-
সেদিনের ভালোবাসা
সেদিনের ভালোবাসা
-পারমিতা চ্যাটার্জীমনে কি পড়ে তোমার
প্রথম দেখা হওয়ার দিনটা-?
মনে পড়ে? সেই সোনালী বিকেলের নিভে যাওয়া আলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা দুজন–
কি জানি কি হয়ে দুজনের–
প্রাণে বেজে উঠেছিল না বলা কথার সুর –
কিছু বলতে চাই কিন্তু পারছিনা বলতে-
মনের কথা থেকে যাচ্ছে মনের গোপনে —
অবশেষে এলো সেই কালবৈশাখীর সন্ধ্যা —
উত্তাল হাওয়ার উদ্যমতার মাঝে প্রথম ধরলাম হাত তোমার —
মনে পড়ে সেদিনের প্রথম স্পর্শের অনুভূতি?
কখন কি করে যেন হারিয়ে গেলাম দুজনে
ভালোবাসার প্রবল উচ্ছাসে–।
সামান্য চাকরি– সামান্য মাইনে সাথে গোটা দুই টিউশানি–
ভালোবাসায় আড়াল হল অর্থের দীনতা –।
কিছু না ভেবেই বেড়িয়ে পড়লাম নির্জন সমুদ্র সৈকতে —
মনে পরে?
কি তুমুল উত্তেজনা —
ছোট্ট ঘর নিয়েছিলাম ভাড়া–
আক্ষেপ ছিল না তাতে–
ছোট্ট একফালি জানলা দিয়ে দেখতাম
সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস —
আছড়ে পড়ছে ঢেউ জানলার সামনে–
সমুদ্রের হাওয়ায় হাওয়ায় এলোমেলো মন–
কাছে এলো দুজনের–
কত কথা, কত গান, কত মন জানাজানি, কত কানাকানি —
তারই মধ্যে হারিয়ে গেলাম দুজন দুজনের একাত্ম বন্ধনের ডোরে–।
আজও কি মনে আছে সেদিনের রাতের কথা–?
জানি তুমি হারিয়ে ফেলেছ রোজকার একঘেয়ে সংসার যাত্রায়–
আমি যে আজও রোমান্টিক — শুধু তোমায় নিয়ে–
এখনও তো একই আছে সেই কালো হরিণ চোখের বিহ্বলতা —
এখনও তো পিঠ ভরা তোমার কালো চুলের রাশি —
কোথাও তো কোন তফাৎ নেই —
তবে? তবে আজ কেন জোছনা মিথ্যে লুটোপুটি খায় আমাদের শয্যায়?
বল না কেন?
কেন এত বদলে গেল?
ভালোবাসা সে তো একই আছে–
কবিতা? সেও তো আছে বুকের মাঝের খাতাটায় বন্দী হয়ে–
এখনও হারায়নি ছন্দ তার-
আজও তো শ্রাবণের বৃষ্টি ঝড়ে পরে–
তবে কিসে এত বদল হল বল না সুনয়না?
আর একবার কি যাবে না কি সমুদ্র সৈকতের সেই ছোট্ট ঘরটায়-?
চল না যাই আর একবার — দেখে আসি দুটি সদ্য বিবাহিত যুবক যুবতীর এলেমেলো ভালোবাসার স্মৃতির কোণটা—
চল না সুনয়না আর একবার ফিরে যাই আমাদের পুরানো ফেলে আসা স্মৃতি ঘেরা সমুদ্রের তীরে সেই ছোট্ট ঘরটায়–
হয় তো আবার ফিরে পেতে পারি দুজনে দুজনকে–
এখনও যে হয়নি বলা সেই না বলা কথাটা–
এবার হয়েছে সময় সে কথা বলে যাবার–
চল না যাই আর একবার শুধু — শেষ কথাটা বলব তোমার কাছে– বালুকাবেলার নীরব নির্জনতায়–।। -
আদর্শ
আদর্শ
-পারমিতা চ্যাটার্জীগল্পের প্লটটা অনেকদিন আগের একটি মেয়ের কথা- সে সময় মেয়েরা জন্মালে বাড়িতে বেজে উঠতো না মঙ্গল শঙ্খ।
দীপালীকা ছিল ওর নাম কালিপুজোর দিন চতুর্দিক যখন প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত ঠিক তখনই আঁতুড় ঘর থেকে একটি সদ্যোজাত শিশুর কান্না ভেসে আসে, দাই বেরিয়ে এসে খবর দিল উদগ্রীব পিতাকে, মেয়ে হয়েছে গো।
পিতা সুধাময়ের মুখে হাসি উঠল। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন- মেয়ের মা ভালো আছে তো?
দাই অবাক হয়ে জবাব দিল,-হ্যাঁ। মেয়ে হয়েছে শুনে কোন বাপের মুখ যে এমন হাসিতে ভরে যেতে পারে এরকমটা সে দেখে অভ্যস্ত নয়।
সুধাময়ের মা ঘর থেকে বের হলেন গম্ভীরমুখে- মাকে দেখে সুধাময় হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল- মা সুখবর আছে তো। মিষ্টি নিয়ে আসি?
– সুখবর? তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে খোকা?
– কেন?
– হয়েছে তো একটা মেয়ে তারজন্য আবার মিষ্টি?
– তার মানে? আজ দীপান্বিতা লক্ষ্মী পুজোর দিন তোমার ঘর আলো করে মা লক্ষ্মী স্বয়ং এলেন তার তুমি তাকে তাচ্ছিল্য করছো?
– হ্যাঁ, তুমি ওই নিয়ে খুশি থাকো শান্তিতে থাকো, আমাকে এর মধ্যে জড়িয়ে না–
– হ্যাঁ মা এতেই আমার শান্তি আমার মুক্তি। ওর নাম রাখলাম দীপালীকা।
– তা নাম তো তুমি যাই রাখো ওর পাঁচ ছ’বছর বয়েস হলেই ওকে বিয়ে দিয়ে দেব।
– না মা তা হবেনা। স্বয়ং বিদ্যাসাগর মহাশয় মেয়েদের অন্ধকার থেকে আলোয় আসার পথ দেখিয়েছেন। আমি সেই আলো থেকে আমার মেয়েকে বঞ্চিত করবনা। ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুল বেথুনে পড়াশোনা করবে।
– কি বলছিস তুই?( দুু’কান চাপা দিয়ে বললেন) এ কথা শোনাও পাপ..
– তাহলে আমি সেই পাপ কাজটাই করব।
– এতে তোর পূর্বপুরুষরা তোকে ক্ষমা করবেন না। কেন তুই একটা মেয়ের জন্য অভিশাপ কুড়োবি?
– এতে যদি আমার অভিশাপ লাগে তো সেই অভিশাপ মাথায় করে নেব। ও একটা মেয়ে নয়,ও আমার মেয়ে। আমি ওকে আমার আদর্শে গড়ে তুলবো।
মায়ের আদেশ অমান্য করে? এতে তুই শান্তি পাবি?
– হ্যাঁ মা এতেই আমি শান্তি পাবো। এক্ষেত্রে যদি নিজের আদর্শকে অস্বীকার করে আমার মেয়েকে তোমাদের অন্ধ কুসংস্কারের অন্ধকার গলিতে ঠেলে দিই তাহলে কোনদিন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না। আমি সারাজীবন অশান্তিতে জ্বলে পুড়ে মরবো। কিন্তু আমার অর্জিত আদর্শে যদি আমার মেয়েকে আমি গড়ে তুলতে পারি, তাতেই আমার পরম শান্তি মা পরম শান্তি। এরপরও যদি তুমি আমাকে এ নিয়ে আর একটা কথাও বলো তাহলে এই দীপান্বিতার সন্ধ্যাবেলায় দাঁড়িয়ে বলছি, তুমি তোমার ছেলের মরামুখ দেখবে। এ দেশের শত শত মেয়ের কান্না তোমার চোখে পড়েনা? ছোট্ট মেয়েগুলোকে বৈধব্যের কঠোর নিয়মে ফেলে তোমরা কি আনন্দ পাও? না.. তুমি যদি বলো আমি মাতৃ আদেশ লঙ্ঘন করছি। তবে হ্যাঁ আমি তাই করছি। সবক্ষেত্রে অন্যায় মাতৃ আদেশ মেনে নেওয়া যায়না। তোমার আদেশ রক্ষা করতে গেলে, আমি নিজের আত্মজার প্রতি চরম অপরাধ করবো। তাতে আমি শান্তি পাবো না মা। তারচেয়ে মৃত্যুর পথ বেছে নেওয়াই ভাালো। আর যদি বিদ্যাসাগরের আদর্শে আমার আত্মজাকে গড়ে তুলতে পারি। তাতেই পাবো আমি পরম শান্তি, পরম মুক্তি। -
কল্পনা
কল্পনা
-পারমিতা চ্যাটার্জীচলতে চলতে ক্লান্ত পা দুটো থমকে দাঁড়িয়ে পরে জীবনের চৌকাঠ ধরে–।
চেয়ে দেখি শেষ বিকেলের ছায়া নেমেছে জীবন আঙিনায় —।
অসময়ে কোথা থেকে এলো এমন বসন্তের বাতাস–?
এলোমেলো করে দিল নিঃসঙ্গ জীবনের খাতাটাকে–।
যা খুঁজে এসেছি এতদিন ধরে– সে যে আপনি এল জীবনে?
ভয় হয় বড়ো ভয় হয় নতুন করে বেদনার রঙ মাখতে–।
নদীর তীরে দাঁড়িয়ে দেখি পশ্চিম দিগন্তে সূর্যটা যাচ্ছে ডুবে-
আকাশের রক্তাভ রঙ ছড়িয়ে পড়ছে আমার মুখে–
বলতে কি পারব অনাহূত অতিথিকে —
যা বলতে চেয়েছি এতদিন ধরে–।
না বলাই থাক–
শুধু নদী তুমি জেনে রাখো– আমার নিঃসঙ্গ নৈশব্দের মাঝে কেউ আছে–দীপালীকার প্রদীপ জ্বালাতে– হয়তো কেউ আছে আমার শূন্যতাকে ভরিয়ে তুলতে–
জানিনা– হয়তো সবই আমার না পাওয়া মনের কল্পনা –।
তবু থাক এই কল্পনাটুকু আঁকা মূর্ত জীবনের প্রতীক হয়ে–
সেটুকুই আমার সান্ত্বনা —।। -
ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা
ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা
-পারমিতা চ্যাটার্জীরুমির আজ মনটা বড়ো খারাপ — সবাই ভাইফোঁটা দিচ্ছে — ঘরে ঘরে বেজে উঠছে শঙ্খ উলুধ্বনি –।
তার বাড়িতেও তার ননদরা এসেছে — তাদের ভাইকে ফোঁটা দিতে — সেই শুধু বঞ্চিত এই উৎসব থেকে–।
অথচ তারও কিন্তু দাদা আছে– তার একমাত্র দাদা– কিন্তু সম্পর্কের ভাঙনে আজ সে বহুদূরে –।
মনে মনে ভাবে — ” দাদা তোর কি আজকের দিনেও একবার মনে পড়েনা ছোট্ট বোনটাকে– ফিরে তাকাস কোনদিন ফেলে আসা সেই স্মৃতিমধুর দিনগুলোতে “–?
– আমি এখনও চোখের সামনে দেখতে পাই ভাইফোঁটার সেই উৎসব মুখর দিনগুলো –মনে পড়ে তোর? মামারা সবাই আসত হাতে মায়ের জন্য শাড়িতে প্যাকেট নিয়ে– আর আমি বায়না করতাম- কিছুতেই দাদাকে আমি খালি হাতে ফোঁটা নিতে দেবোনা– আমারও জামা চাই —
আর তুই বলতিস– মা যে ভাইদের জন্য সব জামাকাপড় কিনেছে – তুই কেন আমায় খালি হাতে ফোঁটা দিবি–?
– আমার বিয়ে হোক তবে তো দেব- মায়ের তো বিয়ে হয়েছে তাই দিচ্ছে –
— তুই তখন হেসে আমায় আদর করে বলতিস– আমারও চাকরি হোক, তোকে খুব সুন্দর জামা কিনে দেব দেখিস– এবার শুধু চকোলেট নে–
আমি বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলতাম — ও তুই এখনও চাকরি করিস না রে দাদা? তুই বড়ে হ, দেখবি এত্তো বড়ো চাকরি করবি-
— আর আমি তখন আমার বোনটিকে খুব সুন্দর জামা কিনে দেব–।
কোথায় হারিয়ে ফেললাম বল তো আমরা সেই সোনার দিনগুলো –?
কি করে তুই আমাকে এত ছোট মনের ভাবলি রে দাদা– এতদিনেও বোনকে চিনলি না ? বাবার বাড়িতে আমি অধিকার দেখাবো?– এ কথা আমি কোনদিন স্বপ্নেও ভাবিনি–।
তুচ্ছ একটা বাড়ির জন্য সম্পর্কটাই ভেঙে দিলি?
তুই জানিস না আমি আজও দেওয়ালে — তোর নামে ফোঁটা দিয়ে তবে জল খাই– ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা, যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দি আমার ভাইকে ফোঁটা। –
এই অধিকার টা তুই আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবিনা– যতদিন বাঁচব আমি দেওয়ালেই তোকে ফোঁটা দিয়ে যাবো–। যেখানেই থাকিস খুব ভালো থাকিস — জানি তুই খুব অসুস্থ- আমার জীবনও একটা সূতোয় ঝুলছে, যে কোন মুহূর্তে সুতোটা ছিঁড়ে যেতে পারে– তখনই সম্পর্কের সুতোটা সত্যি ছিঁড়ে যাবে– সেদিন আর দেওয়ালে ফোঁটা দেওয়ার জন্যেও কেউ থাকবেনা–।প্রার্থনা করি তুই সুস্থ হয়ে ওঠ–।
আমি আমার আজকের দিনের কাজটা সারি– তোর নামে দেওয়ালে ফোঁটা দি– ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা —-। -
আধুনিকতা
আধুনিকতা
-পারমিতা চ্যাটার্জীঘরে ঢুকেই খাটের ওপর ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে, রিমলি শয্যায় গা এলিয়ে দিল। ধরিত্রী দেবী ঘরে ঢুকে প্রশ্ন করলেন, ‘এতো রাত অবধি তুমি কোথায় ছিলে?’
-‘আমি তোমাকে উত্তর দিতে বাধ্য নই মা আমার কাজ ছিল।’
-‘কি কাজ সেটাই জানতে চাইছি তুমি তো কোনো মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে কাজ করো না। সে যোগ্যতা তোমার নেই তাহলে কি এমন কাজ যে, রাত বারোটায় বাড়ি ফিরতে হলো। তাও স্বাভাবিক অবস্থায় নয়!’
-‘মা, প্লিজ যুগটা অনেক এগিয়ে গেছে এই আধুনিক যুগের সাথে তুমি পরিচিত নও এই নিয়ে কথা না বলাই ভালো..’
-‘তা তোমার মতে আধুনিকতা মানে রাত বারোটা অবধি মদ খেয়ে বেলেল্লাপনা করা? এটাকে আধুনিকতা বলে না!’
‘আধুনিকতা মানে পুরাতন মানুষের সৃষ্টি কিছু সংস্কার থেকে নিজেকে মুক্ত করা, আধুনিকতা মানে মানবিক হওয়া, অন্যের দুঃখকে নিজের মনে করে ভাগ করে নেওয়া। আধুনিকতা মানে স্বনির্ভর হওয়া, স্বামী বা বাবার কাছ থেকে ভিক্ষা করে টাকা ওড়ানো নয়। অত্যাচারী স্বামীর অপমান সহ্য করেও তার সাথে এক বিছানায় রাত কাটানো নয়। স্বামীর অপমানের ভাত না খেয়ে নিজের রোজগারের ওপর নির্ভর করা পরাধীনতা বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। যা আমি করেছি আমি, একজন স্বনির্ভর মহিলা একটা সরকারি কলেজে পড়া তোমার আধুনিক বাবা আর ঠাকুমার এই হুকুমটা মেনে নিইনি। আমার চাকরি ছেড়ে দেওয়া নিয়ে আমার ওপর যে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল তার প্রতিবাদ করা। আমি নিজের রোজগারের ভাত খেয়েও তোমার ঠাকুমার শেষ অবধি তাঁর সেবা করে গেছি। আমার মানবিকতার বোধ থেকে একে আধুনিকতা বলে।’
-‘মা, প্লিজ আমার বাবা আমায় যুগপোযোগী করে গড়ে তুলছেন। তুমি এই যুগের সাথে পরিচিত নও। তুমি তোমার পুরানো ধ্যান ধারণা নিয়ে থাকো আমায় জ্ঞান দিওনা।’
-‘তোমার যুগের আধুনিকতা কি বাবার কাছ থেকে প্রতি মাসে মোটা হাতখরচ ভিক্ষা করে নিয়ে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাত্রা করা? এরপর একদিন যদি খবরের কাগজের হেডিংয়ে তোমাদের নাম দেখা যায় অমুক শিল্পপতির মেয়ে মদ্যপ অবস্থায় মাঝরাতে বাড়ি ফিরছিল। সে সময় — কিছু সমাজবিরোধী তার ইজ্জত লুটে নিয়ে তাকে মাঝপথে ফেলে দিয়ে গেছে তখন তোমার এই উচ্ছৃঙ্খল আধুনিকতার দাম দিতে পারবে তো?’
-‘,মা প্লিজ আমি খুব টায়ার্ড তুমি প্লিজ এখন যাও তোমার কলেজের স্টুডেন্টদের লেকচার দিও, আমাকে নয়।’
ধরিত্রী দেবী চলে আসেন তাঁর ঘরে। ভাবেন এ কোন পথে যাচ্ছে তাঁর একমাত্র আত্মজা? কি এর পরিণতি উচ্ছৃঙ্খল বাপের রক্তটাই বইছে ওর ধমনীতে! এর থেকে তাকে মুক্ত করা কি সম্ভব?
এর বেশ কয়েকমাস পরে একদিন খবরের কাগজ দেখে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন তাঁর ভবিষ্যৎ বাণী এতো তাড়াতাড়ি ফলে যাবে ভাবতেই পারেন নি।
তাঁর দু’চোখে জলের ধারা তিনি যে মা! এ সত্যটা অস্বীকার করবেন কি করে? তিনিও তো ব্যার্থ হয়েছেন মেয়েকে এই উচ্ছৃঙ্খল আধুনিকতার শিকার থেকে মুক্ত করতে।এ দায় তিনি এড়াবেন কি করে?’
ছুটে যান নার্সিংহোমে। স্তব্ধ মেয়ের মাথায় হাত রেখে হাত রাখতেই, সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। মা তার মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘কিছু হয়নি। এটা একটা দুর্ঘটনা, সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার হয়েছো। এবার থেকে জীবনের চলার পথটা বদলে ফেল সত্যি আধুনিক হও মনে প্রাণে আধুনিক কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল হয়োনা।’
বাইরে বেরিয়ে দেখতে পেলেন তাঁর স্বামী দাঁড়িয়ে আছে, তাঁকে দেখে হাতজোড় করে বললেন- আমায় ক্ষমা করো। এবার থেকে মেয়ের ভার তুমি নাও আমি হেরে গেলাম..’
-‘সে তো নেবো। মায়ের দায়িত্ব তো অস্বীকার করতে পারিনা। সেটা আমার আধুনিকতায় বলেনা। ওকে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনাটাই আমার দায়িত্ব। তা আমি করবো। সে তুমি বললে বা না বললেও করবো।’
-‘আর আমায় ক্ষমা করতে পারবে?’
-‘না, পারবো না। ইচ্ছাকৃত অপমান আর অত্যাচারী স্বামীর শয্যাসঙ্গিনী হতে আমি অপারক নিজেকে অসম্মানিত হতে দিতে পারবোনা এটা আমার আধুনিকতা।’ -
বন্ধু আমি ভালো আছি
বন্ধু আমি ভালো আছি
-পারমিতা চ্যাটার্জীবন্ধু ভেবেছিলাম তুমি হারিয়ে গেছ অনেকদূরে —
তোমার জীবন খাতা থেকে হয়তো বা আমার অস্তিত্বটাই মুছে গেছে–
প্রথম যৌবনের উচ্ছলতায় ভালোবেসে ছিলে এক বেকার কবিকে–
কবিতা লেখা যার নেশা — চায়না কোনো বন্দী অফিসের বাবু হয়ে থেকে নিজের অস্তিত্বকে গলা টিপে মেরে ফেলতে-
তাইতো তুমি আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বেড়িয়ে গিয়েছিলে নিশ্চিত সংসারে জীবনের দিকে–
ইঞ্জিনিয়ার বর তোমার– কে না চায় একটা সুন্দর সংসার?
না না আমি তোমায় দোষ দিচ্ছিনা–
কে বা চায় বল পয়সাওলা ইঞ্জিনিয়ার বরের আকর্ষণ ছেড়ে এক কবিতা পাগল মনের সাথে নিজেকে জড়াতে–
তাই তুমিও এক নিমেষে সে বাঁধন ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে পারি দিলে সাগর পার হয়ে বিদেশের মাটিতে–
কবির সাথে প্রেম করা যায়, তার সাথে বৃষ্টিতে ভেজা যায়– ফাগুন পূর্ণিমার রাতে তার দেওয়া পলাশের মালা খোঁপায় জড়ানো যায়–
কিন্তু ঘর বাঁধা –? না তা কি সম্ভব —
ভালোই হয়েছে — এত দুঃখ দিয়েছিলেন বলে
আমার সৃষ্টির দরজা খুলে গেছে অনন্ত প্রকৃতির কাছে–
নিত্য নতুন সৃষ্টির মধ্যে দিয়েই ভুলে থাকতে চাই আমার স্মৃতিকে– আমার প্রেমকে, আমার বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাকে–।
তাহলে এতদিন পর আবার কেন চিঠি লিখলে বন্ধু?
তোমার চিঠি হাতে নিয়ে আমি বসে আছি নিঃসঙ্গ নিঃশব্দ বারনদায়– ভাদরের বৃষ্টি ঝরছে– সুন্দর একটা ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে —
চিঠিটা খুলতে ভয় পাচ্ছি —
এলোমেলো ভাবনারা মনকে জুড়ে বসে আছে —
চিঠিটা খুললে যদি আমার এতদিনের সৃষ্টি সব কবিতা ছন্দ হারিয়ে ফেলে?
তবে আমি কি নিয়ে বাঁচব?
অনেকদিনের ভালোবাসার ফুলটা যে এখনও ফুটে আছে হৃদয়ের অন্তরালে সঙ্গোপনে –
যা আমি নিভৃতে নীরবে জলের ছিটে দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছি– সেটুকুও কি কেড়ে নেবে বলে এই চিঠি দিলে বারো বছর পর–?
তবু চিঠিটা খুলে ফেললাম —
একি? এ কি লিখেছ বন্ধু?
তুমি ভালো নেই — কেন? ভালো থাকার জন্যেই তো তুমি একদিন আমাদের ভালোবাসাকে দুহাতে সরিয়ে ছুটে গিয়েছিলে নিশ্চিত সংসারের আশ্রয়ে –
তবে কেন আজ তুমি ভালো নেই বন্ধু?
তুমি লিখেছ– আমি নাকি এখন আমি অনেক বড় কবি–
তাই? আমি জানিনা তো আমি কখন এত বড় কবি হয়ে গেলাম?
তুমি ভালো থাকবে শুধু আমার কবিতার মধ্যে –
তাই আবার ফিরে আসতে চাও ছিঁড়ে ফেলা ভালোবাসার সুতোটা বাঁধতে–
তা কি আর হয় বন্ধু? যা ছিঁড়ে যায় তা ছিঁড়েই যায়, তাকে কি আর বাঁধা যায়-?
মাঝখানে যে বড় গিঁট থেকে যাবে– সে গিঁট তো আর খোলা যাবেনা বন্ধু —
তুমি ভালো থাকো তোমার মতন করে–
আর আমি?
আমি তো ভালোই আছি–
হ্যাঁ ভালোই আছি–
নিত্য প্রবাহমান নদীর মতন আমি বয়ে যাই —
প্রতিদিনের নতুন ভোরের আলোয় আমি জেগে উঠি–
নিত্যনতুন পাখীরা আমার প্রতিদিনের সঙ্গী —
আমি ভালোই আছি–
আমার মন এখন যাযাবর–
ছুটে বেড়াই পাহাড় থেকে পারাবারে চখাচখির মেলায়-
দিক থেকে দিগন্তরের আকাশ – সবুজের মিলনপ্রান্তে —
নদী থেকে সরবরের মাছরাঙা আর গাঙচিলের আলিন্দে–
প্রতিদিনের ফুটে ওঠা লাল পলাশের বনে বনে–
আমি যে আর কোনো বন্ধনে বাঁধা পরতে পারবোনা বন্ধু —
তাই বলছি আবারও তুমি ভালো থেকো —
আমি তো ভালোই আছি–।। -
আমরা বাঙালী
আমরা বাঙালী
-পারমিতা চ্যাটার্জীআজ মহাষ্টমী, অয়ন্তিকা অঞ্জলি দিয়ে আসার সাথে সাথে তার শাশুড়ি মা তাকে বললেন চা করো তো তাড়াতাড়ি ! রূপুটা একদম উপোস করে থাকতে পারেনা। লুচিগুলোও ভাজতে আরম্ভ করতে হবে! অয়ন্তিকারও খুব খিদে পেয়েছিল কিন্তু কি করবে এটা শ্বশুরবাড়ি। মা বলে দিয়েছিলেন, সব মানিয়ে নিতে হয়। সে চায়ের জল একদিকে বসিয়ে, অন্যদিকে লুচির কড়াই বসিয়ে দিল। কমলা মাসী বলল, আমি লুচি বেলে দিচ্ছি।
ভাগ্যিস অভ্র এখন বাড়ি নেই! সে থাকলে ঠিক প্রতিবাদ করতো মায়ের এই ব্যাবহারের। অভ্রের ভালোবাসার জন্যেই হয়তো সে সব মানিয়ে নেয়। পুজোর দিনে অশান্তি হতো একটা, শান্তিপ্রিয় অয়ন্তিকা তা চায়না।
সবাইকে চা আর লুচি ভেজে দিয়ে প্লেটে সাজিয়ে দিল খাবার টেবিলে। ওর শ্বশুরমশাই বললেন- তুমি এবার নাও মা! তোমারটা না আনলে আমি খেতে পাচ্ছিনা।
শাশুড়ি মা বললেন- এ আবার কি আদিখ্যেতা?
– আদিখ্যেতা নয় এটা মানবিকতা। তোমার মেয়ে যেমন না খেয়ে থাকতে পারেনা, তেমন এই মেয়েটাও কিন্তু না খেয়েই কাজ করে যাচ্ছে।
অয়ন্তিকা তাড়াতাড়ি বলল- বাবা আমি ঠিক আছি আপনি খান। আমি বসছি এখুনি!
ওদের খাওয়া শেষ হতে না হতেই অয়ন্তিকার স্কুলের জীবনের বন্ধু নাজমা এলো, বিয়ের সময় আসতে পারেনি তাই। হাতে মিষ্টির বাক্স নিয়ে।
অয়ন্তিকা পরিচয় করিয়ে দিতেই নাজমা প্রণাম করতে গেল।শাশুড়ি দু পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন- থাক থাক!আগে মিষ্টির বাক্সটা হাতে নিয়েছিলেন পরে সেটা অচ্ছুতের মতো ফেলে দিলেন টেবিলের ওপর।
নাজমাকে ঘরে এনে বসানোর পর নাজমা বলল- আমি আজ যাইরে, বুঝতে পারছি তোর অবস্থা! পরে একদিন বাইরে কোথাও দেখা করবো।অয়ন্তিকা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে বলল- আজকের দিনে কিছু না মুখে দিয়েই চলে যাবি?
– না রে আর এখানে কিছু খাবোনা! যখন বাপেরবড়ি যাবি আমায় খবর দিস, মাসীমার হাতে নারকোল নাড়ু খেয়ে আসবো। জলভরা চোখে সে প্রাণের বন্ধুকে বিদায় জানালো।
সেদিনই বেড়াতে বেরিয়ে রূপু পরে গিয়ে মাথায় খুব আঘাত পায়। অনেক রক্তক্ষরণ হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে বলল- এখুনি ব্লাডের দরকার! কিন্তু ‘ও’ পজিটিভ ব্লাড এখানে নেই। পুজোর সময় কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা।
অভ্র হতাশ হয়ে পড়ল- কি করা যাবে এবার?
অয়ন্তিকার হঠাৎ নাজমার কথা মনে পড়ল! নাজমা কয়েকটা এনজিও সংস্থার সাথে যুক্ত।
অয়ন্তিকার ফোন পেয়ে নাজমা ছুটতে ছুটতে এলো,ডঃ কে গিয়ে বলল- আমার রক্তের গ্রুপ ‘ও’ পজিটিভ ডাক্তার আপনি ইমিডিয়েট রক্ত দিতে শুরু করুন।
নাজমার দেওয়া রক্তে অবশেষে রূপুর প্রাণ রক্ষা পায়।
রক্ত দিয়ে নাজমা যখন বেরিয়ে আসছে, তখন অভ্র তাড়াতাড়ি এসে বলে – আপনি চলুন আগে কিছু খাইয়ে আনি! আপনি তো টলছেন!নাজমা বলল- এখানে অবশ্য খাওয়ালে ছোঁয়া ঠেকার ব্যাপারটা থাকেনা।
অভ্র হাতজোড় করে বলে- দেখুন আমার মায়ের হয়ে আমি আপনার কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছি! আমি বাড়িতে থাকলে আপনাকে এত অপমানিত হতে হতো না।
— আচ্ছা আচ্ছা চলুন খাওয়াবেন বললেন যে?
– হ্যাঁ হ্যাঁ চলুন – এই অয়ি এসো–
অয়ন্তিকা ইতস্তত করে বলল- বাবা মা!
– আরে তোমাকে আসতে বললাম এসো না! সবসময় সবার কথা ভাবলে হয়না, কখনও কখনও নিজের কথাও ভাবতে হয়। ওঁরা খেয়ে নেবেন। কিন্তু ইনি সবে রক্ত দিয়ে এসেছেন! এঁর খাওয়াটা অনেক বেশি জরুরি।
খাওয়ার পর বেরিয়ে আসার সময় অভ্র বাবা মায়ের জন্যে কিছু কিনে নিল।
ওদের আসতে দেখে অয়ন্তিকার শাশুড়ি এগিয়ে এসে নাজমার হাতদুটো ধরে বলল- তোমার ঋণ আমি কোনদিন শোধ করতে পারবনা!
– কিছু শোধ পাওয়ার জন্য আমি কিছু করিনি মাসীমা! একজন মানুষকে বাঁচানো আমার কর্তব্য বলে মনে করি তাই করেছি।
অয়ন্তিকার শ্বশুর মশাই এগিয়ে এসে বললেন – আজ কিন্তু ওর রক্ত আর রূপুর রক্ত মিলেমিশে গেল! আসলে কি বল তো? মানুষের রক্তের রঙ একটাই হয়, আর সে রঙটা লাল!
মা জানো আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলামের জন্মদিন পালন করি, তাঁদের গান গাই, কবিতা বলি। সবই আসলে একটা হুজুকে দাঁড়িয়ে গেছে। সবার বলতে ভালো লাগে আমার পঁচিশে বৈশাখ অমুক জায়গায় প্রোগ্রাম আছে, ওখানে আমায় গানে গাইবার জন্য ডেকেছে! কিন্তু তাঁদের আসল যে মূল্যবোধ, তাঁদের জীবনের যে দর্শন আমাদের দিয়ে গেছেন যা হল মানবিকতা বোধ। মানুষের একটাই ধর্ম, যা হল মানবিকতার ধর্ম। তা আমরা ক’জন জানি বা মানি তা হাতে গোনা যায়, এই হল ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের মধ্যে দিয়েই বলে গেছেন,”বাঙালীর প্রাণ, বাঙালীর মন, বাঙালীর ঘরে যত ভাই বোন-
“এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান”।। -
ভালোবাসা কারে কয়
ভালোবাসা কারে কয়
-পারমিতা চ্যাটার্জীকাল বৈশাখীর ঝড়ের মতো এসেছিলে আমার জীবনে–
বঞ্চিত জীবন অঙ্গনে তুমি ছিলে এক ঝলক বসন্তের ফাগুন রাঙা আকাশ —
আমার শ্রাবণ রাতের বৃষ্টিধারা–
আমার শরত আঙিনায় একমুঠো শিউলি?
ভেসে গিয়েছিলাম জোয়ারের স্রোতে তোমার সাথে–
মানতে পারিনি সমাজের বাধানিষেধ —
সব প্রাচীর ডিঙিয়ে হাত ধরেছিলাম তোমার —
কখন যে হাতটা ছেড়ে গেলে — বন্ধন কেটে গেল–
জানতে পারলাম না–।
বুঝলাম যা আমার নয় তা দূরে থাকাই ভালো–
দুটো নদী সমান্তরাল পথে বয়ে যেতে পারে–
একই মোহনায় মিশে যায়না–
রেখে যায় ভাঙা নদীর পারে কিছু বিচ্ছিন্ন স্মৃতির টুকরো –।
অসহায় অবসাদগ্রস্থ মন আকুল হয়ে খুঁজে বেড়ায় ভালোবাসার আশ্রয় —
দিনশেষে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে বসে পড়ে চেনা গাছের ছায়াটায়–।
সেই যদি ফিরে আসতেই হয় চেনা গাছের ছায়ায় তাহলে মিথ্যা ভালোবাসার প্রবঞ্চনায়
ক্ষণিকের এই মোহতে জীবনে অবাঞ্ছিত আবর্জনা এনে কি লাভ?
এর উত্তর জানা নেই —
মানুষ ভালোবাসার চায়–
ভালোবাসাহীন জীবনের মরুভূমিতে একটু জলের রেখা দেখলেই প্রবল তৃষ্ণায় ছুটে যায়–
কিন্তু ওই যে কবির সেই বিখ্যাত গানের লাইন আমাদের মনে করিয়ে দেয়-
-“ভালোবাসা কারে কয়— একি কেবলই যাতনাময়”।। -
শেষ উপহার
শেষ উপহার
-পারমিতা চ্যাটার্জীএকলা শ্রাবণ রাতে মনে পরে অনেক কথা–
লেখা আছে সেই কথা পুরানো ডায়েরির পাতায়–
ডায়েরিটা হয়েছে জীর্ণ —
পাতাগুলো মলিন ধূসর —
তবু লেখাগুলো যায়নি মুছে–
ছেঁড়া ছেঁড়া পাতায় তারা আজও রয়ে গেছে–
শ্রাবণের স্মৃতি রোমান্থনে আজও আছে বেঁচে
ছেঁড়া ডায়েরির পাতার কোণে–
হয়তো একদিন যাবে ছিঁড়ে
ডায়েরির পাতাগুলো যাবে উড়ে সময়ের ঝড়ে।
কে যেন কবিতা শোনাত সেদিন–
সেই স্বর এখনও রয়েছে কানে–
সে কি ভুলে গেছে সেই কবিতার স্মৃতি –?
সে কি জানে দীর্ঘ বিচ্ছেদে আমি হারিয়ে
গেছিলাম বিস্মৃতির অন্ধকারে —
ডিপ্রেশনের কালো পর্দা সরিয়ে
আবার এসেছি ফিরে নিজের সত্তাকে পেয়েছি খুঁজে হৃদয়ের গভীর অন্দর থেকে–
লিখে চলি কবিতা একলা আনমনে–
শ্রাবণের বৃষ্টিতে ভিজে যায় মন–
ভুলে যায় মন বিচ্ছেদ বেদনার রঙ–।
সেকি জানে আমার কবিতা আজ কণ্ঠে নেয় বহু কবিতা প্রেমিক–?
সে কি জানে অজান্তে এ তারই দান–
তারই দেওয়া বিচ্ছেদ বেদনায়
কলম আমার লিখে চলে কবিতা–।
শেষ অনুরোধ যদি রাখি তার কাছে সে কি রাখবে
শ্রাবণের শেষ অনুরোধ আমার–?
একদিন এমনই শ্রাবণের ঘন বর্ষায়
নিস্তব্ধ দ্বিপ্রহরে যাকে বলেছিল
আমি তোমায় ভালোবাসি–।
শেষ অনুরোধ আমার এই শ্রাবণের
যদি সে কণ্ঠে নেয় আমারই লেখা একটি কবিতা–
এই হবে তার কাছ থেকে পাওয়া আমার প্রথম এবং শেষ উপহার।। -
সেদিন ছিল পঁচিশে বৈশাখ
সেদিন ছিল ২৫শে বৈশাখ
-পারমিতা চ্যাটার্জী
বেশি কিছু চাইনা তোমার থেকে
শুধু একটা সুন্দর সকাল উপহার দেবে আমায়?
রোজ সকালে খবরের কাগজের পাতায় কি যে পড়ে যাও বুঝি না–
কখনও তো বলনা, ” এই চায়ের কাপটা নিয়ে একটু বোস আমার কাছে–
কখনও তো বল না তোমার গাছের ফুলগুলো বড় সুন্দর–
আমি তো এইটুকুই শুনতে চাই শুধু–
মুখ গম্ভীর করে কাগজের পাতা থেকে মুখ না তুলেই চায়ের কাপটা হাতে তুলে নাও–
তারপর শুধু বল তাড়াতাড়ি বেড়োতে হবে আমায় — অনেক কাজ পরে আছে অফিসে —
আর হ্যাঁ লাঞ্চটাও একটু বেশি দিও — আমার জিনিস গুলো সব গুছিয়ে সামনে রেখো-
শুধু হুকুমের সুরে কথা বলে যেতে তুমি ক্লান্ত হয়ে যাওনা?
আমার দীর্ঘনিশ্বাসের শব্দ তোমার কানে পৌঁছোয় না–
আমি প্রতিদিন একটু একটু করে হতাশায় ডুবে যাই–
— হারিয়ে যায় আমার প্রতিদিনের সকাল-
বিকেলের স্নিগ্ধ গোধূলি আসতে আসতে মিলিয়ে যায় নীল আকাশের বুকে–
নেমে আসে সন্ধ্যা, আকাশের বুকে ফুটে ওঠে অসংখ্য তারা–
আমি সেই তারার মাঝে খুঁজে চলি হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নদের —
হঠাত্ চমকে উঠি টিভিতে রাজনৈতিক নেতাদের ঝগড়ার আওয়াজে —
বুঝতে পারি তুমি এসে গেছ—-
আমায় দেখে বললে চা হয়েছে না কি?
ম্লান হেসে উত্তর দিলাম– হয়ে গেছে দিচ্ছি–।
গতবার ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের ছবিটা মালা দিয়ে সাজিয়ে ছিলাম, সামনে কাঁসার রেকাবে রেখেছিলাম একমুঠো চাঁপাফুল–
ঘরটা ফুলের গন্ধে ভরে আছে সেই সাথে ভরে আছে আমার প্রাণটাও, আজ যে আমার জীবনের পরম বন্ধুর জন্মদিন—
মনে মনে গাইলাম –“তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম”।
নিজেকেও সাজিয়েছিলাম একটু নতুন সাজে–
তুমি ঘরে ঢুকেই বললে বাহ্ সুন্দর ফুলের গন্ধে ঘরটা ভরে আছে তো?
আমি মৃদুসুরে বললাম– আজ ২৫শে বৈশাখ–
— তুমি দায়সারা ভাবে বললে, ও তা ভালো করেছ– অনেকদিন রবীন্দ্রসংগীত শোনা হয়না– আজ আমার অফিসের এক কলিগ শর্মিষ্ঠা নামে খুব সুন্দর গাইল রবীন্দ্রসংগীত মনটা যেন ভরে গেল– ও চা দেবেতো না কি–
রান্নাঘরে গিয়ে চা বানাতে বানাতে চোখদুটো নিজের অজান্তে ঝাপসা হয়ে গেল– আমার তানপুরাটায় ধূলো জমে গেছে— কার জন্য গাইব? গান শোনার লোকটাই তো বেসুরো, সে অন্য লোকের সুরে মুগ্ধ হয় আমার গান শোনার সময় হয়না–।
চায়ের কাপটা তোমার হাতে দিতে তুমি একটা চুমুক দিয়ে বললে বাহ্ খুব ভালে চা টা — কোন পাতাটার করলে গো?
আমি উদাস উত্তর দিলাম –যে পাতায় রোজ করি-
আমি আমার নিজের ঘরে ফিরে এলাম– কানে আসছিল — টিভির তীব্র শব্দ, রাজনৈতিক নেতাদের একঘেয়ে কচকচানি —
আমি দরজাটা ভিজিয়ে এলাম–
ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল— মনের দরজাটা ভেজাতে পারবি কি?
না সত্যি তা পারবনা–
— তবে শুধু শুধু ঘরের দরজা বন্ধ করে নিজেকে আড়াল করে লাভ কি? এই তোর ঘর এই নিয়েই থাকতে হবে– যেটুকু পেলি ওইযে বলল চা টা ভালো হয়েছে, ওইটুকুই তোর পাওনা– এর চেয়ে বেশি আশা করলে নিরাশা আরও বাড়বে–
আমি তবুও একচিলতে জানলার ফাঁক দিয়ে আকাশটাকে দেখতে চেষ্টা করলাম– মনে হল আমার আকাশটা অনেক অনেক দূরে চলে গেছে–
তবু গুণগুণ করে গেয়ে উঠলাম বহুদিন পর–” যখন জমবে ধূলা তানপুরাটার তারগুলায়, তখন আমায় নাই বা মনে রাখলে, তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে”। কানে এলো — কি গো খেতে দেবে না কি?
আমার সুরটা কেটে গেল–।