-
কবিতা- ফুল ও কচু
ফুল ও কচু
-সঞ্জিত মণ্ডলফুল ভালো না কচু ভালো দ্বন্দ্ব চিরকাল
ফুল বলে সে বনের রাজা বাকিরা বেহাল।
ফুলকে ভালোবাসে সবাই আদরের সে দুলাল
কচুতে গাল লাগতে পারে চুলকায় গলা ও গাল।
বকুল ফুলের গন্ধে মাতাল মৌমাছি আর মন
গোলাপ বলে গন্ধ বিলাই হাসছি সারাক্ষণ।
কচু বলে মানছি আমি তবুও ফোটাও কাঁটা
বিয়ের বাসর ড্রইংরুমে নয় পকেটে সাঁটা।
দেখো আমি মাটিতে শুই মাটিই আমার মা
মাটি মায়ের কাছে থাকি আর তো জানিনা।
খিদে যখন পায় গরীবের আমায় খেয়ে বাঁচে
ফুল তো দেখি বড়োলোকের ওরাই শুধু নাচে।
ভরা পেটে সবাই নাচে যে যেমনটা চায়
আমি থাকি দুখীর পাশে ওরাই মন কাঁদায়।। -
কবিতা -কল্পতরু
কল্পতরু
-সঞ্জিত মণ্ডলকল্পতরু কল্পনা নয় তিনিই স্বয়ং ভগবান
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু তিনিই পূর্ণ করে দেন।
কল্পনা নয় সাধন্মার্গের উচ্চতম সে এক স্থান
বিরাজ করেন পরমপ্রভু সাধকরা তা দেখতে পান।
কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে এক জীবনেই সে প্রমাণ
সাধক যখন সাধনমার্গের গভীরেতে ডুবে যান।
চাইলে যদি না পাওয়া যায় তবে কেন বস্তু চান
গভীর ভাবে চাইলে পরে ঈশ্বর ই তা যোগান দেন।একাগ্রতা মনের শক্তি সাধন বলে পেয়ে যান
হৃদস্পন্দন প্রাণের শক্তি ঈশ্বরেরই অমিয় দান।
নিঃশব্দে আবির্ভাব হন সাধু ঋষি মুনি গণ
কল্পতরু ভগবানকে তারাই কেবল দেখতে পান।
মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন সদা স্বয়ং ভগবান
বাঞ্ছাকল্পতরু নাম ভক্তগণই তাকে দেন।
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে করে দূরে যান
যেমন কর্ম তেমন ফল হাতেহাতে দেখুন পান।পয়লা জানুয়ারি সবাই উদ্যানবাটী চলে যান
ওই দিনেতে শ্রীরামকৃষ্ণ কল্পতরু প্রতীম হন।
নির্লোভ আর সরলতায় তিনি মা’কে খুঁজে পান
পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ নামে জগৎ খ্যাত হন।
সত্য ত্রেতা দ্বাপরযুগে আসেন ভক্তের ভগবান
শ্রীরামকৃষ্ণ কল্পতরু তিনিই কলির ত্রাতা হন।
কাশীপুরের উদ্যানবাটী এই জগতে খ্যাত নাম
মহোৎসবে সবাই মাতে প্রাণের পুজো তারাই দেন।। -
কবিতা- যাঁতাকল
যাঁতাকল
-সঞ্জিত মণ্ডলযাঁতাকল হলো এমন-ই একটা কল চিরকাল আছে
দুঃস্থ মানুষ আর চাল ডাল পিষ্ট যে হয় তাতে।
যাঁতাকলে পেষা হয় চাল গম মানুষ ও পিষ্ট তাতে
স্বামী রা স্ত্রী’কে স্ত্রী-রাও স্বামীকে যাঁতাকলে পিষে থাকে।
যেখানে দেখবে উঁচু নীচু ভেদ যাঁতাকল সেথা আছে
এ ওকে পিষছে সে তাকে পিষছে যে যেমন বাগে পাবে।
আগেও ছিলো যা পরেও থাকবে যাঁতাকল বলে কথা
পেষাই যাদের পেশা তারা জানে যাঁতাকল রূপকথা।
মহিমা বাড়াতে উঁচু নীচু সব যাঁতাকল ধামা ধরে
যাঁতাকল তুমি যুগযুগ জিও শোষণের হাত ধরে।
জানিনা কে তাকে এনেছিল ভবে দারুণ এই যাঁতাকল
যন্ত্র নয়কো যন্ত্রণা দেয় ভেঙে গুঁড়ো করা কল।
ঠাকুমা ঘোরায় আমিও ঘোরাই খেসারি ও মুগ ভাঙি
সাবেকিয়ানা লেখা ছিলো তাতে গৃহস্থ বাড়িতে জানি।
গ্রাম গঞ্জেতে এখনো দেখতে পাওয়া যায় আজকাল
মানুষ নয়কো সে যাঁতায় পেষা যায় শুধু চাল ডাল। -
কবিতা- স্বজন
স্বজন
-সঞ্জিত মণ্ডলস্বজন কি শুধু রক্তেই লেখা থাকে
পিতা মাতা বধূ ভাই বোনেদের জানি
স্বজন তো জানি এর বাইরেও হয়
বসুধৈব কুটুম্বকম মানি।
কতো বন্ধুকে স্বজনও তো ভাবা যায়
কাজের মাসিরা ডুব দিলে হাহাকার
ডাবয়ালা ছেলেটা ডাব দেয় রোজকার
পটাশিয়ামের অভাবটা দূর হয়।স্বজন ভেবেছি ফুলওলি মেয়েটিকে
পুজোর ফুল, বেল-তুলসী পাতাও দেয়
ঝালমুড়ি আর আইসক্রিমওয়ালা আসে,
ফুচকাওলার তেঁতুল জল কে না চায়।
বাস ড্রাইভার, কন্ডাকটর অটোয়ালা ছেলেটাও
সারাদিন রাত দৌড়াদৌড়ি করে
নিরাপদে কতো যাত্রী পৌঁছে দেয়
স্বজন তাদের না বলে বা কি উপায়?খেয়াঘাটের ওই মাঝিটার দিকে দেখো
রোজ কতো লোক খেয়া পারাপার করে
চাষি ভাই আর সবজি বিক্রেতারা
যারা মাছ বেচে তারাও স্বজন হয়।
ট্রাফিকপুলিশ তাদেরও স্বজন ভাবি
ডাক্তাররা তো কতো অসুখ সারায়
মুটে মজুর আর হকারের কথা বলি
ভ্যান আর রিক্সাচালক যারা তারাও স্বজন হয়।শিক্ষক যারা তাদেরও স্বজন ভাবি
রাজমিস্ত্রী ও কামার কুমোর যত
যেখানে যে আছে মুচি ও মেথর ভাই
যে শব পোড়ায় তাকেও স্বজন ভাবি।
স্বজন বন্ধু দেশে ও বিদেশে থাকে
স্বজন সবাই আত্মার আত্মীয়
উদার হৃদয় আজও যারা দুনিয়ায়
স্বজন তাদের সবাই দুনিয়াময়।। -
কবিতা- “ভুলিনি”
“ভুলিনি”
-সঞ্জিত মণ্ডলতোমাকে হারাতে চাইনি বলেই সেদিন ছুঁয়েছি তোমাকে,
তোমার ওষ্ঠ স্পর্শ করেছি সেদিনের সেই প্রভাতে।
তবুও সেদিন ব্যথায় রঙীন হওনিকো সেতো জেনেছি,
আমি যে আকাশ ধরতে চেয়েছি মুখ ফুটে সেও বলেছি।
তুমি রাজী ছিলে কথা দিয়েছিলে চলে যাব বনছায়াতে,
দেখতে দিয়েছ, দেখেছি তোমাকে অমল বিমল শোভাতে।
তোমার স্তনের চন্দ্রবিন্দু স্পর্ধিত করে আমাকে,
বাধা দাওনিকো স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছিলে বনছায়াতে।
সারাটা দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে আবিষ্কারের নেশাতে,
এতো মায়াময়ী কি করে যে হলে, কত শোভা দেখি তোমাতে।দুহাত পেতেছি যা কিছু চেয়েছি সব দিয়েছিলে আমাকে,
লীন হয়ে গেছি, সব ভুলে গেছি,তোমার অমল শোভাতে।
সন্ধ্যা নেমেছে পাখিরা ফিরেছে তরুতলে তরুছায়াতে,
তবুও তোমার কিরণে মুগ্ধ হয়েছি জোনাকি আলোতে।
মনে করে দেখো কত দেরী হল মাঝি ফিরে গেলো কূলেতে,
তুমি আমি মিলে গিয়েছিনু ভুলে বাসর শয্যা সাজাতে।যদি তাই বলো, সে স্বপন ছিল চোখ বুঁজেছিল নেশাতে,
মদিরাবিহীন সে যে কি গহীন নেশাতে লিপ্ত তোমাতে।
ঘুম কি ভেঙেছে, পাখিরা জেগেছে, তরুতলে ছিনু বিছায়ে,
কত পাখি ডাকে ঘুম টুটে থাকে কুসুম কলির ফোটাতে।
যে প্রভাতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছি স্পর্শ করেছি তোমাকে,
সারাদিন রাত পরেও সে রাত হয়নিকো শেষ তোমাতে।
তাই চেয়ে থাকি অনিমেষ আঁখি আজও জেগে থাকি আশাতে,
জানি ভুলবো না, ভুলিনি কখনো সেদিনের সেই তোমাকে। -
কবিতা- বর্ষ বিদায়
বর্ষ বিদায়
-সঞ্জিত মন্ডলবর্ষ যায়, বর্ষ আসে, কালের নিঃশ্বাস সাথে
বিবর্ণ সময়ের ঘ্রাণ মেখে গায়,
কিছু হয়েছিল ভালো, কিছু বুঝি ছিল কালো
মহাকাল সময়ের নিক্তি মেপে যায়।ফেলে যাওয়া দিনগুলি চলে যায় সব ভুলি
স্মৃতিটুকু নিয়ে শুধু থাকি,
আত্মার আত্মীয় সাথে সময় চিনেছি তাতে
আপনার দৈন্য সদা ঢাকি।
যদিবা ডেকেছি পিছে, জানি আমি সব মিছে
ভাবনার জাল বৃথা বুনি,
তুমি আছো মহাকাল বিছায়ে অনন্তজাল
সময়ের ব্যথা বুঝি দাম দিয়ে কিনি।বল আরো কতকাল অপেক্ষায় কাটিবে কাল
কতখানি লেনাদেনা জানি,
মিটেছে কি সে হিসাব, লাভ ক্ষতি না জবাব
শূন্য ঝোলা বয়ে বৃথা আর কত টানি।
আলো দাও হে বিধাতা নক্ষত্র সেবিছে যেথা
মহাশূন্যে সে আলোকবর্ষে আছে থামি।
হেথাকার কাল কেন নাতিদীর্ঘ হয় জানো
সে হিসাব আমরা কি জানি।দাও বল, দাও আলো, অমর প্রদীপ জ্বালো
অন্ন বস্ত্র বাসস্থান করে দাও ভালো
যে তুমি অন্তরে থাকো এবার সমুখে এসো
ভালো করে এইবারে তোমারেই চিনি।
বর্ষ যায়, বর্ষ আসে অনন্ত ভাবনা সাথে
ভালো কিংবা মন্দ হবে সে কেমনে জানি,
তবুওতো আসা চাই অপেক্ষা করেছি তাই
হাসিমুখে সম্ভাষণ জানাবো সে জানি।। -
কবিতা- রেজারেকশন
রেজারেকশন
-সঞ্জিত মন্ডলরেজারেকশনে আবার এসো প্রভু
পৃথিবীতে আজ দারুণ দুঃসময়,
ভাইরাস ভয়ে জীবন স্তব্ধ আজ
পৃথিবীতে ফের সুসময় এনে দাও।
এ কালবেলায় আলো হাতে এসো আজ,
হিংসা ও দ্বেষ নাশকতা দূরে যাক
অবুঝ মানুষ জানে না কি দোষ তার,
মানুষ দেখুক মানবতার স্বরূপ।ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেছিলে,
হাজার দুঃখ ব্যথাতেও ধীর স্থির,
কুকাজের ভুল সবাই কি বোঝে আর
মানুষ দেখুক ক্ষমাসুন্দর মুখ।
ভাইরাস ভয়ে থেমে গেছে কতো কাজ,
গতিময়তাই জীবনে ফিরিয়ে আনে,
দুঃখ বিভেদ সব ভুলে যেতে দাও,
পৃথিবীতে ফের রেজারেকশন হোক।গোটা পৃথিবীই আশায় আশায় থাকে,
তুমি এসে সব ভালো করে দিয়ে যাবে,
পৃথিবী মেতেছে ধ্বংসের উল্লাসে,
এ অন্ধকারে তুমি আলোক জ্বালাও।
বেথলেহেমের শিশু বড়ো হয়ে যায়,
কাঁটার মুকুটে তবু কতো উজ্জ্বল,
দয়া মায়া আর শান্তির বাণী দিলে,
তবু দেখো তুমি ক্রুশবিদ্ধই হও।ভাইরাস ভয় গ্লানি ধুয়ে মুছে দাও
তোমার আশিসে রেজারেকশন হোক,
পৃথিবী আবার নতুন জীবনে ফিরুক
হে মহা জীবন এসো আনন্দময়। -
কবিতা- হাসপাতালের দিনরাত
হাসপাতালের দিনরাত
-সঞ্জিত মন্ডলএখানে কারোর প্রবেশাধিকার নেই
বন্ধ কাঁচের জানালায় রোদ কাঁদে-
বহু দূরেদূরে গাছপালাগুলো নড়ে,
বাইরে বাতাস বইছে তা বোঝা যায়।
আমি কোনো এক অজানা দ্বীপেতে একা
নিজভূমে পরবাসী হয়ে পড়ে আছি।
ঘুম হয় নাকো তাই একা জেগে থাকা
ভোরের আগেই রাত ভোর হয় দেখি।
শব্দ নেইকো লোক চলাচলও নেই,
গম্ভীর ডাক্তার আর নার্সদিদিরাই দেখে
পরীক্ষা নীরিক্ষা কারা করে চলে যায়,
কথা কম বলে কাজ বেশি করে দেখি।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাটে দিনরাত,
ক্লান্তিহীন পরিশ্রমেও পরিসেবা মুখ বুঁজে,
ওরাও প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে খেটে যায়।
এদিকে আমার মনে ঝড় বয়ে যায়,
মাঝে মাঝেই ব্রহ্মতালুটা ফেটে যাবে মনে হয়।
খিদে মরে গেছে, জ্বর ওঠে জ্বর নামে,
অক্সিজেনের লেভেলটা কমে যায়।
ব্লাড সুগারের অবস্থা ভালো নয়,
চারশো আশিতে উঠে বসে আছে সে,
ইন্সুলিনটা রোজ ওরা দিয়ে যায়।
ব্লাড প্রেসারটা তবুও সঠিক আছে,
হঠাৎ কিছুই হবে না অভয় দেয়।
বিধাতাকে ডেকে বলি হে মঙ্গলময়
যদি নিতে হয় নিজে এসে রেখো পায়।ছোট বেলাকার কবিতাটা মনে পড়ে-
Who has seen the Wind neither you nor I
But when the Trees are blowing the wind is passing by.
তবুও তো মনে হয়, একটু বাতাস লাগুক আমার গায়।
মধু বাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ বোঝা যায়।
হয়তো বাইরে সংগীত ধ্বনি বাজে
বন্ধ দুয়ারে সংগীত ফিরে যায়।
আরও কতো কিছু আবোল তাবোল ভাবি,
শরীরে কষ্ট আছে তাই মন বড়ো কাঁদে
ব্যথা যন্ত্রণা মাঝে মাঝেই কাঁদায়।
কবি যখন হাসপাতালে একলা শুয়ে হায়
ঘুম আসে কি কষ্ট রাতে ফুলের বিছানায়।
স্বাধীনতা নেই, পুরোপুরি এক বন্ধ বন্দীশালা-
কষ্ট করেও এখানে বাঁচাটা দায়
রুচি নেই মুখে খাবার কি তোলা যায়
দাসত্ব শৃঙ্খলে বদ্ধ করেছে যেন আমায়।
জীবন ভরেই প্রতিবাদী কবি বংশ পরম্পরায় কলম স্তব্ধ হবে কি এবার হাসপাতালের কারায়।
ঝর্ণার মতো বইবে কলম আকাশের মতো মুক্ত
ধরণীর ধূলোমাটি ভালোবাসি তাই অভিমানে হই সিক্ত।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবনা
এদের জগতে অন্য হিসেব কেউ আপন কেউ পর না।
মুক্ত দুনিয়া দেখে যেতে চাই ভাইরাস ভয় মুক্ত
মঙ্গল করো হে প্রভু আমার ভয় করো অবলুপ্ত।
জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণা ধারাই চাই
তোমার যজ্ঞে আহুতি দেওয়ার পূর্ণতা দেখে যাই।। -
কবিতা- ভালোবাসা
ভালোবাসা
-সঞ্জিত মণ্ডলভালোবাসা মানে একটু গোপনে কিছুটা উষ্ণ হওয়া,
ভালোবাসা মানে মনে বনে কোনে গোপনে জড়াতে চাওয়া।
ভালোবাসা মানে শীতে দুটি মনে আরও ঘন হতে চাওয়া,
ভালোবাসা মানে গোপনে গোপনে ভালো কিছু খেতে চাওয়া।
আড়মোড়া ভাঙি রোজ সকালেই ভালোবেসে চা’টা খাওয়া,
ভালোবাসি বলে রোজ সকালেই ভালো করে মুখ ধোওয়া।
ভালোবাসি বলে শীতের সকালে কিছু সোনা রোদ খাওয়া,
ভালোবাসি বলে শীতের বিকেলে গরম পোশাক চাওয়া।ভালোবাসি মানে গ্রীষ্মে গরমে একটু ঠান্ডা চাওয়া,
স্নান সেরে নিয়ে তাড়াতাড়ি ফ্যানে একটু শীতল হাওয়া।
ভালোবাসি বলে গরমে সকালে একটু হাঁটতে যাওয়া,
ভালোবাসি তাই আকাশে তাকাই একটু মেঘের ছায়া।
ভালোবাসি বলে বৃষ্টি সকালে পথঘাট ভরে যাওয়া,
ভালোবাসি ছাতা, নয় কচুপাতা, মাথাটা ঢাকতে চাওয়া।
ভালোবাসি ফুল কুড়াতে শরতে আগমনী গান গাওয়া,
আসবে জননী তাই জামা কিনি ঠাকুর দেখতে যাওয়া।ভালোবাসি সে কি চোখে জল দেখি বিসর্জনের খেয়া,
চলে যাবে বলে সব কিছু ফেলে বিষাদের গান গাওয়া।
হেমন্ত আসে হেমন্ত যায় সবইতো শিশিরে ধোয়া,
বসন্ত এসে ফোটাবে যে ফুল তারই পথ পানে চাওয়া।
এই ভালোবাসা প্রাণে জাগে আশা দুনিয়াতে আশা যাওয়া,
ভালোবাসি বলে নব হিল্লোলে প্রভাতের গান গাওয়া।
এ জীবনে ভাসি ভালোবাসা বাসি ভালোবাসা দিতে চাওয়া,
এসেছি এখানে এই ধরাধামে ভালোবেসে আসা যাওয়া।। -
গল্প- দ্রব্যগুণ !
দ্রব্যগুণ !
-সঞ্জিত মন্ডলইউনিক পার্কের যেখানে শেষ, তার উত্তর পশ্চিম কোনে শ্রীমাপল্লীর শুরু। ইউনিক পার্ক কোনো পার্ক নয়, এক বর্ধিষ্ণু অভিজাত পাড়া, অনেক গণ্য মান্য বরেণ্য ব্যক্তির আবাসস্থল। সেই তুলনায় শ্রীমা পল্লী নিতান্তই অর্বাচীন-ধানক্ষেতের মধ্যে গজিয়ে ওঠা এক নতুন পাড়া।
তা খেলার মাঠ বলতে, লাইব্রেরী, ক্লাব, ব্যায়ামাগার, ভালো স্কুল বলতে সবই ওই ইউনিকপার্ক।
কালীপূজো, দুর্গাপূজো সেও ওই ইউনিক পার্কে। পাড়াটা সত্যিই ইউনিক, তা সেখানে পার্ক থাকুক আর না থাকুক। আসলে ইউনিক ইন্সুরেন্স কোম্পানীর জায়গায় তৈরী বলেই ওই নাম।
ওদের আড্ডাটাও ওই পাড়াতে। ওরা মানে-ওই পথিক, শ্যামল, বিমল, কমল, জীবন, রতন, তারণ, রাসু, পাপুন, অরুণ, বরুণ, অমিত, সঞ্জিত, সুব্রত আর খোকন।
ওরা সবাই খুব বন্ধু। একেবারে প্রাণের বন্ধু। সমব্যাথী, সহপাঠী, সহ খেলোয়াড়, সবকিছু। একপাড়ায় না থাকলেও একই স্কুলে পড়ে, একসাথে ফুটবল, ক্রিকেট, হুশহুশ, সিরগজি, হাডুডু, দাড়িয়াবান্দা, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি খেলে, একসাথে ক্লাবঘরে ব্যায়াম করে, বসাক বাগানের পুকুরে সাঁতরায়, বেড়াতে যায়, দুর্গা-কালী-সরস্বতী পূজা করে, চাঁদা তোলে, একটা সিগারেট ভাগ করে খায়, আরো কত কি করে।
ওদের অনেকেই ইউনিক পার্কে থাকলেও বেশীর ভাগ আসে পাশের পাড়ার। ওদের সকলেরই স্কুল কলেজের গণ্ডী পেরোনোর পর, সেবারই প্রথম ওদের কাঁধে দুর্গাপুজোর ভার পড়েছে। বাড়ির অনুশাসন ডিঙিয়ে রাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকার অনুমতি মিলেছে। এই প্রথম বারের স্বাধীনতা সেলিব্রেট করার জন্যে ওরা কিছু একটা করবে ঠিক করলো।বিস্তর আলোচনা, মতানৈক্য, অভিমান ইত্যাদির পর ঠিক হল বড় পূজো যখন একটু সিদ্ধি খাওয়া যেতেই পারে। আমাদের ছোট বেলায় বিজয়াদশমীর দিনে অনেক বাড়িতেই ঘুগনি, মিষ্টি আর সিদ্ধির ব্যবস্থা থাকতো। আমরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে প্রণামের বিনিময়ে সেগুলো উদরস্থ করতাম।
ঠিক হলো, বিজয়ার সিদ্ধিটাকে একটু এগিয়ে এনে সপ্তমীর দিনে ব্যাপারটাকে পরখ করলে কেমন হয় দেখা যাক। যেহেতু সিদ্ধিটা নির্দোষ নেশা বড়রা জানতে পারলেও খুব বেশী বকাবকি করবে না।
বলা ভালো, আজ থেকে দশ-বিশ বছর আগেও মদের এমন মোচ্ছব ছিলনা। পাওয়া যেতনা এমন নয়, তবে তা শুধু দুর্লভ ছিলনা তাই নয়, অল্পবয়সী কারো হাতে বোতল যেমন অসম্ভব দৃশ্য ছিল, তেমনি, স্কুল -কলেজের পাশ করা ছেলেরাও বোতল কল্পনাই করতে পারতো না। আর গল্পটা যেহেতু পঞ্চাশ বছরের পুরানো ওরা সিদ্ধিতেই সন্তুষ্ট রইলো।
কিন্তু বানাবে কে? সিদ্ধি বানাবার কায়দা আছে। দুধ লাগবে, বাদামবাটা, ডাবের জল, চিনি মায় সিদ্ধিটাও তো কিনতে হবে। আর ওদের যা বয়েস, ওদের কেউ সিদ্ধি বিক্রী করবে না।
ঠিক হল পূজোর ঢাকিকে দিয়ে সিদ্ধি কেনানো যাবে। একজন বললো সে তার পিসিকে দিয়ে বাদাম বাটাতে পারবে। দুজন ডাবের জল আর দুধ যোগাড় করার দায়ীত্ব নিল। নাপিত বাগান থেকে ডাব আর গোয়ালা পাড়ার দুধ। সিদ্ধির ব্যবস্থা পাকা হলো।বাড়ির বাইরে বেশী রাত পর্যন্ত থাকার স্বাধীনতা উদযাপন শুরু হল রাত বারটার পর। বড় বালতির এক বালতি সিদ্ধির সরবৎ গোলা হয়েছে। প্রথমে সবাই এক গ্লাস করে নিল। স্বাধীনতার জয়, দুগগো পূজোর জয়, জয় সিদ্ধির জয়। প্রথম গ্লাসটা কেউ ঢক ঢক করে, কেউ সুরুৎ সুরুৎ চুমুকে, কেউ রইয়ে সইয়ে চুমুক দিতে দিতে স্বাধীনতা উদযাপন করতে শুরু করলো।
কিন্তু কিছুক্ষণের মধেই অত বড় বালতির সরবত শেষ। প্রথম বার পেট ভরে খাওয়ার ফলে সকলেই ব্যোমভোলা ব্যোমকেশ।
কিন্তু কারো আবার নতুন চৈতন্যের উদয় হোল। লেট নাইট বাড়ির বাইরে মানে তো সারারাত বাড়ির বাইরে নয়। তাহলে? এদিকে সকলেরই মাথাটা টলমল করছে, শরীরটা দুলে ঊঠছে, পা দুটো কোনমতেই নিজের বশে নেই। ইচ্ছা না থাকলেও হাসি পাচ্ছে। আর একবার হাসলেই কেমন যেন ভুসভুসিয়েই হাসিটা পেটের ভেতর থেকে ঠেলে উঠে আসছে। সামলানো যাচ্ছে না। আর বাড়ি ফেরার রাস্তাটাও কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। কে যে কাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে সেই নিয়ে শুরু হল ঠেলাঠেলি।শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো, জীবন যাবে পথিককে পথ দেখাতে শ্রীমা পল্লীতে।
শ্রীমাপল্লীতে যেতে গেলে বড় একটা কাঁচা জল নিকাশি নর্দমা ডিঙিয়ে পেরোতে হয়।ইউনিক পার্কের সীমানায় এল,আই,সি, র মাঠ, তারপরে সেই নর্দমা।
এল,আই,সি,র মাঠটা অন্ধকার। দু’ চারটে জোনাকি জ্বলছে। হালকা, পাতলা একটা কুয়াশার আবরণ মাঠটাকে রহস্যময় করে তুলেছে। জীবনের মাথাটা দুলেদুলে উঠছে। দুবার চোখ কচলে নিয়ে পথিককে ভালো করে ঠাহর করে দেখে বললো, কিরে, রাস্তাটা ঠিক আছে তো?
পথিক রসিকতা করে বলে, জীবন চলেছে পথিককে পথ দেখিয়ে, সে পথ কি ভুল হতে পারে? বললো বটে, কিন্তু নিজেই সন্দিহান হয়ে গুনগুনিয়ে উঠলো, “জীবনপুরের পথিকরে ভাই কোনো দেশেই সাকিন নাই ——–”
ওরা মাঠ পেরিয়ে সেই নর্দমার কাছে এল।
পথিকের হঠাৎ মনে হল, জীবন তাকে এ কোথায় নিয়ে এলো, এইতো সেই পদ্মানদী, কেমন কুলুকুলু শব্দ তুলে এপার ওপার বয়ে চলেছে। বাবার কাছে এ নদীর কত গল্প শুনেছে সে। এই কি সেই গোয়ালন্দের ঘাট!
সে জীবনের হাতটা ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে- জীবন, তুমি আমার বন্ধু হয়ে এতো বড় বিশ্বাসঘাতকতাটা করতে পারলে? জীবন জড়ানো গলায় বলে কি করলাম রে বাবা! পথিক বলে, যাব শ্রীমাপল্লীর ঘরে, আর তুমি নিয়ে এলে পদ্মার চরে! ভালো করে চোখ কচলে নিয়ে জীবন বলে, আরে কথায় কথায় কখন পদ্মাপারে চলে এসেছি, খেয়ালই করিনি। এই জন্যেই বলেছিলাম, বেশী নেশা করো না। পেয়েছো দুধ বাদামের সরবৎ, গিলেছ বেশ খানিকটা। এখন মনে হচ্ছে পথিক তুমি সত্যিই পথ হারাইয়াছ।পথিক সত্যিই চিন্তিত হয়। তাই তো, রোজই কি তাহলে সে পদ্মা পেরিয়ে ইউনিক পার্কে আসে! এই দুকূল প্লাবিনী পদ্মা! এত রাতে পদ্মার ঘাটে না আছে স্টিমার-লঞ্চ,না আছে ভুটভুটি বা ডিঙি নৌকা। নিদেনপক্ষে পাল তোলা নৌকাটাতো থাকবে! শ্রীমা পল্লীর বাড়িতে কিভাবে পৌঁছাবে তার কূল কিনারা পায় না।
সেই রাতে দিগভ্রান্ত দুজন সেই নর্দমার পাশে দাঁড়িয়ে জীবনের বিচিত্র গতিপথে নদীর ভূমিকা, সভ্যতার বিকাশে পদ্মা-গঙ্গার অবশ্যম্ভাবিতা স্বাধীনতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে গঙ্গা-পদ্মার অবদান ও ভূমিকা, সুরে, ছন্দে, গল্পে, উপন্যাসে বাংলা আর বাঙালীর আশা আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গায়িত স্বপ্নের মেদুর কলনিনাদ এই দুই নদীর প্রবল ঘূর্ণিপাকে, প্রতিটি তরঙ্গ বিভঙ্গে গঙ্গা-পদ্মার বিমুর্ত বিভাস এমন অনায়াসে তাদের দুই পাড়ার মধ্যে কল্লোলিনী হবে এটা যেন তাদের স্বপ্নেরও অতীত।
কিন্তু এতো রাত হলেও পদ্মায় কিছুই চলবে না এটাও তাদের স্বপ্নের অতীত। এটা আগে বুঝতে পারলে ওরা মাঠের উন্মুক্ত পরিবেশে শিশির ভেজা ঘাসে ঘাসে নি:শব্দে পদচারণা করে আজ রাতটা কাটিয়েই দিত।
তুরীয়ানন্দ অবস্থাতেও পথিকের মাথায় বিবেকের বাড়ি লাগে। রাতে উন্মুক্ত প্রন্তরে শয্যা নিলে পরবর্তী কালে স্বাধীনতা অসংকুচিত হতে পারে। তাই যত রাতই হোক নৌকা বা লঞ্চ পাওয়া যাক বা না যাক, ঘরে ফেরাটাই সাব্যস্ত হলো।
দুজনে ঠিক করলো, কিছুই যখন পাওয়া যাচ্ছে না, জীবন এক ধাক্কা লাগাক পথিককে। তাতে,যতদূর পদ্মা পেরোনো যায় যাক। ওদের মাথায় হনুমান লম্ফঝম্ফ শুরু করলো। পথিক হনুমানের মতই লাফ মেরে পদ্মা পেরিয়ে যাবে। ঠিক হলো জীবনের ধাক্কা আর পথিকের লম্ফন দুয়ে মিলে পদ্মা পার। ওরা দুজন গলা জড়াজড়ি করে একপ্রস্থ কেঁদে নিলো। পথিক ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, শেষ পর্যন্ত তুমি আমাকে ধাক্কা মেরে পদ্মা পার করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে? পথিক বলে, আমার আর ঘরে ফেরা হবে না। জীবন সিরিয়াস হয়, বলে, অন্য উপায় দেখছি না, ধাক্কা তোমায় মারতেই হবে। বলতে বলতেই সে মারে এক ধাক্কা আর পথিকও সময়মত লাফায় চোখ বন্ধ করে। কিছুপরে সে চোখ খুলে অবাক বিস্ময়ে বলে দেখ জীবন দ্রব্যগুণে একলাফে পদ্মা পার! সলিলসমাধি হয় নি আমার!!
পুনশ্চ।। সেই সেদিনের আমরা ষাটের সীমা পেরিয়েছি পাঁচ-সাত বছর আগেই, তবে আমাদের আত্মিক বন্ধন এখনও সেই আগের মতই অটুট আছে। সেই ঘটনার কথা আজও জাগরুক আছে আমাদের মনের মণিকোঠায়।