• রম্য রচনা,  স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার

    রম্য- “নেই কাজ তো খই ভাজ”

    ।। অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।

     

    “নেই কাজ তো খই ভাজ”
    -রাখী চক্রবর্তী

     

     

    “নেই কাজ তো খই ভাজ “
    প্রবাদ বাক্যটি শুনে একটা বিষয় মাথায় ঢোকে না খই ভাজা কি কোন কাজের মধ্যে পড়ে না ?অকর্মণ্য গুলোই
    কি খই ভাজার দায়িত্ব নিয়েছে, জানি না বাপু!
    চিড়ে ভাজা, মুড়ি ভাজা, চাল ভাজা এগুলো কাজের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে ।খই সেভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি তাই বোধহয় খই ভাজাকে পরিশ্রমের আওতায় আনা হয়নি।
    সাধারণত
    হাতে কাজ না থাকলে মানুষ কি করে।বৌ ,ঝি ,পাড়ার কাকিমা জেঠিমা মাসীমা ঠাকুমা এনারা পিএনপিসি অর্থাৎ পর নিন্দা পরচর্চা করতেন ।না ,না রাগ করলে হবে না সবার কথা বলিনি কিন্তু।
    কেউ কেউ ঠাকুর দেবতা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন।তাহলে খই ভাজার কথা এলো কেন?
    ছেলেরা বা বয়োজ্যেষ্ঠরা হলে চায়ের দোকানে আড্ডা বা ক্লাবে আড্ডা দিতেন। না,না
    বড় ভুল‌ হয়ে গেছে তখন কি ক্লাব ছিল না কি,তখন মাঠ ঘাট ছিল, পথে ঘাটে বনে জঙ্গলে শৌচকর্ম করতে যেতেন আর নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন
    ।সেখানে তো খই ভাজার কোন প্রশ্নই আসত না ।এমন প্রবাদ প্রবচনও তো হতে পারতো “কাজ নেই তো ধম্ম কম্ম কর” বা “কাজ নেই তো সেলাই ফোড়াই কর” বা‌ “কাজ নেই তো রাজনীতি কর” ‌।এই
    রাজনীতি’র ব্যাপারটা ঠিক না,ছেড়েই দিলাম, রাজনীতির গভীরে প্রবেশ না করাই ভালো।আসল  কথায় আসা যাক
    গ্রামের মা ,বৌ ,ঝি’রা অন্ন সংস্থানের জন্য খই ভাজে।শুধু খই কেন মুড়ি, চিড়ে, চাল ভাজে।ওনাদের পরিশ্রমকে কুর্নিশ জানাতে হয় ।সবচেয়ে বড় কথা
    দই দিয়ে খই খেতে যে অসাধারণ লাগে তা কম বেশি সবাই জানি।তাই খই বা খাবার নিয়ে
    কোন রকম ব্যঙ্গ রসিকতা করা একদম ঠিক না।ধনীদের কাছে সবই হাস্যকর।খেটে খাওয়া মানুষ গুলো জানে খই ভাজতে গেলে আগুনের প্রয়োজন হয়।ইদানীং রান্নার গ্যাস সব জায়গায় পৌছেছে।কিন্তু কয়েক বছর আগেও জ্বালানীর জন্য কাঠ জোগাড় করা কতো কষ্টের ছিল ।
    বর্ষায় কাঠ ভিজে থাকতো।হাঁড়ি চড়তো না।মাটির দাওয়া বসে কপাল চাপড়াতো আর বৃষ্টি দেখতো অসহায় মা‌ ঠাকুমারা , ওনাদের চোখের জলের সাথে বৃষ্টির জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতো।
    প্রত্যন্ত গ্রামে আজও জ্বালানি হিসেবে কাঠই ব্যাবহৃত হয়,
    আধুনিক যুগে এয়ারকন্ডিশন ঘরে বসে বলা যেতেই পারে ” নেই কাজ তো
    পপকর্ন ভাজ”।কিন্তু কে বলবে ? আমি আপনি না কি ‌নতুন প্রজন্মের কেউ ?
    ” নেই কাজ তো পপকর্ন ভাজ “
    খই ফোটার মতোই শব্দ হবে ফুটফাট।হাঁড়ি চড়বে ।ভাত ফোঁটার গন্ধ পেয়ে ছোট্ট ছেলেমেয়ে গুলো মাঠ থেকে ছুটে এসে বলবে,” মা ভাত খিদে পেয়েছে “
    দিন বদলাচ্ছে জীবন ধারণের গতি পাল্টাচ্ছে ।তাই খইয়ের বদলে প্রবাদ বাক্যে পপকর্ন যদি যুক্ত হয়।”নেই কাজ তো পপকর্ন ভাজ” । বেশ বড়লোক বড়লোক ব্যাপার শোনাবে তাই না।
    আর খইটা থাক আগের মতোই দই ,কলা, মিষ্টি দিয়ে খাওয়ার জন্য।আর সবশেষে প্রার্থনা করি প্রতিটি শিশুর মুখে যেন খইয়ের মতো বুলি ফোটে,বোবা শব্দটি চিরতরে মুছে যাক,চিরতরে,,,,,

  • নাটক

    নাটক-“শুধু তোমারি ‌জন্যে”

    “শুধু তোমারি ‌জন্যে”
    -রাখী চক্রবর্তী

     

     

    চরিত্র — ‌ডাক্তার ভোলা নাথ,
    কৃষ্ণ নাথ (ভোলা ডাক্তারের ভাই)
    উমা দেবী (ভোলা ডাক্তার ও‌ কৃষ্ণ’র মা )

    কবিতা একটি বিশেষ চরিত্রে
    কেশব নাগ ( কবিতার বাবা)
    ললিতা নাগ ( কবিতার মা )
    কম্পাউন্ডার মদন

    ডাক্তারের চেম্বারের আদলে। চেম্বারের সামনে একটা ওষুধের দোকান। চেম্বারের দরজার ওপরে বড় একটা সাইনবোর্ডে লেখা,
    “ভোলা নাথ ক্লিনিক “

    (প্রথম দৃশ্য)
    **********

    ভোলা নাথ ডাক্তার চেম্বারে চেয়ারের ওপর বসে দু’ পা তুলে কান খোঁচাচ্ছে দেশলাই এর কাঠি দিয়ে।
    কম্পাউন্ডার মদন বেঞ্চে বসে ঝিমোচ্ছে।

    কেশব নাগ মেয়ে কবিতাকে নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করলেন।

    কেশব- ডাক্তার বাবু বাড়ি আছেন?
    মদন- (চোখ রগড়ে) এটা বাড়ি মনে হচ্ছে আপনার। বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে “ভোলা নাথ ক্লিনিক” অক্ষর জ্ঞান আছে তো আপনার। তা না হলে ঠিক আছে।

    কেশব-এই ছোকরা, তুমি কে হে! আমাকে অক্ষর জ্ঞান শেখাতে এসেছো। আমি হলাম কেশব নাগ।

    মদন-দুধ গোয়ালে, কলা দোকানে, কি মনে করে এখানে?
    কেশব- মস্করা হচ্ছে আমার সাথে। আমার মেয়ে কবিতাকে দেখাতে এসেছি ডাক্তার বাবুর কাছে।

    মদন- সিমটম বলুন আপনার মেয়ের..
    কেশব-এই হতোছাড়া, ডাক্তার কে? যে স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে কান খোঁচাচ্ছে সে, না তুমি?
    মদন-ডাক্তার বিশ্রাম নিচ্ছেন। হাফ বেলা হল তাই। দশ মিনিট পর রুগী দেখবেন। আমি সব শুনে রাখছি তাই।

    কবিতা-ও বাবা চুলকাচ্ছে তো,
    কেশব-এই তো মা পাঁচ মিনিট আর..
    মদন-অপেক্ষা করতে হয়। যে সে ডাক্তার নয় এ ভোলা নাথ ডাক্তারের ক্লিনিক। বসুন আপনারা।

    (বেঞ্চে বসে কবিতা ও ওর বাবা
    পাঁচ মিনিট পর বিশাল একটা হাই তুলে ভোলা ডাক্তার চেয়ার থেকে পা নামিয়ে ঠিকঠাক করে চেয়ারে বসে)

    ভোলা ডাক্তার-পেশেন্টকে ডাক মদন।
    মদন-পেশেন্ট হাজির হো
    ভোলা ডাক্তার-এই যমের অরুচি এটা আদালত না। ডাক্তারের ক্লিনিক।
    মদন-(মাথা চুলকিয়ে) ধ্যাত, আদালতে পেয়াদার কাজ করতে করতে অভ্যাসটা খারাপ হয়ে গেছে। পেশেন্ট আসুন ভেতরে।

    (মেয়েকে নিয়ে কেশবের ভেতরে প্রবেশ)

    ভোলা ডাক্তার-সমস্যা কি?
    কেশব-ডাক্তার বাবু মেয়ের চুলকানির রোগ হয়েছে।
    ভোলা ডাক্তার-নাম কি তোমার?
    কবিতা-কবিতা নাগ
    ভোলা ডাক্তার-দেখি হাতটা দাও
    কবিতা-(হাত বাড়িয়ে ) হাতে না পায়ে চুলকায় খুব।
    ভোলা ডাক্তার-হুম।চোখটা দেখি। (চোখ পরীক্ষা করার পর) এই মলমটা পায়ে লাগাবে দিনে রাতে দু’ বার। এই মিশ্রণটা এক কাপ গরম জলে দিয়ে দু’ চামচ খেয়ে বাকীটা ফেলে দেবে। আর একটা কথা বর্ষার জল যেন গায়ে না লাগে। তাই থেকে চুলকানি বাড়তে পারে।
    কবিতা-বর্ষায় ভিজবো না তাই বোলে। কতো প্রিয় বর্ষা ঋতু। ইস্কুলের পরীক্ষাতে “প্রিয় ঋতু” রচনা এলেই আমি বর্ষা কালের রচনা লিখতাম। বেশ বৃষ্টির জলে ভিজবো, গান গাইবো।
    ভোলা ডাক্তার-ঐ বৃষ্টির জলে ভিজেই তো চুলকানির সৃষ্টি হয়েছে।
    (স্বগতোক্তি- যত ভিজবে তত আমার ভালো।তোমাকে নিয়ে ভাবতে পারবো, তোমাকে দেখতে পারবো। কয়েক বছরের জন্য নিশ্চিন্ত।)

    কবিতা- ও ডাক্তার বাবু কি ভাবছেন? ভালো হয়ে যাব তো ডাক্তার বাবু, আপনার ওষুধ খেয়ে?
    ভোলা ডাক্তার-রুগী যদি ভালো হয়ে যায়।তবে আমাদের চলবে কিসে। প্রতি সপ্তাহে এসে পুরিয়া নিয়ে যাবে।
    কেশব-ডাক্তার বাবু কতো দেবো?
    ভোলা ডাক্তার-মিশ্রণ, মলম সব নিয়ে একশো টাকা।
    (কেশব নাগ ডাক্তারকে টাকা দিয়ে কবিতাকে নিয়ে মঞ্চ থেকে প্রস্থান করেন)

    মদন-দুশো টাকা হলো তো। একশো বললেন কেন? এইভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা গেল।
    ভোলা ডাক্তার- এই যমের অরুচি আমি ব্যবসা করছি। দাঁড়া আজ তোকে তাড়িয়ে ছাড়বো।

    (ভোলা ডাক্তার লাঠি নিয়ে তাড়া করে মদনকে। মদন দৌড়ে পালায়।)

    (দৃশ্যান্তসূচক আবহসংগীত বাজবে।
    মঞ্চের সব আলো নিভে যাবে )

    দ্বিতীয় দৃশ্য
    ************
    (পরের দিনের ঘটনা- কৃষ্ণ ও উমা দেবীর কথোপকথন।)
    (কৃষ্ণ রঙ তুলি নিয়ে আর্ট পেপারে আঁকছে আর নিজের মনে বকবক করছে।)

    কৃষ্ণ- সব শালা বদমাশ। ভালো না কেউ ভালো না।
    উমা দেবি-কতবার বলবো, শালা বলতে নেই।
    কৃষ্ণ-কবিতার ভাই আমার শালা তো। শালা শালা শালা, বদমাশ শালা।

    উমা দেবী-ভুলতে শেখ বাবা। সব ভুলে যা।নতুন করে সব শুরু কর। তোকে আর ছবি আঁকতে হবে না। দাদার সাথে চেম্বারে বস।রুগী দেখ। ডাক্তার তো তুইও। দাদা কতো কষ্ট করে সার্জেন বানিয়েছে তোকে। প্রেম ভালবাসা করে পুরো কেরিয়ারটা নষ্ট করে দিলি। এখন পাগলামি করে একবছর কাটিয়ে দিলি। আর না..

    (ভোলা ডাক্তারের মঞ্চে প্রবেশ)

    ভোলা-(জামার, হাতের বোতাম, টাই খুলতে খুলতে) কি হয়েছে মা? এত বকবক করছো
    কেন?
    উমা দেবী-বকবক কি এমনি করি। তোর ভাইয়ের জন্য করি। দিনরাত শালা শালা বলে মাথা খারাপ করে দেয়। কি করি বলতো ভোলা?
    ভোলা-ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে দাও। তবে এ পাগলামি থামবে।
    উমা দেবী- আধ পাগল ছেলেকে কোন মেয়ে বিয়ে করবে? কোনও মা বাবা চাইবে পাগল ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে। তুই বল?

    ভোলা-কৃষ্ণ বিয়ে করলে সব ঠিক হয়ে যাবে মা। অতীত ভুললেই এ রোগ সারে মা। উন্মাদ পাগল তো ভাই না। সব দিকেই তো জ্ঞান আছে। কবিতাকে ভুললেই ও ঠিক হয়ে যাবে। ওর মন থেকে কবিতার স্মৃতি চিরতরে মোছাতে হবে। তা না হলে ওর জীবন থেমে যাবে মা। ওর মতো আর্টিস্ট হয় না মা, ডাক্তার হলো, কত হাসিখুশী ছিল ও। শেষে আধ পাগল হয়ে ঘরের এক কোনে পড়ে আছে।
    উমা দেবী-সবই বুঝি কিন্তু..
    কৃষ্ণ-কবিতা আসবে মা আজ। রান্না করে রেখো ওর জন্য। দেখো, আকাশটা ছাই রঙে ভরে গেছে। বৃষ্টি হলেই ও আসবে। এবার আর ওকে যেতে দেবো না। কবিতা, কবিতা
    তোমার জন্য আমার বেঁচে থাকা
    আমি আছি শুধ তোমারি জন্যে..

    (কৃষ্ণ ‌নিজের মনে বকবক করতে থাকে। মঞ্চে সব আলো নিভে যাবে)

    তৃতীয় দৃশ্য
    ************

    (দুদিন পরের ঘটনা দৃশ্যায়িত হবে)

    ভোলা ডাক্তার খবরের কাগজ পড়ছে ব্যালকনিতে বসে,
    ভোলা-মা এক কাপ চা নিয়ে এসো কথা আছে।
    উমা দেবী-যাই ভোলা (নেপথ্যে )
    (উমা দেবী চায়ের কাপ নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করবে)
    উমা দেবী- চা নে। বল কি বলবি?

    ভোলা-দু’ দিন আগে ক্লিনিকে কবিতা নামের একটি মেয়ে এসেছিল। চুলকানি রোগ নিয়ে।
    আমি আমাদের কবিতার ছায়া দেখতে পেলাম এই কবিতা মেয়েটির মধ্যে। বেশ শিশুসুলভ কথাবার্তা। হাত নাড়তে নাড়তে কথা বলে। খুব ভালো লাগলো মেয়েটিকে।
    তুমি যদি মত দাও কৃষ্ণর জন্য,..

    উমা দেবী-আমি কাউকে ঠকাতে পারবো না।কি পাপ করেছি কে জানে বিয়ের দু’ বছরের মধ্যে তোর বাবাকে হারালাম। কৃষ্ণ তখন ছয় মাসের শিশু। তুই পনেরো বছরের তখন। মনে পড়ে ভোলা তোর, আমি যখন বৌ হয়ে এলাম তুই তখন তোর মা’র ছবি নিয়ে এসে আমার কাছে এসে বললি,”এটা আমার প্রথম মা। তুমি আমার শেষ মা।” আমি তখন তোকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ছিলাম।

    ভোলা-হ্যাঁ মা। মনে আছে। সব মনে আছে।তুমি ভাবো মা, যা বললাম।

    উমা দেবী-তোর বিয়ে না দিয়ে আমি কৃষ্ণর বিয়ে কিছুতেই দেবো না।

    ভোলা-আমি বিয়ে করবো না মা। সংসার করলে ওদের দেখবো কি করে। ডাক্তার কাকু, ডাক্তার কাকু বলে গলা ফাটায় ওরা।দেশের সেবা দশের সেবা করে দিন কেটে যাবে আমার। তুমি যতদিন আছো তোমারও তো সেবা করতে হবে। বৌ এলে যদি আমার কাজে বাঁধা দেয়। মা-ছেলেকে আলাদা করে দেয়, তখন কি হবে। আর আমার বয়সের কথাটা ভাবো।

    উমা দেবী-আমার দুই ছেলে, কেউ কি আমায় নাতি নাতনির মুখ দেখাবে না, কৃঞ্চ পাগল ওর কথা ছেড়েই দিলাম, কিন্তু তুই..
    (মা ও ছেলের কথোপোকথনের মধ্যেই
    ঘরের ভেতর থেকে ভাঙচুর এর শব্দ আসে)
    ভোলা- মা ভাই আবার শুরু করলো, ওষুধটা খাইয়ে দাও।

    (উমা দেবী ওষুধের শিশি নিয়ে মঞ্চ থেকে প্রস্থান করলেন।
    ভোলা জানলার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
    মঞ্চে আলো নিভে যাবে)

    চতুর্থ দৃশ্য
    **********
    দুদিন পরের ঘটনা-
    (বিদ্যুৎ চমকাবে, ঘন ঘন বাজ্ পড়বে কড়াৎ কড়াৎ। বৃষ্টি পড়বে। মঞ্চের আলো জ্বলবে নিভবে। আবহ সঙ্গীত বাজবে, কৃষ্ণ পেন্টিং করতে করতে কবিতা বলে চিৎকার করে উঠবে)

    উমা দেবী-আবার শুরু হল কৃষ্ণর পাগলামি ।ভোলা আয় একবার।
    (ভোলার মঞ্চে প্রবেশ)

    ভোলা-কৃষ্ণ এমন করে না ভাই। আমি কবিতাকে ফিরিয়ে আনবো। এমন করে না।সোনা ভাই আমার।

    কৃষ্ণ-ঐ তো কবিতা, দাদা তুমি দেখতে পাচ্ছো না। ঐ তো কবিতার পিঠে চাবুকের দাগ। দগদগে ঘা দেখো। রক্ত জমাট হয়ে গেছে। ওর ভাই খুব মেরেছে, কবিতার খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। আমিও শেষ করবো নিজেকে।
    (কৃষ্ণ নিজেই নিজেকে মারতে থাকে চাবুক দিয়ে।)

    উমা দেবী-(কৃষ্ণকে ধরে) ছাড় বলছি চাবুক, কবিতা নেই। মারা গেছে, ওর সব যন্ত্রণা ভগবান নিয়ে নিয়েছে। তুই ভালো থাকলে কবিতার আত্মা শান্তি পাবে। তুই চাস না কবিতা ভালো থাকুক-বল!

    (কৃষ্ণ চাবুকটা ফেলে দিয়ে আর্ট পেপারে আবার ছবি আঁকতে বসে। ঘরের মেঝেতে কৃষ্ণের আঁকা সব ছবি ছড়িয়ে পড়ে..ভোলা একটা একটা করে ছবিগুলো তোলে। নেপথ্যে, আবহ সঙ্গীত )

    পঞ্চম দৃশ্য
    ***********
    এক সপ্তাহ পরের ঘটনা মঞ্চে-
    (“ভোলা নাথ ক্লিনিক” এর সেট- ভোলা ডাক্তার চেম্বারে বসে থাকবে। মদন চেয়ার টেবিল মুছবে। কবিতা মঞ্চে প্রবেশ করবে)

    কবিতা-ডাক্তার বাবু আমার মলম ফুরিয়ে গেছে।
    ভোলা ডাক্তার-(কবিতার দিকে তাকিয়ে
    স্বগতোক্তি- চেহারার এতো মিল। কবিতা এখানে না আসলে আমাদের কবিতার আর দেখাই পেতাম না। কৃষ্ণকে যদি দেখাতে পারতাম..)

    কবিতা-ও ডাক্তার বাবু। কিছু তো বলুন।

    ভোলা ডাক্তার-হ্যাঁ, হ্যাঁ বলছি বলছি। বাবা আসেনি আজ?

    কবিতা-না ডাক্তার বাবু, বাবা কাজে গেছে।সন্ধ্যা বেলায় বাড়ি থাকবো না তাই দুপুরে এলাম।

    ভোলা ডাক্তার-ভালো, ভালো করেছো।কোথায় থাকো? কে কে আছে বাড়িতে?

    কবিতা-সামনের পেট্রল পাম্পের পিছনের বাড়িটা আমাদের। আমি মা,বাবা থাকি।

    ভোলা ডাক্তার-বেশ বেশ।এই নাও মলম।

    কবিতা-(মলম হাতে নিয়ে ) কত দেবো ডাক্তার বাবু?

    ভোলা ডাক্তার-যাও বাড়ি যাও। তোমার থেকে এক পয়সা নিতে পারবো না। যখনই ওষুধের দরকার হবে আসবে এখানে। আমি না থাকলেও মদনকে বলবে ও দিয়ে দেবে।

    কবিতা-আপনি তো শিব মন্দিরে বসেন। বিনা পয়সায় রুগী দেখেন। এখানে কেন পয়সা নেবেন না?

    ভোলা ডাক্তার-সব কিছু কি পয়সা দিয়ে পাওয়া যায়।

    কবিতা- (কিছুক্ষণ ভেবে) চলি ডাক্তার বাবু।

    (মঞ্চ থেকে কবিতার প্রস্থান। ভোলা ডাক্তার মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে।
    মঞ্চে সব আলো নিভে যাবে ।)

    ষষ্ঠ দৃশ্য

    ************

    এক মাস পরের ঘটনা মঞ্চে-
    (কেশব নাগ ব্যালকনিতে বসে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে চা খাবেন।
    ভোলা ডাক্তার মঞ্চে প্রবেশ।)

    ভোলা ডাক্তার-কবিতা, বাড়ি আছো।

    কেশব-ডাক্তার বাবু আপনি, আসুন ভেতরে আসুন। বসুন।(চিৎকার করে) কবিতা আয় দেখে যা কে এসেছেন..

    (কবিতা গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে মঞ্চে প্রবেশ করে)

    কবিতা-বাবা ডাকছো? (ভোলা ডাক্তারকে দেখে) ডাক্তার বাবু আপনি!

    ভোলা ডাক্তার-কেমন আছো বলো। একমাস হয়ে গেল তোমার দেখা নেই। তাই তোমার সাথে দেখা করতে চলে এলাম।

    কবিতা-আমি ভালো আছি। আপনি বাবার সাথে কথা বলুন আমি চা করে আনছি।

    ভোলা ডাক্তার-আমার ভাইয়ের জন্য কবিতাকে পছন্দ করেছি। আমার ভাই কৃষ্ণ নাথ।ডাক্তার, তবে হোমিওপ্যাথি না।

    কেশব-কি বলছেন ডাক্তার বাবু। এ তো খুব ভালো কথা। ললিতা ললিতা একবার এদিকে এসো।

    (ললিতা চা ও জলখাবারের ট্রে নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করে)

    কেশব- পরিচয় করিয়ে দি। কবিতার মা।
    আর ইনি ভোলা ডাক্তার। কবিতার ট্রিটমেন্ট করছেন ইনি।

    ললিতা-নমস্কার ডাক্তার বাবু।

    কেশব- ললিতা, ডাক্তার বাবু নিজের ভাইয়ের সঙ্গে কবিতার সম্বন্ধ ঠিক করেছেন। কিছু বলো,

    ললিতা-ও মা। এতো খুব ভালো খবর।কবিতার জন্য পাত্র দেখছিলাম তো আমরা।

    কেশব-যাও যাও, মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে এসো।

    ভোলা ডাক্তার-সে সব পরে হবে। কবিতাকে এখন আমার বাড়ি নিয়ে যাব। যদি অনুমতি দেন। সত্য নারায়ণের পুজো হয়েছে। মা দেখতে চাইল কবিতাকে। আর কবিতা দেখে আসুক নিজের ঘর বাড়ি কেমন। আপনারাও একদিন আসুন।

    ললিতা-আপনি বসুন। আমি কবিতাকে নিয়ে আসছি।

    (ভোলা ডাক্তার ও কেশব নাগ কথাবর্তার মাঝে ললিতা মেয়েকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করে)

    লাল তাঁতের শাড়ি কপালে ছোট্ট একটা টিপ, ভোলা ডাক্তার কবিতাকে দেখেই অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
    কেশব- ডাক্তার বাবু, কবিতা..

    ভোলা ডাক্তার-হ্যাঁ হ্যাঁ চলো। আপনারা চিন্তা করবেন না। আমি সময় মতো দিয়ে যাব কবিতাকে।

    (মঞ্চ থেকে প্রস্থান ভোলা ডাক্তার ও কবিতার। ললিতা ও কেশব দুজনে মিলে মেয়ের বিয়ে নিয়ে কথাবর্তা বলতে থাকবে। সানাই এর সুরে মঞ্চ ভরে যাবে।
    আস্তে আস্তে সব আলো নিভে যাবে)

    সপ্তম দৃশ্য
    **************

    সত্য নারায়ণ পুজোর সামগ্রী ফুল ফল সাজানো, প্রদীপ, ধূপ জ্বলবে।
    কৃষ্ণ ঠাকুর ঘরের এককোনে বসে। উমা দেবী ঠাকুরের সামনে বসে চোখ বুজে প্রার্থনারত)

    কৃষ্ণ-(স্বগতোক্তি )আজকের দিনের কথা মনে আছে তোমার। তুমি প্রথম আমাদের বাড়ি এসেছিলে। লাল টিপ লাল রঙের শাড়ি পড়ে। তুমি আমাদের ঘরে এলে ওমনি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বৃষ্টি আর হয় না জানো।আমার দুচোখে যে বরিষ ধারা বহে সর্বক্ষণ।আকাশ পানে চাইতে পারি না।ৎতুমি আসবে বলে সেদিন আসোনি। দেখ আমার হাতের শিরায় এখনও ক্ষত আছে। কবিতা এখুনি চলে যেও না। থাকো আরও কিছুক্ষণ। যেও না কবিতা ।
    (একটা ছায়া মূর্তি আস্তে আস্তে ঠাকুর ঘরের দেওয়ালে মিশে যাবে। সেই মূহুর্তে কবিতা মঞ্চে করবে ভোলা ডাক্তার এর সাথে)

    কৃষ্ণ-কবিতা যেও না (চিৎকার করে ) আজ সত্য নারায়ণের পুজো হবে, প্রসাদ খাবে না?

    কবিতা-হ্যাঁ ,খাবো তো প্রসাদ। নারায়ণের সিন্নি খুব ভালোবাসি খেতে।

    (কৃষ্ণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কবিতার দিকে। লাল শাড়ি লাল টিপ। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। সেই চেনা মিষ্টি কন্ঠস্বর। কবিতা!)

    কবিতা-কবিতা, তোমার কবিতা।চিনতে পারলে না? এবার তুমি উঠে দাঁড়াও। আর কোনও কথা নয়। জেন্টলম্যান হয়ে ঠাকুর ঘরে এসো। পুরোহিত এখুনি আসবে পুজো করতে।
    কৃষ্ণ-(চোখে মুখে খুশির ঝলক) আমি জানতাম তুমি আসবেই।
    (কৃষ্ণ ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে। উমা দেবী কবিতার কথা শুনে প্রার্থনা থামিয়ে চোখ খুলে কবিতাকে দেখে অবাক হয়ে যান)

    উমা দেবী-কে মা তুমি? আমার অন্ধকার ঘরে আলো হয়ে এলে..

    কবিতা-কবিতা
    উমা দেবী-কবিতা! কবিতা সে তো..

    কবিতা-আমি আছি, আমি থাকবো মা।

    ভোলা ডাক্তার-(কবিতার মাথায় হাত রেখে )
    তোমার অভিনয় দেখে আমি মুগ্ধ। আমার কথা রেখেছো। তোমাকে আমার প্রণাম করতে ইচ্ছে করছে মা। এতো শক্তি তোমার মধ্যে আছে মা। কৃষ্ণ তোমার কথা শুনে ওর ঘরে চলে গেল। বেঁচে থাকো মা।

    উমা দেবী-ভোলা ও কি সেই মেয়ে? কবিতার সাথে ওর এতো মিল। নামও কবিতা!

    ভোলা-কৃষ্ণ ভালো হয়ে যাবে এবার। চেম্বারে বসবে রুগী দেখবে। কবিতার জন্য সব সম্ভব হবে মা দেখে নিও মা।
    (উমা দেবী ঠাকুরের চরণে মাথা রাখে।
    দৃশ্যান্তসূচক আবহ সঙ্গীত বাজবে মঞ্চে সব আলো নিভে যাবে।)

    শেষ দৃশ্য
    ************

    কিছুক্ষণ পরের ঘটনা মঞ্চে-
    (সত্য নারায়ণ পুজো শেষ হবে।
    কবিতা উমা দেবীর সাথে গল্প করবে
    কৃষ্ণ মঞ্চে প্রবেশ করবে জেন্টেলম্যান হয়ে)

    উমা দেবী-এ আমি কাকে দেখছি। ভোলা, শিগগির আয় দেখ তোর ভাইকে..

    ভোলা-(নেপথ্যে, যাই মা। ভোলা মঞ্চে প্রবেশ করে)
    ভোলা-(ভাইকে দেখে ) এই তো ডাক্তার কৃষ্ণ নাথ ।(কৃষ্ণ’র পিঠ চাপড়ে) লড়াই করে বেঁচে থাকার নাম জীবন। কবিতা তোর সাথে আছে ভাই।

    কৃষ্ণ- সে তো জানি, কবিতা আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতেই পারে না, অনেক দিন পর কবিতা আমার সামনে এল,পরীক্ষা করছিল আমাকে আমি ওকে ভুলে যাই কিনা।

    ভোলা- কবিতা ভাই ঘোরে আছে, এই ঘোর কেটে গেলে ও ঠিক তোমাকে আপন করে নেবে।

    কবিতা-আপন তো করে নিয়েছে দাদা, দেখুন ওর চোখে মুখে তৃপ্তির হাসি, আমি না হয় ওর কবিতার ভরসা হয়েই থাকব।

    কৃষ্ণ-(আকাশের দিকে তাকিয়ে) কবিতা দেখো মেঘের ঘনঘটা‌, ছাই রঙে ভরে গেছে আকাশটা, মনে আছে তোমার এই রকম মেঘলা দিনে তুমি আমার ‌বাড়িতে প্রথম এসেছিলে।

    কবিতা- হ্যাঁ, আকাশও তো কথা দিয়েছিল, আমি তোমার সাথে যতবার দেখা করবো ততবারি আকাশ ছাই রঙা মেঘে সেজে উঠবে।
    (কৃষ্ণ কবিতার প্রেমালাপ চলতে থাকবে।)

    উমা দেবী-ভোলা,কতদিন‌ কৃষ্ণ কবিতাকে মেনে নেবে? যদি ও জেনে যায় এই‌ মেয়ে ওর কবিতা ‌না, তখন!

    ভোলা-দেখো মা,ভালো করে দেখো ভাইয়ের হাসি মুখ, এই হাসি কখনওই ভগবান ছিনিয়ে নিতে পারে না‌। সময় দাও মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।
    (কৃষ্ণ কবিতার কাঁধে মাথা রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ‌থাকে,একটা ছায়ামূর্তি মেঘের ভেতরে গিয়ে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়)

    কৃষ্ণ-(কবিতার হাত ধরে) তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না তো?
    কবিতা- (কৃষ্ণর হাত ধরে) তোমার ঘোর যেদিন কাটবে, আমাকে অবহেলা করা শুরু করবে সেদিন তোমার প্রিয় ছাই রঙা আকাশ আমাকে ভালবেসে নিজের কাছে নিয়ে নেবে,
    কৃষ্ণ-(কবিতাকে জড়িয়ে) আমি আছি শুধু তোমারি জন্যে,

    কবিতা-তোমার কবিতা এক বছর হলো‌ মারা গেছে। আমার নামও কবিতা।
    (কৃষ্ণর সামনে কবিতার আর্তনাদ ভেসে উঠবে “বাঁচাও কৃষ্ণ আমাকে বাঁচাও, আমার ভাই আমাকে মেরে ফেললো,কৃষ্ণ, আমি আছি শুধু ‌তোমারি জন্যে” কিছুক্ষণ পরে কৃষ্ণ চোখ খুলে দেখবে কবিতার কোলে ও শুয়ে আছে।)

    কৃষ্ণ-(চোখ ডলতে ডলতে) মা…মা দাদা,

    (উমা দেবী ও ভোলার মঞ্চে প্রবেশ)
    কৃষ্ণ-কবিতা, মা এসেছিল ও, কবিতা নেই আর..

    উমা দেবী-জানি তো, কবিতা নেই, কবিতা তোর জন্য উপহার পাঠিয়েছে, নিবি না?

    কৃষ্ণ-হ্যাঁ নেবো তো, কি উপহার মা?
    উমা দেবী-(কবিতার হাত কৃষ্ণ’র হাতে দিয়ে) যত্নে রাখিস, ভালোবাসিস।
    (কবিতার হাসিমুখ দেখে কৃষ্ণ হাসবে, মাথা নিচু করে লাজুক স্বরে কৃষ্ণ বলবে, দাদা কাল থেকে চেম্বারে বসবো। উমা দেবী ও ভোলা, কৃষ্ণ ও কবিতার চারহাত এক করে দেবে।)
    ব্যাক গ্রাউন্ডে সানাইয়ের সুর বাজবে
    “যদিদং হৃদয়ং মম,তদস্তু হৃদয়ং তব”

    (মঞ্চে সব আলো জ্বলে উঠবে
    মঞ্চের পর্দা পড়বে ধীরে ধীরে।)
    যবনিকা

  • গল্প

    গল্প- শিকারী

    শিকারী
    -রাখী চক্রবর্তী

     

     

    নারায়ণ পুর গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে যে দু’টো বাড়ি আছে তার মধ্যে একটি বাড়িতে মাদু থাকতো ওর বাবার সাথে। কিছুটা দুরে জেলে পাড়া ,ঐ জেলে পাড়ায় ওর বাবার খুব যাতায়াত ছিল। জেলে না হলেও জমিদার বাড়ির পুকুরে মাছ ধরার জন্য ডাক পড়তো মাদু’র বাবা মানে নিরু সাহার। মাদু ওর বাবার খোঁজ করতে করতে মাঝে মধ্যেই জেলে পাড়ায় যেতো। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হতো, মাদুর বাবা বাড়ি ফিরতো না। তখনই মাদু ওর বাবার খোঁজ করতে বেরিয়ে পড়তো। রতন ও হাবু ছিল জেলে পাড়ার মস্তান। মাদু’র দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকতো রতন ও হাবু, মাদুর অস্বস্তি হতো খুব। এক সন্ধ্যা বেলায় মাদু ওর বাবার খোঁজ করতে গেছে জেলে পাড়ায়।
    রতন বিড়ি মুখে দিয়ে সুর টেনে বললো, মাদু দেখবি আমার যাদু। একটু আদর দিলেই তুই ঠিক হয়ে যাবি কাবু।
    হাবু হেসে বললো, আমি হলাম হাবু, হা হা হা
    মাদু- দা সঙ্গে নিয়েই বাড়ি থেকে বের হই।দেখা তোদের যাদু।

    মাদু’র রুদ্র মূর্তি দেখে রতন ও হাবু পালিয়ে গেল।এমনি করেই মাদুর দিন যায়, রাত যায় রতন ও হাবুকে দা দিয়ে ভয় দেখিয়ে।একদিন মাদু’র বাবা মেয়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেই বসলো জেলে পাড়ায় আর সে যাবে না। মাদুও খুব খুশি বাবার কথা শুনে। মাদু’র খুব সম্মানে লাগে রতন ও হাবু যখন কুনজরে দেখে ওকে। বয়স্থা মেয়ে মাদু’র লাজলজ্জা একটু বেশিই। যাক সে কথা
    মাঘ মাসে মাদুর বিয়ে ঠিক করলো ওর বাবা।
    শীতের আমেজ নিয়ে মাদু বৌ সাজলো।লজ্জাবতী পাতার মতো হয়ে আছে মাদু।সলাজ দৃষ্টি ওর। সখীরা ধরলেও লজ্জায় গুটিয়ে যাচ্ছে মাদু। বেশি রাতে বিয়ের লগ্ন ছিল। অতিথিদের খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে তারপর মাদুর বিয়ে শুরু হলো।
    শুভদৃষ্টির সময় বরের দিকে তাকিয়ে মাদু থমকে গেছিল। চোখ দু’টো কতো চেনা।
    মাদু তো আর হবু বরকে দেখেনি আগে। তবে চেনা কেন লাগবে! মাদু মনে মনে বলছে স্বপ্নতে দেখেছি রাজপুত্রকে। বাবা যথার্থ পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছে।
    সখীরা বলছে, মালাটা দে বরের গলায়। এই মাদু…
    মাদু চমকে উঠে বললো, এই তো দিচ্ছি। মালা বদল হলো, বিয়ে সুসম্পূর্ণ হল। মাদু স্বামীর ঘর করতে চললো।
    অষ্টমঙ্গলায় মাদু বাপের বাড়ি আসবে। ঠিক আগের রাতে মাদু’র বর খুন হলো। রক্তারক্তি ভাবে না, বিষাক্ত দংশনে। সারা শরীর নীল হয়ে গেছিল। পুলিশ মাদুকে থানায় ধরে নিয়ে গেল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ।
    নিরু সাহার জীবন থমকে গেল, জামাইয়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে। যৎসামান্য সঞ্চয় ছিল, মেয়ের বিয়ে দিয়ে তা শেষ করেছে নিরু।মাদু’র বিধবা হওয়ার খবর পেয়ে রতন ও হাবু এসেছিল নিরুর কাছে। কতবার বললাম নিরুকা আমাদের সাথে মাদুর বিয়ে দাও।দিলে না। বিধবা মেয়েকে পোষো এবার।
    নিরু নিরুত্তর থাকে রতন হাবুর কথা শুনে।

    একমাস হয়ে গেল মাদু বাপের ভিটেতে পা রাখেনি। রতন চম্পট দিয়েছে ভিন্ গায়ে। মাদু পুলিশের কাছে বলেছে রতন ও হাবু বিষ দিয়েছে ওর স্বামীকে। ওপর তলার পুলিশ নড়েচড়ে বসেছে মাদু’র কথা শুনে। মাদু’র ওপর অকথ্য অত্যাচার করেছে থানার বড়বাবু। সবটাই হাবিলদার দামোদরের কাছ থেকে শুনেছে রতন। তাই দেরি না করে রতন গাঁ ছাড়ল। হাবু গাঁয়েতেই ছিল।

    তিন মাস পর রতন নারায়ণ পুর গ্রামে ফিরলো। সন্ধ্যা বেলায় রতন গঙ্গার ধারে গিয়ে বসলো। মাদু গঙ্গার জল নিয়ে ফিরছিল, মাদুকে দেখে মাদু’র সামনে এসে রতন বললো, কি রে মাদু ঠমক্ ঠমক্ করে চললি কোথায়?দিনের বেলায় তোর দেমাক সহ্য করবো, কিন্তু রাতে আমি যা চাইবো তাই হবে।
    মাদু- পথ ছাড়,যেতে দে।

    রতন- না না, জাপটে ধরে তোকে একেবারে মহলে ‌নিয়ে উঠবো। হ্যাঁ রে মাদু‌‌ শ্বশুর ঘর ছাড়লি কেন? বরকেই বা মারলি কেন?
    আমার জন্য ‌মন কেমন করে তোর তাই না।আমি রাজি বে করবি আমাকে। ওই একটু আদটু আনন্দ ফূর্তি করেছিস বে করে, তাতে কোন দোষ ‌হয় না রে। তাহলে ঐ কথা রইলো আজ রাতে চলে‌ আসিস মহলে।

    মাদু- তোর বাপের মহল বুঝি। ফোট এখান থেকে। হাত ছাড় বলছি

    রতন- তোকে দেখে নেবো। আজ রাতেই।
    রতন মুখে বিড়ি গুঁজে গজগজ করতে করতে চলে গেল।
    রাতে জেলে পাড়ায় উৎসব হবে মানে ছাইপাঁশ খাওয়া দাওয়া হবে। রতনের বন্ধু হাবু, কলকে, হারু সব আসবে।
    রতন হারুর বাড়ি গেল হারুকে ডাকতে। হারু হারু..
    হারু- রতন আয়।

    রতন- আজ উৎসব আছে জেলে পাড়ায়, আসবি কিন্তু। একটু পরেই চলে আসিস, হাবুকে বলা‌ হয়নি এখনও, যাই।

    হারু-হাবু নাই রে, জানিস তো রতন
    রতন-কেন? হাবুর কি হলো?
    হারু- রতন জানিস‌, রাত হলেই তো শিকার করতে বের হয় মেয়েছেলেটি..
    রতন- কে? কার কথা বলছিস?

    হারু- তুই তো ছিলিস নে এখেনে। এক মাস আগির রেতে হাবু খুন হলো। পুলিশের কাছে কয়েছে হাবু একটা মেয়ে ‌ওকে কুপিয়েছে ছুরি দিয়ে। তার পর হাবু মরে গেল। তুই তো গেরামে ছিলিস নে, তায় কিছু জানিস নে।
    রতন- কি বলছিস! চল তুই আমার সাথে।আজ উৎসব হবেই। মাদুকে ডাকতে যাই।রাজি না হলে তুলে আনবো।

    হারু- মাদু কোথায় ?

    রতন- ওর বাপের ভিটেতে আবার কোথায়।স্বামীকে খেয়েছে। এবার আমি ওকে খাবো।হা হা হা..

    হারু- তুই যা আমি পরে যাব।
    রতন মাদু’র বাড়ি গেল। মাদু, মাদু বেরিয়ে আয়। আজ রাতে নাচ, গান, মজলিশ হবে।
    মাদু ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। রতন মাদুকে দেখে চোখ ফেরাতে পারলো না। কি সেজেছিস মাইরি বলেই মাদুকে জাপটে ধরতে গেল রতন।
    মাদু বললো, এখানে না গঙ্গার ঘাটে চল।আনন্দ ফুর্তি করবো। বাবা ঘুমাচ্ছে এখন।
    রতন তো খুশিতে ডগমগ করছে। মাদুর হাত ধরে রতন গঙ্গার ঘাটে গেল। মাদু গঙ্গার জলের দিকে এক পা করে এগোচ্ছে রতনও এগোচ্ছে। তারপর কোমর জল, বুক জল।গলা পর্যন্ত ডুবে গেছে রতনের।
    মাদু হেসে বললো, সুরা পান করে নে রতন।
    অমৃত সুরা। পান কর। যত পারিস পান কর।
    রতন চিৎকার করে বলছে, মাদু বাঁচা, টেনে তোল আমাকে পা মাটিতে আটকে গেছে।

    মাদু- আমার বরও বাঁচার জন্য ছটফট করছিল। বাঁচাতে পারিনি। বিষ দিয়েছিলিস। এবার ডুবে মর। থানার বড়বাবুকে টাকা খাইয়ে ছিলিস আমার ওপর অত্যাচার করার জন্য। এইবার মর..

    রতন ‘মাদু মাদু্’ বোলে চিৎকার করতে থাকলো। গঙ্গার জল আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে গেল। মাদু ঘরে ফিরে এলো।

    হ্যারিকেনটা নিভিয়ে দাও বাবা। আজকের মতো শান্তি আমি কোনদিন পাইনি বাবা।

    নিরু-ঘুমা মা, ঘুমা‌। আমি গান গাইয়ে ঘুম পারিয়ে দিচ্ছি তোকে।

    মাদু- হ্যাঁ বাবা, কতরাত ঘুমাই নি। শিকারের খোঁজে এদিক ওদিক ঘুরে বেরিয়ছি।
    নিরু- চাঁদ মামা ,চাঁদ মামা ঘুম নিয়ে আয়
    মাদু মা’র চোখ যে বন্ধ না হয়,
    তুই এলে ঘুম আসবে‌
    আমার সোনার চোখে,
    সকাল হলে নিয়ে যাস
    ঘুম সোনার চোখ থেকে।।

    পরের দিন সকালে রতনের লাশ ভেসে উঠেছে গঙ্গায়। নারায়ণ পুর গ্রামের সবাই ছুটেছে রতনের লাশ দেখতে। হারুও গেছে।
    পুলিশ অফিসার অবনী কুমার হারুকে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি তো রতনের বন্ধু হও।কিছু জানো তো বলো। তাহলে মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে ।

    হারু- মাদু’কে নিয়ে কাল রাতে উৎসব করবে বলেছেল রতন। আমরা সব বন্ধুরা যাব। রতন মাদুকে ডাকতে গেল। আর এল না, আমরা জেলেপাড়ায় রাত একটা অব্দি ছিলেম। রতন আসল নে। আমরা বাড়ি ফেরে এলাম।
    পুলিশ অফিসার অবনী কুমার বললেন, মাদু মানে বিয়ের পর যার স্বামীর রহস্য মৃত্যু হয়ে ছিল। জেলেতেই তো মাদু আত্মহত্যা করেছিল। সে এখানে কি করে আসবে, মাদু তো মৃত।

    হারু কাঁপতে কাঁপতে বললো, মাদু বেঁচে নেই? হাবুকেও তো একজন মেয়ে খুন করেছেলো। সেও কি তবে!

    পুলিশ অফিসার বললেন, মাদু’র বাড়ি তদন্ত করতে হবে।
    গ্রামের কয়েকজন ও হারু পুলিশের সাথে মাদু’র বাড়িতে গেল। দরজা ভেজানো ছিল ।দরজা খুলতেই ভোটকা গন্ধে পুলিশ অফিসার দু’ পা পিছনে চলে এলেন। হারু সামনে গিয়ে দেখলো, নিরু সাহার দেহে পচন ধরেছে। পুলিশ অফিসার থানায় খবর দিলেন। ভ্যানে করে নিরু সাহার পচা মৃতদেহ মর্গে নিয়ে যাওয়া হলো।
    পুলিশ অফিসার ভালো করে পরীক্ষা নিরিক্ষা করছেন মাদু’র ঘরের, হঠাৎ ওনার নিরুর বিছানায় চোখ গেল। উনি দেখলেন দু’টো মাথার বালিশই ভেজা, চাদরটাও অগোছালো, হ্যারিকেনটা নিভু নিভু করে জ্বলছে।
    “আমার বাবার মৃতদেহ উদ্ধার করুন পুলিশ বাবু, আমার হত্যার প্রতিশোধ আমিই নেবো, নারায়ণ পুর গ্রামে যাবেন কাল সকালে, মাদু আমি”
    হারু- আপনি চুপ করে আছেন কেন,
    পুলিশ অফিসার অবনী কুমার মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন,আর কোন ভয় নেই শিকারী সফল হয়েছে তার কাজে, আপনারা কেউ এখানে আর থাকবেন না। সবাই চলে যান।
    হারু বললো, রতনের ‌মৃত্যু রহস্য কি! সেইটে জানবেন নে অফিসার?

    পুলিশ অফিসার- রতন, হাবু মাদুকে জ্বালাতন করতো তাই না হারু?
    হারু-হ্যাঁ, হাবু ও রতন মাদু’র শ্বশুর বাড়ি পর্যন্তু গেছেলো। কি কাণ্ড বাদেয় ছেল ওরা ওখানে সেইটে জানতে পারিনে এখনও।তারপর তো রতন এই গাঁ ছেড়ে পায়লে গেল। তারপর হাবু খুন হল‌ এক মেয়েছেলের হাতে। মরার আগেই তো হাবু বলেছেল।
    পুলিশ অফিসার ঠিক আছে বলে চলে গেলেন।
    নারায়ণ পুর থানায় গিয়ে ‌পুলিশ‌ অফিসার অবনী কুমার জানতে পারলেন গতকাল রাতে থানার বড়বাবুকে নর্দমার মধ্যে পড়ে থাকতে দেখেছে স্থানীয় লোকজনেরা।
    পুলিশ অফিসার অবনী ‌কুমার থানার থেকে বেরিয়ে বড়বাবুর বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। বড়বাবুর বাড়ি গিয়ে জানতে পারলেন গতকাল রাতে একটি মেয়ে না কি বড়বাবুকে ডেকে নিয়ে গেছে। ভোরবেলায় নর্দমার জলে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন বড়বাবু।

    পুলিশ অফিসার অবনী কুমার আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার তদন্ত শেষ মা, তোমার আত্মা শান্তি পাক। আকাশের ওপর দিয়ে একটা বাজ পাখনা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে গেল। অবনী কুমার আকাশের দিকে তাকিয়ে টুপীটা মাথা থেকে খুলে আবার মাথায় পড়ে নিলেন।

  • কবিতা

    কবিতা- ব্যর্থ প্রেম

    ব্যর্থ প্রেম
    -রাখী চক্রবর্তী

     

     

    পর্বতের চূড়ায় একাকী আমি দাঁড়িয়ে,
    সমতলে স্মৃতিগুলো প্রেমের উষ্ণতা বিলোচ্ছে,
    বিশ্বাস সওদা করেছে তাই সোহাগী
    থেকে হয়েছি অভাগী,
    যেমন বৈকালিক সন্ধ্যার সূচনা করে
    সন্ধ্যার অবসান হয় শঙ্খ নিনাদে
    তেমন আমার জীবনে
    ভালোবাসার স্নিগ্ধ পরশ জিজ্ঞাসা চিহ্ন নিয়ে
    বেসামাল হয়ে পড়ে আছে খাদে,
    উপাসনা উপাচার নৈবেদ্য যা যা সাজিয়েছি প্রেম পুজারীর তরে
    আজ ব্যর্থ সবটাই
    একরাশ ঘৃণা জমে আছে প্রেম কাহিনীর উপসংহারে।

  • কবিতা

    কবিতা- “মানসিক ভারসাম্যহীন”

    “মানসিক ভারসাম্যহীন”
    -রাখী চক্রবর্তী

     

     

    আঁধার ঘুচিয়ে সুর্য ওঠে প্রতিদিন,
    রোজ নামচার নামাবলীর চাদর গায়ে জড়িয়ে
    পথে বের হয় শত শত খেটে খাওয়া মানুষ,
    শুধু আমি কর্মহীন..
    আমি মানুষ এক মানসিক ভারসাম্যহী।
    নোনা জল পান করেও তেষ্টা মেটে আমার,
    দুর্গন্ধ অথচ খাদ্য সামগ্রীতে ভরা থাকে যখন ডাস্টবিন
    আমার চোখ চিকচিক করে ওঠে, জঠর অনলকে শান্ত করতে গিলি সব গোগ্রাসে,
    আমি মানুষ এক মানসিক ভারসাম্যহীন।
    আমার মনের কথা বলি যখন প্রলাপে বিলাপে..
    তোমরা তখন বলো, পাগলটা শাস্তি পাচ্ছে কে জানে কোন পাপে?
    আমি ফুটপাতে নিশি যাপন করি, তবুও নই আমি ভিখারি,
    পথই আমার একমাত্র সঙ্গী তা ভিড় হোক বা জনমানব হীন
    আমি মানুষ এক মানসিক ভারসাম্যহীন।
    আমার পাথর চাপা বুকে স্বপ্নেরা আছাড় মারে না,
    চাওয়া পাওয়া নেই বলে কোন অনুতাপ মনে ঝড় তোলে না,
    হৃদয়ে বাজে তাই সর্বদা খুশির বীণ
    আমি মানুষ এক মানসিক ভারসাম্যহীন।
    শহর জুড়ে ‌আজ সব মত্ত ভালোবাসাবাসিতে
    এর কিছুটা সত্য, কিছুটা ভরা গোপনীয়তা’তে,
    আমি একা,শুধু একা থাকি
    মৃত্যুর প্রতীক্ষাতে
    নিদ্রাবিহীন
    আমি মানুষ এক মানসিক ভারসাম্যহীন।

  • নাটক

    নাটক- “বাপ বাপই হয়”

    “বাপ বাপই হয়”
    -রাখী চক্রবর্তী

     

     

    শশীভূষণ– গঙ্গার ‌পারে বসলে মনটা হু হু করে ওঠে। তোমারও হয় নিশিকান্ত?

    নিশিকান্ত- হয় সব হয়, নিরিবিলি জায়গা, পাখীদের..

    শশীভূষণ– রাত হলো কি পাখীগুলো কিচির মিচির করা শুরু করে দিল। বটগাছের কি বিশ্রাম নিতে নেই?

    নিশিকান্ত- না না শশীভূষণ, পাখীগুলো ক্যাঁচর ম্যাচর করে। আর বটগাছই তো ওদের আশ্রয় দিয়েছে। তা না হলে ওরা থাকতো কোথায়।তোমার ঝাঁকড়া চুলের মধ্যে!

    শশীভূষণ– রসিকতা করছো। তবে জানো আগে বেশ লাগত পাখিদের ঝগড়া শুনতে। তারপর যখন গিন্নি এল, তখন থেকে পাখিরাই আমাদের ঝগড়া শুনতো।

    নিশিকান্ত– হা হা, ভালো বলেছো শশীভূষণ।
    এখন পরম শান্তিতে আছো কি বলো?

    শশীভূষণ– শান্তি আর কোথায় ! চিন্তা যে পিছু ছাড়ে না। বলি তুমি কতোটা শান্তিতে আছো নিশিকান্ত?
    নিশিকান্ত– আমি! দিনে চোখের পাতা এক করতে পারি না। ছবি সন্তানসম্ভবা। বাচ্চা না হওয়া পর্যন্ত টেনশন থাকবে। তবে তোমার সাথে দু’দণ্ড কথা বলে যেটুকু শান্তি পাই, তাই নিয়ে দিব্য আছি।কেমন ফুলে ফেঁপে গেছি দেখো।

    শশীভূষণ — ও ও, আমার ঘরটা কেমন ফুলে ফেঁপে উঠেছে ।

    নিশিকান্ত –মানে! ঘর আবার ফুলে ফেঁপে ওঠে নাকি ?

    শশীভূষণ- যত কাচরা সব এখন আমার ঘরে রাখে বৌমা। ট্রাঙ্ক, ব্যাগ ,পুরনো খাতা বই। পরত এর ওপর পরত জুতো। আগে এই ঘর আমার কাছে মন্দির ছিল।

    নিশিকান্ত– ও তাই বলো। আমরাই তো আবর্জনা, তা আমাদের ঘর কি করে মন্দির হবে?

    শশীভূষণ — ঐ ছেলে মেয়েটা গঙ্গার ধারে ঘুরঘুর করছে দেখছো তো। মনে হয় বসার জায়গা ঠিক যুত্সই হচ্ছে না।

    নিশিকান্ত– তাই হবে। গাছের তলায় সিমেন্টর বেঞ্চ তো পাখিদের টয়লেট করার জায়গা। কতো এ্যা লেগে আছে। সাদা হলুদ, কালো।
    আমরা বেশ ভালো বসার জায়গা পেয়েছি।

    শশীভূষণ– ওদের দেখে আমার যৌবনের উন্মাদনা ফিরে এল।

    নিশিকান্ত– মরণ দশা। তোমার ছেলের বয়সী।ভালো করে দেখো।

    শশীভূষণ– এই নিশিকান্ত ছেলেটার চুলের কাটিংটা রজতাভ’র মতো না! হ্যাঁ গো ও আমার ছেলে রজতাভ!

    নিশিকান্ত– দাঁড়াও ভালো করে দেখি। অন্ধকার তো..

    শশীভূষণ– হা হা হা। তোমার আমার আবার অন্ধকার। আমাদের জীবনে কখনও আলো ছিলো?
    নিশিকান্ত– হ্যাঁ ও রজতাভ, চলো আমরা উঠে যাই ওদের বসতে দিই। বকবকম্ করুক ওরা। ঐ দেখো ওরা এখানেই আসছে।

    শশীভূষণ– পুলিশের ভ্যান এখন এখানে কেন?দেখো নিশিকান্ত। আমার রজতাভ’র কোন বিপদ হবে না তো।

    নিশিকান্ত– মেয়েটার সাথে পুলিশ কি কথা বলছে। ওহ আচ্ছা, পুলিশ মেয়েটিকে ধরতে এসেছে। রজতাভ মেয়েটির সাথে আছে। বিপদ হলেও হতে পারে রজতাভ’র। কোথায় গেলে শশীভূষণ? শশীভূষণ…শশীভূষণ

    শশীভূষণ– ছেলেকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে গেছিলাম, পুলিশ চোখে ধাঁধা দেখছে এখন। দেখো, কেমন করে রজতাভকে খুঁজছে..

    নিশিকান্ত –তাই তো। কিন্তু রজতাভ কোথায়?

    শশীভূষণ– ঐ দেখো, গঙ্গার ঘাটে যে নৌকাটা বাঁধা আছে। ওই নৌকাতেই আছে রজতাভ আমার ছেলে।

    নিশিকান্ত — বাপ বাপই হয়। কি বলো। যে ছেলে তোমার গায়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারলো। সেই ছেলেকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচালে..

    শশীভূষণ –তুমি বা কম কিসে যাও। ছবি’ও তোমার সব সম্পত্তি নিয়ে তোমাকে ধাক্কা মেরে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছিল। এমন মেয়ের জন্য চিন্তাতে তোমার দুপুরে ঘুম আসে না। আসলে বাপ বাপই হয়।
    চলো নিশিকান্ত তাল গাছে চড়ে বসি, তা‌ না হলে থাকার জায়গা পাবো না, আজ সকালে চারটে বাবার আমাদের মতো ভয়ানক মৃত্যু হয়েছে।

    নিশিকান্ত– ওই বাপরাও কি আমাদের মতো ছেলেমেয়েদের জন্য ভাববে?
    শশীভূষণ– হ্যাঁ, হ্যাঁ‌ বাপ বাপই হয়।

  • অণু গল্প

    অণু গল্প- একাদশী

    একাদশী
    -রাখী চক্রবর্তী

     

     

    দীর্ঘ দশ বছর রোগে ভোগার পর দয়ানন্দ চৌধুরী মারা গেলেন। মৃত্যু কালে ওনার বয়স হয়েছিল পঁচাত্তর। একমাত্র সন্তান বিনয়বাবু বাবার শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ খুব ভালো ভাবেই করেছেন। কোনো ত্রুটি নেই।
    শ্রাদ্ধের দিন ও মৎস্যমুখীর দিন অনেক লোক খেয়েছে। এমনকি কুকুর বিড়ালরাও বাদ যায় নি। এই সব দেখে মানে বিনয়বাবুর পিতৃভক্তি দেখে
    সামনের বাড়ির অলোক বাবু আপশোস করে ওনার স্ত্রী দীপাকে বললেন আমার বাবার কাজে পাঁচটা ব্রাহ্মণ খাইয়ে দায় সারলাম। বিনয় দেখিয়ে দিল। কাকে বলে পিতৃভক্তি।
    দীপা বললো, খুব পিতৃভক্তি, দশ বছর ধরে দয়ানন্দ মেসোমশাই রোগে ভুগছিলেন একটা ডাক্তারও দেখায়নি তোমার বন্ধু বিনয়। না ওষুধপত্র, না ভালো পথ্য। কঙ্কালসার দেহ নিয়ে বিছানায় পড়ে ছিলেন মেসোমশাই। ভগবান মুক্তি দিলেন ওনাকে।
    মরার পর লোক দেখানো ভক্তি। আমরা বাবার জন্য অনেক করেছি। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে দু’ তিন ধরে লোক দেখানো লোক খাওয়াই নি। আর মাকেও যত্নে রেখেছি। যে মানুষটাকে বেঁচে থাকতে একটু ভালবাসা, একটু যত্ন, একটু খাবার দিতে পারল না- মৃত্যুর পর আদিখ্যেতা দেখানো।
    বড় ছবি, ফুলমালা। যেন বাবা অন্ত প্রাণ, এবার মাসীমার কি দূরগতি হয় দেখো। খাটিয়ে খাটিয়ে না শেষ করে দেয় মাসীমাকে। অসীমারও তো মা আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা বিনয়বাবু কেন প্রতিবাদ করেন না।
    অলোকবাবু- অশান্তির ভয়ে। এমন অনেক ছেলে আছে বৌকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে মা বাবার মূল্যটুকু হারিয়ে ফেলে। বিনয় হয়তো পরিবারে শান্তি বজায় রাখতে চায়।
    দীপা- বিনয়বাবুর মার আজ একাদশী। মাসীমাকে আমি ফল সাবু দিয়ে আসি।
    দীপা ফল সাবু নিয়ে বিনয়বাবুর বাড়িতে গেল।গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে শুনতে পেল বিনয়বাবুর স্ত্রী অসীমা বলছে, আজ একাদশী মা। একবারই খাবার খাবেন। জল খেতে পারেন। তাতে কোনও পাপ হবে না। তবে সাবুমাখা সেই রাতেই খাবেন।
    দীপা মাসীমার হাতে ফল সাবুর প্যাকেটটা দিয়ে বললো, খাবেন মাসীমা ।
    অসীমা ফলের প্যাকেটটা নিয়ে বললো, দীপা এ সব আবার কেন?
    বিনয়বাবু অসীমার দিকে তাকিয়ে ঘরে চলে গেলেন।
    একমাস পর অসীমার মা ব্যাগপটরা নিয়ে মেয়ের বাড়ি হাজির।
    জানিস তো অসীমা, বৌমা বড় জ্বালায়। আমি আর আধপেটা খেয়ে থাকতে পারবো না। এই বয়সে এতো পরিশ্রম করতে পারি না রে মা। আমি মরণ কাল পর্যন্ত তোর কাছেই থাকবো। মেয়ে কখনও খারাপ হয় না। ছেলে- ছেলের বৌ সব খারাপ হয়। বিনয় শাশুড়ির সব কথা শুনে অসীমাকে বললো, দাও বাজারের ব্যাগটা দাও।বাজার করে আনি। ওহ্ আর একটা কথা অসীমা, মনে আছে তো কাল কিন্তু একাদশী। ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে রেখেছো তো! দুটো লাল দাগ।
    বিনয়বাবু মুচকি হেসে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।

  • কবিতা

    কবিতা- ভোকাট্টা

    ভোকাট্টা
    -রাখী চক্রবর্তী

     

     

    রঙ্গমঞ্চে আলোর সারি
    চলছে যাত্রাপালা, নাটক
    সময়ের ফাঁকফোকড় দিয়ে
    নকল গেল বেরিয়ে
    আসল পড়ল আটক।
    ‌ মুখে রঙ মেখে সঙ সাজা
    বড্ড দামি আজ
    নীতি বাক্য পকেটে পুরে
    সাজি লোক দেখানো সাজ।
    বিবেক বুদ্ধি আছে সবার
    জানি সবই জানি,
    শিশমহলে থেকে তবু
    চপার আঘাত হানি।
    বিকলাঙ্গ সমাজের কাছে
    সত্যবাদীরা হয় বোঝা,
    মিথ্যাচারের রঙিন ফানুস
    ধরা অত হয় না সোজা।
    স্বর্গ মর্ত্য ত্রিভুবন
    দত্তাপহারীতে ভরা,
    নিজের ভুল সব না শুধরে
    শুধু অন্যের ভুল ধরা ।
    এ বলে আমি শুদ্ধ ও বলে আমি,
    যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা দেখে হাসেন অন্তরযামী।
    সিংহাসনে বসার জন্য বিসর্জন দিচ্ছি
    আচার নিষ্ঠা ভদ্রতা,
    মনের অলিন্দে যদি গজিয়ে উঠতো এতটুকু বিশ্বাস ও ভালবাসা
    তবে জীবন নামক ঘুড়িটা কখনোই হতো না ভোকাট্টা।

  • কবিতা

    কবিতা- সর্বজনীন

    “সর্বজনীন”
    – রাখী চক্রবর্তী

     

     

    উদ্যেশ্যে, লক্ষ্য বিন্দু যদি ঠিক থাকে,
    তবে তোমার স্বপ্ন সফল হবে।
    স্বপ্ন যদি জেগে দেখো
    তোমার বিবেক জাগ্রত হবে।
    যত শুদ্ধ আবেগ জমা করবে বিবেকের ঘরে
    তুমি ততই প্রস্ফুটিত হবে
    নতুন ছন্দে, নতুন ভাবে।
    আর তোমার ইচ্ছেগুলো জন্ম দেবে
    ভালভাবে বেঁচে থাকার তাগিদকে।
    বাস্তবের মুল্যায়ন শুরু করবে যখন
    নিষ্ঠা, সততা, ভালবাসার সুরক্ষা চক্রে বাধা পড়বে তোমার মন
    ঘৃণা, অহঙ্কার, মোহ
    ত্যাগ করতে করতে
    তুমি হয়ে উঠবে প্রকৃত মানুষ, সত্যিকারের মানুষ
    শ্রদ্ধা ভক্তিতে নত হবে তুমি বারবার।
    যা কিছু অশুভ শক্তি যা কিছু খারাপ, তোমার দৃষ্টির জৌলুসে হবে ছারখার।
    আজ নয়তো কাল তোমার অস্তিত্বে, তোমার আদর্শে পথ চলবে প্রেমময় এ বিশ্ব সংসার।

  • কবিতা

    কবিতা- জীবনের মানে

    জীবনের মানে
    – রাখী চক্রবর্তী

    জীবন মানে ঘুম চোখে দেখা
    প্রথম রবির কিরণ,
    জীবন মানে সকল স্বপ্ন
    করতে হবে পূরণ।

    জীবন মানে বিনি সুতোয় গাঁথা
    ‌‌হাজার সুখের মালা,
    জীবন মানে ঘুনধরা ভালবাসায়
    ‌ হিসাব দেওয়ার পালা।

    জীবন মানে মনুষ্যত্বহীন
    মানুষদের ভালবাসা,
    জীবন মানে প্রিয়জনদের
    কাছে পাওয়ার নেশা।

    জীবন মানে কাঁটাতারের
    ওপর দিয়ে চলা,
    জীবন মানে শুধু যৌবন না
    আছে বার্ধক্যের জ্বালা।

    জীবন মানে হাল ফ্যাশনে
    বেঁচে বর্তে থাকা,
    জীবন মানে আমার সোনার বাংলার
    রঙে রসে মজে থাকা।

You cannot copy content of this page