-
দ্বিধা সীমন্তিনী
দ্বিধা সীমন্তিনী
-রীণা চ্যাটার্জীসব দ্বিধা শেষ। শুধু গল্পটা…
বিয়ের আগে অত তলিয়ে ভাবেনি- হয়তো প্রয়োজন বোধ করেনি। সবকিছু চোখের সামনে আশৈশব দেখে এলেও অভ্যস্ত চোখে নিজের জন্য আলাদা করে প্রশ্ন জাগেনি। হয়তো এটা বিশ্বাসযোগ্য নয় একটা আদ্যপান্ত বাঙালি পরিবারে, পরিবেশে বড়ো হয়ে ওঠা মেয়ের জন্য এই অনুভূতি, তবুও এটাই সত্যি বিয়ের পরে তপতী প্রথম অনুভব করলো, বিবাহিত আর অবিবাহিত মেয়েদের দুই আলাদা সাজ পরিচয়ে, পরিধানে। নতুন করে বদলে যাওয়া সাজ-পোশাকে তপতীর কিন্তু খুব অস্বস্তি হতো বিয়ের পর- কেমন যেন লজ্জা করতো। ছোটোবেলা থেকে বাবা-কাকা- দাদা-মামা যাদের কোলে পিঠে বড়ো হয়েছে, কতো আব্দার, স্নেহ-খুনসুঁটির মাঝে বেড়ে উঠেছে। শ্বশুর বাড়িতে তাঁরা এলে বা শ্বশুর বাড়ির লোক তপতীর বাপের বাড়িতে এলে মাথায় আঁচল দিতে হতো- ঘোমটা টানা চলতি ভাষায়, খুব অস্বস্তি লাগতো, লজ্জা করতো, কেমন যেন পর পর মনে হতো, পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারতো না। যে পাড়ায় ছোটো থেকে ফ্রক পরে ঘুরেছে, বড়ো হয়েছে, স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করেছে, সেখানেই ঘোমটা টেনে ঢুকতে হবে সাথে ভাশুর বা খুড়শ্বশুর কেউ থাকলে। সঙ্কোচ-লজ্জা ঘিরে থাকতো ঘোমটার আড়ালে। অথচ মায়ের কড়া শিক্ষা বড়োদের সামনে ঘোমটা দিতেই হবে- না হলে না কি অপমান করা হয়। তাই আবার হয়! ঘোমটা দিলেই সম্মান করা হয়! আর ওই যে আপন-পর দ্বিধাবোধ! মন খুলে কথা বলতে না পারা, ওটাই না কি নববধূর ভূষণ- ধ্যেৎ, মনের আনন্দ তো গুলে কাদামাটি বিয়ের। তারপর সিঁদুর- বিয়ের সময় ঠিক ছিল- ফটো উঠলো বেশ কয়েকটা, ভালোই লাগলো। তবে চুলটা সেই যে লাল আর চটচটে হলো, মেজাজ বিগড়ে গেল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়- রোজ না কি নিয়ম করে দুই বার সিঁদুর পরতে হবে, মনে থাকে না। যদিও বা মনে পড়ে, মনে হয় যেন কি এক পরাধীনতা- মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কখনো মনে হতো, আছে তো লাল হয়ে সিঁথি, না হয় থাক, আসলে নিয়ম করে আয়নার সামনে দাঁড়ানোর অভ্যাসটাই তো নেই ছোটোবেলা থেকে কোনোদিন। তারপর স্নান করে ভিজে চুলে সিঁদুর লাগালে জলের মতো গড়িয়ে আসতো নাক বরাবর। জোকার মনে হতো। গরমের দিন হলে তো কথাই নেই-সোনায় সোহাগা, গড়াচ্ছে ঘামের সাথে নাকে-মুখে-চোখে, জ্বালা করতো খুব। ঠিক ওখানেই হাজার কথা- এয়োস্ত্রী মানুষ… সংসারের কল্যাণ, লক্ষণ। মানিয়ে নিয়েছিল মন। আর হাতের এক গয়না, সব রঙের সাথেই সাদা- লাল! একটু তো অদ্ভুত লাগতোই। কেমন যেন “মা… মা” ধরণ। তেলে-হলুদে-শাখা-সিঁদুরে-ঘোমটায়-পরাধীনতায় অন্য এক জীবন। তার সাথে বার-ব্রত-উপোস লেগেই আছে, আর আছে এই করতে নেই, ওই করতে নেই, আমাদের বাড়ির এই নিয়ম। মাঝে মাঝে একপেট খিদের সাথে এক ঝুড়ি প্রশ্ন তোলপাড় করতো শরীর মন। প্রশ্ন থেকেই যত বিপত্তি, উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরো বিপত্তি। সবকিছুই যেন চাপিয়ে দেওয়া এক প্রথা, পরাধীনতার প্রতীক, আর পুরুষতান্ত্রিকতার বৃথা আষ্ফালন। যদিও সারবত্তা বদলে গেছে কালের প্রবাহে, প্রতীকগুলো বেঁচে আছে লোকাচারে, যাদের ওপর চাপানো হয়েছিল তারাই তো পরম বিশ্বাসে, ভরসায় এগুলো নিয়ে বেঁচে আছে, পরাধীনতার রক্ষাকারী হয়ে যুগ যুগ ধরে। তবু বলা যাবে না এইসব কথা, অগত্যা ভরসা ডায়েরি। মনের অশান্ত প্রশ্নগুলো লিখে ক্ষতবিক্ষত হয়ে শান্ত হবার চেষ্টা করে তপতী। বলা বারণ, মনের আগলে খিল দিয়ে রাখতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল আলাদা করে- ওটাই ভদ্রতা।
বিয়ের পর পর বাবার বাড়ি (হঠাৎ করে বাড়ির নাম, সংজ্ঞাও বদলে যায়) এসেও রেহাই ছিল না, স্নান করে সাথে সাথে সিঁদুর না লাগালে কাকি-মা-বৌদি কেউ না কেউ ধ্যাবড়া করে খানিকটা লাগিয়ে দিত। সাথে সাথে প্রবচন- “এতোদিনে তো অভ্যাস হয়ে যায়, তোর কবে হবে?” হয়ে গেল, এইভাবে অভ্যাস হয়েই গেল, তৈরী হয়ে গেল সাজানো বিবাহিত মন- আর লজ্জা করতো না শাড়ির আঁচল মাথায় তুলতে, আর ভুল হতো না দু’ বেলা সিঁদুর লাগাতে, আর বেমানান লাগতো না শাঁখা-পলার সাদা, লালের সাথে যে কোনো রঙের শাড়ি। সাজসজ্জার ধারা- ধারণায় আমূল পরিবর্তন, মনের খচখচানি শীতঘুমে অচৈতন্য।
মেঘে মেঘে বেশ বেলা- তপতীও এখন এক কন্যা সন্তানের মা। মেয়ে তিয়াস বড়ো হয়েছে- স্কুল কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ভার্সিটি পড়ুয়া। ছোটো থেকেই শান্ত, ধীর মেয়ে কিন্তু স্বাধীনচেতা। নিজস্ব মতামত, আর মতামতের পক্ষে যুক্তি নিয়ে আলোচনা করে তপতীর সাথে। তপতীর নিজের না বলতে পারা কথাগুলো ভাষা পায়, ভাবনাগুলো আকার পায়, প্রশ্নগুলো উত্তর খুঁজে নেয় চুপিচুপি। খুব ভালো লাগে তপতীর, বাধা দেয় না- নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। শান্ত স্বভাবের মেয়েটা কিন্তু ভেতর ভেতর সমাজের অনেক রীতি নীতি নিয়ে বেশ প্রতিবাদী। ব্রাম্ভ্রণ্য প্রথা, সমাজের শ্রেণীভেদ, জাতিভেদ, ধর্মীয় ধ্বজা, দেশীয় লোকাচার সব কিছুতেই যুক্তি খোঁজে- পায় না। খুঁজতে থাকে শিকড়- শিকড়ে গিয়ে দেখে হাজার গড়মিল আর সুবিধাবাদ। প্রতিবাদের মেঘ ঘোর হয়ে আসে মনে, নবীন ভাবনায়। কিন্তু সবকিছু যে প্রতিবাদে মেটে না- তাই তো আরো অশান্ত হয় মন।
শরতের মেঘের মতো রোদ-বৃষ্টিতে পুড়তে থাকে, ভিজতে থাকে। অসহায় তপতী- বুঝতে পারে না, কি করবে! তার সম্পূর্ণ সমর্থন থাকলেও সাহায্য করার ক্ষমতা তো নেই!
একদিন তপতী স্নান সেরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভ্যাসবশত সিঁথিতে সিঁদুর ছোঁয়াতে যাবে তিয়াস এসে ঢোকে ঘরে।
মা’র দিকে তাকিয়ে আজ আর চুপ করে থাকতে পারে না- সিঁদুর কেন পড়ো মা রোজ? জানো না এর ইতিহাস, আর উদ্দেশ্য! তোমার ডায়েরিতে কত কিছু লিখেছো, কতো প্রশ্ন রেখেছো, উত্তর খুঁজতে চেয়েছো। তুমি তো নিজেও জানো মা, তা’ও কেন মেনে নাও এই পরাধীনতার নির্লজ্জতা, ঘৃণ্য প্রতীক। প্রয়োজন তো নেই কোনো। তুমি সিঁদুর, শাঁখা পরার সাথে সংসারের কল্যাণ- অকল্যাণ, বাবার ভালো থাকা নির্ভর করে না, তা’ও কেন রোজ এইসব নিজের ওপর চাপিয়ে নাও। নিজের সম্মান নিজে রক্ষা করতে না পারলে- তুমিও তো গতানুগতিক এক ধারায় চলবে, একই ভাবে চলতে থাকবে প্রত্যেকটা প্রজন্ম- কেন মা, কেন?
তপতী হেসে বলে- অভ্যাস হয়ে গেছে রে সোনাই। “সোনাই” তপতী এই নামে ডাকে,তিয়াসকে।
-কিসের অভ্যাস মা?
-মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস, মেনে নেওয়ার অভ্যাস।
-যে অভ্যাস তোমাকে রোজ প্রশ্নের মুখে নিয়ে আসতো, সেই অভ্যাস আরো কতদিন মা?
-এতোদিনের অভ্যাস কি পিছু ছাড়ে সোনাই এতো সহজে?
-কিছু বলার নেই… কি করে যে সব জেনেও এইভাবে নিজেকে ছোটো করতে পারো কে জানে!
-এখন এই বোধ আর কাজ করে না রে, একটা অভ্যাস শুধু। ছাড় এইসব, অন্য কিছু বল… কি করবি আজ? কখন বেরোবি?
-সবসময় কথা ঘোরানোর চেষ্টা… একরাশ বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করতে করতে তিয়াস ঘর ছাড়ে। তপতী আয়নায় নিজেকে ভালো করে দেখে, হাসে… অতীত অন্য কিছু দাবি রাখলো, ভবিষ্যত অন্য কিছু দাবি করছে। বর্তমান! বুঝতে পারে না…সংসারের অন্য কাজে মন দেয়।
তবে একটা শৃঙ্খল থেকে মনকে আংশিক মুক্ত করতে অজুহাত সাজিয়েছে। শাঁখার ভীষণ দাম, কাজের হাত, যখন তখন বেড়ে (ভেঙে গেছে বলা না কি বারণ- বলতে নেই) যায়। ওটা তোলা সাজ করে রেখেছে, ইচ্ছে মতো, দরকার মতো গলিয়ে নেয়।
দামের কথায় সব মানিয়ে যায় সংসারে, সে যদি হয় ঘরের বৌয়ের প্রয়োজনের তালিকা তো দ্বিতীয় বার আর কেউ ভাবে না। সেই সুযোগটাই নিয়েছে তপতী। অবশ্য ওর স্বামীর এইসব ব্যাপারে কোনো মতামত নেই, বক্তব্য নেই- নির্লিপ্ত মানুষ। যদিও তাতেও অসুবিধা হাজার- যত ঝামেলা তপতীকেই সামলাতে হয়। তিনি শুনবেন না, বুঝবেন না কিন্তু “মানিয়ে নিতে” বলতে ছাড়বেন না- ওতেই না কি সব সমস্যার সমাধান। হায় রে কপাল!
দিন যেমন চলে- চলছিল। কখনো এর মন রেখে, কখনো ওর মন রেখে। নিজের মন? সে তো ঘুমিয়েছে না হারিয়েছে- সময় কোথায় ভাবার? কালের চাকায় সময় ঘুরে যায়, ঘুরতে থাকে।
কালের নিয়ম মেনে হঠাৎ করেই তপতীর বাবা একদিন চলে গেলেন এপারের মায়া কাটিয়ে। মা’কে দেখলো তপতী শেষবারের মতো- মায়ের প্রিয় সাজে। দু’বেলা পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে কাচা কাপড়, সিঁথিতে সিঁদুর, কপালে ছোট্ট সিঁদুর টিপ। নিত্যদিনের সাজ হোক বা পুজো থেকে বিয়ে বাড়ি, যে কোনো অনুষ্ঠানে মা-র ওই এক সাজ- অন্য কোনো সাজে কোনোদিন দেখেনি মা’কে। ওটাই যেন মা’র প্রতীক।
বদলে গেল এতোদিনের সাজ এক নিমিষে। চিরদিনের চুপচাপ, কম কথা বলা মানুষটা শোকটাও কেমন নিঃশব্দে পালন করলো। কপালে টিপ নেই- মায়ের এমন মুখ খুব কষ্ট দিচ্ছিল তপতীর মনে।
মুখাগ্নি, অশৌচ, শ্রাদ্ধ সব মিটলো একে একে। এ কয়দিন তপতীও সিঁদুর পরেনি- পরতে নেই না কি…এমন কথাই সবাই বলেছে- তাই পালন করেছে। নিয়মভঙ্গের দিন ব্রাম্ভ্রণের পায়ে তেল-হলুদ দিয়ে স্নান সেরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাতে চিরুনি নিয়ে শুনলো কাকিমা বলছে মা’কে- এবার কদিন চলুন আমাদের কাছে থেকে আসবেন। কোনোদিন তো কোথাও গেলেন না দাদার কষ্ট হবে বলে। এবার একটু ঘুরে আসবেন চলুন। ভালো লাগবে, একটু পরিবর্তন হবে।
মা বললো- আমাকে আর বেরোতে বলিস না রে, এইভাবে কারোর সামনে যেতে পারবো না। আসল সাজটাই লোকটা সাথে নিয়ে চলে গেল- খালি কপাল, খালি সিঁথি নিয়ে কোথায় যাব বল? আমি এখানেই থাকবো… বাকি কটা দিন, যে কদিন বাঁচি, বাইরে বেরোবো না।
অশৌচের পারলৌকিক আচার-বিচারে বেশ কদিন সিঁদুর না পরায় তপতীর সিঁথিও ফাঁকা। হাতে চিরুনি নিয়ে চুলে বিলি কাটতে কাটতে ভাবতে লাগলো- সাজ না পরাধীনতা, তর্ক না বিশ্বাস, ভালোলাগা না মানিয়ে নেওয়া… কোনটা আসল পথ?
মায়ের কাছে যে সাজটা পরম সম্পদ, তা নিয়ে কি তর্ক চলে! মানবিকতা তো এইসময় সেই সায় দেয় না। কিন্তু তিয়াস! ওর যুক্তি তো ফেলে দেবার নয়- ও তো আত্মসম্মানের কথা বলে…
হাজার প্রশ্ন আর দ্বিধা নিয়ে তাড়াতাড়ি সিঁথিতে সিঁদুর লাগিয়ে সরে এলো আয়নার সামনে থেকে।
পরাধীনতা না কি এয়োস্ত্রীর সাজ একরাশ দ্বিধা নিয়ে সংসারের কাজে, কর্তব্য সারতে সমাজের ভিড়ে মিশে গেল সাজানো হাসি মুখে নিয়ে দ্বিধা সীমন্তিনী।পেরিয়ে গেল বছর দুই, আড়াই- মা চলে গেলেন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। বাবার মৃত্যুর পর থেকে শেষ দিন পর্যন্ত মা সত্যিই বাড়ির বাইরে পা রাখেন নি। শান্ত মানুষের জেদ বোধ হয় এমন নীরব আর কঠিন হয়। তপতী আবার একবার প্রিয়জন হারালো, সংসার ছোট হয়ে আসছে যেন দিনে দিনে। মনের গভীরে ডুব দিয়ে দিন কাটে- শত কাজের মধ্যেও মনে হয় মা’র সাথে কথা হলো না আজ,এমনই হয় মনে হয় সবার মা,বাবা-র ছায়া জীবন থেকে সরে গেলে।
চলছিল জীবন বাঁধা গতে- হঠাৎ করেই ছন্দপতন। অফিস থেকে ফেরার পথে কথা বলেও বাড়ি এলো না। দমকা ঝড়ে নিভে গেল প্রাণপ্রদীপ- তপতী সেদিন হারিয়ে গেছিল নিজের পূর্বজীবনে যেখান থেকে একসাথে পথচলা শুরু সেইদিনে। বিশ্বাস তো দূর কথা ভাবতেও পারছিল না মানুষটা নেই। শুধু পাথরের মতো দাহকার্য, অশৌচ বিধি পালন করে গেল। অশৌচবিধি শেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনি দিয়ে অভ্যাসমতো সিঁথির দিকে তাকিয়ে সিঁদুরে হাত দিতে গিয়ে থমকে গেল। আয়নায় নিজের মুখটা দেখতে অচেনা লাগছিল। নিজের মুখ নিজেই সহ্য করতে পারছিল না। আয়নার সঙ্গে খুব একটা সদ্ভাব কোনোদিনই তপতীর নেই। তবে যেতে আসতে চোখ পড়ে গেলে মনে হতো নেই, আর কোনো সাজ নেই। জীবনটা বদলে গেল। ডায়েরি হাতে নিল এক বছর পর। পুরোনো লেখাগুলো পড়তে পড়তে মনে উজাড় করে প্রশ্নের ভিড়… না কোনো তর্ক নেই, শুধু একটাই প্রশ্ন এইভাবে কি সত্যিই হারিয়ে যায় অভ্যাস! বদলে যায় বিশ্বাস? সব দ্বিধা কি এমনভাবেই কাঁদতে বাধ্য করে? জানা নেই- তপতীর কাছে অনেক প্রশ্ন, উত্তর দেওয়ার কেউ নেই।
-
দ্বিতীয় পর্বের চলার পথে
সুধী,
বিধির বিধানে হঠাৎ করেই থেমে যাওয়া… যাঁরা আলাপী মন-এর বড়ো কাছাকাছি তাঁরা থেমে যাওয়ার কারণ জেনেছেন বা জানতে চেয়েছেন তাঁদের কাছে নতুন করে কিছুই বলার নেই- তাঁরা তো মনের মানুষ। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আবার আলাপী মন-এ ফিরে আসতে অনুরোধ করেছেন। পারিনি, চূর্ণবিচূর্ণ মনটা এক জায়গায় জড়ো করতে পারিনি- তবুও প্রিয় মানুষগুলির অনুরোধ, জিজ্ঞাসা- একসময় ভাবতে বাধ্য করলো আলাপী-মন তো আমার আর এক পরিবার। ভুলে ছিলাম কি করে আমার ভীষণ সাধের ‘স্বজন সাথী’ নামটি, এ বোধহয় এক অপরাধ। কিন্তু ওই যে বললাম মনটাকে জড়ো করতে পারিনি এখনও, সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে, অনেক কিছুই মনে পড়ে না, বেদনাদায়ক যেটুকু মনে পড়ে তা আরও বিক্ষিপ্ত করে দিয়ে যায় চলার পথ, মনের রশি। তাও প্রিয়জনদের ইচ্ছেকে মান্যতা দিতে আর একবার চেষ্টা করি, দেখি পারি কি না! যদিও পারা বা না পারা সবটুকুই বিধির বিধান। দ্বিতীয় পর্বের চলার পথে প্রিয় মানুষগুলির সহযোগিতার হাত মসৃণ করবে চলার পথ- এই আশা রাখি।
শুভেচ্ছান্তে,
আলাপী মনWhatsApp নম্বরটি খেয়াল রাখবেন (8910423337)
-
কবিতা- ধুকপুক নিঃশ্বাসে
ধুকপুক নিঃশ্বাসে
–রীণা চ্যাটার্জীকথা মতোই দেখা হল অতিমারি শেষে,
বদলে গেছে অনেক কিছুই,
বদলে গেছি তুমি-আমি,
তোমার আমি, আমার তুমি।
অচেনায় ভীত আমাদের সেই চেনা জগৎ-
এখানে এখন মুদ্রাষ্ফীতির প্রচণ্ড তাপে
আধ-কাঁচা ভাতেও মড়ক জাগে।
ক্ষুধাও যেন তীব্র সঙ্কটের মুখোমুখি…
ক্ষুধাকেই বারবার গিলে খেতে চায়!
এমন কথাই কি ছিল পৃথিবী?
প্রতিবার অতিমারি মড়ক জাগাবে!
প্রতিবার? নিত্য নতুন বেশে আসবে ফিরে
অভ্যাসে অভ্যস্ত হতে হতে…
মোচড় দেবে নবান্নের সমীকরণ?
শুধু কিছু পুরনো মন বেঁচে থাকবে
হুতাশনের তাপে-চাপে-ভাপে!
কথা ছিল দেখা হবে…
কথা মতো দেখাও হল…
অচেনায় ভেজা নিস্তব্ধ সময়-
তুমি কি চেয়েছিলে পৃথিবী এমন?
আমি কি চেয়েছিলাম? জানি না,
হয়তো জানা যায় না,
জানতে পারে না কেউই,
কিছু আগ্ৰাসী দৃষ্টি হঠকারিতায়
লুটে নেয় বেঁচে থাকা আশ্বাস।
তবুও জীবন থাকে বেঁচে,
বুকভরা আশা নিয়ে ধুকপুক নিঃশ্বাসে…
সাহসী ডানার ভরে অতিমারি ফিরে আসে। -
মন বড়ো ছোঁয়াচে
মন বড়ো ছোঁয়াচে
-রীণা চ্যাটার্জীসুধী,
বেশ কয়েকটি মাস পর ফেরার প্রচেষ্টা- এর মাঝে শত, সহস্র চেষ্টা, ইচ্ছে সব ব্যর্থ হয়েছে। জানি না, এবারেও গুছিয়ে উঠতে পারব? না আবার সব এলোমেলো!
ঘটমান জগতে, ঘটে গেল অনেক কিছুই- কিছুটা জানতে পারলাম, বাকিটা অজান্তেই অজানার খামে বন্দী।
আলাপী মন- আমার আর এক পরিবার- বলতে অপরিসীম এক শান্তি বোধ করতাম। সম্পর্কের আচ্ছাদনে মুড়ে ছিল- ভাই, দাদাভাই, বন্ধু, বোন, দিদিভাই। সম্পর্কের দৃঢ়তা আজও আছে, যারা ভালোবেসে সঙ্গে আছে, তাদের ভালোবাসার উষ্ণতায় টের পাই ভুল ছিল না আমার ভাবনায়। তবে ভাবনার আড়ালেও ছিল কিছু বেনোজল, না কি মুখোশ- ঠিক মতো রূপকে নামকরণ করতে পারলাম না, এ আমার চরম অক্ষমতা। মুখোশ পরে থাকা হয়তো সভ্য যুগের বর্ম, শুধু কখন যেন স্বার্থের তিরে ছিঁড়ে গিয়ে কদর্য, নগ্ন রূপটা ভেসে ওঠে- সেই রূপটাই সম্বোধনের ভাষা বদলে দেয় এক লহমায়, পরিবারের পরিভাষায় ছেদ টেনে দেয়, মনটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। মনের এই চরম দুঃসময়ে আমার পরম বন্ধু, সুহৃদ, প্রিয় কবি অমল দাস সযত্নে আগলে রেখেছে আলাপী মন-এর পথচলা। কখনও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়নি আমার কাজ আমি করছি না ‘কেন’? এইখানে মানুষ চেনায় ভুল হয়নি- এই পরম পাওয়া।মনের কথা বললে শেষ হয় না, বড়ো ছোঁয়াচে- কথায় কথায় নাকেকাঁদুনি।
গ্ৰীষ্ম, বর্ষা, শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের সন্ধ্যায় উৎসবের আমেজে আমরা কেমন আছি? জানতে, জানাতে খুব ইচ্ছে করছে। আচ্ছা, এই যে উৎসব পর্ব পেরিয়ে এলাম ঢাক, বাদ্যি, কাশ, পদ্ম, জবা, আলতা, সিঁদুর প্রদীপ, বাজি, ভিড়, হুল্লোড় সবকিছু নিয়ে উৎসবকে সবাই প্রাণঢালা আনন্দে বরণ করে নিতে পারল তো? পারলেই ভালো। যারা পারেনি, তাদের কথা ভাবার সময় বা দায় নিয়ে কি হবে? একবেলার সোহাগী খাবারে তো পিচুটি ঘষা চোখগুলো বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছে ফটো তুলতে- আনন্দ!
পেতে জানালেই হল, যে জানে না- দোষ তার। ঠিক বললাম তো বন্ধুরা!হৈমন্তী শিশিরের শিরশিরে শুভেচ্ছা ও শুভকামনা আলাপী মন-এর পক্ষ থেকে। ভালো থাকা, ভালোবাসা পরস্পর জুড়ে থাক- এইটুকুই ঐকান্তিক কামনা।
-
ছলনায় মঙ্গল
ছলনায় মঙ্গল
-রীণা চ্যাটার্জীসুধী,
“দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটাকে রুখি
সত্য বলে আমি তবে কোন পথে ঢুকি?”খুব পরিচিত কথা বাঙলা মাধ্যমের সব ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষকমহলের কাছে। ভাবসম্প্রসারণের ভাব সম্প্রসারিত করতে অভ্যাসের কলমে কত শব্দের সুড়সুড়ানি।
ক্রমে পেরিয়ে যায় পরীক্ষার চৌকাঠ, পরে কাউকে অভ্যাস করতে দেখলেই মন ঠিক একবার মনে মনে আওড়ে নেয়। কিন্তু দ্ধার কি খোলে? মনে হয় না। তাই সত্য আজও বাইরে অপেক্ষায়। আমাদের সমাজের কান্ডারী নেতাদের, আপাতদৃষ্টিতে নজরে আসা বুদ্ধিজীবীদের দেখে সেই কথাটাই মনে হচ্ছে। নাহলে কিসের এতো অবক্ষয়? একটা ছোট্ট আয়না কি নেই, না কি নিজের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন নেই? সত্য বাইরে অপেক্ষায় বাকি থাকল ভ্রম! সে তো লোহার বাসর ঘরেও সাপের উপস্থিতি আটকানো যায়নি। ভ্রমের বাসর ঘরটাই তো মন। দ্বার বন্ধ করে তাকে তো আরো গভীর আলিঙ্গনে আপন করে নেওয়াই তো রীতি। তাই হয়ে চলেছে ক্রমাগত, ক্রমান্বয়ে… ছলনার মঙ্গলকামনায়।
সমাজের ছবি-প্রতিছবি সব মনে হয় ছোট্ট মনটার মধ্যে অজান্তেই এঁকে দেওয়া হয়। আর আমরা চর্চিত শিক্ষায় বড়ো হয়ে উঠি প্রকৃত অর্থ অনুধাবন না করে। মনের মধ্যে এঁকে দেওয়া চিত্রগুলি নিজের মতো করে বেরঙীন হয়ে যায়। ভ্রমের পথের পথিক হয়ে জীবনটা বেশ কেটেই যায়। সত্যকে চেনা হয় না, জানা হয় না… সময় ঘড়ি ঘন্টা বাজিয়ে দেয়।
জৈষ্ঠ্যের প্রথম দিনে ভয়াবহ উষ্ণ শুভেচ্ছা ও শুভকামনা আলাপী মন-এর পক্ষ থেকে।
-
দিন বদলের পালায়
দিন বদলের পালায়
-রীণা চ্যাটার্জী
সুধী,
ধর্মের নামে বাদী-বিবাদী-র নতুন রূপে রূপসী আমার দেশ, আমার বাংলা, আমার জন্মভূমি, কর্মভূমি। জন্মযোগ, কর্মযোগ সব ধর্মীয় মেরুকরণের পথ দেখাচ্ছে। আমরা দেখছি- কারণ আমরা নিরীহ সংসারী নাগরিক। সংসারের বেড়াজালে জড়িয়ে পেঁচিয়ে পা খালি পেছনেই টেনে নিচ্ছি, এগোনোর ভয় মনের মধ্যে মাকড়সার জাল বুনছে। তবুও মাকড়সার জাল সরিয়ে মনটা মাঝে মাঝেই প্রশ্ন তোলে, ধর্ম দেখতে কেমন? ধর্মের রঙ কি? ধর্মের আহার কি? ধর্মের বাহার! আসলে বর্তমানে ধর্ম তো সবটাই রাজনৈতিক মস্তিষ্কপ্রসূত। শুধু বর্তমানকে দোষ দিয়ে লাভ নেই- রাজনৈতিক রঙ মেখে ধর্ম আগাগোড়াই চলছে, চলবেও। এখন শুধু উলঙ্গপনা ভর করেছে। একে অপরকে কতোটা আঘাত করতে পারবে হয়তো সেই পথেই মুষ্ঠিযোগ সফলতা খুঁজে পাবে। তাই তো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে মানবতার বন্ধন, ভাষার শালীনতা, সম্বোধনের ঐতিহ্য।
বদলের যুগ এসেছে, বদলাচ্ছে চোখের সামনে সম্পর্কের সমীকরণ, স্নিগ্ধতা, পারস্পরিক স্নেহ-শ্রদ্ধার সূত্রটা বেশ নিম্নগামী, সহমর্মিতা হারাচ্ছে নিত্য… তবুও মন বলছে মানবিকতা আছে বলেই আজও পৃথিবীতে ভারসাম্য আছে। তাই কালের মেঘ কেটে গেলে আবার হাসবে ভরসার সূর্য।
উষ্ণতাবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। তবুও উৎসবের আমেজ ঠিক আসে, ঋতু বদলের পালায়। পঞ্জিকা মতে আজ বর্ষবরণের দ্বিতীয় দিন। নবীনের আহ্বানে জানাই নববর্ষের শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।
-
কবিতা- কিস্তিমাত
কিস্তিমাত
-রীণা চ্যাটার্জীবাড়িগুলো সব বদলে ফেলেছে ছাঁচ,
সদর-উঠোন মুছে দিয়ে উঠেছে পৃথক পাঁচ,
সারা পাড়া জুড়ে ওঠে না রাতের আওয়াজ,
তবুও মৃদু কড়ানাড়া মাঝ রাতে
ভেসে আসে মাঝে মাঝে,
“অবনী বাড়ি আছো?”
জানো না বুঝি ‘অবনী’ হয়েছে নিখোঁজ?
তবু তার খোঁজে নিঃঝুম তোলপাড়,
বেইমান জাত রাতের আঁধারেই ভেক ধরে
মুখোশের আড়ালে অবনী-কে খুঁজে যায়।লুকিয়েছে অবনী, হারিয়ে যাবে বলে,
সেই কথা পথ জানে আর জানে অবনীর প্রাণ, সংগ্ৰাম ছিল মুঠোবন্দী ডোরে…
রাতের পৃথিবীকে চিনে নিতে যতটুকু দেরী,
নিখোঁজ হয়েছে পথকে সঙ্গী করে,
অবনী ফেলে গেছে কথা দোরে,
অবনী চলে গেছে কাক ভোরে।
অবনী মিশে আছে অভিযাত্রিকের ভিড়ে।শুনছো ছদ্মবেশী, হয়েছে তোমার দেরী,
অনেক দেরী- ফিরে যাও এবার..
রাতঘুম আর নষ্ট করো না কড়া নেড়ে,
মুখোশ বদলেও হেরে গেছ তোমরা,
লক্ষ তারার ভিড়ে বেঁচে আছে আজও সে-
কিস্তিমাতের কিসমতে জিতে গেছে অবনী।(‘অবনী’ এক প্রতীকী চরিত্র রূপে ব্যবহার করা হয়েছে। যে সমাজের নগ্ন রূপের রহস্য ও ষড়যন্ত্র জানতে পেরে হারিয়ে বাঁচতে চেয়েছে নতুন পরিচয়ে। যদিও শ্রদ্ধেয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘অবনী বাড়ি আছো’- র মূল চরিত্রটির নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তবে তা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক অর্থে। তবুও অজান্তেই কারোর ভাবাবেগের আঘাতের কারণ হলে ক্ষমাপ্রার্থী)
-
নিরপেক্ষতা
নিরপেক্ষতা
-রীণা চ্যাটার্জীসুধী,
‘নিরপেক্ষতা’ আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ একটি শব্দ। এও সর্বজনবিদিত যারা নিরেপক্ষ থাকতে পচ্ছন্দ করে তারাও আদ্যপান্ত নিরীহ। তারা ঝড়ঝাপ্টা ঝরা পতার মতো ঝেড়ে ফেলে জীবনের সুখী গৃহকোণে আবদ্ধ হয়ে যায় অনায়াসে। একটা দন্ডী কেটে নেয় খুব সুন্দর যুক্তি দিয়ে- ‘আমার তো কিছু নেই, আমি কেন কিছু বলব! আমার কাছে সবাই সমান’ কথাটা এইভাবে ভাবতে গেলে যার পায়ে কাঁচ ফোটেনি সে ধন্য ধন্য করে উঠবে, আর যার ফুটেছে? সেই জানে নিরপেক্ষতা শব্দটা কি অসম্ভব রকমের বিষাক্ত! জীবনের অর্থটাই বদলে যায়, বদলে যায় সম্পর্কের সমীকরণ- কেউ যখন সত্যি জেনেও নিরপেক্ষতায় ছদ্মবেশী হয়ে যায়!
সত্যি করে ভাবতে গেলে নিরপেক্ষতা নিরাপদ হলেও নিরীহ কতোটা? আসল কথা নিরপেক্ষতা হয়তো একটা মুখোশ- যা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে নিখুঁত করে বানানো। নাহলে সত্যকে সত্য বলে মানতে, আর মিথ্যেকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পিঠের ওই গোল গোল টুকরো হাড়ের গঠনটা অনেক মজবুত হতে হয়। বিকৃত বা বিক্রিত মনের কাজ নয়। যার মজবুত সে বড়ো বদ, মুখরা- আরো কত বিশেষণ! কিন্তু সময়ে বড়ো প্রয়োজনীয় ওই মানুষগুলো যারা শিরদাঁড়া নিয়ে অনায়াসেই সত্যের মুখোমুখি হতে পারে। বিপদের দিনে মনে হয় এমন একটা নির্ভরযোগ্য লোক যদি পাশে থাকত, যে সমাজের বুকে সত্যের প্রতিচ্ছবিটা তুলে ধরত। দুর্ভাগ্যবশত সবার কাপলে জোটে না। তাই সত্যিটা অধরা থেকে যায় আর মিথ্যে প্রবাদী বচনে জিতে যায়- ‘চোরের মায়ের বড় গলা’। রামকৃষ্ণ দেব তো বলেই গেছেন- যার যেমন ভাব, তার তেমন লাভ।
লাভের পারানি গুনতে গুনতে জীবনটা কেটে যাবে।চৈত্রের প্রথম সন্ধ্যা, কালবৈশাখীর পূর্বাভাস থাকলেও চৈতালি আসে কি না সেটাই অপেক্ষার। যে এলোমেলো হাওয়া আর সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে জুড়িয়ে দিয়ে যাবে অপেক্ষার কয়েকটি প্রহর।
চৈতালি শুভেচ্ছা ও শুভকামনা সকলের জন্য আলাপী মন-এর পক্ষ থেকে। -
কবিতা- নিদ্রায় মগ্ন
নিদ্রায় মগ্ন
-রীণা চ্যাটার্জীশুনতে চেয়েছি কতবার… কত কথা
বলেছিলে কোনো কথা? কখনো?
মনে তো পড়ে না আবছা দূরের স্বরে’ও
বলিরেখা ঢেকে দিয়ে গেছে হয়তো!ভ্রান্তির শহরে অচেনা পথিক হাঁটে,
দৃষ্টির আঁশে অস্বচ্ছ ঘষা স্বপ্ন-
কলরব ওঠে নীরবতার নৈবেদ্য ঘিরে,
দেবহীন গৃহে আরতির ব্যর্থ বাদ্য।মনের সাথে উলঙ্গ তরজা চলে,
হারজিত কিছু নগ্নতা ফেরি করে,
ক্লান্তির বিষুবে সময় পেরিয়ে গেলে’ও
ব্যস্ততার দাপটে অপেক্ষা জাবর কাটে।ঘোর লাগা চোখে ঘুম আসে আর যায়
বৃষ্টি-কুহকে অবারিত খোলা দরবার,
ভুল করে যদি ভোলা মন প্রশ্ন শুধায়?
চোখে চোখ রেখে উত্তর পেতে চায়?পড়ে থাকবে অষ্ফুট তোমার প্রশ্ন,
ফেলে রেখে যাব আমার নির্বাক দৃষ্টি,
নৈঃশব্দ ছুঁয়ে সময়ের সীমানা এলে
নিথর নিদ্রায় মগ্ন আমার পৃথিবী। -
আজ তবে এইটুকু থাক
আজ তবে এইটুকু থাক…
–রীণা চ্যাটার্জী
সুধী,
শুরুটা আজ একটু অন্যরকম। সেদিন ছিল শিব চতুর্দশীর পুণ্যলগ্ন। দু’পক্ষ কাল পার করে প্রথম সম্পাদকীয়–
(আমার ইচ্ছা প্রকাশ
-রীণা চ্যাটার্জী
সুধী,
দু’পক্ষ কাল পার করে এলো সবাকার “আলাপী মন”। “আলাপী মন” আমার ইচ্ছার প্রকাশ। সাহিত্যের খুঁটিনাটি, খড়কুটো মূল্যবান করে রাখার আশা সাহিত্যের আঙিনায়। সবসময়ের সবক্ষেত্রেই দোসর আমার একমাত্র আত্মজা পরম সহিষ্ণুতায় মেল বন্ধন করালো আমার ইচ্ছা “আলাপী মন” এ। কৃতজ্ঞ আমার প্রিয় সাহিত্যিক বন্ধু অমল বাবুর কাছে, যাঁর সহযোগিতা ছাড়া আমাদের আঙিনা গুণীজনদের সমাহারে সেজে উঠতো না। তিনি পরম বিশ্বাস, ভরসা দিয়ে হাত ধরেছেন “আলাপী মন”এর। সাজিয়ে দিয়েছেন অনেক পরিশ্রমে সাহিত্য কুসুম দিয়ে আমাদের আঙিনা। কৃতজ্ঞ আমি সকল লেখক লেখিকার কাছে যারা প্রথম দিন থেকেই আমাদের সাথী- স্বজন সাথী। অনেক দ্বিধা নিয়ে শুরু হয়েছিল পথ চলা, কালের বাণী কি আমাদের জানা নেই…তবে যাঁদের সহযোগিতা জন্ম লগ্ন থেকে আমরা পেলাম তাঁদের সাহিত্য আলাপন আগামীতেও আমাদের সমৃদ্ধ করবে এই আশায় থাকলাম।
সকল লেখক লেখিকার সাহিত্য রচনায় বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। উৎকর্ষতার বিচারে দুঃসাহস নিয়ে নয় কিছু রচনা মনে ছাপ ফেলেছে…’পঙ্গুত্বের জয়’, ‘দায়িত্ব’, ‘বসন্ত আমার গঙ্গাজল’, ‘ওই মেয়ে’, ‘স্মৃতিপট’ নাম নিয়ে বোধহয় তালিকা বৃদ্ধি পাবে, তাই সবাইকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাই।
কুশল কামনা করি সবার জন্য।)
প্রথমটুকু স্মৃতিচারণা। ইচ্ছে হল ফিরে দেখি একবার- পেরিয়ে এলাম পাঁচটি বসন্ত। শিখলাম অনেক কিছুই, জানলাম অনেক কিছু। ভুলভ্রান্তি শোধরানোর চেষ্টা তো অবশ্যই করেছি, জানি না কতোটা পেরেছি।
সার্থকতা- এ এক অমোঘ প্রশ্ন। তবে পথ চলতে চলতে মুখ-মুখোশের তফাৎ চিনেছি। এও জেনেছি- মুখোশ খুলবেই, ও ঢেকে রাখার নয়। তাই মুখের মুখোশী মুখের হাসিও দেখেছি, কষ্ট যে পাইনি তা নয়। তবে আজকাল সহ্য হয়ে গেছে। নম্রতা দেখেছি, ঔদ্ধত্য দেখেছি- তবে আমার জানি না কেন ছোট্ট থেকে মনে হয় প্রকৃত কলম সর্বদা নতমুখী। কলমে প্রতিবাদ সাজে, বিক্ষোভ সাজে কিন্তু ঔদ্ধত্য! কে জানে! তবে আজও অমলিন মুখের হাসি, অকৃত্রিম গলার স্বরে বড়ো শান্তি পাই। শুরু থেকে আজকের দিন পর্যন্ত যাঁরা আমাদের হাত ভালোবাসার বন্ধনে বেধে রেখেছেন তাঁদের কাছে আলাপী মন কৃতজ্ঞ। কারণ মনটুকু ভরসা করেই দিন কাটছে- মনের আলাপ বন্ধ হলে সেদিন? সে হয়তো ইচ্ছের ইচ্ছেমৃত্যু। বাকী দেহ তো নশ্বর…
ফাল্গুনী শুভেচ্ছা ও শুভকামনা আলাপী মন-এর পক্ষ থেকে।