-
“হতভাগিনী মা”
“হতভাগিনী মা”
-তন্ময় সিংহ রায়আমার দশ বছরের জন্মদিনে তুমি বাবাকে বলেছিলে…’কি গো শুনছো? এবারে পূজোয় আমি তোমার কাছে কিছুই চাইবো না, তুমি আমার সোনাকে একটা সাইকেল কিনে দাও।’ আমার স্বাধীনচেতা বাবার কাছে চাকরীটা ছিলো হুকুমের গোলাম-এর মতন। স্বভাবতই বাবার ইচ্ছেটা চাকরীর বিপক্ষে বলাটাই এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আদর্শবান নিম্ন মধ্যবিত্তের যে কত জ্বালা বাবা সেটা বুঝতেই চাইতেন না বলতেন, ‘তোমরা কি না খেয়ে-পরে আছো? প্রয়োজনগুলো কি খুব বেশি কষ্ট দিচ্ছে তোমাদের?’ মনে হতো পরোক্ষভাবে বাবা বোঝাতে চাইতেন, গ্রামের রবীন খুড়ো, দিপু’র মা, শুক্লাদি, ঝুনু মাসি ওদের ছায়ায় বসে অনুপ্রেরণা কুড়াও গভীর মনযোগে। বিশেষত অর্ধাহারে, অনাহারে থাকা পাড়ার যত পড়াশুনা করা ছেলে-মেয়ে, প্রায় বেশিরভাগের-ই উপকরণসহ যথাসম্ভব শিক্ষা সরবরাহের একমাত্র অফিস ছিলো যেন বাবার ওই প্রাচীন আধখাওয়া ফ্যাকাসে লাল উন্মুক্ত ইঁটগুলোর ঘরটা। কেউ সারামাস পড়ে একটা লাউ, কেউ দু-কৌটো চাল আবার কেউবা তার পুকুরের মাঝারি সাইজের দু’টো পোনা মাছ নিয়ে হাজির হতো। এক্ষেত্রে বাবার অপছন্দটা বিশেষ গুরুত্ব পেতো যে না, তা আমি আর মা বেশ ভালোই বুঝতাম। একনিষ্ঠভাবে সারাটা জীবন পাড়ার ছেলেমেয়ে মানুষের দায়িত্বেই বাবা হয়ে গেলেন বার্ধক্যের বাহাত্তর। আমার তখন সাতাশ বছর তিন মাস দু-তিনদিন বোধ হয় হবে, হঠাৎ-ই একদিন গভীর রাতে অসম্ভব বুকের যন্ত্রণা, মুহুর্তেই সব শেষ! একটা জমকালো নিস্তব্ধ রাত হিংস্রভাবে যেন কেড়ে নিলো বাবার জীবনটা। যে মানুষটা আমাদের জন্যে, গ্রামের ছেলে-মেয়েদের জন্যে প্রায় সারাটা জীবন এতো কিছু করলেন, সুযোগ-ই দিলেন না তিনি তাঁর জন্যে শেষ সময়-ও কিছু করার। চোখের সামনে জীবন্ত দেখলাম ওই কালো রঙা প্যাঁচাটা’র সাথে আমার ‘বাবা’ শব্দটা উড়ে বেরিয়ে চলে গেলো বহু দূরে। সারাজীবনের মতন জীবন থেকে হারিয়ে গেলো আমার ‘বাবা’ ডাক-টা। অসম্ভব বুকের যন্ত্রণাসহ জল ভরা দু-চোখ নিয়ে একজন আদর্শবান নিম্ন মধ্যবিত্ত বাবার চিতার হলুদ-লালচে আগুনকে আমি পাথর দৃষ্টিতে দেখেছিলাম। সেই থেকে ভগ্নহৃদয়ের অসহায়া মা-এর একমাত্র দুশ্চিন্তার কারণ হলাম আমি। আর্থিক সামর্থ্য ছিলো না আমার বাবার, একটা মধ্যবিত্ত/উচ্চমধ্যবিত্ত স্বামী কেনার, তায় দেখতে আমি মন্দ। বেশ ভালোই বুঝতে পারতাম আমার মায়ের ঢাকা যন্ত্রণা-টা। সেই প্রবাদ বাক্যটার স্মৃতিচারণে (একে রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর) কাটতে লাগলো আমার অতি সাধারণ পিতৃহারা জীবন অর্থাৎ বাবার মৃত্যু শোকে মা ছিলেন মর্মাহত তার ওপরে আবার আমার দুশ্চিন্তা! শুরু হয়ে গেলো গ্রামের কানাঘুষো….’বুড়ি মেয়েটা ঘরে বসে আছে, আর কতদিন এভাবে চলবে কে জানে! বিয়ে হবেনা ওর… কে নেবে ওকে!’ মনে হতে লাগলো বাবার আদর্শের প্রতিফলন বুঝি এমন-ই হয়! পাড়ায় বেরোলেই নানা লোকের নানা নেতিবাচক মন্তব্যে বৃদ্ধা অসহায়া মা-টা আমার বাড়িতে ফিরতো যন্ত্রণাকে দ্বিগুণ করে। বেশ কয়েকবার-ই অনুভব করেছি, রাতে না ঘুমিয়ে মায়ের ডুকরে কান্নার শব্দ! সহ্য একদিন লঙ্ঘন করলো তার সীমা, আর দেখতে পারলাম না আমার মায়ের এ কষ্ট! বারে বারেই আমায় রেটিনায় গঠন হতে থাকলো শুধু আমার বৃদ্ধা মায়ের কষ্টের প্রতিবিম্বটা। একদিন গভীর রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম সোজা চলে পাশের গ্রামের প্রধানে’র একমাত্র চরিত্রহীন, মোদো-মাতাল, বখাটে ছেলেটার দামি নরম গদি’র বিছানায়….,ক্ষুধার্ত নেকড়ের সহজপাচ্য খাদ্য হয়ে বললাম,’ সিঁথিতে আমায় সিঁদুরটা অন্তত টেনে দিস, একটা স্থায়ী ভোগ্য বস্তু পাবি আর পাবি সেবা দাসী।’ সেদিন ভোরে সিঁথি রাঙিয়ে আমি হলাম একজন চরিত্রহীনা কলঙ্কিতা ও চুড়ান্ত অবহেলিত স্ত্রী। বহুদিন আর ফিরিনি গ্রামে। দিন গেছে, রাতের পর রাত পেরিয়ে আবার নতুন ভোরের আলোয় আলোকিত হয়েছে প্রকৃতি। বারে বারে মনে পড়েছে আমার বৃদ্ধা মা-টাকে। কেমন আছে আমার মা-টা? কি খাচ্ছে? কে করে দিচ্ছে ঘরের কাজগুলো, নিশ্চয়ই বুড়ি হয়ে গেছে অনেক? প্রশ্নগুলো অসহায়ভাবে কেবলি ছটফট করেছে সারা মন জুড়ে। যন্ত্রণার তিক্ষ্ণ ফলায় রক্তাক্ত হয়েছি বারে বারে, তবুও যেতে পারিনি আমার গ্রামটায়, আমার মায়ের কাছে।….. কখনও চিৎকার করে হাউ হাউ করে কেঁদে জানতে ইচ্ছে করতো ‘মা তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে না? আমি তোমার যোগ্য সন্তান হয়ে তোমার কোলে ফিরতে পারিনি মা’… কেন?… তার উত্তর খোঁজেনি কেউ! হঠাৎ-ই আগুনের একটা হলকা’র ছেঁকা গায়ে লাগতেই ধড়ফড়িয়ে উঠলাম আমি। চারিদিকে লোকজন, কারো হাতে বাঁশ…কারো হাতে মাটির কলসী আর মাঝে মধ্যেই উচ্চারিত হচ্ছে ধ্বনি…. ‘বল হরি, হরি বল!’ দেখলাম দাউ দাউ করে জ্বলছে আমার হতভাগিনী মা-টা।….. আজ অনেকদিন পরে সেই কলঙ্কিতা আমি আমার মায়ের ঝলসে যাওয়া দেহের সামনে বসে।।
-
হায় রে মানবিকতা!
হায় রে মানবিকতা!
-তন্ময় সিংহ রায়সমুদ্রতটে মর্নিং ওয়াকে আর পাঁচটা দিনের মতই জগদীশবাবু সেদিনও তাঁর অস্তিত্বের নিদর্শন রাখছেন। এই ৬৯-এও তার গতিবেগে ২৯-এর আভাস পায় অনেকেই। ধপধপে সাদা হাফ্-প্যান্ট, ব্র্যান্ডেড শু আর টি-শার্টে তার শৌখিনতার ছাপ স্পষ্ট। স্বভাবমতই মর্নিং ওয়াকের পর্ব শেষ করেই আওয়াজ দিলেন…’গোপাল, স্ট্র লাগিয়ে আমার ডাবটা দে, আর তিনটে বড়ো দেখে আমার গাড়িতে রেখে দিয়ে আয়, জানালা খোলা।
‘…. ‘এই যে বাবু, আপনার ডাব।’
হঠাৎ পাশ থেকে কে যেন হেসে বলে উঠলো, ‘ও দাদা কিছু মনে করবেন না, ডাব খাবেন আবার পাইপ লাগে?’
…..’এক্সকিউস-মি! হু আর ইউ..এন্ড হাউ ডেয়ার ইউ?’
পায়ে চটি, সাধারণ ফুল প্যান্ট, ইস্ত্রিবিহীন জামা ও সাদা খোঁচা খোঁচা দাড়ির এই লোকটার এত স্পর্ধা! মনে মনে ভাবতেই… লোকটা বলে উঠলো… ‘মানে বলছিলাম যে, আপনি কি রাগ করলেন?’
প্রত্যুত্তরটা বিদ্যুৎ গতিবেগে জগদীশবাবু ফিরিয়ে দিতে উদ্যত হবেন এমন সময়ে গোপাল এসে বললো, ‘বাবু ডাব তিনটে রেখে এসিছি।’ তখনও জগদীশ বাবুর পারদ শীর্ষে… সে কথায় ভ্রুক্ষেপ না করেই আবার সেই লোকটাকে প্রশ্ন, ‘আপনি জানেন আমি কে? হাউ ডেয়ার ইউ ইডিয়ট ওল্ড ম্যান?
….. ‘ আপনি ইংরিজিতে কি বলছেন, দয়া করে বাংলায় বলুন, আপনার চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে আপনি এখনও অনেক রেগে আছেন।’….লোকটা বলে উঠলো।
‘রাগবো না?… আমি এই অঞ্চলের সব থেকে ধনী ব্যক্তি (শিল্পপতি), অনেক বড়ো বড়ো লোকও আমার সাথে ১০ মিনিট কথা বলতে গেলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয় আর দিস ইস অ্যাবসোলিউটলি মাই পারসোনাল ম্যাটার যে আমি ডাবের জলটা কিভাবে পান করবো… উইদ স্ট্র না উইদাউট স্ট্র! ‘
…. ‘মানে বলছিলাম যে সে তো অবশ্যই, আপনি অনেক বড়ো মানুষ। যদি ভূল হয়ে যায় ক্ষমা করবেন।
‘…… ‘ক্ষমা, হোয়াট ক্ষমা? রাবিশ!’
…. ‘মানে বলছিলাম যে, আমি চললাম। ‘
হঠাৎ-ই জগদীশবাবু কেমন যেন স্বাভাবিক হয়ে গেলেন, কপালের গোলাপী চামড়ায় জেগে উঠলো তিন-চারটে ভাঁজ।
…. ‘ও ভাই শুনুন, আপনার বাড়িটা কোথায় বলুন তো, আপনার নাম কি?
কিছু একটা হঠাৎ পরিবর্তন লক্ষ্য করে গোপালও বেশ কিছুটা আশ্চর্য হোলো বটে।….. ‘বাড়ি আমার সাহেবপুর গ্রামে, নাম পবিত্র দত্ত।’
কৌতূহলের সীমা অতিক্রম করে জগদীশ বাবুর এবারের প্রশ্ন, ‘আচ্ছা আপনি কোন স্কুলে পড়তেন মনে আছে?’ বলতে পারেন?’
….. ‘হ্যাঁ আমার ভালোই মনে আছে, সাহেবপুর অবৈতনিক বিদ্যালয়।
…. ‘আরে… দত্ত! চিনতে পারিসনি আমায়? আমি সেই জগো রে! আর সত্যিই তো কিভাবে চিনবি বল সেই ৫৩ বছর আগে মাধ্যমিকেই ছাড়াছাড়ি তারপর বাবার কোলকাতার চাকরীর সূত্রে শহরে চিরস্থায়ীভাবে চলে আসা। তোর, মানে বলছিলাম যে’টা আজও স্বভাব বিরুদ্ধ হয়নি দেখছি রে!
… অত্যাধিক বুড়োটে হয়ে গেছিস তুই! হ্যাঁ রে, তোকে আর ‘মানে বলছিলাম যে’-বলে নিশ্চই কেউ রাগায় না?
কে আর রাগাবে বল… সেই বকুল সেই দিনেশ সেই রোগা প্যাংটা গনেশটা… হ্যাঁ রে ত্রিদিপের সাথে আজ আর তোর নিশ্চয়ই কোনো যোগাযোগ নেই বল? আজ সব কে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে! তা তুই এখানে কি ব্যাপারে? ‘
……দীর্ঘ দিনের ছোটো বেলার হারানো বন্ধু পুনরুদ্ধারে পবিত্রবাবুও যে মনে মনে খুশি হননি তা তো নয়ই বরং হয়ে পড়লেন বেশ কিছুটা আবেগপ্রবণ… ‘জানিস জগো, খবর পেলাম এখানে আগামীকাল একটা হাট বসে, তাতে বেশ সস্তায় ভালো চাদর ও শাড়ি বিক্রি হয়। খান ৫০ কিনবো বলে এসেছি রে, কিনেই রওনা দেবো গ্রামে।
…. ‘এতো চাদর কি করবি?’… কিঞ্চিৎ আশ্চর্য হয়েই জগদীশ বাবুর প্রশ্ন ছিলো এমন।
……. ‘সে থাক বল তোর কথা, তোর তো এখন অনেক নাম, বিশাল ধনী শিল্পপতি, খবরের কাগজ ও টিভিতেও তোকে মাঝে মধ্যে দেখেছি, ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি সামনে থেকে।’
…. ‘হ্যাঁ রে দত্ত, আমার একটাই মেয়ে, বিয়ে দিয়ে দিয়েছি এক নামকরা এফ. আর. সি. এস হার্ট স্পেশালিষ্ট ডাক্তার-এর সাথে। এখন ওরা লন্ডনেই সিফট করেছে। বাড়িতে আমি, আমার মিসেস আর ৮-৯ জন দেখাশোনা, কাজকর্মের লোকজন। আমার জীবনে এখন সব দায়িত্বই শেষ আর ভীষণ শান্তিতেই আছি। এবারে বল তোর খবর কি?
….. ‘আমার দায়িত্ব তো আজও আমি পূর্ণ করতে অক্ষম রে! অনেক কাজ আজও বাকি পড়ে আর শান্তি? জানিনা কেন সে আমায় ভালোবাসেনা, তাকে বুকে জায়গা দেবো বলে আমি কি না করেছি তার জন্যে, কিন্তু পেলাম না রে ওর ভালোবাসা!
…. ‘কি বলছিস রে!’
…. ‘হ্যাঁ রে জগো, এই চাদর আর শাড়িগুলো এ বছরে আমাদের পাশের পলাশপুর গ্রামের কিছু হত দরিদ্রদের দিয়ে সাহায্যের চেষ্টা করবো, দারুণ শীতে এই একটা গরম করা বস্ত্রের অভাবে ওরা যে কি পরিমাণ ছটফট করে সে দৃশ্যকে আপন করতে গিয়ে আমি হারিয়েছি শান্তিকে, স্বামীহারা অসহায়া নিঃসন্তান বৃদ্ধা ছেঁড়া নোংরা একটাই শাড়িতে দিনের পর দিন কিভাবে বেঁচে আছে সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি হারিয়েছি শান্তিকে!… বিগত ১৭ বছর ধরে প্রায় ৩৫-৩৬ টা বিভিন্ন গ্রামের বিভিন্ন অসহায়, উপেক্ষিত জনেদের জন্যে আমি ও আমার স্ত্রী এই কাজ করে আসছি। গ্রামের অর্থবানেদের কাছ থেকে টাকা ভিক্ষে করে ও নিজের প্রয়োজনাতিরিক্ত জমানো টাকার সাহায্যে আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। আরো কত দায়িত্ব! মানুষ হয়ে রাস্তার নোংরায় অবহেলায় পড়ে থাকা একটা মানুষের দেহ দেখতে পারিনি, একটা অসহায় বাচ্ছা একটু ভাতের জন্যে যন্ত্রণায় ছটফট করছে, সহ্য করতে পারিনি! পারিনি ওই বাপ মা মরা শিশুটাকে ফেলে দিতে তাই তোর মতন শান্তি-র ভালোবাসা থেকে আমি আজও বঞ্চিত রে বন্ধু!
….তোর মনে পড়ে আমাদের স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশন-এ আমাদের সুধীর স্যারের(হেডস্যার) গাওয়া শ্যামল মিত্রের সেই জনপ্রিয় সেই গানটার লাইনদুটো…… সেই মানুষ-ই আসল মানুষ যার জীবন পরের তরে, রাজার মুকুট ছেড়ে হাসি মুখে সে তো কাঁটার মুকুট পরে।’
-
তুমি আসবে বলে
তুমি আসবে বলে
-তন্ময় সিংহ রায়চারিদিকে লোকজন হৈ-হুল্লোর, কানায় কানায় পূর্ণ ব্যস্ত একটা দ্বিতলবিশিষ্ট বাড়ি। রঙীন আলোর বৃষ্টিতে ভেজা সমস্ত বাড়িময়! এদিকে বাতাসে ভেসে আসছে স্নিগ্ধ সানাই-এর সুমধুর সুর….! বিভিন্ন ধরণের সুস্বাদু খাবার ও ফুলের মিশ্র গন্ধে ঘ্রাণ শক্তি সাময়িকভাবে হারাচ্ছে তার স্বাভাবিকত্ব…। কিরণ দেওয়া উজ্জ্বল গোলাপি, নীল-সাদা কাপড়ের অপূর্ব কারুকাজ…! মেঝেতে পাতা কার্পেট, তারই মধ্যে অপরূপ মায়াবী দৃষ্টি নিয়ে টুকটুকে লাল শাড়িটা পরে খোঁপায় জড়ানো জুঁই-রজনীগন্ধার বৃত্ত নিয়ে আবির্ভাব হলো তোমার শরীরটা। বন্ধুর একমাত্র বোনের বিয়ে বলে কথা, ভীষণ গুরু দায়িত্বে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ছিলাম আমি কিন্তু সে বাঁধন হঠাৎ-ই যেন খোলা শুরু হলো। শত ব্যস্ততা সত্বেও কেমন যেন সাময়িক স্তব্ধ হয়ে গেছিলো আমার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তোমার শুভাগমনে । আমার সমস্ত গুরুত্বগুলো পূর্ণভাবে মুহুর্তেই যেন তোমার অসম্ভব মাধ্যাকর্ষণ শক্তির দ্বারা আকর্ষিত হতে লাগলো। নির্ভুল অনুভবে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম, হৃদস্পন্দন তার গতিকে বৃদ্ধি করেছে।…….. নাঃ ভূল হচ্ছে! কার আত্মীয়া বা স্পেশাল কেউ হবে …. নিজেকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণিত হল যখন পুনরায় অনুভব করললাম যে হৃদস্পন্দন তার গতিকে তখনও স্বাভাবিক করেনি। মনের মধ্যে বাড়াবাড়ি স্বপ্নের জন্ম হতে লাগলো না জেনে বুঝেই, বুঝলাম মাধ্যাকর্ষণ শক্তি একনিষ্ঠভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে সমগ্র মন জুড়ে।……… দায়িত্ব’পূর্ণ’-টা কখন যে শূণ্য হবে সে আশায় কাজগুলো অগোছালোভাবে কোনোরকমে সম্পন্ন করেই বেশ কিছু সময়ে পরে আবিষ্কার করলাম আমার বন্ধুর বোনের তুমি ছিলে বেষ্ট ফ্রেন্ড মাধবী। সুযোগ পেলেই মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কেন্দ্রে নিক্ষেপ দৃষ্টিটাকে, বুঝলাম সাড়া মিলছে। পুলকিত মনটা নিঃশব্দে হয়ে উঠছিল খুশি খুশি। ইতিবাচক ঈঙ্গিতের জোয়ারে সম্পূর্ণ ভাসিয়ে দিয়েছিলাম নিজের সমগ্র সত্তাকে। অবশেষে দুজন দুজনকে ভালোবেসে বিয়ে ও পরে সৃষ্টি করলাম সংসার। বছর দুই-তিনের মধ্যেই আমাদের ছোট্ট সংসারে যোগ হলো আমাদের আদরের মানিক। অনেক ত্যাগ স্বীকার করে, নিজেদের বেশ কিছু স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করে ধীরে ধীরে পরম যত্নে ও স্নেহ মমতায় এবং আমার সাধারণ চাকরীর তিলে তিলে জমানো প্রায় সবটুকু দিয়ে আমাদের সোনা মানিককে উপযুক্ত পড়া-লেখায় করে তুললাম সমৃদ্ধশালী। তোমার জটিল রোগ যখন ধরা পড়লো তখন আমাদের সোনার ফাইনাল ইয়ার, চিকিৎসায় অযথা ব্যয় তুমি চাওনি।
আজ আমাদের মানিক অনেক নামকরা ডাক্তার, দেশ-বিদেশ জুড়ে তার খ্যাতি। কত সম্মান, কত অর্থ! দুটো গাড়িও কিনেছে সে। নানা ধরণের কোট-টাই আর জুতোয় তার আলমারী লাভ করেছে পূর্ণতা। “জানোতো আমাদের বউমা পুরো মেম….. আমাকে যত্নের চেয়েও ছেলেদের মতন কাটা চুলগুলোয় তার প্রাধান্য বেশি। প্যান্ট-শার্ট তার ভীষণ প্রিয়। ঘোমটা জিনিসটা বৌমার সমাজে অস্বস্তিজনক এক ঘৃণ্য প্রথা। আমি ভালোই বুঝি, ওদের সোসাইটিতে আমি আজ দশ পয়সা। দামি দামি লোক আসে আমাদের সোনার কাছে। ওরা বলে নাকি, কোনো একদিন ঝড় জলের রাতে অসহায়ভাবে পড়ে থাকা এক বৃদ্ধকে বাড়িতে তুলে আশ্রয় দেয় আর সেই থেকেই আমি ওদের বাড়িতে পোষ্য আছি।……. তুমি কি শুনতে পাচ্ছো আমি কি বলছি? তোমার ওই মুখটা আমি আজ আর দেখতে পাইনা ভালো, ওরা মোছেনা তোমার ছবিটাকে, মালা তো দুর। আজ প্রায় তেইশ বছর হলো তুমি চলে গেছো আমায় ফেলে। তুমি কি আর একবার আসবে আমার কাছে, আসবে তুমি সেই মায়াবী দৃষ্টি নিয়ে? জানো মাধবী?… আমার শরীরটা খুব দুর্বল, চোখেও ভালো দেখিনা। শীর্ণ জীর্ণ শরীরে শীরা-ধমনী অনুভবে টের পাই। সমগ্র চুলে বোধহয় ক্লোরোফিলের অভাব। অন্তরের ভালোবাসা পাইনা অনেকদিন হয়ে গেছে গো! বউমাকে অনেকবার বলেছি নতুন একটা চশমার কথা, বৌমার সময় হয়না, নানা পার্টিতে ভীষণ ব্যস্ত সে। খোলা জানালায় আমি অস্পষ্ট অপলক দৃষ্টিতে অনুভবে দেখতে পাই তোমার সেই অপরূপ মায়াবী দৃষ্টি আর আমার দুর্বল চোখ থেকে ঝরে পড়ে বড় যন্ত্রণার অশ্রু। তুমি কি আসবে মাধবী আর একটি বার? আজ-ও আমার হৃদস্পন্দন তার গতিকে মাঝে মধ্যেই বৃদ্ধি করে। এই নিঃসঙ্গ জীবনে আর একবার তোমায় পেতে চাই। জানালায় প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত আমি তাকিয়ে থাকি বড়ো আশা নিয়ে………. তুমি আসবে বলে।”
-
আত্মকেন্দ্রিক বাঁচা
আত্মকেন্দ্রিক বাঁচা
-তন্ময় সিংহ রায়ভাপা ইলিশ অথবা মাটন বিরিয়ানির গন্ধে আমাদের লালারস ক্ষরিত হয় কিন্তু দুর্নীতির গন্ধ খুব সহজেই আমরা উপেক্ষা করি কারণ জীবন একটাই। ভগৎ সিং আর ক্ষুদিরামের আত্মবলিদানের বীজ বুনে সমাজে নিজেকে মহৎ প্রমাণ করে বেড়াবো কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করবো মূক ও বধির রূপে, সুযোগ পেলে চুপিচুপি কমেই ছেড়ে দেবো মনুষ্যত্বটাও। সমাজটা কোমায় যায় যাক, পরিবারসহ নিজেরা ফার্স্ট ক্লাস এসিতে একবার হলেও কাশ্মীরে যাবো। দিনের শুরুতে চায়ের পেয়ালায় সুখচুম্বনসহ খবরের পাতায় অসামাজিক বিশ্লেষণে চোখ রাখবো আর ব্যক্তিত্বপপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপিত আস্ত শরীরে কৃত্রিম হুঙ্কারে সিংহকেও হার মানাবো… “কি হচ্ছে মশাই এসব, ছি! ছি! ছি!… এদের মেরে ফেলা উচিৎ, জেল হওয়া উচিৎ… সমাজটা শেষ হয়ে গেলো।” গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর প্রভাবে মনুষ্যত্ব শুকিয়ে কখন যে আমসত্ত্বে পরিণত হয়েছে তা ঠিক বোঝা যায়নি। মাতঙ্গিনী হাজরায় অনুপ্রাণিত মন সংখ্যায় কমে হু হু করে নিলামে দাম চড়ছে ক্যাটরিনার সৌন্দর্য। ঈর্ষ্বা আর হিংসার রোষানলে সমাজে জ্বলছে দাবানলের আগুন, সে জীবন্ত চিত্র আমাদের যন্ত্রণা দেয়না কারণ আমরা আত্মকেন্দ্রিক নির্লজ্জ বুদ্ধিজীবীর দল সর্বদাই নানাভাবে আমাদের সুখ খুঁজতেই ব্যস্ত। শুধু নিজের পরিবার নয়, যে মন দিয়ে নি:স্বার্থ ভালোবাসতে জানে, তার কাছে গোটা সমাজটাই তার পরিবার হওয়া উচিৎ কিন্তু নি:স্বার্থ ভালোবাসা আজ অণুজীবের ভূমিকায় অবতীর্ণ। সব মিলিয়ে অন্তরের সুপ্তাবস্থায় যত্নে সাজানো লাইনটা এরুপ, ‘শেষ হবো তবুও পরিবর্তন হবোনা, শুধু তুমি আমি আর আমার পরিবার, নেতাজী-র দিন শেষ। ‘ (ব্যতিক্রম অবশ্যই স্বীকার্য)
-
ধর্ষক
ধর্ষক
-তন্ময় সিংহ রায়‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিওনা।’ বহুল প্রচলিত অর্থহীন নয় এমন প্রবাদ বাক্যটির মূল্য, মানবিকতার উজ্বল কলঙ্কিত সেই ‘ধর্ষক’ নামক চরিত্রটির কাছে বর্তমানে নিছক কয়েকটি শব্দের সমষ্টি ব্যতীত অন্য কিছুই নয়। প্রশ্ন যদি তৈরী হয় কারণ? কারণ, অনায়াসে নির্দ্বিধায় হীন মানসিকতার পরিচয় সম্পন্ন করার পরেও আইন পদদলিত করে যে তারা খুব স্বাভাবিক ভাবেই সমাজের মূল স্রোতে শরীর ভাসিয়ে দিতে যথেষ্ঠ সক্ষমতার পরিচয় বহন করবে তা তারা নিজেরাও জানে। প্রশাসনের এ হেন প্রতিবন্ধী ভূমিকায় বিপুল অনুপ্রেরণায় ধর্ষকমন্ডলী খুব সুষ্ঠ ও স্বাভাবিকভাবেই তাদের বংশগতির ধারা সমাজে অব্যাহত রেখে চলেছে। নিকৃষ্ট শ্রেণীর কলঙ্কিত এই সমস্ত ভদ্র পোষাকি জীবের ভবিষ্যৎ টার্গেট বোধকরি কোনো চতুষ্পদী যে হবেনা এমন ভাবাটা বিশেষ আশ্চর্যের কিছুই নয় কারণ, যৌনাচার যখন চুড়ান্ত বিকৃত পর্যায় তখন প্রতিবাদিহীনা চতুষ্পদীর কাছে এদের আধিপত্য অপেক্ষাকৃত অনেকাংশেই বেশি। ‘আত্মসন্মান’ শব্দটা শ্রুতিগোচর হলেও একজন মানুষের সম্পূর্ণ জীবনে এর তাৎপর্য ঠিক কতটা, মানসিকভাবে অশিক্ষিত এ সমস্ত বিচিত্র দ্বিপদীরা তা জানেইনা। ‘অনুতাপ’ এদের বিশেষ বেগ প্রদান করেনা।এদের কুকর্মের ফলে সাধারণ ভদ্রজনেদের ফুসফুসে দুষিত বর্জ্যের যে কিরূপ প্রভাব পড়তে পারে তাও এদের জানার বাইরে। এরাও হাসে, খাদ্য গ্রহণ করে, আপাদমস্তক পোষাকে সুসজ্জিত হয়, মিশে থাকে ভদ্রজনের মাঝেই কিন্তু মনের গভীরে ঝরতে থাকে যৌন লালসার রস। আজ ‘আশারাম’, কাল ‘বাবুরাম’ তো পরশু ‘রহিম রাম।’ ধর্ষণ জগতের বিশেষত সেলিব্রিটিদের শাস্তির কৃত্রিমতা ভবিষ্যৎ সমাজের হাজারো উদিয়মান ধর্ষকের বিপুল অনুপ্রেরণা। এদের পূণ্য স্নানে গঙ্গাও অপবিত্র হয় ও তুলনামূলকভাবে বর্জ্যের গন্ধ এদের চরিত্রের গন্ধ অপেক্ষা শ্রেয় তবুও এরা মুক্ত অক্সিজেনের অংশীদার। গভীর মনোযোগী এ হেন ধর্ষকবৃন্দের মুক্ত অক্সিজেনের হেতু যে শুধুমাত্র অর্থ তা বিশ্লেষণ করে বোধগম্য করানোর কোনো মানেই হয়না। বলাবাহুল্য দরিদ্র ধর্ষক-ও সামাজিক জীবরূপে তাদের অস্তিত্বের নিদর্শন রেখে চলেছে তথাপি উজ্বল নক্ষত্রের ন্যায় ধর্ষকরুপে বিবেচিত হয় একমাত্র অর্থবান ধর্ষকরাই।
-
গর্ভ
গর্ভ
-তন্ময় সিংহ রায়পাঁচ থেকে দশেরা আজ এই সমাজের ব্যোমে,
বিত্তবানের স্বর্নপ্লেটে নাম লেখালেন ক্রমে।
আট উত্তীর্ণ পটলাদা রাজনীতিতে ভিজে,
স্বাস্থ্যবান চার অ্যাকাউন্টে মা লক্ষ্মী নিজে।
এম.এ, বি.এ. হতাশায় খায় কুরে কুরে,
পটলাদা ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ মারে ছুঁড়ে।
সমাজগ্রহণে দুর্নীতির কালো ছায়া হাসে
বিদেশী সুরায় পটলাদার সার্টিফিকেট ভাসে।
স্থলে দুর্নীতি, চিত্তে দুর্নীতি, দুর্নীতি আজ জলে,
বিশুদ্ধ ওই অক্সিজেন-ও দুর্নীতির কথাই বলে।
এমন কোনো গর্ভ আমায় দিতে পারো খুঁজে??
আর একটা সুভাষ পূজো করবো আমি নিজে।। -
দেশমাতার সুযোগ্য সন্তান
দেশমাতার সুযোগ্য সন্তান
-তন্ময় সিংহ রায়“তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ, তোমরাই আনবে সুদিন, তোমরাই গড়বে সুন্দর সমাজ।” আর কাউকে বিশেষ বলতে শোনা যায়না। বর্তমানের ক্যানভাসে ‘দুরত্ব বা নিয়মিত যেভাবেই সম্ভব, সিংহভাগের আগামি উদ্দেশ্য অর্জিত ডিগ্রীকে বিক্রয়যোগ্য করার মাধ্যমে নিজেকে সমাজে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল প্রতিষ্ঠা করে একান্তই ব্যক্তিগত সুখী জীবনে প্রবেশের পথ সম্ভব হলে শ্বেত মার্বেলে মুড়ে দেওয়া ও পাশাপাশি সম্পূর্ণ জীবন শিক্ষিত শব্দের রসাস্বাদন করা।’- এই যন্ত্রণাদায়ক ছবিই বারে বারে ভেসে ওঠে। কোনো অভিভাবকই সমাজকে নিয়ে ভাবনার বীজ বোনেনা, ‘শুধু তোরা নিজের পায়ে দাঁড়া।’…….. পুঁথিগত শিক্ষার ‘ডক্টর অব ফিলোসফি’-রা সমাজে ভীষনরুপে বিশিষ্টজনের তালিকায় তাদের নাম খোদাই করতে যথেষ্ঠ সক্ষমতার পরিচয় বহন করেছেন কিন্তু আজ সামাজিক শিক্ষায় আট উত্তীর্ণের অভাবের ক্রমবর্ধমান ফলাফল,… সমাজের কোনায় কোনায় ঝোপে ঝাড়ে স্ফুলিঙ্গ ভবিষ্যতের ভয়াবহ দাবানলের সংকেত বহন করে চলেছে আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থাকবে সেই দাবানলের জীবন্ত সাক্ষী। খাদ্যে দুর্নীতি, চিকিৎসায় দুর্নীতি, শিক্ষায় দুর্নীতি, স্বাস্থ্যে দুর্নীতি, এমনকি ধর্মেও! দুর্নীতির তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে বাতাস মাটি ও জল আজ আই.সি.ইউ-তে। দুর্ভাগ্যবশত: দুর্নীতমুক্ত ২৩ ঘন্টা ৬০ মিনিট বোধকরি এ জীবনে আর দেখা সম্ভব নয়। চারিদিকে ফাঁকা আওয়াজের বজ্রপাতে সমাজের আকাশে আলোর ঘনঘটা, শুধু বৃষ্টিই নিরুত্তর। নি:স্বার্থ সমাজসেবী আজ গ্যাসীয় বস্তু। চারিদিকে শুধু অর্থাবৃত চোখজোড়ার লোলুপ দৃষ্টির অবাধ বিচরণ। ‘আরো চাই, আরো চাই’ ধ্বনিতে আকাশে বাতাসে শুধুই হাহাকার তবুও নাকি আমরা দেশমায়ের সু্যোগ্য সন্তান। বিড়াল, কুকুর পুষছি গৃহে আর হিংসা ও ঈর্ষ্বা পুষছি মনে যার ফলে সুমধুর সম্পর্কে আজ রিখটার স্কেলের প্রয়োজনীয়তা অত্যাবশ্যকীয়, তবুও নাকি আমরা দেশ মাতার সুযোগ্য সন্তান। অতি যত্নে আত্মকেন্দ্রিক বীজ বপনের মাধ্যমে আমরাই সমাজটাকে বানাচ্ছি হোমার, তবুও নাকি আমরা দেশমাতার সুযোগ্য সন্তান। কিছু ব্যতিক্রম স্বীকার করেও উল্লেখ্য যে, বর্তমানের এমন সন্তান গর্ভে ধারণে দেশমাতৃকা যে কি পরিমাণ কলঙ্কিতা, তা সেই জানে। গান্ধীজির টুকরোর বিনিময়ে, প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে হাজার হাজার সততা আর আদর্শকে খুন করে গুম করা হচ্ছে তাদের আদর্শহীন লাশগুলোকে, নিলামে দাম চড়ছে মনুষ্যত্বের। ‘শুধু নিজে বাঁঁচবো আর সাথে থাকবে আমার পরিবার।’ এই হলো বর্তমান সমাজের অধিকাংশের মুখ্য মন্ত্র। পেট ভর্তি কান্না নিয়েও যে চেষ্টা করছে তার আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার তার ছবি শিরোনামে আসে কম বিশেষত জীবন তার যন্ত্রণাবিদ্ধ। ঝুল কালি মাখা বিবেকানন্দ ও নেতাজীকে সময় বিশেষে শুধু পালন করা হয় বাকি সারা বছর এরা প্রাণহীন আসবাবপত্রের সাথেই সহবাসে রত থাকে অথবা দেওয়ালেই শুধু টাঙিয়ে রাখা হয় তাদের আদর্শকে, তবুও আমরা নাকি দেশমাতার সুযোগ্য সন্তান।
-
কালি শূন্য সেই কলমটা
কালি শূন্য সেই কলমটা
-তন্ময় সিংহ রায়একটা আধবুড়ো বকুল গাছ, সামনেই তার হাত দশেক চওড়া নদী। সোনালী আলোর সাথে জলের নিবিড় সম্পর্ক, আশেপাশের বিভিন্ন গাছগাছালি, চাষের খেত, কয়েকটা কাঁচা ও আধকাঁচা বাড়ি-ঘর এবং পাখীর কলরবে মনে হত গ্রাম-টা তার অপরূপ সৌন্দর্যে কেমন যেন অহংবোধে জর্জরিত। যাইহোক, ওই বকুল গাছের নিচেই ছিলো ২৬ ও ৩১-শের দুটো সতেজ হৃদয়ের প্রকৃত ভালোবাসার মনের ভাব আদান-প্রদানের আদর্শ জায়গা। টুং-টাং, ঝুন-ঝুন শব্দেই অধীর আগ্রহে থাকা আমার এই মনটা নেচে উঠতো খুশির আনন্দে। বুকে হাত না রেখেই অনুভব করতাম হৃৎপিন্ডটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছে। মনে হত পৃথিবীর সব সুখ যেন কেউ চুড়ান্ত বিশ্বাসে কিছু সময়ের জন্যে আমার কাছে গচ্ছিত রেখে গেছে। ভোরের সদ্য ফোটা গোলাপ, গোধূলিতে ঝাঁক বেঁধে নানা জাতের পাখির স্বশব্দে ঘরে ফেরা অথবা ওই উঁচু পাহাড়ের চুড়ায় নানা রঙের খেলা, প্রকৃতির সব সৌন্দর্য-ই যেন একত্রে এসে আমার কাছে উপস্থিত হত… লাল, নীল, গোলাপি কাঁচের চুড়িসমেত তোমার সম্পূর্ণ শরীরটা যখন আমার পাশে এসে অবস্থান করতো। যত্ন করে কাজল আঁকা তোমার হাসি হাসি মুখের চোখদুটো যখন আমার দৃষ্টিকে কেড়ে নিতো মনে হত মৃত্যুকেও আমি তুচ্ছ করতে পারি, কি অসম্ভব আকর্ষণ ছিলো তোমার ওই দৃষ্টিতে। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, বাবার দেওয়া হাত খরচের পয়সা জমিয়ে তুমি আমায় একটা কালির কলম কিনে দিয়েছিলে, বলেছিলে ‘তুমি খুব ভালো লেখো, আমার ভালোবাসার একটা ছোট্ট উপহার এটা তোমায় দিলাম, তুমি অনেক লিখবে কিন্তু।’ বলেছিলাম, ‘তোমার ভালোবেসে দেওয়া এই অমূল্য উপহারকে আমি জীবন্ত রাখবো আমার সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে, আর সেই সৃষ্টির প্রত্যেকটায় থাকবে শুধু তোমার-ই ছবি। তবে একটা বিশেষ অনুরোধ তোমার কাছে, কালি শেষ হলে নতুন করে কালিটা আবার তুমি-ই আমাকে ভরে দিও।’ ভীষণ খুশী হয়েছিলে তুমি। একবার তোমার হাত ধরে উঠতে গিয়ে আমি ধপাস করে পড়েই গেলাম, সে কি হাসিটাই না তুমি হেসেছিলে, তোমাকে থামাতে গিয়ে শেষপর্যন্ত আমিও হয়েছিলাম তোমার হাসির একমাত্র সঙ্গী। অবশেষে তোমার দ্বিতীয়বারের সাহায্যের হাতটাকে আমি ধরে ছিলাম কিন্তু তোমার অপরূপ স্নিগ্ধ ও মায়াবী হাসির টুকরোগুলো মনে হচ্ছিল কেমন যেন আমার রক্তের প্রতিটা কণায় মুহুর্তের মধ্যে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে, কোনো হুঁশ ছিলো না আমার কিছু সময়ের জন্যে, অপলক দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ডুবে গেছিলাম তোমাতে। হুঁশ ফিরলো ওই সাদা-ছাই রঙা রাজ হাঁসটার ঝপাস করে জলে লাফ দেওয়ার শব্দে।
জীবনের কতগুলো রাত, কতগুলো দিন শুধু তোমার এই অসহনীয় মধুর স্মৃতিগুলোকে রক্তাক্ত বুকে চেপে আজ ৪১ বছর পর আমি তোমাদের সেই গ্রামের সেই জায়গায়। খসখসে পাতলা অমসৃণ চামড়ার নিচ থেকে ঘুমন্ত শিরার জেগে ওঠা ও চুলে ক্লোরোফিলের অভাব জানিয়ে দেয়, সত্যি বয়েস হয়েছে। ডাক্তার বলেছে… ‘হার্ট আপনার কমজোরি হয়ে গেছে।’… চশমা ছাড়া চোখেও ভালো দেখতে পাইনা। নিজের অগোছালো জীবনের অন্তিমলগ্নে আজ দাঁড়িয়ে বুকে বড় বেশি যন্ত্রনা করছে, কেন বারে বারেই মনে হচ্ছে আমি আবার পড়ে যাবো আর তুমি আসবে তোমার সাহায্যের চুড়িমাখা হাত দু’খানা বাড়িয়ে দিয়ে ভালোবেসে আমায় তুলতে। অপরুপ তোমার সেই হাসিটায় আমি আবার ডুবে যাবো, তোমার যত্নে আঁকা কাজল চোখে নিজেকে আবার আমি হারাবো। আজও ভাবি, তোমার আর একটা হাসিও কি আমি আর এ জীবনে দেখতে পাবো না? তোমার গন্ধে ভরা সেই জায়গায় আমার দুচোখ বেয়ে অবিশ্রান্ত ধারায় জল, শুধু একটা বার তুমি দেখে যাও। অফিসের কয়েকমাসের গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে মাকে নিয়ে তোমার বাড়িতে এসেছিলাম। সম্মানের চাকরি হলেও মাইনে ছিলো খুব-ই কম, তাই তোমার বড়লোক বাবা আমাদের কিছুতেই দুটো হৃদয়কে যোগ হতে দেয়নি, বোঝেনি প্রকৃত ভালোবাসার মর্যাদা….. এমনকি তোমাদের গ্রামের মোড়লকে ডেকে লোকবলে একপ্রকার জোর করেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল তোমার, কি কষ্টটাই না পেয়েছিলে তুমি!…….. জানোতো,সেই বকুল গাছটাও আজ আর নেই। কাকে জানাবো আমার এই নিদারুণ মর্মস্পর্শী করুণ কাহিনী? আজ জীবনের শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে তোমার কি আমার কথা আমার-ই মতন মনে পড়ে? অন্তত মাঝে মাঝে? বহুদিন পরে হলেও একবার? কত প্রশ্ন জন্মায় আজও নি:সঙ্গ এই মনে, উত্তরের আশায় ব্যর্থ হয়ে আবার মৃত্যুও হয় এই শীর্ণ বুকেই। চোখের সামনে তুমি নেই, আছো হৃদয়ে। পড়ে আছে একবুক যন্ত্রণাময় স্মৃতি আর অতি যত্নে পড়ে আছে তোমার দেওয়া কালিশূন্য সেই কলমটা।
-
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা
– তন্ময় সিংহ রায়প্রশ্ন হল, শিক্ষাব্যবস্থার আধুনীকিকরনে বর্তমানে জাতি কতটা উপকৃত?? সুদক্ষ কারিগর দ্বারা নিপুণ কৌশলে সাজানো এডুকেশন সিস্টেমে সিংহভাগ সরকারী স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ ব্ল্যাকহোলে। অধিকাংশ স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা বোধকরি তাদের প্রকৃত আদর্শমিশ্রিত দায়িত্ব ভূলে জাতির মেরুদন্ডের গর্বে ৮০-৯০ কেজি ব্যক্তিত্ব নিয়ে রোজ স্কুলে যায় ও আসে আর মুখ্যত সাথে রয়েছে তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য সরকারের অতি সামান্য কিছু অনুদান। এ প্রসঙ্গে ব্যতিক্রম নেই বলাটা যুক্তিসংগত নয় তবে তা দুর্লভ। বিশেষত গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া দরিদ্র অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত অভিভাবকদের কাছে এনারা আদর্শ শিক্ষাগুরুরুপে আজও পূজিত হন। জাতির স্পাইনাল কর্ডের এ হেন দীর্ঘজীবী বিচিত্র ভূমিকার চাকা অতি স্বচ্ছন্দে ও নির্বিঘ্নে বর্তমানে ৯০ কিলোমিটার /আওয়ার-এ চলছে। মাথার উপর বোধকরি অদৃশ্য হাতযুক্ত মান্যবরেরাই এনাদের অনুপ্রেরণার ভূমিকায়। দিনের পর দিন স্কুলগুলোতে কোনো ইন্সপেকশন নেই যদিও হল, সব ওকে। সুপরিকল্পিত সাজানো সিস্টেমে সমাজ জন্ম দিচ্ছে লাখো লাখো অশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট। চারিদিকে চলছে নোটের জোয়ার, যে যত উন্নত নোট প্রদানে সক্ষম সে তত দামি মাষ্টার, অভিভাবকরাও খুশিতে আত্মহারা। নোটবন্দি ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞানের পরিধির বহি:প্রকাশ বর্তমান সমাজে কিরূপ তা আশা রাখি বলে বোঝাবার আর অপেক্ষা রাখেনা। কোথায় যাবে বিশেষত গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া এ সমস্ত অভিভাবকদের ছেলেমেয়েরা?? এই এডুকেশন সিস্টেম সত্যিই কি এদের প্রকৃত মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে সক্ষম??
-
শ্রদ্ধেয় নেতাজী, তোমাকে খোলা চিঠি
শ্রদ্ধেয় নেতাজী, তোমাকে খোলা চিঠি
-তন্ময় সিংহ রায়প্রথমেই তোমাকে নত মস্তকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, শতকোটি প্রণাম ও হৃদয়ের গহিনের সবটুকু নিবেদিত ভালোবাসা। হে মান্যবর নেতা, স্বঘোষিত সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণটির প্রকৃতি এমন যে…. মানবরুপী ঈশ্বর দর্শনে আমার এ ক্ষুদ জীবন ধন্য। হে পরম পূজনীয় নেতা, তোমার দেওয়া উপহার তৎকালীন অখন্ড ভারতে, স্বপ্ন আজও সবাই দেখে কিন্তু সমস্ত জাতি-ধর্মমিশ্রিত দেশকে বর্বর ব্রিটিশদের শৃঙ্খল থেকে উদ্ধার করার যে একটাই স্বপ্ন তোমার সারাজীবনের রাতের শান্তির ঘুমটুকু পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছিলো, এমন স্বপ্ন আজ আর কেউ দেখেনা। তোমার দেশে আজ বীরের মেলা, কিন্তু তোমার মত বীর আজ আর জন্মায়না। স্বার্থের অস্তিত্ব আজও তোমার সাধের দেশে জীবিত কিন্তু তোমার স্বার্থ আজ প্রাণ ত্যাগ করেছে। সমাজসংস্কারকে আজ পূর্ণ জোয়ার কিন্তু তোমার মতন সমাজসংস্কারক হওয়ার সাধ্যি কারো নেই। তুমি যে অদম্য তাই তো তোমার ছিলো এত শত্রু, তুমি যে অভেদ্য তাই তো পৃথিবীর সব শত্রুই ছিলো তোমার পদতলে। হে গর্বিত বঙ্গ মায়ের অপরাজেয় বীর সাধক, একজীবনের সবটুকু সুখকে ত্যাগ করে কি যন্ত্রণাময় জীবনকে তুমি উপেক্ষা করেছো, উপেক্ষা করেছো বর্ণচোরাদের, শুধু আমাদের জন্যে, তা আজ ঠিক কজনের গভীরে আঁচড় কাটে আমার জানার বাইরে। ত্যাগের প্রায় শেষ সীমায় তুমি পৌঁছেছো শুধু আমাদের-ই জন্যে, শত লাঞ্ছনা ও অপমানে প্রতি দিন তুমি রক্তাক্ত হয়েছো শুধু আমাদের-ই জন্যে। কিন্তু আজ……. ? তোমায় শুধু মুখস্থ করা হয় ডিগ্রী বাড়ানোর স্বার্থে ও মাঝে মধ্যে কর্তব্য পালনের মাধ্যমে আদর্শের বহি:প্রকাশ ঘটিয়ে নিজেকে মহৎ প্রমাণ করার জন্যে। রং করা ফিল্মি হিরোয় বিশেষত নবপ্রজন্ম বুঁদ আর তুমি আজ আলেয়া। রাজমিস্ত্রি আজও দেওয়াল গাঁথে কিন্তু অধিকাংশ অভিভাবক-ই আজ তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দেওয়ালে তোমার আদর্শ গাঁথেনা তাই আজ ঘরে ঘরে জন্ম নিচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক সন্তান। আজ তোমার খন্ড ভারতে সবাই নিজ নিজ সুখ শান্তির সংসার গড়তে উদ্যত শুধু সংসারটার সুখ শান্তি তোমার কপালে জুটলোনা। জেলে আজও যায় অনেকেই তবে তোমার মতন মহৎ উদ্দেশ্য সফলের স্বপ্ন নিয়ে নয়, দুর্নীতি করে। তোমার আবির্ভাব থেকে আজ অবধি কতবার যে তোমায় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে তা হিসাব বহির্ভূত, তবুও তুমি ছিলে অকুতোভয় ও অভঙ্গুর। হে আধিদৈবিক সিংহপুরুষ, ভীষন ভালো লাগে অনুভব করে যে জিলেটিনের প্রলেপযুক্ত কাগজের টুকরোতে তুমি অস্তিত্ববিহীন কারণ, ঈশ্বরের আসন কোনো কাগজের টুকরোতে নয়, ১২১ কোটির হৃদয়ে। আর যে পরিমান দুর্নীতি আজ ওই কাগজের টুকরোর বিনিময়ে চলছে তা বর্ণনাতীত। হে পরম পূজারী, আমি আপ্লুত, মন বলছে, ধামা চাপা বিকৃত ও মানুষ ভোলানো ইতিহাস নগ্ন হওয়ার সময় আসন্ন। কিছু বিশিষ্ট কৃতঘ্নদের মুখোশ-ও উন্মোচনের পথে কারণ, “শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায়না।” মাঝে মধ্যেই এ প্রশ্ন মনের জরায়ুতে জন্ম নেয় যে তাহলে, ‘প্রকৃত বর্বর কারা?’…. যতদিন এ পৃথিবী জীবিত থাকবে, ততদিন পর্যন্ত আমার সক্রিয় হৃদপিণ্ডে তুমিই আমার ভগবান। হে মানবরুপী ভগবান, স্বাধীন হয়েছি নিশ্চিত কিন্তু তোমার শিক্ষায় আজও শিক্ষিত হওয়ার যোগ্যতাটুকু তৈরী করতে পারিনি। ক্ষমা কোরো, এ লজ্জা একান্তই আমাদের। (ব্যতিক্রম অবশ্যই স্বীকার্য) ইতি……..লজ্জিত তন্ময়।