-
মাহাত্মের ফুল
মাহাত্মের ফুল
-মহেশ্বর মাজিমদনপুরের শিব-মাহাত্ম আজ আর কারো অজানা নয়।
মাটির তিন হাত ভেতরে শিবলিঙ্গ।
শোনা যায় কাশিপুরের রাজা নিজে নাকি এখানে স্বয়ং একবার এসেছিলেন। রাণীকে ব্যাধিমুক্ত করতে।
রাণী যখন সুস্থ হন। তারপর রাজার সাথে পাল্কি চড়ে এসেছিলেন একবার পুজো দিতে।
আশেপাশের সমস্ত গ্রামবাসীদেরকে পুরো দিন ভোজন করিয়েছিলেন।
মন্দির সংস্করণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তার আগে শোনা যায়,এখানে কোন স্থায়ী মন্দির ছিল না। শুধুমাত্র শিবরাত্রির সময় গ্রামবাসীরা মিলে কয়েকদিনের জন্য বাঁশ,খড় দিয়ে একটা চালার মত করে দিতেন।
আসলে মন্দির করার ইচ্ছে থাকলেও,উপায় ছিল না। তখন একের পর এক দুর্ভিক্ষের কবলে সারা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভয়াভয় আকার ধারণ করেছিল।
মানুষ ঠিকমতো দুবেলা খেতে পাচ্ছিল না। মন্দির নির্মাণের ব্যয় জোটায় কী করে?
শেষে,মহাদেব স্বয়ং নির্মাণকারীকেই ডাক দিলেন।
কাশিপুরের রাজা, বাবার কৃপালাভের আশায় উপস্থিত হয়েছিলেন।সে প্রায় কয়েকশো বছর আগের কথা। তারপর থেকে আজ অব্দি আর মন্দিরটির জীর্ণ সংস্করণ করা হয়নি। দূর থেকে তাকিয়ে দেখলে,এখন আর মন্দির বলে একদম মনে হয় না।একটা টিলার আকার ধারণ করেছে। চারপাশে অশ্বত্থ আর বটের শক্ত শিকড় মন্দিরের দেওয়াল ভেদ করে জালের মত ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্ষাকালে জল পড়ে।
শোনা যায় ওখানে নাগ,নাগিনীও বাস করে।
অনেকের চোখেে পড়েছে। তাই কেউ আর একা মন্দিরে যাওয়ার সাহস দেখান না।
গ্রামে আজো কোন গাভীর বাছুর হলে, প্রথম দোয়া দুধ এক বাটি শিব মন্দিরের ভাঙা চত্ত্বরে নামিয়ে দিয়ে আসেন।
সকালে সেই এঁটো দুধের বাটির অল্প দুধ গাভীর মাথায় ছোঁয়ানো হয়।
সেই গাভীর দুধ কেউ কোনদিন নজর দিয়ে খাারাপ করতে পারে না।বিজন এ গ্রামেরই ছেলে। এখন মুম্বাই-এ একটি বিশাল মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর ম্যানেজার। ইচ্ছে ছিল,বিয়েটা হোটেলে করার, কিন্তু বাড়ির সকলের তাতে ঘোর আপত্তি দেখা দিল।
তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই গার্লফ্রেন্ডের হাত ধরে উড়ে আসতে হল নিজের গ্রামে।
সানিয়া বাংলা বলতে ঠিকঠাক পারে না। তবে বুঝতে পারে।সবটাই নিজের আগ্রহে শিখেছে।বিজন তো পরিস্কার বলে দিয়েছিল,কোন দরকার নেই। বাংলা ভাষাটা আজকাল আমিই ঠিকমত বলতে পারি না।
কথা ছিল অষ্টমঙ্গলাটা চুকে যেতেই ফ্লাইট ধরবে। জিদ ধরলো সানিয়া নিজেই। আর দিন কয়েক পরই নাকি শিবরাত্রি। খুব ধুমধাম সহকারে বাবা ভোলেনাথের পুজো হয়। দুদিন বাউল,একদিন অষ্টম প্রহর গুনকীর্তন তাছাড়া অনেকেই ডন্ডিও দেন।
সানিয়াকে বিজন সব বোঝাতে পারলেও ওই “ডন্ডি” নামক শব্দটির ঠিক সরলীকরণটা বোঝাতে পারল না। সানিয়া জিদ ধরে বসে থাকল। ওটা যে কী জিনিস নিজের চোখে না দেখে কিছুতেই যাবে না।
দরকার হলে হানিমুনের ট্রিপ থেকে কয়েকটা হলি ডে মাইনাশ করবে।বিজনও আজ দশ বছর পর নিজের জন্মভূমিটা একবার ঘুরে, ফিরে দেখার সুযোগ পেল।সানিয়াকে সাথে নিয়ে পরিচয় করাতে লাগল এক,একটা জিনিসের সাথে।
পুকুর,ডোবা,ইস্কুল,ধানক্ষেত,জোড়।
সবশেষে এল সেই পুরনো শিব মন্দিরের চত্ত্বরে।
সানিয়া বলে উঠল,ফেন্টাসটিক।ইয়ে খুসবু কিস চিজ কী?
বিজনও বুঝতে পারল না। সত্যি সত্যিই অদ্ভুত একটা মিষ্টি গন্ধে চারিপাশ ম ম করছে।বিজন এদিক,ওদিক খুঁজে দেখল, তবু কিছু বুঝতে পারল না।
সানিয়া চোখের সামনে অনেকগুলো প্রস্ফূটিত ধুতরা ফুল দেখে বলে উঠল,ও দেখো।
বিজন হো,হো করে হেসে ওঠল,আর ইউ ম্যাড?..ওগুলো ধুতরো ফুল।কোন গন্ধ থাকে না।
সানিয়া না দেখে মানবে না। একটা তুলে এনে নাকের কাছে ধরে বলল, প্রুফ ইট।
বিজন নিজের নাককেই বিশ্বাস করতে পারল না।
এটা কী করে সম্ভব? হতেই পারে না। তাহলে কী সে ছোটবেলায় ভুল শিখে এসেছিল?..না,এখন ধুতরো ফুলে গন্ধ হয়?..হয়ত সে জানে না।
তাই একটা ফুল পকেটে ভরে বাড়ি ফিরে এল।
সন্ধ্যেবেলায় সবার সামনেই বলতে লাগল,আচ্ছা মা,তুমি যে আমায় বলতে ধুতরো ফুলে কোন গন্ধ থাকে না। সেটা কী ভুল?
ওর মা সানিয়ার মাথায় তেল বুলিয়ে বলে উঠলেন,ধুর বোকা। সেটা ভুল হতে কেন যাবে?সবাই তো জানে ওই ফুলে গন্ধ থাকে না।
সানিয়া বলে উঠল,না মামিজী এই কথাটি রঙ্গ্ আছে। আমি অর্ আপনার সন মিলকে দেখে এলাম।
তার মা হেসে বলে উঠলেন,কী দেখে এলি পাগলী?..আর তুইও ধন্য বিজন!..বউমাকে বুঝিয়ে বলবি কোথায়? উল্টে তুই ওকে ভুল শিক্ষা দিচ্ছিস?
বিজন পকেট থেকে ধুতরো ফুলটা বের করে শুকে দেখল। গন্ধ নেই, সানিয়াও পেল না।
দুজনই অবাক। তবে কী ফুলটার গন্ধটা এতক্ষণে শেষ হয়ে গেল?
সবাই এ নিয়ে হাসিহাসি করলেও, বিজন আর সানিয়া কিছুতেই হাসতে পারল না। এতটা ভ্রম তাদের কী করে হতে পারে?
এ নিয়ে রাতে দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা হল।তারপর দিন আবার মন্দির চত্ত্বরে তারা গেল। গন্ধটা পেল না। তারা আবার অবাক হল।
এই প্রথম আনমোনা হয়ে বাবা ভোলানাথের উদ্দ্যেশে দুজনেই প্রণাম করল।
তারা বাড়ি ফিরে এল।
এসেই সবাই প্রায় একসাথে বলে উঠল,হ্যাঁরে বিজন এত সুন্দর গন্ধ কোথা থেকে কিনেছিস বাবা?..আমাদের দুটো দিয়ে যাস বাবা ।
তোর দাদু হাঁপানির রুগী।দ্যাখ কেমন আজ দৌড়ে বেড়াচ্ছেন?..ওই গন্ধ পেয়ে।
কোথাও মনে হচ্ছে কোন যন্ত্রণা নেই, শুধু শান্তি,অপার শান্তি। আমরা কখন থেকে শিশিটা খুঁজে ফিরছি, পেলাম না।
তার মা আগ্রহ সহকারে বলে উঠলেন,কই দ্যাখা বাবা একবার । কেমন জিনিসটা দেখি তো।সারা পাড়া এসেছিল,দেখতে। কোথাও পেলাম না।
বিজন কোন গন্ধ পেল না। সানিয়াকে জিজ্ঞাসা করল, সেও পায়নি।বিজন দেখল তার প্যান্টের পকেটে ধুতরো ফুলটা আজো সেই একই রকম আছে। অল্পও শুকায়নি, সানিয়াও অবাক।
গন্ধটা কী তাহলে…।না তো কই?
ফুলটা বিজন বাইরে ছুঁড়ে দিল ।মাঝ রাতে হঠাৎ বিজনের ঘুমটা ভেঙে গেল। সানিয়ার চোখেও ঘুম নেই।বলে উঠল,বাবা ভোলেনাথ কুছ তো চাহতে হ্যায়?
বিজন বলল,ঈশ্বরে বিশ্বাস আমি সেরকম না করলেও। এত লোকের যে বিশ্বাস তাকে ভেঙে লাভ নেই।
শিব মন্দিরটা সংস্কার করার দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে।
সানিয়া বলল,আমার ভী ইরাদা আছে। এমনভাবে বানাতে হবে, যেন বিলকুল স্বর্গ মনে হয়।
বিজন বলল,কিন্তু সে তো অনেক টাকার ব্যাপার!
সানিয়া বলল,এখন স্লিপিং টাইম। কাল সকালে ভাবা যাবে।বিজন মোবাইলের আওয়াজ পেয়ে ভাবল,হয়ত অ্যালার্মটা অফ করা হয়নি।ঘুম জড়ানো চোখেই হাতে মোবাইলটা নিয়ে কাটতে যাবে। এমন সময় চমকে উঠল।মি. লিলি য়ান-এর ফোন। কোম্পানীর সি.ই.ও।
ফোন ধরে বিজন জানতে পারল। তাদের কোম্পানী কিছু ফান্ড ডোনেট করতে চায়।ইন্ডিয়াতে কোথায়, কোথায় ডোনেট করতে হবে তার একটা সামগ্রিক লিষ্ট যেন খুব শীঘ্রই তৈরি করা হয়। অনাথ আশ্রম,স্কুল,কলেজ,হাসপাতাল এমন কী মন্দির বা মসজিদ প্রকল্পেও দান করা চলবে।
সানিয়া খুশি হয়ে বলে উঠল,আমি জানতাম। কুছু একঠো হবে জরুর।বিজনের বিশ্বাস এবার কানায়,কানায় ভরে উঠল। ঈশ্বর যদি চান,অনেক কিছুই করিয়ে নিতে পারেন।
না হলে বিজনের কী সাধ্যি ছিল। গ্রামের এতবড় শিব মন্দিরটাকে এতবড় তীর্থস্থল করে দেয়?সে তো নিমিত্ত মাত্র।টাকা দিয়েছেন,তাদের কোম্পানীর মালিক।
সে শুধু মার্বেল চালান করেছে,বসিয়েছে গ্ৰামের মিস্ত্রি,নিজের পরিশ্রমে। ভোজনশালা বানালে কী হবে। সে তো দানের জিনিসে চলছে। সে শুধু একটা মন্দিরের ট্রাস্ট মন্ডল গঠন করে কয়েক কোটি টাকা গচ্ছিত রেখে দিল। যাতে মন্দিরের সংস্কারে বাঁধা না পড়ে।আজকাল বিদেশের মাটি থেকে সেও আর আসতে সময় পায় না।
এক বছরের মধ্যে সেও প্রোমোশন পেয়ে আমেরিকায় চলে যায়।
আজো তারা শিবরাত্রির দিনটা মনে রাখে।সানিয়া ওইদিন উপোস করে বাবার পুজো দেয়।
গ্রামের শিব মন্দির থেকে যে ধুতরো গাছটা এনে লাগিয়ে ছিল। তার ফুলগুলো আজো সেই রকম সুগন্ধ ছড়ায়।
তবে সেটা তারা দুজনই পায়। এমন কী তাদের ছেলে শংকরও না।সমাপ্ত
-
অৌর প্যায়ার হো গয়া
অৌর প্যায়ার হো গয়া
-মহেশ্বর মাজিসারা কলেজ সংকেতকে “চিতা” বলেই ডাকত।ওর সাথে পাঞ্জা লড়াইয়ে কেউ সহজে পেরে উঠত না।
এমনই শক্তিশালী ছিল হাতের মুঠো।একটি মর্মান্তিক বাইক দুর্ঘটনায় সংকেতের ডানহাতটা এক সময় ভেঙে গেল।
ডাক্তার অনেক চেষ্টার পর সেটা জুড়ে দিয়েছেন।তবে জোরে চাপ দিতে চিরদিনের মত মানা করেছেন।
এখন সে আর কারো সাথে পাঞ্জা লড়াই-এ অংশগ্রহণ করে না।মুম্বাই থেকে একটা কন্সট্রাকশন কোম্পানী তাকে কল করল।সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের জব।
সেবার মুম্বই থেকে ফিরছিল।পুজোতে অনেকগুলো ছুটি নিয়ে।
ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনার্স।লোকে লোকারণ্য।সকলেই নিজের গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে।
…ট্রেনটা ছেড়ে দিতেই সংকেত নিজের বার্থে যাওয়ার জন্য পিছনে ঘুরছিল।তখনি চোখে পড়ল একটি মেয়ে।প্রাণপণে দৌড়চ্ছে উদ্দেশ্য ট্রেনটা ধরবে।কোন কারণে দেরী করে ফেলেছে।
সংকেত তাকে সাহায্যের জন্য ডানহাতটাই প্রসারিত করল।
হাতটা তার দুর্বল।সেটা ওই অচেনা মেয়েটি জানত না।
আর সংকেতের বিশ্বাস ছিল নিজের উপর।…আর কী!!
সংকেত তাকে সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁচকা টানে বুকের মধ্যে টেনে নিল।
মেয়েটি প্রাথমিক আঘাতটা সামলে একটু বিরক্ত মুখ করে বলে উঠল,সব পুরুষ এক।মেয়েদের অসহায় দেখলে কোন না কোন ছুতোয় ব্যবহার করে নেবেই।
নেহাৎ পরশু দিদিটার বিয়ে।আর এয়ার লাইন্সে টিকিট পেলাম না।
তাই শেষমেষ তৎকাল কেটে ঝাঁপ দিতে হল। না হলে আমি আজ পর্যন্ত কোন অচেনা পুরুষের কাছে এভাবে হাত বাড়িয়ে লিফ্ট চাইনি।
আজকেই প্রথম। তাও সেই বিরক্তকর অভিজ্ঞতা।
মেনি..মেনি থ্যাঙ্কস অফ ইওর হার্টফুল হেল্পিং।সংকেত অনেকগুলো কথা একসাথে শোনার পর কী উত্তর দেবে ঠিক খূঁজে পেল না। তাই চুপ করে নিজের বার্থে চলে গেল।
সেবার অনেকগুলো লাগেজ একসাথে সংকেত সিটের তলে সাজিয়ে এনেছিল।স্টেশন অব্দি তিনজন মারাঠি বন্ধু এসেছিল। লাগেজগুলো ঠিকমত সাজিয়ে দিতে।
কথা ছিল হাওড়ায় বাবা,মেশোমশায় আর দিদি,জামাইবাবু অপেক্ষা করবেন। তার জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে নিয়ে যাওয়ার তরে।
ট্রেন ঢোকার পর সংকেত কিছুক্ষণ ইতস্তত করল।কাউকে দেখতে পেল না।
তাই একটু কষ্ট করে নিজেই লাগেজগুলো টেনে টেনে এক জায়গায় জমা করল।
ততক্ষণে হন্তদন্তভাবে সকলে এসে হাজির হলেন।
এসেই তার মেশোমশায় অনেকটা ধমকের সুরে বলে উঠলেন,কী করছিস কী চিতা!
তোর কী মাথা টাথা খারাপ হল?
ওভাবে ডানহাতে করে ভারি ব্যাগগুলো টেনে আনছিস?
তুই কী ভুলে গেছিস তোর ডানহাতে সামান্য চাপ দিতেও ডাক্তার মানা করেছেন?
এত জোর খাটাতে যাস কেন?…যদি বড়সড় বিপদ ঘটে বসে কোনদিন?সেইসময় সেই মেয়েটিও কথাটা শুনতে পেল।সে ইচ্ছে করে একটু দেরীতেই বগি থেকে নামছিল।
হয়ত অবাঞ্ছিত পুরুষদের ছোঁয়া এড়াবার জন্য।কথাটা শোনা মাত্রই তার হৃৎপিন্ডে ছলাৎ করে একটা রক্তের টেউ এসে আছাড় খেল।
সে মিছিমিছি ছেলেটাকে অপমান করেছে জানতে পেরে আর এক বিন্দু নিজেকে স্থির রাখতে পারল না।
সংকেতের সামনে গিয়ে হাতদুটো জড়ো করে বলে উঠল,আমায় ক্ষমা করবেন। না জেনে অনেককিছু বলে ফেলেছি। আয়্যাম এক্সট্রিমলি স্যরি ।
সংকেত তৎক্ষণাত একটু হেসে বলে উঠল,কী করছেন কী ম্যাডাম ।.ইটস ওকে। আপনি ভুল কিছুই বলেননি। পুরুষদের প্রতি ধারণায় আপনার কোন ভুল নেই।
তবে আমি আপনাকে ওভাবে টানতে বাধ্য হয়েছিলাম। বাধ্য না হলে যে আপনার ধারণাটা মিথ্যে হত।সেটাও তো সিওর নয়।
মেয়েটি প্রতি নমস্কার করে চলে যাওয়ার পর তার জামাইবাবু এক সময় কাঁধে ধাক্কা দিয়ে শালাবাবুর উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,চক্কর কেয়া হ্যায়?..কোই মিল গয়া কেয়া?
সংকেত হাল্কা হেসে উত্তরটা এড়িয়ে গেল।একদিন পর হল ভর্তি বিয়ে বাড়ির ভিড়ে তাদের দুজনের আবার দেখা হয়ে গেল।
মেয়েটি অবাক হয়ে বলে উঠল,আপনি!..এখানে?
সংকেত এত ভিড়ের মধ্যেও মেয়েটির থেকে একটু দুরত্ব বজায় রেখে জবাব দিল,ইনিই তাহলে আপনার দিদি?
আপনার বাবা আমার বাবার মনে হয় ফ্রেন্ড হন। বাবার শরীরটা হঠাৎ খারাপ হওয়াতে,আমাকেই গিফ্ট প্যাকেটটা দিয়ে পাঠালেন। ভেবেছিলাম,কোন রকমে হাতে ধরিয়ে কেটে পড়ব। এবার দেখছি না খেয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
…তবে একটা কথা মানতে হবে আপনার দিদি দেখতে খুব সুন্দর। আর হ্যাজব্যান্ডও গুড লুকিং।একদম রাজযোটক সেজেছে আর কি!….সেই ভীড়ে কোন এক বেয়াদপ সংকেতকে পিছন থেকে একটা লম্বা চওড়া ধাক্কা মেরে দিল। টাল খেয়ে পড়ল একদম সেই পুরুষ বিদ্বেষী মেয়েটির বুকের মাঝে। একদম ভিড় ঠেলে লাল কার্পেটের মেঝেয় দুজন উপর নিচে পড়ে রইল।
মেয়েটি এর পরেও মুখে হাসিটি বজায় রেখে সংকেতের কানে কানে আস্তে করে বলে উঠল,আমার কিন্তু লাগেনি।
ডোন্ট মাইন্ড ।
খেয়ে যাবেন কিন্তু ।
তারপর ড্রেসটা ঠিক করে আবার বলে উঠল,বাই দ্য ওয়ে- আমার নাম প্রিয়া। যাওয়ার আগে একবার দেখা করে যাবেন। -
অচেনা শক্তি
অচেনা শক্তি
-মহেশ্বর মাজি
বিয়ের কদিন বাদেই বঙ্কু পাশের গাঁয়ে সনতদের সাথে ঘুরপথে সাইকেলে করে কয়লা ঠেলতে শুরু করল।
নতুন বউকে মাঝ রাতে একা ফেলে ছুটল, রুজির তাগিদে।
পুরনো সাইকেলটা ওরাই ওকে জোগাড় করে দিয়েছে।
রিংটা এক জায়গায় সামান্য বাঁকা।তাই মাল বেশি নেওয়া যায় না।
নতুন রিং এখন অনেক দাম।এভাবেই চালাতে হবে,কিছুদিন ।
মাত্র দু হাজার টাকায় সাইকেলটা ভালই জুটিয়েছে।
একটু কাজ অবশ্য করালো। কয়েকটা স্পোক আর বল বিয়ারিং লাগাতে শ তিনেক খসল।
প্রথম তিনদিন দু ধামা করে মাল নিয়ে, ঠেলাটা রপ্ত করতে হল।
তিনদিন পর থেকেই সেটা পাঁচ করে নিল।
প্রায় আড়াশো কেজি।রাত তিনটেই খাদান থেকে মাল নিয়ে সাইকেলগুলো নিঃশব্দে ঝোপ,জঙ্গলের মাঝে সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে যায়।
আবছা অন্ধকারে কোনরকমে ধুলোমাখা রাস্তাটা চোখে পড়ে।
দুদিকে ঘন ঝোপ,ঝাড়।চাঁদের আলো কখনো বাড়ে,কখনো কমে।ঝিঝি ডাকে।
শেয়ালগুলো গর্তে মুখটুকু বের করে একদল মানুষের জীবন সংগ্রাম দেখে।
কিছুক্ষণ তারাও চুপচাপ হয়ে যায়।…একদিন বঙ্কুর মাথাটা হঠাৎ করে ঘুরে গেল। টাল সামালতে না পেরে ধপ করে সাইকেল সমেত জাকা পড়ল। সামনের বাজারে পুলিশের টহলদারি কড়া থাকে।ভোর পাঁচটার আগেই চাঁদমারি জঙ্গলটা শেষ করে পাঁকা রাস্তা ক্রশ করতে হয়।
পুলিশগুলো ঘামের গন্ধ পায়।তাই সারারাত বড়,বড় ট্রাকগুলো থেকে পকেট উচু করার পরও বাইক হাঁকিয়ে ক্রশিং-এর কাছটাই ভোরবেলাতে গন্ধ শুকে ঠিক এসে যাবে।
একশোটা টাকা না বাগিয়ে ছাড়বে না। পুরো সাইকেল ঠেলে অমানুসিক কষ্টের বিনিময়ে তিনশো টাকা হাতে আসে।
…আর পুলিশ এসে সেই টাকায় ভাগ বসালে মনটা তো ভেঙে যাওয়ারই কথা।আগের তিনজন তাকে পিছনে ফেলে অনেকটা এগিয়ে গেছে। অন্ধকার রাস্তায় কেউ বেশি কথা বলে না।
এমন কি উজানে দুশো কেজির বোঝাটা টানার সময়ও বুকের দমটাকে আস্তে করে ছাড়তে হয়।
উজানটা শেষ হলেই একটা গ্রাম পড়ে।সেখানে আড়তদার বড়,বড় ওজনদাঁড়ি নিয়ে বসে থাকেন।
হাঁক,ডাক পেলেই তাদের লোক সাইকেলের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে নিজেদের আস্তানায় নিয়ে যাবে।সব মালটা তাদেরকে দিতে হয়।ওদের মুখের উপর কথা খাটে না। এক,একটা মাফিয়া।তাদের হাতে সবরকম লোক মজুত আছে। তাই কেউ প্রতিবাদ করে না।তাতে লাভটা কম হয়।তিনশোটা দুশোই ঠেকে।
… পুলিশ পড়লে।সেদিনটা আর ভাল যায় না।…বঙ্কু পড়ে গেছে।মাথাটাকে ওঠানোর চেষ্টা করছে।পারছে না। লাটায়ের মত ঘুরছে।অন্ধকারটা আরো প্রগাঢ় হচ্ছে চোখের কাছটায়।
ওদিকে কয়লা বস্তায়,পাদুটো জাকা আছে।
চেষ্টা করেও টানতে পারছে না।
শরীরটা ঘেমে গেল।মাথার ভেতরে হাজারটা বোলতা যেন গুন্ গুণ্ করে উঠল।
চোখের অন্ধকারটা কাটল।
…তবু সাহায্যের জন্য বাকিদের ডাকার উপায় নেয়।ওর চিৎকার শুনে পুলিশের ভোরের চোখ জেগে যাবে।
একশো করে টাকা খসে যাবে।ওটা অনেক কষ্টের।একশো টাকার মূল্য আজ বঙ্কু জানে।
ওর বউ মা হতে চলেছে।দিন দুই আগে খবরটা জানাল।
এখন তার অনেক দায়িত্ব।ডাক্তার নাকি তার বউকে ভাল,ভাল খাবার খেতে বলেছেন।
তবেই সন্তান হৃষ্টপুষ্ট হবে।সেই রাতেই বঙ্কু মনে,মনে হিসেব করে নিয়েছিল।
বহালের ডাঙাটা এবছর লোক লাগিয়ে কাটাবে।কম করেও গাড়ি চারেক বাড়তি ধান ঘরে ঢুকবে।
তার বউ হাতের বালা জোড়া দিয়ে এঁড়ে বাছুরদুটো পাল্টে বলদ নেবে।
তাহলে বিঘা তিনেক জমি ভাগেও নিতে পারবে।
বঙ্কুর মনটা ছেড়া বিছানায় কই মাছের মত আনন্দে নেচে উঠেছিল।
বউটাকে দু হাতের আলিঙ্গনে ভরে,সেই রাতে এক ধামা ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছিল।এখন তার মুখটা,বঙ্কুর খুব মনে পড়ে গেল।দুঃখের ঘরে একখানা আলো নিয়ে এসেছে। অভাবের অন্ধকারেও ঘরটায় একটা আলো জ্বলে।
বউটা তার বড় আশাবাদী।স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে।দুঃখের আগুনটাকে মনের ভিতর জ্বলতে দেয় না।বঙ্কু শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে পা টা টেনে তুলল।
প্রচন্ড ব্যথা।এই অবস্থায় চলা যাবে না।
..হঠাৎ একদল মানুষের চিৎকার ভেসে এল।
মশাল জ্বালিয়ে এই জঙ্গলের দিকেই আসছে।
সামনে এলে সাহায্য চাওয়া যাবে।
..ক্রমে,ক্রমে আওয়াজটা পরিস্কার হয়ে বঙ্কুর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
হাতি…হাতি..হাতি!!
একদল হাতির পায়ের শব্দ তার দুকানে ভেসে এল।বঙ্কুর বুকটা ধক্ ধক্ করে বাজছে।
মানুষগুলো আর এলো না।
বঙ্কুব গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
চেষ্টা করেও কাউকে ডাকতে পারছে না।
গলার স্বরটা হাল্কা শিসের মত বেরিয়ে এল।
সে পরিস্কার দেখতে পেল।একটা দৈত্যাকার হাতি তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
বঙ্কু চোখ বুঁজে ফেলল।
..এই বার হাতিটি তাকে শুড়ে করে ধরে পায়ের তলায় পিষে দেবে।বুকটা থেতলে চলে যাবে।
বউ-এর হাসি মুখটা মনে পড়ল।
আর বোধহয় ঘর বাঁধা হল না।একটু বাদেই বঙ্কু চোখ খুলল।দেখল হাতিটি তার সাইকেলটা শুড়ে করে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
কাঁদতে,কাঁদতে হাতির একটা পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। তারপর নিজের পা দুটো টেনে সোজা করে নিল। শরীরটা ঝেড়ে, পেশিগুলোকে ঠিক জায়গায় বসিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডালটা সোজা করে ধরল।তারপর ঠেলতে শুরু করল।
পিছনে তাকিয়ে দেখল হাতিটি নেয়।
কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে।….একটু বাদেই ওর বাকি সাথিরা দৌঁড়ে এসে উপস্থিত হল।
এসেই হাঁপাতে,হাঁপাতে একজন বলে উঠল,কী হয়েছিল তোর?..এত দেরী কেন?
আমরা কখন থেকে তোর পথ চেয়ে বসে আছি।..আজ পুলিশগুলো একটাও নেই। ভোটের মিঝিল আছে। ওখানে চলে গেছে।
…পাশের গাঁয়ে চিতা ঢুকেছিল।জঙ্গলের দিকে তেড়ে এসেছে..শুনেই আমরা দৌঁড়ে এলাম।
…তোর যদি কিছু হয়ে যেত!বঙ্কু অবাক হয়ে বলে উঠল,চিতা!…ওরা তো সবাই হাতি..হাতি বলে.চিৎকার করছিল।
—তোর মাথা খারাপ হয়েছে?..হাতি কেন আসতে যাবে?.. ওরা দূূর থেকে চিতা,চিতা বলছিল…তুই হয়ত হাতি শুনেছিস।
একজন টর্চটা বের করে জ্বালাল
—ইস!..পড়ে গেছিলি!…এত রক্ত পড়ছে!..এই অবস্থায় এত ভারি সাইকেলটা একা খাঁড়া করলি?…তোর বউ ঠিক কথায় বলে।শালা তুই একটা অসুর।..কেন আমাদের ডাকলে..সাড়া পেতিস না?
..দে..দে..সাইকেলটা আমাকে দে।তুই আস্তে করে আয়।বঙ্কু বাকি কথাটুকু মনে,মনে চেপে গেল।কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই গেল।
ওর চোখে দেখা হাতিটা কী তাহলে মিথ্যে?… আর তা যদি হয়।তাহলে তার সাইকেলটা সোজা কে করল?
…আর যদি নিজেই করে থাকে।তাহলে ওরকম কেন মনে হল?
কিছু, কিছু জিনিসের আমরা যখন আগাগোড়া কিছু বুঝে উঠতে পারি না। তখন তা দৈব কৃপা বলেই ধরে নিয়।
…এক্ষেত্রেও তাই হল।পরের দিন বঙ্কুর বউ, পোঁয়াতি অবস্থাতেও সারাদিন উপোশ করে গনেশ ঠাকুরের পুজো দিল।
——সমাপ্ত—-