-
কবিতা- শেষ কবিতায় তুমি
শেষ কবিতায় তুমি
– অমিতাভর সরকারবছরের শেষ কবিতায় কি তুমি থেকে যাবে!
নাকি সরষে ফুলের হলুদ গন্ধের সাথে তুমি মিশে থাকবে আমার জীবন ভোর?
পৌষের গন্ধ ডাক দিয়ে যাবে, ডাক দিয়ে যাবে লাল, হলুদ, কমলা রঙের মেলা মাঠে মাঠে, প্রান্তরে-প্রান্তরে কচি-কাঁচার সাথে অবাল বৃদ্ধ-বনিতা মিষ্টি রোদের সঙ্গে মিশে থাকবে। মেতে থাকবে আনন্দের খোলা বাতাসে, চড়ুইভাতির উৎসবে। নদী, সমুদ্র, পাহাড়, জঙ্গল সবকিছু হিমেল হাওয়ার উত্তাপ গ্রহণ করবে। ঠোঁট ফাটা বাতাসেও আনন্দের ফুলঝুরি ছুটবে, ঠিক যেন লেপের মধ্যে ওম নেয়ার মত।
বছরের শেষ কবিতায় তুমি না থেকে আমাকে আবর্তিত করে থাকো, উৎসাহ যোগায় তোমার সাথে প্রতিদিন যেন আমি আবদ্ধ থাকতে পারি।
চুম্বনে চুম্বনে ভরিয়ে দিতে পারি প্রতিটি ছত্র। সেখানে রূপসী হয়ে থাকবে, আমি রূপকার। লাগবে না তোমার ভালো? চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া,
গোলাপের মতো তুমি উদ্ভাসিত হবে। আরো কত কি—- -
কবিতা- রক্ত গোলাপ ও অনুপমা
রক্ত গোলাপ ও অনুপমা
– অমিতাভ সরকারসেদিন সমুদ্রসৈকত ছিল,
মেঘ ছিল..টিপ টিপ বৃষ্টি।
উতল হাওয়া ছিল,
ছিল শেষ না হওয়া কত কথা।
সমুদ্রে ঢেউ ছিল, ঢেউয়ের পর ঢেউ,
সেদিনও সন্ধ্যা নেমে ছিল,
আকাশে উঠেছিল দুধ সাদা চাঁদ।
তোমার হাত দু’টো কত মোলায়েম ছিল,
তোমার কথা ছিল ঝরে পড়া তারার মত।
তোমার কথা শুনতে লক্ষ্মীপেঁচা এসেছিল,
সেদিনও শরৎ পূর্ণিমা ছিল আজকের মত।একটা সময় ছিল, পাহাড়ের ঢালে কমলা তলায় বসে একাকী তোমাকে দেখতাম।
তুমি, হ্যাঁ তুমি ঝর্নার মত নেমে আসতে আমার চোখে অশ্রু হয়ে।
মনে হতো তুমি কত দূরে চলে গেছো, কোনূ এক অজানা দেশে।
তুষার ঝরে পড়লে মনে হতো তুমি আমাকে জড়িয়ে আছো।
টুপ করে একটা কমলালেবু কোলে এসে পড়লো, হেসে বললো কিসের দুঃখ ?
এইতো আমি তোমার কাছে। সত্যিই আমি সেটাই গালে চেপে ধরে তোমাকে অনুভব করতাম।
দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার পর আজ আবার কোজাগরী এসেছে।
চরাচর ভেসে যাচ্ছে চাঁদের আলোয়। আজ নদীরপারে প্রাণহীন শরীরে আমি।
অনতিদূরে প্রস্তুত গোলাপ কাঠে তৈরি চিতা। ধীরে ধীরে নিয়ে শোয়ানো হবে সেখানে।
প্রজ্বলিত হবে সেই চিতা। তারপর পঞ্চভূতে বিলীন হব আমি। অনুপমা তোমার প্রিয় ছিল গোলাপ। সেই গোলাপ কাঠেই আমার চিতা তৈরি করিয়েছিলে।
শেষ সময়েও আমাকে জড়িয়ে রাখলে তোমাতে।
-
অণু কবিতা- কুঁড়ি ফুটেছে
কুঁড়ি ফুটেছে
– অমিতাভ সরকারমন চেয়েছে তোমার আমার,
চুপ থাকলে কি আর হবে।
ফুল ফুটেছে গাছ সেজেছে,
আর প্রেম কি আড়ালে রবে?চন্দ্র কিরণে হাসির জোয়ার,
তারারা মিটিমিটি হাসে।
প্রেমের তরী পারে ভিড়েছে,
ভাসবে সোহাগ রসে।ভাটিয়ালি সুরে নদী বয়ে যায়,
ছাওনি ঢাকা তরী।
দুজনের প্রেমে আকাশ দুলছে,
চাঁদের আলোয় হেরি। -
কবিতা- পাহাড়ের ঢালে তুই
পাহাড়ের ঢালে তুই
– অমিতাভ সরকারএকমুঠো পাহাড় এনে দিস সঙ্গে এক ঘটি ঝর্নার জল। পারবি এনে দিতে অন্তত একটি প্যারোট ফ্লাওয়ার সযতনে। না জানিয়ে তুই চলে গেলি কু ঝিক ঝিক করে। ফিরে এলে গল্প শুনে নেব।
নির্লজ্জের মতো তোর বেড়ানোর বিলাসিতা শোনাবি । কত ব্যাকরণ বর্ণিত হবে।কি করে ভেবেছিলি তুই, তোর অপেক্ষায় আমি বসে থাকব?
অমিও মত্ত সমুদ্র স্নানে। নীল নীলিমায় রৌদ্র নেমেছে। নীলিমা সঙ্গে আছে।
হেমন্তের শীতল আবহাওয়ায় চাদর মুড়ি দিয়ে
তোর কথা ভাবতে ভাবতে স্বপ্নে ফিরে এলি তুই
এই বিদেশ ভূমিতে।কিসিং ফ্লাওয়ারে ঠোঁট লাগিয়ে তোকেই অনুভব করছি। নীলিমা তো শুধু উপমা।
সবকিছু ভুলে শুধু তুই, তুই আমার প্রিয়তমা।
-
কবিতা- অবশেষে
অবশেষে
– অমিতাভ সরকারদুচোখের অশ্রুতে লেখা হল কতকথা,
মাতৃ বন্দনার শেষ নির্ঘণ্টে তুমি দেখা দিলে।অভিমান, অভিযোগ সব মুছে একাকার,
নির্লিপ্ত হৃদয়ে রয়ে গেল আনন্দেরই বিচ্ছুরণ।
শারদ শিশিরে মুছে ছিলে মুখমণ্ডল,
দুই চোখে নিবিড় প্রেম ছিল,
আলক্ত ঠোঁটে আদরের ঘনঘটা,
দু’বাহু উন্মুক্ত করে বেষ্টন করেছিলে।গঙ্গার পুণ্য সলিলে স্নান সেরে
দুজনে মুক্ত হলাম পুরাতন ইতিহাস থেকে।টাইগার হিলের নব সূর্যের রামধনু রঙের মত সাজাতে চাইলাম নতুন জীবন।
দুজনে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে
চলেছি ভবিষ্যতের দিকে। -
কবিতা- কবিতায় অন্তর
কবিতায় অন্তর
– অমিতাভ সরকারসব লেখাই কবিতা হয়না,
সব ভালোবাসা প্রেম হয় না।
রূপবতী হলেও হৃদয় থাকেনা,
সাধারণ লেখাতেও অনুভূতি থাকে;—
বেণু-বনে জোছনা নামে, শ্মশান ঘাটে
ঊষার উদয় হয়, কলুর ঘানি থেকে
বিশুদ্ধ তেল নামে।
কালো মেয়ের অন্তরে ভালোবাসা থাকে,
কালো চোখে প্রেম থাকে, হাসলেও মুক্ত ঝরে।
বুকের মাঝে উষ্ণতা থাকে, আদরে আবেগ থাকে,ঠোঁটের মাঝে কাঁপন থাকে, অন্তর দিয়ে জীবনভর সুগন্ধ ছড়ায়।
অক্ষরের সঙ্গে অক্ষর যুক্ত হয়ে শব্দ হয়, শব্দে রূপশয্যা হয়, ফুলঝুরিতে রঙ ঝরে।তারপর অন্ধকার। অন্ধকারের আলাদা রূপ আছে,
রুপের একটা অনুভূতি আছে ঠিক সাধারণ লেখার মত।
-
কবিতা- আমাতে তুমি
আমাতে তুমি
– অমিতাভ সরকারশুক্লপক্ষে চাঁদের প্রকাশ,
অমাবস্যায় আঁধার আকাশ।
আমাতে চাই তোমার সুবাস।গন্ধ ভরা প্রভাত সায়রে,
জুড়ায় পরান নিহরে নিহরে।শিউলি সকাল আনমনে আসে শিশির ভরা ছন্দ নিয়ে,
সেই শিশিরে আঙ্গুল ভেজাও।
শিশির বিন্দুর নাকছাবিতেউদাস মনে মুখ ঘোরাও ।
তোমার হাসিতে শিউলি ফোটে
অলক্ত ঠোঁটের সিক্ত শিশিরে।
নিখিল নীল স্নিগ্ধ বাতাসে,
তোমারছবি এঁকেছি আকাশে।
মেঘের ভেলায় শুভ্র রঙে,
তুমি দুলছ নিজের ঢঙে।নিজের সময়ে রাত্রি নামে,
নিশির আলাপন তোমার নামে।
কালো রাত্রি সুখে সুখে ভরা,
আকাশ সাজাতে হেসেছে তারা। -
কবিতা- মনের বসন্ত রায়
মনের বসন্ত বায়
– অমিতাভ সরকারঅব্যক্ত অনেক কিছু রয়ে যায়।
সমুদ্রতটে লেখা ছিল অনেক কবিতা।
ঝিনুক কুড়ানো গল্প, হু হু বাতাসে আঁচল উড়ে গিয়ে বুক ঢাকা ছিল মেঘবরণ চুলে,আদরের উষ্ণতার ছবি আঁকা ছিল। ফিসফিস শব্দের বাসরঘর কতবার তৈরি হয়েছে;–
-কি সুন্দর আবেশ মথিত সময়।
শান্তি নিকেতনের পলাশের সাজে স্বপ্নের খেলাঘর রচিত হয়েছিল।
আরো কত কি লেখা ছিল সমুদ্রতটে আঁকা কবিতায়।
সবকিছু ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে গেছে সমুদ্রে।
অনুপমা তুমি চলে গেছো অনেক দূরে।তোমাকে নিয়ে আঁকা কবিতাগুলোর নির্যাস টুকুও তোমার কাছে অজানা থেকে গেল।
-
কবিতা- কবিতার অন্দরমহল
কবিতার অন্দরমহল
– অমিতাভ সরকারকবিতা তো কথা বলে না;—
অনুভূতিগুলোকে সাদা কাগজে লিপিবদ্ধ করে।
পাহাড়ের স্তব্ধতা, নিখিলের রংমহল, তুষার বৃষ্টি,
ঝর্নার অনবদ্য নৃত্য, জলপ্রপাতের গর্জন, নদীর সমুদ্রে মিশে যাওয়ার আকুতি আর তোমার বৃষ্টিভেজা সেদিনের চোখ আজও মনে করিয়ে দেয় তুমি ভালোবেসেছিলে।তুমি মিশে যেতে চেয়েছিলে হৃদয়ের বন্দরে।
মরীচিকা বন্দর তুমি খুঁজে পাওনি।
হয়তো বা আজও খুঁজে চলেছো মধ্য রাতের ঘুম ভাঙ্গা স্বপ্ন সায়রে।
শীত পেরিয়ে বসন্তের হাওয়া চারিদিকে। শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার সদর্প পদধ্বনি।
রঙে রঙে রঙিন প্রকৃতি। এখন তো যৌবনের ডাক।
কোকিলের কুহু কুহু, বেণু-বনে জোনাকিদের উচ্ছ্বলতা। দোল পূর্ণিমার রাত।
মরীচিকার বন্দর হোতে স্বপ্ন হয়ে যেতে ইচ্ছে করে তোমার সেই স্বপ্ন সায়রে।
নরম আঙুল দিয়ে তোমার বৃষ্টি ভেজা চোখ মুছে দিতে। ।
-
কবিতা- অনুপমার কাছে
অনুপমার কাছে
-অমিতাভ সরকারবিন্দুমাত্র কষ্ট ছিল কি সেদিন?
অজান্তে বারবার নিজেকে প্রশ্ন করে উত্তর মিলছে।
না কোন কষ্ট ছিল না, ছিল এক রাশ অভিমান।
অভিমান থেকে ঝরে পড়েছিল দীর্ঘশ্বাস, বিন্দু বিন্দু নোনতা বৃষ্টি।
অভিশাপ ছিল না ,ছিল অন্তরের অসীম ভালোবাসা।
শুধু বারবার হৃদয় থেকে বেরিয়ে এসেছিল তুমি ভালো থেকো ,সুখে থেকো।
অভিমান মিশ্রিত অশ্রুগুলো ফুল হয়ে তোমার কাছে পৌছে গেছিল এই বার্তা নিয়ে।
তুমি কতটুকু বুঝেছিলে জানিনা।
জীবন সায়াহ্নে এসে সেই স্মৃতি কেন এখন দুঃখ দিচ্ছে বুঝে উঠতে পারিনা।
সেদিনের অভিমান আজ কেন দুঃখের প্রতিচ্ছবি।
অনুপমা তুমি কি উত্তর দেবে?
বকুলের গন্ধ তুমি কি এখনো পাও?