপা।
মৃত্যুপথ যাত্রী পুরঞ্জন বাবু মনোরমার হাত বিভাসের হাতে দিয়ে বললেন আজ থেকে তোমরা স্বামী-স্ত্রী। আমি কন্যাদান করে গেলাম। দূরে কোথাও শঙ্খধনি হলো। পুরঞ্জনবাবু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। মনোরমা বিভাসের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।তার একচোখে বেদনার অশ্রু অন্য চোখে আনন্দাশ্রু।মনোরমা মোহরগুলো পুঁটলিতে বেঁধে বিভাসের ব্যাগে সযত্নে রেখে, ব্যাগটি বিভাসের কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে বললো
— আজ থেকে এই সম্পদের মালিক তুমি।
বিভাসের বুকে মাথা রেখে বললো
— আমার মালিক ও ভবিষ্যৎ তুমি।
বিভাস দুবাহু প্রসারিত করে মনোরমাকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে বললো
–আজ থেকে তুমি আমার বউ, সহধর্মিণী, গৃহিণী, কলত্র, স্ত্রী,
জীবনসাথি, ভার্যা, অর্ধাঙ্গী।মনোরমা যথাযথ নিয়মে পিতার মুখাগ্নি করে, তেরাত্রি পালন করে, শ্রাদ্ধ শান্তি করে, বিভাসের হাত ধরে ভোর বেলায় ঘর থেকে বেরিয়ে বিভাসের সেই টালির ছাউনি দেওয়া ভুতুড়ে ঘরে এসে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র নিয়ে কলকাতার উদ্যেশ্যে রওনা হলো।
সেখানে দিন কয়েক উন্নত মানের হোটেলে থেকে চাকরির সন্ধান করতে করতেই এক প্রাইভেট মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে বিভাসের উচ্চ বেতনের চাকরি হয়ে গেলো।
ব্যাঙ্ক লোনে ফ্ল্যাট কিনে, ব্যাঙ্কের লকারে মোহর রেখে বসবাস করতে লাগলো।
গল্পের শুরুতে লিখেছি, বিভাস তার জীবনকাহিনী বলছে তার অতি ঘনিষ্ঠের সামনে —–
কে এই অতি ঘনিষ্ঠ???
এই অতি ঘনিষ্ঠ মেয়েটি আর কেউ নয়। সে যে মনোরমা।
একদিন রাতে যখন বিভাস ও মনোরমা প্রেমালাপে মত্ত।সেই সময় এক অজানা নাম্বার থেকে ফোন কল এলো।মাইক্রোফোন অন করে মনোরমা-বিভাস ফোন রিসিভ করতেই অপরপ্রান্ত থেকে বললেন।
–আপনি কি বিভাস চৌধুরী?
বিভাস বললো
–হ্যাঁ। আমিই বিভাস চৌধুরী। বলুন।
— আমি বহু চেষ্টায় আপনার ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে আপনাকে ফোন করছি।আমি আপনার পিতামহের উকিল। খুব ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল আপনার দাদুর সাথে। তিনি তার সমস্ত স্থাবর অস্থাবর বিষয় সম্পত্তি আপনার নামে উইল করে গেছেন। তার হার্ড কপি আমার কাছে। নিয়ে যান। আর একটি কপি দাদুর আলমারিতে। বাড়িতে গিয়ে বারবার খোঁজ নিয়েছি।তারা বলেছে। বিভাস নিখোঁজ। নিরুদ্দেশ। তারা এই উইলের কথা জানে। আপনার দাদু নিজের হাতে লেখা একটা চিঠিও দিয়ে গেছেন আমাকে
— চিঠিতে কি লিখে গেছেন?একটু পড়ে শোনান।
— তিনি লিখেছেন —
প্রিয় দাদুভাই বিভাস।সবাই জানে আমি বধির। কিন্তু আমি যে হেয়ারিং এড লাগিয়েছি সে কথা কেউ জানতো না। আমি তাদের সব কথা শুনতাম। তারা যে আমার মৃত্যু কামনা করতো, তোমাকে নির্যাতন করতো, ঠিকমতো খেতেও দিতো না।মাছ রান্না হলেও বলতো আজ নিরামিষ। দ্বিতীয় বার ডাল তরকারি চাইলেও দিতোনা।নিত্য কথার বাণে তোমাকে জর্জরিত করতো। আমি সব শুনতাম। তুমি বেকার। চাকরির চেষ্টা করেও তুমি পাওনি।তোমার নিদারুণ কষ্টের কথা ভেবে ও ভবিষ্যৎ ভেবে স্থাবর অস্থাবর সব সম্পত্তি তোমার নামে উইল করে গেলাম।
ব্যাঙ্কে সব তোমার নামে নমিনী করে দিয়েছি।আমার মৃত্যুর পর ব্যাঙ্ক লকারের সবকিছু তুমি পাবে।
ইতি তোমার দাদু।আমার শরীর ভালো নেই। আপনি যদি ফোন করে একবার আসেন তাহলে খুব ভালো হবে। এসে আপনাকে উইল করে দেওয়া নথিটি নিয়ে যান।আপনার দাদুর আত্মা শান্তি লাভ করবে।
এখন রাখছি।শুভ রাত্রি।ফোন লাইন অফ হলে বিভাস সেই ব্যাগ থেকে জ্যোতিষের ভবিষ্যৎ বাণী লিখিত কুষ্টিটা মনোরমাকে পড়তে দিল।
মনোরমা বললো
— এক্কেবারে সবই ভবিষ্যৎ বাণী পুরো মিলে গেছে। কিন্তু এখানে লেখা আছে তোমার কুষ্টিতে সুন্দরী, সুচরিত্রা,বিনয়ী, শ্রদ্ধাবতী স্ত্রী হবে।
আর এক যোগে লিখেছেন স্ত্রী স্থান খুব শুভ। খুব সুন্দরী স্ত্রী লাভ হবে।বিনয়ী, নম্র,সর্বসুলক্ষনযুক্তা, সুচরিত্রা,স্বামীপ্রিয়া হবে।মনোরমা জিজ্ঞেস করল–
তোমার স্ত্রীর কি এসব গুন আছে?
বিভাস মনোরমাকে জড়িয়ে ধরে বললো
— হ্যাঁ। কুষ্টিতে লিখিত সব গুন তোমার আছে।শুধু তাই নয় সব কিছুই সঠিক।
আগে জানতাম জ্যোতিষের ভবিষ্যৎ বাণী ঠিক হয়না। এখন তোমাকে পেয়ে আর সবকিছু পেয়ে মনে হচ্ছে ভবিষ্যৎ ভবিতব্য। -
গল্প- ভালোবাসার গল্প
ভালোবাসার গল্প
জ্যোৎস্না ধোয়া রাত্রি। আকাশে বাঁকা চাঁদ। দূরে ঝাউবন। শালবনে অরণ্য পাখির ডানা ঝাপটানো। গভীর জঙ্গলে সোম শেখর পাহাড়িয়া রাস্তায় ল্যান্ড রোভার জিপ চালিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে ওর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী মধুরিমা।
সোম শেখর এই ফরেস্টের রেঞ্জার। মধুরিমা শহরের মেয়ে। এই প্রথম এমন গভীর জঙ্গলে ওর প্রথম আসা। এমন গভীর জঙ্গল, এমন সবুজ বনানী, শহরে বসে ভাবা যায় না। চন্দন ওকে ছেড়ে চলে যাবার পর, প্রবল বিষন্নতা ঘিরে ধরেছিল মধুরিমাকে। তাই মা বাবা যখন এখানে বিয়ে ঠিক করলেন, ও আপত্তি করেনি। পাঁচ বছর ধরে ভালোবেসে, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে এভাবে চন্দন ওকে একলা ফেলে রেখে চলে যাবে, মধুরিমা কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি। হৃদয়ের এই ক্ষত ভুলে যাওয়া সহজ নয়। চন্দন সুযোগসন্ধানী, প্রবল স্বার্থপর। এখন বড়লোকের মেয়ে বিয়ে করে, চাকরি বাগিয়ে সুখে সংসার করছে। মধুরিমা ভাবে, সকলে ভালোবাসার মূল্য বুঝতে পারে না, আর অংক করে ভালবাসতে শেখে নি ও।
পাহাড়ের পাকদণ্ডী পথ পেরিয়ে সোমশেখর গাড়ি চালাচ্ছিল, হঠাৎ মধুরিমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
তোমার ভালো লাগছে তো,
হুঁ,
তুমি কলকাতায় থাকা মানুষ, প্রথম প্রথম অসুবিধা হবে, পরে মানিয়ে যাবে।
মধুরিমা এমনিতেই যথেষ্ট সুন্দরী। আজ আবার বরের সঙ্গে বেরোবার সময় দারুন সেজেছে। ও বলল, ভালো লাগছে, এখানে শহরের কোলাহল নেই।
পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছো,
হুঁ,
চাঁদটাকে কি শান্ত দেখাচ্ছে,
আমি পাহাড়ে চাঁদ দেখি নি কোনদিন,
গাছের ফাঁক দিয়ে তারা দেখা যাচ্ছে,
ভারী সুন্দর তো,
কাঁঠালি চাঁপা ফুলের গন্ধ পাচ্ছো,
হ্যাঁ, এই এগুলো কি গাছ,
দোলনচাঁপা,
আহ, ভারি সুন্দর তো,
তোমার ভাল লাগছে,
খুব,
আমাদের বাড়ির জানালা দিয়ে লোটা পাহাড় দেখা যায়,
তাই বুঝি,
হ্যাঁ তুমি ঝর্ণাও দেখতে পাবে, তোমাকে একদিন নিয়ে যাবো,
জায়গাটা ভারী নির্জন,
নির্জনতার আলাদা পরিভাষা আছে, দেখতে দেখতে ভালো লেগে যাবে,
আমারতো প্রথম দিনেই ভালো লেগে গেছে,
তোমার শীত করছে,
নাতো,
গভীর অরণ্যে সোম শেখর অর্জুন গাছের পাশে গাড়ি দাঁড় করালো। পাহাড়ের ঢালপথে দাঁড়িয়ে রাতের জ্যোৎসনা দেখল। নীল নিবিড় গাছগাছালির ভিড়ে তখন বন ময়ূর সেগুন গাছের মাথায় বসে ছিল। এভাবেই অনেকটা সময় কেটে যায়। হিমেল বাতাস বয়ে যায়। একসময় ওরা গাড়িতে উঠে পড়ে।
সোম শেখর স্টিয়ারিং এ হাত রেখে গাড়ি স্টার্ট করে। পাহাড়িয়া পথের ল্যান্ড রোভার এগিয়ে চলে।
মধুরিমার চন্দনের কথা মনে পড়ছিল। চন্দন কলেজে ওর দু বছরের সিনিয়র। দারুন সপ্রতিভ, অতিশয় সুদর্শন। ওর বান্ধবী প্রিয়ার দাদা। ওদের বাড়িতেই চন্দনের সঙ্গে প্রথম মধুরিমার আলাপ।
তারপর চন্দন ওকে একদিন ভালোবাসার কথা জানায়। মধুরিমা সময় চায়, ভেবে দেখার।এরপর একদিন চন্দন ওকে কফি হাউসে দেখা করতে বলে,
মধুরিমা কফিহাউসের পৌছে রবি ঠাকুরের ছবির সামনে চন্দনকে বসে থাকতে দ্যাখে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। মধুরিমা সামনে যেতেই চন্দন হেসে বলে, এসো, তোমার আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো,
না,
তাহলে কি ডিসিশন নিলে,
বাড়ি থেকে বিয়ের কথা ভাবা হচ্ছে না,
তুমি কি ভাবছো,
আগে পড়াশোনা কমপ্লিট হোক,
আমি কি ওয়েট করব,
এ ব্যাপারে আমি এখনই কিছু ভাবি নি,
চন্দন বলেছিল, কিন্তু আমি যে তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি,
চন্দনের আসল চেহারাটা বুঝতে অনেকটা সময় লেগেছিল মধুরিমার।
সোম শেখর অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিল, হঠাৎ বলল, এই, চুপচাপ যে,
এমনি,
কি ভাবছো,
কিছু না,
বাড়ির জন্য মন খারাপ,
না না,
আমাকে তোমার ভালো লাগেনি,
হ্যাঁতো,
আর, এই জায়গাটা,
ভারী সুন্দর,
থাকতে থাকতে ভাল লেগে যাবে,
আপনি খুব গাছপালা ভালোবাসেন, না।
আপনি নয়, তুমি। হ্যাঁ ,প্রকৃতি আমার খুব প্রিয়।
তাই,
সকাল হলে দেখতে পাবে কত বনফুল ,কত রকমের পাখি,
প্রকৃতি বন্ধু হলে কেমন লাগে,
মনটা পবিত্র হয়,
আর,
মনটা শিশুর মত হয়, শহরে এ সব পাওয়া যাবে না,
ঠিক বলেছো, শহরে মেকি মানুষের ভিড়,
আমি সরল মানুষ ভালবাসি, প্রকৃতির মধ্যে সেই সরলতা পাই, এখানকার আদিবাসী মানুষেরা আমায় ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে।
মধুরিমা সোম শেখরের কোলে হাত রাখলো।
কিছু বলবে,
না,
মনে মনে বলল, এমন স্বপ্নময় পুরুষ ঈশ্বরের আশীর্বাদে মেলে,
আমাকে ভালবাসবে তো তুমি,
মধুরিমা বলল, বাসি তো,
সোম শেখর বললো, আমি কবিতা ভালোবাসি। কিছু লিখেছিও কবিতা। তুমি সঙ্গে থাকো, জীবনটাকে আমি কবিতার খাতা বানিয়ে তুলবো,
তাই বুঝি,
মধুরিমা, তুমি আমার কবিতা হবে,
ওদের গাড়িটা তখন একটা ঝর্নারপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। মধুরিমা ভাবল,চন্দনের মত চালিয়াত স্বার্থপর পুরুষ এই ভালোবাসার মূল্য বুঝবে না।
মধুরিমা মনে মনে বলল, আমি প্রতিদিন তোমার কাছে বারে বারে নতুন হয়ে আসবো,
সোম শেখর বলল, আমি কবিতার স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চাই, তুমি সঙ্গে থেকো,
ততক্ষনে ওরা ওদের বাংলায় ফিরে এলো। গেটে দারোয়ান ওদের দুজনকে স্যাল্যুট জানালো।
সোমশেখর বলল, তোমাদের মালকিন।
দারোয়ান মধুরিমাকে
বলল, রেঞ্জার সাব বহুৎ আচ্ছা আদমী আছে, এরিয়ার লোক ওনাকে ভগমান মানে।
মানুষটার জন্য মনে মনে গর্ব হলো মধুরিমার। এই স্বপ্নময় পুরুষটির সঙ্গে সুন্দর একটা মনের মত সংসার রচনা করছে হবে ওকে। এমন মহার্ঘ মানুষটিকে সুখী করাই হবে ওর একমাত্র কাজ।
নীল পর্দা সরিয়ে মধুরিমা ঘরে ঢুকলো।
সোম শেখর গাড়ি গ্যারেজ করে ঘরে ঢুকে মধুরিমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, তোমাকে আমি কবিতা বলে ডাকবো, তোমার আপত্তি নেই তো,
মধুরিমা বলল, কেন,
সোম শেখর বললো, আমার জীবনে এতদিন ছন্দ ছিল না, তুমি এলে, ছন্দ এলো, তুমি আমার কাছে কবিতা ছাড়া আর কি,
মধুরিমা তখন গভীর আবেগে স্বামীর বুকে মুখ রেখে গভীর আবেগে, প্রবল ভালবাসার সুখে কেঁদে ফেললো। এই প্রথম ও অনুভব করল, ওর জীবনে এমন সুখের কান্না অপেক্ষা করেছিল, মধুরিমার জানা ছিল না। -
গল্প- রাতের কালো
রাতের কালো
-উজ্জ্বল দাসকলকাতায় একটা চায়ের কোম্পানিতে কাজ করার সূত্রে রোজ ভোরবেলা বাড়ি থেকে বেরোতে হয়, ফিরতে ফিরতেও প্রায় রাত নটা। এভাবেই অভ্যস্ত মসলন্দপুর স্টেশন অন্তর্গত রসুই গ্রাম নিবাসী শম্ভুনাথ মন্ডল। হেসে খেলেই দিন গুজরান এককথায়।
কোনো এক হেমন্তের সকালে শিরশিরানি হাওয়ায় বেশ ফুরফুরে মনেই পৌঁছে ছিলেন অফিস। কাজকম্ম সেরে সারাদিন পর যখন বাড়ির পথে রওয়ানা হলেন তখন সন্ধে। ভিড় বাসের হাতল ধরে শিয়ালদহ স্টেশনে এসে তো ওনার চোখ কপালে উঠেছে। থিকথিক করছে কালো মাথা। ট্রেন অবরোধ। সারাদিন অফিস সামলে, ফেরার সময় এ যে মহা বিপদ। কিন্তু উপায় নেই। এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। খাবারও নেই। সাকুল্যে সঙ্গে রয়েছে আধ বোতল জল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন শম্ভুনাথবাবু। এদিকে অবরোধ উঠে ট্রেন কখন চালু হবে তার বিন্দুমাত্র আভাস নেই এই জনারণ্যে। শিয়ালদহ থেকে মসলন্দপুর প্রায় দেড় ঘন্টার জার্নি। অগত্যা ট্রেনের অপেক্ষাই ভরসা।
একটা পিলারের গায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শম্ভুনাথবাবু চোখ দুটো বুজে সবে হালকা ঝিমিয়ে নিচ্ছিলেন। হঠাৎই যেন কানে এলো ট্রেনের নাম ঘোষণা হচ্ছে মাইকে। একটু আশার আলো দেখলেন শম্ভুনাথবাবু। ক্লান্ত শরীরটাকে টানতে টানতে ঘোষণা মতো এগিয়ে চললেন প্লাটফর্মের দিকে। আর যাই হোক অন্য দিনের মতন নিশ্চয়ই ট্রেনটা একটু আধটু ফাঁকা থাকবে এ আশা করা বিলাসিতা। এদিকে ঘড়ি বলছে প্রায় পৌনে বারোটা।
ভিড় ঠেলে কোনও রকমে এক কোণে গিয়ে দাঁড়ালেন একটা কম্পার্টমেন্টে। গাদাগাদি লোকারণ্যের মাঝখানে শম্ভুনাথবাবু ট্রেনে যে উঠতে পেরেছেন এটাই ওনার কাছে বড় অংকের লটারি। এরপর একের পর এক স্টেশন আসছে আর গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে বহু নিত্যযাত্রী। এইভাবে একটা সময় ঘড়ির দিকে তাকালেন রাত একটা কুড়ি। মসলন্দপুর নামতে আরও কুড়ি পঁচিশ মিনিট তো বটেই।
শুনসান মসলন্দপুর স্টেশনে নেমে দেখলেন হাতেগোনা পনেরো কুড়ি জন কিংবা তারও কম। সারাদিন ভাগ্য পরিহাস করলেও মাঝরাতে যেন কপাল খুলে গেল। গোটা পাঁচেক সাইকেল ভ্যান শেষ গাড়ির প্যাসেঞ্জার নিয়ে যাবার জন্য লাইনের ধারে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে। তার মধ্যেই একটা ভ্যান রিক্সায় চেপে বসলেন শম্ভুবাবু।
ক্লান্ত বিষণ্ণ মনে ঘুটঘুটে অন্ধকারে গিয়ে নামলেন চারঘাট। এখান থেকে রসুই গ্রাম প্রায় মিনিট চল্লিশ হাঁটা পথ। শুরু করলেন হাঁটা। কোথাও আল পথ তো কোথাও মোরামের লাল রাস্তা। হঠাৎই দেখলেন বড় ঝিলপাড় চলে এসেছে সেখান থেকে বাড়ি হাতেগোনা মিনিট সাতেক। হনহনিয়ে পা চালালেন। একটু এগোতেই সামনে দেখলেন মেজো শালা পরেশ দাঁত বের করে এগিয়ে এসেছে।
-আরে, জামাইবাবু যে? এত রাতে!
-এই অফিস থেকে ফিরছি। আর বোলো না। প্রাণে যে বেঁচে আছি এই অনেক।
-কেন কেন?
-সারা কলকাতা স্তব্ধ। কথায় কথায় এরা ট্রেন অবরোধ করবে।
-ইসসস, কী ভোগান্তি…
-তারপরে তুমি এখন এত রাতে! কি করছো?
এক গাল হেসে উত্তর পরেশের- আরে জামাইবাবু আপনি দেখছি সবই ভুলে যান।
-হ্যাঁ সত্যিই, আমার আজকে আর মাথার কোন ঠিক নেই কথাটা বলে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছেন…
হঠাৎই যেন শম্ভুনাথ বাবুর ঘোর কাটলো। মনে পড়ে গেল গোটা গ্রাম যখন কলেরা রোগে উজাড় হয়ে যাচ্ছিল পরেশও তখন বাদ পড়েনি। দেড় মাস আগে মারা যায় পরেশ।
তাহলে এতক্ষণ…সাহসে ভর করে একবার পেছনে তাকালেন শম্ভুবাবু। নিকষ কালো অন্ধকার আর ঝিঁঝিঁ পোকারা কানে তালা লাগিয়ে গিলতে আসছে। দমকা একটা ঠান্ডা হাওয়া কানের গোড়ায় এসে সজোরে ধাক্কা মারলো, দেখতে পেলেন না কাউকে। তারপর আর কিছু মনে নেই।
-
গল্প- মিসক্যারেজ
মিসক্যারেজ
–লোপামুদ্রা ব্যানার্জীআরে বাবা আমার তো দেরি হয়ে যাচ্ছে। ব্যাঙ্ক থেকে বলে ছিল ফার্স্ট আওয়ারে আসতে। বাড়িতেই সাড়ে এগারোটা বেজে গেল।
ওগো শুনছো, তাড়াতাড়ি একবার এসে আমার আধার কার্ডটা দিয়ে যাও।
রান্নাঘর থেকে উচ্চ স্বরে আওয়াজ এলো, আমার হাত জোড়া। খাটের গদির নিচে আলমারির চাবির গোছাটা আছে। তুমি আমার আলমারিটা খুললেই দেখতে পাবে একটা টিনের চকোলেটের বাক্স আছে। ওর মধ্যেই রাখা আছে তোমার আমার আধার কার্ডগুলো।
শম্ভু বাবু অগত্যা গদির নিচ থেকে চাবির গোছাটা বের করে সহধর্মিনীর আলামারিটা খুলল। খুলেই তো অবাক। ফিসফিস করে বলে উঠল, এতো শাড়ি! এরাই যা গাদাগাদি ঠেসাঠেসি করে রয়েছে সেখানে কি আর আমার প্যান্ট জামারা জায়গা পায়!
দুজনের দু’টো আলাদা আলমারি না হলে কি চলে সুরভীর। যাক গে এবার দেখি চকলেটের বাক্স কোথায়?
একটু এদিক ওদিক উঁকি মারতেই একদম নীচের থাকে দেখতে পেল বাক্সটা। এটা তো ভ্রমরের পাঁচ বছরের জন্মদিনের চকলেটের বাক্স। কোনো জিনিসটা ফেলতে মন চায় না সুরভীর। নিজের মনেই হাসতে হাসতে বলল কথাগুলো শম্ভু বাবু।
বাক্সটা খুলতেই দেখে বেশ কিছু পুরানো পোস্ট কার্ড, এনভেলব, ইনল্যান্ড লেটার রয়েছে। তারই মধ্যে উঁকি মারছে আধার কার্ডগুলো। নিজের আধার কার্ডটা পকেটে পুরে বাক্সটা বন্ধ করতে যাবে হঠাৎ একটা চেনা হাতের লেখা কাগজ দেখতে পেয়ে থমকে গেল।
বাক্সের একদম নিচের দিকে রয়েছে ভাঁজ করা কাগজটা। কাগজটা হাতে নিয়ে কৌতুহলবশত ভাঁজগুলো খুলে ফেলল।
বেশ বড় বড় হরফে স্পট হাতের লেখায় লিখেছিল চিঠিটা মৃদুলা। মৃদুলা হচ্ছে শম্ভু বাবুর একমাত্র বোন।
সম্বোধন করেছিল এইভাবে,
প্রিয় বৌদি,
জানি না তুমি বেঁচে ফিরে আসবে কিনা? কিন্তু সত্যি বলছি তোমাকে ছাড়া আমি অচল। যেদিন শাঁখা পলা খুইয়ে সাদা শাড়ি পরে আবার ফিরে এলাম বাপের বাড়িতে। সেদিন তুমি অঝোর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে মা’কে বলেছিল, মা মৃদুলাকে রঙিন শাড়িটা পরতে দিই। ওর এই বিবর্ণ চেহারা যে আমি সহ্য করতে পারছি না।
মা বরং বিরক্ত হয়ে বলেছিল, তোমার যত অনাসৃষ্টি কথাবার্তা বৌমা। এই সদ্য বিধবা হয়েছে মৃদুলা। এর মধ্যেই রঙিন শাড়ির কথা ভাবছো! বলি সমাজ সংসারের কথা তো একটু ভাববে। ওর শ্বশুর বাড়িতে জানতে পারলে কি ভাববে!
সেদিন তুমি বলেছিলে, মৃদুলা আর শ্বশুরবাড়ি ফিরবে না। যে মানুষটার জন্য শ্বশুরবাড়িতে থাকতে যাওয়া। সেই মানুষটাই যখন রইল না তখন কিসের আশায় ওমন শ্বশুরবাড়িতে পড়ে থাকা।
মা দাঁত খিঁচিয়ে বলে ছিল, মৃদুলার মেয়ে তো আর বানের জলে ভেসে আসে নি। বারোমাস মামা বাড়িতে থাকলে ঠাকুমা দাদুর কাছ থেকে আর কিছু পাবে ভ্রমর দিদিভাই?
তখন দাদা যদিও বলেছিল, মৃদুলার শ্বশুরবাড়ির অবস্থা খুব যে স্বচ্ছল তা তো নয়। রোজগার তো করতো আমাদের জামাই তুফান। সেই যখন রইল না তখন আর ওখানে পড়ে থেকে কাজ নেই বোনের।
দাদার কথা মায়ের পছন্দ না হলেও মুখে আর কিচ্ছুটি বলে নি সেদিন। আমার ভ্রমরের সব দায়িত্ব তোমরা নিজেদের কাঁধে তুলে নিলে।
স্বামী শোকে কাতর হয়ে আমি প্রায় বিছানা নিয়েছিলাম। আমার যে একটা দু’ বছরের ছোট্ট মেয়ে আছে তা প্রায় ভুলতেই বসে ছিলাম।
তুমি আমার মেয়েকে স্নেহ আর যত্ন দিয়ে আগলে রাখতে সারাক্ষণ। কিন্তু সেই আমিই আজ তোমার চরম ক্ষতি করে দিলাম।
সত্যি বলছি বৌদি তোমার প্রাণনাশের চেষ্টা আমি বিন্দুমাত্র করিনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম তোমার পেটের সন্তানটা যেন না থাকে। কি সাংঘাতিক স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম সেই মুহূর্তে। নিজের সুখের প্রতি এত লোভ আমার। ছিঃ ছিঃ। এই রকম একটা নীচ কাজ আমি করে ফেললাম। আমার যে নরকেও স্থান হবে না। ভগবান যে আমাকেও দগ্ধে দগ্ধে মারবেন।
চিঠিটা পড়তে পড়তে শম্ভু বাবু রাগে কাঁপতে শুরু করেছেন। মাথার মধ্যে যেন আগুন জ্বলে উঠছে। মনে হচ্ছে এখুনি ছুটে গিয়ে মৃদুলাকে ঘর থেকে টেনে বের করে দেওয়া উচিত। নিজের মনে মনে বলে উঠলেন, দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষলাম শেষ পর্যন্ত।
চিঠিটা এখনও শেষ হয় নি। রয়েছে আরো কয়েকটা লাইন। কিন্তু বাকি লাইন কটা পড়ার মতো ধৈর্য আর শম্ভু বাবুর নেই। উনি চিৎকার করে ডাকলেন সুরভীকে।
স্বামীর হঠাৎ এমন তীব্র চেঁচানি শুনে সুরভী তো বেশ ভয় পেয়ে গেল। হাতের কাজ ফেলে, কোনো রকমে রান্নাঘরটা ভেজিয়ে পড়ি কি মরি করে ছুটে এলো নিজেদের রুমে।
সুরভীকে আসতে দেখেই শম্ভু বাবু চিঠিটা দেখিয়ে বলে, এটা কি গিন্নি?
চিঠিটা দেখে সুরভীর গলা প্রায় শুকিয়ে এসেছে। মনে মনে বলে, সর্বনাশ। আমার এত বছরের লুকিয়ে রাখা চিঠিটা ওর হাতেই পড়ল। হে ভগবান এখন কি করে মানুষটাকে সামাল দেবো আমি।
সুরভীকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবার ধমকে উঠলেন শম্ভু বাবু, চিঠিটা নাচিয়ে বললেন, এটার মানে কি?
সুরভী ছুটে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এলো। তারপর অনুনয়ের সুরে বলে, প্লিজ লক্ষ্মীটি একটু কম চিৎকার চেঁচামেচি করো। ঠাকুরঝি পূজোতে বসেছে।
-খুনী, আসামী, ভন্ডদের পূজো ভগবান গ্ৰহন করে না। এটা নিঃশ্চয় তুমি জানো।
সুরভী শম্ভ বাবুর হাত থেকে খপ করে চিঠিটা কেড়ে নিয়ে বলে, এই চিঠিতে ঠাকুরঝি যা লিখেছে তা কিন্তু ষোলো বছর আগের ওর স্বীকারোক্তি। ও তো ওর নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত।সেই অনুতাপ থেকেই চিঠিটা লিখেছিল সেদিন ও ভগবানের কাছে।
-তোমাকে কি চিঠিটা মৃদুলা নিজ হাতে দিয়েছিল?
-না গো না। আমি নার্সিংহোম থেকে ফিরে আসার মাস খানেক পর কিছুটা সুস্থ হয়ে যখন ঠাকুর ঘরে যাই। তখন ঠাকুরের সিংহাসনের কাপড়টা পাল্টাবো ভেবে ওটা তুলতে গিয়ে দেখি হলুদ কাপড়ের নিচে রয়েছে একটা ভাঁজ করা কাগজ। চিঠিটা পড়ে সেদিন আমিও চমকে উঠে ছিলাম।
আর সব থেকে আশ্চর্য হয়ে ছিলাম যে মৃদুলা ইচ্ছে করে বাথরুমে সাবান জল ফেলে রেখেছিল। যাতে আমি পা পিছলে পড়ে যেতে পারি।
শম্ভু বাবু একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আজও চোখের সামনে তোমার অসহায় মুখটা ফুটে ওঠে আমার মাঝে মধ্যেই। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলে তুমি তখন। বাথরুমের মধ্যে এমন ভাবে পড়ে গিয়েছিল যে দেওয়ালের কিনারায় লেগে কপালটা ফেটে গিয়েছিল। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল বাথরুমের সাদা মার্বেলগুলো । হসপিটালে নিয়ে যেতে যেতেই তুমি পথেই জ্ঞান হারালে। আমি সমানে তোমার চোখে মুখে জলের ছিটা মারছিলাম। কিন্তু তোমার জ্ঞান ফিরে আসেনি তখন। নার্সিংহোম-এ পৌঁছানো মাত্রই ডাক্তার তোমাকে ও.টি-তে নিয়ে যেতে বলল। ঘন্টা দেড়েক পরে ডাক্তার বাবু বিষন্ন মুখে জানালেন, ‘মা কে বাঁচাতে পারলেও বেবিকে পারলাম না এবং পরবর্তীতে ম্যাডাম প্রেগন্যান্ট হতে গেলে বেশ কিছু কমপ্লিকেশন দেখাও দিতে পারে। আই মিন মিস ক্যারেজ হতেও পারে ।’
সেদিন আমার মতো শক্ত পুরুষ মানুষের চোখও জলে ভরে উঠেছিল।মাও খবরটা শুনে দুঃখ পেয়েছিল খুব। তবুও মা সেদিন তোমাকেই দুষে ছিল।মা আক্ষেপ করে বলেছিল, বৌমার তো সবেতেই অনাসৃষ্টি কান্ড কারখানা। মৃদুলাকে সাদা শাড়ি পরতে দিল না কোনোদিন। একাদশী করতে দিল না একদিনও। মাছ মাংস ডিম সব খাওয়ানো চাই বিধবা ননদকে। এত অনাচার করলে কি আর ধর্মে সয়। ভগবান একদম টের পাইয়ে দিল। মিসক্যারেজ হয়ে গেল।
শম্ভু বাবু সুরভীর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি যখন এই চিঠিটা পেলে তখন আমাকে কিচ্ছুটি কেন জানালে না?
একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুরভী বলল, যাকে ভগবান সব দিক থেকে মেরে রেখেছে। তাকে আর নতুন করে কি শাস্তি দেবে মানুষ। যে ছোট্ট শিশুটা পৃথিবীর আলো দেখতেই পেল না। তার জন্য দুঃখ করে মনের কষ্ট বাড়িয়ে কি লাভ হতো। বরং ভগবান যখন ভ্রমরের মতো একটা ফুটফুটে মেয়ের দায়িত্ব আমাদেরকে দিয়েছে তখন ওকেই মন প্রাণ দিয়ে লালন পালন করা ভালো নয় কি?
চিঠির শেষ লাইনগুলো নিঃশ্চয় তুমি পড়োনি। পড়লে আর ঠাকুরঝির শাস্তির কথা ভাবতে না।
ঠাকুরঝি লিখেছিল, বৌদি আমি যখন শুনলাম তুমি মা হতে চলেছো তখন আমার মনে একটা ভয় তৈরি হলো। এই ভয়টা ছিল আমার মেয়ে ভ্রমরকে নিয়ে। দুবছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে মামা বাড়িতে আশ্রয় পাওয়ার পর থেকেই ও তোমাদের চোখের মণি হয়ে উঠেছে। দাদা তো অফিস থেকে ফেরার পথে ভ্রমরের জন্য কিছু না কিছু আনবেই রোজ। আর তুমি তো ভ্রমরের যশোদা মা। আমার থেকে বেশি ও তোমার কাছে আবদার করে।
সেইখানে আর একটা বাচ্চা এলে আমার মেয়ের আদর যে কমে যাবে। তোমাদের ভালোবাসাও কমে যাবে ধীরে ধীরে। এইসব ফালতু কথা ভাবতে ভাবতে আমার বুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়। আর এই কান্ড জ্ঞানহীন, অনৈতিক কাজটা করে ফেলেছি বৌদি তোমার সাথে। প্লিজ ভগবান আমাকে ক্ষমা করে দিও। বৌদির সামনে গিয়ে এইসব কথাগুলো বলার সৎ সাহস আমার নেই। তাই তোমাকেই লিখে জানালাম সব কথা।
শম্ভু বাবুও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আমি ভাবতেই পারছি না আমার নিজের বোন আমাদের সঙ্গে এমন কাজ করল!
সুরভী শম্ভু বাবুর গায়ে হাত বুলিয়ে বলে, মন খারাপ করো না। আমাদের নিজেদের সন্তান না হলেও ভ্রমর কিন্তু আমাদের সন্তানেরও বেশি।এতো বাধ্য, বিনয়ী মেয়ে সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না।
নাও আর দেরি করো না। ভ্রমর টিউশনি থেকে সোজা ব্যাঙ্কে চলে যাবে বলেছে। মেয়েটার আজ প্রথম ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হবে। খুব আনন্দ ওর।
পর মুহূর্তেই শম্ভু বাবুকে অনুরোধের স্বরে সুরভী বলে, প্লীজ ঠাকুরঝি’র এই স্বীকারোক্তির কথা তুমি আমি ছাড়া দ্বিতীয় ব্যাক্তি কেউ না জানে। এত বছরের পুরানো কথা আর খুঁচিয়ে ঘা করার দরকার নেই।
শম্ভু বাবু হালকা দু’চোখ বন্ধ করে স্ত্রীকে বুঝিয়ে দিলেন, ঠিক আছে। তাই হবে। ক্ষমার চেয়ে বড় ধর্ম আর কিছু নেই যে সংসারে। -
গল্প- ভূমিকার ভুমিকায়
ভূমিকার ভুমিকায়
– সঞ্চিতা রায়(ঝুমকোলতা)ভূমিকা রায়ের আজকে খবরের কাগজে অনেক বড় একটা সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গানের শ্রোতা আজ সারা পৃথিবী জুড়ে। আর তাঁর গানের ছাত্রীরা কেউবা রিয়েলিটি শো তে প্রথম, কেউবা সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর কাছে গান শিখে অনেকেই আজ জীবনে নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত।
সাংবাদিক- আপনার ছোট বেলার কথা বলুন ভূমিকা- যৌথ পরিবারে ভীষণ আদরের মেয়ে ছিলাম। অনেক ভাইবোনের সাথে ঠাকুমা, দাদু, জেঠিমা-জেঠু, বাবা-মা পিসিদের স্নেহ আদরে বেশ কেটেছে ছোটবেলা।
‘গান শিখেছিলেন ছোটবেলায়?’
‘আমার জেঠু, কাকু, বাবা সবাই ভালো গাইতেন, মা’ও গান জানতেন। তাই সঙ্গীত মুখর পরিবেশেই আমার বড় হওয়া।’
সাংবাদিকরা চলে গেছেন অনেকক্ষণ। বাংলায় অনার্স করার পর বড়ির সবাই চাইলো, বিয়েটা দিয়ে দিতে ,আপত্তি করেনি ভূমিকা। নির্মাল্যকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিল ভূমিকার। হ্যাঁ, খুব সুখী হয়েছিল তারা। দু’বছর পর সৌজন্য এল। ভীষণ খুশী ভূমিকা ও নির্মাল্য। ভীষণ যত্নে বড় করতে লাগলো ছেলেকে। কিন্তু হঠাৎই ছন্দপতন। নির্মাল্যর কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল হঠাৎ। আর কোনো চাকরি পেল না নির্মাল্য। আর্থিক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হতে হতাশা গ্রাস করলো নির্মাল্যকে। একটা বেসরকারী স্কুলে যোগ দিল ভূমিকা। কিন্তু সৌজন্য যে বড়ই ছোট তখন। বাধ্য হয়ে ছোট ব্যবসা করার কথা ভাবতে শুরু করলো ভূমিকা। দু’বছর পর নির্মাল্যর আকস্মিক মৃত্যুতে ছেলেকে নিয়ে ভীষণ অসুবিধায় পরে গেল ভূমিকা। নিজের গয়নাগুলো বিক্রি করে ছোট করে ব্যবসা শুরু করলো ভূমিকা। স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে ব্যবসায় মন দিল। বেসরকারী স্কুল তো, বড়ই কম মাইনে ছিল। বাবা-মা, জেঠু আরো সবাই আর্থিক দিক থেকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ভূমিকার ছিল প্রবল আত্মসম্মান । কারুর সাহায্য ছাড়াই নিজে কিছু করার চেষ্টা করতো সব সময়। ব্যবসার পাশাপাশি ছেলেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত সেই পড়িয়েছে। গৃহশিক্ষকতাও করেছে পাশাপাশি । তার ভাল৬লাগার জগৎ গান করা, আঁকা সব হারিয়ে গেল জীবন থেকে। একা মা হিসাবে একমাত্র ছেলেকে সবটুকু দিয়ে দিল। নিজে কম খেয়ে ছেলেকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াত। হ্যাঁ, সেই অর্থে ছেলে তাকে নিরাশ করেনি। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। বড় অঙ্কের মাইনে তার। কিন্তু !‘বাবু আমার জন্য একটা পেঁপে আনবি আজ? মাংস দিয়ে খুব পেঁপে খেতে ইচ্ছা করছে রে’
‘তুমি জানো পেঁপের এখন কত দাম? আমাকে ফ্ল্যাটের ইএমআই দিতে হয়, অত পারবো না! পাশ থেকে বৌমার গলা ‘বাবা তো একটা বাড়িও রেখে যায়নি, সবই আমাদের করতে হচ্ছে অথচ লোলা দেখ’
‘কিন্তু বাড়িটাতো আমি তোকে পড়ানোর জন্যই বিক্রি…’ কথাটা শেষ করতে দিল না ছেলে।
‘ছাড় তো ওসব সব বাবা-মা’ই সন্তানের জন্য করে, নতুন কি করেছো তুমি? চোখের জল আসে ভূমিকার। বাড়িটা থাকলেও হয়তো নিজের মত করে যেভাবে হোক জীবনটা কাটিয়ে দিত। ছেলে একই কোম্পানিতে চাকরিরতা বান্ধবীকে বিয়ে করেছে। তিয়াসা বোস। তিয়াসা আর সৌজন্য একসঙ্গে গাড়ি করে অফিস যায়, একসঙ্গেই ফেরে। রাতে খেতে বসে, ‘এ কী খাবার বানিয়েছে তোমার মা? এত কম তরকারী!’
‘সারাদিন কী করো বসে বসে? আমার বউ সারাদিন খেটে আসার পর কি রান্নাও করবে?’
‘বাবু আমার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না একটা রান্নার লোক রাখ না!’
‘আমার কি টাকার গাছ দেখেছো?’ এইরকম নানা ঘটনায় জর্জরিত হতে হতে ভূমিকা খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে দেখলো কোনো একটা ছোট পরিবারে বাচ্চা দেখা আর রান্নার জন্য লোক লাগবে। ভূমিকার মনে হল এই ভাবে অসম্মানিত হওয়ার চেয়ে খেটে খাওয়া ভাল। ফোন করলো। দেখা করতে গেল এবং কাজটা নিল। ‘তুমি কি আমার মান সম্মান সব নষ্ট করে দেবে? শেষে এই কাজ! কোনো দরকার নেই।’
‘আমাকে যে তোর কথা শুনতেই হবে এমন তো কথা নেই। তুই যদি রোজ আমার অসম্মান করতে পারিস, তোর সম্মান নিয়ে ভাবার দায়িত্ব আমার নয়। পারলে আমায় আটকা, আমারও কিন্তু মহিলামহল আছে।’ দৃঢ় কণ্ঠ ভূমিকার। ফোনটা বাজছে… অতীতে হারিয়ে যাচ্ছিল ভূমিকা। “ঠাম্মি আজ আমার একটু দেরী হবে, চিন্তা কোরো না কিন্তু।’
সাজির ফোন। হ্যাঁ, এই সাজিকেই ছোটবেলা থেকে দেখাশোনা করে বড় করে তুলেছে। আজ সে সাজির নিজের ঠাম্মি হয়ে উঠেছে।দরজার বেলটা বাজালো ভূমিকা- ‘আপনারা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, তাই এসেছি। ‘ছোট্ট সাজি ভূমিকার কোলে পিঠে মানুষ হচ্ছে। সাজির বাবা, মা, সাজি সবাই ভূমিকাকে খুব ভালোবাসে। সাজির বাবা মা ভূমিকাকে নিজের মায়ের মতই দেখে। সাজি ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে। একদিন সাজির বায়না সে গানের রিয়েলিটি শো তে যাবে। অডিশান দেবে। ‘কিন্তু তুই তো সেই ছোটবেলা কিছুদিন গান শেখার পর আর শিখিস নি কি করতে যাবি?’
‘আমাকে যেতে দাও।’
সে কী! সাজি অডিশানে সফল হয়েছে। তার চেয়েও আশ্চর্য রিয়েলিটি শো তে সে প্রথম হয়েছে। মঞ্চে সবাই যখন হাততালি দিচ্ছে, সাজি তার গুরু মা’কে সামনে আনে। হ্যাঁ, ভূমিকাই তার গুরু মা। অনেক অনেক অভিনন্দন শুভেচ্ছা আর পুরস্কার পায় তারা।হারমোনিয়ামটা অনেক দিন কোনো কাজে লাগছিল না। একদিন ভূমিকা সাজিকে বলে,’আমাকে একটু বাজাতে দেবে? আমার জীবন থেকে তো বহুদিন গান হারিয়ে গিয়েছে, দেখি পারি কিনা! এত দিন চর্চা না থাকা সত্বেও ধীরে ধীরে গলা খুলে যায় ভূমিকার। ‘আমায় শেখাবে ঠাম্মি?’ গোপনে চলতে থাকে সঙ্গীত চর্চা। তারপরটা ইতিহাস। আজ অনেক অনেক বাবা, মা তাদের ছেলে মেয়েদের গান শেখাতে চান ভূমিকার কাছে। ভূমিকার আজ অনেক অনেক সফল ছাত্র ছাত্রী। ভূমিকা নিজেও আজ বড় সঙ্গীত শিল্পী। সাজির বাবা-মায়ের কাছে ভূমিকা মায়ের মত। আর সাজি তো তার নয়ন মণি। নিজের নাতনী । শিল্প যে শিল্পীর কাছ থেকে হারিয়ে যায় না, তার বড় প্রমাণ ভূমিকা। তবে সাজিই তার অনুপ্রেরণা। তার গানের স্কুলের নাম সাজি। বিনা পারিশ্রমিকেও অনেককে শেখায় ভূমিকা। আর্থিক দিক থেকে যারা পিছিয়ে তাদের জন্য বেশ কিছু ব্যবস্থা করেছে সে।
আজ ভূমিকাকে বিশেষ সম্মান জ্ঞাপন করা হবে সমাজে তার অবদান ও তার সঙ্গীত প্রতিভার জন্য। সৌজন্য অনেকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে। না, সাড়া দেয়নি ভূমিকা।
অনুষ্ঠান চলছে। সামনের সারিতে সৌজন্য আর তিয়াসা। একে ওকে বলছে ‘ইনি আমার মা।’ অনুষ্ঠানে যখন পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা চলছে, ভূমিকা বলে- ‘এক মিনিট, আজ আমার সব কিছু আমার নাতনী আর আমার ছেলে আর বউয়ের কল্যাণে। আমি তাদের মঞ্চে ডাকতে চাই। লোভে চোখ চিকচিক করে ওঠে সৌজন্য তিয়াসার।
কিন্তু এ কাদের নাম বলছে ভূমিকা! অর্পণ রায়, দিব্যা রায়(সাজির বাবা মা) ও সাজি। আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন তাদের। মঞ্চ আলো করে ভূমিকা ও সাজিরা।
‘শুধু রক্তের সম্পর্কে কিছু হয় না, আত্মিক সম্পর্কটাই আসল। আজ এই তিন জনের ভালোবাসা আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে। এরাই আমার ছেলে, মেয়ে(বৌমা)ও নাতনী। সব মা বাবাকেই বলছি, অবশ্যই সন্তানকে সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করুন, কিন্তু নিজের জন্যেও সময় রাখুন, নিজের ভবিষ্যতের কথাও একটু ভাবুন, তা না হলে সন্তান যদি পেশাগত সফল হয় কিন্তু প্রকৃত মানুষ না হয় বাবা মা পরবর্তী তে বড় অসহায় হয়ে যায়। যেমনটা আমি হয়েছিলাম। আমার ভাগ্য ভালো আমি সত্যি করে প্রকৃত মানুষ সন্তানকে কাছে পেয়েছি। নাই বা হলাম তার গর্ভধারণী তবু সে, তারা আমার জীবনের চলার পথের আলো। আমি যখন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিলাম ঈশ্বর এই আলো আমায় পাইয়ে দেন। হ্যাঁ, সবাই নিজের আত্মপরিচয় গড়ে তুলুক। আবার বলছি, বাবা মায়েরা সন্তানের সাথে সাথে নিজের ভবিষ্যতের কথাও একটু ভাবুন। হারিয়ে যেতে দেবেন না নিজের প্রতিভা। সারাদিনে একটু সময় নিজের জন্যেও রাখুন। একটু হলেও নিজের কথা ভাবুন। সবাই খুব খুব ভাল থাকুন। সারা প্রেক্ষাগৃহ হাততালিতে ভরে উঠলো। -
গল্প- চোখ বুজে…
চোখ বুজে…
– অমল দাস
-রণ বউ এসেছে… রণ’রে বউ…
টুনি ডাকলো। রণজয় শুনেও শুনলো না। বেশ কয়েক বছর আগে বাড়িতে একটি ছোট্ট টিয়া নিয়ে আসে রিক্তা, রণজয়ের বউ। নাম রাখে টুনি -রিক্তার সর্বক্ষনের সঙ্গী। প্রথম প্রথম রিক্তা কথা শেখাতো, এখন পাখিটা খুব কথা বলে। যা শোনে তাও, নিজের থেকেও বাদ দেয়না। টুনি ওদের ছোট্ট সংসারের সদস্য।
টুনি আবার ডাকে –ওরে রণ দ্যাখ বউ …
রণজয় তাও দেখলো না। সে একটি আধখানা চাঁদের মতো চেয়ারে বসে, পা’দুটিকে তুলে দিয়েছে সামনের বারান্দার কার্নিশে। শরীরের ভঙ্গি ঠিক ছাউনি খোলা ডিঙি নৌকার মতো। চেয়ারের ঠিক পিছনেই টেবিল। হাতে খবরের কাগজ। খবরে গভীর ভাবে ডুব দিয়েছে। ভাবখানা -পারলে খবর ডুব দিয়ে তুলে আনে। রিক্তার অভিমান এমন মনঃসংযোগে রণজয় হয়তো তাকে কখনো দেখেইনি।
রিক্তা চা হাতে পিছনেই দাঁড়িয়ে। রণ দেখল না। রিক্তা ধৈর্য হারিয়ে বলল – এখানেই দেবো চা’টা..
রণ পিছনে না তাকিয়েই বলল – সক্কাল সক্কাল স্বামীকে চাটা। এ কি দজ্জাল বউ! তা.. অপরাধ কি হল দেবী ? স্বামী না.. স্ত্রীর পরম গুরু!
রিক্তা বলল – গুরু নয়.. গুরু নয়.. গরু, মাথায় শুধুই ভুষো। এ সুর রণজয়ের চেনা। প্রায়ই শুনতে হয়! যেমন কর্ম, ফল তো আর আলাদা হতে পারেনা! গতে বাঁধা। রণজয় কথা না বাড়িয়ে পিছন না ফিরেই বলল- ও চা এনেছো টেবিলে রাখো।
রিক্তা চা রেখে নিজের চায়ের কাপটা নিয়ে পাশের চেয়ারেই বসলো। রণ কার্নিশ থেকে পা নামিয়ে ভিজে বিড়ালের মতো । টেবিলের দিকে ঘুরে খবরের কাগজটি মুড়ে রাখতে গিয়েই যত বিপত্তি। চায়ের কাপ সটান মেঝেতে –ঝন্ ঝন্ ঝন্ আওয়াজ। কাচের টুকরো মেঝেতে গড়িয়ে গেলো। শুধু কাচ ভাঙার মতো একটা মুখের সহস্র ভাগ দেখা গেলো না।
রণ কাপের দিকে না দেখে রিক্তার দিকে ক্যাবলার মতো চেয়ে রইল। এগুলো রিক্তার খুব যত্নের জিনিস। এখন দেবী কি রূপ ধরে!
টুনি বলে উঠলো- রণ করলি তো কেলো..
রিক্তার চক্ষু রক্তবর্ণ। নাকের পাটা ফুলছে… কমছে। একেই ছুটির দিন, সকাল থেকে খবরের কাগজে মুখগুজে – কথা নেই। তার উপর সাধের কাপ টুকরো টুকরো।
চিৎকার করে উঠলো রিক্তা – দেখেছ.. দেখেছ..! দিলে তো সর্বনাশ করে। দামী কাপসেট’টার তিনটেই শেষ করলে তুমি! হাড়ে লক্ষ্মী নেই গো..
রণজয় চেয়ার নিচু হলো। কাপের টুকরো তোলার ভান করে সোজা রিক্তার পায়ে হাত। রিক্তা চমকে গেলেও পরক্ষনেই দু’পা সরে গিয়ে, কপট গম্ভীর্যে বলে উঠলো -থাক.. থাক.. পায়ে পড়ে মাফ চাইতে হবে না! ন্যাকামি বন্ধ করো।
-দেবী এ ন্যাকামি নয়, প্রান ভয়। গরম চা তোমার পায়ে পড়লো কিনা সেটাই দেখছি।
-পড়লে পড়ুক! তাতে তোমার কি যায় আসে…?
-বাঃ রে.. বউটা তো আমার। চা পড়ে এমন সুশ্রী বউয়ের শরীরে খুঁত ধরে গেলে নিজেকে মাফ করতে পারবো না তো ।
-আদিখ্যেতা। সকাল সকাল ফাজলামির আর জায়গা পেলে না?
– আদিখ্যেতা নয় গো! ও আমার বুকের খাঁচা থেকে বেরিয়ে পড়া ভালবাসা।
-শোন ওই সব ভালবাসা বুকের খাঁচাতেই রেখে দাও। ভালবাসার খাঁচা আর খোকার প্যান্টের কাছা দুই সমান। ঢিল দিলেই খুলে পড়ে মাটিতে।
– সেকি! এসব কি কথা সক্কাল সক্কাল ! (রণজয়ের ঠোঁটে মৃদুহাসি)
-গ্যাট হয়ে বসে না থেকে ঘর থেকে বিদায় হও। একসেট নতুন কাপ নিয়ে এসো।
– সে নয় যাচ্ছি। তবে খাঁচার ভালবাসার একটা ব্যবস্থা হবে না?
রিক্তা আন্দাজ করলো। আদুরে স্বরে বলল- খাঁচা সামলাবে না কাছা?
দুজনেই কাছাকাছি এলো। আবেশে চোখ বন্ধ।
টুনিও চোখ বন্ধ করে বললো- বাঃ রে লজ্জা নেই…
——–সমাপ্ত————-
-
গল্প- বৃষ্টি
বৃষ্টি
-অঞ্জনা গোড়িয়াবৃষ্টি এখন মানসিক কেন্দ্রে। চঞ্চল মেয়েটা কেমন যেন শান্ত হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক শীতল ধীর সরবরের মতো। এখন সে অন্ধকার ঘরে বসে কি সব আঁকি বুকি আঁকে দেওয়ালে। আর তাকিয়ে থাকে বাইরের আকাশের দিকে।
বৃষ্টির মা একবার বাড়িতে রঙীন পাখি পুষে ছিল। সময়ে খেত দিত খাঁচায়। বেশ মজা পেত বৃষ্টি । এক দিন দেখল, কিছু লোক এসে বড় পাখি গুলি বাক্স বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি ছুটে এসে মাকে নিষেধ করল। কিছুতেই শুনল না মা। বুঝিয়ে বলল বৃষ্টিকে, পাখি বিক্রি করেই তো দুটো পয়সা হবে সোনা। সেই জন্যই তো পুষেছি।
বৃষ্টি চুপচাপ শুনল। কি একটা ভেবে চলে গেল। সকালে উঠে মা দেখে অবাক হয়ে গেল। একটা ও পাখি নেই খাঁচায়। বুঝতে আর বাকি রইল না। নিশ্চয় বৃষ্টির কাজ। মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
আমি আর বায়না করব না মা পুতুল কেনার জন্য। পাখি বেঁচে টাকা নিও না। আকাশই ওদের ঘর। কি আনন্দে ওরা উড়ে বেড়ায়,তাই না!
মায়ের রাগ হলেও বৃষ্টির এমন কথার উত্তর দিতে পারল না। সে দিনের পর আর বাড়িতে কিছু পোষে না ।
সেই বৃষ্টিই আজ বন্দী । বন্দী খাঁচা যার পছন্দ ছিল না।বৃষ্টি নাচে গানে পাড়ার সেরা মেয়ে। মাথা ভরতি কোঁকড়ানো চুল। জ্যাঠিমার কাছে বসে টান টান করে বেনি করত। লাল ফিতে দিয়ে ফুল করে নাচ দেখাত। দিন দিন চঞ্চল ছটপটে মেয়েটা কেমন ভয়ে আতঙ্কে শিউড়ে থাকত।
একদিন ভোরে রেলস্টেশনের দিকে যেতে দেখল তাকে। ওই দিকেই পুলিশ স্টেশন। পাড়ার কিছু লোক এসে খবর দিল। বৃষ্টির বাবা ছুটতে ছুটতে গেল।
দেখে, বৃষ্টি রক্ত মাখা ছুড়ি হাতে বসে আছে। বাবাকে দেখেও মুখে কোন সাড়া নেই। বার বার জানতে চাইল কী করেছ বৃষ্টি? ছুড়িটা দেখিয়ে বলল,খুন করেছি। ওই দুষ্টুলোকটাকে। তাই ধরা দিতে এসেছি।
কে সেই লোক? কী করেছে? সবাই জানতে চায়লো।
বৃষ্টি বলতে শুরু করল,
পাড়ার মুদি দোকানদার, রতন কাকুকে খুন করেছি।প্রায় প্রতিদিনই স্কুলের ছোট মেয়েদের খাবারের লোভ দেখিয়ে ভেতরে নিয়ে যেত। আর ইচ্ছে মতো আদর করতো। খুব কষ্ট হতো।কী সব নোংরামো করে বাড়ি পাঠিয়ে দিত। বাড়িতে বলতে বারন করতো। আমাকে ও প্রায় জোর করে চকলেট খাওয়ানোর লোভে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন টিভিতে এক নাটক দেখেই বুঝেছি । এসব খারাপ মানুষের বাজে কাজ। তাই আজ মেরেই ফেললাম। বড্ড জ্বালা দিত সবাইকে। রাগে মাথা গরম হয়ে গিয়ে ছিল। ছুড়িটা বসিয়ে দিলাম পেটে। ব্যাগে ভরে নিয়ে গিয়েছিলাম স্কুলে। ফেরার পথে বসিয়ে দিয়েছি পেটে।
ওই সব দুষ্টু লোকদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। বলো বাবা, আমি ঠিক করেছি কি না?
বাবার মুখে কোন কথা নেই। মেয়ের সাহসীকথায় গর্বে বুক ভরে গেল।
রতন মারা যায় নি। পুলিশ আহত রতন কে তুলে নিয়ে আসে থানায়।
কিন্তু বৃষ্টি আর ফিরতে পারে নি স্বাভাবিক জীবনে।
খাঁচার ভেতর থেকে সে দেখে, আকাশের বুকে কেমন পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে। তালি দিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে আর
বলে ওঠে,” যারে পাখি যা উড়ে যা”। -
গল্প- শিখন
শিখন
-লোপামুদ্রা ব্যানার্জী_কি রে ময়না কখন ফিরে আসলি মৌ দের বাড়ি থেকে?মৌ এর টেস্ট পেপার টা নিয়ে এসেছিস তো?
আমি মুখ টা হাঁড়ির মতো করে জবাব দিয়েছিলাম, না।মৌ আমাকে ওর পুরানো টেস্ট পেপার টা দিতে পারবে না বলেছে।
আমার মা অবাক হয়ে বলল,সে কি কথা! তুই অনেক দিন আগে থেকেই বলে রেখেছিস ওকে যে মৌ এর বোর্ডের পরীক্ষা টা শেষ হলেই ওর টেস্ট পেপার টা নিবি।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখি মৌ আমার থেকে বয়সে এক বছরের বড়ো ছিল।ও আমার পাড়ার বন্ধু ছিল।
আমি একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ছিলাম,তাই তো আমি জানতাম মা।মৌ এর কাছ থেকে টেস্ট পেপার টা পেয়ে যাবো বলেই তো অন্য কোনো দাদা, দিদিকে আগে থাকতে কিচ্ছুটি বলি নি। এখন এদিকে মৌ টেস্ট পেপার টা দেবেনা বলছে। অঙ্কের স্যার তো আগামীকাল থেকেই টেস্ট পেপার নিয়ে যেতে বলেছে টিউশনি তে।
মায়ের মুখ টা ও বেশ চিন্তিত দেখালো। কিছুক্ষণ পর মা বলেছিল, হয়তো ওর সত্যি কোনো অসুবিধা হয়েছে তোকে টেস্ট পেপার টা দিতে। তবে এরপর থেকে আর মৌ এর কাছে কোনো পুরানো বই চাইতে যাস না।
আমি তোর বাবাকে বলছি ।উনি ওনার কোনো ছাত্র ছাত্রীর কাছ থেকে ঠিক একটা পুরাতন টেস্ট পেপার এর জোগাড় করে আনবেন।
এরপর প্রায় মাস খানেক পরের ঘটনা। আমার মনে মৌ কে নিয়ে যেটুকু অভিমান ছিল তা একমাসে নদীর স্রোতের মতো বয়ে গেছে অনেক দূর। আমি আবার আমার বান্ধবীর সান্নিধ্য লাভের আশায় দিনরাত সময় পেলেই মৌ দের বাড়ি ছুটে যাই।মৌ ছিল আমার কাছে অনুপ্রেরণা।ওর হাতের লেখা এতো সুন্দর ছিল যে দেখে মনে হতো যেন টাইপ করে লিখেছে।খেলা ধূলা তে ও তুখোড় ছিল। প্রতি বছর স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতায় প্রাইজে ঘর ভরিয়ে দিতে।আর দেখতে ও ছিল ভীষন সুন্দর।
আমি মৌ কে অনুসরন করতাম মনে প্রাণে।সেদিন রবিবার ছিল। আঁকার ক্লাস থেকে ফিরে এসে টিফিন করেই মৌ দের বাড়ি গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি ওদের উঠানে এসেছে একজন রদ্দি ওয়ালা।মৌ ,মৌ এর দিদি,দাদা ওর মা সবাই মিলে পুরানো বই খাতা ,পেপার গুলো ভালো করে চেক করে রদ্দি ওয়ালা কে দিচ্ছিল। পূজা সংখ্যা,মাসিক পত্রিকা,নাইন,টেনের বই এর মধ্যে লাল হলুদ রঙের এ বি টি এ এর টেস্ট পেপার টা উঁকি মারছিল।আমি বই খাতার গাদার মধ্যে থেকে একরকম ঝোঁ মেরে টেস্ট পেপার টা উঠিয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি সাল টা দেখেছিলাম।বড় বড় করে লেখা ১৯৯৬।
মুহুর্তের মধ্যে চোখ টা ঝাপসা হয়ে এসেছিল।বই টা ফেলে এক ছুটে বাড়ি চলে এসেছিলাম।মৌ যদিও পিছন থেকে ডেকে ছিল। কিন্তু সেদিন আমি আর সাড়া দিই নি। আমার কিশোরী মন সেই দিন প্রথম বুঝতে পেরেছিল বেইমানি কি জিনিষ।
মা রান্না ঘরে খাসীর মাংস রান্না করছিল। খাসীর মাংস হলেই মাকে আমি পীড়াপীড়ি করে বলতাম,মা মৌ কে একটা ছোট বাটিতে মাংস দিয়ে আসি। মৌ মাটন খেতে খুব ভালো বাসে।মৌ কে খাইয়ে আমি খুব আনন্দ পেতাম।
আমি মায়ের পিছনে দাঁড়াতেই মা জিজ্ঞাসা করল, কি ব্যাপার আজ তাড়াতাড়ি প্রিয় বান্ধবীর বাড়ি থেকে ফিরে এলি যে?
আমি আর সেদিন নিজেকে স্থির রাখতে পারি নি।অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল ব্রন ভরা গালে। কাঁদতে কাঁদতে মাকে খুলে বললাম মৌ দের বাড়িতে বই বিক্রির সমস্ত কথা।মৌ যে ইচ্ছা করেই আমাকে ওর পুরানো টেস্ট পেপার টা দেয় নি সেটা বুঝতে আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না।
কাঁদতে কাঁদতে বারবার আমি বলছিলাম,মা তুমি তো জানো আমি মৌ কে কত ভালোবাসি।বাবা ওনার স্কুল থেকে পুরানো প্রশ্ন পত্র, রেফারেন্স বই আনলেই আমি মৌ কে দিয়ে আসতাম।যাতে মৌ এর রেজাল্ট আরো ভালো হয়।মৌ যখন যেখানে যেতে বলত আমি ছুটতাম ওর সঙ্গে।মা বারণ করলে ও খুব একটা শুনতাম না।মৌ ওর জীবন বিজ্ঞানের প্র্যাকটিক্যাল খাতায় সব ছবি ও আমাকে দিয়ে আঁকিয়ে নিত। কোনোদিন না করি নি। নিজের পড়ার ক্ষতি করেও মৌ এর কাজ করে দিতাম।মৌ এর প্রতি আমার একটা টান ছিল।
মা আমার মাথায় নিজের বাঁ হাত টা বুলিয়ে সেদিন বলেছিল,মন খারাপ করিস না ময়না। তুই কাউকে ভালো বাসিস বলেই যে সে তোকে ভালোবাসবে তার কোনো কথা নেই। বরং যে তোকে ভালোবাসে তাকে তুই অবশ্যই ভালোবাসার চেষ্টা করবি।হয়তো সে তোর মতো পড়াশোনায় ততটা ভলো নয়।হতে পারে সে গরীব,হতে পারে সে দেখতে খারাপ।মোট কথা সে হয়তো তোর সমকক্ষ কোনো দিক থেকেই নয়। তবু ও তাকে তুই ভালোবাসবি।কারন সে তোকে ভালোবাসে।যে সম্পর্ক দেওয়া নেওয়ার ভিতের ওপর গড়ে ওঠে তা কিন্তু চিরস্হায়ী হয় না কখনো।এই তো তোর জীবন শুরু।কত ঠকবি তারপর তো শিখবি। সেই শিখন আজীবন কাজে লাগবে।
স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে সংসার জীবনে এসেও আমার বন্ধুর অভাব হয় নি কোনদিন।মৌ এর কাছ থেকে ঠকে আমি শিখে নিয়েছিলাম দেওয়া নেওয়ার সম্পর্কে বন্ধুত্ব গড়া উচিত নয়। বন্ধুত্ব গড়তে হয় কেবল মাত্র বিশ্বাস আর ভালোবাসায়।তাতে বন্ধু সংখ্যা যদি কম থাকে তাও ভালো। -
গল্প-অন্যরকম ভালোবাসার গল্প
অন্যরকম ভালোবাসার গল্প
-সুনির্মল বসুদীঘল দীঘি, ঝাউবন, সুপারি গাছের ছায়া, রাতের জ্যোৎস্না চুঁইয়ে পড়ছে চরাচর জুড়ে, মৃদুল বাতাস মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে, দূর আকাশে সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে।
ছাতিম বন পার হয়ে অনুরাধা এসে দাঁড়ালো দীঘির পাড়ে। সুগত অনেকক্ষণ ধরে ওর জন্য অপেক্ষা করছিল।
-এত দেরি হল?
-টিউশনি সেরে বাস পেতে দেরি হয়ে গেল। -আমার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিলে বুঝি,
-হু,
-সরি, কি করবো বলো,
-না না ঠিক আছে,
-আমারও এভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা করা ভালো লাগছে না,
-আমি তো চাকরি চেষ্টা করছি, না হলে কি করব বলো,
সুগত একটা সিগারেট ধরালো।
-আবার ওইসব ছাইপাশ খাচ্ছো, কতদিন ছাড়তে বলেছি,
+আমার হবে না,
-ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়,
-আমি যাকে ভালোবাসি, তাকে ছাড়ি না,
-ভ্যাট, বাজে কথা বোলো না,
-তারপর, তোমার খবর কি,
-বাড়ি থেকে পাত্র দেখা চলছে, তুমি একটা কাজ যোগাড় করো,
-এখানে কোথায় চাকরি, তবু চেষ্টা তো করছি,
-দ্যাখো, আকাশের চাঁদটা কি সুন্দর,
-হু,
-কী নির্জন প্রকৃতি, তুমি কবিতা লিখতে পারতে,
-আমি যদি জীবনানন্দ দাশ হতাম, অথবা হতাম সুনীল গাঙ্গুলী, তাহলে রাতের এই বর্ণনা লিখে যেতে পারতাম,
-সুনীলদার একটা কবিতা শোনাবে,
“এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি এ হাতে কোন পাপ করতে পারি, এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে ভালোবাসি, এই ওষ্ঠে এত মিথ্যা কি মানায়।”
-দারুন দারুন,
-সামনের সপ্তাহে মন্দারমনি যাবার প্ল্যান আছে, তুমি যাবে,
-ওখানে বড্ড ভীড়,
-আমরা ভিড়ের বাইরে থাকবো,
-তাহলে যাবো,
-একটা কথা জিজ্ঞাসা করব,
-বলো,
-শেখর চ্যাটার্জি এখনো তোমায় ডিস্টার্ব করে?
-পথে দুদিন কথা বলতে চেয়েছিল, আমি পাত্তা দিইনি,
-তোমার বাড়ি কি বলছে,
-মা-বাবার ওর ব্যাপারে আগ্রহ আছে, শত হলেও পয়সাওয়ালা ওরা,
-দুনিয়া টাকার বশ,
-কিন্তু আমি তো ওকে ডিসলাইক করি,
-জানি,
-তোমাকে একটা কাজ জোগাড় করতেই হবে,
-চেষ্টা তো করছি, না হলে কি করব,
+জানো সুগত, আমি বাড়িতে একটা রজনীগন্ধা ফুলের গাছ বসিয়েছি, প্রতিদিন গাছে জল দিই, গাছটা বড় হচ্ছে, গাছটা কি নাম রেখেছি, জানো,
-কি!
-ভালোবাসার গাছ,
-বাহ, এমন সুন্দর করে তুমি ভাবতে পারো,
-পারি তো, আমাদের ভালবাসাও বড় হবে, গাছটাও বড় হবে,অনেকদিন অনুরাধার দেখা নেই।
সুগত হতাশ। কোথাও চাকরির দেখা নেই। বেকারত্বের অভিশাপ ওর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এত ব্যর্থতা নিয়ে জীবন কাটানো বড় শক্ত ব্যাপার।
সেদিন জনতা রেস্টুরেন্টে বন্ধু অনিকেতের সঙ্গে দেখা। কথায় কথায় অনিকেত বলল, ও শুনেছে, শেখর চ্যাটার্জির সঙ্গে অনুরাধার বিয়ে আগামী মাসে।
মাথায় বাজ পড়ল সুগতর।
সুগত নিজেকে বোঝালো, আমি এই শহরে আর থাকবো না, এই শহর আমাকে কিছু দেয়নি, নিজের মতো করে বেঁচে থাকার সুযোগটুকু পেলাম না এই শহরে, আমি এখান থেকে দূরে চলে যাবো,সপ্তাহখানেক বাদে সুগতর কাছে একটা ফোন এলো।
-হ্যালো,
-আমি শেখর চ্যাটার্জী বলছি,
-বলুন,
-অনুরাধার বাড়ি থেকে পাত্র হিসেবে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল,
-এসব জেনে আমি কি করবো,
-আরে শুনুন মশাই,
-হ্যাঁ বলুন,
-আমি অনুরাধার সঙ্গে ফোনে কথা বললাম, ও আপনাকে ভালোবাসে, তাই ওদের বাড়ির প্রস্তাব আমি গ্রহণ করতে পারি নি, আপনি অনুরাধাকে বিয়ে করুন।
-কিন্তু আমার চাকরি নেই, আমি বেকার,
-সেটা সমস্যা হবে না,
-সেটাই বড় সমস্যার,
আমি আপনাদের ভালোবাসাকে সম্মান -দিতে চাই।
-কিভাবে?
-আমার কোম্পানিতে আপনি কাজে যোগ দিন। আপনার কোয়ালিফিকেশন,
-বি.কম অনার্স,
-একাউন্টেন্ট হিসেবে কাজে আসুন।
-আপনি এ কথা অনুরাধাকে বলেছেন?
-না,
-কেন,
-ওর ধারণা, পয়সাওয়ালা লোক মাত্রই খারাপ, আপনি কালই একবার আমার অফিসে আসুন।মধ্যরাত। দীঘির জলে উতরোল ঢেউ। অনুরাধা সঙ্গে দেখা করতে এলো সুগত।
আমার চাকরি হয়েছে, অনু।
-কোথায়,
-শেখর চ্যাটার্জির কোম্পানিতে,
-তাই বুঝি,
-হ্যাঁ তো,
-আমি কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম,
-কেন,
-আমার বাড়ি থেকে যখন বিয়ের প্রস্তাব গেল, আমি তখন শেখর বাবুকে সবকিছু ভেঙে বলেছিলাম,
-উনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন, আমাদের ভালোবাসাকে সম্মান জানাবেন।
-তাহলে,
কাল তুমি একবার আমাদের বাড়িতে এসো। আমার বাবা মা-র সঙ্গে কথা বলো,পরদিন সন্ধ্যায় সুগত অনুরাধারদের বাড়িতে গেল।
ও বাড়িতে তখন খুশির হাওয়া। অনুরাধা বলল,
আমার ভালোবাসার গাছটায় ফুল এসেছে, একবার দেখবে না?
সুগত দেখলো, বাতাসের রজনীগন্ধা সুবাস ছড়িয়েছে। নাকি, গাছে ভালোবাসার ফুল ফুটেছে।
বাইরে মোটর গাড়ির শব্দ।
শেখর চ্যাটার্জী এসেছে।
অনুরাধা বলল, আসুন শেখরদা,
শেখর চ্যাটার্জী সুগতর হাত ধরে বলল, বিয়েতে আমাকে ইনভাইট না করলে, চলবেনা কিন্তু ,ব্রাদার।