স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার
-
গল্প- অভি
অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার
অভি
-পায়েল সাহুরক্তিম, অভিনন্দা, অমৃতা, নীতা আর মৌলি কলেজ থেকেই অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। যেখানে থাকে সেখানেই একসঙ্গে, যা করে একসাথে পরামর্শ করেই।
রক্তিম আর নীতা একই অফিসে চাকরি করে এবং বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে পরবর্তীকালে। মৌলি কলেজে পড়ায়, অমৃতা গৃহবধূ আর অভি মানে অভিনন্দার পেশা ফটোগ্রাফি।অভি নিজেকে ছেলে হিসেবেই ভাবতে ভালোবাসে, তার সাজপোশাক চেহারা সবটুকুই ছেলেদের মতো, এমনকি গলার স্বর অব্দি। তাই অচেনা কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে সে নিজের “অভি” নামটা বলতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে। শুধু মনে নয়, কলেজে পড়ার সময় থেকেই সে বেশ বুঝতে পারে আর পাঁচটা মেয়ের মতো মানসিকতা তার নয়, ছেলেদের প্রতি সে কোনো আকর্ষণ বোধ করেনা বরং মেয়েদের তার ভালো লাগে বেশি, মেয়েলি শরীরের খাঁজ-ভাজ তাকে টানে, অসম্ভব আকর্ষণ বোধ করে, যদিও মনে মনে এসব ভাবলেও নিজের বন্ধু-বান্ধবীদের কাছে কখনোই বলে উঠতে পারেনি, কিছুটা লজ্জায়, কিছুটা নিজের অস্তিত্ব সংকটে সমস্যায়।
ফোটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার পর আচমকাই মডেল হিসেবে তার কাছে উপস্থিত হয় রিয়া , নিজের পোর্টফোলিও বানানোর উদ্দেশ্যে। রূপসী রিয়াকে দেখে নিজেকে হারিয়ে ফেলে অভি (অভিনন্দা)। দিনের পর দিন বিভিন্ন জায়গায় ফোটোশুট করতে করতে অদ্ভুত একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয় দুজনের। প্রেমিক থাকলেও অভির আবেদন, অভির আন্তরিক ব্যবহার মুগ্ধ করে রিয়াকে। অভি ভীষণ ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে রিয়ার কাছে।
ফটোশুট চলাকালীন পোশাক পরিবর্তনের সময় হঠাৎই নিজেকে উন্মুক্ত করে অভির কাছে নিজেকে সম্পূর্ণরুপে মেলে ধরে রিয়া। কোনোরকম ক্ষতির সম্ভবনা না থাকায় দিনের পর দিন রিয়া শারীরিক ভাবে মিলিত হতে থাকে অভির সঙ্গে। আর অভিও ভেসে যায় আনন্দের সাগরে।
ধীরে ধীরে অভির চেষ্টায় রিয়া একজন নামকরা মডেল হয়ে ওঠে। কিন্তু এসবের মাঝে প্রায় বছরখানেক অভি সম্পূর্ণরুপে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল নিজের প্রাণের বান্ধবীদের কাছ থেকে। যদিও এই সম্পর্ক, অভিনন্দার নিজের নতুন পরিচয় তার মা বাবা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি, সম্পূর্ণ রুপে সম্পর্ক ছিন্ন করেন তার সঙ্গে।
এই সময় হঠাৎ একদিন অমৃতার ছেলের অন্নপ্রাশনের নিমন্ত্রণ পায় অভি। অনুষ্ঠানের দিন সে পৌঁছে যায় তার আদরের রিয়াকে সঙ্গে নিয়েই। যথারীতি বন্ধুরা সকলে অবাক হলেও সকলে হাসিমুখে মেনে নেয় তাদের অভির প্ৰিয় মানুষটিকে। বন্ধুদের সঙ্গে আবার নতুন করে যোগাযোগে সবার দিনগুলো হৈহৈ করে কাটতে থাকে।
কিন্তু জীবন রং পাল্টায় প্রতি মুহূর্তে। সোজা সরল ভাবে সে চলতে শেখেনি। রক্তিম আর নীতার বৈবাহিক কলহ ভীষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে বন্ধুদের মধ্যে এবং ধীরে ধীরে সেটা এগোতে থাকে বিবাহ বিচ্ছেদের দিকে। নিজের সন্তানের কথাও আর ভাবতে চায়না রক্তিম।অভি ভীষণ ভাবে চেষ্টা করে ওদের সম্পর্কটা জোড়া দিতে কিন্তু রক্তিম ট্রান্সফার নিয়ে নেয় অন্য রাজ্যে এবং সবার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই সময়গুলোতে অভি তার এককালের প্ৰিয় বান্ধবীকে যথাসম্ভব সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করে, খুশী রাখার চেষ্টা করে।
ঠিক এই সময় রিয়া ধীরে ধীরে প্রফেশনাল ব্যস্ততা দেখিয়ে দূরত্ব বাড়াতে থাকে অভির সঙ্গে এবং তাকে দেখা যেতে থাকে মডেলিং এর বিভিন্ন আসরে তার পুরোনো প্রেমিকের সঙ্গে। দিশাহারা অভির ফোনটুকুও তোলার সময় হয়না রিয়ার, বরং ঘটা করে ফেসবুকে পোস্ট হয় রিয়া এবং তার প্রেমিকের বিয়ের এনগেজমেন্টের খবর। দুই দিশাহারা, হতাশাগ্রস্ত বান্ধবী নীতা এবং অভি (অভিনন্দা) আঁকড়ে ধরে নিজেদের। একজন স্বামীহারা, আর একজন? সঠিক সংজ্ঞা হয়তো নেই, ছিলোনা কোনোদিনই, তবে এই কথাটুকু স্পষ্ট হয়ে যায় রিয়া নিজের শরীর দিয়ে অভির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে জীবনে।
পাঁচ বছর কেটে গেছে। রক্তিম আর ফিরে আসেনি, কোনো যোগাযোগ রাখেনি নীতার সঙ্গে, বদলে অভি বুক দিয়ে আগলে রেখেছে নীতা এবং তার সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে মিলিকে। হ্যাঁ পরিচয় অবশ্যই আছে তাদের, অভি নীতার বড়ো দাদা আর মিলির ভালো মামু।
-
কবিতা- মাত্র কয়েক পা
অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার’
মাত্র কয়েক পা
–অমল বিশ্বাস ( বাংলাদেশ)দক্ষিণে গেলে
চলে এলে নির্মল হাওয়া খেয়ে
বাঁচবে বলে।অথচ আজও উত্তরে গেলে না
মাত্র কয়েক পা।মাটি কিংবা বাপ-দাদাকে শোয়ানো চিতা
যেখানে তোমার শরিকানা
দলিল লাগবে না।যাও চিনে এসো, মাত্র কয়েক পা।
-
কবিতা- কর্নওয়ালিসের সাড়ে তিন হাত
।। অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
কর্নওয়ালিসের সাড়ে তিন হাত
-অসীম দাসভুলে যাওয়ার দুরূহ প্রচেষ্টাতে
এক ক্ষেত পরাগের মিলমিশ ,
সাড়ে তিন হাত সবুজ স্মৃতি হতে পারে !
সাতে পাঁচে নেই বললেও —
মুক্ত ছয়-এর অনর্গল টান ,
আঙুলের ফাঁক গলে কখন অজান্তে
নিয়ে যায় চলমান নাব্য মিছিলে ।
সাবধানী হিসেবের গন্ডি ভেঙে
সামান্য চক-খড়ি ,
স্বর্ণলঙ্কার দাহ্য-চিত্র আঁকে !স্বার্থপরতার পরতে পরতে জমে আছে
নিরন্ধ্র অন্ধের বিন্দু বিন্দু নির্জনতা ।
উদাত্ত সমুদ্রের বর্ণাঢ্য ঢেউ- এ
ভেসে যেতে পারে স্বেচ্ছাবহ গুহ্য খোলস ।
কোনও দিন মুখ দেখব না-র প্রতিজ্ঞা ফু- এ ,
হঠাৎই শবনম ভোরে বেজে ওঠে
প্রেমিক অর্ফিয়াসের মিলনের বাঁশি ।আসলে , ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ এই শব্দবন্ধ শুঁকে
একদিন যে আর বেতো ঘোড়াও হাসবে না ,
ধুরন্ধর প্রশাসক কর্নওয়ালিস জানত না । -
প্রবন্ধ- মায়ের আঁচল
অমরনাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার
প্রবন্ধ- মায়ের আঁচল
-সুমিতা দাশগুপ্তবাংলায় একটা কথা আছে “বন্যেরা বনে সুন্দর , শিশুরা মাতৃক্রোড়ে” । কোনও সন্দেহ নেই জগতের সমস্ত শিশুদের জন্যই এই কথাটি ধ্রুব সত্য। মানবশিশুর জন্য আরও একটি পরম ভরসাস্থল ধ্রুবতারার মতো চিরসত্য হয়ে বিরাজ করে , সেটি হলো মায়ের আঁচল।
এই জগতে মায়ের আঁচলের তুল্য আর আছেটা কী? ছেলেবেলায় স্নানের পর ভেজা চুল , খেলার মাঠ ফেরত ঘামে ভেজা মুখ,
অঙ্কের খাতায় কম নম্বর পাওয়ার চোখের জল , বাড়িতে আসা অচেনা অতিথির সামনে থেকে আড়াল খোঁজা , এইসব কিছুর জন্য , মায়ের আঁচলই তো চিরকাল শিশুদের একমাত্র ভরসাস্থল।
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তাঁর “ছেলেবেলা”র
স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন সন্ধ্যাবেলায় গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে লম্বা অন্ধকার বারান্দা দিয়ে ”ভূতের ভয় শিরদাঁড়ার উপর চাপিয়ে চলে যেতুম মায়ের ঘরে”…., সেই মায়ের আঁচলের ভরসায়।
কালের নিয়মে বয়স বাড়ে। শিশু থেকে বালক, বালক থেকে কিশোর , তরুণ ,যুবক — ক্রমশ সে স্বাবলম্বী মানুষ , পা বাড়ায় মুক্ত জীবনের পথে। তখন তার আর ঠিক সেইভাবে মায়ের আঁচলের দরকার পড়ে না , আঁচলের আওতা ছেড়ে বহির্বিশ্বে পা রাখার জন্য সে উদগ্রীব।
” রইবো না আর বদ্ধঘরে দেখবো এবার জগতটাকে , কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে” —প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পক্ষে সেটাই তো স্বাভাবিক। মা-ও, সন্তানকে এগিয়ে দেন জীবনের যাত্রাপথে।
মায়ের আঁচলের ছায়া , কিছুটা নেপথ্যে রেখে তখন সে জীবন পথের পথিক।
পথ হাঁটতে হাঁটতে ক্রমে বেলা বাড়ে । অপরাহ্ণের আলো এসে পড়ে গায়ে মাথায়।জীবনের অতিবাহিত কাল ক্রমশ পিছে সরে সরে যায়। সংসারের নিত্য দিনের টানাপোড়েনে মায়ের ছায়া আবার মাঝে মাঝে মানসপটে উঁকি দিয়ে যায়, হয়তো বা সেদিন সে রৌদ্রদগ্ধ মানুষের মতোই ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত , কখনও বা অকূল পাথারে দিশাহারা । মনখারাপের দিনে যেদিন সে নিজের সঙ্গে নিজে একেবারে একা ,খুব ইচ্ছে যায় মায়ের আঁচলের তলায় স্নিগ্ধ শীতল পাটির স্নিগ্ধ আশ্রয়টুকু আরও একবার ফিরে পেতে। মধ্যরাতের একা বিনিদ্র শয্যায় , নিভৃতে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দু মুছতে মায়ের অদৃশ্য আঁচলখানিই যে তখন একমাত্র সম্বল। পৃথিবীর সমস্ত আলো নির্বাপিত হলেও, মায়ের স্নেহপরশটুকু আঁধার ঘরের প্রদীপ হয়ে জ্বলতে থাকে , জ্বলতেই থাকে অনির্বাণ শিখায়। -
কবিতা- চড়ুই পাখি
অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার
চড়ুই পাখি
–বিভূতি ভূষন বিশ্বাসফুরুত ফুরুত ওড়ে,চড়ুই তো নাম,
বসত বাড়ির ঘুলঘুলিতেই ধাম ।
ওরা ঘুরে বেড়ায় উঠোনেরই ধারে,
তাই দেখে বিড়াল,ল্যাজটা শুধু নাড়ে।
কিচিরমিচির করে,বলছে বলো কী,
সুখ দুক্ষের কথা,না কলহ বিবাদি।
সন্ধ্যা বেলায় করছে নাকি সন্ধ্যারতি,
না শয্যাগৃহ নিয়ে,করছে মারামারি ।আপন মনে আমি,ভাবছি কত কথা,
চলছে যে এদের বড়ই দুরবস্থা ।
ধীরে ধীরে হচ্ছে এরা সবাই বিলুপ্ত,
এদের দুর্দশায় কে হবে অনুতপ্ত ।
মানব জাতিই ভাববে এদের কথা,
সংরক্ষণের জন্য হবে যে সুব্যবস্থা । -
গল্প- ধৃতরাষ্ট্রের গল্প
অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার
ধৃতরাষ্ট্রের গল্প
-সুনির্মল বসুপ্রায় প্রতিদিন এই সময়ে অর্থাৎ সন্ধ্যার অন্ধকার মাটির পৃথিবী কে স্পর্শ করবার আগেই সূর্যকান্ত বাবু বাড়িতে ফিরে আসেন। আজ বছর সাতেক হল, তিনি কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন।
কর্মজীবনে একটা বেসরকারি কারখানার কনিষ্ঠ কেরানি ছিলেন তিনি। এতোকাল অনেক কষ্টের মধ্যেই এত বড় সংসারটা চালিয়ে এসেছেন। তখন তাঁর সামান্য হাতেগোনা আয়। এরইমধ্যে বড় ছেলে শুভব্রতকে এম কম পর্যন্ত পড়িয়েছেন। মেজো ছেলে সুব্রত বিএসসি পর্যন্ত পড়েছে।ছোট ছেলে সুদীপ্ত হায়ার সেকেন্ডারি পর্যন্ত পড়ে পড়াশুনা ইস্তফা দিয়ে ইদানিং নাট্যচর্চা ও অভিনয়ে মেতে উঠেছে।
শুভব্রত এখন একটা ব্যাংকে ম্যানেজার হয়েছে। সুব্রত চাকরি করছে রাজ্যের সেচ দপ্তরে। একমাত্র মেয়ে তিতলির বিয়ে হয়েছে একজন স্কুল শিক্ষকের
সঙ্গে। এখন সূর্যকান্ত বাবুর যা কিছু চিন্তা, তা ঐ ছোট ছেলে সুদীপ্তকে নিয়েই। সুদীপ্ত আজ পর্যন্ত একটা চাকরি জোগাড় করতে পারেনি। ছোট ছেলে সুদীপ্তকে নিয়ে ভাবনাটা প্রায় দিন রাতেই তাকে যেন কুরে কুরে খায়। গিন্নী মনীষা দেবী আজ প্রায় দশ বছর হল গত হয়েছেন। তা না হলে, ওরা দুজনেই এই দুশ্চিন্তার অংশীদার হতে পারতেন। তা যখন হবার নয়, তখন এই ভাবনা এখন সূর্যকান্ত বাবুর একার উপরেই ন্যস্ত।
এসব কথা ভাবতে ভাবতেই তিনি সামনের হাতল ভাঙ্গা চেয়ারটিতে বসে পড়লেন। এখন সন্ধ্যের গাঢ় অন্ধকার ঘরে বাইরে জায়গা বিছিয়েছে। আজকাল চোখে ভালো দেখতে পান না তিনি। আই স্পেশালিস্ট তাকে পরামর্শ দিয়েছেন, চশমার পাওয়ারটা বেশ খানিকটা বাড়ানো দরকার। তিনি বড় বউ অনামিকা এবং মেজ ছেলে সুব্রতকে সে কথা জানিয়েও ছিলেন।কিন্তু ওরা মুখের ওপর নেতিবাচক উত্তর না করলেও, এক ধরনের পাশ কাটানো ভাব দেখিয়ে সরে গেছে। আর,বড় ছেলে শুভব্রত অফিস নিয়ে এতই ব্যস্ত যে, রাতে বাড়ি ফিরলে তার সঙ্গে কথা বলা একটা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আজকাল চোখের জন্য বড্ড কষ্ট পাচ্ছেন সূর্যকান্তবাবু। তাই যেখানেই যান , সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরে আসবার চেষ্টা করেন। তাদের এই সার্পেন্টাইন লেনের এই গলিটায় সবসময়ই ব্যস্ততম গাড়ির যাতায়াত। তাই সূর্যকান্ত বাবুর মাঝে মাঝে ভয় হয়, একে চোখে ভালো দেখতে পান না, এভাবেই কোনদিন গাড়ির তলায় বেঘোরে প্রাণ টা আবার যাবে নাতো। তবু কি আর করা যাবে। ইদানিং সূর্যকান্ত বাবু বেশ বুঝতে পারছেন, এ সংসারের পক্ষে তিনি এক প্রয়োজন শূণ্য বাতিল মানুষ। যে সংসারের জন্য তিনি আর মনীষা দেবী
একদিন জীবনপাত করেছিলেন, সেই সংসারে কেউ আর তাঁকে চায়না।
এই কথাটা মনে আসতেই, সূর্যকান্ত বাবু অতীত চারী হলেন।তখন কারখানায় হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর, প্রতিদিন সংসারটা ভালো চলবে ,ছেলেমেয়েকে বড় করতে হবে, মানুষ করতে হবে ,এই ভেবে দু বাড়ি টিউশনি করে রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরতেন। মনীষা দেবী অনুযোগ করতেন, তুমি যে এমন করে খাটাখাটুনি করছো, তোমার যদি একবার শরীরটা ভেঙে পড়ে তখন কি হবে,
সূর্যকান্ত বাবু তখন বলতেন, দাঁড়াও, আমার শুভ সুব্রত একবার মানুষ হোক, তখন আমাদের আর কষ্ট কি,
আজ বিজ্ঞাপনে দেখা সুখী পরিবারের মতো তাঁর সাজানো সংসার। মনীষাদেবী মারা গেলেন। ঘরে দুটি নতুন বৌ এলো। বড় বউ অনামিকা, আর মেজ বউ ঝুমুর।
এরপর থেকেই ছেলে দুটির সঙ্গে যেন তাঁর এক অদৃশ্য দেয়াল রচিত হয়ে গেছে। ছোট ছেলে সুদীপ্ত বেকার। তাই হয়তো মাঝে-মাঝে বাপের একটু আধটু খবর নেয়।
সূর্যকান্ত বাবু ভাবেন, আজকাল সকালের চা জলখাবার পেতে পেতে তাঁর সকাল সাড়ে দশটা বেজে যায়। চাকরি জীবনে তাঁর অফিসের বেহারা হরিপদ তাঁকে ঠিক দুপুর তিনটের মধ্যে টেবিলে চা দিয়ে যেত। ছুটির দিনে মনীষাও এ কাজে কখনো ভুল করেনি।আর এখন সন্ধ্যে প্রায় সাড়ে সাতটা। চা খাওয়ার কথাটা, একবারও কেউ জিজ্ঞাসা করতে এলো না। ছেলে বউরা এখন টিভি দেখায় ব্যস্ত। তাই সংসারের এই অপ্রয়োজনীয় বুড়ো মানুষটার কথা হয়তো কারো মনে নেই। আগে আগে এসব ঘটনায় তিনি কষ্ট পেতেন। এখন আর বড় একটা মনে করেন না। মনে করলে, বাঁচা যায় না।মনে মনে ভাবেন, যে কদিন আছি ,যেমন তেমন করে কাটিয়ে দিতে পারলেই হলো, ওরা ভাল থাক, ওরা সুখে থাক, তাহলেই তাঁর সুখ। শুধু ছোট ছেলে সুদীপ্তর একটা চাকরি বাকরি হয়ে গেলে, তিনি নিশ্চিন্তে মরতে পারেন।
অবশেষে সূর্যকান্ত বাবু ভাবলেন,আজ শুভ আর সুব্রত কে একটু সুদীপ্তটাকে কোথাও কোনো কাজে কাজে ঢুকিয়ে দেবার জন্য চেষ্টা করতে বলবেন।
সূর্যকান্ত বাবুর ভাবনার মাঝখানে হঠাৎ ছেদ পড়ল। মেজ বউ ঝুমুর তাঁর ঘরে ঢুকে বেশ ঝাঁঝিয়ে বলল,
আপনাকে কতদিন বলেছি, বিকেলে বেড়াতে যাবার সময় থলেটা নিয়ে কিছু বাজার করে আনবেন।জানেন, আপনার ছেলেরা দারুণ ব্যস্ত ,আর আপনার ছোট ছেলে তো নাটক করে শিশির ভাদুড়ী, নাকি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় হতে চলেছে।
সূর্যকান্ত বাবু আমতা আমতা করে বললেন, গতকাল সকালে যে বাজার করে আনলুম।
ঝুমুর বলল, ওই বাজারে কি রাবণের গুষ্ঠির খাওয়া হয়।
সূর্যকান্ত বাবু আর কথা বাড়ান নি।
খানিক বাদেই সুদীপ্ত ঘরে ফিরল। বলল, ঠিক আছো তো বাবা,
কোথায় থাকিস আজকাল, কি করিস,
নাটক নিয়ে মেতে আছি বাবা,
কোন্ বই করবি তোরা,
মাইথোলজিক্যাল নাটক,
এরপর খানিকটা আবেগের সঙ্গে সুদীপ্ত বলে, জানো বাবা, আমি ধৃতরাষ্ট্রের রোলটা করছি, ডাইরেক্টর জহর দা বলেছেন, আমাকে নাকি এই রোলটায় ভালো মানাবে।
সূর্যকান্ত বাবু নীরব থাকেন।
খানিকবাদে তিনি গুটিগুটি পায়ে বড় ছেলে শুভব্রতর র ঘরে গেলেন। এই ঘরটা বড় সৌখিন করে সাজানো। ভাবলেন, বড় বৌমা অনামিকার রুচি আছে। বড় বাড়ির মেয়ে তো। সূর্যকান্তের মন প্রশান্তিতে ভরে গেল। সত্যি, আজ কতদিন বাদে বড় ছেলের এত কাছাকাছি এলেন তিনি।
তাঁর মনে পড়ল,একবার ছোটবেলায় শুভ বাজার থেকে নতুন কেনা গামছাটা বাপের কোলে চড়ে আসবার সময় রেললাইনে ধারে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছিল। পরে সূর্যকান্ত আর তা ফিরে পাননি।
বাবাকে ঘরে ঢুকতে দেখে, শুভব্রত ইঙ্গিত পূর্ণ দৃষ্টিতে স্ত্রী অনামিকার দিকে তাকালো।
সূর্যকান্ত বাবু বললেন, দ্যাখ্ শুভ, অনেকদিন ধরে তোকে একটা কথা বলবো মনে করছি।সুদীপ্তর তো পড়াশোনা হল না, তাই যদি তুই তোর অফিসে ওকে একটু চেষ্টা চরিত্র করে ঢুকিয়ে দিতিস্।
শুভব্রত একথা শুনে তেতে উঠলো। বলল, চাকরি কি ছেলের হাতের মোয়া,তাছাড়া থার্ড ডিভিশন এর হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করা ছেলের এখন বেয়ারার চাকরি পাওয়াটাও সহজ ব্যাপার
নয়। আমি কি করতে পারি।
সূর্যকান্ত বাবুর নিজের ঘরে ফিরে এলেন।
পরদিন সকালে সুদীপ্ত এসে বলল, জানো বাবা, এবার আমরা লখনৌতে একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতায় কমপিট করতে যাচ্ছি।
সে বুঝলাম, কিন্তু একটা চাকরি বাকরি যোগাড় কর, ভবিষ্যতে কি করে খাবি তুই,
দ্যাখো না, নাটক নিয়ে আমরা ভবিষ্যতে কি করি,
সূর্যকান্ত বাবু ছোট ছেলেকে নিয়ে চিন্তা মুক্ত হতে পারছেন না।
সেদিন সন্ধ্যায় তিনি মেজো ছেলে সুব্রতর ঘরে গেলেন। সুদীপ্তর চাকরির ব্যাপারে কিছু করা যায় কিনা। সুব্রত বলল, আমি যেখানে বড় পোস্টে চাকরি করি,সেখানে ওকে ফোর্থ ক্লাস স্টাফ হিসেবে বসাই কি করে, তুমি এমন অবান্তর কথা বলো না।
মেজ বউ ঝুমুর বলল, এই সবে কাজ থেকে ফিরল, সারাদিন পর খেটেখুটে এসেছে, আপনি এখন ওকে এসব না বললেই পারতেন।
সূর্যকান্ত বাবু বেরিয়ে এলেন। নিজের বোকামির জন্য, তিনি যেন নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না।
সংসারের কাজ তিনিও তো কম করেন না। শুভব্রত ছেলে, তাঁর নাতি বুম্বা আর সুব্রতর মেয়ে টুকুনকে স্কুলে দিতে ও আনতে যান। বাজার করেন। বয়সের কারণে যদি ভুলেও যান, মনে করিয়ে দিলে, তা এনে দিয়ে থাকেন।
আসলে, সূর্যকান্ত বাবু সম্প্রতি বড় বেশি টের পাচ্ছেন, তার অস্তিত্ব টাকে ছেলে, ছেলে বউরা আর মোটেই স্বীকার করতে চাইছে না। এ সংসারে তিনি এখন যেন ডানা ভাঙ্গা জটায়ু।
সূর্যকান্ত বাবু এখন নিজের ঘরে ফিরে আসেন।বাইরে সুদীপ্তদের নাটকের ক্লাব থেকে সুদীপ্তর জোরালো অভিনয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। সুদীপ্ত এখন ধৃতরাষ্ট্রের সংলাপ আওড়াচ্ছে।
অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের বলছেন, যখন অধর্মের স্রোতে মেতেছে কুরু পুত্রগণ, তখন ধর্মের সাথে সন্ধি করা মিছে, পাপের দুয়ারে পাপ সহায় মাগিছে।
ডাইরেক্টর জহর মুখুজ্জে বললেন, ভালো হচ্ছে সুদীপ্ত, তুই শুধু একটু আপে তুলে বলে যা।
সুদীপ্ত আবার বলে চলে।
সূর্যকান্ত বাবু ভাবেন, সুদীপ্ত এখন কোন্ ধৃতরাষ্ট্রের কথা বলছে, তারপর সহসাই সূর্যকান্ত বাবুর মনে হয়, তিনিও সার্পেন্টাইন লেনের এক অন্ধ ক্ষমতাহীন ধৃতরাষ্ট্র। আজ তামাম কলকাতা, তথা তামাম পশ্চিম বাংলা, এমনকি সারা ভারত নাকি সারা পৃথিবী জুড়ে ধৃতরাষ্ট্রের সংখ্যা কেবল বেড়ে চলেছে।
একদিন বহু আশায় বহুকষ্টে বহু রক্তের বিনিময়ে তারা যাদের বড় করে পালন পোষণ করে এসেছেন, যাদের জন্য স্বপ্ন বয়ে বেড়িয়েছেন সারা জীবন,আজ তারাই তাঁকে বাতিল বলে উপেক্ষার অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।
নাতি বুম্বা সহসা ডাকলো, দাদু, খেতে এসো। মা খেতে ডাকছে।
সূর্যকান্ত কেমন যেন ঘোরের মধ্যে অসংলগ্ন ভাবে মনে মনে বলে উঠলেন, আমি একালের ধৃতরাষ্ট্র। তাই দুর্যোধনদের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করতে পারিনা।
সেই রাতে সংসারের এই বাতিল মানুষটি কখন যেন গভীর রাতে অন্য লোকে পাড়ি জমালেন। -
গল্প- “শূন্যতার করাল গ্রাসে”
অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার
“শূন্যতার করাল গ্রাসে”
-সুমিতা পয়ড়্যাহিরুবাবু মোটা মাইনের চাকরি করেন। ভরপুর সংসার। বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে আনন্দের ধরাধাম।কারুর নজর লেগেছিল কিনা জানা নেই।তাই ছেলে মেয়ে বড় হতে তাদের ভর্তি করা হলো কোনো এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় এক। হিরুবাবুর বাবা ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ডের কোন এক স্কুলে শিক্ষক ছিলেন। তিনি বলেই বসলেন, আমরা বাঙালি ;ছেলে মেয়ে মাতৃভাষায় বড় হবে এটাই গর্বের। পিতার মুখের উপর কথা বলবে এমন সাধ কোনকালেই ছিল না।
তাই হল। পিতৃদেবের আজ্ঞা শিরোধার্য। হিরুবাবু ছেলে মেয়েকে নিয়ে বাবার কাছে চলে এলেন। ছেলে মেয়েকে বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি করানো হলো কিন্তু তাদের থাকতে হলো ঠাকুমা দাদু কাকু কাকিমার কাছে। হিরুবাবু ফিরে গেলেন। কিন্তু অত ছোট ছোট ছেলে মেয়ে বাবা মাকে ছেড়ে দাদু ঠাকুমার কাছে থাকা- এ যেন কোন এক অচেনা অজানা দ্বীপে পাড়ি দেওয়া। হিরু বাবু কিছু বলছেন না তো তাদের মায়ের কান্না দূর অস্ত।ছেলে অভ্র আর মেয়ে অনিমা ভর্তি হল স্কুলে। যথারীতি পড়াশোনা করতে করতে এক বছর পার হলো । বাবা মায়ের আদরের ছেলে-মেয়ে আজ ঠাকুমা দাদু কাকা কাকুর অনুগত। উনারা যা বলেন তাই শুনতে হয়। তার ফলে অভ্র খানিকটা মানিয়ে নিলেও অনিমা সারাক্ষণ মন খারাপ করে আর মায়ের জন্য কাঁদতে থাকে। যারপরনাই পরের বছরই অনিমা আবার বাবা-মার কাছে ফেরত চলে যায়। অভ্রকেও যেতে বললে সে আর গেল না। অভিমান থেকে সে বলেই বসলো—তোমরা কি শুরু করেছ! একবার এখানে, একবার ওখানে, আমি কোথাও যাবো না। এখানেই থাকবো। অভ্র তখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। অনেক দুঃখ- ক্ষোভ-বেদনা নিয়ে তার পথ চলা শুরু হয়। কাউকে কোনো কথা বলত না । নীরবে সব কাজ সম্পন্ন করে যেত।ঠাকুরমা অভ্র কে অবশ্য খুব ভালোবাসতো। আর ভালোবাসত তার বন্ধুরা।কারণ বন্ধুদের কাছে অভ্রর কোনো না নেই।সব কর্মকাণ্ডে অভ্র সঙ্গী। একমাত্র ঠাকুরমাই অভ্র নাএলে খেত না, দুজনে একসঙ্গে গল্প করতো। এই ভাবেই চলছিল অভ্রর বড় হওয়া। হিরো বাবু মাসে মাসে মোটা অংকের টাকা বাবার হাতে তুলে দিতেন। কোনদিন হিসেবে নেন নি কিংবা জিজ্ঞাসা করেননি। ওদিকে হীরু বাবুর বাবা মানে অভ্রর ঠাকুরদা ঐ মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে শুধু জমি আর জমি কিনতে লাগলেন।
এরপর অভ্র পড়া শেষ করে বিটেক, এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করে। চেষ্টা করে চাকরিও পায়।
কিন্তু যে অনুপাতে তার পড়াশোনা ভালো করা উচিত ছিল তা পারেনি। কাকু কাকিমার গঞ্জনা, দাদুর বকুনি সব মিলেমিশে এক নৈরাশ্যের রাজ্যে বিরাজ করতো।
দিন যায় রাত যায়। এমনই এক দিনে হিরুবাবুর বাবা মারা যান।তখনও অভ্র ঠাকুরমার সাথে।অবশেষে হিরুবাবুর চাকরি জীবনের অবসান ঘটে। তখন ছেলের কাছে তারা চলে আসে। সেখানেই জায়গা কিনে বাড়িঘর করেন। বেশ চলছিল এইভাবে।
অভ্রর মা বেশ রাজরানী হয়ে ছিলেন। কোনদিন হিসেব-নিকেশ এর মধ্যে যাননি। খরচ করতে করতে একসময় টাকা শেষ হতে থাকে। তবুও তারমধ্যে মেয়ের বিয়ে ছেলের বিয়ে সব তিনিই দেন। ছেলে চাকরি পেলেও মোটা মাইনের চাকরি ছিল না। তাই তার পক্ষে খুব বেশি খরচ করা সম্ভব ছিল না।হিরু বাবুই ছেলের বিয়ে দিলেন।
অভ্রর বিয়ের পরে সংসারের নিত্যনৈমিত্তিক অশান্তি লেগেই থাকত। সেই অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে অভ্রর মা একদিন বলেই বসলেন, আলাদা থাক, শান্তিতে থাক।
যেই বলা সেই কাজ। অভ্র তার স্ত্রীকে নিয়ে চলে গেল এবং আলাদা থাকতে শুরু করলো। যথারীতি বাবা মায়ের প্রতি তার দায়বদ্ধতা কমে গেল। স্ত্রীকে নিয়ে সুখের ঘরে আড়ম্বরের, পরিপাট্যের ঝাঁ-চকচকে জীবনে অভ্যস্ত হলো। নিজের ছেলে হল।অন্নপ্রাশন থেকে পড়াশোনা কোনো কার্পণ্য নেই অভ্রর।স্ত্রীর সমস্ত চাহিদা পূরণ,স্বপ্ন পূরণ সবটাতেই অভ্রর কমিটমেন্ট ভরপুর।অথচ বাবা-মা-বোন এদের থেকে দূরে বহুদূরে সরে গেল। একবারের জন্যেও ফিরে তাকায় নি। অভ্রর পরিবর্তন লোকচক্ষুর আড়াল হল না। তবুও সে নির্বিকার।এদিকে হিরুবাবুর জমানো টাকা ক্রমশ শেষ হতে হতে তলানীতে ঠেকলো। কিন্তু কাউকে কিছু বলার নেই। ছেলেকেও না।
যেহেতু ছেলে ছোট থেকে বাইরে মানুষ হয়েছে তাই বাবা মায়ের প্রতি তার এমনিতেই অসন্তোষ ছিল। আর বিয়ের পরে আলাদা হয়ে আরো পাষাণ হয়ে গেল। ভুলেই গেল যে বাবা-মা তার আপনজন।
যথারীতি হিরুবাবু চিন্তা মগ্ন হয়ে পড়লেন। যখন চাকরি করতেন তখন বেশিরভাগ টাকাটাই বাবার হাতে তুলে দিতেন। তখন এত চিন্তা ভাবনা করেন নি। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে হিরুবাবু দেখতে পান কিছু জমি ছাড়া তার আর কিছু নেই। প্রায় সবটাই ছোট ভাইয়ের দখলে। হিরুবাবু এমনই এক মানুষ যিনি কখনো কারো সঙ্গে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হন নি। তার এই উদারচিত্ত আজ তাকে চিন্তায় ফেলেছে।চিন্তা করতে করতে অবসাদগ্রস্ত জীবনে চলে গেলেন। যেটুকু ছিল সেটুকু দিয়েই কোনরকমে চলছিল, আর মেয়ে এসে খানিকটা সামাল দিয়েছিল।
তবুও দিনে দিনে তিনি এক বিরাট শূন্য গহবরে তলিয়ে যেতে থাকলেন। যেখান থেকে মানুষ আর মানুষের মত ফিরে আসতে পারে না। নানা রোগে আক্রান্ত হলেন। ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তার আর কোন উপায় রইল না। শেষে ডাক্তারও জবাব দিলেন। আর কিছু করার নেই। যে কদিন বাঁচবেন এমনই বাঁচবেন।এমন শূন্যতার দ্বীপে পৌঁছে গেলেন যেখানে মানুষ হয়েও, এতকিছু করার পরও সবকিছুই শূণ্য।
পরে ছেলে বড় চাকরী করলেও বাবা-মাকে আর কাছে টেনে নেয় নি। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে সেদিন বলেনি, আমি আছি চিন্তা কিসের! কিছুটা ভরসার হাত বাড়ালে হয়তোবা এত শুন্যতা আসতো না। জীবন এতটা অন্ধকারময় হোত না।———
-
কবিতা- বড় একা লাগে
।। অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
বড় একা লাগে
-সোহিনী সামন্তবড় একা লাগে…
হ্যাঁ, হ্যাঁ বড় একা লাগে…
যখন সেই চেনা
পাখি আর আসে না,
কিচিরমিচির করে ভুবন ভরিয়ে তোলে না,
তখন বড় একা লাগে…
যখন পরিচিত মানুষ অনেক দূরে চলে যায়, চাইলেও আর তার দেখা পাওয়া যায় না…
তখন বড় একা লাগে…
যখন বন্ধুত্বের অটুট বন্ধন ভেঙে যায়,
চাইলেও আর বন্ধুত্ব ফিরে
পাওয়া যায় না… তখন বড় একা লাগে…
যখন গাছে ফুল ধরে না,
চাইলেও ফলের স্বাদ পাওয়া যায় না…
তখন বড় একা লাগে…
যখন কোকিল সুরে গান ধরে না,
চারিদিক যখন শান্ত, বর্ণহীন, নিঃশব্দ…
তখন বড় একা লাগে…
একা লাগার যে পরিভাষা হয় না… উপলব্ধি শুধু থেকে যায় সুপ্ত মনে। -
কবিতা- নবীন কবি
।। অমরনাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ।।
নবীন কবি
– শ্যামল কুমার রায়নতুন কথা শোনাও কবি ।
গতানুগতিকতার আবর্তে
চলছে সবার আনাগোনা ।
ঘূর্ণিপাক উজান স্রোত এড়িয়ে ,
গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে
ভুলভুলাইয়ায় চলছে , পথ কানা।সমাজ বদল চেয়েছিল যারা ,
তারা বুঝি ছেড়ে দিলো হাল ,
চেতনার হলো না উন্মেষ ।
এবার এগিয়ে এসো নবীন কবি ,
কাঠের তরবারি দাও বিসর্জন ,
শানিত কলমে ধরো রুদ্রবেশ । -
গল্প- ভারতমাতা
।। অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
ভারতমাতা
– রাণা চ্যাটার্জীশীতের জবুথবু আঁধার রাত। লম্বা বয়ে যাওয়া খাল পাড়ের পাশ দিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার ফুঁড়ে পথ হাঁটছিল রতন,পাশে তার কয়েক ঘণ্টা আগে পরিচয় হওয়া নতুন সঙ্গী হুকুম সিং। মাথায় পাগড়ী এমন ভাবে বেঁধেছে কেবল চোখদুটো ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো জ্বলজ্বল করছে। বিপক্ষকে পায়ের প্যাঁচে জড়িয়ে টুঁটি ধরে কয়েক মুহূর্তে নাস্তানুবুদ করা তার বাম হাতের খেল।ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে যখন রতন অনুভব করলো পিঠে ভরসার হাত, উত্তেজনায় টগবগ করে উঠলো রক্ত।যে দায়িত্ব রতনের ওপর সঁপেছে স্বদেশী দলের নেতৃত্ব তা পালন করতেই হবে নীরবে নিস্তব্ধ অন্ধকারের মতোই ।এই সংকল্প মনে প্রাণে রতনকে এতটাই উত্তেজিত করে দিচ্ছে ,শুধু ভাসছে মনে ভারত মায়ের শৃঙ্খল মুক্তির হাসি।
দেশের সকল প্রান্তের মতো বাংলা সহ এ তল্লাটে লাল মুখো বাঁদর ইংরেজরা আধিপত্য কায়েম রাখতে লোভ দেখিয়ে নেমকহারাম এ দেশীয় কিছু মানুষকে হাত করেছে। এরা ইংরেজ দের দালাল রূপে নানা তথ্য সংগ্রহের জন্য জাল ছড়িয়েছে। শুরু হয়েছে সাধারণ কৃষকদের জমি, মাটি,আম আদমির জীবন জীবিকা সর্বস্ব লুটেপুটে নেওয়ার অত্যাচার, শোষন রাজ।সকল দৃষ্টি এড়িয়ে এ দুইজনের ওপর দায়িত্ব পড়েছে সাত ক্রোশ পথ পাড়ি দিয়ে নদীর ওপারে বাংলাদেশ সীমান্তে যে রেল স্টেশন তার সন্নিকট গোলা গুলি বারুদ সব জাগরণ মঞ্চের গোপন আস্তানায় পৌঁছানোর।কালকেই ট্রেনের মধ্যে যাওয়া অস্ত্র লুট করার মোক্ষম সুযোগ,সেটা ভেস্তে যাওয়া মানে মৃত্যুর সামিল রতনের কাছে। অন্ধকারে হোঁচটে পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটা উপড়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই উফ বাবাগো করে বসে পড়লো রতন।মুহূর্তে দেশলাই জ্বালিয়ে নিজের খদ্দরের পাঞ্জাবির একদিকটা ফরাৎ করে ছিঁড়ে পায়ে বেঁধে দিয়ে হুকুম সিং বললো “উঠিয়ে বাঙালি দাদা, আভি বহুৎ কাম বাকি,উঠিয়ে”!
ভরসায় টগবগ করে পুনরায় রক্ত ফুটে উঠলো রতনের।তার থমকে যাওয়া মানা,থেমে যাওয়া মানে ভারত মায়ের অব্যক্ত যন্ত্রণার পাথর তারও বুকের ওপর যেন আরো জোরালো ভাবে বসানো।আজ জঙ্গলে সারা বিকাল, সন্ধ্যা জুড়ে মাস্টারদা’র জ্বালাময়ী ভাষণ দারুন উদ্দীপ্ত করেছে রতনকে। এখনো যেন চোখের মধ্যে ভাসছে স্বাধীনতার মুক্তির আকাঙ্খা,আরও জোড়ে পা চালায় দুই নও জওয়ান।
বাঁশ বাগানের পাশ দিয়ে গোয়াল ঘরের ভেতর অব্যবহৃত রাস্তায় পা টিপে নিজের কুঁড়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে অবাক হলো রতন। একি মা এখনো জেগে!রাস্তায় ঠায় লন্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে! তবে কি তার অপেক্ষায় গ্রাম বাংলার অভাবী হাড়ভাঙা পরিশ্রমের প্রতিবিম্ব তার জন্মদাত্রী মা এই রাত বারোটার সময়।”কি রে রতন এলি বাবা,আমি জানতুম তুই আসবি”বলে পথ ছাড়লো মা, এ যেন সাক্ষাৎ ভারত মাতা রতনের।সে মাতঙ্গিনির নাম শুনেছে,তার মা কোনো অংশেই কম সাহসী নয় এটাও মানে রতন।ইতিমধ্যে মায়ের ব্যবস্থায় রুটি,গুড় মাটির পাত্রে গরম দুধ হাজির দুজনের।
“ওঠ বাবা আর দেরি করিস না – কে”!ধরফর করে উঠে বসলো রতন।ঘড়িতে রাত সাড়ে তিনটা।তবে কি মা ঘুমায় নি! মা কি আঁচ করতে পেরেছে নতুন সঙ্গী রাতে বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার কিছু একটা দায়িত্ব রতন দের ওপর।জলদি রেডি
হয়ে মুখে কাপড় জড়িয়ে মায়ের পায়ে হাত ছুঁইয়ে প্রণাম করে অন্ধকার পথে পা বাড়ালো দুই স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষিত যুবক। ওদেরকে মা,গামছায় পোঁটলা করে চিঁড়ে মুড়কি বেঁধে ধরিয়ে দিতে ভুললেন না!পরদিন বিকালে ওঠানে রতনের নিথর দেহ এসে পৌঁছালো। স্থানীয় সংবাদে বারবার নিউজ বুলেটিন বলছে কুমার দহ স্টেশনের কাছে ট্রেনের চেন টেনে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় স্বদেশী ও পুলিশের মধ্যে প্রবল খণ্ডযুদ্ধ হয়।গোলাগুলির মাঝে পড়ে মৃত্যু হয় রতন বসু রায়ের।বিপ্লবীরা প্রচুর অস্ত্র উদ্ধার করে তাদের মিশন সফল করেছে,শুরু হয়েছে কারফিউ,ধরপাকড়। গ্রাম বাংলার বয়স্ক মা তাকে তো কাঁদতে নেই ! তার পায়ের সামনে পড়ে রয়েছে তার সন্তানের নিথর দেহ । তার রতন তো ভারত মায়ের শৃঙ্খলা মুক্তির জন্য বলিপ্রদত্ত ,আর তিনি শহীদের মা, আপামর ভারতবাসীর জননী” ভারত মাতা”।একদল যুবক “বলো হরি হরি বোল” সুরে শ্মশান মুখে নিয়ে যাচ্ছিল রতনের দেহ। বয়স্ক মা ছেলের মাথায় আশির্বাদ দেওয়ার নামে পা ছুঁয়ে প্রণাম করলো অমর শহীদের।