• কবিতা

    কবিতা- মুখোশের আড়ালে

    মুখোশের আড়ালে
    – সোমা কর্মকার দে

     

     

    সভ্য জগতের বাইরেও, যে এক অন্য জগতের বাস।
    অন্ধকারে নিওন আলোর রোশনাইয়ে ওঠে নাভিশ্বাস।
    পুরছে কতশত প্রাণ, পৈশাচিক লালসা পূরণের তরে।
    বাঁচার তাগিদে সব সয়েও, যে বলি হচ্ছে প্রতিমুহূর্তে।
    স্বল্প মুল্যে মুছে ফেলে, রক্তাক্ত হৃদয়ের গভীর ক্ষত!
    অকালেই তাই হারিয়ে যায়, নিষ্পাপ প্রাণ কত শত।
    কেউবা হারায় নেশায়, তো কেউবা হারায় পেশায়!!
    কিবা তার খোঁজ রাখে? এই সভ্য সমাজের মানুষ?
    ওদের দ্বারের মাটি ছাড়া, হয়না যে আমাদের পূজা!
    অথচ কি আশ্চর্য!! ওদেরই এই সমাজে ঠাঁই হয়না।
    লালসা পূরণের তরে, ওদেরকেই যারা অশুচি করে!
    তারাই গর্ব করে, ওদেরকে বেশ্যা বলে ভূষিত করে।
    মুখোশধারী ভন্ডরা সব বুঝেও না বোঝার ভান করে।
    পুরুষ ছাড়া একা একা বেশ্যা হয় কোন মেয়েটা শুনি?

  • কবিতা

    কবিতা- ঘুরে দাঁড়াও

    ঘুরে দাঁড়াও
    – সোমা কর্মকার

    “নারী” তুই জন্মেছিস কি কেবল পরের ভালোর তরে,
    নিজের ভেবে মিছে বড়াই, তুই কেন করিস তবে?
    না ছিল কখনও তোর কোনো ঘর, না কোনোদিন হবে!
    সবাই যতটুকু খোঁজে তা যে শুধুই প্রয়োজনের তরে।
    জন্মে থেকে পালিত হলি যে ঘরে যে মায়ের কোলে,
    বিয়ের পরে তাদেরকেই যে ফেলে চলে যেতে হবে।
    সব ভুলে তখন আপন করবি শ্বশুর ঘরের লোককে,

    সেখানে আবার চলতে হবে তোকে সবার মন জুগিয়ে।
    নিজের খুশি বির্সজন দিতে হবে অন্যের ভালোর তরে।
    তখন তো আবার বাপেরবাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি হবে!
    এর মধ্যে কোনটা রে বল, তোর নিজের বাড়ি তবে?
    নারীদের নিজের বাড়ী বলে আসলে কিছুই হয় না রে!
    মাঝে মাঝে তাই অনেক প্রশ্ন জাগে আপন মনে মনে,
    নারী নামক বস্তুটির আছে কি কোনো যোগ্যাধিকার?
    চিরজীবন নারীরা হয় যে শুধু অন্যের লালসার বলি,
    জায়গায় বিশেষে আবার বিভিন্ন রকম যে তার চিত্রটি।
    সারাজীবন সবেতেই যে করবি শুধুই অ্যাডজাস্টমেন্ট,
    বিনিময়ে পাবি রে তুই কেবল নানা রকম পানিশমেন্ট।
    আপণ ভেবে যাদের তরে করবি তুই নিজের প্রাণপাত,
    সবশেষে তারাই ভুল প্রতিপন্ন করবে তোকে দিনরাত।
    এই নারীর গর্ভেই ভূমিষ্ঠ হয়ে নারীকেই করে ভূ লুণ্ঠিত,
    শত নারীর রক্ত ক্ষতে আছে সেই সব ইতিহাস বর্ণিত।
    সবই যেন শুধু মরুভূমির মত তপ্ত বালিতে জল ঢালা।।
    সবাই যদিও খারাপ নয় কিছু মানুষ ব্যাতিক্রমও হয়।
    তবে বে‌শির ভাগ মানুষই ভাবে নারী যে অতীব নগণ্য,
    তাই তো নারীরা বারবার হয়ে ওঠে শুধুই ভোগপন্য।।
    একবারও মনে পড়েনা কার মাধ্যমে ধরণীতে আগমন,
    মনে পড়েনা নিজের বাড়ি কিংবা অতীতের সব কথা?
    কিন্তু এভাবেই কি সারাজীবন চলতে পারে বলতো??
    অনেক তো হল মুখ বুজে সওয়া, এবার ঘুরে দাঁড়াও!
    জানুক সবাই নারীরা প্রয়োজনে অস্ত্র ধরতেও জানে,
    অত্যাচারিত ব্যভিচারী আসুরকে হত্যাও করতে পারে।
    ইচ্ছে করলে একলহমায় ভয়ংকর প্রলয় ঘটাতে পারে।

    সেদিনসবে বুঝবে তবে নিরবতা সবসময় দুর্বলতা নয়।

  • গল্প

    গল্প- “উপহার”

    “উপহার”
    – সোমা কর্মকার

     

     

    প্ল্যান করা পুরো ভ্যালেনটাইন সপ্তাহটাই ভেস্তে গেলো অফিসের কাজের চাপে। কবে থেকে ভাবছি একদিন একটু তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে একটা গিফট কিনবো ওর জন্য। আজ ‘ভ্যালেনটাইনস ডে’ ভাবলাম অন্তত আজকের দিনটা ছুটি নিয়ে ওকে কোথাও একটু ঘুরতে নিয়ে যাবো। ছুটি নেওয়া, আগে বেরোনো তো দুরের কথা অন্য দিনের থেকে আজ একঘন্টা দেরীতে বেরোলাম। কি করে যে মুখ দেখাবো ইশানীকে? ছি! ছি! কি যে করি? কোনো গিফটের দোকানও খোলা নেই এই সময় যে কিছু কিনে নিয়ে যাবো। ভাগ্যক্রমে একটা দোকান খোলা পেলাম সেখান থেকে অগত্যা পাঁচটা ক্যডবেরি নিয়ে স্টেশনের দিকে এগোলাম, মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম এমন সময় পেছনদিক থেকে কে যেন আমার জামা ধরে টানলো। পেছন ঘুরে দেখি একটা ছোট্ট ছেলে, হাতে পাঁচ-ছটা গোলাপ নিয়ে বলছে বাবু এই গোলাপ কটা নেবে? তোমার বউকে দেবে.. আজ তো ভালোবাসার দিন সবাই তার ভালোবাসার মানুষকে আজ গোলাপ দেয় নাও না গো, মাত্র এ কটাই পরে আছে বেশী লাগবে না কুড়ি টাকা দিলেই হবে, আমি ভাই এর জন্য একটা পাউরুটি কিনবো। বাচ্ছাটিকে দেখে খুব মায়া হলো, নিজেই এতো ছোটো বাচ্চা হয়ে আবার ভাই এর পেট চালানোরও কথা ভাবছে। ওর হাত থেকে গোলাপগুলো নিয়ে পকেট থেকে একশো টাকা বার করে ওকে দিয়ে দিলাম। ও বললো এতো লাগবে না বাবু, মাত্র কুড়ি টাকা। বললাম এটা আজকের দিনে আমি তোকে উপহার দিলাম। খুব খুশি হয়ে ও নিষ্পাপ হাসি দিয়ে চলে গেলো। গোলাপগুলো পেয়ে আমিও খুব খুশি হলাম, ওই নাই মামা থেকে তো কানা মামা ভালো আরকি। দেখতে দেখতে বাড়ী ফিরে এলাম, লজ্জায় ও ভয়ে ইশানীকে উইশ করে গোলাপ আর চকলেটগুলো দিলাম। মিষ্টি করে হেসে ও জিনিসগুলো সাদরে খুব যত্নের সহিত গ্রহণ করলো এবং আমাকেও একটা রিটার্ন গিফট দিলো, একটা সুন্দর ঘড়ি আর একটা লাল খামে বন্দি একটা গ্ৰিটিংস কার্ড তাতে ওর নিজের হস্তাক্ষরে লেখা আছে- “I love you always. ভালোবাসার জন্য আলাদা করে কোনো দিনের দরকার হয় না”। খুব পছন্দ হয়েছে ওর গিফটা আমার। দু’জনে খাওয়া দাওয়া সেরে ঘরে গিয়ে ওকে রাস্তায় ছেলেটার ঘটনা সব বললাম, এও বললাম- আজকের দিনটা নিয়ে অনেক প্লান করেছিলাম জানো কাজের প্রেসারে সব ভেস্তে গেলো। তুমি খুব রাগ করেছো তাই না? ও বললো আরে এটা কোনো ব্যাপারই নয়, আমি এসব মানিনা জানো সম্পর্ক ঠিক থাকলে প্রতিটি দিনই বিশেষ দিন হয়ে উঠতে পারে। নাইবা আমায় কোথাও নিয়ে যেতে পারলে, নাইবা ছুটি নিলে, কিন্তু তুমি চিরকাল আমার পাশে থেকো এটাই যথেষ্ট। তাছাড়া কাজের চাপ থাকলে তো তোমারও কিছু করার নেই তাইনা? আর তোমার জন্য তো ওই শিশুটাও খুব খুশি হলো, ছুটি নিলে তো আর এতো কিছু হতো না, এটাও বা কম কোথায় বলো? তাছাড়া লাল গোলাপ আর চকলেট আমার সবচেয়ে বেশী প্রিয় জিনিস, সেটাই তো আমি পেয়েছি আর কি চাই? কতো লোক যে প্রতিদিন ঠিক মতো খেতেও পায় না। ওর কথাগুলো শুনে আমি এতোটাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম যে আর কিছু বলার ভাষা পেলাম না। শুধু মনে মনে ইশ্বরকে ধন্যবাদ জানালাম।

  • কবিতা

    কবিতা- “আমার সুপার মম”

    “আমার সুপার মম”
    – সোমা কর্মকার

    তুমিই আমার স্নেহময়ী, এক এবং অদ্বিতীয় জননী।
    সেরার সেরা মা যে তুমি, নানা গুনের অধিকারী।
    আমার কাছে তুমি নয়কো, কোনো সাধারন নারী।
    আমার জীবনে তুমিই যে, অন্যতম মহীয়সী নারী।
    আজ চলো তোমাকে নিয়েই একটা কবিতা লিখি।
    তুমিই যে আমার প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ শিক্ষা দাত্রী।
    তুমিই আমার জীবনের, সবচেয়ে কাছের সঙ্গী।
    চলার পথে তুমিই যে, আমার প্রেরণা প্রদানকারী।
    তোমাতেই শেখা সহ্যশক্তি, তোমাতেই সহানুভূতি।
    আমার কাছে তুমিই লক্ষী, তুমিই যে সরস্বতী।
    তুমিই সৃষ্টি, তুমিই আবার অশুভ শক্তি বিনাশীনী।
    দুহাতেই যে দশ হাতের কাজ, একাই করো তুমি।
    তোমাকে দেখেই পাই আমি, অনেক মনের শক্তি।
    মাঝে মধ্যে হয়তো বা ভুল করি, রাগও অনেক করি,
    তবুও মাগো তোমাকে যে আমি অনেক ভালোবাসি।
    জন্মেছি আমি যেমন মাগো, তোমারই ওই কোলে,
    শত জন্মেও পাই যেন ঠাঁই, শুধু তোমারই কোলে।
    তোমার মতো এহেন মায়ের আশীর্বাদ পেয়ে।
    জীবন হয়েছে ধন্য আমার, আঁধার গেছে ঘুঁচে।
    তোমার দেওয়া আদর্শেই যেন সারাজীবন কাটে।

  • গল্প

    গল্প-“গোল্ডির কিছু কথা”

    “গোল্ডির কিছু কথা”
    – সোমা কর্মকার

     

     

    কী হবে?
    তাহলে কী মরে যাবে?
    এদিকে বারোটা বেজে গেছে, আবার ফিরে গেলে ওদিকে তো দেরী হয়ে যাবে? উফ্ ওকেই বরং একটা ফোন করি।

    বাসে উঠি কিছুটা যেতেই বারবার অস্বস্তি হতে থাকে, নানান কথা ভেবে ভেবে না পেরে পিউ ফোনটা করেই ফেলে অর্ককে। ফোনটা বাজতেই অর্ক ফোনটা রিসিভ করে বললো, হ্যাঁ বলো তুমি বের হও নি এখনো?
    পিউ বলে আরে বেরিয়েছি তো কিন্তু একটা ভুল হয়ে গেছে জানো তো, কী যে হবে বুঝতে পারছিনা।
    অর্ক

    :- আহা! আরে কী হয়েছে সেটা তো বলবে?
    পিউ:- আরে মাছের পাম্পটা একবার বন্ধ করেছিলাম, আর চালাতে ভুল গেছি! আমি বাসে উঠে বেশ কিছুটা চলেও এসেছি। আবার তো আমরা সেই কালরাতে ফিরবো।
    -যাঃ তুমি কেনই বা বন্ধ করতে গেলে, আমি তো সকালে চালিয়ে দিয়ে বলে এলাম বেরোনোর সময় দেখো যেন পাম্প বন্ধ না থাকে।

    পিউ:- কী হবে গো? তাহলে কী মরে যাবে মাছটা?

    -কী আর হবে মরেই যাবে, এমনিতেই বেশ কিছু দিন হয়ে গেল জল পাল্টানো হয়নি, এবার অক্সিজেন এর অভাবে মরে যাবে, যাক কি আর করা যাবে, যা হবার হবে, তিনটে তো এমনিতেই মরে গেছে। এখন পরে আছে একটা, ভালোই হবে মরে গেলে আমারও খাটুনি কমে যাবে। তুমি চিন্তা করো না সাবধানে যাও আর পৌঁছে আমায় ফোন করো, রাখছি কেমন।
    এই বলে অর্ক ফোন কেটে দিলো।

    সারা রাস্তা পিউ ভাবতে ভাবতে গেলো, এতোদিন পর বাপের বাড়ি যাচ্ছে কোথায় মনটা আনন্দে থাকবে তা না হয়ে শুধু ভাবছে, ইস আমার ভুলের জন্য বোধহয় হারাধনের বাকি একটাও গেলো। খুব মন খারাপ হলো পিউয়ের। অনেকদিন পরে বলে কয়ে রাজী করিয়ে অর্কর সাথে নিজে গিয়ে হাট থেকে বেছে বেছে একটু ভালো অরেন্ডা প্রজাতির চারটে দামি বড়ো গোল্ড ফিস নিয়ে এসেছিলো। তার মধ্যে দুটো রেড ক্যাপ ছিলো। এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনটি মরে যায়, যাক সে সব কথা, এখন পড়ে আছে একটা রেড ক্যাপ। তখনই অর্ক বলেছিলো ‘এসবের দরকার নেই একে তো বাঁচে না তারপর খাটুনি।’ 

    যাই হোক এখন তো ভগবানের উপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। পিউ মনে মনে ঠাকুরকে বললো প্লীজ ঠাকুর মাছটাকে তুমি বাঁচিয়ে দাও, দরকার হয় আমার জীবনের দশ পার্সেন্ট আয়ু ওকে দিয়ে দাও প্লীজ ঠাকুর প্লীজ.. ।

    এসব নানা কিছু ভাবতে ভাবতে পিউ বাড়ি পৌঁছে যায়, বাড়ি ফিরে ও মাকে সব বলে। মাও শুনে খুব দুঃখ প্রকাশ করে, বলে কী সুন্দর মাছগুলো ছিল। যাই হোক বাপের বাড়ি গিয়ে হাসি মজা করে ভালো মন্দ খাওয়া দাওয়া করে ওরা পরদিন রাতে আবার বাড়ি ফিরে আসে, এসে ঘর খুলেই পিউ আগে অ্যাকোরিয়ামের লাইট আর পাম্প জ্বালায়। ভয়ে ভয়ে দেখে মাছটা একটা কোনায় গাছের ফাঁকে ঢুকে আছে, কোনো নড়াচড়া করছে না। প্রায় এক মিনিটের মাথায় মাছটা একটু নড়ে উঠল তারপর চলতে শুরু করে আস্তে আস্তে। খুব খুশি হলো পিউ। ছুটে গিয়ে অর্ককে বলে, জানো মাছটা বেঁচে আছে, উফ্
    আমার যে কী টেনশন হচ্ছিল কি বলবো।
    অর্ক তক্ষুণি বলে আরে অক্সিজেনের অভাবে ও অসুস্থ হয়ে পড়েছে, কোনো রকমের বেঁচে আছে কাল ঠিক মরে যাবে দেখো।
    পিউ বলে, না না আর মরবে না, অর্ক বলে আমার এসবে অভিজ্ঞতা আছে আমি জানি।

    আবার পিউ একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে পরদিন সকালে উঠে দেখে মাছটা ঠিকই আছে, খুব খুশি হলো পিউ দেখতে দেখতে প্রায় দু’মাস কেটে গেলো এখনও মাছটা আছে ওদের সাথে।

    পিউ ভগবানকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানায় মাছটার জন্য।
    কেউই চিরকাল থাকে না তেমনি মাছটাও হয়তো একদিন মারা যাবে ঠিকই কিন্তু ওই দিন যদি কিছু হতো তাহলে হয়তো পিউর নিজের কাছে নিজেকে দোষী বলে মনে হতো।

    এবার পিউ ঠিক করেছে ওই রেড ক্যাপের সাথে আরও একটা রেড ক্যাপ আরও দু’টো মাঝারি সাইজের এমনই গোন্ড ফিস এনে আবার চারটে পূর্ণ করবে।

  • গল্প

    গল্প- স্বপ্নপূরণ

    স্বপ্নপূরণ
    – সোমা কর্মকার

     

     

    মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ভদ্র, সভ্য ছেলে সূর্য। মা, বাবা আর দুই ভাই এই চারজন মিলে ছোট্ট সুখের পরিবার ওদের। মা শিক্ষকা, বাবা ব্যবসায়ী। পাড়ায় যথেষ্ট নাম ডাক আছে ওদের। সূর্য ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনায় ভালো, ব্যবহারের দিক থেকেও বিনম্র স্বভাবের।পেশায় সূর্য একজন হিসেব রক্ষক। চাকরির সুবিধের জন্য ও বাড়ী ছেড়ে অফিসের কাছাকাছি ভাড়া থাকত।

    এভাবেই চলতে চলতে স্বপ্না নামক একটা মেয়েকে সূর্য ভালোবেসে প্রপোজ করে ফেলে। স্বপ্নাও ওর ভালবাসার স্বীকার করে নেয়। ওরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, অবশ্য বাড়ীর লোকের স্বপ্নাকে দেখে পছন্দ হয়নি তাই বিয়েতে একটু আপত্তি ছিল, তবুও ছেলের পছন্দ বলে মেনে নেয়। যথারীতি ওরা বিয়ে করে ফেলে। সূর্যর ভালোবাসায় কোনো ত্রুটি ছিল না, মনে প্রাণে ও স্বপ্নাকে ছাড়া কিছুই চিনত না। এভাবে বেশ কিছুদিন ভালোই কাটছিল। আস্তে আস্তে দেখা গেলো খুঁটিনাটি বিষয়ে কথা কাটাকাটির জন্য ওদের মধ্যে দুরত্ব বাড়তে থাকে। স্বপ্না বিলাসিতা করে প্রচুর টাকা নষ্ট করতে লাগলো। সূর্যকে ভালো পেয়ে ভুল ভাল বুঝিয়ে বন্ধুদের নিয়ে ফুর্তি করে অনেক টাকা খরচ করতো। এভাবে চলতে চলতে যথারীতি সূর্যের আর্থিক অবস্থা খারাপ হতে লাগলো। তাই স্বপ্নার চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে পারতো না। আর তাই অশান্তি দানা বেঁধে ওঠে এবং আস্তে আস্তে চরম আকার ধারণ করে, একদিন স্বপ্না সূর্যকে ছেড়ে চলে যায়। সূর্য মনে প্রাণে খুব ভেঙ্গে পড়লো, এক লহমায় ওর সমস্ত স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। বিষয়টা ও কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলো না। একা থাকতো তাই বিষয়টি কারো কাছে শেয়ার করতে পারতো না। আর যেহেতু ও প্রায় বাড়ীর অমতে বিয়ে করছে তাই বাবা মাকে ও অভিযোগ করার মুখ নেই। এসব নানা চিন্তা-ভাবনা, কষ্ট ও মনের দ্বন্দ্বে সূর্য আস্তে আস্তে কেমন একটা পাগলের মতো হয়ে গেলো। কাজ বাজ বন্ধ করে ঘর ছেড়ে একটা মন্দিরে গিয়ে আশ্রয় নিলো। আসলে খুব ভালোবাসার মানুষটির থেকে এমন আঘাত ও কোন দিন আশা করেনি।

    এরপর প্রায় দেড় বছর কেটে গেল একদিন অমিত নামে ওর এক বন্ধুর সাথে দেখা হলো। সমস্ত কিছু শুনে ওর মাথা ঘুরে গেল ও কিছুতেই বুঝতে পারলো না কি করে সূর্যের মতো ছেলের সাথে এমন ঘটনা কেন ঘটলো। অমিত সূর্যকে অনেক করে বুঝিয়ে সুজিয়ে ওর বাড়ীতে নিয়ে এলো এবং ডাক্তার দেখিয়ে আস্তে আস্তে সুস্থ করে তোলে। আবার ও অফিস যেতে লাগলো ও অনেক স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো।

    প্রায় দুই বছর পরে অফিসে কর্মসূত্রে অতসী নামে একটি মেয়ের সাথে ওর আলাপ পরিচয় হলো এবং খুব ভালো সখ্যতা গড়ে উঠলো। অতসী সূর্যের কাছে ওর বাড়ীর কথা জানতে চাইলে সূর্য জীবনের অন্ধকার দিনগুলোর সম্পর্কে বিস্তারিত বললো। আলোচনা সুত্রে জানা গেলো অতসী ও ডিভোর্সী ওর সঙ্গেও এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুজনে একি পথের পথিক হওয়ায় ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব আরো গভীর হয়। সূর্য খুব ভালো মনের মানুষ বুঝে অতসী নিজে থেকে সূর্যকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিলো এবং চিরজীবন একসাথে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু সূর্য রাজী হলো না ও বলে – ‘ভালোবাসা আর ঘর বাধার প্রতি বিশ্বাস উঠে গেছে। তাই তুমি আমার বন্ধুই ঠিক আছো’। অতসী বললো – ‘একবার বিশ্বাস করতে পারো, হয়তো ঠকবে না’।

    প্রায় হপ্তা খানেক পর হঠাৎ অমিত ওকে দেখতে আসে। সূর্যের মনখারাপ দেখে অমিত কি হয়েছে জানতে চায় এবং অমিত জোর করাতে সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। সব শুনে অমিত বাচ্চাদের মত করে বোঝাতে লাগলো এবং বললো – ‘দেখ আমাদের সঙ্গে হয়তো অনেক সময় অনেক দুর্ঘটনা ঘটে কিন্তু সবাই খারাপ হয় না, এই পৃথিবীতে খারাপের ব্যতিক্রম ও কিছু আছে। হয়তো ভগবান তোকে আরেকটা সুযোগ দিয়েছে। তাছাড়া জীবনে বাঁচতে গেলে পাশে একটা সঠিক মানুষের প্রয়োজন। একবার একটু ভেবে দেখ,  দরকার হয় কিছুটা সময় নে’। তারপর প্রায় দুই সপ্তাহ সূর্য নানারকম ভাবে বিষয়টা ভাবলো। শেষে জীবনের ওপর বাজী রেখে রাজী হয়ে গেলো, ও রেজিস্ট্রি করে অমিতের উপস্থিতিতে বিয়ে হলো। আজ প্রায় ১০ বছর হয়ে গেল, একটা কন্যা সন্তান নিয়ে ওরা দিব্যি সুখেই দিন কাটাচ্ছে।

    অমিতের জন্য দুটি ভেসে যাওয়া জীবন আরার কুল খুঁজে পেলো, এ এক আকস্মিক প্রাপ্তি যা দুটো জীবনকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।

                                       —

  • কবিতা

    কবিতা- ধর্ষিতা সমাজ”

    “ধর্ষিতা সমাজ”
    – সোমা কর্মকার

    মিথ্যে সভ্যতায় মোরা মেকি, ভণ্ড মানুষরূপী
    জানোয়ার, প্রতারকদের কি দাম আছে বল?
    যারা নিজেদের পৈশাচিক লালসা পূরণ করতে,
    মা বোনদের ইজ্জত-আব্রু নিয়ে খেলা করে।
    তাদেরকে কি মানুষ বলে, নারীর সাথে সাথে আজ,
    মানবিকতা আর সভ্য সমাজেরও কি ধর্ষণ বারবার।
    সমাজের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষরা কি গর্জে উঠবে না?
    তুলবে না তাদের প্রতিবাদের মুষ্টিবদ্ধ শক্ত থাবা?
    নাকি আজকের প্রিয়াঙ্কার মতো বলি হবে শত প্রিয়াঙ্কার।
    যার মধ্যে থাকতেও পারে আমার আপনার কিছু আপনজন।
    জেনে রাখ আজ করবি অন্যের অত্যাচার কাল হবে তোর,
    নিজের ঘরের সাড়ে সর্বনাশ একদিন ঠিকই তার হিসাব পাবি।

  • গল্প

    গল্প- “অতিথি পাখি”

    “অতিথি পাখি”
    – সোমা কর্মকার

    অফিস যাওয়ার সূত্র ধরে ট্রেনে ডেইলী প্যাসেঞ্জারী করা। সেই সময় বছরের পর বছর একই কামরায় যাতায়াতের ফলে বেশকিছু লোকের সঙ্গে একটা সখ্যতা গড়ে উঠছে। তার মধ্যে বিশেষ কয়েকজনের সঙ্গে একটু বেশী আন্তরিকতা গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে একজন হলো প্রিয়াঙ্কা। ফর্সা, সুন্দরী, প্রাণবন্ত, হাসিখুসি একটা মিষ্টি মেয়ে প্রিয়াঙ্কা। বেশ পরিপাটি করে সাজাতো ও, হাসি, ঠাট্টা আর দুষ্টুমিতে ভরিয়ে রাখতো পুরো কামরাটাকে। খুব অল্প সময়েই ও আমার মনপাড়ার বাসিন্দা হয়ে গিয়েছিল। কোন কারণে যদি আমাদের মধ্যে কেউ একটু আগে পরের কামরায় উঠে পরতাম তাহলে আমরা একে অপরকে ফোন করে আবার পাশাপাশি চলে আসতাম। এমনকি কেউ অনুপস্থিত থাকলেও আমরা একে অপরকে ফোন করে না আসার কারণটা জেনে নিতাম। এভাবেই চলছিল হঠাৎ দেখলাম বেশ কয়েকদিন প্রিয়াঙ্কা আসছে না। আশেপাশের আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করাতে কোয়েরী নামের আমার আরেকটা বন্ধু (ওর সঙ্গেও প্রীয়াঙ্কার সুত্র ধরেই চেনা, যদিও এখন ও আমার খুব কাছের বন্ধু) বললো ওকে ফোন করা হয়েছিল ও বলল ওর কোন আত্মীয় (দাদা) অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে তাই ও আসছে না। সে কথা শুনে দু’দিন পরে আমি ওকে ফোন করি আমাকেও একই কথা বলল আর বললো দু’দিন পর থেকে ও আসবে। আমি বললাম ঠিক আছে তুমি এসো তার পর কথা হবে। কথামতো ঠিক দু’দিন পরে ও ঠিক ফিরে এলো, কিন্তু ওর মধ্যে কিছুতেই আমি সেই প্রিয়াঙ্কাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ও যেন কাউকে চেনেই না, আমাদের কারো সাথে কোন কথা নেই। সাজ নেই, গোজ নেই, একদৃষ্টে জানালা দিয়ে বাইরে আনমনে তাকিয়ে থাকছে। আর ওর স্টেশন আসলে নেমে যায়। এ যেন অন্য কোন প্রিয়াঙ্কা। ভাবলাম যেহেতু সদ্য সদ্য ওর বাড়ীতে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে তাই হয়তো একটু আপসেট, দু’ দিন পরে আবার ঠিক হয়ে যাবে এই ভেবে দু’দিন কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না। দু’ দিন পরেও কোন পরিবর্তন নেই। তখন একে সবাই জিজ্ঞেস করতে লাগল, কি হয়েছে? সাজগোজ কেন করছো না? আমাদের সঙ্গে কথা বলছো না কেন?ইত্যাদি নানা রকম প্রশ্ন। কিন্তু এইসময় আমি ওকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি, আসলে সত্যি কথা বলতে জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি, পাছে ও কি ভাবে। তবে মনে মনে খুব বুঝতে পারছিলাম, যে মারা গেছে সে ওর খুব কাছের কেউ। আর সেই বিষয়টা ও ভুলতে ও পারছে না, কাউকে বলতেও পারছিল না হয়তো। কিন্তু যে কোন দুঃখের কথাই কাউকে না কাউকে শেয়ার করলে বোধহয় মনটা একটু হালকা হয়। একদিন অনেক সাহস করে ওর পাশে গিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলাম প্রিয়াঙ্কা কি হল কথা বলছো না কেন? আমাদের সাথে কথা বলো মন ভালো লাগবে। কি হয়েছে? ওর খালি একটাই কথা কিছু হয়নি আমি ঠিক আছি। আগ বাড়িয়ে আর কিছু বলতে পারিনি, শত হলেও সবার একটা পার্সোনাল স্পেস থাকে, আর সবাই তো সমান হয় না। এর পর আবার বেশকিছু দিন ও এলো না। কোন এক শুক্রবার ওকে ফোন করতে বললো ওর জ্বর হয়েছে তাই আসছে না। সোমবার থেকে আবার আসবে। কিন্তু সোমবার’ও আসলো না। কারো কাছে শুনলাম যে ওকে অন্য বগিতে দেখেছে। তখন বুঝতে পারলাম যে ও একটু একা একা থাকতে চাইছে। দেখতে দেখতে আবার বেশ কিছু দিন হয়ে গেল কিন্তু মনটা খুব খারাপ লাগছিল তাই না পেরে একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ট্রেনে বসেই ওকে ফোন করে ফেললাম, দেখলাম ওর ফোনটা সুইচ অফ বলছে, মনটা আরো বেশী উতলা হয়ে উঠলো। মনে পড়লো বেশ কিছু দিন আগে একটা নতুন নাম্বার থেকে আমাকে ফোন করে ছিল। আমার কি মনে হলো সেই নম্বরটা সেভ করে রেখেছিলাম, সেই নম্বরটিতে ফোন করতে ফোনটা রিসিভ করল। আমি বললাম কে প্রিয়াঙ্কা? অপরদিক থেকে উত্তর আসলো না আমি প্রিয়াঙ্কার মা বলছি, তুমি কে? আমি বললাম, ওহ্ কাকিমা, আমি সোমা বলছি, ওর সাথে একসঙ্গে যাতায়াত করি। কাকিমা বললো, বলো। আমি বললাম প্রিয়াঙ্কা আছে? কদিন ধরে আসছে না… বলতে বলতেই বললো, না প্রিয়াঙ্কা তো নেই! ও তো মারা গেছে!!
    কথাটা শুনেই আকাশ পাতাল ভেবে আমার মাথা ঘুরে গেলো। আমি বললাম কি বলছো তুমি এসব? বললো কেন তোমরা কিছু জানো না? ওর যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল সে ছেলেটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। তারপর থেকে ও কেমন একটা হয়ে গেছিলো। আমি তখন বললাম যে, আমরা অতো কিছু জানিনা। তবে প্রিয়ঙ্কা বলেছিল ওর কোন এক দাদা মারা গেছে, তবে বুঝতে পারছিলাম যে ওর কাছের কেউ মারা গেছে। কিন্তু ও তো আমাকে দু’ দিন আগে বললো ওর জ্বর হয়েছে, ও সোমবার থেকে আসবে। হ্যাঁ, সোমবার অফিস গিয়েছিলো, বাড়ী এসে ও অ্যাসিড খেয়ে নিয়েছিল। ওকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, দুই দিন ছিল হাসপাতালে দু’ দিন পরে বাড়িতে ফিরে আসলো তারপর দিন ও মারা গেলো। কথাগুলো শুনে ফোনটা রাখবো নাকি, কথা বলব, বসবো, না দাঁড়াবো কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। কোন ক্রমে ট্রেন থেকে নেমে টোটো করে বাড়ী ফিরে আসলাম। সবার প্রথমে মার সঙ্গে বিষয়টা শেয়ার করলাম। কিন্তু কিছুতেই আমি ভুলতে পারছিলাম না। রাতে ঘুমাতে পারছিলাম না, খেতে পারছিলাম না, রাতদিন শুধু ওর কথাই মনে পড়ত ওর হাসি, ওর কথা, ওর মুখ ইত্যাদি নানা স্মৃতিগুলো বারবার ফিরে আসছিলো। অনেকদিন সময় লেগেছিল বিষয়টা স্বাভাবিক হতে। মাঝে মাঝে মনে হতো ওর তো বাবা ছিলো না, ও কি ওর মার কথাও একবার ভাবলো না? আবার ভাবি সবসময় হয়তো সব পরিস্থিতিতে সবার পক্ষে সব কিছু মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। যার যার বিষয়টা হয়তো, সেই ভালো বুঝতে পারে, একেই হয়তো ভালোবাসা বলে। যাই হোক, ও যেখানেই থাকুক ওর আত্মার শান্তি কামনা করি। তবে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি কারো সাথে যেন এমনটা না হয়, সবাই যেন তার কাছের ভালোবাসার মানুষটিকে পায়।

  • অণু কবিতা

    অণুকবিতা- “অনুভূতি”

    “অনুভূতি”
    – সোমা কর্মকার

    জীবন বয়ে চলে স্পন্দিক গতিতে,
    মানুষ চলে তারই তালে তালে।
    যেমন করে চলে নৌকা নদীর জলে।
    গড়ে ওঠে অনেক ঘটনা স্মৃতির অতলে।
    কিছু হারায়, কিছু পায়, কিছু সাথে চলে,
    হারিয়ে ও হারায় না যে স্মৃতি,
    তাইতো শিহরণ জাগায় হৃদয় জুড়ি।
    ভুলেও ভোলা যায় না কিছু অনুভূতি।
    না দেখে মেটে না তৃষ্ণা, দেখে মেটে না তৃপ্তি,
    অতৃপ্তিতে প্রাণ কাঁদে, হিয়া হয়ে ওঠে অধীর।
    ভাবের ঘোরে ক্লান্ত হয় আঁখি,
    ভাবে শুধু বিরলে বসি।

You cannot copy content of this page