-
গল্প- ভবিতব্য
ভবিতব্য
-শচীদুলাল পালবিভাস তার জীবনকাহিনী বলছে তার এক অতি ঘনিষ্ঠের সামনে —–
আমার বয়স তখন ২৮,ম্যাথেমেটিক্সে এম.এসসি পাশ করে কোনো চাকরি বাকরি পায়নি। বেকার। দু একটা টিউশানি করে কতটুকু বা আয় হয়?হাত খরচাটাও আসেনা। প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষা দিচ্ছি চাকরি পাবার আশায়।
এক খ্যাতনামা জ্যোতিষ যিনি আমার কুষ্টি তৈরি করেছিলেন তার কাছে একদিন গেলে কুষ্টি দেখে ভবিষ্যৎ বাণী লিখে দিলেন, প্রবল ধনযোগ আছে।নবমাধিপতি স্থিত অংশ অধিপতি, ভাগ্যস্থানে উচ্চস্থ পঞ্চমাধিপতির সহ যুক্ত থাকায় লক্ষীযোগ হয়েছে।ফলে কীর্তিবন্ত, রাজসদৃশ ধনবান হবে।উত্তমা স্ত্রীলাভ হবে।
আকস্মিক অর্থলাভ যোগ আছে।
অষ্টমপতি অষ্টমস্থানে, মৃতব্যাক্তির সম্পত্তি প্রাপ্তি যোগ আছে। বর্তমান সময় কষ্ট কর। শনি- চন্দ্রের দশা-অন্তর দশা ও শনির সাড়ে সাতি চলছে।মাস দুয়েক পরেই দীর্ঘ সাড়ে সাত বছরের সাড়ে সাতি শেষ হবে।বর্তমানে প্রবল দারিদ্র্য যোগ।
স্ত্রী স্থান খুব শুভ। খুব সুন্দরী স্ত্রী লাভ হবে। স্ত্রী বিনয়ী,নম্র,সর্বসুলক্ষনযুক্তা, সুচরিত্রা,স্বামীপ্রিয়া হবে।
আমি বিয়েই করবো না মনস্থ করেছি স্ত্রী লাভ কি করে হবে?
ভাতৃস্থান অতি অশুভ। সন্তান স্থানে দেখা যাচ্ছে এক কন্যা হবে।
অনেক শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। কর্মস্থান মধ্যম।চাকুরি লাভ হবে।
জ্যোতিষের ভবিষ্যৎ বাণী বিশ্বাসই হলো না।একান্নবর্তী পরিবারে দুই দাদা দুই বৌদি তাদের একটি করে সন্তান। ঘরে নিত্য অশান্তি।একে অপরের সাথে শুধু উচ্চগ্রামে কলহ কচকচি । প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসতে গেলে অনেক স্টাডি করতে হবে।কিন্তু দিন দিন বাড়ির বাতাবরণ ঝগড়াঝাঁটিতে এমন পর্যায়ে পৌছে যাচ্ছে যে কান ঝালাপালা হয়ে যায়।মা বাবা ঠাকুরমা অনেকদিন আগেই পরলোকে। শুধু ঠাকুরদাদা আছেন। বৌদিরা শুধু দাদা- শ্বশুরের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে আছে। বাড়ীটা ছেড়ে যেতে পারছেনা। যদি অন্য কাউকে লিখে দেয়। বুড়োটা যে কবে মরবে?
বেকার বলে একবৌদি একদিন বলেই দিল
— বিধবা মেয়ের মতো ঘরে বসে বসে অন্নধংস করছো।
আর এক বউদি বললো
— সংসারে টাকা দাও নাহলে রাস্তা দেখো। আমরা পারবোনা এভাবে তোমার পেট চালাতে।
ধুমসো যোয়ান মরদ! কুলি মজুরি করেও তো দুটাকা আয় করতে পারো?
ভাইপো ভাইঝিরাও অবজ্ঞা করে।অবহেলা করে সবাই।আমি যেন এক গলগ্রহ।ভবিষ্যৎ চিন্তায় একেই চিন্তাগ্রস্ত বিমর্ষ থাকি। তার উপর নানা সব কথার বাণে জর্জরিত।একদিন আমি আশার এক চিলতে আলো দেখতে পেলাম।
একদিন ” আমার শহর ” নামে এক পাব্লিক ফেসবুক গ্রুপের বিজ্ঞাপনে দেখলাম “একটা টিউশন টিচার চাই।”
উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। নীচে ফোন নং। কিছুদিন আগে এইরকম বিজ্ঞাপন খবরের কাগজে ও OLx এ-ও দেখেছি। একদিন ফোন করলাম।ফোন নাম্বারটি একই। অপরপ্রান্ত থেকে বলল
— বলুন কি বলতে চান। আমি তখন বিজ্ঞাপনের কথা সবিস্তারে বললাম।
— আপনি সন্ধ্যা বেলায় বাবুর সাথে কথা বলবেন। আমি তার বাড়ির খাস চাকর নিবারণ।
এখন আপনি আপনার সম্বন্ধে কিছু বলুন। তাতে যদি বাবুর পচ্ছন্দ হয় তবেই আপনার সাথে কথা বলবেন। এইটি আপনার নং?
— হ্যাঁ।আমি সবিস্তারে আমার বায়োডাটা বললাম।
— আপনি অনেক শিক্ষিত। বাবু আপনাকে ফোন করবে।
সন্ধ্যাবেলা ফোন এলো। ফোনে দু একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে আমি উত্তর দিলাম।
বাবু বললেন
— তুমি কাল সন্ধ্যা বেলা তোমার কাগজ পত্র, বায়োডাটা ইত্যাদি নিয়ে চলে এসো।
পাশের শহরে আমি ঠিকানা খুঁজে পৌঁছে গেলাম।বিশাল বাড়ি। পুরানো আমলের অনেকটা জমিদার বাড়ির মতো। সংস্কার করে ঝাঁ তকতকে করা হয়েছে।অনেকটা জমি। জমিতে বিভিন্ন ধরনের গাছ গাছালিতে পূর্ণ।
চুল রুক্ষশুষ্ক।খোচাখোচা দাড়ি।অনেকবার কাচা হয়েছে এমন এক রঙচটা শার্ট-প্যান্ট পরে দরজায় বেল বাজাতে সেই খাস চাকর নিবারণ দরজা খুলে বললো —
–আপনি বিভাস চৌধুরী? বাবু আপনাকে গতকাল আসতে বলেছিলেন?
— হ্যাঁ। আমিই বিভাস চৌধুরী।
আমাকে সোফায় বসতে বলে ভিতরে চলে গেলো।
কিছুক্ষণ পরে বাবু এলেন।
সন্দেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে জরিপ করলেন, কাগজপত্র খুঁটিয়ে দেখে বললেন।
–আমার নাম দর্পনারায়ণ সিংহ। একডাকে এ অঞ্চলের সবাই আমায় চেনে।
তুমি আমার মেয়েকে পড়াবে।সে তার নিজের সময় অনুযায়ী সময় দেবে।
আমি বললাম কিন্তু স্যার আমার বাড়ি অনেক দূরে।
— সে তোমায় ভাবতে হবেনা। তুমি থাকবে আমার বাড়ির প্রাচীরের বাইরে আমারই জমিতে একটা ঘরে।তুমি উপযুক্ত বেতন পাবে।
তোমার বাক্স পেঁটরা নিয়ে কাল থেকে চলে এসো।ওখানে তোমাকে নিজেই রান্না বান্না করে খেতে হবে।
আমি রাজি হয়ে গেলাম।পরদিনই এক অজানা ভবিষ্যতের উদ্যেশ্যে পাড়ি দিলাম।
একটা কিটস ব্যাগে জামাকাপড় আর বইপত্র নিয়ে হাজির হতেই নিবারণ আমায় প্রাচীর সংলগ্ন সেই ঘরটিতে নিয়ে গেলো। টালির ছাউনি দেওয়া ঘরে একটায় রুম। ভাঙা নড়বড়ে তক্তাপোশ। একটা নড়বড়ে টেবিল ও চেয়ার। রান্না বান্না করার সরঞ্জাম গ্যাসস্টোভ চাল ডাল নিবারণ আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছে। ঘরটাতে একটা জানালা। জানালা খুলতেই পোকামাকড় টিকটিকি গিরগিটি হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকতে শুরু করলো। ল্যাজ তুলে একটা কাঁকড়া বিছেও ঢুকে পড়েছে। নিবারণ সেটাকে বেশ কায়দা করে মারলো।টালি ভাঙা পরিত্যক্ত ঘরটিতে জলও পড়ে। মেঝেতে জলের দাগ দেখে বুঝলাম।দূরে একটা কুঁয়া, তারপাশে পায়খানা। আলো নেই। টর্চের আলোয় ভরসা।ঘর দেখিয়ে নিবারণ চলে গেলো। কিছুক্ষণ পরে আবার এসে বলল
—বিভাসবাবু চলুন, আপনার ছাত্রী আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছে।
আমি গিয়ে বসে আছি। ছাত্রীর দেখা নেই। নিবারন এসে চা ও জলখাবার দিয়ে গেলো। অনেকগুলো আইটেম। ক্ষুধার্ত আমি একে একে সব খেয়ে ফেললাম। রাতে আর না খেলেও চলবে।
বেশ কিছুক্ষণ পর ছাত্রীটি এলো। আধুনিকা বলতে যা বোঝায় সেই রকম পোশাক আশাক।মেয়েটি এসে বললো
— আমার নাম প্রিয়ংকা। পড়াশোনায় আমার মন নেই।ওগুলো আমার মাথায় ঢুকে না।আপনাকে পড়াতে হবেনা। আমার সব সাবজেক্টের হোমওয়ার্ক আপনি এই খাতায় লিখে দেবেন। আমি কপি করে স্কুলে জমা করব।
— সামনে তোমার মাধ্যমিক পরীক্ষা। তুমি কিভাবে পাশ করবে?তোমার ভবিষ্যৎ?
— সে আপনাকে ভাবতে হবেনা। আমার বাবার প্রচুর টাকা। বিশাল লম্বা হাত। আপনি চুপচাপ নিজের কাজ করবেন। আমি মোবাইলে চ্যাট করবো। যদি রাজি থাকেন তাহলে ভালো, নাহলে উল্টো আপনাকে ফাঁসিয়ে দেব। এর আগে মিথ্যে বদনাম দিয়ে অনেক মাষ্টারকে আমি তেড়েছি।
আমি অনিচ্ছাকৃত রাজি হলাম।
রাত এগারোটা নাগাদ আমার জন্য বরাদ্দ সেই ভুতুড়ে ঘরে ফিরে এলাম। গা ছমছম পরিবেশ।বহুকাল এই ঘরে কেউ বাস করেনি।বাইরে নিশাচর পাখির কর্কশ আওয়াজ।আমি মনকে শক্ত করে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ঘরদোর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে, যা ছিলো তাই রান্না বান্না করে পড়াশোনায় মন দিলাম। প্রতিযোগিতা মূলক পরিক্ষায় বসার পড়াশোনার জন্য এই নিরিবিলি ঘরটি আমার কাছে খুব উপযুক্ত।
আসার সময় চার্জেবল টেবিল ল্যাম্পটি নিয়ে এসেছিলাম।রাতে মেয়েটিকে টিউশন পড়িয়ে ফিরে এলাম ঘরে। দিনের রান্না করা খাবার গুলো খেয়ে পড়তে বসলাম। পড়তে পড়তে রাত হলো। নিশুতি রাত।হঠাৎ লোড সেডিং।আলো চলে গেলো। চাপ চাপ অন্ধকার। বাইরে থেকে কুকুরের আর্তনাদের শব্দ ভেসে আসছে। নিশাচর পাখির কর্কশ আওয়াজ। টেবিল ল্যাম্পে চার্জ দেওয়া হয়নি। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে তক্তাপোশে শুয়ে পড়লাম।চোখদুটো লেগে এসেছে। একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব। হঠাৎ একটা ফিসফিস মেয়েলি কন্ঠস্বর।আমি কান খাড়া করে শুনবার চেষ্টা করলাম। মেয়েটি কাঁদছে। হঠাৎ অস্পষ্ট দেখলাম আমার সামনে সাদা শাড়ি পরা ঘোমটা মাথায় একটা মেয়ে। আমি চীৎকার করে বললাম কে ওখানে?
হাতড়ে টর্চের আলো ফেলতেই মেয়েটি অদৃশ্য হয়ে গেলো।আমি অনুভব করলাম এই ঘরে প্রেত আছে। আমার নার্ভাস সিস্টেম খুব স্ট্রং। ভূত প্রেতে আমি বিশ্বাস করিনা। তাই সেরাতের মতো ঘুমিয়ে পড়লাম।ঘুম থেকে উঠে দিনের বেলা ভাবছি গতরাতের কথা। ভ্রম ভেবে উড়িয়ে দিলাম।
পরের দিন যথারীতি কাজকর্ম করে, টিউশনি পড়িয়ে, ঘরে এসে কাজকর্ম করে খাওয়া দাওয়া সেরে পড়তে বসলাম।
টেবিল ল্যাম্পের আলোতে পড়ছি।হঠাৎ শুনলাম খিলখিল হাসির শব্দ।আকস্মিক দেখলাম আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাদা শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা।
সে বললো
—আলো জ্বালবে না।
আলো আমার সহ্য হয়না। কি এতো পড়ছো?
আমার খুব কৌতুহল হলো বললাম
–বেশ আলো জ্বালবো না।কিন্তু আপনি কে? আমার কাছেই কেন বা আসেন?
সে তখন কাঁদতে কাঁদতে বললো
— আমার দীনদরিদ্র নাতির-ছেলের এক কন্যা আছে। কন্যাটি সুন্দরী। পাড়ার বখাটে ছেলেরা তাকে সম্ভোগ করতে চায়। শিয়াল কুকুরের মতো তাকে ছিঁড়ে খেতে চায়।
শিয়াল কুকুরের হাত থেকে তুমি
মেয়েটিকে বাঁচাও। তুমি ভালো ছেলে।তোমার কাছে একটা অনুরোধ তুমি মেয়েটিকে বাঁচাও।
— আমি হো হো হেসে বললাম, আমার দ্বারা সেটি অসম্ভব। কারণ আমি বিয়েই করবো না। আমার নিজেরই চালচুলো নেই।বিয়ে করে খাওয়াবো কি? তাছাড়া আপনি বলছেন আপনার নাতির ছেলের কন্যা।তাহলে আপনার বয়স কত? একশ বছরের বেশি!
— আমার বয়সের গাছপাথর নেই।ওই মেয়েটির সৎপাত্রে বিয়ে দিয়ে আমি মুক্তি পেতে চায়। আমার অতৃপ্ত আত্মা শান্তিলাভ করবে।
— এবার বুঝেছি আপনার মতলব। আপনি আমার কাছে আসবেন না। এই বলে টর্চের আলো ফেলতেই বৃদ্ধা অদৃশ্য হয়ে গেলো।এরপর দিন কয়েক তার দেখা নেই।
শুধু ভাবি বৃদ্ধাটি অশরীরী হলেও তার সাথে কথা বলতে ও শুনতে বেশ ভালো লাগে।একাকি এই ঘরে একা একা থাকতে থাকতে কেমন যেন মনমরা লাগে।অশরীরী হলেও একজন সাথী তো ছিল।
দিন দশেক পরে। বাইরে তুমুল ঝড় জল বৃষ্টি।শুনশান রাতের নিঃস্তব্ধতা ভেঙে এক সাঁপে ধরা ব্যাঙের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে।আমি ভয়ে বিবর্ণ। প্রবল বেগে হাওয়া বইছে। মনে হচ্ছে হাওয়ার দাপটে পুরানো জরাজীর্ণ দরজাটা ভেঙে যাবে।অন্ধকার। লোডশেডিং। সামনে দেখি সেই বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। আজ তাকে বললাম বসুন।তিনি আমার তক্তাপোশের পাশেই বসলেন।
এ কদিন আসেননি কেন? আপনার অব্যক্ত কথা শুনতে ভালো লাগে। আমি সাহিত্যচর্চা করি। একটু আধটু লিখি বিভিন্ন পত্রিকাতে।
আপনার কাহিনি লিখবো।
বৃদ্ধার খিলখিল হাসির শব্দে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ হলো। ।ও সব ছাইপাঁশ লিখে কিচ্ছু হবেনা। ধান্দাবাজ।
— বেশ বলুন। আমি শুনবো।
বৃদ্ধা তখন তার কাহিনি বলতে শুরু করলো
—-আমার নাম বিষ্ণুপ্রিয়া আমার স্বামীর নাম লক্ষীপতি।আমাদের ছিল লোহা লক্করের ব্যবসা।মনোপলি ব্যবসা।এই তল্লাটে এ ধরনের ব্যবসা করে আমাদের চেয়ে কমদামে কেউ দিতে পারতো না। তাই রমরমিয়ে চলতো।আমাদের ঘরে রাধামাধবের নিত্য পূজা সেবা হতো।হরি কীর্তন হতো। গীতা ভাগবত পাঠ হতো। খুব ধার্মিক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন আমার স্বামী।ছেলের নাম রেখেছিলেন মদনমোহন। মদনমোহন খুব বিলাসী ছিল।ঘরে বাঈজী নাচ করাতো। মদ খেয়ে মেয়েছেলে নিয়ে ফুর্তি করতো।আমার স্বামীর এসব অনাচার একেবারেই সহ্য করতে পারতোনা।একদিন ছেলেকে শাসন করতে গিয়ে হার্ট এটাকে মৃত্যু হলো। বাবার মৃত্যুর পর ছেলে মদনমোহন তার বিলাসিতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল।কর্মচারীরা চুরি করতে লাগলো।
ব্যবসা পড়তির দিকে। কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
আমার পুত্রের এক পুত্র হলো অর্থাৎ আমার নাতি, নাম রাখলাম মুরারিমোহন।সেতো বড়ো হয়ে আরও বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিল।বেশ্যাপল্লীতে রাত কাটাতো। রেস খেলতো। জুয়া খেলতে গিয়ে
সর্বস্বান্ত হলো। ব্যবসা লাটে উঠলো। জমা টাকায় হাত পড়লো। ব্যবসা আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। দেনার দায়ে সব একে একে বিক্রি হয়ে গেলো। একদিন সিঁদুকের চাবি চাইলো নাতি মুরারিমোহন।আমি চাবি দিতে রাজি না হলে সে আমাকে মারধোর শুরু করলো। আমি এক গভীর রাতে সিঁন্দুক থেকে একশোটা মোহর একটা ঘটিতে পুরে ভালো করে মুখ বন্ধ করে বাড়ির কোনায় অশ্বত্থ গাছটির নীচে পুঁতে দিয়ে এলাম। পরবর্তী বংশধরেরা ভোগ করবে এই ছিল মনস্কামনা।এরপর নাতি মুরারিমোহনের এক পুত্র হলো। নাম তার পুরঞ্জন।
তার জন্মের পর ঘরে ডাকাতি হলো।যা কিছু অবশিষ্ট ছিল সেগুলো সব নিয়েও তারা সন্তুষ্ট না হয়ে আমার কাছে সিঁন্দুকের চাবি চাইলে আমি দিয়েও দিলাম। দেখলো সিন্দুক ফাঁকা।তখন তারা আমার নাতিকে জোর জবরদস্তি করতে গেলে আমি প্রতিবাদ করলাম। আমার নাতিকে গুলি করতে গেলে আমি বুক চিতিয়ে রক্ষা করতে গেলে গুলিটা আমার বুকে লাগলো। সাথে সাথেই আমার মৃত্যু হলো।
অভাব অনটনের সংসারে নানান রোগভোগে বিনা চিকিৎসায় একে একে পরিবারের সবাই পরলোকে চলে গেলো। পারিবারিক দেনা শোধ করতে পুরঞ্জন বাড়িটি বিক্রি করতে বাধ্য হলো। এক চিটিংবাজ এসে পুরঞ্জনকে বললো
— এই দেখো তোমার বাবা আমার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলো। সুদে আসলে বিশাল টাকা। এইটাকা তুমি দিতে পারবেনা জানি তবে তুমি যদি জমি জমা সমেত পুরো বাড়িটা বিক্রি করে দাও আমি তোমার পিতৃপুরুষের ঋণ মকুব করে কিছু টাকাও তোমাকে দেব। অগত্যা পুরঞ্জন জমি বাড়ি সব বেচে দিয়ে নামমাত্র কয়েকটি টাকা ও একমাত্র কন্যা মনোরমাকে নিয়ে বস্তিতে ঘরভাড়া নিয়ে থাকতে লাগলো।
পুরঞ্জন নানান জটিল রোগে আক্রান্ত। যেটুকু অবশিষ্ট ছিল সব প্রায় শেষ। মেয়ে মনোরমা ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে বিবাহ যোগ্যা। কিন্তু কি করে বিয়ে দেবে। মনোরমা বলে, “তার বিয়ে হয়ে গেলে বাবাকে কে দেখবে। “
এতক্ষন বৃদ্ধা প্রেত কথা বলেই যাচ্ছিলো। আমি চুপচাপ শুনছিলাম। বৃদ্ধা একটু কথা বলা বন্ধ করলে আমি জিজ্ঞেস করলাম।
পুরঞ্জন তার মেয়েকে নিয়ে কোথায় থাকে?
— এই শহরের দক্ষিনে এক বস্তিতে থাকে।
— আর যে বাড়িতে আপনি ও আপনার বংশধরেরা থাকতো সেটি কোথায়?
— যে বাড়িতে আপনি টিউশন পড়ান সেই বাড়িটায় আমাদের বাড়ি ছিলো। চিটিংবাজ দর্পনারায়ণ সিংহ আমার প্রপৌত্রকে মিথ্যে দেনার দায়ে জাল নথি দেখিয়ে বাড়িটা কিনে নিয়েছে নামমাত্র কয়েকটা টাকা দিয়ে।
— মোহরের ঘটিটা কোথায় পুঁতে রেখেছেন?
— পূর্বে যেটা আমাদের বাড়ি ছিল এখন দর্পনারায়ণ সিংহের বাড়ি, সেখানে দক্ষিণ দিকে প্রাচীরের গায়ে যে অশ্বত্থ গাছ আছে তার তলায়। আমি এখনো ওই গাছেই থাকি। যতদিন ওই মোহরগুলো পুরঞ্জনের হাতে পৌঁছে দিতে পারছি এবং মনোরমা সৎপাত্রস্থ হচ্ছে ততদিন আমার মুক্তি নাই।
আমার অনুরোধ তুমি বাবা ও-ই মোহরের ঘটিটা উদ্ধার করে পুরঞ্জনের হাতে তুলে দাও।
— ওরে বাবা! আমি পারবো না। ওই ভুতুড়ে জায়গায় আমি যেতে পারবো না।তাছাড়া দর্পনারায়ণ বা তাদের বাড়ির কেউ যদি দেখে ফেলে তাহলে আমাকে মেরে দেবে।
— তোমার কোনো ভয় নেই। রাত্রের বেলা সবাই যখন ঘুমাবে তখন যাবে।
— এতবড় দুঃসাহসিক কাজ করে আমার কি লাভ হবে?
— তোমাকে সাতটি মোহর দেওয়া হবে? বলে বৃদ্ধা প্রেত অদৃশ্য হয়ে গেলো।
আমি সারারাত ভাবলাম ৭ টি মোহরের অনেক দাম। আমি বেকার। টিউশানি করে খাই।তাও অনিশ্চিত। ছাত্রীটির মর্জির উপর নির্ভর করছে।
বাড়িতেও কেউ ভালোবাসেনা। আমার জীবনের কোনো দাম নেই।
এই দুঃসাহসিক কাজ করে এক কন্যাদায়গ্রস্ত বাবার কিছু উপকার করলে ঈশ্বর সদয় হবে। তাঁর কৃপায় একটা চাকরি পেতে পারি। কিন্তু কয়দিন থেকে বৃদ্ধা প্রেতটি আর আসেনা।অনেক রাত জেগে পড়াশোনা করি। সবটাই ভ্রম ভেবে ভাবি, আমি বোধহয় হ্যালুশিনেশনের শিকার।
বৃদ্ধার আসার আশা ছেড়ে আমি পড়াশোনায় মন দিয়েছি। রাত জেগে পড়ি।
একরাত শুতে দেরি হলো। অন্ধকার ঘর। হঠাৎ ফিসফিস মেয়েলি শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। দেখি বৃদ্ধা সামনে দাঁড়িয়ে আছে।বলছে,
— চলো শিগগির। আজ উপযুক্ত অমাবস্যার রাত।দর্পনারায়ণ মদ খেয়ে বেহুঁশ। ওর স্ত্রী বাত বেদনায় যন্ত্রণা কাতর।কড়া ডোজের ঘুমের অষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছে। নিবারন শ্মশান কালির পুজাতে সারারাত ওখানে থাকবে।প্রিয়ংকা মেয়েটি একটা ছেলের সাথে আবদ্ধ ঘরে কুক্রিয়ারত হয়ে রাত কাটাবে।
আমি ধড়ফড় করে উঠে পড়লাম। একটা কালো রঙের জামা প্যান্ট পরে প্রেতের পিছনে পিছনে অনুসরণ করলাম। প্রাচীরের সামনে থমকে দাঁড়ালাম। বললাম
–ভয় করছে।
প্রেতটি বললো
— কোনো ভয় নেই। আমি তোমার সাথেই আছি। পুরো ঘটনাটি তদারকি করবো।
প্রাচীরের উপর উঠে একলাফ দিলাম।দেখলাম এক বিষধর কেলে খরিস ফনা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
ভয়ে আমার শরীর হিম হয়ে গেলো।প্রেতটি বললো
— ওটি আমার পোষা সাপ। ও তোমাকে কিচ্ছু করবেনা।
তারপর প্রেতটি ঈশারা করতেই সাপটি ফনা নামিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেলো। ওই দেখো তোমার সামনে একটা শাবল ও কোদাল।
এই দেখো এই জায়গায় খুঁড়বে।দুহাত খুঁড়তে হবে।
আমি এখন প্রেতের আজ্ঞাবহ এক ক্রীতদাস। শরীরে অযুত শক্তি সঞ্চার হলো। শাবল চালাচ্ছি। কোদাল দিয়ে মাটি অপসারণ করছি। হাত দেড়েক খুঁড়বার পর একসময় টং করে শব্দ হলো। আমি উপু হয়ে হাত ঢোকাতেই এক ঘটিতে হাত লাগলো। আমি ঘটিটি তুলে প্রেতের হাতে তুলে দিতে হাত বাড়ালাম।
প্রেত বললো
— আমাকে কেন দিচ্ছ? তোমাকে যা যা বলেছি তাই করো।বলেই প্রেত অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমি ঘটি হাতে প্রাচীর টপকে নিজের ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে বিছানার উপর ঘটিটি উপুড় করতেই ঝকঝকে মোহরের আলোতে ঘরটি আলোকিত হলো। গুনে দেখলাম। হ্যাঁ একশোটাই আছে। আমি সেখান থেকে ৭ টি মোহর আলাদা করে রেখে দিলাম। ১৮৭০ সালের ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার মোহর। নেট ঘেটে দেখলাম অক্সন প্রাইস তিন থেকে সাড়েতিন লাখ প্রতিটি।পরেরদিন সকাল বেলা ৯৩ টি মোহর এক পুঁটলিতে বেঁধে নিয়ে বের হলাম প্রেতের দেওয়া পুরঞ্জনের ঠিকানায় সেই বস্তিতে।দেখি বস্তির ঘরের সামনে একটি বোখাটে ছেলে পায়চারি করছে। শিস দিচ্ছে। আমাকে দেখে ছেলেটা চলে গেলো।
আমি দরজায় কড়া নাড়তে দরজায় ফুটো দিয়ে আমাকে নিরীক্ষণ করে একটি মেয়ে দরজা খুলে দিল।মেয়েটির পরনে শতছিন্ন শাড়ি।সে তার ছিন্ন আঁচল দিয়ে তার যৌবন ও দারিদ্রতা ঢাকবার চেষ্টা করলো।কিন্তু পারলো না। মেয়েটি ফর্সা ও সুন্দরী। তার অপরূপ রূপ যৌবন দেখে আমার বুকের ভিতর এক আলোড়ন তৈরি হলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম।
–এটি পুরঞ্জনবাবুর বাড়ি?
মেয়েটি ক্ষীণ স্বরে বললো
— হ্যাঁ।কিন্তু বাবাতো বাড়িতে নেই।হাসপাতালে গিয়েছে। আপনি বিকেলে আসুন।
— তোমার নাম কি?
—আমার নাম মনোরমা। আপনি আমাকে বলতে পারেন। বাবা খুব অসুস্থ। বাঁঁচবার আশা নেই।
— আমি যা বলার বিকেলে এসে বলবো। তুমি দরজা লাগিয়ে দাও।আমি ঘরে এসে পুঁটলি খুলে আমার ভাগের অংশের ৭ টি মোহরও তার সাথে ঢুকিয়ে রাখলাম। ১০০ মোহরের পুঁটিলিটি একটা ব্যাগে ঢুকিয়ে বিকেল হলেই বেরিয়ে পড়লাম।
পুরঞ্জন বাবুর বাড়িতে কড়া নাড়তেই মনোরমা দরজা খুলে বললো
—বাবার অবস্থা ভালো না। প্রবল শ্বাসকষ্ট।
আমি বললাম
— আমি কিছু টাকা তোমার বাবার কাছ থেকে ধার নিয়েছিলাম।সেই টাকা ফেরত দিতে এসেছি। তুমি গিয়ে তোমার বাবাকে বলো।
মনোরমা বাবাকে গিয়ে বলতেই
বললো
— ওকে ঘরে আমার কাছে আসতে বল।
আমি গিয়ে দেখলাম পুরঞ্জনবাবু হাঁপাচ্ছেন। বললেন
— আমি কাউকে টাকা ধার দিয়েছি বলে মনেতো হয়না।
আমি ব্যাগ থেকে পুঁটলি বের করে একশোটা মোহর বিছানায় ঢেলে দিয়ে বললাম
— এগুলো সব আপনার।
মৃত্যুপথযাত্রী পুরঞ্জন বাবু মোহরে হাত দিয়ে বললেন
— এগুলো সব আমার?
— হ্যাঁ।সব আপনার।
— তোমার নাম কি বাবা?
— আমার নাম বিভাস চৌধুরী।
আমি বললাম
— আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে।
— আমার আপত্তি থাকবে কেন? এতো সৎ ভদ্র ছেলে আমার জামাই হবে আমিতো বিশ্বাস করতেই পারছিনা। এতো ঈশ্বরের অসীম কৃপা।
মৃত্যুপথ যাত্রী পুরঞ্জন বাবু মনোরমার হাত বিভাসের হাতে দিয়ে বললেন আজ থেকে তোমরা স্বামী-স্ত্রী। আমি কন্যাদান করে গেলাম। দূরে কোথাও শঙ্খধনি হলো। পুরঞ্জনবাবু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। মনোরমা বিভাসের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।তার একচোখে বেদনার অশ্রু অন্য চোখে আনন্দাশ্রু।মনোরমা মোহরগুলো পুঁটলিতে বেঁধে বিভাসের ব্যাগে সযত্নে রেখে, ব্যাগটি বিভাসের কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে বললো
— আজ থেকে এই সম্পদের মালিক তুমি।
বিভাসের বুকে মাথা রেখে বললো
— আমার মালিক ও ভবিষ্যৎ তুমি।
বিভাস দুবাহু প্রসারিত করে মনোরমাকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে বললো
–আজ থেকে তুমি আমার বউ, সহধর্মিণী, গৃহিণী, কলত্র, স্ত্রী,
জীবনসাথি, ভার্যা, অর্ধাঙ্গী।মনোরমা যথাযথ নিয়মে পিতার মুখাগ্নি করে, তেরাত্রি পালন করে, শ্রাদ্ধ শান্তি করে, বিভাসের হাত ধরে ভোর বেলায় ঘর থেকে বেরিয়ে বিভাসের সেই টালির ছাউনি দেওয়া ভুতুড়ে ঘরে এসে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র নিয়ে কলকাতার উদ্যেশ্যে রওনা হলো।
সেখানে দিন কয়েক উন্নত মানের হোটেলে থেকে চাকরির সন্ধান করতে করতেই এক প্রাইভেট মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে বিভাসের উচ্চ বেতনের চাকরি হয়ে গেলো।
ব্যাঙ্ক লোনে ফ্ল্যাট কিনে, ব্যাঙ্কের লকারে মোহর রেখে বসবাস করতে লাগলো।
গল্পের শুরুতে লিখেছি, বিভাস তার জীবনকাহিনী বলছে তার অতি ঘনিষ্ঠের সামনে —–
কে এই অতি ঘনিষ্ঠ???
এই অতি ঘনিষ্ঠ মেয়েটি আর কেউ নয়। সে যে মনোরমা।
একদিন রাতে যখন বিভাস ও মনোরমা প্রেমালাপে মত্ত।সেই সময় এক অজানা নাম্বার থেকে ফোন কল এলো।মাইক্রোফোন অন করে মনোরমা-বিভাস ফোন রিসিভ করতেই অপরপ্রান্ত থেকে বললেন।
–আপনি কি বিভাস চৌধুরী?
বিভাস বললো
–হ্যাঁ। আমিই বিভাস চৌধুরী। বলুন।
— আমি বহু চেষ্টায় আপনার ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে আপনাকে ফোন করছি।আমি আপনার পিতামহের উকিল। খুব ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল আপনার দাদুর সাথে। তিনি তার সমস্ত স্থাবর অস্থাবর বিষয় সম্পত্তি আপনার নামে উইল করে গেছেন। তার হার্ড কপি আমার কাছে। নিয়ে যান। আর একটি কপি দাদুর আলমারিতে। বাড়িতে গিয়ে বারবার খোঁজ নিয়েছি।তারা বলেছে। বিভাস নিখোঁজ। নিরুদ্দেশ। তারা এই উইলের কথা জানে। আপনার দাদু নিজের হাতে লেখা একটা চিঠিও দিয়ে গেছেন আমাকে
— চিঠিতে কি লিখে গেছেন?একটু পড়ে শোনান।
— তিনি লিখেছেন —
প্রিয় দাদুভাই বিভাস।সবাই জানে আমি বধির। কিন্তু আমি যে হেয়ারিং এড লাগিয়েছি সে কথা কেউ জানতো না। আমি তাদের সব কথা শুনতাম। তারা যে আমার মৃত্যু কামনা করতো, তোমাকে নির্যাতন করতো, ঠিকমতো খেতেও দিতো না।মাছ রান্না হলেও বলতো আজ নিরামিষ। দ্বিতীয় বার ডাল তরকারি চাইলেও দিতোনা।নিত্য কথার বাণে তোমাকে জর্জরিত করতো। আমি সব শুনতাম। তুমি বেকার। চাকরির চেষ্টা করেও তুমি পাওনি।তোমার নিদারুণ কষ্টের কথা ভেবে ও ভবিষ্যৎ ভেবে স্থাবর অস্থাবর সব সম্পত্তি তোমার নামে উইল করে গেলাম।
ব্যাঙ্কে সব তোমার নামে নমিনী করে দিয়েছি।আমার মৃত্যুর পর ব্যাঙ্ক লকারের সবকিছু তুমি পাবে।
ইতি তোমার দাদু।আমার শরীর ভালো নেই। আপনি যদি ফোন করে একবার আসেন তাহলে খুব ভালো হবে। এসে আপনাকে উইল করে দেওয়া নথিটি নিয়ে যান।আপনার দাদুর আত্মা শান্তি লাভ করবে।
এখন রাখছি।শুভ রাত্রি।ফোন লাইন অফ হলে বিভাস সেই ব্যাগ থেকে জ্যোতিষের ভবিষ্যৎ বাণী লিখিত কুষ্টিটা মনোরমাকে পড়তে দিল।
মনোরমা বললো
— এক্কেবারে সবই ভবিষ্যৎ বাণী পুরো মিলে গেছে। কিন্তু এখানে লেখা আছে তোমার কুষ্টিতে সুন্দরী, সুচরিত্রা,বিনয়ী, শ্রদ্ধাবতী স্ত্রী হবে।
আর এক যোগে লিখেছেন স্ত্রী স্থান খুব শুভ। খুব সুন্দরী স্ত্রী লাভ হবে।বিনয়ী, নম্র,সর্বসুলক্ষনযুক্তা, সুচরিত্রা,স্বামীপ্রিয়া হবে।মনোরমা জিজ্ঞেস করল–
তোমার স্ত্রীর কি এসব গুন আছে?
বিভাস মনোরমাকে জড়িয়ে ধরে বললো
— হ্যাঁ। কুষ্টিতে লিখিত সব গুন তোমার আছে।শুধু তাই নয় সব কিছুই সঠিক।
আগে জানতাম জ্যোতিষের ভবিষ্যৎ বাণী ঠিক হয়না। এখন তোমাকে পেয়ে আর সবকিছু পেয়ে মনে হচ্ছে ভবিষ্যৎ ভবিতব্য। -
গল্প- আপনজন
আপনজন
-শচীদুলাল পালহুগলি জেলার কোন্নগরের একপ্রান্তে ব্যান্ডেল হাওড়া মেন লাইন অপর প্রান্তে সমান্তরাল গঙ্গা বয়ে চলেছে। গঙ্গার পাশ দিয়ে সুদীর্ঘ জি টি রোড। ঘন বসতিপূর্ণ এই শহরের মধ্যভাগে প্রধান রাস্তার উপর দুই বিঘা বাগান ঘেরা জমির উপর বিশাল বাড়িতে মাধববাবু একাই থাকেন। পৌষ মাস।মেঘলা আকাশ। টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। ছাতা মাঠায় ওই রাস্তা দিয়ে আসছিলেন লতা দিদিমণি। বাড়ীটির ভিতর থেকে কাশি ও কাতরানির আওয়াজ শুনে থমকে দাঁড়ালেন। গেট খুলে লন পার হয়ে প্রধান দরজায় উপস্থিত হয়ে দেখলেন দরজার সামনে দুধের প্যাকেট, খবরের কাগজের স্তুপ। দীর্ঘদিন ঘরে কেউ প্রবেশ করেনি ও কেউ বের হয়নি।দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। কলাপসিবল খোলা।
লতাদি কলিং বেল বাজালেন। সাড়াশব্দ পেলেন না। জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দিলেন। কেউ এসে দরজা খুললো না।
চিন্তিত মনে লতাদি জোরে জোরে অনেকক্ষণ ধরে ধাক্কা দিলেন, বেল বাজালেন ও ডাকলেন। অনেকক্ষন পর দরজা খুলে টলতে টলতে বেরিয়ে আসলেন মাধব বাবু। রোগক্লিষ্ট শরীর। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। জীর্ণ শীর্ণ শরীর।
প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন ভদ্রলোক। লতা দিদিমণি হাত ধরে ধীরে ধীরে ঘরে বিছানায় শুইয়ে দিতে সাহায্য করলেন। কপালে হাত দিয়ে দেখলেন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন- একি! অনেক জ্বর! কবে থেকে জ্বরে ভুগছেন?
বহু কষ্টে ক্ষীণ স্বরে বললেন- কবে থেকে তা বলতে পারবো না। তবে আমি মৃত্যু পথযাত্রী। আমি আর বাঁঁচবো না। আপনি কে?
– সে সব পরে বলবো। এখন বলুন ওষুধপত্র কিছু খেয়েছেন? কিছু খাবার খেয়েছেন?
– বিছানা ছেড়ে উঠে ওষুধ নেবার সামর্থ আমার নেই। আর খাবার কে খাওয়াবে?
লতাদিদিমনি ড্রয়ার থেকে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বের করে খাওয়ালেন। কপালে জলপটি দিলেন। দেখলেন ঘরে কোনো খাবার নেই।
বললেন আমি আপনার জন্য কিছু ওষুধ ও পথ্য নিয়ে আসছি। আপনি শুয়ে থাকুন। উঠবেন না।
দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বর্ষণ মুখর সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়লেন ডাক্তারের সন্ধানে।
কোনো ডাক্তার আসতে চাইলো না। ডাক্তারকে রোগীর বিবরণ বলে ওষুধ, পথ্য পাউরুটি দুধ ফল কিনে নিয়ে আসলেন।জ্বরের ঘোরে দিন কয়েক কাটলো। যমে মানুষে টানাটানি। বিকারে ভুল বকছে। মৃতা স্ত্রীকে স্মরণ করে বলেই চলেছে- জ্যোৎস্না!আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চলো। লতাদি অহরহ সেবা শুশ্রূষা করে গেলেন। তার সেবা শুশ্রূষায় ও ঐকান্তিক প্রার্থনায় ঈশ্বর তুষ্ট হলেন।
দিন সাতেক পর মাধব বাবু চোখ মেলে চেয়ে দেখলেন তার সামনে সেবারতা এক মহিলার হাত। তার মনে হলো সাক্ষাৎ কোনো দেবি। তার সেবাযত্নে প্রাণ ফিরে পেয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হলেন। মাধব বাবু বললেন- আপনি কি কোনো দেবি? আপনিই কি ঈশ্বর? কে আপনি? কি আপনার পরিচয়?
– আমি দেবি নয় স্যার। আমি এক গার্লস স্কুলের রিটায়ার্ড শিক্ষিকা। আপনার সাথে কখনো সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু দরজায় নেমপ্লেট দেখে জানলাম আপনিও স্কুল শিক্ষক।
আজ মাধববাবু অনেকটা সুস্থ। দিন দুয়েক জ্বর আসেনি।
গরম জলে স্নান সেরে খাওয়ার টেবিলে বসে দুজনে একসাথে খাবার খাচ্ছে। পরিপাটি করে লতাদি রান্না করেছে।
এভাবে আরও দিন কয়েক পর পুষ্টি ও বল সঞ্চার করে স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে মাধব বাবু বললেন- আমিও হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত হেডমাস্টার। এই বাড়িটি আমার বাবা করেছিলেন। আমি কিছু সংস্কার করেছি মাত্র। আমার ছেলে অয়ন খুব মেধাবী ছিল। হায়ার সেকেন্ডারিতে প্রথম দশজনের মধ্যে পঞ্চম হয়েছিল। কম্পুউটার সাইন্সে বি টেক। পরে এম টেক। পাড়ায় খুব নাম। আমিও গর্বিত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সির কোর্সগুলো করে এক কোটি টাকার প্যাকেজ অফার নিয়ে এখন সে আমেরিকায়। আমারই বন্ধুর মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছিলাম। খুব ভালো মেয়ে। ওদের এক ছেলেও আছে। বেশ সুখেই আছে। প্রথম প্রথম ফোনে মাঝে মধ্যে কথা বলতো। পরে ধীরে ধীরে ভুলেই গেলো। আমি ফোন করলে বলতো “আমি ভীষণ ব্যস্ত বাবা। পরে আমিই কল ব্যাক করবো।”
পরে আর তার সময়ই হতো না। বউমাও আমাদের ভুলে গেলো। সাধের এক রত্তি আমাদের নয়নের মনি নাতিটাকেও কথা বলতে দিতো না। বলতো তার নাকি পড়াশোনার খুব প্রেশার। সেবার অয়নের মা এক কঠিন ক্রিটিকাল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। মৃত্যুপথযাত্রী জ্যোৎস্না (আমার স্ত্রী) কথা বলতে চেয়েছিল ছেলে বউমা আদরের নাতির সাথে, কিন্তু পারেনি। তার ইচ্ছে ছিল ছেলের হাতে আগুন পেয়ে স্বর্গে যাবে। সে ইচ্ছেও তার পূরণ হয়নি। ছেলে একবার ফোন করে বলেছিল তার নাকি সামনে প্রমোশন, ছুটি সে পাবে না। সুতরাং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সে আসতেই পারবে না। অবশ্য কিছু টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিল।
সেও আজ বছর পাঁচেক আগের কথা। ছেলে বলেছিল ওখানকার সব বিষয় সম্পত্তি বেচে দিয়ে আমেরিকায় চলে আসতে। আমি বলেছিলাম “আমি নিরুপায়”।
পৈতৃক ভিটে মাটি, বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় সজন, আপন দেশ, আপনজন ছেড়ে যেতে মন চাইনি।
– আপনার জ্বরের কথা কাউকে জানিয়েছিলেন? কাউকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন?
– যতক্ষণ সজ্ঞানে ছিলাম ডেকেছি। কথা বলেছি। অনেক আত্মীয় বন্ধু যাদের সাথে নিত্য দেখা হয়, কথা বলে, তারা কেউ খোঁজ রাখেনি। কেউ কথা রাখেনি।ফোন করেনি।
– বাড়িতে কাজের লোক? রান্নার লোক?
– তারা তো জ্বর শুনে ভয়ে অনেকদিন থেকে এ মুখো হয়নি। বাগান পরিচর্চা করার মালি! তারও পাত্তা নেই।
– আর কোনো আপনজন?
– এতদিনে উপলব্ধি করলাম, আমার কোনো আপনজন নেই। আপনিই ফেরেস্তা, দেবদূত, এক অতি আপনজন। আপনিই আমার প্রাণদাত্রী। আমি শুধু নিজের কথায় বলে যাচ্ছি। এবার আপনার কথা বলুন।
– হ্যাঁ। নিশ্চয়ই বলবো। কিন্তু তার আগে আপনার পূজোর ঘরে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বেলে দিয়ে আসি।বিশাল দোতলা বাড়িটির বাগানের গাছপালার আড়ালে সূর্য গেলো অস্তাচলে।পাখীদের কলতানে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। শান্ত নিস্তব্ধ যাদব বাবুর গৃহমন্দিরে বহুকাল পরে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে উঠলো। নিস্তব্ধতা খান খান করে শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হলো। লতা দিদিমনি পূজার ঘর থেকে ধীর পায়ে বৈঠকখানা ঘরে যাদব বাবুর মুখোমুখি সোফায় বসলেন। আজকের সন্ধ্যায় জীবন সায়াহ্নে দুটি অচেনা প্রাণী। দুই শিক্ষক শিক্ষিকা হৃদয় – মনের কাছাকাছি।
যাদব বাবু বললেন- এবার আপনার কথা বলুন দিদিমণি।
লতা দিদিমণি শুরু করলেন- আমি ফিজিক্সে এম এসসি পাশ করে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেছি। চার ভাই দুইবোনের সংসারে আমিই একমাত্র উপার্জনশীলা। বাবাকে সাহায্য করতাম। দুভাই ও বোনরা তখন খুব ছোট। সংসারের ভার নিজের কাঁধে নিয়ে সংসার চালিয়ে সঞ্চয়ের টাকায় জমি কিনে বাড়ি করেছি। বাবার মৃত্যুর পর ভাইবোনের বিয়ে দিয়েছি। ভাইদের স্বল্প আয়। একান্নবর্তী বিরাট পরিবার।
– আপনি বিয়ে করেননি?
– সেটা আর হয়ে উঠেনি। সংসার সামলাতে গিয়ে, সংসারটাকে দাঁড় করাতে গিয়ে
কখন যেন মেঘে মেঘে বেলা হয়ে গেছে। আমি অবিবাহিতা থেকে গিয়েছি। আমি এখন চিরকুমারীর মর্যাদায় গৌরবান্বিতা।
ভাইবউরা প্রথম প্রথম ঠিক ছিল। পরে তারা আমাকেই অবজ্ঞা করতে শুরু করলো। আমার কর্তৃত্ব মেনে নিত না।
ধীরে ধীরে আমার সঞ্চিত অর্থের উপর কেউ সাহায্য, কেউ অধিকার দাবি করতে লাগলো। আমি অকাতরে তাদের দিয়েই যেতে লাগলাম।
দিতে দিতে একদিন সব ফুরিয়ে আসতে লাগলো। এমনকি বোনদের বিয়েতে সোনার অলংকার দিয়েছিলাম। ভাইবউরাও দাবি করলো আমাদেরও দিতে হবে। আমি ভাবলাম এরাই তো আমার সব আমার আপনজন। দিয়েই দি।
তাস খেলায় তাসের পাতা যেমন বিতরণ করে তেমনি সব গয়নাগাঁটি জমানো টাকা সমবন্টন করে দিলাম।
দিতে দিতে আমি হয়ে গেলাম প্রায় নিঃস্ব। যে স্বল্প আয়ের ভাইকে আমি বেশি ভালোবাসতাম যার পরিবারে নিজেকে আপন ভেবে সম্পূর্ণ সঁপে দিয়েছলাম, তাদের ছেলেমেয়েদের কোলে পিঠে মানুষ করলাম। সমবন্টনে সেই ছোট ভাই ও ভাই বউ-এর হলো রাগ। দিনরাত খোঁটা দিতে লাগলো।
আমার উপর মানসিক নির্যাতন করতে শুরু করলো। অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করতে লাগলো।
অসুখে বিসুখে চেক আপ করানো ডাক্তার দেখানো কিছুই করতো না। আমি যেন তাদের কাছে গলগ্রহ। এক অবহেলিত অবস্থায় দিন কাটতে লাগলো।
– এতো অমানবিক!
– হ্যাঁ। আমি এক অশনি সংকেত উপলব্ধি করলাম।
– তখন কি করলেন?
– আমি ঠিক করলাম আমি আর সংসারে থাকবো না। আমি নিজের উপার্জনের টাকায় কেনা জমি, নিজ আয়ের তৈরি বাড়ি ত্যাগ করে এক বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিলাম।
– আপনি তো পেনশন হোল্ডার?
– পেনশনের টাকা যাকে যতো দিতাম তাকে ততটাই এখনো ফোন পে-তে পেমেন্ট করে দিই।
-এখনো তাদের টাকা দেন?
– না দিয়ে পারি! তারা যে আমার আপনজন।
এখন কোথা থেকে আসছিলেন?আপনার এই পাড়ায় অনেকটা দূরে আমার এক বোনের মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তার একটা ছেলে আছে ক্লাস ফোরে পড়ে। তাকে খুব ভালোবাসি।
কিছুদিন আগে দিনকয়েক থাকবো বলে গেছিলাম। বোনঝি লতামাসি লতামাসি বলে খুব খাতির করলে। নাতিটাকে একটা বড়ো দামি খেলনা দিলাম। সে খুব খুশি। তার আনন্দে তার সাথে খেলা করে আমিও কিছুটা সময় কাটালাম।
রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে একটা ঘরে শুয়েছিলাম। পাশের ঘরে বোনের মেয়ে ও তার হাসবেন্ড-এর কথা শুনে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলো। তাদের কথাগুলি বুকের মধ্যে হাতুড়ির আঘাত দিতে লাগলো।
‘লতা মাসি এসে আমাদের বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা সব মাটি করে দিল। এখন কতদিন থাকবে? কবে যে বিদেয় হবে বুড়িটা? মরণ হয় না। নাতির সঙ্গে প্যায়ারের নাম করে শেষ বেলায় আমাদেরই ঘাড় মটকাবে না তো?’
ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে আমি শাড়ি ছেড়ে বোনঝিকে ডাকলাম। হাতে একটা ভারি প্যাকেট দিয়ে বললাম এটা তোমাদের জন্য। যাও দিন কয়েকের জন্য কোথাও বেড়িয়ে এসো। বোনঝি প্যাকেট খুলে দেখলো অনেক টাকা। লক্ষাধিক। দেখে একদম থ হয়ে গেলো।
আমি বললাম, বৃদ্ধাশ্রমে আমার পাশের বিছানায় যে মেয়েটি থাকে সেই মেয়েটির কাল থেকে শরীর খুব খারাপ। আমাকে এখুনি চলে যেতে হবে। আমি ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হলাম। বোনঝি নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। আমি আস্তে আস্তে ঘর থেকে বের হয়ে যখন রাস্তায়, তখন পৌসমাসের বৃষ্টি,
আর আমার দুচোখে জলের ধারা মিলেমিশে একাকার। তারপরই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আপনার রোগ যন্ত্রণার আওয়াজ পেয়ে আপনার সাথে সাক্ষাৎ।
কিছুক্ষণ নিঃশব্দে থেকে উভয়ে উভয়ের কথা শুনে তাদের আপনজনদের কথা অনুভব করলেন। খাওয়া দাওয়া শেষে দুজনে দুই আলাদা রুমে থেকে রাত্রিবাস করলেন। সারারাত ভাবলেন। লতা দিদিমণি ঘরদোর সব গুছিয়ে রান্নাবান্না করে ঢেকে রেখে বললেন- স্যার। আমার কাজ শেষ। আমি আজ চলে যাবো। এই আমার ফোন নং। প্রয়োজন পড়লে আমায় ডেকে পাঠাবেন।
– আপনি চলে যাবেন?
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃরাশ সেরে মাধববাবু বললেন- শুনেছি বন্যার সময় গাছের ডালে একসাথে সাপ ও মানুষ বাস করছে। দুজনেই একই সমস্যার সম্মুখীন। দুজনেই নিরাশ্রয়।
আমরাও দুজনেই নিরাশ্রয়। এই বিশাল পৃথিবীতে আপনজন খুঁজে পাইনি। আপনি যদি কিছু মনে না করেন তবে একটা কথা বলি।
লতাদি চোখ নামিয়ে বললো- বলুন।
আপনার সাহচর্যে সেবায় যত্নে আমি মুগ্ধ। অভিভূত। ঈশ্বর এতদিন বাদে এক প্রকৃত আপনজন পাঠিয়ে দিয়েছেন। এবার আমাকে আপনার আপনজন ভাবার সুযোগ করে দিন।
লতাদি মাথা নিচু করে রইলো। কি উত্তর দেবে?
মাধব বাবু বললো- আমাকে আপনার কোমল হৃদয়ে স্থান দিন।
লতা দিদিমণি চোখে চোখ রেখে বললেন
-বেশ।
-শুধু বেশই যথেষ্ট নয়। আসুন আমরা আমাদের একাকীত্ব দূর করি। একজন আর একজনকে চিরসাথী করি।
– সমাজ কি বলবে? নিন্দে করবে যে।
– আমরা লিভ টুগেদার হয়ে জীবন যাপন করতে চাই।
– এ এক গভীর সমস্যা।
– ঠিক আছে। তাহলে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা যদি দিই।
– সারাজীবন অবিবাহিতা থেকে এই শেষ বেলায় বিয়ে! অসম্ভব। লোকে কি বলবে?
– লোকে আবার কি বলবে? তাছাড়া আমরাতো এই বয়সে দেহের টানে বিয়ে করছি না।
লতাদি মাথা উঁচু করে বললো- আপনজন খুঁজতে গিয়ে যা দেখলাম। সমাজ সংস্কার তো আমাদের কথা ভাবেনি। আমাদের দিকে তাকায়নি। এখন আমাদের নিষ্কাম ভালোবাসার স্বীকৃতি দিক বা না দিক আমরা ঘর বাঁধবো।
-আমরা ভাববো এই বয়সে শরীর নয়। চাই আপনজন।
– আমি ভাবছি এই বিশাল সম্পত্তি ও বাড়ি কোনো মিশনের স্কুলকে দান করে দেব। সেখানে আমাদের জীবিত অবস্থাতে স্কুল হবে। ছাত্র ছাত্রীরা শিক্ষালাভ করবে। তারাও হবে আমাদের প্রকৃত আপনজন।
– আমি আপনার পরিকল্পনায় সহমত। এই বিশাল সম্পত্তির উপর দুটি মাত্র রুম নিয়ে আপনি আমি প্রকৃত আপনজন ভেবে জীবনের শেষ কটা দিন কালাতিপাত করবো।
– এই বিশাল সম্পত্তির সিংহদ্বারে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে “আ-প-ন-জ-ন”
– আর আমাদের দুজনের হৃদয় মন্দিরেও লেখা থাকবে “আ-প-ন-জ-ন” -
কবিতা- শিষ্টতা
শিষ্টতা
-শচীদুলাল পালছিলো মানুষ বনে গুহায়
না ছিলো তার ঘর দোর,
আহার নিদ্রা মৈথুন মত্ত
জন্তু সম বর্বর।কালক্রমে বিবর্তনে
শিখলো সে ব্যবহার,
যুক্ত হলো আচরণে
সৌজন্য শিষ্টাচার।রুচিপূর্ণ সহৃদয়তা
বিবেক মনুষ্যত্ব,
আন্তরিকতা সাধুতায়
হলো ক্রমোন্নত।হয়না অন্যের ক্ষোভের কারণ
আচরণে শিষ্ট,
হয়না কারো স্বার্থ বিঘ্ন
করেনা অনিষ্ট।কথাবার্তা আচরণে
আছে কিছু নিয়ম,
দাও ছোটদের স্নেহ প্রীতি
বড়োদেরকে প্রণাম।কথার মাঝে কথা বলা
নয়কো মোটে উচিৎ
নয়কো কথা বলা যখন
অনিচ্ছুক প্রথম সাক্ষাৎ।হতে পারো জ্ঞানী তুমি,
বলার নাই দরকার
তোমার পরিচয় তোমার
দৃষ্টি কথা ব্যবহার।হারিয়ে গেছে সেদিনের
ধৈর্য সহিষ্ণুতা,
এখন শুধু লালসা লোভ
আর স্বার্থপরতা।সেবাধর্ম পরোপকার
প্রাণদান আজ বিলুপ্ত
দৈহিক প্রেমে দেহ মিলন
আজ নয়কো কুন্ঠিত।পিতামাতা বয়োজ্যেষ্ঠ
শিক্ষকদের সম্মান,
হারিয়ে গেছে সৌজন্য
দেয়না তাদের মান।হারিয়ে গেছে সদভাবনা
শ্রদ্ধা আর কোমল মন।
হারিয়ে গেছে জীবন থেকে
সঠিক আপনজন। -
প্রবন্ধ- বন্ধুত্ব
বন্ধুত্ব
-শচীদুলাল পালআজকের এই স্বার্থপরতার যুগে বন্ধুত্ব প্রায় বিলুপ্ত। স্বার্থ ছাড়া কোনো সম্বন্ধ চোখে পড়ে না। কোনো ভালোবাসা স্বার্থ ছাড়া হয় না। গিভ এন্ড টেক এর যুগে প্রকৃত বন্ধু খুঁজে পাওয়া বড়ো মুস্কিল।
বাল্যকালে যখন মনে শিশুর সারল্য থাকে ততদিনই সমবয়সী বা সহপাঠীদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। একসাথে খেলার মাঠে, স্কুলে, পড়াশোনায় নোট দেওয়া নেওয়া, দুষ্টুমি, খুনসুটির মাধ্যমে বন্ধুত্বের প্রকাশ ঘটে-
“বন্ধুত্ব মানে এক থালায় খাওয়া, একসাথে ঘোরাঘুরি,
বন্ধুত্ব মানে কান্ট্রি লিকার সাথে কাঁচা লঙ্কা মুড়ি।”দুই কিশোরীর মধ্যেও সখ্যতা গড়ে উঠে। সই, মিতালি, বকুল ফুল, গঙ্গাজল ইত্যাদি নামে অবহিত করা হয়।
এই সখ্যতা সবার সাথে হয় না। এটি এক বিরল ঘটনা। কারণ অনুসন্ধান করে জানা যায় তাদের দুজনার মধ্যে এক অদৃশ্য টান-রাশিগত মিল।
কখনও ওরা বকুলফুল, কখনও ভালবুলি। কখনও আবার ওদের নাম চোখের বালি।‘সই’ নামের মানববন্ধন রীতিমতো উদ্যাপনের বিষয়। বন্ধুত্ব উদ্যাপনের এমনই এক উৎসব হল ‘সহেলা’।
তাই দার্শনিকের কথায় An old friend is gold.
পরে বড়ো হলেও সেই স্মৃতিটুকু থেকে যায়।শোলেতে জয়-বীরুর বন্ধুত্ব চির অমর।বন্ধুকে বাঁচাতে নিজেকে বিপদে সঁপে দেওয়ার মতো মহৎ কর্মে আত্মনিয়োগ করবার জন্য বন্ধু জয়ের কয়েনে দুই পিঠেই ছিল হেড সাইন।
আবার বয়স বাড়ার সাথে অবক্ষয় সমাজে বিভিন্ন পরিবেশে শুরু হয় স্বার্থপরতা বন্ধুত্বের নামে অপকর্ম।
পাঁচজন এক হলে একডাকে জড়ো হয়ে মদ কিনে নৈশ্য আসর জমিয়ে দেওয়া, দলবেঁধে কাউকে পেটানো, কাউকে হেনস্থা করা, ঘেরাও, ইত্যাদি অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার মতো ঘটনায় সামিল করার ক্ষেত্রে মেকি বন্ধুত্ব দেখা যায়।কোনো দুঃস্থ মানুষের, কোনো অসুস্থ মানুষের সাহায্যে, শ্লীলতাহানি থেকে মেয়েকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসা, আর্থিক সাহায্য করা, বন্ধুর জন্য স্বার্থত্যাগ আত্মত্যাগ আজকাল প্রায়ই দেখা যায় না।
তবুও সারা বিশ্বে বিভিন্ন দেশ আলাদা আলাদা তারিখে “ফ্রেন্ডশিপ ডে” পালন করে থাকে।সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি এই চার যুগ। যেমনি যেমনি যুগান্তর ঘটলো তেমনি তেমনি সমাজে অবক্ষয় নেমে আসতে লাগলো।
পুরাকালে বন্ধুত্ব ছিল। যেসব কাহিনী আজও অমর হয়ে আছে।
পুরাকালে কয়েকটি বন্ধুত্বের কাহিনী লিখি।
সৃষ্টির আদিতে ছিল শিব।
শিব প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে। সেই জ্যোতির্লিঙ্গ দেখে ব্রহ্মা বিষ্ণুর কৌতুহল হলো। শিব বিষ্ণুর নম্র স্বভাব সত্যবাদিতা দেখে তার প্রতি আসক্ত হন। এক প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। সুখে দুখে এই দুই বন্ধু একসাথে থেকেছেন।ভস্মাসুর শিবের কাছে বর পেয়েছিল, যার মাথায় সে হাত রাখবে, সে ভস্ম হয়ে যাবে। ভস্মাসুর তখন শিবের মাথাতেই হাত রেখে তা পরীক্ষা করতে গেলো।
সমুহ বিপদ বুঝে বিষ্ণু মোহিনী রূপ ধারণ করে নাচে গানে ভস্মাসুরকে মোহিত করেন ও বশে আনেন। ভস্মাসুর তখন বিষ্ণুর মোহিনী মায়ায় ভুলে নিজের মাথায় হাত রাখেন আর ভস্মীভূত হয়ে যায়। পড়ে থাকে ভস্ম।আবার, শিব যখন সতীর শোকে পাগলপারা, তাঁর মৃতদেহ নিয়ে তাণ্ডবে মত্ত, বিশ্ব ব্রহ্মান্ড কাঁধে সতীর শবদেহ নিয়ে বিচরণ করছেন। তখন বিষ্ণুই তাঁর সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ ছিন্নভিন্ন করে শিবকে শান্ত করেন।
বিষ্ণু যখন নৃসিংহ রূপে হিরণ্যকশিপুকে বধের বরে কিছুতেই শান্ত হচ্ছিলেন না, তখন শিব ধারণ করেন ঋষভের রূপ। এমন এক পাখি যার মাথা বাঘের মতো।
সেই রূপে শিব পায়ে করে আকাশপথে তুলে নিয়ে যান নৃসিংহকে। বেশ কয়েক পাক ঘুরিয়ে গায়ের জোরে তাঁকে পরাস্ত করে শান্ত করেন। একই ঘটনা ঘটে যখন বিষ্ণু হয়েছিলেন বরাহ অবতার। সেই সময় বরাহ স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলেন। দেবলোকে ফিরছিলেন না পূর্ব রূপে। শিব তখন আবার ঋষভের রূপে ভয় দেখিয়ে তাঁর স্মৃতি ফিরিয়ে আনেন।
তাঁদের বন্ধুত্ব এতটাই প্রগাঢ় ছিল যে দুজনে মিশে গিয়েছিলেন একই শরীরে।
এইজন্য প্রিয় বন্ধুকে হরিহর-আত্মা বলা হয়।পুরাণে আর এক বন্ধুত্বের কথা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে তা হলো “কৃষ্ণ সুদামার” বন্ধুত্ব।
দেবকী -বসুদেব যখন কংসের কারাগারে, তখন জন্ম হয় কৃষ্ণের। কংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য কৃষ্ণকে গোকুলে রেখে আসেন বসুদেব। সেখানে ছেলেবেলায় বন্ধুত্ব গড়ে উঠে সুদামার সাথে। মাখন চুরি, গরু চরানো, খেলাধূলায় সখ্যতা গড়ে উঠে সুদামার সাথে। সুদামা ছিল কৃষ্ণের ডান হাত।
পরবর্তী কালে কৃষ্ণ চলে গেলেন দ্বারকায়। সেখানে তিনি রাজা হলেন। এদিকে সুদামা দারিদ্রে জর্জরিত। দুবেলা খাওয়া জোটে না।
স্ত্রী সন্তান সহ নিদারুণ অন্নকষ্ট। একদিন সুদামার স্ত্রী তাকে জোরপূর্বক পাঠালেন কৃষ্ণের কাছে। কিছু সাহায্যের আশায়। অনিচ্ছায় কৃষ্ণ সাক্ষাতে গেলো সুদামা সাথে ভাঙা চাল (যাকে ক্ষুদ বলা হয়) নিয়ে, বন্ধুকে ভেট দেবে বলে।
সেখানে পৌঁছে তার চক্ষু চড়কগাছ। তার বন্ধু কৃষ্ণর বিশাল সুবর্ণ নির্মিত অট্টালিকা।
রাজদ্বারীরা বিশ্বাসই করলো না, কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের কথা! ভিখারি ভেবে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। হাসাহাসি করতে লাগল এবং সেই কথা ছড়িয়ে পড়ল রাজপুরীতে। সুদামা তখন বাড়ির পথ ধরেছেন।লজ্জিত হয়ে ফিরে আসছেন, হঠাৎ শুনলেন কে যেন পিছন থেকে ডাকছে। ফিরে দেখলেন কৃষ্ণ। জীর্ণ শীর্ণ দীন দরিদ্র বন্ধু সুদামাকে সমাদরে সসম্মানে রাজধানীতে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন। নিজ হাতে পা ধুইয়ে দিলেন। রানী রুক্মিণীও তাকে সোনার থালায় উত্তম উৎকৃষ্ট ভোজন পরিবেশন করলেন। আর আড়ষ্ট সুদামার কাছ থেকে ভাঙা চাল কেড়ে পরম তৃপ্তি ভরে খেয়ে বন্ধুর ভেট গ্রহণ করলেন। সুদামা আনন্দে নিজ ঘরে এসে দেখলেন বন্ধু কৃষ্ণের কৃপায় তার সুবিশাল বাড়ী হয়েছে। সপরিবারে গরীব থেকে ধনীতে পরিণত হয়েছে। বন্ধুত্বে ধনী দরিদ্র কোনো ভেদাভেদ নেই।
আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বা অহং- কোনও কিছুই বাধা হতে পারে না নিখাদ বন্ধুত্বে।
কৃষ্ণ ও সুদামার ভালবাসা হ’ল প্রকৃত বন্ধুর ভালোবাসা। সত্যিকারের প্রেমে উচ্চ বা নিম্ন দেখা যায় না, এবং সম্পদ ও দারিদ্র্যও দেখা যায় না। এ কারণেই আজও বিশ্বে কৃষ্ণ ও সুদামার বন্ধুত্বকে সত্য বন্ধুত্ব প্রেমের প্রতীক হিসাবে স্মরণ করা হয়।কৃষ্ণার্জুন বন্ধুত্ব:-
কৃষ্ণ ছিলেন অর্জুনের পিসতুতো দাদা। কৃষ্ণের পিতা বসুদেবের নিজের বোন পৃথা। রাজা কুন্তীভোজ তাঁকে দত্তক নিয়েছিলেন বলেই আমরা চিনি কুন্তী নামে!
একটা সময়ে কৃষ্ণ এবং অর্জুনের মধ্যে কোনও যোগাযোগই ছিল না। অর্জুনকে কৃষ্ণ প্রথম দেখেন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায়। দেখেই চিনতে পারেন। অর্জুনকে তাঁর পছন্দ হয়ে যায়। তখন কুন্তীর কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দেন তিনি। দু’জনের বন্ধুত্বের সেই শুরু।
কৃষ্ণ বুঝেছিলেন, অর্জুনের চিত্ত বেশ বিক্ষিপ্ত। তাঁর পথপ্রদর্শক দরকার। তাই সব সময় তিনি থেকেছেন অর্জুনের সঙ্গে। তাঁর সহায়তাতেই অর্জুন অগ্নির কাছ থেকে লাভ করেন গাণ্ডীব ধনুক আর অক্ষয় তূণীর। যা চিরতরে জুড়ে যায় যোদ্ধা অর্জুনের পরিচিতির সঙ্গে।
অর্জুনকে কৃষ্ণ এতোটাই ভালবাসতেন যে সব বাধা উপেক্ষা করে তিনি মেনে নেন সুভদ্রার সঙ্গে অর্জুনের প্রেম। সারা ভারত, বিশেষ করে যাদবরা যখন গর্জে উঠেছে এই দুই ভাই-বোনের বিয়ে নিয়ে, তখন তাঁদের শান্ত করেন কৃষ্ণই। স্বীকৃতি দেন তাঁদের প্রেমকে।
আবার, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন যখন বিষাদযোগে আচ্ছন্ন, তখন কৃষ্ণই দূর করেন তাঁর সব দ্বিধা। তাঁকে উচিত পরামর্শ দেন। সারথি হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের জয়ের সহায়ক হন।কৃষ্ণ -দ্রৌপদীর বন্ধুত্ব:-
কৃষ্ণ দ্রৌপদী একে অপরকে পছন্দ করতেন। স্বভাবের মিল তাঁদের আকৃষ্ট করে পরস্পরের প্রতি। কৃষ্ণ নিজেই বলেছিলেন দ্রৌপদীকে, তোমার আর আমার গায়ের রং এক। মিল আছে নামেও! আমি কৃষ্ণ, তুমি কৃষ্ণা।
কৃষ্ণ ইচ্ছে করলেই যোগ দিতে পারতেন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে। কিন্তু তিনি যোগ দিলে অন্য কারও সঙ্গে দ্রৌপদীর বিবাহ হতো না। তিনি তা করেননি। স্বয়ম্বরে এসেছিলেন নিতান্ত দর্শক হয়ে। বস্ত্রহরণের সময় কৃষ্ণই দ্রৌপদীর লজ্জারক্ষা করেছিলেন।দুর্যোধন যখন দুর্বাসা ঋষিকে পাঠিয়ে বনবাসে অপমান করতে চেয়েছিলেন পাণ্ডবদের, তখনও দ্রৌপদীর সহায় হন কৃষ্ণই। অগ্নির কাছ থেকে দ্রৌপদী পেয়েছিলেন একটি পাত্র। সেই পাত্রের খাদ্য ততক্ষণ ফুরাত না, যতক্ষণ না দ্রৌপদীর খাওয়া হত। এটা জেনেই দুর্যোধন দ্রৌপদীর খাওয়া শেষ হলে পাঠিয়েছিলেন শিষ্যসমেত দুর্বাসাকে।
অন্তর্যামী কৃষ্ণ বুঝতে পেরেছিলেন পাত্রে খাবার নেই! বিপদ বুঝে হাজির হন কৃষ্ণ। সেই পাত্র হাতে নিয়ে দেখেন, তাতে একটি মাত্র ভাতের দানা পড়ে আছে।
সেটাই মুখে দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বাত্মা তুষ্ট হোক! আর দেখতে দেখতে পেট ভরে যায় জগতের সব ক্ষুধার্ত প্রাণীর। বিপদ বুঝে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন দুর্বাসা।
এছাড়া দ্রৌপদীর সম্মানরক্ষার্থে আরও একটা কাজ করেছিলেন কৃষ্ণ। প্রিয় বোন সুভদ্রাকে নিতান্ত গরিবের পোশাকে পাঠিয়েছিলেন দ্রৌপদীর কাছে। বুঝেছিলেন, অর্জুনের সঙ্গে সুভদ্রার বিয়েতে দুঃখ পেয়েছেন দ্রৌপদী। তাই মূল্যবান পোশাকে-গয়নায় সুভদ্রাকে তিনি সাজিয়ে দেননি। কৃষ্ণের এই সিদ্ধান্তে দ্রৌপদীর অহং রক্ষা হয়। সুভদ্রাকে তিনি গ্রহণ করেন হাসিমুখে। সাজিয়ে দেন নিজের গয়নায়!সীতা- সরমা:-
দ্রৌপদীর বন্ধু যেমন কৃষ্ণ, সীতার তেমনই বন্ধু সরমা। রাবণ যখন হরণ করে সীতাকে নিয়ে আসেন লঙ্কায়, তখন তাঁর দুঃখ বুঝেছিলেন একমাত্র বিভীষণের পত্নী সরমা। সরমা না থাকলে সীতা লঙ্কাপুরীতে অপমান আর উপহাসের মাঝে শান্তি খুঁজে পেতেন না। আর একটা সময়ের পর দুই নারীই এসে দাঁড়ান একই জায়গায়। বিভীষণ রামের শিবিরে যোগ দেওয়ায় স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন সরমাও। তাঁকেও তখন লঙ্কাপুরীতে শুনতে হচ্ছে গঞ্জনা। একমাত্র তখন সান্ত্বনা ছিল সরমা-সীতার বন্ধুত্ব।
শকুন্তলার দুই সখী অনসূয়া আর প্রিয়ম্বদা।শকুন্তলার প্রাণের চেয়েও প্রিয় বন্ধু ছিলেন আশ্রমকন্যা অনসূয়া আর প্রিয়ম্বদা। জন্মের পর মা মেনকা ছেড়ে যান শকুন্তলাকে। বিয়ের পর চিনতে অস্বীকার করে স্বামী দুষ্মন্তও। কিন্তু, এই দুই বন্ধু কখনই শকুন্তলাকে ছেড়ে যাননি। শকুন্তলার নাম নিলেই তাই এই দুই নারীর নামও একসঙ্গেই উচ্চারিত হয়।
কর্ণ আর দুর্যোধন:-
বন্ধুকে যে কখনই ছাড়া যায় না, তা আমরা জেনেছি কর্ণ আর দুর্যোধনের বন্ধুত্ব থেকে। কর্ণকে সূতপুত্র বা সারথির ছেলে, অর্থাৎ নিচু জাত বলে বিদ্রুপ করেননি একমাত্র দুর্যোধনই। কর্ণকে প্রথম দেখায় তাঁর এতটাই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল যে তিনি অঙ্গরাজ্য দান করেন তাঁকে। সেই দুর্যোধন, যিনি কখনই সম্পত্তি বা অধিকার ছাড়তে নারাজ ছিলেন। তাঁর বন্ধুত্বেই অভিজাত সমাজে স্থান পান কর্ণ। তাই দুর্যোধনকে তিনি কখনই ছেড়ে যাননি। কুন্তী তাঁর মা, পাণ্ডবরা তাঁর ভাই- এই সত্য জানার পরেও, দুর্যোধনের সিদ্ধান্ত ভুল জেনেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাঁর হয়ে লড়াই করেন কর্ণ। প্রাণও দেন। আর আমরা বুঝতে শিখি, নিঃশর্ত বন্ধুত্বের জন্য পরিবারকেও ত্যাগ করা যায়!
-
প্রবন্ধ- মন
মন
-শচীদুলাল পালজগতের সবচেয়ে দ্রুতগামী হলো মন।
এই মুহুর্তে এখানে, পরমুহূর্তে দিল্লি বা আমেরিকায় এমনকি মঙ্গল গ্রহে পৌঁছে যায়।
আমাদের যখন কোনো বিষয়ে লিখতে বলা হয়, তখন সেই বিষয়ের অনেক গভীরে প্রবেশ করি। সেই বিষয়ের মন সাগরের অতল জল থেকে সেরা মণিমুক্তাদি সংগ্রহ করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি।বিকশিত মন:-
মনের তিনটি স্তর। প্রথম স্তরটি হলো মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকা আর বুঝতে না পারা যে সে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। সচেতন না হওয়া। এক ভ্রান্তিতে থাকে। বুঝতে পারে না তার ধারণাটা ভুল।
দ্বিতীয় স্তরে বুঝতে পারে মায়ার বন্ধনে বাঁধা পড়ে আছে। কষ্টের কারণ হলো এই মায়ার বাঁধন।
তৃতীয় স্তরে সে বুঝতে পারে মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত। মায়া দ্বারা প্রভাবিত হয় না। বুঝতে পারে মায়া তার কিছুই করতে পারবে না।
দ্বিতীয় স্তরে বুঝতে পারে কোনো বিশেষ ব্যক্তি সম্বন্ধে যা ভেবেছিল তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যা ভেবেছিল তা সেরকম নয়। তার থেকে বের করে আনা যায় না।
মন আহারের দ্বারা, পরিবেশের দ্বারা, যে সময়ের মধ্যে যাচ্ছে সেই সময়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়।
কখনো কখনো জীবনে এমন পরিস্থিতি আসে তখন আবেগের ঝড়ের ভিতর পড়ে যায়। সময়, খাদ্য আর পরিবেশ এই তিনটির প্রভাব থাকে মনের উপর।
অন্যকে দোষ দেওয়া মনের এক অস্বাভাবিক রূপ। এই স্বভাব সবার মনেই থাকে। অনেকে আবার নিজেকে দোষ দেয়।
এই দুটি স্বভাব থেকে মুক্ত করে জেগে উঠতে হবে। সচেতন হতে হবে।
কাউকে দোষ দিলে যেমন তার সাথে থাকতে পারে না তেমনই নিজেকে দোষ দিয়ে নিজের সাথেই থাকতে পারে না। আত্ম বিকাশের প্রথম পদক্ষেপ হলো নিজেকে দোষ না দেওয়া।
তা বলে অন্যকে দোষ দেওয়া চলবে না। নিজের সব ভুলকে সমর্থন করা স্বপক্ষে যুক্তি খাড়া করা এক্কেবারে উচিত নয়।
মনের গভীরে শান্তি পেতে হলে বিশ্রাম আর কর্মের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।
বিশ্রাম মানে শরীর বিছানায় এলিয়ে দেওয়া নয়। ভাবতে হবে আমি সন্তুষ্ট, আমি তৃপ্ত। কেবল তৃপ্তিই শান্তি দিতে পারে। কোনো কাজে নিযুক্ত থেকে এই মানসিক সন্তুষ্টি দিতে পারে না।
কেবল প্রজ্ঞায় দিতে পারে মানসিক তৃপ্তি।জীবনের যথার্থ জ্ঞান হলো
১.সবকিছুই অস্থায়ী,
২.আমি পরিতৃপ্ত,
৩.আমার কিছুই চাইনা।
এই তিনটিই হলো প্রজ্ঞার নির্যাস।
ক্ষমা করতে শিখতে হবে। মন যখন বিদ্বেষকে আর ধরে রাখতে পারে না, ঘৃণা করবার যন্ত্রণাকে আর সহ্য করতে পারে না, ক্রোধকে আর বইতে পারে না তখন ক্ষমার ভাব মনে এসে যায়।নীরব মন:-
মনের ভাবনাগুলো তাদের নিজেদের উদেশ্যে নয়। তাদের লক্ষ্য হলো নীরবতা। শ্বাসের সঙ্গে যে প্রার্থনা হয়, সেই প্রার্থনা নীরব।অন্তরের মধ্যে যে ভালোবাসা সে ভালোবাসা সেও মৌন। নিঃশব্দ প্রজ্ঞাও মৌন। কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া দয়ামায়া, সেও নীরব।কর্তাবিহীন কর্মের সাধন হয় নীরবতায়।সম্পূর্ণ সত্তাময় যে হাসি সেই হাসি নীরব।
চেতনার বিকাশ থেকে মনের শান্তি আসে।
মন ভালো রাখতে হলে নিজের মুখের হাসিকে সহজলভ্য করে তুলতে হবে।
সাধারণত আমরা অন্যের প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করি। হাসিকে লুকিয়ে রাখি। এর উল্টোটা হওয়া উচিৎ। ক্রোধকে সম্বরণ করে হাসিকে উপহার দিতে হবে।হৃদয় সব সময় পুরানোকে চায় আর মন চায় নতুনকে। জীবন এই দুইয়ের সমন্বয়। প্রত্যেক বছর যেন জীবন পুরানো জ্ঞান আর নতুনত্বে ভরে দেয়। জীবনে এই দুটিরই প্রয়োজন।
সৎসঙ্গ:-
যখন মানুষ সৎসঙ্গে আসে তখন তাদের সবার মনে যত বোঝা থাকে সব দূর হয়ে যায়।তারা তাদের মনকে অতিক্রম করে এক আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত হয়। আর ঈশ্বরের সাথে যুক্ত হয়ে যায়।
মন সাকার নয়- অমূর্ত। অর্থাৎ মনের কোনো নির্দিষ্ট অবয়ব নেই। মন কোনো ইন্দ্রিয় বা ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বস্তুও নয়।
বাইরের জগতের বিভিন্ন অনুভূতি আমরা গ্রহণ করি পঞ্চেন্দ্রিয় মাধ্যমে। এই পঞ্চেন্দ্রিয় হলো চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক। এই পঞ্চেন্দ্রিয়র মধ্যে কোনোটির সাহায্যেই মনকে আমরা জানতে পারি না। যদিও গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন ইন্দিয় সমূহের মধ্যে আমি হলাম মন। অর্থাৎ সে অর্থে মন যদি ইন্দ্রিয় হয় তবে সে পঞ্চেন্দ্রিয়র বাইরে অন্য কোনো ইন্দ্রিয় বা বিশেষ ধরনের অনূভুতি বা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়।ধ্যান:-
ধ্যান প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব–
মানুষের সব দুঃখ কষ্ট যাতনার মূলে রয়েছে -মনের আলতু ফালতু ভাবনা। অকারণে অযথা চিন্তা করা। মনের স্বভাব হচ্ছে এটা সেটা চিন্তা করা। এর ফলেই মনের স্বাস্থ্য দূর্বল হয়,অবসন্ন হয়। তার ফলেই রোগ যাতনা অশান্তি জন্ম নেয়। মানুষ নিরানন্দ হয়ে পড়ে। তাহলে উপায় কি? মনকে কিন্তু শিক্ষা দেওয়া যায়। মনকে একমুখী করা যায়। মনের আসল রূপ কিন্তু খুবই মনোরম। খুবই উদার খুবই বিশাল। যে শিক্ষা দ্বারা মনকে বশ করা যায় সেটি হচ্ছে ধ্যানযোগ। ধ্যানযোগ করলে মন একমুখী হয়। শান্ত হয়।রাগহীন হয়। এক অনাবিল আনন্দ পাওয়া যায়। এই আনন্দ থাকলে রোগ দুঃখ হয় না।হলেও তা সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করা যায় এই ধ্যানযোগের দ্বারা।
মন তার নিজের সৃষ্ট কুট কাচালি, ভ্রম ও অবাস্তবকে প্রশয় দেয়। কিন্তু ধ্যান মানে হচ্ছে চিন্তা থেকে মুক্তি।
একজন মানুষ যখন যথেষ্ট পরিণত তখন সে বুঝতে পারে তোষামোদে তুষ্ট হওয়া বা অপমানিত হওয়া সবই হলো মনের অহং ও স্বার্থপরতারই প্রকাশ। সুতরাং এগুলোতে তার কোনো প্রতিক্রিয়া না হওয়ারই কথা।
মনকে ভালো রাখার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উপায় ধ্যান।
কিন্তু দেখা যায় ধ্যান করার সময় নানান বিকার এসে জ্বালাতন করে। কামনা, লোভ, কারুর প্রতি রাগ, ঈর্ষা, কারোর প্রতি অনুরক্তি সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
এগুলো জয় করতে হলে প্রত্যাহার সাহায্য করে। প্রত্যাহার মানে-
ঠিক আছে এই মুহুর্তে আমি কোনো কিছুর গন্ধ নিতে চাই না। এই মুহূর্তে আমি কোনো সুস্বাদু জিনিষের স্বাদ গ্রহণ করতে চাই না। এই মুহুর্তে আমি জগতের কোনো কিছু দেখতে চাই না। এমনকি এখন আমি কোনো পরোয়া করি না কোনো সুন্দর শব্দের। আমি কোনো স্পর্শের অনুভুতিও পরোয়া করিনা।
এইভাবে আমরা মনকে পঞ্চন্দ্রিয় থেকে নিজেদের কাছে ফিরিয়ে আনি। তখনই জাগতিক মায়ার ভ্রম থেকে মুক্ত হওয়া যায়।সুতরাং ধ্যান সফল হয় তখনই এইসব কৌশল দ্বারা মনকে ফিরিয়ে আনে। ধ্যান সফল হয়।অনেক জটিল ব্যাধি সৃষ্টি হয় না ধ্যানযোগের ফলে। মন পবিত্র হয়। শান্ত হয় তাই নয় বহু রোগ ভালো হয়। সাময়িক রাগের ফলে বহু মানুষ হার্ট স্ট্রোকে মারা যায়। এমন ঘটনা অনেক। ধ্যানযোগের ফলে তাদের অন্তত হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হবে না।
জগতে সুখ, ভালোবাসা, আনন্দ আসবে। মানুষের মন মধুময় হবে।
সবরকম প্রতিকূলতা, ঋণাত্মক দিক নিয়েও মানুষের মন মধুময় থাকবে এমনই শক্তিধর এই ধ্যানযোগ।অনেক সময় দেখা যায় কিছু কথা অন্যায়ভাবে বললো বা অপমান করলো। এর জন্য রাগ হলো। এর ফলে স্নায়ু থেকে এক উত্তেজক রস বেশি পরিমানে বার হবে। এই রস শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ক্ষতি ডেকে আনবে। এই অঙ্গগুলি দূর্বল হয়ে পড়বে। এই ক্ষতিকে ঠিক করতে শান্তরসের দরকার হয়।আর এই শান্তরস বের করতে হলে চাই মনের ব্যায়াম। আর এই মনের ব্যায়ামই হলো ধ্যানযোগ।
ভালোবাসার ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায়
মন ও হৃদয়ের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও হৃদয় তাকে গ্রহণ করতে পারে না। আবার হৃদয় চাইলেও মন তা গ্রহণ করতে পারে না।সাহিত্যিকদের মনটাই আসল রাজা। গল্পের গরুকে গাছে চড়িয়ে দিতে পারে। তারা পাথরে ফুল ফুটিয়ে দিতে পারে।
মনের শক্তি বা ইচ্ছাশক্তি থাকলে ঝড় জল তুফানের মধ্যেও বেরিয়ে নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌছাতে পারে। আবার মন না চাইলে শুয়েই থাকে। সেই-
” বুঝলে নটবর, আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাব না। “পূর্বে রাজকন্যারা স্বয়ংম্বর সভায় যাকে ইচ্ছে তার গলায় মালা পরিয়ে দিত। এখন স্বয়ংম্বর সভা না থাকলেও যাকে মনে ধরে প্রেম প্রস্তাব করে বিয়ে করা যায়। বিপরীতে ঘৃণা মনেই সৃষ্টি হয়। আবেগ, স্নেহ, মমতা, ভালোবাসার জন্ম হয় মনে। মন থেকে হৃদয়ে।
মানব সত্তা বড় বিচিত্র। অনেক সময় বা কোন কোন সময় মন এমন কিছু পেতে চায় যা বিবেক সমর্থন করে না। অর্থাৎ মানব সত্তা একক নয়। মানুষের দুটো সত্তা রয়েছে। একটি দেহসত্তা, অপরটি নৈতিক সত্তা। দেহ হলো বস্তুসত্তা। দুনিয়াটাও বস্তুসত্তা। বস্তুজগতের কতক উপাদানেই মানব দেহ গঠিত। তাই বস্তুজগতের প্রতি মানবদেহের প্রবল আকর্ষণ থাকাই স্বাভাবিক। এ পৃথিবীতে ভোগ করার মতো যা কিছু আছে তাই দেহ পেতে চায়। দেহের মুখপাত্রই হলো মন। দেহ যা চায় তাই মনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। সুতরাং, মন যা চায় তা দেহেরই দাবী।
মন কোনো সময় খালি থাকে না। চেতন বা অবচেতন মনে কিছু না কিছু সে চিন্তা করেই চলেছে।মানসিক বা মনের রোগ:-
মনের রোগ হচ্ছে রোগীর অস্বাভাবিক আচরণ, অস্বাভাবিক জীবন-যাপন যা মস্তিষ্কের রোগের কারণে হয়। যার জন্য স্বাভাবিক পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত জীবন ব্যাহত হয় অথবা রোগী তীব্র মানসিক যন্ত্রণা বা অস্বস্তিতে ভোগে।মন থাকে মস্তিষ্কে। মনের সাধারণত ৩টি অংশ। ক) সচেতন মন খ) অচেতন মন গ) অবচেতন মন। সচেতন মন, মনের মাত্র ১০ ভাগ। মনের ৯০ ভাগ জুড়ে রয়েছে অচেতন বা অবচেতন মন।
মানসিক রোগের প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায় নি। বিভিন্ন কারনে মনের রোগ হতে পারে।
তবে কারণগুলোর মধ্যে জেনেটিক বা বংশগত প্রভাব, পরিবেশগত প্রভাব, শারীরিক মানসিক যৌন নির্যাতন, অস্বাভাবিকভাবে শিশুর লালন-পালন, ইন্টারনেট সহ অন্যান্য নেশা দ্রব্যের ব্যবহার, মস্তিষ্কের গঠন জনিত সমস্যা, নিউরো ট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতা, দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের অভাব, দীর্ঘমেয়াদী অস্বাভাবিক চাপ, এছাড়া মৃগীরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিকস্, ব্রেন ইনজুরি, ব্রেইন টিউমার, কিডনি, যকৃত, হৃদপিণ্ডের ফেইলিয়রও মানসিক রোগের কারণ হতে পারে।
পরিশেষে– সুস্থ মনই সুস্থ শরীর প্রদান করে দীর্ঘজীবন দান করে। -
কবিতা- নারী
নারী
-শচীদুলাল পালনারী মানে রূপে লক্ষী গুণে সরস্বতী
কর্মে দাসী স্নেহে মাতা মন্ত্রনাতে মন্ত্রী।কর্মে নারী ধর্মে পত্নী ক্ষমায় বসুন্ধরা,
দিবারাত্রি সেবিকাটি সেবায় স্নেহধারা।যুগে যুগে নিপিড়ীতা সেই বরবর্ণিনী
পঞ্চপাণ্ডব ভোগ্যপণ্যা রমণের রমণী।মহারথী শর্ত মানে দ্রোপদীরে দানে।
দুঃশাসন বস্ত্র টানে চুপ সব অপমানে।গর্ভসঞ্চার,ঋষির প্রয়োগ প্রথা নিয়োজনে,
পুরুষ দ্বারায় নিয়মকানুন প্রথা প্রবর্তনে।পুরুষ ভোগ্যা প্রলোভিতা শকুন্তলা নাচার।
অন্তঃসত্ত্বা অস্বীকারে বিস্বরনের শিকার।সীতার অগ্নি পরখ, রামের সংশয় নিবারণে,
মহীয়সী নারী মরে বারবার অপমানে।পুরুষ ইচ্ছার প্রতীক নারী, ভোগ্য যত্রতত্র।
নারীভোগে রেয়াৎ, যখন মুনি কামতাড়িত।হবে তুমি মহীয়সী হলে সেবাদাসী,
পুরোহিতের শয্যাসাথী তবেই দেবের দাসী।ঘোমটা মাথায় ছিল নারী হতো সমাদৃতা।
নারীর বিপদ নারী ডাকে যখন অনাবৃতা।প্রস্তর খন্ডে কারুকার্য নগ্ন নারীমূর্তি
শিল্পীর তুলি কবির কাব্যে নগ্নতারই পূর্তি।ইতিহাসে দ্রৌপদী আর হেলেন জয়নব সীতা,
যুগে যুগে মহাকাব্যের যুদ্ধ রচয়িতা। -
গল্প- প্রতীক্ষা
প্রতীক্ষা
-শচীদুলাল পালবিহারের মোকামায় নাজারেথ হাসপাতালের আই সি ইউ কেবিনে এক বৃদ্ধা অপারেশনের পর অচৈতন্য। অক্সিজেন সরবরাহ ও সমস্ত মনিটরিং ইকুপমেন্ট চালু। রোগিণীর পাশে বসে নিরীক্ষণরতা এক তরুণী লেডি ডাক্তার,ডাঃ নিবেদিতা। এশিয়ার সেরা সার্জেনদের মধ্যে একজন ডাঃ নিবেদিতা।
ইসিজি মনিটারের গ্রাফের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন মানুষের জীবনের সাথে রেখাগুলির কি অপূর্ব মিল। জীবনটাও ইসিজি গ্রাফের মতো প্রতি পল বিপল ওঠা নামা করছে। যেদিন যে মুহূর্তে
ওঠা নামা গ্রাফটি সরলরেখায় পরিনত হবে সেদিনই জীবনের সময় শেষ অর্থাৎ মৃত্যু।
সে আজ তিন দিন যাবৎ দিনরাত প্রায় বিনিদ্র। টুলে বসে তন্দ্রাচ্ছন্ন। পাশের টুলে নার্স।বাইরে আয়া।ভাবছে সবার মতো তারোও জীবনটা অনেক উত্থান পতনে ভরা। বেশি করে মনে পড়ছে তার হারিয়ে যাওয়া মায়ের কথা। সে ভাবতে ভাবতে গভীর অতলে চলে গেছে। ✨✨✨✨✨✨✨✨আমি তখন খুব ছোট। জ্ঞান হওয়া থেকে দেখতাম একটা দরমার বেড়া দেওয়া ঘরে আমার সারা দিনরাত কাটতো। মা বাসন মেজে, অন্যের বাড়ি কাজ করে ফিরে আসতে আসতে রাত হয়ে যেতো। যা নিয়ে আসত তাই খেতাম।অনুভব করতাম ক্ষিদের যে কি জ্বালা! মা মুখে খাবার পুরে দিলে কি যে আনন্দ হতো। সেই সময়গুলোর কথা মনে পড়ে। পরে মা এক মিশনারী স্কুলে চাকরি পেয়ে গেলো। অফিস ঘর ঝাড়ু দেওয়া থেকে বেয়ারার সব কাজ করত।অফিসের পাশে এক ঘরে আমরা থাকতাম। এভাবে আমি ধীরে ধীরে বড়ো হলাম। আমিও স্কুল ইউনিফর্ম পরে অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সাথে স্কুল যেতাম। মাকে জিজ্ঞেস করতাম সবার তো বাবা আছে। আমার বাবা কই?
মা শুধু কাঁদতো। চোখ দিয়ে জল পড়তো। কিছু বলতোনা। এড়িয়ে যেত।মা কষ্ট পাবে বলে আমিও কিছু জিজ্ঞেস করতাম না।
একদিন মাকে বললাম
— তুমি প্রতিদিন এড়িয়ে যাচ্ছো কেন? আজ তোমাকে বলতেই হবে। স্কুলে বন্ধু বান্ধবরা বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে কিছুই উত্তর দিতে পারিনা। অনেকে বলে আমি নাকি জারজ। আচ্ছা মা, জারজ কাকে বলে?
আমি কি জারজ?
মা সপাটে এক গালে চড় কসিয়ে দিয়ে হু হু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে লাগলো। বলল–
নারে না। তুই জারজ নোস। তোর বাবা আছে।ভেবেছিলাম আমার বিগত দিনের কথা আমার অসময়ের কথা তোকে বলবনা। কিন্তু আজ ভাবলাম তোকে সব জানাতে হবে। আমি মরে গেলে পিতৃ পরিচয়হীনা হয়েই জীবন কাটাতে হবে।
— হ্যাঁ মা বলো। তোমার বিগত দিনের কথা আমি জানতে চাই।মা বলতে লাগলো ——
—- —- আমার বিয়ে হয়েছিল এক গ্রামে।এক শিক্ষিত ধনী পরিবারে এক উচ্চ আয়ের ছেলে রুদ্রর সাথে। অনেক বড়ো পরিবার। ছেলেটি মায়ের কথায় উঠবোস করতো। বেশ ভালোই কাটছিল। একদিন আমি প্রেগন্যান্ট হলাম।ছেলেটি কাজ শেষে ঘরে ফিরতে রাত হতো। তাই সারাদিন শাশুড়ির তত্ত্বাবধানে থাকতাম। তিনি যা বলতেন আমি সব শুনতাম। একদিন শাশুড়ীর সাথে শহরে এক ডাক্তারকে দেখানোর জন্য গেলাম। শাশুড়ী আমাকে নিয়ে গেলো এক অবৈধ আল্ট্রাসোনোগ্রাফি সেন্টারে। আমি শাশুড়ীর সাথে ফিরে এলাম। দিন কয়েক পর শাশুড়ী একদিন বললো —
তুমি এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিতে চলেছো।
আমি চাইনা কন্যা সন্তান। চলো এখুনি। তোমাকে এবরসন করাতে হবে।
আমি প্রতিবাদ করলাম। শাশুড়ী তীব্র নির্যাতন করতে লাগলো।
তোমাকে গর্ভপাত করাতেই হবে।
আমি বললাম ” আমি গর্ভপাত করাবো না। কন্যা সন্তান কি সন্তান নয়?আপনিও তো কন্যা সন্তান হয়েই পৃথিবীতে এসেছেন।
—– কিন্তু আমিতো পুত্র সন্তানের মা।
— তা হলেই বা। কন্যারা না থাকলে এই জগৎ সংসার চলবে কি করে? সৃষ্টির এই প্রবাহ শেষ হয়ে যাবে।
পুত্র হোক বা কন্যা। তার জন্ম তো নারীর গর্ভে।
— তুমি মুখে মুখে তর্ক করবেনা।
চুলের মুঠি ধরে আমাকে মারতে লাগলো। এখুনি চলো
–আমি যাবো না। আমি আমার সন্তান নষ্ট করব না।
— ঠিক আছে। ছেলে আসুক। তোমার অনেক বাড় বেড়েছে।
কথায় কথায় প্রতিবাদ।
— আপনি জানেন কি ভ্রূণ পরীক্ষা দণ্ডনীয় অপরাধ। ৫ থেকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে।রাতে ছেলে রুদ্র এলো। মা ইনিয়ে বিনিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মিথ্যা অভিযোগ জানালো। বলল আমি নাকি শাশুড়ীকে মারতে গিয়েছি।
রুদ্র আরও রেগে রুদ্রমূর্তি ধারন করল।
—- মা যা বলছে তা তুমি মেনে নাও। মা ঠিকই বলছে।তুমি এবরসন করিয়ে নাও। আমিও চাইনা এ বাড়িতে কন্যা সন্তান। মা আমারই পরিকল্পনা মাফিক চলছে।
এভাবে দিনকয়েক চললো।
এবার রুদ্র আর শাশুড়ী আমার উপর অত্যাচারের মাত্রা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল। খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিল। ভাতের থালা কেড়ে নিত।মারতে মারতে খাট থেকে ফেলে দিত।প্রচন্ড শীতে বাড়ির উঠানে রাত কাটাতে বাধ্য করত।আমার ঠাঁই হলো গোয়াল ঘরে। একরাতে মা ও ছেলের কথাবার্তা কানে এলো।” বিষ খাইয়ে পেটের বাচ্চা সমেত মেরে দাও।”
তারা মধ্য রাত্রিতে গোয়াল ঘরে এসে আমাকে জোর করে খাওয়াতে এলো। আমি খাবার খেতে রাজি হলাম না। তখন তারা আমার গলা টিপে মারতে এলো। আমি বললাম
— আমাকে মারবেন না। আমি বাঁচতে চাই।আমি রাজি।
তখন তারা আমাকে সযত্নে ঘরে নিয়ে গেলো।
আমি বললাম
— আমি কালই যাব।কোথায় ইউ এস জি রিপোর্ট। আমি একটু দেখি।
তারা ইউ এস জি রিপোর্টটি আমার হাতে দিয়ে দিল। আমি এবরসন করাবো জেনে খুব যত্ন করলো।রাত তখন তিনটে। বাড়ির সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমি এক বস্ত্রে ইউ এস জি রিপোর্টটি সযত্নে হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরোলাম।
শীতের নিশুতি রাত। হাড় কাঁপানো কনকনে ঠান্ডা। কুয়াশায় সামনের কিছুই দেখা যায়না।
জনমানব হীন রাস্তা। বাবা মা অনেক দিন আগেই প্রয়াত।কোথায় যাব? এক অজানার উদ্যেশ্যে পাড়ি দিলাম। এই সঙ্কটকালে কেঁদে কেঁদে শুধু ঈশ্বরকে ডাকলাম। শীতে, ক্ষিদে তেষ্টায়, পথশ্রমে, অবসন্ন শরীরে রাস্তার ধারে এক গাছতলায় আশ্রয় নিলাম। দেখি একটা কুকুর শীতে জুবুথুবু হয়ে ঘুমাচ্ছে। তার পাশেই শুয়ে পড়তেই জ্ঞান হারালাম।
যখন জ্ঞান ফিরল তখন অনুভব করলাম আমি এক হাসপাতালের বিছানায়। সামনেই এক নার্স।ধড়ফড় করে উঠে বসার চেষ্টা করতেই নার্স এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল
— উঠবেন না। আপনি মিশনারী হস্পিটালে আছেন। আজ সকালে মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে ফাদার আপনাকে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সহায়তা নিয়ে গাছতলা থেকে উদ্ধার করে এখানে ভর্তি করেছেন।
— সিস্টার।আমি মা হতে চলেছি। আমার গর্ভস্থ সন্তান ঠিক আছে তো,?
—– ঈশ্বরের অসীম কৃপায় আপনি ঠিক আছেন। এখুনি ডক্টর ও ফাদার এসে যাবেন।
———- ফাদার ও ডক্টর আসতেই আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম। পরিচয় গোপন করে বললাম
—- আমি আমার সন্তানকে বাঁচাতে চাই। আমার কেউ নেই। আপনি আমার ফাদার মানে পিতা।
ফাদার ও ডক্টর রুটিন চেক আপ করে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো।
কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের সুপারকে সাথে নিয়ে ফাদার এলেন। সুপার বললেন
—ফাদার সব বন্দোবস্ত করেছেন। বাচ্চার জন্ম ও সম্পুর্ন সুস্থ হওয়া পর্যন্ত আপনি এখানে থাকবেন।
অবশেষে এলো সেই আকাঙ্ক্ষিত সময়।
নিদিষ্ট দিনে সুস্থ সবল এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দিলাম আর সেই সন্তানই হলি তুই। আমার নয়নের মনি। আমার নিবেদিতা।তোকে ঘিরেই আমার স্বপ্ন। বেঁচে থাকার অবলম্বন।
—– তারপর বাবা আর যোগাযোগ করেনি? তুমি আর যাওনি?
বাবা তোমার কাছে আসেনি? আমাকে দেখতে আসেনি?
— হ্যাঁ এসেছিল। তবে তোকে দেখতে আসেনি।তুই তখন ক্লাস ফাইভের ছাত্রী । অনেক খুঁজে ফাদারের অফিসে এসেছে। ফাদার আমাকে ডেকে পাঠালো।
আমি গিয়ে দেখি রুদ্র মানে তোর বাবা বসে আছে। আমাকে বললো
— গতকাল আমেরিকা থেকে ফিরেছি। এক জরুরি কাজে তোমার কাছে ছুটে এসেছি।
— বলো আমাকে কি করতে হবে?
— আমেরিকায় নাগরিকত্ব নিয়ে থাকলে তবেই পাশপোর্ট ভিসা এক্সটেনশন করা যায়। তাই সেখানকার নাগরিক কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে হবে।তাহলে শীঘ্র নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে। আর সেটা সম্ভব হবে যদি তুমি যদি এই ডিভোর্স পেপারে সই করে দাও।
— ও আচ্ছা। দাও কোথায় সই
করতে হবে।
আমি আর একটি কথাও না বাড়িয়ে সই করে দিলাম।
সেই সময়ে ছিন্ন হয়ে গেলো তোর বাবা রুদ্রর সাথে আমার বিবাহ বন্ধন।মায়ের জীবনের দূর্বিষহ সময় গুলির কথা ভেবে মনে মনে ভাবলাম আমাকে স্বনির্ভর হবে।
আমি পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম। টীচাররা খুব আদর করত। CBSC বোর্ড এক্সামে ৯৯% নম্বর পেয়ে যেদিন বাড়ি গেলাম সেদিন মায়ের কি আনন্দ! আমাকে ঘিরে মায়ের নাচ। সে খুশির দৃশ্য আজও মনে আছে। এভাবে আমি টুয়েলভ লেবেল এক্সামে স্কুল টপার হলাম। কি করব ভাবছি ডাক্তারি এডমিশন টেস্টে এপিয়ার হলাম, সেইসময় আমার মাথায় বাজ পড়লো।
মহাকাল ছিনিয়ে নিল আমার প্রিয়তমাকে।একদিন মিশনারীর অব চ্যারিটির দিল্লির অফিস থেকে অফিসিয়াল কাজ শেষে মা ফিরছিলেন এক্সপ্রেস ট্রেনে। ট্রেনে আকস্মিক ভাবে আগুন লেগে যায়। বহু যাত্রী অগ্নি দগ্ধ হয়ে,শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আঘাতে জর্জরিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছিল। মৃত্যু মিছিল। লাশের পাহাড়।
লাসের স্তুপ থেকে মায়ের মৃতদেহ পাওয়া যায়নি।
বার্নিং ট্রেনে মায়ের সাথী ছিল এক নান ( সন্ন্যাসিনী)। তার বয়ান অনুযায়ী
—- তোমার মা ও আমি একসাথে ছিলাম। বিপদের সময় তোমার মা আমাকে সাহস
দিচ্ছিলেন। চারিদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। একসময় আমি জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান যখন ফিরল দেখলাম তোমার মা নেই। আমার বিশ্বাস তিনি মরেননি বেঁচে আছেন।
খুব জ্ঞানী ছিল তোমার মা।একসাথে দুজনে স্টেশনে ট্রেন ধরার জন্য আসছিলাম। পথিমধ্যে ট্র্যাফিক জাম। নিদিষ্ট সময়ে ট্রেন ছেড়ে দেবে। তাই বাস থেকে নেমে হাঁটা লাগালাম। প্রায় ছুটতে লাগলাম দুজনেই।সেসময় তোমার মা বলছিলেন
— সময়ের চাকা কখনো থেমে থাকে না। পৃথিবীর সমস্ত শক্তি এক করে দিলেও ঘড়ির কাঁটাটাকে বন্ধ করা যায় না। পিছন দিকে টানা যায়না। সেজন্য প্রতিটি সেকেন্ড প্রতিটি মুহূর্ত প্রতিটি পল বিপল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক মুহূর্ত চলে গেলে আর তা ফেরে না। সুতরাং দৌড় লাগাও যতক্ষণ না গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছো।———- আমি মিশনারী স্কুলের নিয়মমতো আবাসিক হোস্টেলে থাকা খাওয়ার সুযোগ পেলাম।
এক শুভ দিনে এক শুভ সংবাদ পেলাম।
লন্ডনে ডাক্তারী পড়ার জন্য আমি এলিজিবল। মিশন আমার সব দায়ভার বহন করলো।
আজ বছর তিনেক হলো এক্কেবারে FRCP.(london) পাশ করে সার্জেন হয়ে দেশে ফিরে এসে এই মিশনারী হাসপাতালে জয়েন করেছি। মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োগ করেছি।এসব ভাবতে ভাবতে কোথায় হারিয়ে গেছিলো।
✨✨✨✨✨✨
ICU কেবিনে
নার্সের ডাকে নিবেদিতার তন্দ্রাচ্ছন্নতা কেটে গেলো।
— ম্যাডাম। পেশেন্টের জ্ঞান ফিরছে।
— হ্যাঁ।অনেক ক্রিটিক্যাল অপারেশন। এই অপারেশনে সাধারণত ২℅ পেশেণ্ট বাঁচে। অপারেশন সাকসেসফুল।
আমি নিজে হাতে অপারেশন করেছি। আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় মুহুর্ত।✨✨✨✨✨✨✨✨✨
দুদিন পর। পেশেন্টকে আই সি ইউ থেকে জেনারেল কেবিনে দেওয়া হয়েছে। পেশেন্ট বিছানায় বসে নার্সের হাত থেকে পথ্য গ্রহণ করছে। সার্জেন ডাক্তার নিবেদিতা এসে কেবিনে গিয়ে বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করলেন
—- আপনি কেমন আছেন?
— আমি তো মরেই গিয়েছিলাম। সব হাসপাতাল জবাব দিয়ে দিয়েছিল। তুমি আমায় বাঁচিয়েছো।
অনেক ক্রিটিক্যাল অপারেশন।
শুনেছি এশিয়ার সেরা সার্জেনদের মধ্যে তুমি একজন।
তুমি মানবী নও মা।
তু মি ভ গ বা ন।— আমি ভগবান নই ঠাম্মি।
আমি আপনার সেই পুত্রবধূর কন্যা ভ্রূণ। গর্ভে কন্যা সন্তান আছে বলে এবরসন করতে বলেছিলেন। মা রাজি না হবার জন্য মায়ের উপর অকথ্য নির্যাতন করেছিলেন। পুত্রবধূ ও তার গর্ভস্থ কন্যা সন্তানকে একসাথে হত্যা করতে গেছিলেন। অত্যাচারিত নিপিড়ীত বহিস্কৃত
মায়ের কন্যা ভ্রূণ জীবন্ত আজ আমি আপনার সামনে। আমি ডাঃ নিবেদিতা, সার্জেন —–
আপনার
না ত নি।
আমি ভগবান নই ঠাম্মি—
আমি আপনারই
না-ত-নি। -
কবিতা-বাঙলার শৈত্যপ্রবাহ
বাঙলার শৈত্যপ্রবাহ
-শচীদুলাল পালহিমের পরশ শীতে শির-শির
উত্তর হাওয়ায় কাঁপে শরীর।রুক্ষ শুষ্ক বাতাবরণ,
মিষ্টি মধুর তপন তাপন।স্নান জল স্পর্শণে শিহরণ
অঙ্গে অঙ্গে লাগে কম্পন।খসে পড়ে পাতার বসন
নগ্নরূপে গাছপালা বন।কুয়াশার চাদর আচ্ছাদন
ঝাপসা লাগে পথঘাট লোকজন।জুবুথুবু অলস জীবন
আপাদমস্তক ঢেকে শয়ন।লেপ কাঁথা কম্বল সম্বল
গরীবের গা-সেঁকতে অনল।চলো দার্জিলিং পাহাড়ে
তুষারপাত দেখবো এবারে।ধনীর সাজ টুপি সোয়েটার
জ্যাকেট কোর্ট প্যান্ট মোজা মাফলার।নেই ঘর নেই কাপড় নিরাভরণ
জাড়ে জ্বর গরীবের মরণ।বড়লোকের শখের পৌষমাস
শীতকালে দুঃস্থের সর্বনাশ।খেজুর রসেরই নলেন গুড়
পিঠে পায়েস মিষ্টি মধুর।মালপোয়া পাটিসাপটা
দুধপুলি বকুল তিল পিঠা।সফেদা লেবু কমলা
কুল জলপাই ধাত্রীফল আমলা।পালং বেথো মেথি মটর
ধনেপাতা মুলো গাজর।বাঁধাকপি ফুলকপি
বেগুন বিলাতি ওলকপি।শীতের মরসুমি শাক সবজি
এই সময়ে খাও মন মরজি।আনন্দমুখর শীতের মেলা
বই পড়তে, কিনতে বইমেলা।পৌষমাস টুসু পরব মানভুম
বিটিছিলার টুসু গানের ধুম।টুসু ভাসান পোখোরে চান
আগুনে গা সেঁকে মাতান।বক্রেশ্বর উষ্ণপ্রস্রবণ
শীতে দিনভর অবগাহন।শান্তিনিকেতন চলো যাই
কবিগুরুর সেই পৌষ মেলায়।জয়দেবের কেন্দুলি মেলায়
কীর্তন শেষে খড়ের গাদায়।সাগর সঙ্গমে সাগর বেলায়
মকর সিনান পুণ্যির আশায়।চলো দলবেঁধে কজনে,
নদীকুলে বনভোজনে।নাচ গান কাব্যে দুঃখ ভুলি
মিলেমিশে সেলফি তুলি।পরিযায়ীর ভীড় জলাশয়ে
আসে পাখি দূর পাড়ি দিয়ে।ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা,
গাঁদা, গোলাপ শীত প্রেমিকা।যিশু স্মরণ বড়োদিনে
সারা বিশ্বে উদযাপনে।শীতের রাত রাস্তাঘাট শুনসান
কাজের শেষে প্রত্যাবর্তন।সরস্বতী বর কামনা
মাঘ পঞ্চমী আরাধনা।প্রথম ধুতি প্রথম শাড়ি
সেলফি নিতে কাড়াকাড়ি।ওমের খোঁজে লেপের তলায়
ঘন সান্নিধ্যে জাড় পালায়। -
কবিতা- টুসু পরব
টুসু পরব
-শচীদুলাল পালপৌষ মাস টুসু মাস কর টুসু গান
ধর তান প্রাণ মন রাখ টুসু মান।
সাঁঝ বেলা বিটি ছিলা আয় বাজা শাঁখ,
বিটিগুলা আয় ছুটে আল্পনা আঁক।
কাঁড়ুলি বাছুরের গোবর তুস সরা এনে।
সিঁদুরের সাত দাগ টেনে বসা আসনে।
রোজ রোজ টুসু সাজা গেঁদা আকন্দে।
ছুটু ছুটু গান বাঁধ মনের আনন্দে।
পুরোহিত বামুনের দরকার নাই,
টুসু কোনো দেবী লই ধর্মগ্রন্থে নাই।
গাঁ-ঘরের বিটিছিলা পুজা করি তুকে
মুড়ি মুড়কি চিড়া মিষ্টি দিব খেতে তুকে।
গোল হঁয়ে বসে গান বাঁধ প্রেম পিরিতের,
মসকরা রসে ভরা ভিতর বাইরের।
আদিবাসী মাহাতো ভুঁইয়া কুরমি,
মাতে পুরুলিয়া বাঁকুড়া সারা মানভুমি।
পুরা পৌষ জাড়ে নাচে গানে মাতন
সাঁকরাতে ভোরে জাড়ে পোখোরে ভাসান,
পোখোরেতে ডুবে চান করে দলে দলে,
গরমাবি লাচ করবি আগুন জ্বেলে।
রাঙা জামা রাঙা শাড়ি নতুন কাপড়ে,
পিঠা খেয়ে মেলা যাবি হাত ধরে ধরে।(পুরুলিয়ার আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত)
-
গল্প- সম্পর্ক
সম্পর্ক
-শচীদুলাল পালগঙ্গা তীরবর্তী ঘনবসতিপূর্ণ ভদ্রেশ্বর শহরের প্রধান সড়কের পাশে একটা সরণি। সেখানের বাড়িগুলি বেশ ছাড়া ছাড়া। অনেক জায়গা নিয়ে বাগানে ঘেরা। গাছপালায় ভর্তি।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘর থেকে টি ভি-র আওয়াজ ভেসে আসছে। আকাশ ওই রাস্তাটা দিয়ে যাচ্ছিল। এই বাড়িটার ওপর টার্গেট অনেকদিন ধরেই। একা বৃদ্ধ বাড়িতে থাকেন সেটা আকাশের কাছে খবর আছে। দরজাটা খোলা দেখে আকাশ সুড়ুৎ করে ঢুকে সেঁধিয়ে যায় বাড়িটার মধ্যে। সন্ধ্যেবেলায় এমনি খোলা বাড়ি পাওয়া মানে হাতে স্বর্গ পাওয়া। খুব একটা খাটাখাটির দরকার নেই। জামা, জুতো, যা হাতের কাছে পায় তুলে নেয়। সঙ্গে মোবাইল, হাতঘড়িটাও পকেটে চালান করে দেয়। একটু এদিক ওদিক দেখছে আর কি নেওয়া যায়। ঠিক সেই সময় সামনের রুমটা থেকে একটা গোঙানির আওয়াজ পায় আকাশ। প্রথমে ভেবেছিল ওকে দেখে হয়তো চিৎকার করার চেষ্টা করছে। পালাতে যাবে ঠিক তখন ভাবলো- এটা তো ঠিক চিৎকার নয়- গোঙানি। জামা, জুতোটা নামিয়ে রেখে একটু সাহস সঞ্চার করে রুমটায় উঁকি মারে আকাশ। দেখে এক একা বৃদ্ধ খাটে গোঙাচ্ছে। হাতটা বুকের ওপর। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। ঘরে আর কেউ কোথাও নেই। ওকে দেখে কিছু যেন বলতে চাইলো। আকাশ বুঝতে পারে কেস সুবিধার নয়। কি করবে ভেবে উঠতে পারে না। সুবর্ণসুযোগ – ঘরটা খালি করে দেবে? কিন্তু চোখের সামনে একজনকে মরতে দেখে তার সামনে দিয়ে সব কিছু নিয়ে চম্পট দেবে এই আকাশ চোর? একটু দোটানায় পড়ে। রুম থেকে বেরিয়ে দুএকটা জিনিস আবার ব্যাগে ঢোকায়। কিন্তু গোঙানিটা যেন বেড়েই চলেছে। আবার ফিরে আসে রুমে। বৃদ্ধলোকটা যেন কিছু বলতে চায় আকাশকে।
আকাশ বলে- দাঁড়ান, আপনাকে হসপিটাল নিয়ে যাচ্ছি এখুনি। বলে বাইরে গিয়ে একটা ট্যাক্সি এনে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে নিয়ে বৃদ্ধকে নিয়ে সোজা হাসপাতাল।হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময় বৃদ্ধের বালিশের তলা থেকে আলমারির চাবিটা পায়। সেটা দিয়ে আলমারি খুলে এদিক ওদিক হাতড়ে লাখ খানেক টাকাও পায়। সেই টাকা দিয়ে বৃদ্ধকে হাসপাতালে ভর্তিও করে দেয় মিহির মুখার্জি নাম দিয়ে। বৃদ্ধকে তাড়াতাড়ি ICU তে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার দেখে বলে যে ম্যাসিভ কার্ডিয়াক এরেস্ট। এখুনি অপারেশন করতে হবে। যাইহোক অপারেশন হয় এবং অপারেশন সাকসেসফুল।
ডাক্তার বললেন- ঠিক টাইমে রুগীকে নিয়ে আসা হয়েছে বলে এ যাত্রায় বেঁচে গেল। কিন্তু এখনো কিছুদিন অন্তত হাসপাতালই থাকতে হবে।মোবাইলে বৃদ্ধের প্রবাসী ছেলেকে ফোন করে আকাশ।
অপরপ্রান্ত থেকে কন্ঠস্বর ভেসে আসে
-হ্যালো, কে বাবা?
-না, আমি আকাশ বলছি
-আপনি কে?
-আমি আকাশ। চোর।
-মানে?
-কাল সন্ধ্যেবেলায় আপনার বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে দেখি আপনার বাবা হঠাৎ অসুস্থ। তাই আর চুরি করা হয়নি। হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছি। আপনি কে বলছেন ?
-আমি ওনার ছেলে। আমেরিকা থেকে বলছি। আপনি কি চ্যাংড়ামো মারছেন?
-চ্যাংড়ামো মারবো কেন? এই নিন হসপিটালের ফোন নাম্বার আর বেড নাম্বার। জিজ্ঞেস করে নিন। আর যত তাড়াতাড়ি পারেন আপনি চলে আসুন। একা বাবাকে ছেড়ে দিয়ে আমেরিকাতে দিব্ব্যি আছেন আর আমাকে সব কাজকম্মো ফেলে আপনার বাবাকে দেখতে হচ্ছে। আপনি আবার বিকেলে ফোন করবেন বাবার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবো।এদিকে নার্সরা বৃদ্ধকে মিহির বাবু বলে ডাকলে, বৃদ্ধ বললেন- আমাকে মিহির বাবু বলে কেন ডাকা হচ্ছে? আমার নাম তো সাগর। সেই কথা শুনে ওয়ার্ডের সিস্টাররা এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকেন। আর মিহিরবাবুকে বলা হয়- কাকু আপনাকে যিনি ভর্তি করিয়েছেন তিনি তো এই নামেই ভর্তি করিয়েছেন।
পরেরদিন আকাশ যথারীতি সাগরবাবুর সঙ্গে দেখা করতে যায় ICU তে। সিস্টাররা আকাশকে জিজ্ঞেস করেন
-আপনি এনার কে হন?
-আমি কেউ না।
-এনার নাম কি?
-সাগর মজুমদার।
-তাহলে মিহির মুখার্জী নামে কেন ভর্তি করিয়েছিলেন?
-আমি তখন জানতাম না। তবে ওনার ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। ওনার থেকেই নামটা জেনেছি। তাতে হয়েছেটা কি?
-কিছু না।
যাই হোক আকাশ এবার সাগর বাবুর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে।
-জ্যাঠা, কেমন আছেন?
-ভালো। তুই না থাকলে তো বোধহয় এ যাত্রায় একদম উপরে চলে যেতাম।
-আরে না না। আপনি পুণ্যবান লোক, তাই ভগবান আপনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। যাই হোক আপনার ছেলে তো আমেরিকায় থাকে। তার সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি আসছেন খুব তাড়াতাড়ি। কাল থেকে আপনার মোবাইলটা নিজের কাছেই রেখেছি, যদি কেউ চেনাজানা ফোন করে তাকে খবরটা দেবো বলে।
-এই ফোনটা তোর কাছেই রাখ।
-এখুনি আপনাকে আপনার ছেলে ফোন করবে। বলতে বলতে আমেরিকাবাসী ছেলের ফোন আসে। আকাশ ফোনটা সাগর বাবুকে দেয়। কিছুক্ষন বাবা-ছেলের মধ্যে কথাবার্তা হয়।-তুই কি বলেছিস আমার ছেলেকে?
-যা সত্যি তাই বলেছি। বলেছি যে চুরি করতে ঢুকে আপনার বাবাকে অসুস্থ দেখে হাসপাতালে ভর্তি করে দিই।
-তুই চুরির কথাটা বললি কেন? কিছু একটা বানিয়ে বলতে পারতিস।
-না, না জ্যাঠা ধরা আমি পড়ে যেতাম। তার চেয়ে ভাবলাম যে সত্যিটাই বলে দিই।যাইহোক প্রত্যেকদিন আকাশ সাগরবাবুকে দেখতে আসে। দেখতে দেখতে কয়েকদিনের মধ্যে আমেরিকাবাসী ছেলে এসে পড়ে। পরনে হাফ-প্যান্ট, গায়ে চকরা-বকরা রংচঙে জামা, মাথায় একটা টেক্সাস কাউ-বয় মার্কা টুপি, চোখে রেব্যানের সানগ্লাস, পায়ে স্নিকার। হাসপাতালে যাবার আগে থানায় গিয়ে সেই রাতের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জ্ঞানগর্ভ ইংরেজীতে লিখে একটা FIR দায়ের করে। পুলিশ আদৌ সেই FIR এর বয়ান বুঝতে পেরেছিল কিনা সন্দেহ আছে, সে যাই হোক মুখের বয়ানের ভিত্তিতে পুলিশ এসে আকাশকে থানায় ধরে নিয়ে যায়।
পরেরদিন বিকেলে ছেলে হাসপাতালে আসে। আকাশকে দেখতে না পেয়ে সাগরবাবু ছেলেকে জিজ্ঞেস করেন,
-আজ আকাশটা এলো না কেন?
-আকাশটাকে ছেড়ে দাও বাবা। ওই চোরটার জন্য এত কিসের চিন্তা।
-কিন্তু সে তো চুরি করেনি। তাছাড়া তুই যে আমাকে এখন এখানে দেখছিস সেটা তো ওর জন্যে?
-তাতে কি হয়েছে। আসলে সে এক পাক্কা চোর। সে চুরির উদ্যেশেই এসেছিল। সেজন্য তাকে জেলে পুরে দেওয়া উচিৎ। এটা আমার এক নৈতিক কর্তব্য।
সাগরবাবু এই নিয়ে আর কথা বাড়ান নি ছেলের সঙ্গে। কয়েকদিন পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন।বাড়ি এসেই থানায় আকাশের সাথে দেখা করতে যান সাগর বাবু। এদিকে কোর্টের ডেটও দেখতে দেখতে চলে এসেছে। ইতিমধ্যে আকাশের কান্ড প্রায় সমস্ত খবরের কাগজের শিরোনামে- “বৃদ্ধের প্রাণ বাঁচিয়ে চোরবাবাজীবনের হাজতবাস।” সেই মতো কোর্টে এই কেস কভার করতে মিডিয়ার হুড়োহুড়ি।
কোর্টে প্রথমে সাগরবাবুকে জিজ্ঞেস করা হয়।
সাগরবাবু বললেন– দরজাটা ঐদিন সন্ধ্যাবেলা খোলা ছিল। আমি যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিলাম। সেই সময় আকাশ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। গোঙানি শুনে ঘরে ঢুকে ও আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
পুলিশ বললো– আমাদের খাতায় ওর নাম নেই, এই প্রথমবার ওকে FIR এর বয়ানের ভিত্তিতে আটক করা হয়েছে। ও নিজেই স্বীকার করেছে যে ওর চুরির মতলব ছিল।
এরপর ডাকা হয় সাগরবাবুর ছেলেকে।সে বললো – আমাকেও ফোন করে ও চুরির কথা স্বীকার করেছে। সে একজন চোর। শেষে ডাকা হয় আকাশকে।
আকাশ বললো- হুজুর আমি গীতা ছুঁয়ে মিথ্যা কথা বলতে পারবনা। আমি চোর। ঐদিন আমি চুরির উদ্দেশ্যেই ঘরে ঢুকেছিলাম। কিছু জিনিস ব্যাগে ঢুকিয়েও নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে জ্যাঠাকে দেখে আমার মনে হয় এখুনি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত। তাই আর চুরি করা হয়ে
ওঠেনি। একটা ট্যাক্সি ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।
সাগর বাবু বললেন- ও মিথ্যা বলছে। ও চুরি করেনি। আমার সমস্ত জিনিস ঠিকই আছে। আমেরিকাবাসী বাবাকে বলে- তুমি চুপ করো বাবা।সাগরবাবু ছেলেকে ধমকে বললেন- তোর না এলেও চলতো। তুই বরং আজই আমেরিকা ফিরে যা। শুধু মুখে পুঁইপাঁই ইংরেজী ছাড়া আর কিছু কি শিখেছিস? কুলাঙ্গার কোথাকার! সবার সামনে বাবার দাবড়ানিতে আমেরিকাবাসী একটু দমে যায়।
জজসাহেব আকাশকে জিজ্ঞেস করেন- তোমার কাছে কোনো চুরির প্রমাণ আছে?
আকাশ বললো- আছে। এই বলে পকেট থেকে একটা ঘড়ি বের করে সবাইকে দেখায়। এই ঘড়িটা আমি চুরি করেছি, পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম।
সাগর বাবু বললেন- না, না ওটা আমার ঘড়ি নয়।
আমেরিকাবাসী বললো- বাবা।! এ তুমি কি বলছো! আমি তোমাকে এই মূল্যবান ঘড়িটা দিয়েছিলাম। এটার দাম জানো? এটার দাম ৩০০০ ডলার। এ এক পাক্কা চোর। জজসাহেব শেষবারের মতো আকাশকে জিজ্ঞেস করে- তুমি চিন্তা করে বলছো তো?
পুলিশ বললো- আকাশ ভেবে দেখ, ওটা ভুল করে তুই নিয়েছিস কি না? তোর কি সত্যি চুরি করা উদ্দেশ্য ছিল?
আকাশ বলে- হুজুর, সত্যি কথা আমি সহজ ভাবে বলেছি। আবারও বলছি, আমি চুরি করতেই ঢুকেছিলাম। আমি চোর।
সভাকক্ষ একদম চুপ। সাগর বাবু হতাশায় ঘাড় নাড়ছেন। পুলিশের দীর্ঘশ্বাস! জজসাহেব বললেন- আকাশ চুরি করতে গিয়েছিল এটা যেমন ঠিক, তার চেয়েও বেশী করে ঠিক যে সে এক মানবিক কাজও করেছে। মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে সত্যিটা প্রথম থেকেই স্বীকার করেছে। তাই আদালত সবদিক বিবেচনা করে আকাশকে তিন মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলো। আমেরিকাবাসী ছেলে বললো- কি হাস্যকর। এত দামী একটা ঘড়ি চুরি করে মাত্র তিন মাসের জেল! আমি হাইকোর্টে যাব।
কোর্টের বাইরে পুলিশের ভ্যানে ওঠার আগে সাগরবাবু দেখা করেন আকাশের সাথে। আকাশ ঘড়িটা ফেরত দিয়ে বললো-
জ্যাঠা, এটা আমি ইচ্ছে করে এই দিনটার জন্যে রেখেছিলাম। আর লাগবে না।
আর এই নিন আপনার ঘড়ি ও মোবাইল।
-তুই স্বীকার করলি কেন আকাশ?
-জ্যাঠা, আপনি চিন্তা করবেন না। মাত্র তিনমাসের ব্যাপার তো।আকাশ এখন সেলিব্রিটি চোর। এই ঘটনা বড় বড় করে সব পেপারে ছাপা হয়েছে। আকাশকে একটা ভদ্রস্থ সেলে রাখা হয় যেখানে অপেক্ষাকৃত ‘ভালো’ আসামীরা থাকে।
জেলে সবাই জিজ্ঞেস করে- আকাশ তুই এতটা বোকামি কি করে করলি? তুই তো না বলে দিলেই তো ছাড়া পেয়ে যেতিস। আকাশ চুপচাপ থাকে।
দেখতে দেখতে ছাড়া পাবার দিন এগিয়ে আসে। সই-সাবুদ করে বেরোতে যাবে দেখে সাগরবাবু দাঁড়িয়ে আছেন, বললেন- তোকে নিতে এলাম। চল আকাশ আমার বাড়ি চল।
এই বলে আকাশ সাগর বাবুর সাথে ওঁর বাড়ি আসে। দুজনেই একা। খাওয়া দাওয়ার পর বেশ কিছুক্ষন গল্প হয়। আকাশ বলে- আমি এই লাইনে অনেকদিন ধরেই আছি। পাঁচ মিনিটেই আমি যে কোন তালা খুলে দিতে পারি। তবে আমি পুরো অহিংসায় বিশ্বাসী, আজ অবধি কাউকে একটা চড় পর্যন্ত মারিনি। গর্ব করে বলতে পারি এখনো পর্যন্ত একবারও ধরা পড়িনি।
– বাবা তুই তো একটা শিল্পী চোর রে! এতো সূক্ষ্ম হাতের কাজ। চল আমরা একটা খেলা খেলি। আমি কাল কিছু টাকা তুলে আনব ব্যাঙ্ক থেকে, তুই যদি রাস্তা থেকে টাকাটা চুরি করতে পারিস তাহলে টাকাটা তোর।
-জ্যাঠা, আমি আর চুরি করবো না ।
-তুই এটাকে চুরি ভাবছিস কেন? আমি দেখতে চাই তুই কত বড় শিল্পী!
-আমি আর চুরি করবো না।
-তাহলে তুই চ্যালেঞ্জটা নিতে ভয় পাচ্ছিস। বল না পারবি না। তুই যদি এটাকে চুরি ভাবিস, তাহলে বলি জীবনের শেষ চুরিটা এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাক।
– ঠিক আছে। আপনি যখন চ্যালেঞ্জই দিলেন, তাহলে সেটা তো নিতেই হয়। যেখানে আমার সম্মানের প্রশ্নও জড়িত।আসলে আকাশ সাগরবাবুর প্রাণ বাঁচিয়েছে তাই তিনি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ আকাশের কাছে। কোথাও যেন মনে হয় সরাসরি টাকা দিলে হয়তো আকাশ নেবে না বা তাকে ছোট করা হবে। তাই একটু ঘুরিয়ে নাক দেখানোর চেষ্টা।
পরের দিন সাগরবাবু ব্যাঙ্কে টাকা তুলতে যান। ফেরার পথে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চায়ের অর্ডার দেন আর ভাবতে থাকেন কখন আকাশ আসবে। হয়তো একটু অমনোযোগীও হয়ে পড়েছিলেন। ঠিক সেই সময় সাগরবাবুকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে টাকার ব্যাগটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কেউ একজন ছুটে পালায়। আরে এতো আকাশ নয়! সাগরবাবু “চোর চোর” বলে চেঁচিয়ে ওঠেন। কিন্তু তার আগেই চোরবাবাজী পগার পার। সাগরবাবু ভাবেন- ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলার কথা আকাশই একমাত্র জানতো। তাহলে কি এটা আকাশেরই কাজ? নিজে না করে কোন শাগরেদকে দিয়ে করিয়েছে। তাই বলে এমনি করে ধাক্কা দিয়ে, ছি ছি!সাগরবাবুর মনটা বেশ খারাপ। সন্ধ্যেবেলা একা বাড়িতে বসে। হঠাৎ কলিং বেলের আওয়াজ। এই সময় আবার কে এল? দরজা খুলে দেখেন, আকাশ দাঁড়িয়ে আছে। আকাশকে দেখে হঠাৎ খুব রেগে যান সাগরবাবু। বললেন- তুই অন্যকে দিয়ে টাকাটা চুরি করালি? যে নাকি আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল।
আকাশ বললো- জ্যাঠা আমি পুরো ঘটনাটাই দেখেছি। আমি সামনের একটা গলিতে লুকিয়ে ছিলাম। তুমি এলেই পেছন থেকে ব্যাগটা কেটে ঠিক টাকাটা বের করে নিতাম। কিন্তু দেখলাম ব্যাটা অন্য একটা চোর টাকাটা নিয়ে ছুটে পালাচ্ছে। আমি ছুটি পেছন পেছন। চোরটা যে বাসে উঠল, আমিও সেই বাসে। আর ভিড়ের মধ্যে আমার হাত আবার কথা বলা শুরু করলো। পরের স্টপেজে আমি ব্যাগটা কেটে টাকাগুলো বের করে নেমে পড়ি। এই নিন আপনার টাকা। গুনে নিন ঠিক আছে কিনা?
বলে টাকার বান্ডিলটা সাগরবাবুর হাতে তুলে দিতে যায়।
সাগরবাবু বলেন- তুই যখন পেয়েছিস ওটা তো তোর টাকা। তুই রেখে দে।
-না না সেরকম তো কথা ছিল না। আপনার টাকা তো আমি চুরি করতে পারি নি। তাই আপনাকেই দিয়ে গেলাম।এই বলে সাগরবাবুর হাতটা টেনে টাকার বান্ডিলটা গুঁজে দেয় আকাশ। যাবার সময় বললো- জীবনের শেষ চুরিটাই আমার জীবনে সেরা চুরি। কখনো চোরের ওপর বাটপারি করিনি। আজ সেটাও করলাম আপনার জন্যে।
দিয়ে গেলাম আমার মোবাইল নম্বর। অসুখে বিসুখে দুঃখে কষ্টে বিপদে আপদে আমাকে ফোন করবেন। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো আপনার সেবা করতে।এই বলে হাঁটা দেয় আকাশ। সাগর বাবু তাকিয়ে থাকেন যতক্ষন অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে আকাশের চলে যাবার দিকে।
এই ঘটনার পর কয়েক বছর কেটে গেছে।
সময়ে অসময়ে আকাশ এসে সাগরবাবুর ঘরে এসে দেখাশোনা করে। কেনাকাটা ওসুখে বিসুখে চেক আপে নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়া, ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে এনে দেওয়া যাবতীয় সব কাজ করে দেয়। বিনিময়ে কিছু দিতে গেলে নেয় না। তবে সে আর চুরিও করে না। কখনো সবজি বেচে। হকারি করে।
এদিকে আমেরিকাবাসী ছেলে কোনো খোঁজ খবর নেয় না।
একবার ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল সে এক বিদেশি মেয়েকে বিয়ে করেছে। আর অন্য অন্য শহরে অন্য চাকরি নিয়ে চলে গেছে। তারপর ছেলে ফোন করেনি।
তবে সাগর বাবু ফোন করেন। সাধারণ দু এক কথা বলেই লাইন কেটে দেয়।একদিন সাগরবাবু আকাশের কাছে অনেক দুঃখে বললেন- দেখ আকাশ। তুই আমার ছেলের মতো। আমার জন্য তুই যা করিস তা নিজের ছেলেও করতোনা। আমি কিছু টাকা দিচ্ছি এগুলি দিয়ে একটা দোকান কিনে ব্যাবসা কর। যত টাকা লাগে আমি দেব।
– না জ্যেঠু। আমি কোনো সাহায্য নেবো না।
– তাহলে এক কাজ কর। তোর জন্য একটা ব্যাঙ্ক লোনের ব্যবস্থা করে দি।
– আমাকে ব্যাঙ্ক লোন কেন দেবে?
– সে তোকে ভাবতে হবে না। ব্যাঙ্কের সার্কেল ম্যানেজার আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তুই কিস্তির টাকা সময়ে সময়ে শোধ করে দিবি তাতেই হবে।
আকাশ উত্তর না দিয়ে চুপচাপ থাকলো।
এই ঘরের সামনে যে গ্যারেজটা ও অন্যান্য আরও দুটো ঘর আছে সেখানে তুই একটা দোকান দিবি। আর সেটা হবে তোর ইচ্ছে মতো।এভাবে আকাশ একটা কাপড়ের বড়ো দোকান, আর একটাতে রেস্টুরেন্ট করলো।
সে ধীরে ধীরে পাক্কা ব্যাবসাদার হয়ে গেলো।
একদিন আকাশ তার প্রেমিকাকে বিয়ে করে ঘরে আনলো। তারও কাজ সাগর জ্যেঠুর দেখভাল করা। নার্স ও আয়ার কাজ দুজনেই করতে লাগলো।
নিয়মিত সময়মত দুজনে মিলে জ্যেঠুর সেবা যত্ন করে আনন্দেই কাটতে লাগলো।
পাশের একটা রুমে সে তার বউকে নিয়ে থাকে। আজ থেকে বারো বছর আগেই সাগর বা’বুর জীবনাবসান ঘটতো তা আকাশের শ্রদ্ধা ভক্তি সেবা যত্নে আরও বারো বছর বেড়ে গেলো। সাগর বাবু আকাশকে পুত্র স্নেহে তার হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন। এখন তার বয়স ৮৬। বুঝতে পারছিলেন পরমায়ু বেশিদিন নেই। বার্ধক্যজনিত নানান উপসর্গ।
প্রবাসী ছেলেকে সব কথা লিখে জানালেন। ছেলে উত্তরে লিখলো- তুমি যা ভালো বোঝ করো। আমার আর তোমার প্রতি, তোমার প্রপার্টির ও ইন্ডিয়ার প্রতি কোনো মোহ নাই।
এখানে আমি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছি। আর কখনো আমার দেশে ফেরা হবে না।সাগরবাবু একদিন আকাশ ও ওর বউকে ডেকে বললেন- আমি আর বেশিদিন বাঁঁচবো না। আমার একটাই কামনা আছে তোর কাছে।
– বলুন জ্যেঠু। কি ইচ্ছে?
-আমার মৃত্যুর পর তুই আমার মুখাগ্নি করবি। প্রবাসী ছেলে কখনো আসবে না। আমার স্থাবর অস্থাবর সব সম্পত্তি আমি তোর নামে উইল করে গেলাম। এই নে আলমারির চাবি। ব্যাঙ্কের লকারের চাবি।
সর্বত্র তোর নামে নমিনি করেছি। এখানে এক দলিল আছে সেখানে আমার সমস্ত বিষয় সম্পত্তি তোর নামে দানপত্র করেছি।
আর তোর নামে কোনো ব্যাঙ্ক লোন নেই। সব শোধ হয়ে গেছে।
বলতে বলতে শ্বাসকষ্ট শুরু হলো।হাসপাতালে ভর্তি করা হলো।
ICU তে রেখে চিকিৎসা করা হলো।
দিন সাতেক পর আকাশের উপস্থিতিতে এই ভবসংসারের সব মায়া ত্যাগ করে সাগরবাবু পরলোকে পাড়ি দিলেন।
আকাশ মৃতদেহ সাথে পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয়দের নিয়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় গঙ্গাতীরে শ্মশানে উপস্থিত হলো। সাগরবাবুর ইচ্ছানুসারে আকাশ মুখাগ্নি করলো-
পুরোহিতের সাথে আকাশ মন্ত্র পাঠ করলো,“ওঁ কৃত্বা তু দুষ্কৃতং কর্মং জানতা বাপ্য জানতা। মৃত্যুকাল বশং প্রাপ্যনরং পঞ্চত্বমাগতম্ ধর্মাধর্ম সমাযুক্তং লোভ মোহ সমাবৃতম্ দহেয়ং সর্বগাত্রানি দিব্যান্ লোকান্ স গচ্ছতু।”