-
প্রতিবাদের মিছিল
প্রতিবাদের মিছিল
-ফণীভূষণ কান্ডার
অরাজকতা যেখানে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়
উষ্ণস্রোত হয়ে নেমে আসে ভারতবর্ষের রাস্তায়,
প্রতিবাদের মিছিল।
ভারতবর্ষের ওলিতে গলিতে তার প্রমান খুঁজে পাবে।
কিংবা রাস্তার ঐ নগ্ন শিশুটিকে জিজ্ঞাসিবে,
সেই বলে দেবে, অরাজকতা কাকে বলে !
তার প্রমান খুঁজে পাবে-
বার্ধক্যভাতা না পাওয়া ঐ বৃদ্ধের কাছ থেকে।
কাছে গেলেই তাঁর করুন চাওয়া বলে দেবে অরাজকতা কি !
ঐ মেয়েটিকে দ্যাখো যে পেয়েছে শুধুই অবজ্ঞা,
সমাজে কন্যা সন্তান বলে।
সেই বলে দেবে অরাজকতার সংজ্ঞা, অরাজকতার চরম সত্য।
ধর্ষিতা ঐ নারীকে জিজ্ঞাসা করো ! অরাজকতা কাকে বলে ?
সেই তোমাকে বুঝিয়ে দেবে ইঙ্গিতে, ছলে-বলে, কৌশলে
কলুষিত সমাজের বৈশিষ্ট্য।
এই অরাজকতার বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ তো হওয়া উচিৎ !
প্রতিবাদ না হোক, একটা সমাজসেবা ?
না ? তাও নয় ? ধিক ! শত ধিক জানাই তোমারে ।
তাহলে কে এদের হয়ে প্রতিবাদ করবে ?
”বিজ্ঞাপন দাও ! ঘোষণা করো ! লোক ডাকো ! পথে নামো !
দু চারজন জনপ্রতিনিধি গড়ো !
বড়ো বড়ো রাজনৈতিক নেতাকে ডাকো ! ”
প্রতিবাদের জন্য শ্রম নয়, বল নয়, চাই একটা প্রতিবাদী মন
যে এই অরাজকতার বিরুদ্ধে লড়বে, প্রতিবাদে করবে অনশন।
গড়বে একটা অরাজনৈতিক দল।
ঐ নগ্ন শিশুটি, সেকি প্রতিবাদ করতে জানেনা ?
জানে ! তবে সে আজ অন্নহীন, বস্ত্রহীন গরীবের ছানা।
সে আজ লজ্জার দূরদর্শন।
তাহলে ঐ বৃদ্ধ ? না না সে কেন ?
সেতো আজ সামর্থ্যহীন !
আর ঐ ধর্ষিতা রমনী, বিশটা বছর ইজ্জত নিয়েছিল ঋণ,
বিশ পূর্ণ হতেই শয়তানের হাতে পরিশোধ !
যেদিন এদের হয়ে একটা প্রতিবাদী মন
জেগে উঠবে আগুনের ফুলকি হয়ে
সেদিনই ভারতবর্ষের রাস্তা,
ওলিগলি জ্বলে উঠবে দাবানল হয়ে
অগণিত প্রতিবাদের মিছিল।
-
জরিপদার
‘জরিপদার’
-ফণীভূষণ কান্ডারগোপাল বিশ্বাসকে বক্সীবাবু কোনদিন দেখেননি। তার মৃত্যুর পর নামটা শুনেছিলেন। গোপাল বিশ্বাস বেঁচে নেই। তার সম্পত্তির ভাগ কে কত পাবে সেই নিয়ে সমস্যা। প্রাথমিকভালে বক্সীবাবু জানলেন গোপালের চার ছেলে এবং স্ত্রী জীবিত। গোপাল বিশ্বাস মারা যাওয়ার পর মা এবং ১৭ – ১৮ বছরের এক ভাইকে বাস্তু থেকে বের করে দিয়েছে তিনভাই মিলে। আর তিনভাই মিলে গোপালের ১৮ বিঘার সম্পত্তি এবং বাস্তু বাড়িটা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এখন গোপালের স্ত্রী আর ছোটছেলেটা পথে বসেছে। গ্রামের লোকের সালিশি মানছে না তিনছেলে এবং তাদের বৌয়েরা।
এই কারণে গ্রামের পক্ষ থেকে প্রধান সুনীল দে এবং জরিপদার বক্সীবাবুকে ডাকা হয়েছিল, সেইসঙ্গে আরো গণ্যমান্য ব্যক্তি। প্রধান এবং জরিপদার সহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে পুনরায় সালিশি সভাতে বসা হল। গ্রামের লোক বলছে শেষ বয়সে বুড়োকে দেখছিল তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। অর্থাৎ সেবাশুশ্রুষা করেছিল দীপালি। পৌষ মাসের সন্ধ্যায় হ্যারিকেনের আলোতে শুরু হল বিচার। প্রধান এসেছেন। তিনি গণ্যমান্য ব্যক্তি , একটু দেরিতে এসেছেন। প্রধান আসতেই বক্সীবাবু সৌজন্য মূলক নমস্কার জানালেন।
প্রধান সুনীল বাবু গোপালের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। তিনি এসে বিচারাসনে বসলেন। গোপালের তিন ছেলে এসেছে ; বিজয়, অনিল ও প্রকাশ। তিন ভাইয়ের কথা শুনে বক্সীবাবু বুঝলেন তিনজনই বড় হিংসুটে। বড় ছেলেটা বলল, ” ঐ দীপালি বিশ্বাস আমাদের কেউ না আর ঐ ছেলেটা আমাদের ভাই নয়। প্রধান সাহেব আপনি নিজে দীপালি বিশ্বাসকে জিজ্ঞাসা করুন না ও আমাদের ভাই কিনা __________! ” অন্য আর একজন ভাই বিজয়ের কথার মাঝখানেই কথা বলল, ” আমাদের বাবা ভালো মানুষ ছিল। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেনি। গ্রামের এতগুলো লোক আছে জিজ্ঞাসা করুন এদের ! ” শীতের রাত,তার উপর হ্যারিকেনের আবছা আলোতে একজন সামনে এগিয়ে এল, চেনা গেল না তাকে। সে বলল, ” বহুবছর আগে গোপাল কাকা একটা ২৫ -২৬ বছরের মেয়েকে কোথা থেকে নিয়ে এসেছিল, তার কোলে একটা ৬ -৭ মাসের বাচ্চা ছিল। সেই মেয়েটা হল দীপালি বিশ্বাস আর কোলের বাচ্চাটা সুরেশ। সুরেশ নামটা গোপাল কাকাই দিয়েছিল।
বক্সীবাবু দেখলেন হ্যারিকেনের আবছা আলোতেও দীপালি বিশ্বাসের চোখের জল চিক চিক করছে। মুখ নীচু করে বসে আছে আর নিরবে কাঁদছে। একটা হাত সুরেশকে জড়িয়ে রেখেছে, মুখে কোন কথা নেই।
প্রধান বললেন, ” বৌদি তুমি কি কিছু বলবে ? ” বিধবা মাথা নাড়লো। প্রধান পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ” দীপালি বৌদিকে গোপালদা বিয়ে করেছিল কিনা তা কি কেউ জানে ? ” কোন উত্তর নেই। বিয়ের কোন সাক্ষী নেই ।
অনিল বলল, ” হুজুর সে অনেকদিনের কথা, বাবাকে সহজ সরল মানুষ পেয়ে ঐ রাক্ষুসী ভুলিয়ে ভালিয়ে বশ করেছিল। আর এক আঁধার রাতে বাবার সঙ্গে উঠেছিল এই বাস্তুবাড়িতে। সেই রাতেই তুমুল ঝগড়া শুরু, আর সকালেই তিন ভাই এই বাড়ি ছেড়েছিলাম বউ – বাচ্চাদের নিয়ে। ঐ রাক্ষুসীকে বাবা বিয়ে করেনি, আমরা সাক্ষী। তাহলে ওরা কেন সম্পত্তির ভাগ পাবে ? ” এতক্ষণ পর বক্সীবাবু মুখ খুললেন ” বৌদি তাহলে তুমি শোনাও কি হয়েছিল, কি ব্যপার, কি বৃত্তান্ত ! তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই। ” দীপালির চোখ যেন ফসফরাসের মতো দপ করে জ্বলে উঠল। বোধহয় সেইদিনটার কথা ভেবে চোখে বান এলো। দীপালি বিশ্বাস চুপ করে বসে থাকলো কোন আওয়াজ করলো না।
প্রধান বললেন ঠিক আছে তাহলে আমি বলছি সেদিন ঠিক কি হয়েছিল। প্রধান বলতে আরম্ভ করলেন। গম্ভীর গলার আওয়াজ। সবাই নিস্তব্ধে শুনছে।
”_________ দিনটা ছিল শনিবার। প্রতি শনিবার হিঙ্গলগঞ্জে বিকেলে হাট বসত, এখন যদিও সকালে হয়। যাইহোক দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়লাম হিঙ্গলগঞ্জের হাটের উদ্দেশ্যে। মাইল ১৫ পথ। হাট সেরে ফিরতে রাত হয়ে যেত। সেদিনও তাই হল। সঙ্গী ছিল গোপালদা। কেনাকাটা সেরে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে দুইজন হেঁটে চলেছি বাড়ির উদ্দেশ্যে। কিছুটা রাস্তা আসার পর রাস্তার ধারে চাপা কান্নার আওয়াজ শোনা গেল। এইরকম আঁধার রাতে নির্জনে কোন মেয়েমানুষ কাঁদছে শুনে এগিয়ে গেলাম উৎসের দিকে। সন্নিকটে গিয়ে গোপালদাই কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করেছিল। টর্চের আলোতে মুখে বয়সের ছাপটা অনুমান করেছিলাম ২১ -২২। চোখের জলে পুরো চিবুক ভিজে গিয়েছিল। কোলে একটা ছোট্ট বাচ্চা ছিল। মেয়েটার কাছ থেকে জানতে পারলাম ওর স্বামী বদ্ধ মাতাল, মদ খেয়ে রোজ মাতলামি করে, মারধর করে। সেদিনও খুব মারধর করে এবং বাড়ি থেকে বের করে দেয়। মেয়েটা বাপের বাড়িতে গেলে ভাইয়েরাও বাড়িতে ঢুকতে দেয় না, তাড়িয়ে দেয়। বেচারি আর কোথায় যাবে ! একে তখন দুর্ভিক্ষ, তার উপর বাচ্চা কোলে, কেউ রাখতে চাইল না। তাই পথই সম্বল। সেই অসহায়, নিঃসম্বল মেয়েটার মাথায় গোপালদাই হাত রেখে বলেছিল, চল আমার বাড়িতে থাকবি। রান্না করবি, খাবি, থাকবি নিজের বাড়ির মতো করে। অমনি দেখেছিলাম মেয়েটার চোখেমুখে অজানা খুশির ছোঁয়া, যেন ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে কোথাও একটা প্রদীপের শিখা দেখতে পেল। কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। বোধহয় ধন্যবাদের ভাষা জানা ছিলনা। তারপর পা দুটো জড়িয়ে ধরেছিল।
গোপালদা বাচ্চাটাকে কোলে নিল, চারটে জীব ছয়খানা পায়ে ফিরে এসেছিলাম এই গ্রামে। গোপালদার বাড়িতে ওদের ছেড়ে দিয়ে আমি বাড়ি ফিরে গিয়েছিলাম। পরে অবশ্য বাকি ঘটনাটা শুনেছি। ______বলেই প্রধান চুপ করে গেলেন। তারপর আবার বলতে আরম্ভ করলেন। একটা ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া মহৎ ব্যক্তির পরিচয়, আর তোমরা কিনা ( তিন ভাইয়ের দিকে আঙ্গুল তুলে ) তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছো ! আর যদি গোপালদা খারাপ কাজ করেই থাকে তার অবর্তমানে সেই খারাপ কাজের প্রায়শ্চিত্য তো তোমাদেরকেই করতে হবে। তোমাদের বাবা যে অসহায় মেয়েটাকে আশ্রয় দিয়েছিল তার জন্য কি একটু জায়গা হবে না ? তার জন্য না হোক ওই ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে ঘর তৈরির জন্য এক ফালি জমি এবং চাষবাস করে খাওয়ার জন্য একটা বিঘা জমি কি দেওয়া যাবে না ? আমি কি নিতান্তই বেশি বলে ফেললাম ? না কি বলেন জরিপদার বক্সীবাবু ?
বক্সীবাবু এতক্ষণ নিঃশব্দে শুনছিলেন। ”প্রধান সাহেব আমি আর কি বলবো ? সকল সমস্যা সমাধানের যোগ্য প্রস্তাব আপনি রেখেছেন। আসল জরিপদার তো আপনিই, নিঃসংকোচে আমি স্বীকার করছি………….” বলে বক্সীবাবু স্বস্তির মৃদু হাসি হাসলেন। যে হাসিটা দীপালির অস্ফুট কান্নাকে ছাপিয়ে গেল। হ্যারিকেনটা তখনও জ্বলছিল, তারই হাল্কা আলোতে প্রধানের মুখটা যেন উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠল।