• গল্প

    সহযাত্রী

    সহযাত্রী
    -বিশ্বদীপ মুখার্জী

     

     

    নিউ দিল্লী থেকে বিকেল চারটে বেজে পঁচিশ মিনিটে ছাড়ে শেয়ালদা রাজধানী এক্সপ্রেস। সৌভিক যখন নিউ দিল্লী স্টেশন পৌঁছালো তখন বিকেল চারটে। এখনও হাতে অনেক সময় আছে। ফার্স্ট এ.সি.তে রিজার্ভেশন তার। নিজের কামরা খুঁজে তাতে উঠলো সৌভিক। যে কেবিনে সৌভিকের রিজার্ভেশন, সেটা দুজনের কেবিন। মানে সৌভিক ছাড়া আরও একজন আসবে এই কেবিনে। জিনিসপত্র বার্থের নীচে রেখে জানালার ধারে বসলো সৌভিক।
    সৌভিকের বয়স তিরিশ বছর। দিল্লীতে বড় কর্পোরেট সেক্টরে কাজ করে সে। বাড়ি নৈহাটিতে। কিছুদিন পর তার বিয়ে। রিয়া নামের মেয়েটির বাড়ি বর্ধমানে। রিয়াও কাজ করে এক কর্পোরেট সেক্টরে, কোলকাতায়। সৌভিকের বিয়ে রিয়ার সাথেই। বিয়ের পর দিল্লীতে গিয়ে কোনো এক কোম্পানীতে কাজ করবে রিয়া।

    ‘ঠক্-ঠক্।’ দরজায় কেউ টোকা মারলো।
    দরজা খুলতেই সৌভিক দেখে, এক মাঝবয়সী লোক তার সামনে দাঁড়িয়ে। কালো রঙের পোশাকের ভদ্রলোকটির বাঁ হাতে এক ট্রলি ব্যাগ। মাথার চুল ধপধপে সাদা, মুখ ভর্তি সাদা দাড়ি-গোঁফ। সৌভিকের বুঝতে অসুবিধে হলো না যে সেই ভদ্রলোকই তার সহযাত্রী। দরজার সামনে থেকে সরে গিয়ে ভদ্রলোককে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিলো সৌভিক। ভেতরে ঢুকে এক গাল হেসে সৌভিককে ভদ্রলোক শুদ্ধ বাংলা ভাষায় বললেন- ‘সহযাত্রী যদি বাঙালী হয়, তাহলে যাত্রার আনন্দই আলাদা।’
    সৌভিকের আশ্চর্য হলো। ভদ্রলোক কী করে বুঝলেন যে সৌভিক বাঙালী? সৌভিক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ভদ্রলোকের দিকে। সৌভিককে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভদ্রলোক অট্টহাস্য করে বললেন- ‘আশ্চর্য হবেন না মশাই। কামরার বাইরে যে রিজার্ভেশন চার্ট লাগানো আছে তাতেই দেখলাম যে আপনার নাম সৌভিক সান্যাল। আসলে কি জানেন, এটা আমার অভ্যেস। যখনই ট্রেনে যাত্রা করি তখনই রিজার্ভেশন চার্ট দেখেনি। সহযাত্রী যদি বাঙালী পাই, তাহলে মনটা খুশিতে ভরে যায়। আমার নাম দেবব্রত ভট্টাচার্য।’
    দেবব্রত করমর্দন করলেন সৌভিকের সাথে।

    নির্ধারিত সময়ে নিউ দিল্লী থেকে রওনা দিলো শেয়ালদা রাজধানী এক্সপ্রেস। পরবর্তী স্টেশন কানপুর সেন্ট্রাল আসতে এখন বহু দেরি। ইতিমধ্যেই সৌভিক লক্ষ করেছে যে দেবব্রত ভট্টাচার্য কথা বলতে বেশ ভালোবাসেন। অনবরত কথা বলা তাঁর অভ্যেস হয়তো। তিনি বললেন- ‘আমার বাড়ি খড়্গপুরে। হাওড়া রাজধানীতে টিকিট পেলে ভালো হতো। হাওড়াতে নেমে লোকাল ধরে খড়্গপুর চলে যেতাম।’
    গল্প করতে সৌভিকেরও যে খুব একটা মন্দ লাগে তা নয়। শেয়ালদা পৌঁছতে এখন অনেক দেরি। সেই পরের দিন সকাল দশটা দশ। যাত্রাপথ যদি গল্পে কেটে যায়, তাহলে বেশ ভালোই হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনের গল্প বেশ জমে উঠলো। দেবব্রত বাবু বললেন- ‘আসলে একটা ফোনের অপেক্ষা করছি আমি। যদি ফোনটা আসে তাহলে আমাকে আসানসোলে নামতে হবে। আর যদি ফোন না আসে তাহলে সোজা শেয়ালদা।’
    ‘সে কি? আপনি এখনও এটাই জানেন না যে আপনাকে নামতে কোথায় হবে?’ আবার আশ্চর্য হলো সৌভিকের। কেমন বিচিত্র লোক বাবা!
    ‘আসলে আমার এক বন্ধুর ছেলের রিসেপশন পার্টি সেখানে। নিমন্ত্রণ করেছিলো। আবদার ছিলো শো দেখবার। আজকাল শো আর বেশি দেখাই না। দেখি , যদি লাস্ট রিকোয়েস্ট সে করে তাহলে তো দেখাতেই হবে শো।’
    ‘কিসের শো?’ জিজ্ঞেস করলো সৌভিক।
    খানিক বিরতি নিয়ে দেবব্রত বাবু বললেন– ‘ম্যাজিকের শো।’

    গাজিয়াবাদ স্টেশন পেরিয়ে গেছে। দ্রুত গতিতে ছুটছে রাজধানী এক্সপ্রেস। ইতিমধ্যেই টি.টি. এসে টিকিট দেখে গেছে। বাটার টোস্ট এবং টমাটো সুপ দিয়ে গেছে প্যান্ট্রি থেকে। টমাটো সুপে একটা চুমুক দিয়ে সৌভিক জিজ্ঞেস করলো – ‘আপনি কি ম্যাজিশিয়ান?’

    ‘হ্যাঁ। আপনি জাদুকর পি এস ভট্টাচার্যর নাম শুনেছেন?’
    নিজের বাবা ও ঠাকুরদার মুখে জাদুকর পি এস ভট্টাচার্যর নাম সৌভিক শুনেছে। জাদুকর হিসেবে বেশ নামডাক ছিলো তাঁর। সৌভিক মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল।
    ‘সেই বিখ্যাত জাদুকর পি এস ভট্টাচার্যর একমাত্র ছেলে আমি।’ মৃদু হেসে দেবব্রত বাবু বললেন।
    ‘সে কি! আপনি সেই বিখ্যাত ম্যাজিশিয়ান পার্থ সারথি ভট্টাচার্যর ছেলে?’
    ‘আজ্ঞে হ্যাঁ। কিছুটা বাবার কাছ থেকে শিখেছি , কিছুটা শিখেছি বিদেশের কিছু জাদুকরের সান্নিধ্য পেয়ে।’
    সৌভিক বর্তমান যুগের ছেলে। বিজ্ঞানে বিশ্বাসী। সব কিছুতেই বৈজ্ঞানিক যুক্তি দেওয়া তার অভ্যেস। অন্যদের মতো সেও জাদুটাকে কিছুটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও কিছুটা হাতের সাফাই বলে মনে করে।
    ‘ম্যাজিকে হিপ্নোটিজমটা বেশ ভালো, বাকি সব তো বেকার।’ নিজের খাবার শেষ করে সৌভিক বলল- ‘হাতের সাফাইটাই হলো আসল। যে যত ভালো হাতের সাফাই পারবে, আজকের দিনে সে ততো ভালো ম্যাজিশিয়ান। হ্যাঁ, সাথে অল্পবিস্তর বিজ্ঞানও থাকে অবশ্য।’
    সৌভিকের দিকে তাকিয়ে অল্প হাসলেন দেবব্রত। বললেন – ‘বর্তমান যুগে লোকেরা তাই মনে করে বটে। কিন্তু ম্যাজিক বিজ্ঞান ও হাত কী সাফাই থেকে ঊর্ধে।’
    ‘সেটা আপনার মনে হতে পারে, দেবব্রত বাবু। কেন কি আপনি ম্যাজিক দেখান। ক্ষমা করবেন, আপনার প্রফেশনকে ছোট করা আমার উদ্দেশ্য নয়। যেটা সত্য সেটাই বলছি। হিপ্নোটিজ্ম দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু দেখতে গেলে সেটাও তো সাইন্স। ভালো ভালো মনোচিকিৎসকেরাও হিপ্নোটিজ্ম পারে।’
    ‘অবশ্যই পারে। কিছু কিছু ম্যাজিকে বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে সেটা ঠিক, কিন্তু সব ম্যাজিক বিজ্ঞান ও হাত কী সাফাই নয় সান্যাল বাবু।’
    বেশি তর্কবিতর্কে যাওয়া স্বভাব নয় সৌভিকের। শুধু বলল- ‘এই যাত্রাপথে কোনো ম্যাজিক দেখাবেন কি? তাহলে সময়টা মন্দ কাটবে না।’
    দেবব্রতবাবু উত্তর না দিয়ে সৌভিকের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

    রাত সাড়ে ন’টায় যখন ট্রেন কানপুর সেন্ট্রাল থেকে রওনা দিলো, তখন দুজনেরই রাত্রি আহার শেষ হয় গেছে। দেবব্রত বাবুর সাথে কথা হওয়ার পর ক্রমাগত রিয়ার সাথে ফোনে কথা বলে গেলো সৌভিক। সেই কথা বিরাম পেলো রাত্রি আহারের পূর্বে। ডিনার শেষ হওয়ার পর এবার শুতে যাওয়ার পালা। সৌভিকের বার্থ নীচে এবং দেবব্রত বাবুর ওপরে। শুতে যাওয়ার আগে সৌভিক দেবব্রতবাবুকে বলল- ‘ম্যাজিক দেখা আর হলো না।’
    মুচকি হেসে দেবব্রত বাবু বললেন- ‘ভবিষ্যতে আবার যদি দেখা হয়, তাহলে অবশ্যই দেখবো ম্যাজিক।’

    তখন প্রায় রাত দুটো। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল সৌভিকের। ব্যাপারটা কী? ট্রেনটা আজ একটু বেশি জোরে চলছে বলে মনে হচ্ছে না? ট্রেন চলার শব্দ একটু বেশিই কানে লাগছে এবং দুলুনিটাও অনেকটা বেশি। রাজধানী এক্সপ্রেসে এই প্রথম যাত্রা করছে না সৌভিক। কোনো বার তো এমন মনে হয়নি। তাহলে আজ হঠাৎ….
    কেবিনটা প্রায় অন্ধকার। একটা ছোট্ট নীল রঙ্গের বেড লাইট কেবিনকে আলোকিত করে রেখেছে। কেবিনের একই ধারে ওপর নীচে করে দুটো বার্থ। বার্থের ঠিক উল্টো দিকে প্লাইএর দেয়াল। দেয়ালে আয়না ঝুলছে এবং জামাকাপড় রাখার ছোট একটা তাক সেখানে। সেই প্লাইএর দেয়ালের কাছেই দেবব্রত বাবুর ট্রলি ব্যাগ রাখা ছিলো। আলোআঁধারির মধ্যে সৌভিক দেখতে পেলো দেবব্রতবাবুর সেই ট্রলিটা নেই। চমকে উঠল সৌভিক। ট্রলিটা গেলো কোথায়। ঘুমের ঘোরে সে ভুল দেখছে না তো? আরও ভালো করে দেখবার চেষ্টা করলো সে। না, সে কিছু ভুল দেখছে না। উঠে দাঁড়ালো সৌভিক। ওপরের বার্থের দিকে তাকাতেই আশ্চর্যের সীমা থাকলো না তার। দেবব্রত ভট্টাচার্য তো কম্বল ঢাকা দিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন। এতো রাতে হঠাৎ নিজের ট্রলি ব্যাগ নিয়ে গেলেন কোথায়? তিনি বলেছিলেন যে তাঁকে আসানসোলেও নামতে হতে পারে। কিন্তু আসানসোল আসতে তো এখনও বহু দেরি। কী একটা মনে হতে বার্থের নীচে রাখা নিজের জিনিসপত্রগুলোকে দেখে নিলো সৌভিক। সেগুলো যথাস্থানেই আছে। নিজের মোবাইলে আগেই সময় দেখে নিয়েছিল সৌভিক। রাত দুটো দশ। এতো রাতে হঠাৎ দেবব্রত বাবু গেলেন কোথায়? প্রশ্নটা বারবার তার মনকে নাড়া দিতে লাগলো। কৌতূহল আর সন্দেহ মেশানো অনুভূতি নিয়ে কেবিনের বাইরে বেরোতে গেলো সৌভিক। কেবিনের দরজাটা খোলার সময় তার শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে গেলো এক ঠান্ডা স্রোত। তাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের কারণে কেবিনটা বেশ ঠান্ডা হয় গিয়েছিল। কিন্তু এই ঠান্ডা পরিবেশেও দরদর করে ঘেমে গেলো সৌভিক। কেবিনের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজার কাছে খানিক মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল সৌভিক। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ অথচ দেবব্রতবাবু কেবিনে নেই। কিছুক্ষণের জন্য তো কিছুই বুঝতে পেলো না সৌভিক। সে কী ভয় পেলো? কিন্তু ভয় পাওয়া তো তার স্বভাব বিরুদ্ধে। ছোট থেকেই সে শুনে এসেছে যে, সৌভিক সাহসী। ভয় তার ধারেকাছে আসতে পারে না। সেই সাহসের আজ কী হলো? না, সৌভিক ভীতু নয়। সাহস তাকে দেখতেই হবে। এই অদ্ভুত রহস্যের সমাধান তাকে করতেই হবে।

    কেবিনের দরজা খুলে বাইরে বেরলো সৌভিক। ট্রেন চলার শব্দ আরও বিকট ভাবে তার কানে এলো। লম্বা করিডোর। বেশ কিছু আলো জ্বলছে সেখানে। ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের দু’দিকে একবার তাকিয়ে নিলো সৌভিক। কোথাও কোনো জনপ্রাণী নেই। সৌভিক নিজের ডান দিকে এগোলো। করিডোরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে বাথরুমের দিকে গেলো সৌভিক। দু’টো বাথরুমই খোলা , তাতে কেউ নেই। নিজের মনের জোরে যে ভয়টাকে সৌভিক দাবিয়ে রেখেছিল, সেটা ক্রমে বাড়তে শুরু করলো। বন্ধ একটা ঘর থেকে এক জন উধাও হয় কী করে, এই প্রশ্নটা তাকে বিচলিত করে তুলছিল বারবার। রুদ্ধশ্বাসে সৌভিক দৌড়ে গেলো করিডোরের আরেক প্রান্তে। কামরার দরজার কাছে উল্টো দিকে মুখ করে একজনকে শুয়ে থাকতে দেখলো সে। পরনে সাদা জামা ও সাদা প্যান্ট। সৌভিক বুঝতে সময় নিলো না যে শুয়ে থাকা ভদ্রলোকটি কোচ অ্যাটেনডেন্ট।

    ‘দাদা , ও দাদা!’
    কোচ অ্যাটেনডেন্টকে ডাকলো সৌভিক। কোনো সাড়া শব্দ নেই। দু’তিন বার আরও ডাকলো সে। দেবব্রতবাবু যদি কোথাও গিয়েও থাকেন তাহলে কোচ অ্যাটেনডেন্ট সেটা জানবে। তাই তাকে ঘুম থেকে ওঠানো দরকার। ঘুমন্ত ব্যক্তিটির কাঁধে হাত দিয়ে দু’বার ধাক্কা দিলো সৌভিক। কোচ অ্যাটেনডেন্ট ধড়ফড় করে উঠে পড়লো। সৌভিকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো– ‘কেয়া হুয়া বাবু?’

    কোচ অ্যাটেনডেন্টকে দেখে সৌভিক চার হাত পেছনে ছিটকে গেলো। বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়ে রইল তার দিক। এ তো কোচ অ্যাটেনডেন্ট নয়। এ তো অবিকল দেবব্রত ভট্টাচার্য। সেই ধপধপে সাদা চুল, মুখ ভর্তি সাদা দাড়ি গোঁফ। কন্ঠস্বরও তো একই। ভয় যেন রক্ত শূন্য সৌভিক। কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। ঠিক মনে হচ্ছে দেবব্রত বাবু নিজের পরিধান পরিবর্তন করে সৌভিকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

    ‘কেয়া হুয়া বাবু?’ কোচ অ্যাটেনডেন্ট সৌভিকের দিকে এগিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
    সে মুহূর্তে সৌভিকের চিন্তাশক্তি যেন লোপ পেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কিছুই না বুঝতে পেয়ে দৌড় দিলো নিজের কেবিনের দিকে।
    ‘কেয়া হুয়া বাবু? কেয়া হুয়া বাবু?’ জিজ্ঞেস করতে করতে কোচ অ্যাটেনডেন্টও তার পিছু নিলো। নিজের কাবিনের কাছে পৌঁছে ভয় আতঙ্কে মূর্ছা যাওয়ার অবস্থা হলো সৌভিকের। তার পরিস্কার মনে আছে কেবিনের দরজা খুলেই সে বাইরে বেরিয়েছিল। এখন সে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
    ‘দরজা খোলো, দরজা খোলো, প্লিজ দরজাটা খোলো।’ পাগলের মতো দরজা পেটাচ্ছে ও চিৎকার করছে সৌভিক। কিন্তু দরজা খুলছে না কেউ। সৌভিক নিজের ডান দিকে তাকালো। কোচ অ্যাটেনডেন্ট ধীর গতিতে এগিয়ে আসছে তার দিকে। তার মুখে রহস্যময় হাসি। সৌভিক আবার দরজায় ধাক্কা দিলো। সৌভিকের প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা। যে সময় কোচ অ্যাটেনডেন্ট তার থেকে মাত্র দু’ হাত দূরে , ঠিক সেই মূহুর্তর কেবিনের দরজা খুলে গেলো। কেউ সৌভিকের হাত ধরে টেনে ভেতরে ঢুকিয়ে তার বার্থে তাকে বসিয়ে দিলো। সৌভিক দেখলো তার সামনে দেবব্রত ভট্টাচার্য। সেইকালো রঙের বস্ত্রে।
    ‘কী হলো? এতো ভয় পাচ্ছেন কেন আপনি?’ দেবব্রত বাবু মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন সৌভিককে।
    আর তখনই সৌভিক দেখলো কেবিনে প্রবেশ করলো সেই কোচ অ্যাটেনডেন্ট। অবিকল দেবব্রত ভট্টাচার্য। দুই দেবব্রত ভট্টাচার্য মিলে অট্টহাস্য শুরু করলো সৌভিকের অবস্থা দেখে। সৌভিক বার্থে বসে কিছুক্ষণ দেখলো তাদের। দৃষ্টি আসতে আসতে ঝাপসা হলো , তার পর চোখের সামনে অন্ধকার।

    যখন ঘুম ভাঙ্গলো সৌভিকের তখন সকাল প্রায় আটটা। রাজধানী এক্সপ্রেস তখন বর্ধমানের কাছে। ঘুম ভাঙতেই রাতের ঘটনাগুলো সৌভিকের চোখের সামনে একে একে ভেসে এলো। কী অদ্ভুত ও বীভৎস রহস্য! রাতের কিছু দৃশ্য ও সকালের কিছু দৃশ্যতে সামঞ্জস্য পেলো সৌভিক। দেবব্রত ভট্টাচার্য নেই, নেই তার ট্রলি ব্যাগটাও। সৌভিক কিছুই বুঝতে পারছিল না তার সাথে এটা হচ্ছেটা কী? তার মন থেকে আতঙ্কের কালো ছায়া এখনও কাটেনি। কেবিনের দরজা খুলে বাইরে বেরোতে গিয়ে দেখলো দরজা খোলা। বাইরে বেরোলো সে। অন্য এক কেবিন থেকে কোচ অ্যাটেনডেন্ট বেরিয়ে তার দিকেই আসছিল। সৌভিক তাকে ভালো করে দেখলো। না, এর চেহারার সাথে কোনো মিল নেই দেবব্রত বাবুর।
    ‘আমার কেবিনের এক জন আরও ছিলেন। তিনি কোথায় গেলেন আপনি বলতে পারবেন কি?’ কোচ অ্যাটেনডেন্টকে জিজ্ঞেস করলো সৌভিক।
    ‘উনি তো আসানসোল নেমে গেলেন।’ জবাব দিয়ে কোচ অ্যাটেনডেন্ট এগিয়ে গেলো।
    সৌভিক নিজের কেবিনে ফিরে এলো। জানালার কাছের ডেস্কে এক চার ফালি করে মোড়া কাগজের টুকরো দেখতে পেলো সে। কাগজ উঠিয়ে দেখলো সৌভিক। একটা চিঠি।
    ” সৌভিক বাবু ,
    দু’টো কারণে আপনার থেকে ক্ষমা চাইছি। প্রথমত, আপনাকে না বলে চললাম। দেখলাম আপনি গভীর ঘুমে মগ্ন। তাই বিরক্ত করা ঠিক মনে হলো না। আমাকে আসানসোল নামতে হলো। কাল রাতে বন্ধুর ফোন এসেছিল। ক্ষমা চাইবার দ্বিতীয় কারণ হলো, গত রাত্রে আপনাকে ভয় দেখানো। আপনি বলেছিলেন যে ম্যাজিক বিজ্ঞান ও হাত কী সাফাই ভিন্ন কিছুই না। আমার কথা আপনি বিশ্বাস করেননি। গত রাতে যা হলো সেটা না তো বিজ্ঞান ছিলো, আর না হাতের সাফাই। কারুর স্বপ্নে ঢুকে ভয় দেখানোটাও একটা ম্যাজিক। প্রকৃত ম্যাজিক বিজ্ঞান ও হাত কী সাফাই থেকে ঊর্ধে। আবারও ক্ষমা চাইছি আপনার থেকে। দুনিয়াটা গোল। ভবিষ্যতে কোথাও না কোথাও আবার দেখা হবে। চললাম।
    আপনার সহযাত্রী
    দেবব্রত ভট্টাচার্য

    চিঠিটা নিজের জামার পকেটে রেখে জানালার দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো সৌভিক।

  • গল্প

    কারণে- অকারণে

    কারণে- অকারণে
    -বিশ্বদীপ মুখার্জী

     

     

    শহরের নাম বাঞ্ছনীয় নয়। সেই শহর দীর্ঘদিন আমায় দিয়েছে আশ্রয়, সাথে দিয়েছে দু’বেলা অন্ন। তাই শহরের নাম এখানে লিখে সেটার অপমান করতে চাই না। প্রশ্ন হল, অপমান কিসের? যা কিছু আমি দেখলাম, অভিজ্ঞতা লাভ করলাম সেটা কি সত্যি এমন, যেটা পরবর্তী কালে জন সমূহের সামনে হাস্যকর অথবা নিন্দনীয় বিষয় হয় দাঁড়াবে? নচেৎ, তাহলে দোষারোপ আমার ওপরেও হওয়া উচিত। কেন কি সেই পরিস্থিতির কিছু টা অংশীদার আমিও ছিলাম।

    দেবাদা বলতো- ‘ঠিক-ভুল প্রত্যেকের নজরে ভিন্ন। আমার মন যেটা করতে সায় দেয়, সেটাকেই আমি ঠিক বলে মনে করি।’

    এহেন দার্শনিকতার প্রতিবাদ যে আমাদের মিত্রমণ্ডলীতে হতো , সেটা বলাই বাহুল্য । কিন্তু যতক্ষণ না নেশা নামতো, দেবাদার বক্তব্য এদিক থেকে ওদিক হত না। ‘নেশা’, হ্যাঁ, প্রায় প্রত্যেক সন্ধ্যায় আড্ডার অছিলায় “পান” শব্দের গুরুত্বকে আমরা বাড়িয়ে তুলতাম। সেটা ধূমপান হোক অথবা সুরাপান। আমি ছিলাম প্রবাসী। চাকরির সূত্রে সেই শহরে যাওয়া। যেই পাড়ায় ভাড়াবাড়িতে থাকতাম, সেখানকার প্রতিবেশীদের সাথে ভাল আলাপ-পরিচয় হয় গিয়েছিল আমার। দেবানন্দ ভট্টাচার্যর মুদির দোকানের শাটার বন্ধ হলে, আড়ালে বসতো আমাদের আড্ডার আসর। দেবানন্দ ভট্টাচার্যকে আমরা দেবাদা বলে ডাকতাম। বয়সে আমার থেকে প্রায় দশ বছরের বড়। শুধু দেবাদাই নয়, মলয়দা, প্রতাপদা প্রত্যেকেই আমার থেকে বয়সে বড়। শুধু নব, মানে নবকুমার হাজরা ছিল আমার বয়সী।

    বয়সে বড় মিত্র মণ্ডলীর সাথে মেলামেশা করতে আমার অসুবিধে হয়নি। তাদের ব্যবহারে এতোটাই আপনত্ব যে, মুগ্ধ হতেই হয়। এই আপনত্বই তো ছোটো শহরের আত্মা।

    সে দিন কাজ থেকে আমি যথা সময় ফিরেছিলাম। চাবি দিয়ে দরজার তালা খুলতে যাব, পেছন থেকে মলয়দার গলার আওয়াজ পেলাম।
    ‘একটা খবর পেয়েছো, দীপ?’
    ঘাড় ঘুড়িয়ে মলয়দার দিকে তাকালাম। জিগ্যাসু নেত্রে চেয়ে রইলাম।
    ‘নবর মায়ের শরীর খুব খারাপ। কোলকাতা নিয়ে গেছে।’ মলয়দা বলল।
    ‘কী হয়েছে তার মায়ের?’ বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম।
    ‘সেরিব্রাল অ্যাট্যাক। এখানে ফেলে রেখে লাভ নেই, তাই কোলকাতা নিয়ে গেল। প্রতাপের কোন এক ভাই নাকি কোলকাতার এক সরকারী হাসপাতালের ডক্টর। প্রতাপ গেছে সঙ্গে।’
    আমি ঘরের দরজা খুলতে ভুলে গেলাম। খুবই খারাপ খবর। আমাদের মধ্যে নব এক মাত্র যার আর্থিক অবস্থা ভাল না। এক তেলমিলে কাজ করে। কতই বা রোজগার হয় সেখান থেকে। অল্প বয়সে নিজের বাবাকে হারিয়েছে নব। মা ছাড়া এই বৃহৎ সংসারে আপন বলতে তার কেউ নেই। বিয়ে করেনি। পাছে যদি বৌ ভাল না হয়। পাড়ার লোকেরা তার বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু নবর জেদের আগে তাদের হার মানতেই হল।
    আমি লঘু কদমে এগিয়ে গেলাম মলয়দার কাছে। নিজের সিগারেটের ডিবে থেকে দু’টো সিগারেট বার করে একটা আমায় দিলো, একটা নিজে ধারালো মলয়দা।
    ‘কখন ঘটল এসব? আমায় খবর তো দিতে পারতে।’ সিগারেটে একটা টান দিয়ে অভিমানের স্বরে আমি বললাম।
    সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে মলয়দা বলল- ‘ঘটনা ঘটেছে প্রায় বেলা এগারোটায়। তোমায় খবর দিয়ে লাভ কী হতো, দীপ? কাজের ক্ষতি হতো বরং। আমার কাছেও সময় ছিল না। না তো আমি সাথে যেতাম। কিন্তু ভাই, একটা কথা বলি, শোনো। নিয়ে যে গেল, তাতে টাকার শ্রাদ্ধ ছাড়া কিছু হবে না। দেখে তো অবস্থা খুব খারাপ মনে হল। বাঁচিয়ে নিয়ে ফেরার সম্ভাবনা কম। দেবাও তাই বলছিল।’

    আমার ঠিকানা থেকে দেবাদার দোকান খুব কাছে। কথা বলতে-বলতে আমরা দোকানের সামনে উপস্থিত হলাম। গ্রাহক ছিল না। দেবাদা কী একটা হিসেব মেলাতে ব্যস্ত। আমাদের এক নজর দেখে পুনরায় হিসেবে মনোনিবেশ করল। আমরা দু’জনে সামনের রকে বসলাম

    মলয়দা বলতে লাগলো- ‘দেখো দীপ, তফাৎ কী হত? এখানে থাকলে দু’দিন বাঁচতো, সেখানে না হয় আরো দু’দিন বাঁচবে।’
    দেবাদা আমাদের দিকে ভাল করে তাকালো এবার

    ‘এই অবস্থায় বেঁচে থাকা মানেই কষ্ট। একটা রুগী যে কষ্ট ভোগ করে, তার অংশীদার কি আমরা হতে পারি?’ দেবাদা বলল।
    এহেন কথা শুনে আমার অবাক লাগছিল। বললাম- ‘তা বলে কি মানুষে চেষ্টা করা ছেড়ে দেবে? জন্ম-মৃত্যু তো আমাদের হাতে নেই, আমরা শুধু চেষ্টাই করতে পারি।’

    ‘হ্যাঁ, তা ঠিক বলেছ। দেখা যাক নিয়তির লেখন কী?’ কথা শেষ করে দেবাদা পুনরায় নিজের হিসেবের খাতার দিকে ঘাড় হেঁট করল।
    আমার সিগারেট শেষ হয় গিয়েছিল। রক থেকে উঠে ঘরের দিকে এগোবার জন্য পা বাড়ালাম। মলয়দা সঙ্গ নিল।
    ‘তোমার কথাটা ঠিক। মানুষ শুধু চেষ্টাই করতে পারে। কিন্তু মানুষকে নিজের পকেটের দিকেও তাকানো উচিত। কোলকাতা নিয়ে যেতে, নিয়ে আসতে পাঁচ হাজারের ওপর খরচ। তারপর, সরকারী হাসপাতাল হলেও, কিছু খরচ তো আছেই। যদি নবর মা সুস্থ হয় ফেরেন, সেটাও কত দিনে তার কোনো ঠিক নেই। তুমি তো জানো দীপ, এসব বড় লোকেদের রোগ। দীর্ঘ দিন চিকিৎসা চলে।’
    আমি দরজা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকলাম। লাইট জ্বালিয়ে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলাম মলয়দাার দিকে। মলয়দা উপবেশন করল। আমি হাত-মুখ ধুয়ে এসে মলয়দাকে বললাম- ‘টাকার মূল্য অনেক, সেটা মানি। কিন্তু মলয়দা, মানুষের জীবনের মূল্য কি টাকার থেকে কম? নব তো একলা নয়, আমরা তো আছি তার সাথে। টাকার প্রয়োজন হলে কিছু-কিছু টাকা দিয়ে আমরা সাহায্য করতেই পারি তাকে। আর চিকিৎসার কথা বলছ? হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিলে বাড়িতেই চিকিৎসা হয় এই রোগের। হ্যাঁ, প্রাথমিক দিকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া দরকার। হাসপাতালে কত দিন থাকতে হয় সেটাই দেখার।’
    আমার শেষ বাক্যের জের টেনে মলয়দা বলল- ‘সেটা তো আমারও কথা, দীপ। কত দিন থাকতে হবে সেখানে তার ঠিক নেই। তার ওপর লোকবলের অভাব। আয়া ঠিক করতে হবে। দিন হিসেবে টাকা নেবে তারা। প্রায় তিন ‘শত টাকা প্রতিদিন। খরচের অংকটা একবার হিসেব করে দেখে নাও।’

    রাত্রে ফোন করলাম নবকে। শুনতে পেলাম তার অশ্রু ভেজা কন্ঠস্বর। জানতে পারলাম, তার মায়ের শরীর ক্রমাগত অবনতির দিকে এগোচ্ছে। আমি বললাম- ‘টাকার চিন্তা করিস না, নব। আমরা আছি। শুধু টাকাই নয়, যে কোনো প্রয়োজনে খবর দিবি।’

    মলয়দা-র বলা “টাকার শ্রাদ্ধ” কথাটা আমায় চঞ্চল করে তুলেছিল। সত্যি কি আজকের দিনে মনুষ্যের জীবন থেকে টাকার মূল্য বেড়ে গেছে? নবর মা যদি জীবিত অবস্থায় ফিরে না আসেন, তাহলে কি সত্যি এটা টাকার শ্রাদ্ধ হবে? ফোনে নব আমায় বলেছিল- ‘বাবা মারা যাওয়ার সময় আমি এতোই ছোটো ছিলাম যে, কিছুই করতে পারিনি। আফসোস রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার আর সেই আফসোস থাকবে না। আমি চেষ্টা তো করলাম।’
    মানুষের মনের সান্ত্বনা, মনের তৃপ্তি থেকে টাকার মূল্য অনেক বেশি। সেটা তো মানতেই হবে।

    খবরটা পরদিন সকালে পেলাম। নবই ফোন করে খবরটা দিল – ‘মা আর নেই।’ দেবাদার দোকানের সামনে আমরা একত্রিত হলাম। প্রশ্ন উঠল মৃতদেহ নিয়ে আসা নিয়ে।

    ‘কোলকাতা থেকে যদি শব বাহন গাড়ি করে নিয়ে আসা হয়, তাহলে চার হাজার টাকার মত লাগবে।‘ মলয়দা বলল।

    ‘দরকার নেই। আমার এক পরিচিত পৌরসভায় গাড়ি চালায়। আমি তাকে ফোন করছি।’ দেবাদা প্রস্তাব রাখল।
    দিনটা ছিল রবিবার। ছুটির দিন। তাই আমি বললাম- ‘এখান থেকে যদি গাড়ি যায়, তাহলে আমি যেতে পারি। প্রতাপদার পক্ষে নবকে একলা সামলানো কি সম্ভব হবে?’

    সত্যি, নবকে সামলানো প্রতাপদার পক্ষে একলা সম্ভব ছিল না। হাসপাতালের সেই করুণ দৃশ্যের বর্ণনা করতে চাই না। যার যায়, সেই বোঝে। আমরা মন শান্ত করার দু’চারটে কথা বলতে পারি মাত্র। কারুর দুঃখে নিজে অংশগ্রণ করা সম্ভব নয়। কোলকাতা যাওয়ার পথেই দেখেছিলাম আকাশের অবস্থা ভাল নয়। ঘন কালো মেঘ জোমেছিল আকাশে। যে কোনো সময়ে বৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা। নবর এই চরম বিপত্তির সময় আকাশও যেন নিজের প্রত্যেক অশ্রু বিন্দুকে বর্ষার জলে রূপান্তরিত করে পৃথিবী ভাসিয়ে দেওয়ার উপক্রম করছে। ফেরার পথে মাঝ রাস্তায় বৃষ্টি আরম্ভ হল, যেটা গন্তব্য স্থলে পৌঁছবার পূর্বেই নিজের নিষ্ঠুর রূপ ধারণ করল। মৃতদেহ নিয়ে যখন আমরা পৌঁছলাম, তখন বিকেল পাঁচটা । নবর বাড়ির সামনে ছাতা মাথায় দেওয়া প্রতিবেশীদের ভীড়। একে-একে প্রত্যেকে কাঁচের দেয়ালে বন্দী মৃত দেহের দর্শন করলেন।
    আমরা শ্মশান পৌঁছলাম সন্ধ্যা ছ’টার পর। বৃষ্টি অনেকটাই কমেছিল। মৃতদেহকে ঘি মাখানো, গঙ্গা স্নান করানো প্রভৃৃৃতি কাজ শুরু হল। ঠিক সেই সময় যা দেখলাম, সেটা ছিল আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। এর আগেও আমি বেশ কিছুবার কারুর না কারুর শ্মশান যাত্রী হয়েছি। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা কোনোদিন লাভ করিনি। দেখলাম, মলয়দা প্রতাপদার হাতে কিছু টাকা দিলো। টাকা গুনে প্রতাপদা সেটা নিজের প্যান্টের পকেটে রাখল। কিছু বার্তা বিনিময় হল তাদের মধ্যে। আমি এক কোণায় দাঁড়িয়ে কৌতূহলী তাদের দিকে চেয়েছিলাম। প্রতাপদা আমার দিকেই এগিয়ে এলো। কাছে এসে বলল- ‘যাবে আমার সাথে?’

    ‘কোথায়?’ কৌতূহলী জিজ্ঞেস করলাম।
    প্রতাপদা অবাক হয় আমার দিকে তাকালো।
    ‘কেন? জানো না নাকি?’
    সত্যি আমি জানতাম না। মাথা নাড়লাম। মুচকি হাসলো প্রতাপদা ।
    ‘এসো আমার সাথে। জানতে পারবে।’
    মলয়দার বাইকে আমরা বসলাম। প্রতাপদা যে পথ বেয়ে আমাকে নিয়ে যাচ্ছিল, সেটা চিনতে পারলাম। যত এগোই, বিস্ময়ে চেয়ে থাকি চারিদিকে। এ পথে, এ পাড়ায় আমরা তো প্রায় রোজ আসি। কিন্তু আজ কেন? সেই চেনা দোকানের সামনে প্রতাপদা বাইক দাঁড় করালো। আমি হতবুদ্ধির মত তাকিয়ে রইলাম সেই দোকানের দিকে। চেনা দোকান পলকে অচেনা মনে হল আমার। পা উঠছিল না। প্রতাপদা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নিজের পাশে আমাকে না দেখতে পেয়ে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকালো পেছন দিকে। আমি মূর্তির মত বাইকের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম।

    কী হল? এসো, দাঁড়িয়ে রইলে যে।’

    প্রতাপদার কথায় সংবিৎ ফিরে পেলাম।
    ইচ্ছে হল জিজ্ঞেস করি- ‘এখানে কেন? আজ এখানে কিসের কাজ?’
    কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। বিস্ময়ে কন্ঠরোধ হয় গিয়েছিল আমার। প্রতাপদার ডাকে যন্ত্রের মত এগিয়ে গেলাম। বিলেতি মদের একটা বড় বোতল নিয়ে, প্যান্টের পকেট থেকে এক থলি বার করে তাতে বোতলটা ঢোকালো প্রতাপদা । থলিটা আমার হাতে দিয়ে বলল- ‘এটাকে নিজের কাছে রাখো। সামলে রাখবে।’ দোকানিকে বোতলের মূল্য চুকিয়ে আমার পুনরায় ফিরে এলাম বাইকের কাছে। এই পরিস্থিতিতে এমন জায়গায় নিজেকে বেমানান লাগছিল। অপরাধী মনে হচ্ছিল নিজেকে। আশেপাশের লোকেদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছিলাম না। শুধু ভাবছিলাম- ‘কতক্ষণে এ স্থান পরিত্যাগ করবো।’

    শ্মশান ফেরার পথে প্রতাপদা কত কিছু অনর্গল বকে গেল। একটা কথাও আমার কর্ণ স্পর্শ করল না। মাথায় কেবল মাত্র একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল- ‘আজকের দিনে এর প্রয়োজন কী?’

    চারিদিক প্রায় অন্ধকার। মাঝে-মাঝে বিদ্যুতের আলো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইটের ন্যায় জ্বলে উঠছিল। নবর মায়ের নিস্প্রাণ দেহ চুল্লিতে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক অন্ধকার প্রায় কোণাতে প্রত্যেক শ্মশান যাত্রীরা একত্রিত। নবকে চা পান করিয়ে তার এবার নিজেদের পানের দিকে ধ্যানমগ্ন। একে-একে প্রত্যেকে লাল জল গলাদ্ধকরণ করতে শুরু করল। মদ্যপানের তিন কারণের বিষয় আমার জানা ছিল। প্রথম অত্যন্ত খুশিতে মদ্যপান, দ্বিতীয় দুঃখের সাগরে ডুবে গেলে মদ্যপান, এবং তৃতীয় অকারণ মদ্যপান। এহেন পরিস্থিতিতে মদ্যপানের হেতু কী, সেটা জানার প্রবল ইচ্ছে হল।

    কারণ জানবার জন্য আমাকেও সেই পথে এগোতে হল। যতক্ষণ না নিজে দু’ঘুঁট গলাদ্ধকরণ করি, ততক্ষণ হেতু জানা সম্ভব নয়। আমি চিন্তা-ভাবনার ঘোরে ছিলাম, হঠাৎ দেখলাম দেবাদা গেলাস আমার দিকে এগিয়ে দিলো ।
    ‘কি হে! তুমিও নাও। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছো কেন?’
    আমি এক নিমেষে সেই গেলাসটা রিক্ত করে ফেরত দিলাম দেবাদাকে। না, এই গভীর বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য এক পেগ যথেষ্ট নয়। দু’তিন পেগ গলার নীচে নামিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে পুনরায় চিন্তা মগ্ন হলাম। দু’টো কারণ আমার চোখের সামনে জ্বল-জ্বল করে উঠল। শ্মশান যাত্রীদের মদ্যপানের দু’টো কারণ হতে পারে। যার হারিয়েছে তার দুঃখে দুঃখিত হয়ে মদ্যপান করা, অথবা যে ইহলোকের সব মোহ-মায়া পরিত্যাগ করে চিরকালের মত মুক্তি পেয়েছে তাঁর আনন্দে আনন্দিত হয় মদ্যপান করা। এখানে আমরা নব’র দুঃখে দুঃখিত, নাকি তার মায়ের মুক্তির আনন্দে আনন্দিত? প্রচুর মাথা ঘামিয়েও সেই প্রশ্নের উত্তর পেলাম না।

    সমাপ্ত।

  • গল্প

    বাইপাস ও বিয়ারের ক্যান

    বাইপাস ও বিয়ারের ক্যান
    – বিশ্বদীপ মুখার্জী

     

     

    অনুরোধ অগ্রাহ্য করা যায় না সব সময়ে। সৌভিকের অনুরোধ আমি এক বার অমান্য করেছি। ওর বিয়ের সময়। অতিরিক্ত ব্যস্ততার দরুণ যেতে পারিনি ওর বিয়েতে। অভিমান যে ওর হয়েছিল সেটা বলাই বাহুল্য। দু’দিন আগে সে আমায় ফোন করে বলল – ‘এবার আমি কোনো বাহানা শুনবো না। তোকে আসতেই হবে, এটাই শেষ কথা। আর রিয়া কী ভাবছে বলতো? কেমন বন্ধু রে বাবা, বিয়ে হওয়া থেকে দর্শন নেই একবারও।’

    না, এবার যেতেই হবে।
    সৌভিক বলেছিল – ‘আমি বাস স্ট্যান্ড পৌঁছে যাবো।’
    আমি মানা করলাম।
    ‘দরকার হবে না। তুই আবার আসতে যাবি কেন? আমি পৌঁছে যাবো।’

    কেলেঙ্কারিটা ঘটল বাসটা খারাপ হয় গিয়ে। ঠিক করার অনেক চেষ্টা করা হল, কিন্তু লাভ হল না। খানিক বাদে সহযাত্রীরা যে যার মত চলে গেল। শুধু রয়ে গেলাম আমি। লম্বা বাইপাস রাস্তা। এখান থেকে সৌভিকের বাড়ি নিদেনপক্ষেও দশ  কিলোমিটার তো হবেই। হেঁটে যাওয়ার কথা চিন্তাই করা যায় না। বেলা বাড়ার সাথেসাথে রৌদ্রের তাপ নিজের প্রকাণ্ড রূপ ধারণ করছে। রাস্তার দু’ধারে ক্ষেত। আশেপাশে কোনো গাছপালার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ রাস্তার ওপার থেকে একটা বাস আসতে দেখলাম। মনে প্রবল ইচ্ছে হল বাসটা ধরে ফেরত চলে যাই। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের ইচ্ছেকে দাবিয়ে দিলাম। সৌভিকের বিয়েতে যাইনি। এবার যদি তার ছেলের অন্নপ্রাশনেও না যাই, তাহলে সে কোনো দিন ক্ষমা করবে না আমায়। বন্ধুত্বের মাঝে চিড় ধরেই যাবে। সেটা আমি কখনোই হতে দিতে চাই না

    বাসটা আমার সামনে দিয়ে চলে গেল। আমি লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম সে দিকে। ব্যাগটাকে কাঁধে নিয়ে বাইপাস ধরে এগিয়ে গেলাম। ভাবলাম, সৌভিককে ফোন করে ডেকেনি। ওর বাইক নিয়ে আসতে বেশি সময় লাগবে না। দুর্ভাগ্য যে আমার ছায়া হয়ে আমার সাথেই যাত্রা আরম্ভ করেছে, সেটা বুঝলাম যখন সৌভিকের ফোন লাগলো না। হতাশ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু দাঁড়ানোটাও দুর্বিসহ হয়ে উঠছিল। অগত্যা পুনরায় হাঁটা শুরু করতেই হল।

    একনাগাড়ে পাঁচ মিনিট হাঁটার পর সম্পূর্ণ শরীর যেন অবসন্ন হয়ে উঠছিল। হাত-পা অসার। ক্ষণেকের জন্য বিরতি নিয়ে আবার যাত্রা পথে এগিয়ে যাওয়া। ঘামে সমস্ত শরীর গেছে ভিজে। গলা শুকনো কাঠের মত। হঠাৎ খেয়াল হল ব্যাগে একটা জলের বোতল আছে। আপাতত জল পান করে তৃষ্ণা থেকে মুক্তি তো পাই। শরীরে জল গেলে নাকি শক্তির সঞ্চার হয়। আমার শক্তির প্রয়োজন। মানসিক এবং শারীরিক। ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বার করার পর ক্ষণেকের জন্য হাত-পা ছুঁড়ে ক্রন্দন ভিন্ন আর কিছুই মাথায় আসেনি। জল প্রায় ফুটন্ত। যথাস্থানে জলের বোতলটা রেখে দিয়ে নিজের অসার দেহটাকে টানতে, টানতে এগিয়ে নিয়ে চললাম। মরুভূমিতে মরীচিকার মত দেখা দিলো খানিক দূর একটা বট বৃক্ষ। রাস্তার যেই ফুটে আমি ছিলাম, ঠিক সেই ফুটেই। আশ্চর্য ভাবে আমার শরীরে শক্তির সঞ্চার হল। পা দুটো যেন নিজে থেকেই তীব্র গতিতে ছুটে চলল সেই মরুভূমির মরীচিকার দিকে। বট বৃক্ষের দিকে যত এগোই, ততই যেন আমার হাঁটার গতি তীব্র হয়। এমন গতিতে এর আগে কোনো দিন হেঁটেছি কিনা মনে পড়ে না। কিন্তু একী? আমার সামনে থেকেও কেউ সেই বৃক্ষের দিকে সজোরে এগিয়ে আসছে বলে মনে হল আমার। আমি ভুল দেখছি না তো? না, ভুল আমি দেখছি না। আমার সামনে একটা লোক নিজের কাঁধে বড় কিছু একটা নিয়ে এগিয়ে আসছে বট বৃক্ষের দিকে। তার পাশে ছোট্টো একটা কন্যা।ধীরে ধীরে দুরত্ব কমলো আমাদের মধ্যে। আমার আগে সেই লোকটাই বট বৃক্ষের শীতল ছায়ার  নীচে উপস্থিত হল। বৃক্ষের তলায় স্থানের অভাব নেই। ঈষৎ দুরত্ব নিয়ে বসলাম আমি। মনে মনে ভাবছিলাম যে লোকটা কাঁধে এক প্রকাণ্ড বোঝা নিয়ে এতো দ্রুত গতিতে হাঁটল কী করে? দু’জনের পোশাক দেখে নিম্ন শ্রেণীর বলে মনে হল আমার। লোকটার বদনে এক ছেঁড়া গেঞ্জি এবং ময়লা লুঙ্গি। বয়স দেখে বোঝা মুশকিল। গরীবদের বয়স এমনিতেই একটু বেশি মনে হয়। তাও চল্লিশের কাছাকাছি বলে মনে হল। গায়ের রং কালো। এক মাথা রুক্ষ চুল। মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি গোঁফ। মেয়েটার বয়স খুব জোর আট বছর। শ্যামল বর্ণ দেহ। রুক্ষ ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল। দেহে ছেঁড়া ফ্রক। দেখে বোঝাই যায় সেই লোকটার কন্যা। আমার কৌতূহল হল লোকটার কাঁধে বৃহৎ বোঝাটা দেখে, যেটাকে সে ইতিমধ্যে মাটিতে নামিয়েছে। মাদুর ও কম্বলে পরিপাটি করে মোড়া একটা বৃহৎ বস্তু। লোকটার কাঁধে এক গামছা, যেটা দিয়ে নিজের মুখ থেকে ঘাম মুছতে, মুছতে সেই মেয়েটিকে বলল – ‘আর বিশী দূর না। চলেই আইলাম। ‘

    মেয়েটি শূন্য নেত্রে চেয়ে রইল সেই লোকটার দিকে।
    ‘নে, তুইও ঘাম মুছিয়া ফেল।’ গামছাটা মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিলো।

    আমার মধ্যে এক বড় রকম দোষ আছে। বেশিক্ষণ নিজের কৌতূহল দাবিয়ে রাখতে পারি না। এবারও পারলাম না। লোকটাকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম – ‘দাদা , মাদুরে মোড়া এই বস্তুটি কী?’
    লোকটা চমকে তাকালো আমার দিকে। এতক্ষণ হয়তো আমাকে লক্ষ্য করেনি সে। স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে খানিক চেয়ে সে বলল- ‘আজ্ঞে, ইটা বস্তু নয় বটে।’
    ‘তবে কী?’ আমার কৌতূহল আরো বৃদ্ধি পেল।
    বাচ্চা মেয়েটির দিকে একটা আঙ্গুল দেখিয়ে সে বলল- ‘এর মা বটে।’
    শুনে আমি আঁৎকে উঠলাম। লোকটা বলে কী? এই ছোট্টো মেয়েটির মা?
    ‘হাসপাতাল থিকা আইসছি, আজ্ঞে। আজ ভুরে মুরে গেল।’
    আমি হাঁ হয় ওর কথা শুনছি। কী বিকট যন্ত্রণা এদের, সেটা ভেবেই সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল। তাহলে কি লোকটা হাসপাতাল থেকে এই মৃতদেহটা কাঁধে করে নিয়ে আসছে? আমি প্রায় নির্বাক। লোকটা কি আমার মনের কথাটা শুনতে পেল? বলল – ‘হাসপাতালে একটা ভ্যান ছিল। উনেক টকা চাইলো। টকা আর কুথায়? তাই কাঁধে করে……।’ কথা শেষ করতে পারলো না সে। হয়তো গলা ভারী হয় আসছিল।
    আমি হতবুদ্ধির ন্যায় চেয়ে রইলাম তার দিকে। আশ্চর্য ঘটনা। এরকম ঘটনা সচরাচর চোখে পড়ে না। লোকটার কী আশ্চর্য ক্ষমতা? দুঃখের পাহাড় নেমে এসেছে তাদের কাঁধে, কিন্তু তবুও কাঁধ এখনও বলিষ্ঠ। লোকটার দিকে তাকিয়ে আমি নিজের ওপর লজ্জা বোধ করলাম। আমার পিঠে একটা ছোটো ব্যাগ। এই সাংঘাতিক গরমে ব্যাগের ভারটা যেন কোনো পর্বতের ভারের মত প্রকাণ্ড মনে হচ্ছে আমার। দীনতা মনুষ্যের সহ্য ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় শুনেছিলাম। আজ দেখেও নিলাম। হঠাৎ বাচ্চা মেয়েটির কন্ঠস্বরে আমি সংবিৎ ফিরে পেলাম। নিজের পিতাকে সে বলছে- ‘বাবু, জল খাইবো।’

    ‘সে কি রা? তিষ্টা পেলো নাকি?’
    মেয়েটি ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল।
    ‘উফঃ! এখুন জল কুথায় পাই বল দেকিনি? ইকটু বাদেই তো বাড়ি পৌঁছেছে যাব।’
    ‘জল খাবো, বাবু।’ কাঁদো কাঁদো গলায় পুনঃরায় নিজের পিতাকে বলল সে। তৃষ্ণায় দু’চোখ সজল হয়ে উঠেছিল তার।
    তৃষ্ণা কতটা কষ্টকর সেটা প্রত্যেকেই জানে। তৃষ্ণার্ত আমিও। কিন্তু যে জল আমার কাছে আছে, তাতে বিন্দু মাত্র তৃষ্ণা নিবারণ হবে না আমার সেটা বেশ ভালোই জানি। আমরা ফ্রিজের জল পান করে অভ্যস্ত। কিন্তু এরা? এরা তো এহেন জল দিয়েই নিজেদের তৃষ্ণা মেটায়। ফ্রিজের জল পাবে কোত্থেকে এরা। তাহলে কি আমার বোতলে যে ফুটন্ত প্রায় জলটা আছে, তাতে এই মেয়েটির তৃষ্ণা মিটবে? মেয়েটি নিরন্তর নিজের পিতাকে বিরক্ত করে যাচ্ছে জলের জন্য।
    ‘জ্বালাস নাতো। একে তো তুর মা সংসারটাকে জ্বালিয়ে চলে গেলো। এবার তুই জ্বালাস না। এবার মুনে হয় আমাকেেও মুরতে হবে।’ নিজের মেয়েকে বেশ ঝাঁঝিয়়ে কথাগুলো বলল লোকটা।
    খারাপ লাগছিল আমার। বট বৃক্ষের শীতল ছায়াতে যেন দম বন্ধ হয় আসছিল আমার। নিজেকে সংযমে রেখে ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বার করে মেয়েটিকে দিলাম। ইতস্তত করলো প্রথমে। তাকালো নিজের পিতার দিকে। লোকটা করুণ দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইলো শুধু।
    ‘নাও, জল আছে।’ মেয়েটিকে বললাম। তার হাতে বোতলটা ধরিয়ে দিলাম।

    গরম জলে তৃষ্ণা নিবারণ হয় না সেটা জানা কথা। প্রায় পুরো বোতল রিক্ত করার পরেও মেয়েটির তৃষ্ণা মেটেনি সেটা বুঝলাম খানিক বাদেই।

    আমাকে বোতল ফেরত দেওয়ার পরেই লোকটা উঠে দাঁড়ালো।
    ‘চলি আজ্ঞে। দেরি হুই যাবে। চল রে।

    আমার মনটা অজান্তেই ছটফট করে উঠল। কিছু সাহায্য করতে চাইছিলাম তাদের। কিন্তু কেমন সাহায্য? অর্থ দিয়ে নাকি সঙ্গ দিয়ে? সঙ্গ দেওয়ার সময় আমার কাছে নেই। তাই অর্থ দিয়েই সাহায্য করবো নিশ্চয় করলাম। বলতে দ্বিধা নেই যে সংকোচ হচ্ছিল। শব্দের অভাব বোধ করছিলাম। পার্সে সর্বসাকুল্যে হয়তো দু’শত টাকা হবে। একশত টাকার একটা নোট বার করে লোকটার দিকে বাড়িয়ে বললাম- ‘এটা রাখো। কাজে দেবে।’
    লোকটা ততক্ষণে নিজের মৃত স্ত্রীর দেহকে কাঁধে উঠিয়ে নিয়েছে। আমার দিকে চেয়ে বলল- ‘না আজ্ঞে, টাকা লিবো না। আপনি ভগুবান মানুষ। মেয়েটিকে জল দিয়া বাঁচাইলেন। আপনিগো থিকা টাকা লিয়া আমি পাপ করবো না।’
    ‘পাপ কিসের? কথা যদি পাপের আর পূণ্যের হয়, তাহলে পাপ তো আমি করছি। আপনাকে এতো বড় একটা সংকটে দেখেও মাত্র এই কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করছি।’
    আমি আর কথা বাড়ালাম না। এই সময় মনুষ্যত্বের বিষয়ে ভাষণ দেওয়া যুক্তিকর হতো না। জোর করেই লোকটার হাতে গুঁজে দিলাম সেই নোটটা। দশ টাকার দু’টো নোট মেয়েটির হাতে দিয়ে বললাম- ‘ঠান্ডা কিছু খেয়ে নিস।’

    নিজের গৃহের দিকে এগিয়ে গেল তারা। এর পরেই যা দেখলাম, সেটা আমার জীবনের চরম অভিজ্ঞতা। তৃষ্ণা মানুষকে দিয়ে কী না করায়? রাস্তার ওফুট দিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল একটা গাড়ি। উচ্চ ধ্বনিতে গান কানের পোকা নাড়িয়ে দিলো। গাড়ির এক খোলা জানালা থেকে তীর বেগে বেরিয়ে এলো রিক্ত এক বিয়ারের ক্যান। ক্যানটা মেয়েটির পায়ের কাছে এসে হোঁচট খেয়ে থেমে গেলো। ঝুঁকে সেই রিক্ত ক্যানকে ওঠালো সে। ক্যানের গায়ে এখনও বিন্দু বিন্দু জলকণা লেগে ছিল। ঠান্ডা, শীতল জল কণা। তৃপ্তি সহকারে সেই জল কণা চাটতে চাটতে মেয়েটি নিজের বাবুর পেছন পেছন হাঁটতে লাগলো। আমি শুধু মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখতে থাকলাম।

    সমাপ্ত ।

  • ধারাবাহিক

    অমৃতের বিষ পান (পর্ব -৪/শেষ) 

    অমৃতের বিষ পান (পর্ব -৪/শেষ)
    -বিশ্বদীপ মুখার্জী

     

    মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়ে রইল মিতালী। তার দু’চোখ লাল, জলে ভেজা ।
    ‘কী বললেন? দেওরের ওপর কুদৃষ্টি? আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন নাকি? আমি নিজের দেওরের ওপর কুদৃষ্টি দিয়েছি? এ সব তথ্য আপনারা পান কোথা থেকে? মানে …. মানে যে দোষী তাকে বেকুসুর খালাস করে, যে বেকুসুর তাকে দোষী করবেন? বাঃ এ.সি.পি.বাঃ! এই আপনাদের ইনভেস্টিগেশন? কে কার ওপর কুদৃষ্টি দিয়েছিল, সেটা বুঝবার ক্ষমতা আপনারা হারিয়ে ফেলেছেন। এখন যদি আমি কিছু বলি আপনাকে তাহলে আপনি কস্মিনকালেও বিশ্বাস করবেন না। শরীরে দাগ নেই এ.সি.পি. এতো দিনে সব দাগ মুছে গেছে। যদি থাকতো তাহলে নিজের সমস্ত কাপড় খুলে আপনাকে দেখিয়ে দিতাম। সেটাই হতো সেই শুয়োরের বাচ্চা ভাস্কর গাঙ্গুলীর বিরুদ্ধে আমার প্রমাণ। শরীরের দাগ মুছে গেলে কী হবে, মনের ভেতরকার ক্ষত এখনও রয়ে গেছে। সেটা কোনো দিন মুছবে না। আপনারা অন্ধ এ.সি.পি. আপনারা অন্ধ।’ কথা শেষ করে ডুকরে কেঁদে উঠলো মিতালী।
    মৃত্যুঞ্জয় নিস্তব্ধ। মিতালীর কথাগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে নিজের করা এই ভুলের ক্ষমা নেই। খানিক পর নিজেকে সামলে নিয়ে মিতালী পুনরায় বলতে শুরু করলো- ‘আমারও ভালোবাসার অধিকার আছে স্বামীকে ভালবাসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে ভালোবাসার মর্ম বুঝতে পারলো না। স্বামী মারা যাওয়ার পর ভাস্করের হাত থেকে কোনোক্রমে নিষ্কৃতি পেয়ে আমি যখন এখানে আসি, তখন আমি মানসিক দিক থেকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে গেছি। আমি আর আমার মেয়ে, এটাই ছিলো আমার সংসার। তার পর হঠাৎ করে আমার জীবনে আসে অমৃত। ছেলেটা ছিলো খুব শান্ত, কিন্তু কথা বলতে বেশ ভালোবাসতো। আসতে আসতে তার সাথে গল্প করা শুরু করলাম। নিজের অতীতের কথা তাকে বলতাম। মনটা বেশ হালকা হতো আমার। হ্যাঁ, আমি ভালবেসেছি, ভালবেসেছি অমৃতকে। নিজের থেকে বয়সে ছোটো কোনো ছেলেকে ভালোবাসা যদি অপরাধ হয়, তাহলে সেই অপরাধ করেছি আমি। আর আমার তাতে কোনো আফসোস নেই।’
    মৃত্যুঞ্জয় পুনরায় ঘরের এদিক ওদিক ঘুরতে শুরু করলো। এবার সে মাস্টার বেডরুমে গেলো। প্রতিটি জিনিস অতি সন্তর্পণে নিরীক্ষণ করছিলো সে। হঠাৎ তার নজর গেলো শোকেসে রাখা এক ফটো ফ্রেমের ওপর। হাতে নিয়ে ভালো করে দেখলো। এক পরিবারের গ্রুপ ফটো। এটা যে গাঙ্গুলী পরিবার সেটা বুঝতে দেরি হলো না তার।
    ‘কে কে আছে এই গ্রুপ ফটোতে?’ মিতালীকে জিজ্ঞেস করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    মিতালী আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে শুরু করলো- ‘ইনি আমার শ্বশুর, আমার স্বামী, আমার দেওর, দেওরের স্ত্রী ….’
    হাত দেখিয়ে থামবার ইশারা করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘এটা আপনার দেওর?’ ভাস্কর গাঙ্গুলীর ছবির দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করলো।
    ‘হ্যাঁ, এটাই সেই পিশাচ।’ রক্তবর্ণ নেত্রে মিতালী বলল।
    মৃত্যুঞ্জয় আর কিছু বলল না। ভ্রুকুটি করে সে দিকে একাগ্রচিত্তে চেয়ে রইল।
    ইতি মধ্যেই মৃত্যুঞ্জয়ের মোবাইলটা বাজলো। অরূপের ফোন।
    ‘হ্যাঁ অরূপ, বলো।’
    ‘দুটো খবর আছে। প্রথম খবর হলো ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টকে পাঠিয়ে দিয়েছি অনেকক্ষণ আগে, আর দ্বিতীয় খবর হলো ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তীর জুতো পাওয়া গেলো না। সে নিজের চেম্বারে নেই। চেম্বার বন্ধ, তালা লাগা।’
    মৃত্যুঞ্জয় বলল- ‘তুমি এই মুহূর্তে একটা কাজ করো অরূপ। কিছু ফোর্স নিয়ে পার্ক সার্কাসের দিকে রওনা দাও। সেখানে ‘কেয়ার ফর ইউ’ নামের এক নার্সিং হোম আছে, সেখানে যাও। যত দূর সম্ভব সিদ্ধার্থ চক্রবর্তীকে সেখানেই পাবে। একটা আরও কথা, আজ সকালে মিতালী গাঙ্গুলীর মেয়ে রিয়াকে তার ফ্ল্যাট থেকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। ফ্ল্যাটের মেঝেতে কাদা মাখা জুতোর ছাপ রয়েছে। আমার বিশ্বাস সে জুতোর ছাপ ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তীর। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে অ্যারেস্ট করো।’
    মৃত্যুঞ্জয় ফোন কেটে দিয়ে মিতালীকে বলল- ‘আপনি যে মহিলা উন্নয়ন সমিতির এক সদস্য, সেটাও আপনি বলেননি।’
    মিতালী নিরুত্তর।
    ‘রিতিকা ব্যানার্জীকে আপনি চেনেন?’
    মিতালী চমকে তাকালো মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে।
    ‘রিতিকা ব্যানার্জী?’
    ‘হ্যাঁ। যাদবপুরে থাকতো। প্রায় বছর খানেক আগে থেকে নিখোঁজ।’
    চাপা কন্ঠে মিতালী বলল- ‘চিনি। আমাদের সমিতিরই এক সদস্য ছিলো সে।’
    ‘সে কোনো ডক্টরকে দিয়ে নিজের চিকিৎসা করাচ্ছিল সেটা জানতেন?’
    ‘না। জানতাম না।’ দৃঢ় কন্ঠে মিতালী বলল।
    ‘আচ্ছা, একটা কথার জবাব দিন। আপনি তো বেহালাতে বহু দিন থেকেছেন। সেখানে কি কোনো বিউটি পার্লার নেই?’
    মৃত্যুঞ্জয়ের এই বিচিত্র প্রশ্নে অবাক হলো মিতালী।
    ‘থাকবে না কেন? অনেক আছে।’ জবাব দিলো সে।
    খানিক শূন্যের দিকে ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে চিন্তা করলো মৃত্যুঞ্জয়, তার পর বলল- ‘ঠিক আছে, আমি তাহলে এবার আসি। আপ্রাণ চেষ্টা করবো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার মেয়েকে আপনার কাছে ফিরিয়ে দিতে।’
    কথা শেষ করে হনহন করে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেলো সে।
    মিতালীর ফ্ল্যাট থেকে বেরোতেই সামনের সিঁড়িতে কিছু আবছা দেখতে পেলো মৃত্যুঞ্জয়। যেন সিঁড়ি দিয়ে কেউ ওপরে উঠছিল, মৃত্যুঞ্জয়কে দেখতে পেয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে গেলো। কে হতে পারে? আজ লিফট্ খারাপ, তাই হয়তো সে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এসেছে। মৃত্যুঞ্জয়ও দ্রুত পায়ে পিছু নিলো তার। চারিপাশে অকারণ কিসের যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসা দুজনের পদধ্বনি ভিন্ন অতিরিক্ত কোনো শব্দ নেই। মৃত্যুঞ্জয় বুঝতে পারলো যার পিছু সে নিচ্ছে সে অতি তীব্র গতিতে দৌড়াতে সক্ষম। খানিক পর আগন্তুক দ্রুত বেগে মুখ্য ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেলো। দারোয়ানের পাত্তা নেই। সেই লোকটির ফটক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার প্রায় পাঁচ সেকেন্ড পর মৃত্যুঞ্জয় ফটক পার করলো। রাস্তাঘাটে লোকজনের চলাচল বেশ ভালোই। সেই লোকটি এগিয়ে চলল বাঘাযতীন স্টেশনের দিকে। দুজনের দূরত্ব প্রায় কুড়ি হাত। ক্রমে সেই দূরত্ব কমছে। পনেরো হাত …. দশ হাত …. পাঁচ হাত …. দু হাত …. অবশেষে তাকে নিজের নাগালে পেলো মৃত্যুঞ্জয়। সেই লোকটির জামার কলারে মৃত্যুঞ্জয়ের হাত গেলো। মৃত্যুঞ্জয়ের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে গেলো সে। বিফল হলো। সামনের দিকে মুখ থুবড়ে পড়লো। অল্প আঘাত পেলো, সেটা বলাই বাহুল্য। তাকে সামনের দিকে ঘুরিয়ে তার ওপর চড়ে বসলো মৃত্যুঞ্জয়। দু হাতের মুঠোয় তার জামার কলার ধরে মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করলো- ‘আমাকে ফলো করা হচ্ছে? কে তুই?’
    সে চুপ করে থাকলো। দু’ গালে দুটো কষিয়ে থাপ্পড় কষালো মৃত্যুঞ্জয়। চোট ও থাপ্পড়ের দরুণ তার ঠোঁট দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত।
    ‘যদি আরও মার না খেতে চাস তাহলে বল তুই কে আর কেন আমাকে ফলো করছিস?’ মৃত্যুঞ্জয় প্রায় চিৎকার করে কথাগুলো বলল।
    অল্প কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সে ছেলেটা বলল- ‘আমি …. আমি রাহুল , রাহুল ব্যানার্জী।’
    অরূপ হালদার বেশ কিছু পুলিশ ফোর্স নিয়ে পৌঁছালো পার্ক সার্কাস অবস্থিত ‘কেয়ার ফর ইউ’ নার্সিং হোমে। তার আগে লোকাল থানার বড় বাবু সমেত কিছু কনস্টেবলকে সে নিয়ে নিয়েছে। লোকাল থানার বড় বাবুর নাম শ্রীধর হাজরা। বেশ মোটাসোটা লোক, বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছে।
    ‘কী ব্যাপার অরূপ বাবু? অতো হন্তদন্ত কেন?’
    অরূপ হালদার সংক্ষিপ্তে পুরো ঘটনাটা বলে শেষে বলল- ‘আমার মনে হয়ে কোনো বড় স্ক্যান্ডালের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।’
    ‘আর যদি কিছু না পাওয়া যায়?’ হাজরা বাবু সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখলেন অরূপকে।
    ‘কিছু না পাওয়া গেলে ডক্টর সিদ্ধার্থকে অ্যারেস্ট করবো।’ অরূপ বলল।
    ‘বিনা কোনো প্রমাণে?’
    ‘আন্ডার সস্পিশন।’
    নার্সিং হোমে বেশ কিছু পুলিশকে এক সাথে ঢুকতে দেখেই রিসেপশনিস্ট ঘাবড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
    ‘ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী আছে?’ জিজ্ঞেস করলো অরূপ।
    ‘না….মানে….মানে…হ্যাঁ ….’ মেয়েটি সংলগ্ন কিছুই বলতে পারলো না।
    ‘কী হলো? আছে কি না বলতে এতো সময় লাগে?’ বড় বাবু হাজরা এক ধমক দিলেন।
    ‘হ্যাঁ, আছেন।’ মেয়েটি জবাব দিলো।
    ‘কোথায়?’ প্রশ্ন করলো অরূপ।
    ‘ওপরে …. ওপরে।’
    চার তলা নার্সিং হোম। প্রতিটি ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজলো তারা। নার্সিং হোমের মালিকের কেবিনে তালা। শেষে তারা পৌঁছালো চার তলায়। সেখানে আছে দুটো অপারেশন থিয়েটার , একটা বড় আই.সি.ইউ. এবং একটা হল ঘর। হল ঘরের দরজাটা অল্প খোলা ছিলো। ধাক্কা দিয়ে সেটা পুরো খুলে দিয়ে ভেতরে ঢুকলো অরূপ। ঘরে দুজন ভদ্রলোক।
    ‘আপনাদের মধ্যে সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী কে?’
    সিদ্ধার্থ গোলগোল চোখে অরূপকে দেখলো। দরদর করে ঘামছে সে। তার হাবভাব দেখে অরূপের বুঝতে অসুবিধে হলো না যে এই সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী। অরূপ এগিয়ে গেল তার দিকে।
    ‘আপনি কিছু নিলেন এনার কাছ থেকে। তাই না?’
    অরূপের সামনে দাঁড়ানো ভদ্রলোকটি বলল- ‘না না, আ..আমি তো কিছুই দিইনি একে।’
    ‘সার্চ করে দেখবো?’
    সিদ্ধার্থ চক্রবর্তীর কোর্টের পকেট থেকে বেরোল নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা।
    ‘এবার বলুন চক্রবর্তী বাবু, মিতালী গাঙ্গুলীর মেয়ে রিয়া কোথায়?’
    অরূপের এই প্রশ্নে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী।
    বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমে এসেছে। আকাশে আর মেঘ নেই। দিনের শেষে বিদায় নেওয়ার পূর্বে নিজের দর্শন দিয়েছেন সূর্য দেবতা। বালিগঞ্জে রুবি দে’র বিউটি পার্লার উক্ত বাড়ির সামনে এক হোন্ডা সিটি গাড়ি এসে দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে নেমে পার্লারের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো মৃত্যুঞ্জয়। পার্লারে কাজ করা দুই মেয়ের মধ্যে একজনও নেই। দরজা খোলার শব্দে ভেতর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো রুবি দে। নিজের সামনে আচমকা মৃত্যুঞ্জয়কে দেখে মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল তার। চকিতে নিজেকে সামলে মুখে কৃত্রিম হাসি নিয়ে বলল- ‘আপনি এখানে? এই সময়?’
    ‘আমাদের সময়ের ঠিক থাকে না ম্যাডাম। আমাকে দেখে ঘাবড়ে গেলেন দেখছি।’
    ‘না, না , ঘাবড়াবার কী আছে? বলুন।’
    ‘ভেতর ঘরে বসতে পারি কী?’
    মুখটা পুনরায় ফ্যাকাসে হয়ে গেলো রুবি দে’র।
    ‘মানে….মানে….লোক আছে আর কি। জরুরি মিটিং চলছে।’ আমতা আমতা করে বলল রুবি দে।
    ‘চলুন, আমিও দেখি কার সাথে আপনার এই জরুরি মিটিং।’
    কথা শেষ করে ঘরের ভেতর ঢুকলো মৃত্যুঞ্জয়। ভেতর ঘরের সোফাতে বসে এক ভদ্রলোক । বয়স চল্লিশ ঊর্ধে। গায়ের রং পরিস্কার না বললেই চলে। এক মাথা চুল, ব্যাক ব্রাশ করা, জামাকাপড় দেখে বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারের বলেই অনুমান করা যেতে পারে।
    ‘ওঃ! তাহলে আপনিও এখানেই আছেন?’ সেই ভদ্রলোককে মৃত্যুঞ্জয় বলল।
    রুবি দে পাথরের মূর্তির ন্যায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চাইলে। মৃত্যুঞ্জয় তার দিকে ইশারা করে বলল- ‘বসুন আপনি। দাঁড়িয়ে কেন?’
    রুবি দে তাও বসলো না।
    ‘আপনার পরিচয়? বিনা অনুমতিতে এখানে ঢোকার কারণ? আপনি কি জানেন না যে এটা লেডিস বিউটি পার্লার , পুরুষের বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ।’ সেই ভদ্রলোকটি এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো মৃত্যুঞ্জয়কে বলে গেলো।
    ‘আপনার কোন প্রশ্নের জবাব আগে দেবো? আমার পরিচয়? আমি আই.পি.এস. মৃত্যুঞ্জয়। বিনা অনুমতিতে ঢুকবার কারণ? তদন্ত চলাকালীন আমাদের অনুমতির প্রয়োজন হয় না।’
    মৃত্যুঞ্জয় এবার দেয়ালের শোকেশের কাছে গেলো। যে পত্রিকা গুলো সাজানো ছিলো সে গুলো একে একে বার করে সেন্টার টেবিলের ওপর ফেলল।
    ‘ম্যাডাম, এ পত্রিকাগুলো এখানে সাজিয়ে রাখবার কথা না। এগুলো তো গোপন জিনিস। তাই নয় কি? এগুলো তো নিজের বেডরুমে বালিশের তলায় লুকিয়ে রাখতে হয়।’
    লজ্জা এবং ক্রোধে রুবি দে’র মুখোমণ্ডল রাঙ্গা হয়ে উঠলো।
    ‘আচ্ছা ম্যাডাম, আপনি নিম্ফোমেনিয়ার বিষয় কী জানেন? ‘ রুবি দেকে প্রশ্ন করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    রুবি দে’র মুখে কথা নেই।
    ‘কী হলো ম্যাডাম? এই ম্যাগাজিনগুলো তো বেসিকালি নিম্ফোমেনিয়ার ওপরেই। তাই নয় কী?’
    ভদ্রলোকটি এবার উঠে দাঁড়ালেন।
    ‘আপনি এক ভদ্রমহিলার সাথে অসভ্য ব্যবহার করছেন।’ কর্কশ গলায় বললেন মৃত্যুঞ্জয়কে।
    ‘করতে বাধ্য হয়েছি মিস্টার। কেন কি এই নিম্ফোমেনিয়াই হলো অমৃত সামন্তের মৃত্যুর মুখ্য কারণ। কেন ম্যাডাম, আমি কি ভুল বলছি কিছু? যদি কিছু ভুল বলি তাহলে শুধরে দেবেন। আপনি বেশ বহু দিন ধরে নিম্ফোমেনিয়া নামের এক সাইকোলজিকাল রোগে আক্রান্ত। সেই রোগের কারোণেই আপনার নজর পড়েছিলো অমৃত সামন্তের ওপর।’
    ‘আপনি খামোখা এক ভদ্রমহিলাকে অপমান করছেন।’ ভদ্রলোকটি চিৎকার করে উঠলো। ক্রোধে দিশাহারা হয়ে রক্তবর্ণ নেত্রে এগিয়ে এসেছিলেন মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে। মৃত্যুঞ্জয় তার ডান গালে সজোরে একটা থাপ্পড় লাগাতে তিনি ছিটকে পড়লেন সোফাতে গিয়ে।
    ‘আপনি কি রুবি দে’র প্রেমে পড়েছেন নাকি মিস্টার ভাস্কর গাঙ্গুলী? দুঃখের বিষয় তো এটা যে রুবি দে আপনার সাথে শুধু নিজের স্বার্থের জন্য সম্পর্ক রেখেছে। নিজের শারীরিক স্বার্থের জন্য।’
    রুবি দে’ র দিকে ফিরে মৃত্যুঞ্জয় বলল- ‘ম্যাডাম রুবি, আপনি রিতিকা ব্যানার্জীর নাম তো নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন?’
    এতক্ষণ ঘাড় হেঁট করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো রুবি দে। মৃত্যুঞ্জয়ের মুখে রিতিকা ব্যানার্জীর নাম শুনে চমকে উঠলো সে।
    রাত প্রায় সাড়ে দশটা। আকাশ পুনরায় মেঘাচ্ছন্ন। আজ অরূপের ঘরে শুধু অরূপ আর মৃত্যুঞ্জয় নেই , আছে আরেক জন। অরূপ আজ খুশি। থানার বড় বাবু হিসেবে তার প্রথম কেস সফল। এই সফল কেসের জন্য সে মৃত্যুঞ্জয়ের চিরকৃতজ্ঞ। অরূপের কথায়, আজকের রাতটা সেলিব্রেট করার। তাই বাড়ির প্রত্যেকের শুতে যাওয়ার পর তিন জনে মিলে রাত সেলিব্রেট করা শুরু করলো। হ্যাঁ, এখনও তো তৃতীয় ব্যক্তির কথা বলাই হয়েনি। সে হলো, রাহুল ব্যানার্জী।
    সবার গেলাসে পেগ ঢালার পর অরূপ মৃত্যুঞ্জয়কে বলল- ‘তুমি না থাকলে এতো সহজে এই কেসের মিটমাট হতো না, মৃত্যুঞ্জয় দা।’
    পাশে বসে থাকা রাহুল ব্যানার্জী অরূপের উদ্দেশে বলল- ‘মৃত্যুঞ্জয়দা যে কষিয়ে থাপ্পড় মারলো আমায়, ব্যথা এখনও আছে। এক আই.পি.এস. এর থাপ্পড়, চিরকাল মনে থাকবে।’
    অট্টহাস্য করলো সবাই।
    প্রথম পেগে এক চুমুক দিয়ে রাহুল আবার বলল- ‘দুর্গাপুর থেকে আমি এখানে গোপনে গোয়েন্দাগিরি করতে আসি। বেশ কিছু দূর এগিয়ে অবশেষে নিজের খেই হারিয়ে ফেললাম। আচ্ছা মৃত্যুঞ্জয়দা, তুমি এতো সহজে কী করে সব কিছুর কূলকিনারা বার করলে?’
    মৃত্যুঞ্জয়ের প্রথম পেগ শেষ হয়ে গেছে। একটা সিগারেট ধরিয়ে সে বলল- ‘শুরুর দিকে কূলকিনারা আমিও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তবে অমৃত যে কোলকাতায় এসে সোজা পথে এগোচ্ছিল না সেটা তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। সে এখানে টিউশনি করতো, দুটো। দুটো টিউশনি থেকে মাসে কতো রোজগার হতে পারে? দেড় হাজার, দু হাজার, তিন হাজার? বাড়ির আর্থিক অবস্থা ঠিক না। বাড়ি থেকে ধরে নিলাম মাসে চার হাজার টাকাই আসে। সব মিলিয়ে মাস গেলে হাতে সে ছ’সাত হাজার টাকা পায়। কোলকাতায় থাকার খরচও আছে। দমদমে প্রায় প্রতিটি হোস্টেলে থাকা খাওয়ার খরচ মাস গেলে প্রায় চার হাজারের ওপরে। কতই বা বাঁচতো তার হাতে? কিন্তু তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছিলো বাষট্টি হাজার টাকা। রুটিন এনকোয়ারি শুরু করলাম। রুবি দে’র বাড়ি পার্লারে প্রথম দিন গিয়েই আমি নিম্ফোমেনিয়ার বিষয় কিছু ম্যাগাজিন দেখতে পেয়েছিলাম। এটা একটা সাইকোলজিকাল রোগ। একে হাইপার সেক্সসুয়ালিটিও বলা হয়। শরীরে অতিরিক্ত সেক্সের কারণে রুগীরা সর্বক্ষণ নিজেদের সেক্স পার্টনার খুঁজে বেড়ায়। ভাস্কর গাঙ্গুুুুলীর সাথে রুবি দে’র সম্পর্ক বহু দিনের। মিতালী বহু দিন ধরে মহিলা উন্নয়ন সমিতির এক জন সদস্যা। মিতালীর বাড়িতেও মাঝে – মাঝে মিটিং হতো । সেখানেই ভাস্কর গাঙ্গুলী ও রুবি দে’র পরিচয়। ভাস্কর যখন দেখলো মিতালীকে নিজের বশে আনা তার পক্ষে সম্ভব হলো না, তখন সে এগোলো রুবি দে’র দিকে। রুবি দে’র তো বলতে গেলে মনের ইচ্ছাপূরণ হলো । একে তো তিনি নিম্ফোমেনিয়ার পেশেন্ট, তায় আবার স্বামী বিদেশে। কিন্তু অসুবিধে হলো ভাস্কর সারা দিন নিজের কাজে ব্যস্ত। রুবি দেকে সময় দিতে পারতো না সে। ঠিক সে সময় রুবি দে’র নজর পড়লো অমৃত সমান্তর ওপর। অমৃতের মাকে তার বাড়ি পৌঁছাতে গিয়ে অমৃতের সাথে আলাপ তার। অমৃত জানায় যে তার কোলকাতায় গিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছে। উৎসাহ দেয় রুবি দে। তার পর আর কী? কোলকাতায় এসে শুরু পায়রাডাঙ্গাতে থাকা অমৃতের জীবনের নতুন অধ্যায়।’
    ইতিমধ্যেই দু পেগ শেষ হয়ে গেছে প্রত্যেকের। তৃতীয় পেগে এক চুমুক দিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বলল- ‘সত্যি বলতে অমৃতের জীবনটা এখানে বেশ ভালোই কাটছিলো। সে উপভোগ করছিলো দু’দুটো নারীর সংসর্গ। সময় সময় আর্থিক সাহায্য হয়ে যাচ্ছিলো তার। মিতালীর ওপরেও আমার সন্দেহ ছিলো। সন্দেহটা প্রবল হয় যখন জানতে পারি সে দুশ্চরিত্রা। কিন্তু তখনও আমি ভুল পথেই হাঁটছি। এবার রাহুলের কথায় আসি। অমৃতের হত্যার পর থেকেই সে উধাও। খুঁজে পাওয়া যায় না তাকে। সেটার কারণ জানার প্রবল ইচ্ছে হয়। রাহুলের রুম থেকে পাওয়া খবরের কাগজ আমায় হেল্প করেছিলো। সেখান থেকেই জানতে পাই রিতিকার বিষয়, জানতে পাই ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তীর বিষয়। রাহুলের বিষয় বিশদ ইনফরমেশন নেওয়ার উদ্দেশে আমি সিদ্ধার্থ চক্রবর্তীর কাছে যাই। জানতে পারি রাহুলের কোনো রোগ নেই। নিছকই ইনসমনিয়ার বাহানা করে রাহুল যায় সেখানে। তার উদ্দেশ্য নিজের নিরুদ্দেশ বোনের তদন্ত করা। ডক্টর সিদ্ধার্থর হাতে আমি অডি গাড়ির চাবির রিং দেখি। তার পেশা খুব একটা চলে না, সেটা তার রিক্ত চেম্বার দেখেই মনে হয়। তারপর অডি গাড়ি। মিতালীর ফ্ল্যাটের জুতোর ছাপ ও ডক্টরের চেম্বারের জুতোর ছাপ মিলে যায়। রিয়ার কিডন্যাপিং আমার সন্দেহকে আরও প্রবল করে। রিয়ার কিডন্যাপিংএর পেছনে উদ্দেশ্য কী হতে পারে? জানবার জন্য ডক্টর সিদ্ধার্থকে নাগালে পাওয়া দরকার ছিলো। গুড জব অরূপ। প্রকাশ্যে এলো অরগ্যান ট্রাফিকিংএর স্ক্যান্ডাল। হসপিটালের অপারেশন থিয়েটার থেকে উদ্ধার করা হলো অচেতন রিয়াকে। রিতিকা মহিলা উন্নয়ন সমিতির সাথে যুক্ত ছিলো। সেই সমিতির দারুণ রুবি দে’র সাথে যে সিদ্ধার্থর পরিচয় হয়েছিল সেটা সে হয়তো জানতো রিতিকা। কোনো এক ভয় তার মনে বাসা বেঁধেছিলো। তাকে ডক্টর সিদ্ধার্থর কাছে চিকিৎসার জন্য রুবি দে পাঠায়। অরগ্যান ট্রাফিকিং এর শিকার হয়ে রিতিকা।’
    ‘অমৃত হত্যার পেছনে উদ্দেশ্য?’ জিজ্ঞেস করলো রাহুল।
    ‘উদ্দেশ্যটা থানাতে গিয়ে রুবি দে নিজেই পরিস্কার করেছে। অমৃতের সাথে দুর্বল মুহূর্তের সময় কিছু গোপন তথ্য সে ফাঁস করে। অমৃতের সাথে মিতালীর এক একটা সম্পর্ক গড়ে উঠছে সেটা রুবি দে অনুমান করতে পারে এবং সহ্য করতে পারে না। অমৃতকে গোপন তথ্য জানিয়ে তার মনে ভয় জন্মায়। সে ভাস্করের সাহায্য নেয় অমৃতকে পথ থেকে সরাতে । যে নম্বর দিয়ে অমৃতকে শেষ কল করা হয়েছিল সেটা অমৃত কিনে রুবি দেকে দিয়েছিল । কেন সেটা রুবি দে’ই ভালো বলতে পারবে। আগে অমৃত, তারপর মিতালীর পরিচারিকা। আমার বিশ্বাস মিতালীর পরিচারিকা রুবি দে’র গুপ্তচর ছিলো। যাই হোক, মামলা শেষ। অরূপ, মিতালীর বাড়ি থেকে কার ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেলো?’
    অরূপ বলল- ‘ডক্টরের আর রুবি দে’র।’
    একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিয়ে সিগারেটের শেষ অংশটা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিলো মৃত্যুঞ্জয়।
    সমাপ্ত….

  • ধারাবাহিক

    অমৃতের বিষ পান (পর্ব -৩)

    অমৃতের বিষ পান (পর্ব -৩)
    -বিশ্বদীপ মুখার্জী

    রাহুল ব্যানার্জী রুমমেট ছিলো অমৃতের। অমৃতের হত্যার পর সেও নিজের পুরনো রুম ছেড়ে দেয়। কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। দমদমের হোস্টেলের বাকি ছেলেদের মধ্যে কেউ জানে না যে রাহুল গেলো কোথায়? রাহুলের বাড়ি দুর্গাপুরে। একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করে কোলকাতায়। রাহুলের অফিস গিয়ে তার বাড়ির ঠিকানা পেলো অরূপ, সাথে পেলো তার কোলকাতার বাসার ঠিকানা। আশ্চর্য ব্যাপার এটা যে, অমৃতের হত্যার দিন থেকে রাহুল অফিসে যায়নি। কোলকাতার নিজের নতুন আশ্রয়ের ঠিকানা রাহুল অফিসে দেয়নি। সে ঠিকানা অরূপ পেলো রাহুলের এক বান্ধবীর কাছ থেকে, যে রাহুলের সাথে একই অফিসে কাজ করে। রাহুলের নতুন বাসার ঠিকানা পেয়ে অরূপ নিজের বাকি পুলিশ দলের সাথে সেখানে গেলো। পুলিশ দেখে রাহুলের বাড়িওয়ালা অবাক। রাহুলের ঘরে তালা দেখে অরূপ বাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলো- ‘চাবি কি আপনার কাছে আছে?’
    ‘আ…. আজ্ঞে না বাবু।’ আমতা আমতা করে বাড়িওয়ালা বলল।
    অতঃপর তালা ভেঙ্গে দিতে বাধ্য হলো অরূপ। শুরু হলো সে ঘরের খানাতল্লশী।
    আকাশে হঠাৎ করে নিজের বাসা বেঁধে নেওয়া মেঘের দারুণ চাঁদ ও তারা কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুরু হয়েছে অল্প,অল্প বৃষ্টিও। নিজের ঘরের সাথে লাগোয়া ব্যালকনির এক আরাম কেদারায় বসে সিগারেটে সুখ টান দিচ্ছে মৃত্যুঞ্জয়। আচমকা ঘরের দরজা খোলার শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকালো সে। ঘরে ঢুকেছে অরূপ, হাতে কিছু খবরের কাগজ নিয়ে। মৃত্যুঞ্জয়ের পাশের চেয়ারে বসে সামনের সেন্টার টেবিলে খবরের কাগজগুলো রেখে অরূপ বলল- ‘এগুলো সেই খবরের কাগজ, যেগুলো রাহুলের রুম থেকে পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে মোট বারোটা। শেষ খবরের কাগজ প্রায় এক বছর আগেকার।’
    সিগারেটের শেষ অংশটা অ্যাশট্রেতে ফেলে মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করলো- ‘আরও কিছু পাওয়া গেলো?’
    ‘হ্যাঁ। কিছু ক্রাইম থ্রিলার নভেল, কিছু ডক্টরের প্রেসক্রিপশন আর কিছু ঘুমের ট্যাবলেট।’
    খবরের কাগজগুলো পুঙ্খানুপঙ্খ ভাবে দেখতে শুরু করলো মৃত্যুঞ্জয়। আধা ঘন্টার ওপর সময় লাগলো খবরের কাগজ গুলো পড়তে। তার পর অরূপকে সে বলল- ‘ডক্টরের প্রেসক্রিপশন গুলো আছে?’
    ‘হ্যাঁ, নিয়ে আসছি।’
    খানিক পর কিছু প্রেসক্রিপশন নিয়ে এলো অরূপ, সাথে নিয়ে এলো রাহুলের ঘর থেকে পাওয়া কিছু ট্যাবলেটের পাতা। সবগুলো ভালো করে দেখে মৃত্যুঞ্জয় বলল- ‘বড় থেকে ছোটো । এই খবরের কাগজগুলোর মধ্যে একটা খবরে নজর দিয়েছো?’
    ‘না। এখন অবধি পড়ে উঠতে পারিনি। সময় আর পেলাম কই?’
    ‘প্রায় দেড় বছর আগে যাদবপুর থেকে রিতিকা ব্যানার্জী নামের এক মেয়ে নিখোঁজ হয়। যাদবপুরের এক হোস্টেলে থাকতো সে। বাড়ি ছিলো দুর্গাপুরে। এক প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করতো সে। পুলিশ কিছু দিন খোঁজার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু নিজের কাজে তারা সফল হয়েনি। ফাইল বন্ধ হয়ে যায়। খবরের কাগজ কিছু দিন উৎসাহ দেখলো। ধীরে ধীরে খবরের কাগজে এই খবরটা কম স্থান পেতে শুরু করলো।’
    ‘ঘটনাটা শুনেছি। তখন আমি ঠাকুরপুর থানায় ছিলাম।’ অরূপ বলল।
    ‘হুম। কিন্তু ব্যাপারটা হলো সেই মেয়েটির মানে রিতিকা ব্যানার্জীর মানসিক অবস্থা নাকি ভালো ছিলো না। ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী নামের এক সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে সে চিকিৎসা করাতো। ডক্টর চক্রবর্তীর কাছে জেরা করে জানা গিয়েছিলো যে রিতিকা নাকি ডিপ্রেশনে ভুগছিলো। তার নাকি ভয় ছিলো, কেউ তার মার্ডার কিম্বা রেপ করতে পারে। রিতিকা পুলিশকে ভয় পেতো। ভেবেছিলো তার ভয়টা হয়তো নিছকই মনের ব্যামো। সাইক্রিয়াটিক কাউন্সিলিং নিলে হয়তো ঠিক হয়ে যেতে পারে। এবার একটা জিনিস এখানে লক্ষ করার। রিতিকা থাকতো দুর্গাপুরে, রাহুলের বাড়িও সেখানেই। দুজনেরই উপনাম ব্যানার্জী। রাহুলও সাইক্রিয়াটিক ট্রিটমেন্টে আছে, এবং সব থেকে বড় ব্যাপার হলো দুজনেরই ডক্টর একই। আমার বিশ্বাস রাহুল শুধু চাকরী করতে কোলকাতা আসেনি, অরূপ। চাকরীর আড়ালে সে রিতিকা অন্তর্ধান কেসের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।’
    ‘তাহলে অমৃতের খুনের পর রাহুল সেই রুম ছেড়ে পালিয়ে গেলো কেন?’ প্রশ্ন করলো অরূপ।
    ‘একটা কারণ এটা হতে পারে যে নিজের তদন্তে কোনো প্রকারে বাধার আশংকা অনুভব করেছিলো সে। কিম্বা…’
    ‘কিম্বা কি? মৃত্যু দা?’
    ‘অরূপ, অনেক সময় এমন হয়ে যে একটা কেসের তদন্ত করতে গিয়ে আমাদের সামনে অন্য কোনো রহস্য চলে আসে। রহস্যের ইন্টারলিংক। হতে পারে রাহুল রিতিকা ব্যানার্জীর কেস হ্যান্ডেল করতে গিয়ে অমৃতের কিছু গোপন তথ্য জানতে পেরেছিলো। অমৃতের খুনের পর তার নিজের প্রাণের ভয় ঢুকেছে। এবার এটাও সম্ভব যে অমৃতের খুনের পেছনে রাহুলের যোগদান আছে। এভরিথিং ইস পসিবল মাই ডিয়ার। রাহুলকে খুঁজে বার করো, অরূপ। রাহুলকে খুঁজে বার করা খুব দরকার।’
    ‘লোক লাগিয়ে দিয়েছি। দুর্গাপুরে গিয়েও তাকে খোঁজা হবে। লোক লাগাবার কথায় মনে পড়লো, মিতালীর পেছনেও লোক লাগানো হয়েছে। তার সারা দিনের খবর আমরা পাবো এবার। একটা কথা জিজ্ঞেস করা ছিলো, মৃত্যুঞ্জয়দা।’
    ‘কী?’
    ‘মিতালী গাঙ্গুলীকে আমরা অ্যারেস্ট করতে পারি না? জানি, তার এগেনস্টে কোনো প্রমাণ নেই আমাদের কাছে, কিন্তু তবুও আন্ডার বেসিস অফ সস্পিশন।’
    মৃত্যুঞ্জয় বলল- ‘পারি। কিন্তু করে লাভ নেই। পাকাপোক্ত প্রমাণ থাকলে অ্যারেস্ট করে লাভ আছে। তার পর অমৃতকে আর পরিচারিকাকে খুন করার পেছনে মিতালীর মোটিভও তো পরিস্কার নয়।’
    ‘এটা তো পরিস্কার যে মিতালীর সাথে অমৃতের একটা অবৈধ সম্পর্ক ছিলো। হতে পারে, তাদের ঘনিষ্ঠ কিছু মুহূর্তের ভিডিও বানিয়ে মিতালীকে ব্ল্যাকমেল করছিলো অমৃত। ব্ল্যাকমেলের টাকা দিতে দিতে থকে গিয়েছিলো মিতালী। অমৃতের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা তো কিছু কম নেই।’
    ‘হতেও পারে। মিতালী কোনো লোক লাগিয়ে খুন করিয়েছে অমৃতের। আচ্ছা অরূপ, খুনের দিন ভোরে অমৃতের কাছে যে নম্বর থেকে ফোন এসেছিলো, সে নম্বরে তার আগেও কি কথা হয়েছে?’
    ‘না। সেই নম্বর থেকে একটাই কল করা হয়েছে, সে দিন ভরে। নম্বরটা দু’দিন আগেই নেওয়া হয়েছিল।’
    ‘হুম, বুঝলাম। মিতালী গাঙ্গুলী, রুবি দে আর রাহুল ব্যানার্জী, কেউ সন্দেহের বাইরে নেই, অরূপ। আমার সন্দেহের লিস্টে এরা তিনজনেই আছে। তুমি রাহুলের খোঁজ নাও। এদিকে আমি দেখছি কী করা যেতে পারে।’
    কথা শেষ করে মৃত্যুঞ্জয় ঘরের ভেতর চলে গেলো।
    প্রায় সারা রাত তুমুল বৃষ্টি হলো। সকালেও বেশ অনেকক্ষণ বৃষ্টি হওয়ার কারণে বাড়ি থেকে বেরোতে পারেনি মৃত্যুঞ্জয়। যখন সে বেরলো তখনও কিন্তু বৃষ্টি থামেনি। দেরি করা মৃত্যুঞ্জয়ের পছন্দ না। তাই বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে গেলো সে। হ্যাঁ, অমলবাবুর কাছ থেকে তাঁর হোন্ডা সিটি গাড়িটা নিয়ে নিয়েছিল মৃত্যুঞ্জয়। ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তীর ঠিকানা তার কাছে আছে। পৌঁছতে প্রায় চল্লিশ মিনিট সময় লাগলো।
    ঢাকুরিয়াতে ডক্টর চক্রবর্তীর চেম্বার। একটা বড় চারতলা বাড়ির দু’তলায়। বাড়িটা অ্যাপার্টমেন্ট নয়। নিচের তলায় বাড়িওয়ালা থাকেন। দু’তলা থেকে ফ্ল্যাট টাইপের বানানো। ভাড়া দেন তিনি। দু’তলায় একটা 2BHK নিয়ে ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তীর চেম্বার। ঢুকতেই ছোট্টো হল-এ এক অল্প বয়সী মেয়ে বসে। দেখেই বোঝা যায় সে রিসেপ্সনিস্ট। মৃত্যুঞ্জয় এগিয়ে গেলো তার দিকে। মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে যুবতীটি বলল- ‘বলুন?’
    ‘ডক্টর বাবু আছেন?’ জিজ্ঞেস করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘দেখানোর আছে কী?’ জবাবের বদলে পাল্টা প্রশ্ন। বিরক্ত লাগে মৃত্যুঞ্জয়ের।
    ‘হ্যাঁ, দেখাবো তাঁকে।’
    ‘500 টাকা ফি, জমা করে দিন।’ রিসেপশনিস্ট যন্ত্রের মতো বলে যাচ্ছে।
    ‘সে না হয় করলাম। ডক্টর বাবু আছেন তো?’
    ‘না। এখনও আসেননি।’
    অবাক হলো মৃত্যুঞ্জয়। সাড়ে এগারোটা বাজে। ডক্টরের পাত্তা নেই।
    ‘কোথায় আছেন তিনি?’ মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করলো।
    ‘হসপিটালে।’
    ‘হসপিটাল! কোন হসপিটাল?’
    রিসেপশনিস্ট হসপিটালের নাম বলে বলল- ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই ডক্টর বাবু চলে আসবেন। আপনি যদি দেখাতে চান, তাহলে টাকা জমা করে দিন।’
    অগত্যা, উপায় নেই। টাকা জমা করে অপেক্ষা করতে হলো মৃত্যুঞ্জয়কে। প্রায় আধা ঘন্টার অপেক্ষার পর ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তীর আগমন হলো। বেশ সুপুরুষ চেহারা, মাথার চুল বেশ বড় কিন্তু এলোমেলো। বয়স আন্দাজ চল্লিশের আশেপাশে। ভেলভেট কালারের জামার ওপরে কালো সুট সাথে লাল টাই। কালো বুট এবং কালো প্যান্টের নিচে অল্প অল্প কাদার দাগ। মার্বেলের ফ্লোরে কাদা লাগা বুটের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। গাড়ির চাবির রিংকে নিজের ডান হাতের আঙ্গুলে নাচাতে নাচাতে ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী প্রবেশ করলো। মৃত্যুঞ্জয় লক্ষ্য করলো গাড়ির চাবির রিংটা অডি কোম্পানীর। মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে অল্প দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজের কেবিনে সে ঢুকে গেলো। খানিক পর ভেতর থেকে তলব আসাতে রিসেপ্সনিস্ট ভেতরে গেলো। প্রায় মিনিট খানেক পর বেরিয়ে মৃত্যুঞ্জয়কে ভেতরে যাওয়ার ইশারা করলো সে। ভেতরে ঢুকেই মৃত্যুঞ্জয় কোনো প্রকারের ভঙ্গিমা না করে ডক্টর চক্রবর্তীকে বলল- ‘এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর দেরি করে লাভ নেই। সোজা আসল কথায় আসা যাক।’
    ডক্টর চক্রবর্তী কিছুই বুঝতে পারলো না। খানিক অবাক দৃষ্টে মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে চেয়ে বলল- ‘মানে, আমি তো কিছুই বুঝলাম না।’
    সামনের চেয়ারটা টেনে বসলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘আপনি রাহুল ব্যানার্জীর বিষয় কী জানেন?’ মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করলো।
    ‘ম….মানে আপনি ট্রিটমেন্ট করাতে আসেননি?’ আবার প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন।
    ‘না। আমি এখানে কিছু ইনফরমেশন নিতে এসেছি। আমি এ.সি.পি. মৃত্যুঞ্জয় মজুমদার, সি.আই.ডি. থেকে।’
    সি.আই ডি.’র নাম শুনে ডক্টর চক্রবর্তীর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু চকিতে নিজেকে সামলে নিলো সে।
    ‘হ্যাঁ….হ্যাঁ বলুন, কী জানতে চান?’
    ‘আপনার এক পেশেন্টের বিষয় জানতে চাই। রাহুল ব্যানার্জী।’
    ‘রাহুল….রাহুল….ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে।’
    ‘গুড। রাহুল কিসের চিকিৎসা করাচ্ছিলো আপনার কাছে?’
    ‘ইনসমনিয়া। দিনের পর দিন তার ঘুম হতো না তার। ভোর রাতের দিকে অল্প হলেও যদি চোখ লাগতো, ভয়াবহ কিছু স্বপ্নে তার ঘুম ভেঙ্গে যেতো।’
    ‘সে কি রোজ আসতো আপনার কাছে?’
    ‘প্রায়। কিছু বিচিত্র স্বপ্ন নিয়ে। কেউ নাকি তার গলা টিপতে আসছে, সে মরুভূমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, হঠাৎ তার পায়ের নিচের মাটি ফেটে জল বেরিয়ে এলো, সেই জলে ডুবে গেলো সে। এবার আপনি বলুন মশাই, মরুভূমিতে এতো জল কোথায় থেকে আসবে যে মানুষ ডুবে যায়?’
    ‘আপনি তখন কী করতেন?’
    ‘ঘুমের ওষুধ বদলে বদলে দিতাম।’
    ‘শেষ বার কবে আসে আপনার কাছে?’
    খানিক ভেবে ডক্টর সিদ্ধার্থ বলল- ‘আজ শুক্রবার, গত শনিবার সে এসেছিলো।’
    ‘এবার আপনি বলুন রিতিকা ব্যানার্জীর কেস আর রাহুল ব্যানার্জীর কেসের মধ্যে কোনো মিল দেখতে পারছেন কী?’
    ‘উফ …. আবার সেই রিতিকা ব্যানার্জী।’ একরাশ বিরক্তি নিয়ে সিদ্ধার্থ বলল- ‘দেখুন মিস্টার এ.সি.পি. রিতিকা ব্যানার্জীর কেস নিয়ে আমি অনেক ঝামেলার সম্মুখীন হয়েছি। আর নয়। অনেক বার স্টেটমেন্ট দিয়েছি পুলিশকে। বারবার একই স্টেটমেন্ট দিতে দিতে মুখে ব্যাথা হয়ে গেছে আমার। স্যরি এ.সি.পি.। এই বিষয় আমি আর কোনো সাহায্য আপনাকে করতে পারবো না।’
    ‘বেশ, তাই ভালো। অনেক ধন্যবাদ, ডক্টর। প্রয়োজনে আবার বিরক্ত করতে আসবো।’
    ঢাকুরিয়ার পর মৃত্যুঞ্জয়ের আগামী গন্তব্য সল্টলেক, সেক্টর 5। মৃত্যুঞ্জয় ঘড়িতে সময় দেখলো। এখনও অফিসে লাঞ্চ টাইম হতে অল্প দেরি আছে। ঠিক সময় পৌঁছে যাওয়া যাবে। কোলকাতার বেশ কিছু রাস্তাঘাট জলমগ্ন। গাড়ির গতি বেশি বাড়াতে পারলো না মৃত্যুঞ্জয়। মিতালীর অফিসের নিচে যখন নিজের গাড়িটা পার্ক করালো মৃত্যুঞ্জয়, তখন তার ঘড়িতে দুপুর দুটো দশ। গাড়িতে বসেই মিতালীকে ফোন করলো সে।
    ‘আপনি নিচে নেমে আসুন। আমি অপেক্ষা করছি আপনার।’
    বেশ বিরক্তই হলো মিতালী। নিচে নেমেই মৃত্যুঞ্জয়কে বলল- ‘আপনি কি আমাকে এবার নিশ্চিন্তে চাকরীও করতে দেবেন না?’
    ‘ওহঃ .. অতো রাগ করছেন কেন? এটা তো লাঞ্চ টাইম। তার পর জম্পেস খিদেও পেয়েছে। চলুন, কোথাও বসে খেতে খেতে কথা বলা যাক।’
    ‘আমার আপনার সাথে লাঞ্চ করার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই মিস্টার এ.সি.পি.’ রাগে চোয়াল শক্ত হলো মিতালীর।
    ‘রাগ করবেন না ম্যাডাম। কেন কি এটা আপনার রাগ দেখাবার সময় নয়। আসুন আমার সাথে’ কথা শেষ করে মৃত্যুঞ্জয় পাশের একটা রেস্তোরাঁর দিকে এগোলো। পিছু নিলো মিতালী।
    ‘কী হচ্ছে এটা এ.সি.পি.? আপনি তো বলেছিলেন পরের দিন সকালে আসবেন, আমার কাজের বৌয়ের সাথে কথা বলতে।’ মৃত্যুঞ্জয়ের পাশে হাঁটতে হাঁটতে মিতালী বলল।
    ‘সে কাজ আমার হয়ে গেছে। আপনার বিষয় অনেক কিছুই জানতে পেরেছি ম্যাডাম।’
    ‘কী জানতে পেরেছেন?’
    ‘বলবো, সব বলবো। চিন্তা করবেন না আপনি।’
    ‘তার মানে আপনি কোথাও বাইরে আমার কাজের বৌয়ের সাথে দেখা করেছেন। আপনি তাকে গন পয়েন্টে রেখে আমার এগেনস্টে কিছু ভুল এবং মিথ্যে স্টেটমেন্ট নিয়েছেন। তাই না মিস্টার এ.সি.পি.?’
    ‘আপনার মাথা অনেক দূর পর্যন্ত চলে দেখছি। এই মাথাটা কোনো ভালো কাজে লাগলে মন্দ হতো কী?’
    রেস্তোরাঁর সামনে দুজনে এসে দাঁড়ালো। ভেতরে ঢুকবার আগে মিতালী বলল- ‘কিছু তো একটা গন্ডগোল আপনি করেছেন। না তো সোনালী আজ দেরি করে আসতো না। সোনালী মানে আমার কাজের বৌ।’
    ‘সেটা জানি। কিন্তু দেরি করে আসতো না মানে?’ এবার মৃত্যুঞ্জয়ের আশ্চর্য হবার পালা।
    ‘মানে, আজ সকালে সে আমায় ফোন করে বলল যে তার শরীর ভালো না। দেরি করে আসবে। আমি যেন ফ্ল্যাটের চাবিটা ফ্ল্যাটের দরজার সাথে লাগোয়া লেটার বক্সে রেখে দি। আমি তাই করলাম। লেটার বক্সের এক চাবি তার কাছে থাকে। যখন কোনো দিন সে দেরি করে আসতে, আমি সেটাই করে থাকি। কিন্তু সে কোনো দিনই খুব দেরি করে না। আজ হঠাৎ দেরি করলো কেন …..’
    ‘আপনি কি সিওর যে ফোনটা সোনালী করেছিল আপনাকে?’
    ‘হ্যাঁ। গলার আওয়াজটা চেঞ্জ মনে হলো, কিন্তু তার শরীর খারাপ তাই।’
    ‘হতেই পারে না এটা?’ মৃত্যুঞ্জয়ের গলার আওয়াজটা উচ্চ হলো বিস্ময়ের কারণে।
    ‘কী হতে পারে না?’
    ‘সোনালী আপনাকে ফোন করতেই পারে না।’
    ‘কিন্তু কেন?’
    ‘কেন কি গত কাল সন্ধ্যেতেই সোনালীকে হত্যা করা হয়েছে।’
    ‘কী? সোনালীর হত্যা?’ ইলেকট্রিকের বড় শক লাগলো যেন মিতালীর।
    ‘হ্যাঁ, কাল সন্ধ্যেতে আপনার ফ্ল্যাট থেকে বেরোবার পর বাঘাযতীন স্টেশনে কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের সামনে ফেলে দেয়। আততায়ী এখনও ধরা পারেনি।’
    ‘তাহলে আজ আমাকে ফোন করলো কে? তার পর আমার মেয়ে তো আজ বাড়িতেই আছে।’ ভয়ের সাথে কান্না মেশানো কন্ঠস্বর মিতালীর।
    ‘দেরি করা যাবে না। চলুন আপনার ফ্ল্যাটে।’
    গাড়ি করে মৃত্যুঞ্জয় ও মিতালী বাঘাযতীনের দিকে এগিয়ে গেলো।
    ফ্ল্যাটের দরজা অল্প খোলা। ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো মৃত্যুঞ্জয় ও মিতালী। মিতালী তারস্বরে ডাকতে থাকে নিজের মেয়ে কে- ‘রিয়া …. রিয়া …. ও রিয়া …. রিয়া!’
    এ ঘর ও ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়ায় নিজের মেয়েকে। কোত্থাও নেই রিয়া।
    ‘মৃত্যুঞ্জয়, আমার মেয়ে কোথায় গেলো?’ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মিতালীর গলা।
    মৃত্যুঞ্জয়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঘুরতে থাকে চারিদিকে। ঠিক তখনই তার নজর যায় একটা জিনিসে।
    মাটির দিকে বেশ কিছুক্ষণ এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল মৃত্যুঞ্জয়। তার ঠোঁটে মৃদু হাসি। তাকে হাসতে দেখে আরও খেপে গেলো মিতালী।
    ‘হোয়াট দ্য হেল ইউ আর ডুইং এ.সি.পি.? আমার মেয়ে কিডন্যাপ হয়েছে আর আপনি এখানে দাঁড়িয়ে হাসছেন?’
    মিতালীর কথার জবাব না দিয়ে একটা ফোন করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘হ্যালো, অরূপ? যা বলছি খুব ভালো করে শোনো। আমার ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তীর জুতো চাই। হ্যাঁ, জুতো, বুট …. সে সব পরে বলবো। সে নিজের চেম্বারে আছে। কালো বুট সে পরে আছে …. সে তোমার যেমন সুবিধে হোক, তেমন করো। তার বুট নিয়ে তুমি মিতালী গাঙ্গুলীর ফ্ল্যাটে এসো। তোমার অপেক্ষা করছি আমি। আর হ্যাঁ, এক ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টকে নিয়ে এসো।’
    কথা শেষ করে ফোন কেটে দিলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘ডক্টর সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী কে?’ মিতালী প্রশ্ন করলো।
    ‘জানতে পারবেন ম্যাডাম। সব জানতে পারবেন।’
    মৃত্যুঞ্জয় এবার পুরো ফ্ল্যাটটা পুংখানুপুঙ্খ ভাবে দেখতে লাগলো। ড্রয়িং রুমের প্রতিটি জিনিস বিনা ছুঁয়ে ভালো ভাবে নিরীক্ষণ করলো। ফ্ল্যাটে দুটো বেডরুম, দুটোতেই ঢুকলো সে।
    ‘ফ্ল্যাটে বলতে আপনারা তিন জন। আপনি, আপনার মেয়ে এবং কাজের বৌ। কাজের বৌ রাতে থাকে না। আপনি তো এক বেডরুমের ফ্ল্যাট নিতে পারতেন। মাস্টার বেডরুম ছাড়া পাশের বেডরুম কোন কাজে আসে?’
    খানিক চুপ থেকে মিতালী বলল- ‘কোনো দিন যদি ….’
    তার কথাকে মাঝ পথে থামিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বলল- ‘যদি কোনো আত্মীয় স্বজন আসে …. তাই না? বেশ।’
    দ্বিতীয় বেডরুমের ভেতরে ঢুকলো সে। কাঁচের জানালার ধারে খাট পাতা। সুন্দর বিছানা করা, দুটো বালিশ পরিপাটি করে সাজানো। খাটের পাশে এক ড্রেসিং টেবিল। সে দিকে এগোলো মৃত্যুঞ্জয়। ড্রেসিং টেবিলের ওপর সাজগোজের বেশ কিছু কসমেটিক্স রাখা। অতি সন্তর্পণে নিচের ড্রয়ারটা মৃত্যুঞ্জয় খুললো। কিছু রিক্ত সিগারেটের ডিবে পেলো সে। একটা ডিবেতে এখনও দুটো সিগারেট ভরা। আড়চোখে মিতালীর দিকে তাকিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বলল- ‘এ গুলো নিশ্চয়ই আপনার নয়।’
    ‘আপনি ফালতু সময় নষ্ট করছেন এ.সি.পি.’
    ‘আমি সময় নষ্ট করছি? আমি এখানে আছি অমৃতের খুনের তদন্ত করতে। আপনার মেয়ের সন্ধান করতে নয়।’ মৃত্যুঞ্জয়ের কন্ঠস্বর বেশ উচ্চ হলো- ‘আপনি কি শুরু থেকে আমাকে কো-অপারেট করেছেন? করেননি। আপনি কি আমায় বলেছেন যে অমৃতের সাথে আপনার ইললিগাল রিলেশন ছিলো। আপনার কুদৃষ্টি ছিলো তার ওপর। শুধু অমৃত না, আপনার কুদৃষ্টি ছিলো আপনার দেওরের ওপর। তাই আপনি স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজের শ্বশুর বাড়ি ত্যাগ করতে বাধ্য হোন।’

    চলবে………………..

  • ধারাবাহিক

    অমৃতের বিষ পান (পর্ব -২)

    অমৃতের বিষ পান  (পর্ব -২) 
    -বিশ্বদীপ মুখার্জী

     

     

     

    এক ঘন্টার থেকে অল্প বেশি সময় লাগলো মৃত্যুঞ্জয়ের বালিগঞ্জ চৌমাথায় পৌঁছাতে। সে দেখলো বেশ ফরসা এক মহিলা, পরনে লাল শাড়ি, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে এবং বারবার কাউকে ফোন করছে। মৃত্যুঞ্জয়ের মোবাইলে রিং হচ্ছিলো। সে বুঝতে পারলো লাল শাড়ি পরা মহিলাটি রুবি দে। ফোন কেটে এগিয়ে গেলো সেদিকে।
    ‘আপনি কি রুবি দে?’ মহিলাটির পেছনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    মহিলাটি ঘুরে দেখলো তাকে।
    ‘হ্যাঁ।আপনি সি.আই ….’
    ‘হ্যাঁ আমি।’
    মুখে কৃত্তিম হাসি নিয়ে রুবি দে বলল- ‘আপনি ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন আমায়। আসুন, এখানে দাঁড়িয়ে তো কথা হবে না। আমার পার্লারেই চলুন।’
    ‘কিন্তু সেখানে তো পুরুষের প্রবেশ নিষেধ।’ মৃত্যুঞ্জয় বলল।
    ‘আপনি যেভাবে ফোনে কথা বললেন তাতে এটা পরিস্কার হয়ে গেছে যে ব্যাপার খুবই গুরুতর। আর গুরুতর ব্যাপারের আলোচনা রাস্তায় হয় না। তাই না? কেও যদি কোনো জরুরি ব্যাপারে আমার সাথে দেখা করতে আসে, তাহলে তার জন্য আমার পার্লারের দরজা অবশ্যই খোলা আছে। চলুন, বেশি দূর না, পাশেই।’
    রুবি দের পার্লার তার বাড়ির সাথে লাগোয়া, এক তলায়। একটা বোর্ড লাগানো আছে ‘দে বিউটি পার্লার’। পার্লারে দুটো ঘর। সামনের ঘরে পার্লারের কাজ হয়। মৃত্যুঞ্জয় দেখলো কোনো গ্রাহক নেই। দুটো অল্প বয়সী মেয়ে একসাথে বসে টিফিন করছে। বোধহয় এই পার্লারেই কাজ করে তারা। ভেতরের ঘরটা তুলনামূলক ছোটো। ছোটো আকারের গোল করে এক সোফাসেট পাতা আছে, মাঝখানে একটা গোল সেন্টার টেবিল। মৃত্যুঞ্জয়কে সেই ঘরে নিয়ে গেলো রুবি দে। রুবি দের বয়স মিতালীর বয়সের কাছাকাছি হবে। রুবি দেকেও দেখতে মন্দ না। গায়ের বর্ণ মিতালীর থেকে বেশি পরিস্কার হবে। কাঁধ পর্যন্ত চুল কাটা। চেহারার গঠন অল্প ভারিক্কি। কথা বলার পটুতা যেন মিতালীর থেকে বেশি রুবির। মৃত্যুঞ্জয়কে বসতে দিয়ে বলল- ‘বাইরে প্রচণ্ড রোদ, তায় আপনারা আবার পুলিশের লোক। মাথা সবসময় গরমই থাকে আপনাদের। বসুন, আপনার জন্য শরবত নিয়ে আসি।’
    ‘ধন্যবাদ। শরবত লাগবে না আমার। এক গেলাস জল হলেই হবে।’
    জল পান করার পর মৃত্যুঞ্জয় রুবিকে জিজ্ঞেস করলো- ‘আপনি মিতালী গাঙ্গুলীকে চেনেন?’
    ‘মিতালী গাঙ্গুলী? যে বাঘাযতীনে থাকে?’
    ‘হ্যাঁ। খুব ভালো করে চিনি। সে তো আমাদের সমিতির এক সদস্য।’ রুবি জবাব দিলো।
    ‘কিসের সমিতি?’
    ‘আমাদের এক মহিলা সমিতি আছে। নাম দিয়েছি, “মহিলা উন্নয়ন সমিতি”। এই ঘরটা আসলে সমিতির মিটিংএ কাজে আসে। সমিতিতে যত সদস্য আছে সবার বাড়িতে একবার, এক বার করে মিটিং হয়। আমার বাড়িতে মিটিং হলে সেটা এখানেই হয়। হঠাৎ মিতালীর বিষয় জিজ্ঞেস করলেন? ও ভালো আছে তো?’
    ‘হ্যাঁ, সে ভালো আছে। আচ্ছা, আপনি অমৃতকে চেনেন?’ মৃত্যুঞ্জয় আরেকটা প্রশ্ন করলো।
    ‘কে অমৃত?’
    ‘অমৃত সামন্ত। দমদমে থাকে। বয়স প্রায় তেইশ, চব্বিশ।’
    মনে পড়লো রুবির- ‘ও হ্যাঁ, চিনি বৈকি। আমার ছেলেকে টিউশন পড়াতো।’
    ‘টিউশন থেকে তাকে সরিয়ে দিলেন কেন?’
    ‘কারণ ছিলো। আমার ছেলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। অমৃত ইংলিশে কাঁচা ছিলো একটু। অসুবিধে হচ্ছিলো। তাই তাকে সরিয়ে অন্য টিচার নিতে বাধ্য হলাম।’ রুবি বলল।
    ‘কতো দিন আপনার ছেলেকে পড়িয়েছে সে?’
    একটু চিন্তা করে রুবি বলল- ‘প্রায় ছ’মাস।’
    ‘আপনার সাথে অমৃতের পরিচয় কী করে হয়?’
    ‘অমৃতের মায়ের সাথে আমার পরিচয়। সে আমার বান্ধবী নয়, আমার থেকে বয়সে তিনি বড়। আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের। অমৃতের বাবা তার মায়ের ওপর অত্যাধিক টর্চার করতো। সেই টর্চার সহ্য না করতে পেয়ে একদিন অমৃতের মা বাড়ি ছেড়ে কোলকাতা চলে আসে। শেয়ালদা স্টেশন থেকে আমরা তাকে উদ্ধার করি এবং বাড়ি ফেরত নিয়ে যাই। তবে থেকে অমৃতের সাথে পরিচয় আমার।’
    খানিক বিরতি নিয়ে রুবি দে আবার বলল- ‘কেন বলুন তো? হঠাৎ অমৃতের বিষয় প্রশ্ন। সে ভালো আছে তো? অনেক দিন তার খোঁজ নেওয়া হয়নি।’
    ‘না। সে ভালো নেই। তাকে খুন করা হয়েছে।’
    ‘কী! খুন করা হয়েছে?’ খুনের কথা শুনে আঁতকে উঠল রুবি দে।
    ‘হ্যাঁ, খুন করা হয়েছে তাকে।’ মৃত্যুঞ্জয় বলল।
    ‘কিন্তু কেন? কী দোষ করেছিল সে?’
    ‘সেটারই তো তদন্ত করছি ম্যাডাম।’
    বিষণ্ণতার কালো ছায়া রুবির মুখের ওপর স্পষ্ট ফুটে উঠল। খানিক ঘাড় হেঁট করে বসে রইল সে।
    ‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না আপনার কথায়। অমৃত এক সাধারণ ছাপোষা ছেলে, কেউ অকারণে তাকে খুন করবে কেন?’
    ‘ম্যাডাম, মাঝে-মাঝে সাধারণ ছেলেও কিছু অসাধারণ কাজ করে ফেলে, যার ফলে তাকে নিজের প্রাণ দিতে হয়ে।’
    ‘কবে হলো খুনটা?’ রুবি জিজ্ঞেস করলো।
    ‘দু’ দিন হলো। আপনি অমৃতের বিষয় আরও কী, কী জানেন?’
    ‘খারাপ কিছুই জানি না। তাকে টিউশনি থেকে বার করতে খারাপ লেগেছিল আমার। দু’ পয়সা রোজগার তো হতো। তার রোজগার বন্ধ করতে আমি চাইনি। তাই একটা পার্ট টাইম জবের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম তাকে। কিছু দিন সেখানে কাজ করলো সে। তারপর ছেড়ে দিলো। বলল যে সে পড়াশোনা করতে চায়। সরকারী চাকরী পাওয়া তার লক্ষ্য।’ কাঁপা-কাঁপা কন্ঠে রুবি বলল।
    ‘পার্ট টাইম কাজটা কোথায় করতো সে?’
    ‘পার্ট টাইম কাজ বলতে আমাদের মহিলা উন্নয়ন সমিতির কাজ দেখাশোনা করতো। হাত খরচা বাবদ কিছু টাকা তাকে দিতাম।’
    বাইরের ঘরে বসে থাকা দু’টো মেয়ের মধ্যে এক জন আওয়াজ দিলো- ‘দিদি, কেউ এসেছে।’
    ‘যাই। প্লিজ, আপনি বসুন, আমি এখনই আসছি।’ কথা বলে বেরিয়ে গেলো রুবি।
    ঘরটাকে ভালো করে দেখলো মৃত্যুঞ্জয়। দেয়ালে শোকেস ঝুলছে। বেশ কিছু পত্রিকা সাজানো তাকে।
    বাইরের ঘর থেকে এক পুরুষের কন্ঠস্বর ভেসে এলো- ‘আমি তাহলে আসি এখন। এক ঘন্টা পরে আসবো তোমায় নিতে।’
    মৃত্যুঞ্জয় উঁকি মেরে দেখলো মেকআপের একটা চেয়ারে এক মহিলা বসে আছে, এবং দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে এক পুরুষ। সেই মহিলাটির স্বামী হয়তো। এবার এখানে থাকা সম্ভব না। রুবি দে এবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যাবে। মৃত্যুঞ্জয় ভেতর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
    ‘আমি এবার আসি। শুধু একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার ছিল আপনাকে।’
    ‘করুন।’ বিনম্র কন্ঠে রুবিদে বলল।
    ‘আপনার বাড়িতে কে, কে থাকেন?’
    ‘আমি, আমার ছেলে আর বৃদ্ধ শ্বশুর। বর বিদেশে থাকে। শাশুড়ি মারা গেছেন প্রায় পাঁচ বছর হলো।’
    রাত্রে অরূপের ঘরেই কথা হলো দুজনের। অরূপ বলল- ‘অমৃতের ব্যাংক ডিটেল্স চেক করা হয়েছে। তার ব্যাংক ব্যালেন্স শুনলে চমকে যাবে।’
    ‘কতো?’ মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করলো।
    ‘এই মুহূর্তে তার এ্যকাউন্টে বাষট্টি হাজার টাকা আছে।’
    ‘হুম, বুঝলাম। টিউশন থেকে এতো টাকা রোজগার সম্ভব না।’ কথা শেষ করে একটা সিগারটে ধারালো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘কোনো দু’নম্বর ধান্দাও হতে পারে। সারা দিন না হোক, অমৃতের সাথে সারা রাত থাকতো তার রুমমেট রাহুল। সব না হোক, কিছু তো জানে সে নিশ্চয়ই। আজ সন্ধ্যেতে আবার সেই হোস্টেলে গিয়েছিলাম। রাহুলের সাথে দেখা করতে।’
    ‘দেখা হলো তার সাথে?’ মৃত্যুঞ্জয় প্রশ্ন করলো।
    ‘না, হয়নি। সে নাকি হোস্টেল ছেড়ে দিয়েছে।’
    কথাটা শুনে একটুও আশ্চর্য হলো না মৃত্যুঞ্জয়। মৃদু হেসে বলল- ‘সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? তোমরা দেরী করলে, তার লাভ উঠিয়ে নিলো সে। যে দিন অমৃতের খুন হয়েছিল, সে দিনই রাহুলকে জেরা করা দরকার ছিল। সে কোথায় গেছে জানতে পারোনি নিশ্চয়ই।’
    ‘না।’
    ‘জানতে পারবে, রাহুলের অফিস থেকে। কাল তার অফিসে যাও। সেখানে দেখা করো রাহুলের সাথে। বেহালার যে বাড়ির ঠিকানা দিয়েছিলাম, সেখানে খোঁজ করেছিলে?’
    অরূপ বলল- ‘হ্যাঁ, করেছিলাম। বাড়িতে মিতালী গাঙ্গুলীর শ্বশুর, শাশুড়ি, দেওর এবং দেওরর বৌ থাকে।’
    ‘তারপর।’
    ‘দিবাকর গাঙ্গুলী, মানে মিতালীর স্বামী এবং দিবাকরের ভাই ভাস্কর গাঙ্গুলী মিলে এক সাথে একটা দোকান চালাতো। হার্ডওয়ারের দোকান, বেশ বড়, বেহালাতেই। দিবাকর গাঙ্গুলী ছিল এক নম্বরের মাতাল। খবর নিয়ে জানা গেলো সে নাকি কুড়ি বছর বয়স থেকে মদ ধরেছে। শেষের দিকে মদ্যপান নাকি অসম্ভব বাড়িয়ে দিয়েছিল। দোকানের দিকে মন ছিল না তার। দোকানটা প্রায় ভাস্কর গাঙ্গুলী চালাতো। এই নিয়ে বাড়িতে রোজ চরম অশান্তি। লিভার সিরোসিস হয়ে মারা যায় দিবাকর। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি কি দিবাকরের গত হওয়ার আগে থেকেই মিতালীর চালচলন খুব একটা ভালো ছিলো না।’
    ‘মানে?’
    ‘মানে, মিতালীর নাকি কুদৃষ্টি ছিলো নিজের দেওর ভাস্করের ওপর। ভাস্করকে দু’ এক বার নাকি সিড্যুস করার চেষ্টাও সে করেছে।’
    ‘আই সি …. তার পর?’
    ‘পারিবারিক অশান্তি, যা হয়ে আর কি। দিবাকর মারা যাওয়ার পর নাকি মিতালী এক বিন্দু চোখের জল ফেলেনি। উল্টে ভাস্করকে আরও বেশি করে সিড্যুস করতে শুরু করলো।’
    সিগারেটের শেষটা অ্যাশট্রেতে ফেলে মৃত্যুঞ্জয় বলল- ‘আমার যতো দূর মনে হয়ে মিতালীর কাজের বৌএর থেকে বেশ কিছু ইনফরমেশন পাওয়া যেতে পারে। অনেক সময় তারা ভেতরের খবর একটু বেশিই রাখে। কিন্তু মিতালীর সামনে তাকে জেরা করে লাভ নেই। মুখ খুলবে না সে। তাকে আলাদা করে জেরা করতে হবে।’
    ‘তাকে কি থানায় উঠিয়ে নিয়ে আসবো?’
    ‘না, থানায় না। চারিদিকে পুলিশ দেখলে সে ঘাবড়ে যেতে পারে। আগামী কাল সন্ধ্যে সাতটা, যখন সে মিতালীর ফ্ল্যাট থেকে বেরোবে, তখন। তার আগে আমাকে পাপিয়ার সাথে দেখা করতে হবে। কিছুক্ষণের জন্য মরতে হবে মৃত্যুঞ্জয়কে।’
    পাপিয়া মুখার্জী বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে মেকআপ আর্টিস্টের কাজ করে। মৃত্যুঞ্জয়ের বহু পুরনো পরিচিত। টালিগঞ্জে একটা ফ্ল্যাটে থাকে সে। সকাল-সকাল বেরিয়ে গেলো মৃত্যুঞ্জয় তার সাথে দেখা করার জন্য। বহু দিন পর দেখা হবে পাপিয়ার সাথে। বহু রহস্য সমাধান করতে মৃত্যুঞ্জয়কে পাপিয়ার সাহায্য নিতে হয়েছে। কখনও চার্চের ফাদার, কখনও মসজিদের শেখ কিম্বা মন্দিরের পুরোহিত …. নিখুঁত মেকআপ দিতো পাপিয়া। মৃত্যুঞ্জয়কে মৃত্যুঞ্জয় বলে চেনাই যেতো না। পাপিয়ার সাথে শেষ দেখা হওয়ার কথা মনে পড়লো মৃত্যুঞ্জয়ের। মৃত্যুঞ্জয়ের জীবনে তখন প্রভা নেই। চারিদিক দিয়ে অন্ধকার বিষন্নতায় ঢাকা মৃত্যুঞ্জয়ের জীবন। চাকরী ছাড়ার পর কোলকাতা ছাড়ার আগে পাপিয়ার সাথে দেখা করেছিল সে। পাপিয়ার দু’চোখে ছিল জল। মৃত্যুঞ্জয়কে যেতে দিতে চায়নি সে। চেষ্টা করেছিল যাতে সে না যাক। কিন্তু নিজের চেষ্টায় বিফল হয়েছিল সে। এই মুহূর্তে মৃত্যুঞ্জয়কে নিজেকে বড্ড স্বার্থপর মনে হলো। এক সময় পাপিয়ার অনুরোধ সে রাখেনি। পাপিয়া হাত জোর করে অনুরোধ করেছিল- ‘যেও না মৃত্যুঞ্জয়। তুমি চলে যাওয়াটা সমস্যার সমাধান নয়। তুমি কিছু দিন চাকরী থেকে ছুটি নিয়ে নাও। কোথাও ঘুরে এসো। জানি, এগুলো ভোলা এতো সহজ না। কিন্তু মানুষকে ভুলে থাকতে হয়ে।’
    রাখতে পারেনি সে পাপিয়ার অনুরোধ। আজ সেই পাপিয়ার সাথে আবার সে যাচ্ছে, সাহায্য চাইতে। সত্যি, পরিস্থিতি মানুষকে মাঝে মাঝে স্বার্থপর করে দেয়।
    পাপিয়ার ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘কে?’ পাপিয়ার সে চেনা কন্ঠস্বর ভেসে এলো মৃত্যুঞ্জয়ের কানে।
    জবাব দেওয়ার বদলে এক বার আরও বেল টিপলো সে।
    কিছু সেকেন্ড পর মৃত্যুঞ্জয়ের সামনের বন্ধ দরজাটা খুলে গেলো। দরজা খুলে মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল পাপিয়া।
    ‘মৃত্যুঞ্জয়!’ অবাক কন্ঠে পাপিয়া বলল।
    ‘চিনতে পারলে তাহলে।’
    মৃত্যুঞ্জয়কে ভেতরে নিয়ে গেলো পাপিয়া। দুজনেরই একে অপরকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করার ছিলো, অনেক কিছু বলার ছিলো। সংক্ষেপে নিজের কথা পাপিয়ার সামনে পরিবেশন করলো মৃত্যুঞ্জয়। কোলকাতা আসার কারণ বলল, অমৃত হত্যার ঘটনা বলল এবং অবশেষে পাপিয়ার কাছে আসার কারণটাও সে বলল।
    ‘তুমি রহস্যকে ছেড়ে দিলে কী হবে মৃত্যুঞ্জয়, রহস্য তোমায় ছাড়বে না। আমি সেই রহস্যের প্রতি কৃতার্থ যার কারণে তুমি আমার কাছে এলে তো, মনে পড়লো তো আমার কথা। বলো, আজ কী সাজে সাজাবো তোমায়?’

    ‘তোমার ইচ্ছে, পাপিয়া। তোমার যেমন ইচ্ছে, তেমন আমাকে সাজিয়ে দাও।’
    মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, পরনে গাঢ় নীল রঙের পাঞ্জাবী ও সাদা পায়জামা। কাঁধে এক কাপড়ের ব্যাগ। মৃত্যুঞ্জয়কে চেনা দুস্কর। বাঘাযতীনের এক চায়ের দোকানে বসে চা পান করছে মৃত্যুঞ্জয়। তার হাত ঘড়িতে বাজে ঠিক সন্ধ্যে সাতটা। মিতালী গাঙ্গুলীকে অ্যাপার্টমেন্টে প্রায় আধ ঘন্টা আগে সে ঢুকতে দেখেছে। মিতালীর পরিচারিকার এবার বেরোবার সময় হয়ে এসেছে। চা শেষে করে দোকানিকে টাকা দিতে যাবে সে, ঠিক সেই সময় পরিচারিকার ওপর নজর গেলো মৃত্যুঞ্জয়ের। চায়ের মূল্য দিয়ে অতি সন্তর্পণে পরিচারিকার পিছু নিলো সে। পরিচারিকা ধীরে ধীরে বাঘাযতীন রেলওয়ে স্টেশনের দিকে এগিয়ে চলেছে। তার থেকে প্রায় কুড়ি হাত দূরে মৃত্যুঞ্জয়। পরিচারিকা স্টেশনে ঢুকে সব থেকে আগে কাটলো একটা টিকিট। না, আর বেশি সময় নষ্ট করা চলবে না। এ সময় ট্রেনে ভিড় খুব হয়। ট্রেনে এক বার চড়ে গেলে পরিচারিকাকে খুঁজে বার করা খুব কঠিন। পরিচারিকা এগোলো প্ল্যাটফর্মের দিকে, মৃত্যুঞ্জয় ভিড় ঠেলে এগোলো তার দিকে। শেয়ালদা যাওয়ার এক ট্রেনের ঘোষনা হলো। মৃত্যুঞ্জয় এগিয়ে গিয়ে পরিচারিকার কাঁধে হাত দিলো। পরিচারিকা ঘাবড়ে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকালো।
    ‘বেশি প্রশ্ন না। ব্যাগে বন্দুক আছে। আসুন আমার সাথে।’ পরিচারিকার কানে ফিসফিস করে বলল মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘আ – আ – আপনি ….’
    পরিচারিকা কিছু বলতে যাচ্ছিলো, তার মুখ নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘বেশি কথা নয় বললাম না।’
    পরিচারিকাকে টানতে টানতে স্টেশনের এক ধারে নিয়ে গেলো সে। একটা বড় গাছের আড়ালে দাঁড়ালো তারা। পরিচারিকার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বলল- ‘আমি গত কাল সকালে মিতালীর ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম। সেই পুলিশের লোক আমি।’
    ‘পুলিশের লোক!’ আরও ঘাবড়ে গেলো পরিচারিকা।
    ‘হ্যাঁ। যা,যা জিজ্ঞেস করবো, সঠিক উত্তর দেবে।’
    ‘আ ..আমি তো জানি না কিছু।’ পরিচারিকার কন্ঠে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।
    ‘বলতে গেলে সারা দিন তুমি মিতালী গাঙ্গুলীর বাড়িতে থাকো। কিছু জানি না বললেই যে আমি বিশ্বাস করে নেবো তোমার কথা, সেটা ভাবলে কী করে? যতটুকু জানো, ততো টুকুই বলো।’
    পরিচারিকা হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল। অশ্রু ভেজা কন্ঠস্বরে বলল- ‘আমি সাধারণ মানুষ বাবু। বাড়িতে স্বামী আর দুটো বাচ্চা আছে। আমাকে কেন এই ঝঞ্ঝাটে ….’
    ‘তোমার কোনো অসুবিধে হবে না। আমি যে তোমার থেকে কিছু জানতে পেরেছি, সেটা কাউকে বলবো না। বিশ্বাস রাখতে পারো আমার ওপর। আমি শুধু অমৃত আর মিতালীর বিষয় কিছু জানতে চাই।’
    ‘আমি বেশি কিছুই জানি না বাবু। অমৃত সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টায় পড়াতে আসতো আর আমি সাতটায় বেরিয়ে পরতাম।’ পরিচারিকা বলল।
    ‘মিতালী বাড়ি ফেরে কটায়?’
    ‘ছ’টা থেকে সাড়ে ছ’টার ভেতর। মিতালীদি’র ঢুকবার কিছুক্ষণ পরেই অমৃত আসতো বিটিয়াকে পড়াতে।’
    ‘তোমার মিতালীদি’র সাথে অমৃতের সম্পর্ক কেমন ছিল? মানে, মিতালী কোনো দিন তোমার সামনে অমৃতের প্রশংসা বা নিন্দে করেছে?’ প্রশ্ন করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘না, কোনো দিন কিছু বলেনি। তবে এক দিন ..’
    যেন কিছু মনে পড়লো পরিচারিকার। কিছু বলতে গিয়েও যেন সে থেমে গেলো।
    ‘কী বলো তবে এক দিন কী?’ মৃত্যুঞ্জয় জোড় দিলো।
    ‘এক দিন …. এক দিন সন্ধ্যে সাতটায় আমি বেরিয়ে পরলাম। আমার অদ্ভুত লাগতো যে সাতটা বাজাতে না বাজতেই মিতালীদি আমায় চলে যেতে বলতো। যদি আমার কোনো কাজ বাকি রয়ে যেতো তাহলে মিতালীদি বলতো যে সে কাজটা সে নিজেই করে নেবে। সে দিনও আমি ঠিক সাতটায় বেরিয়ে গেলাম। কিছু দূর এগোবার পর আমার মনে হলো , মিতালীদি’র কাছ থেকে টাকা চাইতে আমি ভুলে গেছি। টাকার প্রয়োজন ছিলো সে দিন। মিতালীদিকে আমি সকালেই টাকার কথা বলেছিলাম। দিদি বলেছিল যে সন্ধ্যে বেলায় এসে দেবে। আমি ফিরে গেলাম টাকা চাইতে। ফ্ল্যাটের দরজা খোলা ছিলো। দিদি হয়তো বন্ধ করতে ভুলে গেছিলো। দরজার ফাঁক দিয়ে যা দেখলাম, সেটা কোনো দিন ভুলবো না।’ এতো দূর বলে বিরাম নিলো পরিচারিকা।
    কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় তাকে বিরাম দিতে নারাজ।
    ‘কী দেখলে?’
    ‘দেখলাম …. দেখলাম, অমৃত বিটিয়াকে পড়াচ্ছে, আর আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে দিদি। একটা নাইটি পড়ে। খুবই খোলামেলা নাইটি। মাঝে মাঝে এমন ভাবে অমৃতের সামনে আসছিলো যে ….’
    কথাটা বলতে গিয়ে পরিচারিকা থেমে গেলো। চোখে মুখে একরাশ ঘৃণার ছাপ। খানিক চুপ থাকার পর পরিচারিকা আবার বলল- ‘আগে আমি দিদিকে ভালবাসতাম, সম্মান করতাম। কিন্তু সে দৃশ্য দেখার পর ভালোবাসা, সম্মান সব চলে গেছে। পেটের দায়ে পড়ে আছি বাবু।’
    ‘কতো দিন আছো মিতালীর সাথে?’
    ‘শুরু থেকে। তার শ্বশুর বাড়ির চাকরানি আমি। মিতালীদি’র চলে আসাতে আমিও চলে আসি।’
    ‘নিজের দেওরের সাথে ….’
    ‘না বাবু ..’ মৃত্যুঞ্জয়কে মাঝপথে থামিয়ে পরিচারিকা বলল- ‘আমি আর কিছু জানি না বাবু। আমায় খ্যামতে দিন।’
    পরিচারিকা চলে গেলো। শেয়ালদা যাওয়ার একটা আরও ট্রেন চলে আসছিলো। ট্রেনের অপেক্ষা করছিলো পরিচারিকা। একটা সিগারটে খাওয়ার জন্য মৃত্যুঞ্জয় স্টেশনের বাইরে ঠিক তখনই এক বিকট চিৎকার শুনতে পেলো সে। প্ল্যাটফর্মের দিকে দৌড় দিলো মৃত্যুঞ্জয়। ট্রেন ততক্ষণে ঢুকে গেছে, সাথে শুরু হয়েছে হৈহল্লা।
    ‘বাঁচা…বাঁচা।’
    ‘ট্রেন থামা।’
    ‘ধর, ধর পালিয়ে গেলো।’
    নানাবিধ কথা।
    মৃত্যুঞ্জয় কাছে গিয়ে দেখলো, প্রায় দু’টুকরো হয়ে পড়ে আছে মিতালীর পরিচারিকা।
    ‘কেউ ধাক্কা দিলো, দাদা। অন্ধকারে ঠিক দেখতে পেলাম না তাকে। ধাক্কা দিয়ে ঝড়ের বেগে পালিয়ে গেলো।’ এক জনকে বলতে শুনলো মৃত্যুঞ্জয়।

     

     

    চলবে……….

  • ধারাবাহিক

    অমৃতের বিষ পান  (পর্ব – ১) 

    অমৃতের বিষ পান (পর্ব – ১) 
    -বিশ্বদীপ মুখার্জী

    অমল হালদারের নিমন্ত্রণটা অমান্য করতে পারলো না মৃত্যুঞ্জয়। কোলকাতা তার জীবনের অতীত, এক এমন অতীত যার ছায়া সে নিজের বর্তমান জীবনে পড়তে দিতে চায় না। নর্থ বেঙ্গলে থাকা কালিন এক রহস্যের সমাধান করার জন্য তাকে কোলকাতা যেতে হয়। কিন্তু সেটাও অনিচ্ছা সত্বেও। এক বার আরও তাকে যেতে হবে কোলকাতা। অমলবাবুর অনুরোধ সে অমান্য করবে কী করে?
    মৃত্যুঞ্জয় যখন সি.আই.ডি.তে কাজ করতো, অমল হালদার ছিলেন তার সিনিয়ার। বয়স জ্যেষ্ঠ অমল হালদারকে মৃত্যুঞ্জয় নিজের গুরু বলে মানতো। অমল বাবু চাকরী থেকে অবসর পেয়েছেন প্রায় দু’বছর হলো। থাকেন কোলকাতাতেই, নিজের বাড়িতে। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে অরূপ হালদার পুলিশেই কাজ করে। দমদম থানার বড়বাবু সে এখন। মেয়ে অর্পিতা হালদার পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর এক প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করে। তারই বিয়ের উপলক্ষ্যে মৃত্যুঞ্জয়কে কোলকাতা আসার নিমন্ত্রণ করলেন অমল হালদার।
    আজকের দিনে মৃত্যুঞ্জয়ের গোপন ঠিকানার বিষয় যারা জানে, তাদের মধ্যে এক জন অমলবাবু। নর্থ বেঙ্গল ছাড়ার পর মৃত্যুঞ্জয় যে বাঁকুড়াতে আছে, সেটা তিনি বেশ ভালো করেই জানতেন। মৃত্যুঞ্জয়ের চাকরী ছাড়ার পর তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন তিনি। মৃত্যুঞ্জয় বহু বার পরিবর্তন করেছে নিজের মোবাইল নম্বর। কিন্তু প্রতিবারই নিজের নতুন নম্বর অমলবাবুকে দিয়েছে। পুলিশ ডিপার্টমেন্টের অনেকেই জানে যে অমলবাবুর যোগাযোগ আছে মৃত্যুঞ্জয়ের সাথে। অনেকে অমল বাবুর থেকে মৃত্যুঞ্জয়ের নম্বরও চেয়েছে। কিন্তু নম্বর দেননি অমল হালদার। বিশ্বাস রক্ষা করতে তিনি খুব ভালোই জানেন।

    অমলবাবুর ডাকে কোলকাতা এলো মৃত্যুঞ্জয়। বিয়ের অনুষ্ঠান, অমলবাবুর লেক টাউনের দু’তোলা বড়ো বাড়িতে আত্মীয়ের প্রাচুর্য। অমল হালদার প্রত্যেককে মৃত্যুঞ্জয়ের পরিচয় দিলেন নিজের এক বন্ধুর ছেলে বলে। মৃত্যুঞ্জয়ের আসল পরিচয় যদি কেউ জানতো, সে হলো অমলবাবুর স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে এবং নিমন্ত্রিত কিছু পুলিশ অফিসার।
    বিয়ের দিন সকালে অরূপ কাজে বেরিয়ে গেলো। ছুটি তো সে নিয়েছিল, কিন্তু থানা থেকে ফোন আসাতে তাকে চলে যেতে হলো। শুরুতে একটু গজগজ করলেন ঠিকই অমলবাবু, কিন্তু তিনি জানেন পুলিশের চাকরীর কোনো বাঁধা ধরা সময় হয়ে না। বিকেলে ফিরে এলো অরূপ। বরযাত্রী আসতে এখনও প্রায় দু’ঘন্টা দেরী। ইতিমধ্যেই থানায় যাবার কারণটা মৃত্যুঞ্জয়কে বলল অরূপ। বরযাত্রীর আপ্যায়নের সরঞ্জাম করতে, করতে অরূপ মৃত্যুঞ্জয়কে বলল- ‘আজ সকালে দমদমের এক হোস্টেলে একটা ছেলের খুন হয়েছে।

    ‘হোস্টেলে খুন?’ জিজ্ঞেস করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘না, ঠিক হোস্টেলে না। রাস্তায়।’
    ‘ রাস্তায়? কেউ প্রত্যক্ষদর্শী ছিলো না?’

    ‘ না, এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আসলে ঘটনাটা ঘটেছে ভোর পাঁচটা নাগাদ। রাস্তা সুনসান ছিল সে সময়। কেউ তাকে ফোন করে হোস্টেলের বাইরে ডাকে।’ ‘

    ‘কার নম্বর পাওয়া গেলো ফোন চেক করে?’
    ‘আননোন নম্বর। সুইচ অফ। নম্বর ট্রেস করতে দেওয়া হয়েছে। কাল রিপোর্ট আসবে।’

    ‘কী দিয়ে খুন করা হয়েছে?’
    ‘ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে। সম্ভবত চাকু। কিন্তু সেটা পাওয়া যায়নি।’
    ‘লেগে পড়ো, অরূপ। মনে হয়ে এই কেসটা তুমি এ‍্যস সুন এ‍্যস পসিবল সলভ করে নেবে।’

    বিয়ে চলাকালীন বহু বার অরূপের ফোন বেজে উঠল। বেশ চিন্তাগ্রস্ত ছিলো অরূপের মুখমন্ডল। সে সশরীরে তো বিয়ের অনুষ্ঠানে, কিন্তু মনটা যেন অন্যত্র। মৃত্যুঞ্জয় বুঝতে পারলো কেসের চাপটা হয়তো বাড়ছে। অরূপের কাছে এসে সে জিজ্ঞেস করলো- ‘কী হলো, অরূপ? বেশ চিন্তায় আছো মনে হচ্ছে?’

    ‘কল ট্রেসিং এর রিপোর্ট এসেছে, মৃত্যুঞ্জয়দা। ওই নম্বরটা অমৃতের নামেই নেওয়া।’ অরূপ বলল।
    ‘কোন নম্বরটা?’
    ‘যে নম্বর দিয়ে লাস্ট কল এসেছিল।’
    ‘অমৃতটা কে?’
    ‘যে খুন হয়েছে, তার নাম অমৃত। অমৃত সামন্ত।’
    ‘কলটা কোথা থেকে করা হয়েছিল জানা গেলো?’
    ‘হুম। দমদম থেকে। ভোর চারটে বেজে পঞ্চাশ মিনিটে। বাড়ির লোককে খবর দেওয়া হয়েছে। তারা থানায় এসে বসে আছে।’ অরূপ বলল।

    হাতে কোনো কেস পেলে রাতের ঘুম শেষ হয়ে যায়, সেটা জানে মৃত্যুঞ্জয়। তার সাথেও এমনই হতো। অরূপ দমদম থানার বড়বাবু। হয়তো অনেক রহস্যের সমাধান সে করেছে। কিন্তু এখন সে নার্ভাস কেন? কারণটা জানতে পারলো মৃত্যুঞ্জয় পরের দিন। অর্পিতার বিদায়ের পরে অরূপ মৃত্যুঞ্জয়কে বলল- ‘যার সামনে এতো বড় এক আই.পি.এস. অফিসার থাকবে, সে তো একটু হলেও নার্ভাস হবে। খুব বড় কমপ্লিকেটেড কেস আমি আজ পর্যন্ত হ্যান্ডেল করিনি। জানি না এই কেসটা কতোটা কমপ্লিকেটেড হবে।’
    ‘আমি আর আই.পি.এস. নয়, অরূপ। ভুল করছো তুমি। আমাকে দেখে নার্ভাস হবার কিছুই নেই।’ মৃত্যুঞ্জয় বলল।
    ‘সত্যি বলতে এই প্রথম পুরোপুরি কোনো কেস আমার হাতে এলো। এর আগে কোনো থানার ইনচার্জ আমি ছিলাম না। কিছু দিন হলো দমদম থানার ইনচার্জ হয়ে আমি এসেছি। মৃত্যুঞ্জয়দা, একটা রিকোয়েস্ট করবো?’
    ‘কী?’
    ‘ক্যান উ হেল্প মি টু সোল্ভ দিস কেস? তোমার সান্নিধ্যে কিছু শেখার এর থেকে বড় সুযোগ আর কী কোনো দিন পাবো?’

    পর্ব –  ২
    ‘আমি অফিসিয়ালি তো তোমাকে সাহায্য করতে পারবো না, অরূপ। কিন্তু আনঅফিসিয়ালি তোমার সাথে আছি।’ অরূপের কাজে বেরোবার আগে মৃত্যুঞ্জয় তাকে বলল।

    সারা দিন মৃত্যুঞ্জয় বাড়িতেই থাকলো। অধিকাংশ সময় সে কাটালো অমলবাবুর সাথে। কিছু পুরোনো কথা যে উঠল সেটা বলাই বাহুল্য।
    অমলবাবু বললেন- ‘মৃত্যুঞ্জয়, তখন তোমার মাথার ঠিক ছিলো না। প্রভার চলে যাওয়া তোমায় ভেঙ্গে দিয়েছিল। তখন তুমি যা করতে যাচ্ছিলে, তাতে তোমাকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যেতো। ডিপার্টমেন্টে তোমার প্রয়োজন ছিল।’
    ‘প্রবলেম তো সেখানেই, স্যার। আপনারা শুধু ডিপার্টমেন্টের বিষয় ভেবে গেলেন। ডিপার্টমেন্টের এক অফিসারের মনে কী ঝড় চলছে সেটা আপনারা বুঝলেন না। আমার স্ত্রী ও তার গর্ভে থাকা ছ’মাসের সন্তানকে যারা মেরেছে, তারা পলিটিক্যাল লিডারের ডান হাত ছিলো। তাই আমি যদি তাদের প্রাণের শত্রু হয়ে যেতাম, তাহলে আমার জীবিত থাকায় প্রশ্ন চিহ্ন উঠে যেতো। ডিপার্টমেন্ট চাইতো আমি অনবরত ডিপার্টমেন্টের হয়ে জটিল থেকে জটিল রহস্যের সমাধান করে যাই। তার জন্য আমার জীবিত থাকার প্রয়োজন ছিলো। স্যার, আজকের দিনে আমার এটা বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় না, যে ডিপার্টমেন্ট আমার সাথে স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করেছে। আমার আজও রাতে ঘুম হয়ে না, স্যার। ততো দিন রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবো না, যতো দিন না আমি নিজের স্ত্রী ও সন্তানের খুনিদের শাস্তি না দিই।’
    মৃত্যুঞ্জয়ের কথাগুলো চুপচাপ শুনলেন অমল হালদার।
    ‘তাই আমিও চাকরী ছাড়তে বাধ্য হলাম স্যার। যদি ডিপার্টমেন্ট আমার প্রতি স্বার্থপর হয়, তাহলে আমিও তার প্রতি স্বার্থপরই হবো।’

    ‘গ্লানি আমারও আছে, মৃত্যুঞ্জয়। প্রভা আমার মেয়ের মতো ছিল। তার অসময় চলে যাওয়া আমায় কতোটা আঘাত দিয়েছে সেটা বলে বোঝাতে পারবো না। কিন্তু তুমি সে সময় নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলে। সে সময় তোমাকে সামলানো দরকার ছিলো। যদি স্বার্থপরের কথা বলো, সেটা শুধু ডিপার্টমেন্ট নয়, স্বার্থপর আমিও। আমি প্রভার মতো মেয়েকে হারিয়েছিলাম, মৃত্যুঞ্জয়ের মতো ছেলে হারানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না।’ দু’চোখ ছলছল করে উঠল অমলবাবুর।

    রাত দশটার পর বাড়ি ফিরলো অরূপ। ডিনার শেষ করে ছাদে গিয়ে কথা হলো মৃত্যুঞ্জয়ের সাথে তার। সিগারেটের ডিবে থেকে মৃত্যুঞ্জয়কে একটা সিগারটে দিয়ে একটা নিজে ধারালো সে। একটা টান দিয়ে বলল- ‘পোস্টমর্টেম রিপোর্ট চলে এসেছে।’
    ‘কী বেরোলো তাতে?’
    ‘সেটাই, যা আন্দাজ করেছিলাম। ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে গলার নলী কাটা হয়েছে।’
    ‘ফোন লিস্ট চেক করা হয়েছে?’ মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করলো।
    ‘হ্যাঁ। শেষ কলটা দমদম থেকেই এসেছিল। নম্বরটা অমৃতের নামেই নেওয়া। বাকি কল হিস্ট্রি যা বেরলো তাতে বেশিরভাগ তার বন্ধুবান্ধবের নম্বর। পায়রাডাঙ্গাতে অমৃতের বাড়ি। বেশিরভাগ কল সেখানেই করা হয়েছে। কিছু কল করা হয়েছে কোলকাতায়। নিজের রুমমেটকে আর যেখানে টিউশন পড়াতো সেখানে।’
    ‘টিউশন পড়াতো অমৃত?’
    ‘হ্যাঁ, হাত খরচার জন্য। তার রুমমেট রাহুলের থেকে আমরা জানাতে পেরেছি। অমৃত কোলকাতায় থেকে ব্যাংক, রেল ইত্যাদি পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করতো। খরচা বাবদ কিছু টাকা তার বাবা পাঠাতো, বাকি টাকা সে টিউশন করে রোজগার করতো।’
    সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করলো – ‘রাহুল কী করে?’
    ‘একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরী করে সে। অফিস সল্টলেকে।’

    ‘হোস্টেলের রুম থেকে কী, কী জিনিস পাওয়া গেলো অমৃতের?’
    ‘বিশেষ কিছুই না। কিছু জামাকাপড় আর বইপত্র।’
    সিগারট ফেলে দিয়ে খানিক চোখ বন্ধ করে চিন্তা করলো মৃত্যুঞ্জয়। তারপর জিজ্ঞেস করলো – ‘অমৃতের বাবা কী করেন?’
    ‘পায়রাডাঙ্গাতে তাঁর মুদির দোকান আছে।’ অরূপ জবাব দিলো।
    ‘অমৃতের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না খোঁজ নিয়েছ?’
    ‘আছে একটা। তার ওয়ালেট থেকে এ.টি.এম. পাওয়া গেছে। কিন্তু তার ব্যাগ সার্চ করে কোনো ব্যাংকের পাসবুক পাওয়া যায়নি।’
    ‘খোঁজ নিয়ে দেখো। কোন ব্যাংকের কোন ব্রাঞ্চে তার অ্যাকাউন্ট, আর সেই অ্যাকাউন্টে এই মুহূর্তে কতো ব্যালেন্স আছে।’
    ‘ঠিক আছে, মৃত্যুঞ্জয়দা।’
    ‘অমৃতের কোলকাতায় পরিচিতির কেউ আছে কী?’
    ‘এখন পর্যন্ত তো কাউকে পাওয়া যায়নি।’
    ‘তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে কোলকাতায় কে আছে?’
    মাথা নেড়ে ‘না’ বলল অরূপ – ‘কেউ না।’
    ‘দিনে কটা টিউশনি করতো সে?’
    ‘এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বলতে গেলে, দুটো। রোজ সন্ধ্যা ছ’টায় বেরোতো, রাত দশটায় ফিরতো।’ অরূপ বলল।
    ‘তার মানে এই দুটো টিউশনি থেকে রোজগার বেশ ভালোই হতো তার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন কোলকাতায় তার বিশেষ পরিচিতি কেউ ছিলো না, তখন তাকে এই টিউশন গুলো কে ধরিয়ে দিয়েছিল?’
    মৃত্যুঞ্জয়ের প্রশ্নে চুপ থাকলো অরূপ। নিরুত্তর সে।
    ‘এই প্রশ্নের উত্তর সেখানে গিয়েই পাওয়া যাবে, যেখানে অমৃত টিউশন পড়াতো। অরূপ তুমি এক কাজ করো, আগামী কাল তুমি অমৃতের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডিটেল্স বার করো। আমি বরং তার টিউশন বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নি। তার টিউশন বাড়ির ঠিকানা দাও।’

    বাঘাযতীনের এক বহুতল অট্টালিকা। তারই আট তলায় 712/B নম্বর ফ্ল্যাটে থাকে মিতালী গাঙ্গুলী। বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি, সুগঠিত সুন্দর চেহারা এবং উপস্থিত বুদ্ধি রাখে খুব বেশি। কলিং বেল টিপতে পরিচারিকা দরজা খুলল।
    ‘ম্যাডাম আছেন?’ পরিচারিকাকে জিজ্ঞেস করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘আপনি?’ জবাব দেওয়ার বদলে পরিচারিকা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলো।
    ‘ম্যাডামকে বলুন পুলিশের লোক এসেছে।’
    পুলিশের নাম শুনে পরিচারিকার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।
    ‘কে এসেছে রে?’ ইতিমধ্যেই মিতালী ভেতর ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিছু সেকেন্ড মৃত্যুঞ্জয়কে অবাক দৃষ্টিতে দেখার পর জিজ্ঞেস করলো – ‘আপনি?’
    ‘হ্যাঁ আমি। আমি এ সি পি মৃত্যুঞ্জয় মজুমদার, সি.আই.ডি.।’
    ‘সি.আই. ডি.! সি.আই.ডি. হঠাৎ আমার বাড়িতে কেন জানতে পারি?’
    ‘নিশ্চই জানতে পারেন ম্যাডাম। আসলে আমাদের কাছে সময়ের খুব অভাব। তাই ফালতু ঘুরে বেড়ানো আমাদের পোষায় না। যেখানে যাই, কাজেই যাই।’
    পরিচারিকাকে চা করতে বলে মৃত্যুঞ্জয়কে হল ঘরের সোফাতে বসতে দিলো মিতালী। হল ঘরটা ভালো করে এক বার চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো মৃত্যুঞ্জয়। বেশ সুন্দর সাজানো ঘর। দামী সোফাসেট, মাটিতে দামী কার্পেট, দেয়ালে ঝুলছে বেশ সুন্দর কিছু ওয়েল পেন্টিং। তাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের কারণে ঘরটা বেশ ঠান্ডা। ঘর সাজাবার জন্য প্লাস্টার অফ প্যারিসের বেশ কিছু মূর্তি এবং কিছু শোপিস দেখতে পেলো মৃত্যুঞ্জয়।
    মৃত্যুঞ্জয়ের সামনের সোফাতে বসে মিতালী বলল – ‘বলুন, আজ হঠাৎ সি.আই.ডি. আমার ফ্ল্যাটে আসার প্রয়োজন বোধ করলো কেন?’

    ‘আপনি অমৃত সামন্তকে কী ভাবে চেনেন?’
    অমৃতের নাম শুনে মুখটা ঈষৎ শুকিয়ে গেলো মিতালীর।
    ‘আমার মেয়ে রিয়াকে টিউশন পড়াতো অমৃত, প্রায় এক বছর ধরে। খুব ভালো পড়াতো সে। সত্যি বলতে এখন চিন্তায় পড়ে গেলাম। রিয়ার জন্য নতুন টিউটার খুঁজতে হবে। সামনে পরীক্ষা তার। কী যে করি, কিছুই বুঝতে পারছি না।’ বিষণ্ণতা ভরা মুখে মিতালী বলল।
    ‘তার মানে আপনি প্রায় এক বছর ধরে চেনেন অমৃত কে?’
    ‘হ্যাঁ।’
    ‘কী করে পরিচয় হয়ে তার সাথে আপনার?’
    ‘আমার এক বান্ধবীর মাধ্যমে। তার ছেলেকেও অমৃত টিউশন পড়াতো।’
    ‘কী নাম আপনার বান্ধবীর?’
    ‘রুবি দে। বালিগঞ্জে থাকে।’

    পর্ব –  ৩

    ‘আপনি আর আপনার মেয়ে থাকে এই ফ্ল্যাটে?’ মৃত্যুঞ্জয়ের আরেকটা প্রশ্ন।
    ‘হ্যাঁ।’
    ‘আপনার হাসবেন্ড?’
    ‘মারা গেছেন, প্রায় দু’বছর হলো।’
    ‘ওঃ! সরি। এই ফ্ল্যাটটা আপনার নামে না আপনার হাসবেন্ডের নামে?’
    এই প্রশ্ন অল্প বিরক্ত হলো মিতালী। বলল – ‘এর উত্তরের সাথে কি এই কেসের কোনো যোগাযোগ আছে?’
    মৃদু হেসে মৃত্যুঞ্জয় বলল – ‘যোগাগোগ আছে কি না সেটা আমরা বুঝে নেবো, ম্যাডাম। আপনি শুধু আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যান।’
    চা চলে এলো। চা দিয়ে পরিচারিকার ভেতরে চলে যাওয়ার পর মিতালী বলল- ‘এই ফ্ল্যাটটা আমার। হাসবেন্ড মারা যাওয়ার ছ’মাস পর আমি কিনেছি। আমার শ্বশুর বাড়ী বেহালাতে। স্বামী মারা যাওয়ার পর সেখানে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। তাই ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এই ফ্ল্যাটটা কিনি।’
    ‘আপনার মেয়েকে দেখছি না।’
    ‘সে স্কুলে। সকাল আটটা থেকে দুপুর দু’টো পর্যন্ত তার স্কুলে থাকে।’

    ‘আপনার অফিসের টাইম কী?’
    ‘এগারোটা থেকে পাঁচটা।’
    ‘আপনার মেয়ে যখন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে তখন বাড়িতে কে থাকে?’
    ‘আমার কাজের লোক। যে বৌটা চা দিয়ে গেলো, সে। তার ডিউটি সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যে ছ’টা অবধি।’
    ‘কতো দিন ধরে কাজ করছে সে?’
    ‘আমার এখানে আসার পর থেকেই।’
    ‘তার সাথে কি কথা বলা যেতে পারে?’
    ‘হ্যাঁ। কিন্তু এখন না। আমার অফিসের দেরি হচ্ছে। আপনি বরং কাল আসুন। কাল আপনি তার সাথে কথা বলে নেবেন।’
    মৃত্যুঞ্জয় ঘড়ি তে সময় দেখলো। সকাল প্রায় দশটা।
    ‘কাল যদি আপনার পরিচারিকা না আসে?’
    ‘সন্দেহ করছেন?’
    ‘সন্দেহ করা তো আমাদের কাজ, ম্যাডাম। আমরা প্রত্যেককে সন্দেহ করি।’
    ‘আপনি আজ আমায় যেখানে পেলেন, কালও সেখানেই পাবেন। আমার পরিচারিকাও আগামী কাল থাকবে।’ দৃঢ় কন্ঠে মিতালী বলল।
    ‘বেশ। যাওয়ার আগে আপনার থেকে তিনটে জিনিস চাইবো।’ মৃত্যুঞ্জয় বলল।
    ‘কী?’
    ‘আপনার শ্বশুর বাড়ির ঠিকানা, আপনার অফিসের ঠিকানা এবং রুবিদের বাড়ির ঠিকানা। আশা করি আপনার আপত্তি হবে না।’
    ‘না, আপত্তি নেই। তবে আমার শ্বশুর বাড়ির লোকেদের বিরক্ত না করাই ভালো। তাদের সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই।’
    ‘চিন্তা করবেন না। খুব একটা বিরক্ত করবো না। আর হ্যাঁ, আপনার স্বামীর নামটা আপনি বললেন না।’
    ‘দিবাকর গাঙ্গুলী। বিজনেসম্যান ছিলো, ক্যান্সারে মারা যায়।’

    মিতালী গাঙ্গুলীর ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে মৃত্যুঞ্জয় ফোন করলো অরূপকে। মিতালীর শ্বশুর বাড়ির ঠিকানা দিয়ে বলল- ‘খোঁজ নাও বাড়িতে কে,কে থাকে এখন। নিজের শ্বশুর বাড়ির লোকেদের সাথে মিতালীর সদ্ভাব ছিলো কি না। বিশেষ করে নিজের স্বামীর সাথে।’
    আগামী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মৃত্যুঞ্জয় বাঘাযতীন থেকে গিরিশ পার্ক গেলো। অমৃত নিজের দ্বিতীয় টিউশন সেখানেই করতো। প্রশান্ত বাগচী নামের এক জনের ছেলেকে পড়াতো সে। প্রশান্ত বাগচীর বাড়ি খুঁজে পেতে অল্প বেগ পেতে হলো তাকে। ভাড়া বাড়িতে থাকেন তিনি। বাড়ি খুঁজে পেয়েও কোনো লাভ হলো না মৃত্যুঞ্জয়ের। দরজায় তালা দেওয়া। খবর নিয়ে জানতে পারলো যে প্রশান্ত বাগচী সপরিবার কোনো এক আত্মীয়র বিয়েতে কোলকাতার বাইরে গেছেন। যে কোনো তদন্তের জন্য সময়ের মূল্য সব থেকে বেশি হয়। এখানে আসাতে সময় নষ্ট হলো মৃত্যুঞ্জয়ের। ঘড়িতে সময় দেখলো সে, বেলা বারোটা বেজে গেছে। আর বেশি সময় নষ্ট না করে সে বেরিয়ে পড়লো বালিগঞ্জের দিকে। তার আগে রুবি দেকে ফোন করলো সে। মিতালী দিয়েছিল রুবি দের নম্বর।
    ‘হ্যালো! ‘ এক মিহিন কন্ঠ ভেসে এলো মোবাইলের ওপার থেকে।
    ‘আমি কি রুবি দের সাথে কথা বলতে পারি?’ মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করলো।
    ‘বলছি। আপনি?’
    ‘আমি সি.আই.ডি. থেকে এ.সি.পি. মৃত্যুঞ্জয়।’
    খানিক নিস্তব্ধতা পর ওপার থেকে আওয়াজ এলো- ‘বলুন।’
    ‘আপনার সাথে দেখা করতে চাই?’
    ‘কারণ জানতে পারি কী?’
    ‘অবশ্যই পারেন। কিন্তু কারণটা ফোনে বলা যাবে না। অত্যন্ত কনফিডেন্সিয়াল।’
    রুবি দে বলল- ‘দেখুন, আমি এই মুহূর্তে নিজের পার্লারে আছি। এখানে পুরুষ মানুষের প্রবেশ নিষেধ। সে কোনো পুলিশ অফিসারই কেননা হোক। আপনি বরং এক কাজ করুন, সন্ধ্যে ছ’টার পর আমার বাড়িতে আসুন। সেখানে নিশ্চিন্তে কথা হতে পারবে।’
    মাথা গরম হলো মৃত্যুঞ্জয়ের। একে এমনিতেই সময় নষ্ট হয়েছে, এর থেকে বেশি সময় নষ্ট করতে সে নারাজ। বেশ উচ্চ গলায় সে বলল- ‘আপনার সময়ের মতো আমরা চলতে পারবো না, ম্যাডাম। আমাদের প্রতিটা সেকেন্ড মূল্যবান। তাই সন্ধ্যে ছ’টা পর্যন্ত অপেক্ষা করা সম্ভব না। আমি এক ঘন্টার ভেতর বালিগঞ্জ চৌমাথায় পৌঁছাবো। আপনি সেখানে দেখা করবেন আমার সাথে।’

     

    চলবে………………

  • ধারাবাহিক

    যেখানে দেখিবে ছাই (পর্ব-৩ /শেষ)

    যেখানে দেখিবে ছাই (পর্ব-৩ /শেষ)
    -বিশ্বদীপ মুখার্জী

    গভীর বিষণ্ণতায় থাকার দারুণ রাত্রে ভালো ঘুম হয়ে না তিস্তার। আদৌ কি তার দাদা কোনো দিন ফিরে আসবে? আদৌ কি আর কোনো দিন নিজের দাদার মুখে ‘রুমির’ মধুর ডাক শুনতে পাবে? রাখী ও ভাইফোঁটার পর্ব কি বিষাদের গভীর সাগরে ডুবেই কেটে যাবে তিস্তার? চোখের জল সে ফেলে না। এখনও নিজের মাকে সাহস দিয়ে যাচ্ছে সে। যদি তিস্তা চোখের জল ফেলে তাহলে তার মায়ের মনোবল তো আরও পড়ে যাবে। সারা রাত প্রায় জেগেই কাটালো তিস্তা। তাই ভোরের দিকে চোখ লেগে গিয়েছিল। ঠিক সে সময় তার মোবাইল বেজে উঠল। ধড়ফড় করে উঠে বসলো সে। মোবাইলের দিকে দেখলো সে। দেখেই অবাক। অদ্ভুত এক তৃপ্তি পেলো সে। এক এমন তৃপ্তি যেটা বর্ণনা করা সম্ভব না। ফোন তুলল সে – ‘হ্যালো!’
    ‘অনেক জরুরি কথা আছে আপনার সাথে। আমি বারোটা নাগাদ পৌঁছাবো। আপনি কি বাস স্ট্যান্ডে আসতে পারবেন? ‘ কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে গেলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘পারবো, পারবো আমি। আপনি ছিলেন কোথায়? বহুবার আপনার ফোন ট্রাই করলাম।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে অচিরেই তিস্তার গলা ভারী হয়ে এলো।
    ‘সব বলবো আপনাকে। শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করুন।’
    সেই থেকে আর ঘুম হলো না তিস্তার। অধীর আগ্রহে বসে থাকলো বেলা বারোটা বাজার অপেক্ষায়। তাহলে দীনবন্ধু বাবু ঠিক কথাই বলেছিলেন। মৃত্যুঞ্জয় যে কাজের দায়িত্ব নেয়, সেটা শেষ না করা পর্যন্ত সে শান্তি পায়ে না।
    বাড়িতে কাউকে জানায়নি তিস্তা। বাস স্ট্যান্ড বাড়ি থেকে একটু দূর, তার এগারোটা বাজার সাথে-সাথেই তিস্তা বেরিয়ে গেলো। মৃত্যুঞ্জয় কোথায় গিয়েছিল, জানে না তিস্তা। কী খবর সে নিয়ে এসেছে, সেটাও জানে না সে। ক্রমে তার হৃদয় স্পন্দন বেড়ে চলেছে। সাড়ে এগারোটা নাগাদ সে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে পৌঁছালো। বেশ কিছু বাস সেখানে প্রবেশ করলো, বেশ কিছু বাস বেরিয়ে গেলো নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। এক কোণাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো তিস্তা। খানিক পর শিলিগুড়ি থেকে একটা বাস ঢুকলো সেখানে। পিঠে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে সেই বাস থেকে নামলো মৃত্যুঞ্জয়। মৃত্যুঞ্জয়কে দেখতে পেলো তিস্তা। মরুভূমির লোকেরা জলের দিকে যেমন ছুটে যায়, ঠিক তেমনই ছুটলো তিস্তা মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে। যেন মনে হলো বহু বছর পথ হারানো পথিক অবশেষে নিজের পথ খুঁজে পেলো।
    ‘কোথায় চলে গিয়েছিলেন আপনি, কিছু না জানিয়ে? এই কিছু দিন কী অবস্থা হয়েছে আমার, সেটা জানেন না আপনি।’ একরাশ অভিমানের স্বরে তিস্তা বললো।
    ‘সব বলবো আপনাকে, কিন্তু সময় আসলে। এখন হাতে সময় খুব কম।’ মৃত্যুঞ্জয় বলল।
    ‘সময় কম মানে? আমার দাদাকে খুঁজে পাওয়া গেছে?’
    তিস্তার এই প্রশ্নে অল্প বিষণ্ণতা চলে এলো মৃত্যুঞ্জয়ের মুখে। সেটা লক্ষ করলো তিস্তা।
    ‘কী হয়েছে, মৃত্যুঞ্জয়? আপনি চুপ কেন? জবাব দিন আমার প্রশ্নের।’
    ‘আপনি চলুন আমার সাথে। নিজের চোখেই সব দেখে নেবেন।’ কথা শেষ করে এগিয়ে গেলো মৃত্যুঞ্জয়। পেছন পেছন তিস্তা।
    হেঁটে যাওয়ার মতো সময় নেই। বাস স্ট্যান্ডে কিছু ভাড়ার ট্যাক্সি ছিলো, যেগুলো টুরিস্টদের ঘুরতে নিয়ে যায়। একটা ট্যাক্সি ভাড়া করলো মৃত্যুঞ্জয়। যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি চালককে যে ঠিকানাটা সে বলল, সেটা শুনে চমকে উঠল তিস্তা। ঠিকানাটা তাদের শাড়ির দোকানের ।
    ‘দোকানে যাবেন কেন আপনি?’ জিজ্ঞেস করলো তিস্তা।
    ‘আগে ট্যাক্সিতে বসুন।’
    মৃত্যুঞ্জয় প্রায় ধাক্কা দিয়ে তিস্তাকে ট্যাক্সিতে বসিয়ে নিজে তার পাশে বসলো।
    ‘একটু তাড়াতাড়ি যাবেন মশাই। সময় খুব কম।’
    ‘ব্যাপারটা কী, মৃত্যুঞ্জয়? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
    খানিক চুপ থেকে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো মৃত্যুঞ্জয়, তার পর বলল – ‘আমি কোলকাতা গিয়েছিলাম। এই কেসের গোপন রহস্য ভেদ করতে আমাকে সেখানে যেতেই হতো। শুরুতে সেই দোকানে গেলাম যেখান থেকে সুপ্রিয় কসমেটিক্স কিনতো।অনেক গোপন তথ্য সেখান থেকে উদ্ধার হলো। যখন কলকাতা গেলাম, তখন আরও একটা তথ্য জানবার ইচ্ছে হলো। তাই রওনা দিলাম বেলঘোরিয়ার উদ্দেশ্যে। সব তথ্য সংগ্রহ করার পর কোলকাতা থেকেই এখানকার থানায় ফোন করলাম। অনিচ্ছা সত্বেও থানার বড়বাবুকে নিজের পরিচয় দিতে হলো। যদি পরিচয় না দিতাম, তাহলে হয়তো কাজ হতো না।’
    ‘থানার বড় বাবু তো সুপ্রিয়র দোকান সার্চ করেছে। নীলকন্ঠদাকে আবার থানায় নিয়ে গিয়েছিল।’ তিস্তা বলল।
    ‘জানি। সেটা আমার ফোন করার আগে। কাল রাতে বড় বাবুর সাথে আমার কথা হয়েছে। এতক্ষণে হয়তো পুলিশ নিজের কাজ সেরে নিয়েছে।’
    মৃত্যুঞ্জয়ের মোবাইল বেজে উঠল। তিস্তা শুধু মৃত্যুঞ্জয়ের কথাগুলোই শুনতে পেলো।
    ‘ হ্যাঁ বড়বাবু, বলুন ….কী পেলেন? ওঃ .. তাহলে পেলেন তো …. ঠিক আছে .. আপনি এগোন , আমিও আসছি।’ ফোন রেখে দিলো মৃত্যুঞ্জয়।
    তিস্তার কাছে এখনও কিছুই পরিস্কার না। কী হচ্ছে এবং কী হতে চলেছে, কিছুই তার মাথায় আসছে না। এতো কিছু জানার তার দরকার নেই। তার শুধু প্রয়োজন নিজের দাদাকে নিয়ে। মৃত্যুঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করলো – ‘আমার দাদা কোথায়, মৃত্যুঞ্জয়? তার কোনো সন্ধান পেলে?’
    মৃত্যুঞ্জয় আড়চোখে তাকালো তিস্তার দিকে। বলল – ‘মনে আছে আপনার, সে দিন আপনার বাড়ি গিয়ে সুপ্রিয়র ঘর থেকে কিছু নেলপোলিশ ও কিছু লিপিস্টিক আমি নিয়েছিলাম? ‘
    ‘মনে আছে।’
    ‘ ওই নেলপোলিশ ও লিপিস্টিক আমি সাজগোজ করার জন্য নিশ্চই নিইনি। তার পেছনে কারণ ছিলো। যে কারণটা একটু পরেই আপনি জানতে পারবেন। ওই কারণের জন্যই আপনার দাদা নিরুদ্দেশ।’
    দোকান চলে এলো। এক দিক দিয়ে তাদের ট্যাক্সি ও অন্য দিক দিয়ে পুলিশের গাড়ি এক সাথে দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো। গ্রাহকের খুব একটা ভিড় দোকানে ছিলো না । দু-একটা গ্রাহক ছিলো ঠিকই, তাদের বিক্রম শাড়ি দেখতে ব্যস্ত ছিলো। এক দিক দিয়ে পুলিশের দল ও অন্য দিক দিয়ে তিস্তা এবং মৃত্যুঞ্জয়কে ঢুকতে দেখে সুধাকর এবং সুধাময় ঘোষাল চমকে গেলেন। সুধাময় বাবুর গলা থেকে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে গেলো – ‘আপনারা!’
    সুধাময় বাবুর কথার জবাব কেউ দিলো না।
    মৃত্যুঞ্জয় এগিয়ে গেলো বিক্রম পালিতের দিকে। তাকে বলল – ‘বিক্রম বাবু, আপনার বন্ধ ঘরের রহস্য ভেদ হয়ে গিয়েছে।’
    বিক্রম পালিত চমকে উঠল – ‘মানে?’
    ‘মানে আপনি জানেন না বুঝি? ঠিক আছে, মানে আপনাকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে থানায়।’
    ‘থ – থ – থানায় কেন? আ – আমি কী করেছি?’
    ‘কসমেটিক্সের ব্যাবসা তো সুপ্রিয় করতো। আপনার সেই বন্ধ ঘরে প্রায় কুড়িটা নেলপলিশের শিশি পাওয়া গেছে।’ বলল মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘তাতে কী হয়েছে? বাড়িতে নেলপোলিশ রাখা কী অন্যায়?’ এবার সুধাময় বাবু বললেন, গলার স্বর ঈষৎ উচ্চ।
    ‘না, একেবারেই অন্যায় না, যদি সেই নেলপোলিশ সামান্য নেলপোলিশ হয়। একটা নেলপোলিশের শিশির দাম যদি হাজার-হাজার টাকা হয়, তাহলে সেটা ভাবতে বাধ্য করে।’ মৃত্যুঞ্জয় বলল।
    ‘নেলপোলিশের শিশির দাম হাজার-হাজার টাকা!’ বিস্ময়ে কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে গেলো তিস্তার।
    ‘হ্যাঁ তিস্তা।’ মৃত্যুঞ্জয় বলল – ‘এক-একটা নেলপোলিশের দাম প্রায় পনেরো থেকে কুড়ি হাজার টাকা। এতো দামী নেলপোলিশের ব্যবসা আপনার দাদা করতো, সাথে বিক্রম পালিত। এইগুলা আদৌ নেলপোলিশ নয়, তিস্তা।’
    ‘তাহলে কী?’
    ‘এ গুলো ড্রাগস্।’
    ‘ড্রাগস্!’ তিস্তার সাথে অনেকেই চমকে উঠলেন।
    ‘হ্যাঁ। নেলপোলিশের শিশির পরীক্ষণ করানো হয়েছে। নেলপোলিশের শিশির ভেতর যে জিনিসটা পাওয়া গেছে, সেটাকে বলা হয়ে “লিক্যুইড হেরোইন”।
    মৃত্যুঞ্জয়ের কথা শুনে প্রত্যেকে থ।
    ‘তিস্তা, আপনার দাদা আপনার জামাইবাবুর সাথে মিলে ড্রাগসের ধান্দা করতো। আপনার দাদার কী হয়েছে, সেটা এবার বিক্রম বাবুই ভালো বলতে পারবেন। বিক্রম বাবু, আপনার বাড়ি থেকে যা পাওয়া গেছে সেটা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। কলকাতার যেখান থেকে আপনারা হেরোইন কিনতেন সেখানে অলরেডি নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্ট রেড মেরেছে। আপনার ও সুপ্রিয়র বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই, বাঁচবার আর কোনো উপায় নেই। এবার বলুন, সুপ্রিয় তো আপনার পার্টনার ছিলো, তাকে খুন করলেন কেন?’
    তিস্তার ও সুধাকর বাবুর আর কোনো সন্দেহ রইল না যে সুপ্রিয় আর এই দুনিয়াতে নেই । হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল তিস্তা ।
    মূর্তির ন্যায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বিক্রম পালিত। পুলিশের কিছু সিপাহী তাকে অ্যারেস্ট করতে যাবে , ঠিক সে সময় সুধাময় বাবু বলে উঠলেন – ‘দাঁড়ান। যদি খুনের কারণে অ্যারেস্ট করা হয়, তাহলে আমাকে করুন। সুপ্রিয়র হত্যা আমি করেছি।’

    সবাই থানাতে একত্র হয়েছে। দুটো পাশাপাশি চেয়ারে বসে বিক্রম ও সুধাময় ঘোষাল। তাদের দুজনকে ঘিরে আছে থানার বড় বাবু, মৃত্যুঞ্জয়, সুধাকর ঘোষাল এবং তিস্তা। সুধাময় বাবু বলছেন- ‘মানুষের জীবনে শুধু একটা জিনিসের প্রয়োজন, সেটা হলো টাকা। যার কাছে টাকা নেই, তার সমাজে কোনো মান-সম্মান নেই। মান-সম্মান ছিলো না বিক্রমের। আমার নিজের ভাই বিক্রমকে কোনো দিন সম্মান দিতে পারেনি। আমার মেয়ে নাকি বংশের মুখে চুনকালি মাখিয়েছে। আমি নিজের বড় মেয়ের বিরুদ্ধে কোনো দিন যাইনি। তাই বিক্রমকে বিয়ে করার তার সিদ্ধান্তটা অগত্যা আমাকে মানতেই হলো। আমার লক্ষ্য ছিলো বিক্রমকে তার সম্মান পাওয়ার যোগ্য করার। আর সম্মান মানুষে একটি জিনিসে পায়, টাকায়।’
    কথা শেষ করে থামলেন সুধাময় ঘোষাল। অল্প জল পান করে পুনরায় বলতে শুরু করলেন – ‘সে রাতে সুপ্রিয় কারুর সাথে ফোনে কথা বলছিলো। আমি তাদের কথা আড়াল থেকে শুনেনি। ড্রাগসের ব্যাপারে কথা হচ্ছিলো তাদের। আচমকা আমাকে দেখে সুপ্রিয় ভয় আঁতকে ওঠে। ঠিক তখনই আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেললো। আমি সুপ্রিয়কে বললাম যে আমি টাকা ইনভেস্ট করবো। শর্ত এটাই যে এই ব্যবসাতে বিক্রমকেও নিতে হবে। কোলকাতার মার্কেটের সাথে সুপ্রিয়র ভালো পরিচয় ছিলো। সে ওখানে থেকে মাল নিয়ে আসতো, এখানে বিক্রি করার দায়িত্ব ছিলো বিক্রমের। মাঝে মাঝে বিক্রমকেও যেতে হতো কলকাতা। বেশ সুন্দর চলছিলো সব কিছু। বিক্রমের ভালো অর্থ রোজগার হচ্ছিলো। স্বচ্ছন্দে চলছিলো আমার মেয়ের সংসার। এক দিন হঠাৎ সুপ্রিয় বলল সে নাকি এ ধান্দা করবে না আর। এবার নাকি সে সাধু পুরুষ হয়ে থাকবে। আমি তাকে বোঝালাম যে সে যদি না করে, না করুক। কোলকাতার মার্কেটের সাথে ভালো পরিচয় করিয়ে দিক বিক্রমের। কিন্তু সেটাও সে করালো না। কোলকাতায় গিয়ে সে বলে এলো যে তার আর মাল চাই না। যা পেমেন্ট বাকি ছিলো, সব দিয়ে এলো। আমি আর বিক্রম মিলে কোলকাতার মার্কেটের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু বাধা সৃষ্টি করলো সুপ্রিয়। অগত্যা তাকে পথ থেকে সরানো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না।’
    ‘শালা বেইমান …. তুই ভাই না শত্রু আমার? ‘সুধাময়ের দিকে তেড়ে গেলেন সুধাকর ঘোষাল। থানার বড় বাবু, তিস্তা ও মৃত্যুঞ্জয় মিলে তাকে আটকালো।’
    ‘কুপথে তো অনেকেই যায়, কিন্তু নিজের ভুল বুঝে যে সুপথে আসতে চায় , তাকে আসতে দেওয়া উচিত । আপনি তাকে সুপথে আসতে দেননি, সুধাময় বাবু। এর শাস্তি তো আপনাকে পেতে হবেই। সুপ্রিয়র লাশ কোথায় লুকিয়েছেন, সেটা বলবেন কী?’ কথা শেষ করে মৃত্যুঞ্জয় তিস্তা ও সুধাকর ঘোষালের দিকে তাকালো। দুজনেরই চোখ দিয়ে বয়ে চলেছে অফুরন্ত অশ্রু ধারা।
    সকাল প্রায় দশটা বাজে। নিজের ঘরে ব্যাগ প্যাক করে ব্যস্ত মৃত্যুঞ্জয়। হঠাৎ পেছন থেকে তিস্তার কন্ঠস্বর শুনতে পেলো সে।
    ‘কোথাও যাচ্ছেন?’
    পেছন দিকে তাকিয়ে দেখলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘যেতে হবে।’
    ‘কোথায়?’
    ‘দেখি কোথায় যাই।’
    ‘মানে? কতো দিনের জন্য যাবেন?’
    ‘ফিরে আসবো কিনা সন্দেহ আছে।’
    চমকে উঠল তিস্তা।
    তিস্তার দিকে এগিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বলল – ‘তিস্তা, আমার পরিচয় যত গোপন থাক, ততোই ভালো। আমার অতীত খুব একটা ভালো না। আমি এখানে নিজের পরিচয় লুকিয়েই ছিলাম। এখানে যখন অনেকে আমার আসল পরিচয় জেনে গেছে, তখন আর এখানে থাকা চলবে না আমার। দুঃখ শুধু এটাই রয়ে গেলো যে আপনার দাদাকে ফিরিয়ে দিতে পারলাম না।’
    ‘আপনি যেটা করলেন সেটা কিছু কম নয়। খারাপ লাগছে আমার। আমার জন্য আপনাকে নিজের ঠাঁই ছাড়তে হলো। একটা প্রশ্ন আপনাকে জিজ্ঞেস করি?’
    ‘অবশ্যই।’
    ‘কলকাতা গিয়ে আপনি কী এমন তথ্য পেলেন যার ভিত্তিতে এটা বুঝলেন যে বিক্রম পালিত দোষী?’
    অল্প হাসলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘জানতে চান? খুব একটা কঠিন ছিলো না। সুপ্রিয় কলকাতায় যেখান থেকে কসমেটিক্স কিনতো সেখানে গেলাম। ঠিকানাটা নীলকন্ঠ দিয়েছিল। সেখান থেকে যখন খুব বেশি তথ্য পাওয়া গেলো না তখন এক কর্মচারীকে আড়ালে কিছু টাকা দিয়ে গোপন তথ্য জানবার চেষ্টা করলাম। যেখান থেকে সুপ্রিয় লিক্যুইড হেরোইন কিনতো সেখানকার ঠিকানা পেলাম। সেই কর্মচারী নাকি সুপ্রিয়কে এই ধান্দার প্রলোভন দিয়েছিল। যাই হোক, কলকাতার নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্টকে খবর দিয়ে সেখানে গেলাম। যেখান থেকে জানতে পারলাম যে সুপ্রিয়র সাথে মাঝে মাঝে এক অন্য লোকও আসতো সেখানে। কে সে? সুপ্রিয় যে একলা কোলকাতা যেতো না সেটা সুপ্রিয়র ঘরে সে দিন জানতে পেরেছিলাম। ডাস্টবিন থেকে একটা ট্রেনের টিকিটের টুকরো পাই আমি। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শেয়ালদা, দার্জিলিং মেল। টিকিটে দুটো বার্থ রিসার্ভ করার উল্লেখ ছিলো। তাই বলা হয়ে ম্যাডাম, কোনো জিনিসকে তুচ্ছ ভাবতে নেই।” যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই। পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।” যাই হোক, সেই ঠিকানা থেকে যারা, যারা ড্রাগ কিনতো তাদের ভিডিও করে রাখতো এক জন নিজের মোবাইলে। সেখান থেকে সুপ্রিয় ও বিক্রমের ভিডিও পেলাম। বেলঘোরিয়া, বিক্রমের পৈতৃক বাড়ি গিয়ে জানতে পারলাম যে তার বাবারা তিন ভাই। দু’ভাই এখনও বেলঘোরিয়াতেই থাকে। সুদের ব্যবসা ছিলো তাদের। এক দিন বিক্রমের বাবা বেশ কিছু টাকার হেরফের করে সেখান থেকে স্বপরিবারে উধাও হয়ে যায়। কিছু জিনিস শুরুতেই মনে খটকা দিয়েছিল আমায়। প্রথম তো বিক্রমের সাথে দেখা করার কথাতে সুধাময় বাবুর বাধা দেওয়া, এবং দ্বিতীয় বিক্রমের দরকার থেকে বেশি আপ্যায়ন করা।’
    কথা শেষ করে থামলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘তার মানে সে দিন দাদা আর নীলকন্ঠদার মধ্যে কি ড্রাগ নিয়েই ঝামেলা হয়েছিল?’
    ‘একদম ঠিক। নীলকন্ঠ জানতে পারে যে তাদের কসমেটিক্সের সাথে ড্রাগও আনা হচ্ছে। পুলিশকে খবর দিয়ে তাদের ধরিয়ে দেওয়ার ধমকি দেয় সে। তাই এতো আপসেট থাকতো আপনার দাদা। ‘
    মৃত্যুঞ্জয়ের বেরোবার সময় চলে এলো। তিস্তা তাকে ছাড়তে গেলো বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত। ইচ্ছে করলো, মানা করুক মৃত্যুঞ্জয়কে যেতে। কিন্তু যে যেতে চায়, তাকে কেউ আটকাতে পেরেছে?
    ‘যেখানেই থাকুন, যোগাযোগ রাখবার অনুরোধ রইল।’ বিষাদে ভরা মুখে তিস্তা বলল।
    জবাবে শুধু অল্প হাসলো মৃত্যুঞ্জয়।
    বাস ছেড়ে দিলো । যতক্ষণ বাসকে দেখা যায়, দেখতে থাকলো তিস্তা ।

    =সমাপ্ত=

  • ধারাবাহিক

    যেখানে দেখিবে ছাই (পর্ব -২)

    যেখানে দেখিবে ছাই  (পর্ব-২) 
    -বিশ্বদীপ মুখার্জী

    মৃত্যুঞ্জয়ের এই কথায় এবার সুধাময় বাবু এগিয়ে এলেন। বললেন – ‘তার সাথে দেখা করা কি খুব প্রয়োজন?’
    ‘কেন? আপনার কোনো আপত্তি আছে তাতে?’ মৃত্যুঞ্জয়ের তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ।
    ‘না-না, আপত্তি হবে কিসের? দেখা করতেই পারেন। আসলে সে খুব লাজুক স্বভাবের আর কি।’ সুধাময় বাবু বললেন।
    ‘ছেলেদের লাজুক স্বভাব মানায় না সুধাময় বাবু। সেটা মেয়েদের আভূষণ। বিক্রম বাবুর ঠিকানাটা দেবেন।’
    সুপ্রিয় ও নীলকন্ঠের দোকানটা বেশ সাজানো। গ্রাহক ছিলো না, নীলকন্ঠ হিসেবের খাতা খুলে কিছু হিসেব মেলাতে ব্যস্ত।
    ‘আপনার পার্টনার তো নেই। একলা-একলাই হিসেব মেলাচ্ছেন?’
    অচেনা কন্ঠস্বর শুনে চমকে ঘাড় উঠিয়ে তাকালো নীলকন্ঠ। খানিক ভ্রুকুটি করে দেখলো, তার পর জিজ্ঞেস করলো – ‘আপনার পরিচয়?’
    ‘বিস্তৃত পরিচয় দেওয়ার মতো সময় নেই নীলকন্ঠ বাবু। আপনার জন্য এটুকু জানাই প্রয়োজনীয় যে আমি সি.আই.ডির লোক।’ সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলো মৃত্যুঞ্জয়।
    সি.আই.ডি.র নাম শুনে ঈষৎ ঘাবড়ে গেলো নীলকন্ঠ। হঠাৎ সি.আই.ডি. তার দোকানে! তাহলে কি সুপ্রিয়র বাবা তার ছেলেকে খোঁজার জন্য সি.আই.ডি. লাগিয়েছেন? পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নীলকন্ঠ বলল – ‘আপনার এখানে কী প্রয়োজন সেটা বুঝলাম না তো।’
    অট্টহাস্য করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘আমার এখানে কী প্রয়োজন হতে পারে নীলকন্ঠ বাবু? আপনার বন্ধু, আপনার বিজনেস পার্টনার সুপ্রিয় তো নিরুদ্দেশ। যতো দিন না সে ফেরত আসে, এই দোকানের আপনি তো মালিক। আর যদি সে ফেরত নাই আসে তাহলে তো আপনি রাজা, মশাই।’
    ‘আপনি বলতে কী চান?’ ঈষৎ গাম্ভীর্যের স্বরে নীলকন্ঠ প্রশ্ন করলো।
    ‘পঞ্চাশ শতাংশ পুঁজি লাগিয়ে একশো শতাংশের মালিক হওয়াটা খারাপ আইডিয়া নয়।’
    মৃত্যুঞ্জয়ের এই কথায় প্রায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো নীলকন্ঠ।
    ‘আপনি বলতে চান আমি সুপ্রিয়র খুন করে তার লাশ লুকিয়ে রেখে দিয়েছি?’
    ‘আমি তো এমন কিছুই বলিনি মশাই। আমি তো এই সবে তদন্ত শুরু করেছি। যখন তদন্ত চলে তখন প্রত্যেককে সন্দেহ করাটা আমার কাজ। এমন কি সন্দেহের লিস্ট থেকে সুপ্রিয় নিজেও বাদ যায়নি।’
    এ আবার কেমন বিচিত্র কথা। যার বিষয় তদন্ত চলছে, সে নিজেও সন্দেহের লিস্টে আছে? সত্যি, গোয়েন্দাদের মাথার ঠিক থাকে না। মুচকি হেসে নীলকন্ঠ বলল – ‘বলুন, কী জানতে চান।’
    ‘কসমেটিক্সের ব্যবসা করার প্ল্যানটা আপনার ছিলো না সুপ্রিয়র?’
    ‘ সুপ্রিয়র। তবে আমি এক কথায় রাজি হয়েছিলাম। আমার এক দূর সম্পর্কের মামা কসমেটিক্সের ব্যবসা করে বড়লোক হয়েছে। আজ তার নিজের বাড়ি , গাড়ি সব আছে, ওই ব্যবসার দৌলতে। তাই যখন সুপ্রিয় প্রস্তাবটা আমার কাছে রাখলো, আমি না করতে পারলাম না।’
    ‘ব্যবসাটা কতো দিনের?’
    ‘প্রায় দু’ বছর হলো।’
    ‘কোলকাতা গিয়ে মাল নিয়ে আসেন, না কোলকাতা থেকে অর্ডার করে মাল আনান?’
    ‘প্রত্যেক পনেরো দিনে এক বার করে কোলকাতা যাওয়া হয়ে। সেটা সুপ্রিয় নিজে যেতো।’
    ‘আপনি যেতেন না কেন?’
    ‘কোলকাতার হোলসেল মার্কেটে সুপ্রিয়র জানাশোনা আছে। তাই সস্তায় মাল পেতাম আমরা।’
    দোকানের চারিপাশে এক বার ভালো করে চোখ ঘুরিয়ে মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করলো- ‘বিক্রি তো ভালোই হয় বলে মনে হচ্ছে। তাই না?’
    দু’হাত জোর করে নীলকন্ঠ বলল- ‘ঈশ্বরের কৃপা।’
    ‘কার কৃপা সেটা পরে বোঝা যাবে। আচ্ছা, কোলকাতা সুপ্রিয় কি একলা যেতো?’
    ‘হ্যাঁ। আর কে যাবে সাথে? নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং মেল ধরতো। সেই ট্রেনেই ফিরে আসতো। আমি স্টেশানে গিয়ে তাকে রিসিভ করতাম। ফেরার সময় মাল থাকতো, তাই যেতাম আর কি।’
    নীলকন্ঠ শুরুর দিকে যে ঘাবড়ে গিয়েছিল, তার থেকে অনেকটাই সামলে উঠেছিল।
    ‘যে দিন সুপ্রিয় নিরুদ্দেশ হয়, সে দিন তার আচরণ কেমন ছিলো?’
    খানিক চিন্তা করে নীলকন্ঠ বলল- ‘তার দুু’ দিন আগে থেকেই সে কেমন যেন বদলে গিয়েছিল। বেশি কথা বলতো না। আমি ভাবলাম শরীর খারাপ হবে হয়তো। জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু মন মাফিক উত্তর পেলাম না।’
    ‘আপনাদের মাল রাখার জায়গা কোথায়? মানে কোলকাতা থেকে মাল এনে রাখেন কোথায়?’
    ‘এই দোকানে গোডাউন বলে কিছু নেই। আমার বাড়িতে জায়গার অভাব। তাই সুপ্রিয় নিজের বাড়িতেই রাখতো।’
    ‘দোকান সার্চ করতে পারি কী?’
    ‘অবশ্যই পারেন। কিন্তু সার্চ ওয়ারেন্ট লাগবে।’
    মুচকি হাসলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘ভেরি স্মার্ট।’ উঠে দাঁড়ালো সে – ‘এখানকার মতো আসি। দরকারে আবার আসবো।’
    দোকান থেকে বেরিয়ে সময় দেখলো মৃত্যুঞ্জয়। ধীরে-ধীরে বেলা বাড়ছে। এবার কোন দিকে যাওয়া যেতে পারে? থানা না বিক্রম পালিতের বাড়ি?

    থানায় গেলো না মৃত্যুঞ্জয়। থানায় যথা সময় যাওয়া যাবে, এখন গিয়ে লাভ নেই। বিক্রম পালিত এখন নিশ্চই নিজের বাড়িতে হবে না। ঘোষালদের দোকান খোলার সময় হয়ে গেছে, বিক্রম পালিত দোকানের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে হবে। তাই এখন সব থেকে ভালো কাজ বাড়ি ফিরে যাওয়া। বাড়ি গিয়ে মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা করা যাবে যে আগামী পদক্ষেপ কী নেওয়া যেতে পারে।
    বাড়ি গিয়ে অবাক হলো মৃত্যুঞ্জয়। সে দেখলো দীনবন্ধু বাবুর সাথে তাঁর ঘরে বসে গল্প করছে তিস্তা। মৃত্যুঞ্জয়কে দেখে উঠে দাঁড়ালো সে। লঘু কদমে এগিয়ে এলো তার দিকে।
    ‘কিছু কথা বলার ছিলো আপনার সাথে। এসে দেখলাম আপনি ফেরেননি। তাই কাকুর সাথে বসে গল্প করছিলাম।’ তিস্তা বলল মৃত্যুঞ্জয়কে ।
    ‘ওপরে আসুন।’ মৃত্যুঞ্জয় দু’তলায় নিজের ঘরের দিকে এগোলো। পেছন-পেছন তিস্তা।
    তিস্তাকে চেয়ারে বসতে দিয়ে নিজে ঘরের একটি মাত্র জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো মৃত্যুঞ্জয়। জানালা খুলে দিলো। সূর্যের আলো প্রবেশ করলো ঘরে। জ্যাকেটের পকেট থেকে সিগারেটের ডিবে ও লাইটার বার করে একটা সিগারেট ধরিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বলল- ‘বলুন।’
    ‘সব থাকে আগে তো আমি কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি আপনাকে। আপনি আমায় সাহায্য করছেন, এটা আমার জন্য বিরাট প্রাপ্তি। একটা আরও কথা আপনাকে বলতে চাই, যেটা কাল বলা হয়েনি।’
    ‘কী কথা?’ সিগারেটে একটা টান দিয়ে জিজ্ঞেস করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘কিছু দিন আগেকার কথা।’ তিস্তা বলতে শুরু করলো- ‘দাদা আর নীলকন্ঠদার মধ্যে চরম অশান্তি হয়েছিল। কী ব্যাপারে, সেটা জানি না। দাদার সাথে একটা দরকারী কাজ ছিলো আমার। তাই দাদার দোকানে আমি যাই। গিয়ে দেখি দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছে। গলার স্বর দু’জনেরই উঁচু। আমায় দেখে দুজনেই শান্ত হয়ে গেলো। ঘটনার ঠিক দু’দিন পর দাদা কোথাও চলে গেলো। আমি ভাবলাম কলকাতা গেছে হবে, দোকানের জিনিসপত্র আনতে। দাদা চার দিন পর ফিরলো, খালি হাতে। দোকানের জিনিসপত্র দাদা ট্রেন থেকে নেমে সোজা বাড়ি তেই নিয়ে আসে। কিন্তু সে বার কোনো জিনিস আনেনি। কারণ জিজ্ঞেস করাতে বলল যে সে নাকি জিনিস আনতে যায়নি। কিছু টাকা বাকি ছিলো, সেটা পেমেন্ট করতে গিয়েছিল। কিন্তু দাদা সর্বদা ব্যাংকের মাধ্যমেই পেমেন্ট করতো। আমার খটকা লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু এ বিষয় দাদাকে আর কোনো প্রশ্ন করিনি।’
    নিজের কথা শেষ করলো তিস্তা।
    ‘ঘটনাটা গত কাল যদি জানাতেন তাহলে বেশি ভালো হতো। আপনার দাদা কসমেটিক্সের সব জিনিস কলকাতার কোন দোকান থেকে কিনতো সেটা কি আপনার জানা আছে?’
    ‘না। সেই বিষয় কোনো ইনফরমেশন আমার কাছে নেই।’
    তিস্তার চলে যাওয়ার পর মৃত্যুঞ্জয় অনেকক্ষণ নিজের ঘরে বসে থাকলো। নেলপলিশের শিশিগুলো বেশ ভালো করে পরীক্ষণ করলো। তার পর একটা ফোন করে সন্ধ্যের অপেক্ষা করতে লাগলো ।
    সন্ধ্যে সাত টা নাগাদ ঘোষালদের দোকান বন্ধ হয়ে যায়। তাই প্রায় সাতটা তিরিশ নাগাদ মৃত্যুঞ্জয় বিক্রম পালিতের বাড়ি পৌঁছালো। দুটো ঘরের একতলা অতি সাধারণ বাড়ি। স্বামী-স্ত্রী একটা ঘরে থাকে, দ্বিতীয়টি বন্ধ থাকে। বেশ পুরুষালী চেহারা বিক্রম পালিতের, সাথে মিশুকে। অবাক লাগলো মৃত্যুঞ্জয়ের। সুধাময় বাবু তো অন্য কথা বলেছিলেন। বিক্রম নাকি লাজুক। এ তো বিক্রমের এক অন্য রূপ দেখলো মৃত্যুঞ্জয়। সুধাময় ঘোষালের জ্যেষ্ঠা পুত্রী শ্রাবন্তী নিজেও খুব মিশুকে। মৃত্যুঞ্জয়ের আপ্যায়ন বেশ ভালোই হলো সেখানে।
    মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দিয়ে বিক্রম বলল- ‘আমি ভাবলাম আপনি হয়তো সকালেই আসবেন। তাই দোকানে দেরি করে গেলাম।’
    মৃত্যুঞ্জয় সেই কথার কোনো জবাব না দিয়ে তাকে প্রশ্ন করলো- ‘সুপ্রিয়র সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিলো?’
    ‘খুবই ভালো। এমনই তো বেশি দেখা হতো না তার সাথে, কিন্তু যখনই দেখা হতো হেসে কথা বলতো। খুব হাসি মুখী ছেলে, আর তেমনই মেহনতী।
    ‘আপনার বাড়ি কোথায়?’ মৃত্যুঞ্জয়ের দ্বিতীয় প্রশ্ন।
    ‘কুচবিহারের দিকে। আর যদি পৈতৃক বাড়ি জিজ্ঞেস করেন, ্ সেটা বেলঘরিয়া তে।’
    ‘বেলঘরিয়া মানে সেই দমদমের পরের স্টেশন?’
    ‘আজ্ঞে। আপনি তো জানেন দেখছি।’ এক গাল হেসে বিক্রম বলল।
    ‘কেউ থাকে সেখানে?’
    ‘থাকে বৈকি। আমার দুই কাক এবং তাদের পরিবার।’
    ‘যাতায়াত আছে?’
    এক দীর্ঘস্বাস ফেলে বিক্রম বলল – ‘বহু দিন যাওয়া হয়নি। ছোটো বেলায় এক বার গিয়েছিলাম, মনে আছে। সেটাই শেষ। আমার বাবা চা বাগানে কাজ পেয়ে চলে আসেন এদিকে। তবে থেকে আমরা উত্তর বঙ্গবাসী হয়ে গেছি।’
    ‘যাতায়াত নেই কিন্তু যোগাযোগ তো হবে?’
    ‘হুম, তা আছে। আজকাল ফেসবুক আর হোয়াটস’অ্যাপের দৌলতে যোগাযোগ করাটা বিশেষ বড় ব্যাপার না।’
    ইতিমধ্যেই শ্রাবন্তী কিছু জলখাবার নিয়ে এলো। কিছু লুচি ও তরকারি। খাবারের থালাটা মৃত্যুঞ্জয়ের সামনে রেখে নিজে বিক্রমের পাশে গিয়ে বসলো। মৃত্যুঞ্জয়ের উদ্দেশে বলল- ‘আমাদের পরিচয় দার্জিলিং এ। সেখানে ঘুরতে গিয়েছিলাম। প্রথমে বন্ধুত্ব, তার পর প্রেম। যা হয় আর কি। দার্জিলিং এর চা বাগানের অবস্থা যে খুব ভালো না সেটা হয়তো আপনি জানেন। বিক্রমের রোজগার খুব একটা ভালো হতো না সেখানে। আর এদিকে আমি তো প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। বিয়ে করবো তো একেই। শেষে আমার জেদের সামনে হার মেনে বাবা নিজের দোকানে কাজ করার প্রস্তাবটা দেয়। তবে থেকে বিক্রম এখানেই আছে।’
    শ্রাবন্তী বেশ খোলা মনে কথা গুলো বলে গেলো।
    ‘আপনারা ওই বাড়িতেই তো থাকতে পারতেন?’ প্রশ্ন করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ঈষৎ বিষন্ন হয়ে গেলো শ্রাবন্তীর মুখ।
    ‘পারতাম। কিন্তু আমার কাকার আপত্তি ছিলো। কাকা শুরু থেকেই এই বিয়ের বিরুদ্ধে।’
    যে ঘরে তারা বসে ছিলো, সেই ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়ার পথ। দরজায় তালা।
    ‘ওই ঘরটা কি বন্ধ থাকে?’ জিজ্ঞেস করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘হ্যাঁ। আমাদের একটা ঘরেই কাজ চলে যায়। যদি কোনো দিন গেস্ট আসে, তাহলে তাদের ওই ঘরে থাকতে দিই।’ শ্রাবন্তী বলল।
    খাওয়া শেষ করে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো মৃত্যুঞ্জয়। যাওয়ার আগে বিক্রম থেকে নিয়ে নিলো তাদের পৈতৃক বাড়ির ও কুচবিহারের বাড়ির ঠিকানা।
    মৃত্যুঞ্জয়ের সাথে দেখা হওয়ার পর থেকেই তিস্তার মন মেজাজ খুব একটা ভালো ছিলো না। নিজের নিরুদ্দেশ ছেলের শোকে তার মায়ের শরীর দিনে-দিনে অবনতির দিকে এগোচ্ছে। সুধাকর বাবু ইতিমধ্যেই বেশ কিছু বার থানার চক্কর লাগিয়ে নিয়েছেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বড় বাবুর এক কথা- ‘আমরা খুঁজছি।’
    পর দিন সকালে মৃত্যুঞ্জয়ের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে তিস্তা দীনবন্ধু বাবুর বাড়ির দিকে রওনা দিলো। তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যখন দীনবন্ধু বাবুর কাছে সে জানতে পারলো যে মৃত্যুঞ্জয় আজ ভোরে কোথাও চলে গেছে। কোথায় গেলো মৃত্যুঞ্জয়? তাহলে কি সে আর তিস্তাকে সাহায্য করবে না? পুলিশের ওপর তিস্তার শুরু থেকেই বিশ্বাস ছিলো না। চারিপাশে নিবিড় অন্ধকারের মধ্যে স্নিগ্ধ আভা হয়ে ফুটে উঠেছিল মৃত্যুঞ্জয়ের আবির্ভাব। কিন্তু সেই আভাটাও এখন নিরুদ্দেশ। তিস্তার মুখ আরো ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। দীনবন্ধু সরকার তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- ‘চিন্তা করিস না, মা। মৃত্যুঞ্জয় ঠিক ফিরে আসবে। আমি তাকে বহু বছর ধরে চিনি। তখন আমরা কলকাতায় থাকতাম। আমার মেয়ের খুন হয়ে গিয়েছিল। সেই কেসটা মৃত্যুঞ্জয় তদন্ত করেছিল। আমি আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম যে আমার মেয়ের খুনি কোনো দিন ধরা পরবে। কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় হাল ছাড়েনি। খুনিকে আদালত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল মৃত্যুঞ্জয়। আমি জানি, যে দায়িত্ব সে নেয় সেটা পুরো না করা অবধি সে শান্তি পায়ে না। চিন্তা করিস না, মৃত্যুঞ্জয় ঠিক ফিরে আসবে।’

    দু’দিন ধরে মৃত্যুঞ্জয়ের কোনো খোঁজখবর নেই। তিস্তা অনবরত তাকে ফোন করে চলেছে, কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। মৃত্যুঞ্জয়ের ফোনের সুইচ অফ। মৃত্যুঞ্জয়ের ওপর থেকে ধীরে-ধীরে আস্থা হারিয়ে ফেলছিল তিস্তা। এর মধ্যে পুলিশ অল্প সক্রিয় হয়েছে। কসমেটিক্সের দোকান তোলপাড় করে রেড মারলো পুলিশ। কিছুই পেলো না সেখান থেকে। আবারও নীলকন্ঠকে থানায় উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। জেরা করা হলো বেশ অনেকক্ষণ। নতুন তথ্য কিছুই পেলো না পুলিশ। অগত্যা ছেড়ে দিতে হলো নীলকন্ঠকে। থানার বড় বাবু সুধাকর ঘোষালকে বললেন- ‘ওই নীলকন্ঠই গণ্ডগোল করেছে। কোনো প্রমাণ পাচ্ছি না তাই ছেড়ে দিতে হচ্ছে। শালা, দোকানের একলা মালিক হওয়ার ফিকিরে আছে। কিন্তু আমি যত দিন আছি, সেটা সম্ভব হতে দেবো না।’

  • ধারাবাহিক

    যেখানে দেখিবে ছাই (পর্ব -১)

    যেখানে দেখিবে ছাই (পর্ব – ১)
    -বিশ্বদীপ মুখার্জী

    অন্য দিনের তুলনায় একটু তাড়াতাড়ি ফিরে এলো মৃত্যুঞ্জয়। একে তো প্রচণ্ড ঠান্ডা, তায় আবার অল্প-অল্প বৃষ্টি। রোজ সকাল-বিকেল এদিক- ওদিক ঘুরতে যাওয়া তার অভ্যেস। ইভিনিং ওয়াক করার সাথে-সাথে রাত্রি আহারের ব্যবস্থাও সে করে নেয়। হোটেলের খাবার খেতে খুব একটা পছন্দ সে করে না। তাই কিছু সব্জী কিনে বাড়িতেই রান্না করে সে। কিন্তু আজ সেটা সম্ভব হলো না। বাজার খুব ভালো বসেনি আজ, বৃষ্টির দরুণ। অগত্যা হোটেল থেকেই খাবার প্যাক করে নিয়ে আসতে হলো তাকে ।
    বাড়িটা দু’তোলা, কিন্তু ছোটো। নিচের তলায় বাড়িওয়ালা থাকেন নিজের অসুস্থ স্ত্রীর সাথে, ওপরে একটি মাত্র ঘরে মৃত্যুঞ্জয়।
    সিঁড়ি দিয়ে দু’তলায় উঠবার সময় নিজের ঘর থেকে বাড়ির মালিক দীনবন্ধু সরকার বেরিয়ে এলেন। বয়স ষাটের ওপর, কিন্তু দেহ এখনও বলিষ্ঠ। তাঁর বয়সের অনুমান লাগানো যেতে পারে মাথার পাকা চুল দেখে। মৃত্যুঞ্জয়কে বললেন – ‘তোমার সাথে কিছু কথা আছে, মৃত্যুঞ্জয়।’
    মৃত্যুঞ্জয় ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো দীনবন্ধুর দিকে।
    ‘কী কথা বন্ধু ?’
    দীনবন্ধু মৃত্যুঞ্জয় থেকে বয়সে প্রায় পঁচিশ বছরের বড়, কিন্তু তাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্বের থেকে কিছু কম না। দীনবন্ধু নামটা মৃত্যুঞ্জয়ের বেশ বড় লাগে। তাই সেটাকে ছোটো করে ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করে সে।
    ‘ আমার ঘরে এসো। ‘
    দীনবন্ধুর সাথে – সাথে মৃত্যুঞ্জয় তাঁর ঘরে ঢুকলো। ঘর বেশ বড় না। আসবাব-পত্র একটু বেশি তাই ঘরটা আরও ছোটো মনে হয়ে। ঘরের মাঝে খাট পাতা, তাতে শুয়ে আছেন দীনবন্ধু বাবুর অসুস্থ স্ত্রী। মৃত্যুঞ্জয়কে একটা চেয়ারে বসতে দিয়ে দীনবন্ধু বাবু নিজে খাটে বসলেন। অতঃপর শুরু হলো তাদের বার্তা।
    ‘ মৃত্যুঞ্জয়, আমি তোমায় কথা দিয়েছিলাম যে তোমার পরিচয় আমি কাউকে দেবো না। কিন্তু আপসোস এটাই যে নিজের কথা আমি রাখতে পারলাম না।’ ঘাড় হেঁট করে দীনবন্ধু সরকার বললেন।
    ‘মানে!’ চমকে উঠলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘আমি বলতে বাধ্য হলাম। যাকে বলেছি,তার হয়তো তোমাকে প্রয়োজন।’
    ‘আমি তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না, বন্ধু ‘ মৃত্যুঞ্জয় বলল।
    দীনবন্ধু বাবু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন – ‘সুধাকর ঘোষাল আমার পুরনো বন্ধু। দু’ দিন থেকে তার ছেলে নিখোঁজ। সুধাকরের মেয়ের সাথে আজ সকালে বাজারে দেখা হলো। কথা হলো বেশ কিছুক্ষণ। রুমি নাম তার, ভালো নাম- তিস্তা ঘোষাল। তার সন্দেহ তার দাদাকে হত্যা করা হয়েছে। প্রমাণের অভাবে কিছু করতে বা বলতে পারছে না সে। পুলিশ কতো দূর কী করবে, সেটা জানা নেই। তাই সে নিজেই এই ব্যাপারে তদন্ত করতে চাইছে। কথাটা শুনে ভয়ে আমার তো অবস্থা খারাপ। খুনের তদন্ত যে কতোটা কঠিন সেটা জানা আছে আমার। রুমির বয়সই বা কতো, যে ও খুনের তদন্ত করবে? তাই বাধ্য হয়ে আমি তোমার কথা ওকে বললাম। খানিক পরে সে আসবে এখানে, তোমার সাথে দেখা করতে।’
    থামলেন দীনবন্ধু বাবু।
    ‘তার দাদাকে যে খুন করা হয়েছে, এই সন্দেহটা কী করে হয়ে তার?’ মৃত্যুঞ্জয় প্রশ্ন করলো।
    সাথে-সাথে বাইরে থেকে এক জনের মিহিন কন্ঠ শোনা গেলো।
    ‘কাকু, আছো কী?’
    দীনবন্ধু বাবু ঘর থেকে বেরোলেন। খানিক পর যখন ঘরে ঢুকলেন, তাঁর সাথে ছিলো এক যুবতী। বয়স আন্দাজ কুড়ির কাছাকাছি। বেশ ভালোই লম্বা। পরনে জিন্স টপ, সাথে এক ছাতা। মৃত্যুঞ্জয়ের বুঝতে সময় লাগলো না যে এই রুমি ঊরুফে তিস্তা ঘোষাল।

    দীনবন্ধু বাবুর অসুস্থ স্ত্রীর কারণে সেখানে বসে কথা বলা সম্ভব ছিলো না। তাই সবাই মিলে মৃত্যুঞ্জয়ের ঘরে একত্র হলো। ছোট্টো ঘর। একটা কাঠের আলমারি ছাড়া একটা খাট এবং একটা চেয়ার ঘরে, সাথে ছোটো একটা গ্যাস এবং কিছু বাসনপত্র। খাটে দীনবন্ধু বাবু ও তিস্তা উপবেশন করলো, চেয়ারে বসলো মৃত্যুঞ্জয়। তিস্তার কিছু বলার আগেই মৃত্যুঞ্জয় তাকে জিজ্ঞেস করলো – ‘আপনার সন্দেহ কী করে হয়ে যে আপনার দাদাকে খুন করা হয়েছে?’
    শুরুতেই প্রশ্নের ধাক্কা খেয়ে ঈষৎ ঘাবড়ে গেলো তিস্তা। ঢোঁক গিলে এক বার দীনবন্ধু বাবুর দিকে তাকালো, পরক্ষণেই মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে বলল- ‘আমার দাদা খুব হাসিখুশি মানুষ। সারা দিন অনবরত কথা বলে যেতো আর নিজের আশেপাশের লোকেদের হাসিয়ে যেতো। দাদার অন্তর্ধান হওয়ার দু’তিন দিন আগে থেকে সে কেমন চেঞ্জ হয়ে গিয়েছিল। বেশি কথা বলতো না, সারা দিন প্রায় গুম হয়ে থাকতো।’

    ‘কারণ জিজ্ঞেস করেননি?’
    ‘করেছিলাম। আমাকে শুধু বলল যে কাজের চাপ আছে।’ তিস্তা বলল।
    ‘কী কাজ করতো আপনার দাদা?’
    ‘ব্যাবসা করতো। দাদা আর তার একটা বন্ধু নীলকন্ঠদা মিলে একটা ব্যাবসা শুরু করেছিল। কসমেটিক্স-এর দোকান খুলে ছিলো একটা। দোকানটা খারাপ চলতো না।’
    ‘দোকানটা তার মানে এখন নীলকণ্ঠদার দায়িত্বে?’ জিজ্ঞেস করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
    ‘ঠিক আছে। এবার নিজের বাড়ির সম্বন্ধে কিছু বলুন। মানে আপনার বাড়িতে কে, কে আছে ? ‘
    ‘আমাদের বাড়িতে দুটো পরিবার।’ তিস্তা বলতে শুরু করলো- ‘ এক আমাদের আর আমার জেঠুর পরিবার। আমাদের পরিবারে আমরা চার জন। বাবা, মা ও আমরা ভাই-বোন। জেঠুর পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচ। জেঠু, জেঠিমা তাদের দুই মেয়ে আর এক ছেলে। দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। পাত্র বলতে গেলে ঘর জামাই।’
    ‘বলতে গেলে মানে?’
    ‘মানে, বড়দি নিজের বরকে নিয়ে আলাদা এক ভাড়া বাড়িতে থাকে। সেই বাড়ির ভাড়া আমার জেঠুই দেয়। জামাইবাবু আমাদের দোকানে সেলসম্যানের কাজ করে। আসলে দুজনের লাভ ম্যারেজ। বড়দি জেঠুর খুবই প্রিয় তাই এই বিয়েটা মেনে নিয়েছে।’

    ‘হুম, বুঝলাম। আগে?’
    ‘জেঠুর ছোটো মেয়ে প্রিয়া আমার থেকে এক বছরের বড়। আমার কলেজেই সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ছেলে সৌভিক অনেক ছোটো । ইস্কুলে পড়ে সে। ক্লাস নাইনে। ‘কথা শেষ করে তিস্তা থামলো। তাকালো মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে

    মৃত্যুঞ্জয় দু’ চোখ বন্ধ করে শুনছিলো।
    ‘কী নাম তোমার জেঠুর?’
    ‘সুধাময় ঘোষাল। বড় মেয়ের নাম শ্রাবন্তী, তার পর প্রিয়া। ছেলের নাম সুকান্ত।’
    ‘তোমার দাদার নাম জানা হলো না।’
    ‘ সুপ্রিয় ঘোষাল।’ তিস্তা জবাব দিলো।
    ‘ পুলিশে নিশ্চই মিসিং রিপোর্ট লেখানো হয়েছে?’
    ‘ আজ্ঞে। নীলকন্ঠদাকে পুলিশ থানায় ডেকে নিয়ে গিয়েছিলো। জিজ্ঞাসাবাদ কী হলো জানি না। এখন তো দেখছি ছেড়ে দিয়েছে। ‘

    ‘ আচ্ছা , তুমি বললে যে তোমার জামাইবাবু তোমাদের দোকানের সেলসম্যান। কিসের দোকান তোমাদের?’
    ‘শাড়ির দোকান। জয়েন্ট। বাবা আর জেঠুর জয়েন্ট দোকান।’ তিস্তা এখন বেশ অনেকটাই ফ্রী হয়ে গেছে।
    ‘তোমাদের নিজেদের দোকান থাকতে তোমার দাদা আলাদা দোকান খুললো কেন?’
    ‘দাদার নিজের পায়ে দাঁড়াবার ইচ্ছে ছিলো। আমাদের শাড়ির দোকানটা অনেক পুরনো। আমার ঠাকুরদার দোকান। ঠাকুরদার পর বাবা ও জেঠু মিলে দোকানটা বড় করেছে। ঈশ্বরের কৃপায় দোকান বেশ ভালোই চলে। আমার দাদার মধ্যে শুরু থেকেই কিছু আলাদা করার ইচ্ছে ছিলো। যাকে বলে শূন্য থেকে শীর্ষে যাওয়া, দাদা সেই জিনিসটা পছন্দ করতো। তাই সে আলাদা বিজনেস শুরু করেছিলো।’

    তিস্তার কথা শেষ হওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ ঘাড় হেঁট করে বসে রইল মৃত্যুঞ্জয়, তার পর জিজ্ঞেস করলো- ‘কখন বুঝলে যে তোমার দাদা মিসিং?’

    ‘এটা এক ছোটো জায়গা। তাই বেশি রাত পর্যন্ত দোকান দাদা কোনো দিনই খোলা রাখতো না। আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে দোকান বন্ধ করে সে বাড়ি চলে আসতো। সে দিন ফিরলো না। নীলকন্ঠদাকে জিজ্ঞেস করা হলো। সে নিজের বাড়িতে। আরও কিছু বন্ধু বান্ধবদের ফোন করা হলো, কিন্তু লাভ হলো না। দাদার মোবাইল সুইচ অফ বলছিলো। রাত বারোটা নাগাদ গিয়ে থানায় রিপোর্ট লেখানো হলো।

    ‘শেষ দুটো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা আছে। রাত বাড়ছে, আপনার এবার বাড়ি ফের উচিত।’ মৃত্যুঞ্জয় বলল।
    তিস্তা নিজের মোবাইলে সময় দেখলো। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু আকাশে এখনও ঘন মেঘের বাসা।
    ‘জিজ্ঞেস করুন।’
    ‘আপনার জামাইবাবুর নামটা বলুন এবং এটা বলুন যে তিনি আলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়ে কেন থাকেন।আপনাদের বাড়ি তেই তো থাকতে পারতেন।’
    ‘আমার বাবার আপত্তি ছিলো। বাইরের লোককে বাড়ির অন্দরমহলে ঢোকাতে বাবা নারাজ ছিলো।’ তিস্তা বলল।

    ‘ এই নিয়ে তোমার জেঠুর সাথে তোমার বাবার কথা কাটাকাটি হয়েনি?’
    ‘ না।’
    ‘বেশ। নাম কী মহাশয়ের?’
    ‘বিক্রম পালিত।’
    অতঃপর চলে গেলো তিস্তা। পুনরায় শুরু হলো
    অল্প-অল্প বৃষ্টি ।
    অশান্ত ছিলো তিস্তার মন । মৃত্যুঞ্জয়ের আসল পরিচয় তাকে দীনবন্ধু বাবু দিয়ে দিয়েছেন । এতো বড় এক আই পি এস অফিসার কি তিস্তার সাহায্য করবে? সকালে যখন বাজারে দীনবন্ধু সরকারের সাথে তিস্তার দেখা হয়েছিল, তখন তিস্তার সব কথা শুনে তিনি বলেছিলেন – ‘এ সব ব্যাপারে একলা এগোনো ঠিক নয় রুমি। কারুর সাহায্য তোকে নিতেই হবে।’
    ‘কার সাহায্য নেবো, কাকু?’
    খানিক চিন্তা করে সরকার বাবু বলেছিলেন – ‘আজ সন্ধ্যাতে আমার বাড়ি আসিস। আমার ভাড়াটেকে তুই হয়তো দেখেছিস, মৃত্যুঞ্জয়। এক সময় সে আই.পি.এস. অফিসার ছিলো। এখন সে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। তার কাজ করার পদ্ধতি সরকারের পছন্দ হয়নি। অনেক বড়-বড় রহস্য সমাধান সে করেছে। তুই যদি চাস, তাহলে তার সাহায্য নিতে পারিস।’
    ‘সে কি আমাকে সাহায্য করবে?’
    ‘আমি বলবো তাকে।’

    তিস্তার চলে যাওয়ার পর দীনবন্ধু সরকার মৃত্যুঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করলেন – ‘কী ভাবলে মৃত্যুঞ্জয়? সাহায্য করবে রুমিকে?’
    ‘সে এখন অবধি যা-যা বলেছে, সেটা যদি সব ঠিক থাকে তাহলে নিশ্চই সাহায্য করবো।’

    মৃত্যুঞ্জয় রাত্রি আহারের সরঞ্জাম নিয়ে বসে গেলো।

     

    পর দিন সকালে মৃত্যুঞ্জয়ের ফোন আসার পর মেজাজটা বেশ ভালো ছিলো তিস্তার। মৃত্যুঞ্জয় ফোনে তাকে বলেছিল – ‘আমি দেড় ঘন্টার ভেতরে আপনাদের বাড়ি পৌঁছাবো। বাড়ির সকলকে থাকতে বলবেন।’

    তার মানে মৃত্যুঞ্জয় তদন্ত করতে রাজি হয়েছে। তিস্তা কথাটা গত রাতেই নিজের বাবাকে জানিয়েছিল। এক রাশ বিরক্তির স্বরে সুধাকর ঘোষাল নিজের মেয়েকে বলেছিলেন – ‘দরকারটা কী ছিলো? পুলিশকে তো জানানো হয়েছে। পুলিশের থেকে বেশি ক্ষমতা নিশ্চয়ই এক গোয়েন্দার হবে না।’
    ‘সে আতিপাতি গোয়েন্দা নয় বাবা। এক প্রাক্তন আই পি এস অফিসার। কোলকাতায় সি.আই.ডি. তে কাজ করতো।’
    নিজের মেয়েকে বেশি ঘাঁটালেন না সুধাকর ঘোষাল।

    সারা রাত বৃষ্টিপাতের পর সকালের আকাশটা বেশ পরিস্কার। রোদ উঠেছে, কিন্তু শীত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়নি। রোজকার মতো মর্নিং ওয়াক করে এসে মৃত্যুঞ্জয় ভাবলো এক বার থানা থেকে ঘুরে আসা যাক। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হলো তাকে। এতো সকালে থানাতে বড় বাবু নিশ্চই আসবেন না। পাহাড়ের জায়গায় লোকেদের ঘুম একটু দেরীতেই ভাঙ্গে। তায় যদি পুলিশের লোক হয়, তাহলে তো কথাই নেই। থানায় গিয়ে লাভ নেই, তার থেকে ভালো হয় যদি ঘোষালদের বাড়ি ঘুরে আসা যায়। তার কাছে ছিলো তিস্তার মোবাইল নম্বর, ফোন করলো তিস্তাকে।

    ‘ঘোষাল ভিলা’ যখন পৌঁছালো মৃত্যুঞ্জয়, তখন ঘড়িতে সকাল সাড়ে আটটা বাজে। সুধাময় ঘোষালের বড় মেয়ে ও জামাই ভিন্ন বাড়িতে প্রত্যেকেই ছিলো। দু’তোলা বাড়ি, বেশ বড়। নিচের তলায় সুধাকর ঘোষালের পরিবার থাকে, এবং ওপর তলায় থাকে সুধাময় ঘোষালের পরিবার। প্রত্যেকের সাথে মৃত্যুঞ্জয়ের পরিচয় করালো তিস্তা।
    ‘আপনার দাদার কি আলাদা কোনো ঘর আছে?’ তিস্তাকে জিজ্ঞেস করলো মৃত্যুঞ্জয়।
    ‘আজ্ঞে হ্যাঁ ।’
    ‘ঘরটা কি এক বার দেখতে পারি?’
    ‘অবশ্যই, অবশ্যই।’ এবার সুধাকর ঘোষাল এগিয়ে এলেন।
    ছোটোখাটো গোলগাল চেহারা সুধাকর বাবুর। মাথায় কাঁচাপাকা চুল, খুবই অল্প। দু’ভাইকে দেখতে অনেকটা একই রকম।
    সুপ্রিয় ঘোষালের ঘর নিচের তলায়, তালা বন্ধ ছিলো তাতে। চাবি দিয়ে তালা খুললেন সুধাকর বাবু। বেশ বড় ঘর। দেয়ালে এক এল.ই.ডি. টিভি, মিউসিক সিস্টম, খাটে দামী বেড কভার পাতা। এক নজর দেখে মনে হয়ে সুপ্রিয় খুব শৌখিন ছেলে ছিলো। মৃত্যুঞ্জয় ভালো করে ঘুরে ঘুরে চারিদিকে দেখতে লাগলো। এক বার শুধু সুধাকর বাবুকে জিজ্ঞেস করলো – ‘পুলিশ কি এ ঘরে এসেছিল এক বারো?’
    ‘ না মশাই। এ ঘরে কেন? রিপোর্ট লেখাবার পর থেকে এক বারও এই বাড়িতেই তাদের পা পরেনি। গত কাল দুপুরের দিকে এক বার থানায় গিয়েছিলাম। বড় বাবুর সাথে দেখা হলো না।’

    খাটের নিচে ঝুঁকে দেখলো মৃত্যুঞ্জয়। কাঠের বেশ কিছু বাক্স দেখতে পেলো সে। একে-একে সেগুলোকে বার করলো। তিস্তা এবং তার খুড়তুতো বোন প্রিয়া সাহায্য করলো মৃত্যুঞ্জয়কে। বাক্সগুলোকে খুলতেই মেয়েদের সাজগোজের জিনিস বেরোতে লাগলো, কসমেটিক্স। লিপিস্টিক, নেলপোলিশ, লুজ ইত্যাদি। দু’ চারটে লিপিস্টিক ও নেলপোলিশ নিজের কাছে রেখে বাকিগুলো বাক্সে ভরে বাক্সগুলো পুনরায় যথাস্থানে রেখে দিলো মৃত্যুঞ্জয়। ঘরের এক কণাতে ছিলো প্লাস্টিকের এক ডাস্টবিন। মৃত্যুঞ্জয় সে দিকে এগোলো। ডাস্টবিনের যাবতীয় জিনিস মাটিতে ফেললো সে। কিছু জিনিস নিজের প্যান্টের পকেটে রেখে বাকিগুলো পুনরায় ডাস্টবিনে চালান করলো।
    ‘না, আর কিছু দেখার নেই এই ঘরে। চলুন।’
    ঘর থেকে বেরিয়ে সুধাকর ঘোষালকে মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করলো – ‘সুপ্রিয় কি মাঝে-মাঝে কোলকাতা যেতো?’
    ‘হ্যাঁ, তা যেতো বইকি। দোকানের মাল কেনার ব্যাপার ছিলো। প্রায়ই যেতো কোলকাতা। ‘সুধাকর বাবু জবাব দিলেন।’
    ‘সুপ্রিয়র দোকানের ঠিকানাটা চাই আমার’।সুধাকর বাবু মৃত্যুঞ্জয়কে ঠিকানা দিয়ে বললেন – ‘নীলকন্ঠকে সেখানেই পেয়ে যাবেন আপনি।’
    ‘নীলকন্ঠকে তো পেয়ে যাবো কিন্তু বিক্রম বাবুর সাথে দেখা করাটাও যে প্রয়োজন।’

    চলবে…………………..

<p>You cannot copy content of this page</p>