-
চলে যেতে হবে..
চলে যেতে হবে..
-জ্যোৎস্না ভট্টাচার্য ত্রিবেদীচলে যেতে হবে …
একদিন চলে যেতে হবে
ফেলে এই ঘর দূয়ার, এই শহর, এই দেশ, সভ্যতা, সখ্যতা,সংস্কৃতি, ধর্মান্ধতা, ভালোবাসা, বিশ্বাস, ঘৃণা অবিশ্বাস–
সব, সব ফেলে চলে যেতে হবে।পরিযায়ী পাখিদের মতো আসা আর যাওয়া
নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পথ ধরে–
সময় ফুরোলেই ফেরার তাগিদ–
যেমন শীত ফুরোলেই পাড়ি জমায় বসন্তের খোঁজে।
চির বসন্তের দেশে ফিরে যাবার সে অমোঘ টান–
উপেক্ষার নেই কোনো উপায়
কারণ ও কি আছে কিছু..?
আছে কি কোনো মায়ার বাঁধন কিংবা কোনো টান পিছু..!
হয়তো বা আছে, হয়তো বা থাকে, সকলেরই কিছু না কিছু।
স্বামী, পুত্র, স্ত্রী, কন্যা, হয়তো বা কোনো গোপন প্রেম–
কিছু পাওয়া অথবা অনেক না পাওয়ার
লোভী কিংবা নির্লোভ আকর্ষণ।
থাকে আরো কিছু, ভবিষ্যতের সুখ-আশা, হয়তো কিছু আকাঙখা পূর্ণ হবার প্রতীক্ষায় প্রহর গোনে।
হয়তো বা কারো সময় পূর্ণ হবার আগেই আসে চট জলদি জরুরি তলব।
ঠিক যেমন এক প্রদীপ তেল থাকা সত্ত্বেও,
হঠাৎই নিভে যায় কোনো এক দমকা হাওয়ায়।
পড়ে থাকে পরীক্ষা পাসের সুখবর, হয়তো কোনো কিশোরী বেলা উত্তীর্ণ সদ্য যুবতী থাকে অপেক্ষায়–
থাকে কোনো মা, ভাতের থালা সাজিয়ে উৎকন্ঠায় আকূল–
অপেক্ষায় থাকে সদ্য চাকরী পাওয়ার সুসংবাদ বয়ে আনা এপোয়েন্টমেন্ট লেটারটি।
হয়তো পাড়ার জীর্ণ শীর্ণ নেড়ীগুলোও থাকে অপেক্ষায়-তাদের প্রতিদিন বিস্কুট খাওয়ানো মানুষটির ফেরার প্রতীক্ষায়……
তবু চলে যেতে হয়– সব অপেক্ষার মায়া ছেড়ে
সমস্ত আকাঙখা ঝেড়ে ফেলে চলে যেতে হয়–
কোনো স্নেহ, ভালোবাসা বা দয়ারই পূর্ণ সন্মান জানানো হয় না।
সব কিছুই অপূর্ণ, অসম্পূর্ণ ফেলে, চলে যেতেই হয়।।চলে যাবো–একদিন
কোনো একদিন চলে যাবো ঠিক
কারো ডাকেই আর পিছু ফেরা হবে না–
হবে না আর কোনো প্রতীক্ষারই সুখাবসান।
মান, অভিমান, আশা, আকাঙ্ক্ষা সমস্ত চাওয়া পাওয়ারই হবে অবসান—-
হবো না কারো অসন্তোষ, বিরক্ত বা বিদ্রুপের কারণ..হয়তো থাকবে প্রতীক্ষায় অনেক সুখবর, ঘটনা, দূর্ঘটনা ও
হয়তো কষ্ট পাবে কেউ কেউ, হয়তো কেউ খুশীও হবে( মনে মনে অবশ্যই)
শুধু ফেরা হবেনা আর-
একটি বারের তরেও পিছু ফেরা….
একবার পা বাড়ালে, যেতেই হবে…
চলে যেতে হবে—-
পিছুটান যতো, সমস্ত পিছনেই ফেলে
চলে যাবো- একদিন ঠিক–
কোনো একদিন..কোনো..একদিন….।। -
ভুলে যাই…
ভুলে যাই…
-জ্যোৎস্না ভট্টাচার্য ত্রিবেদীবড়ো ভুলে যাই আজকাল—-
সব ভুল হয়ে যায়,
সকাল সন্ধ্যায় তুলসি তলায় প্রণাম, পিদিম, ভুলে যাই…
ঠাকুর ঘরে সন্ধ্যা বাতি দেখাতে ভুল হয়ে যায়—
ভুল হয় পরিপাটি সাজিয়ে ভাতের থালাটি ধরতে–
ভুল হয়ে যায় প্রতিদিন সন্ধ্যায়
দেখা প্রিয় সিরিয়াল….
ভুলে যাই — আগে আমি শাক, ডাল,, এগুলো খেতামই না..
ভালোবাসতাম যা যা, এখন সবই প্রায় ভুলে গেছি—
ভুলে গেছি পাখীর মতো মিষ্টি সুরে গাইতে….
কবিতা, গল্প, গান.. সব কিছু লিখতেই, বড়ো ভুল হয় আমার আজকাল…
‘বাংলা’ লিখতে গিয়ে, ভুলে ‘হিন্দি’ লিখে বসি।ভুলে গেছি কতো কিছুই, কতো কিছুই ভুলে যাচ্ছি অহরহ…
আশ্বিনের সেই শিউলি ছড়ানো পথে চলা…
কার্তিকের বিন্দু বিন্দু শিশিরে ভেজা ঘাসে পা ডুবিয়ে হাল্কা শীতের আমেজ নেওয়া…
ভুলেই গেছি শীতের ছুটিতে মামাবাড়ী যাবার কথা —
ট্রেন থেকে নেমে রিকশায় যাবার পথে, নতুন গুড় জ্বাল দেবার অতূলনীয় মিষ্টি গন্ধ।
প্রতি সন্ধ্যায় দাদু র সাথে বাজার ফিরতি পথে দুটি মিষ্টি বরাদ্ধ….
” একটা বাড়ী গিয়ে খাবে, আর একটি কাল সকালে” … দাদুর বলা…
ভুলে যাই আরো কতোকিছু..
দিদার হাতের সেই অপূর্ব ছোটো মাছের ঝোল…
অথবা, কলসি থেকে নতুন গুড় ইচ্ছে মতো ঢেলে নিয়ে চুমুক দিয়ে অথবা চেটে চেটে.. আহা :
সব — সব ভুলে গেছি —
সমস্ত ভালো লাগার স্মৃতি আজ বিস্মরণ…..শুধু ভুলিনা আজ ও তোমার না রাখা কথাগুলো…
ভুলিনি ধীরে ধীরে আমার ‘মেয়ে’ থেকে ‘বৌ’ হয়ে ওঠার অসম্ভব কষ্টদায়ক দিনগুলো।
ভুলিনা আজ ও সেই রাতগুলো, যেগুলো ভরে উঠতো— কেটে যেতো চাপা গুমরে ওঠা কান্নায়,
নিজেকে নির্ভুল, পটু, সফল গৃহবধূ প্রতিপন্ন করার চেষ্টায় নিজের সমস্ত সত্ত্বা,সবটুকু আমিত্বকে বিসর্জন দেওয়ার, অস্বীকার করার সফল প্রকাশের কান্নায়।
না না, কেউ দেখেনি, কেউ কোনোদিন ও জানেনি, সে কান্না, সে অসহায় আক্ষেপ।
একটি বারের জন্য ও ভুলিনি তা গোপন করতে—
ওই একটি ব্যাপারে সম্পূর্ন সফল আমি, নিজেকে ‘সুখী’ প্রতিপন্ন করতে।তাই ভাবি, ভুলে যাই কতোকিছুই —
যা মনে করতে চাই, রাখতে চাই মনে আপ্রাণ —
ভুলে যাই — অথচ যা আমার দুঃস্বপ্নের স্মৃতি, ভুলতেই চাই একেবারে — সব কিছু জ্বলজ্বলে হয়ে ওঠে।।এমনি ভাবেই ভুলতে ভুলতে হয়তো একদিন ভুলে যাবো সবই…
ভুলে যাবো তোমাকেও…
কোনো একদিন, হয়তো বা আমাকেও…
হ্যাঁ, নিজেকেও ভুলে যাবো আমি, ঠিক, কোনো একদিন..
আর সেদিন ই মুক্তি… সেদিন ই আমার মুক্তি….“আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, এই আঁধারে…”
-
স্রোতোস্বিনী
স্রোতোস্বিনী
-জ্যোৎস্না ভট্টাচার্য ত্রিবেদীওলো — ও নদী, তুই চললি কোথা,
কোন অজানার দেশ…
কোন সে অচীন পুরে পাবি
অজানা ‘ সন্দেশ’।।
কোন সাগরে মিলতে রে তোর
পাগল পারা গতি…
গ্রাম গঞ্জ ভাসিয়ে ছুটিস, লাজ নেই এক রতি…!!ঘর দালান আর পুকুর বাগান
কোথায় যে যায় ভেসে…
উন্মাদিনীর ধ্বংস লীলায়
মুছে যায় নিঃশেষে।।
জন-জানোয়ার,বিভেদ কি আর
তোর কাছে সব এক…
জোয়ান বুড়ো কচি শিশু
(তোর) স্রোতে ওই ভাসে দেখ।ঘর ভাসিয়ে, গ্রাম ভাসিয়ে
ছুটিস যাহার প্রতি,
সে কি রে তোর অমর প্রেমী
গত জন্মের পতি…!!
চার পাশে সব ধ্বংস করে
মিলবি তারি সনে,
তোর প্রেমী কি ভুলবে রে তোর ভালোবাসার গানে…?তোর মতো তার ‘শতেক’ প্রিয়া
ঝাঁপিয়ে পড়ে বুকে
সবাইকে সে গ্রহণ করে
মেলায় পরম সুখে।।তুই ও তো সেই মিলিয়ে যাবি
হারিয়ে যাবি আর,
নামটাও যে থাকবে না তোর
গাল ভরে ডাকবার।সাগর জলে মিলেমিশে নদীর জীবন শেষ…
উজার করে দেবার তরেই
নদীরা নিঃশেষ।। -
জীবন যে রকম
জীবন যে রকম
-জ্যোৎস্না ভট্টাচার্য ত্রিবেদীজীবনটা কবিতার কোনো ছেঁড়া পাতা নয়…
নয় বিখ্যাত কোনো কবির বহু প্রচলিত কবিতা…
নিষ্ঠুর, কঠিন, কঠোর গদ্য, সুরহীন, ছন্দহীন, তালহীন,
কিন্তু প্রানহীন কখনোই নয়।অসম্ভব জীবন্ত,
প্রখর রৌদ্রে পিচগলা রাস্তায় ক্লান্ত, অবসন্ন, পিপাসার্ত
পথিক যেমন দুরন্ত বেগে গন্তব্যে ছুটে চলে, ঠিক তেমনই গতিময়।
মেলার ভিড়ে মাকে হারিয়ে ফেলে ছোট্ট শিশু ভীত, সন্ত্রস্ত,
আকূল হয়ে যেমন মাকে ই খোঁজে….. তেমন ই আকূলতা ময়।।
সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ঘরে ফিরে,
প্রেয়সীর কপালে লাল টিপটি দেখে যে ভালোবাসায় মন ভরে ওঠে,,,,
তেমন ই ভালোবাসাময়।।
প্রথম যেদিন ছোট্ট শিশুটি হঠাৎ ই মা বলে ডাকে,,,,,
নতুন মা হওয়া মেয়েটির হৃদয় যে মমতায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে,,,,
তেমনই মমতাময়।।জীবন কাব্য নয়, ছন্দের পর ছন্দ মিলিয়ে লেখা
প্রিয় কবির কোনো কবিতাও নয়…জীবনটা যে শুধু জীবনই…
শুধুই জীবন…… -
সত্যি যদি এমন হতো..
সত্যি যদি এমন হতো
-জ্যোৎস্না ভট্টাচার্য ত্রিবেদীসীতাকে রক্ষা করতে রাম লঙ্কার উদ্দেশ্য যাত্রা করলেন যখন, স্বামী রূপে তিনি নিজে কি করেছিলেন একটু তো প্রশ্ন জাগেই,
‘টুকরো টুকরো অনেক পাথর সাগরে ফেলিল ছুঁড়ে
কাঠবেড়ালিও গেল না বাদ, ছুঁড়লো দু’ হাত ভরে
পাথরে পাথরে বাঁধা হলো পথ রামের যাত্রা হেতু
সেতু বন্ধনে রামের নাই হাত ভক্তেরা বাঁধে সেতু!’অপহৃতা সীতা যদি সেতু বন্ধনের ঘটনাটি শুনে রাগে দুঃখে তাঁর স্বামীকে বলতেন,
‘অনেক খুঁজিয়া সীতাকে দেখেন অশোক মনের মাঝে,
রামেরে দেখিয়া সীতা ক্রোধে বলে কেন এসেছো এ সাঁঝে?
শুনেই রামের মাথা ওঠে ঘুরে চোখে আসে জল ভরে..
ভাবেন, সীতা এ কেমন কথা আজকে বলিল মোরে!’তারপরও যদি বলতে পারতেন তবে হয়তো আজ আমাদের সমস্যাটা কিছু কম হোতো।
‘ক্ষমতা কিছুই নাহিকো তোমার পর ভরসাতে থাকো
ভালোমানুষের ধ্বজাখানি ধরে নিজেরে আড়াল রাখো’সৃস্টির আদিকাল থেকে নারীর পুরুষকে স্বামী অর্থাৎ মালিক রূপে স্বীকার করে নেওয়ার ফলেই পুরুষের এমন আধিপত্য। অথচ জন্ম মূহুর্ত থেকে অন্তিম সময়টুকু পর্যন্ত নারীই তার অবলম্বন। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন ভাবে নারীই তার ভার বহন করে এসেছে। তবু আজও ‘কন্যা’ই দায়। নিজেকে নিঃশেষে নীরবে উজাড় করে দিয়ে নারী পুরুষের সংসার সৃষ্টি করেছে, রক্ষা করেছে, সুখী করেছে তবু নারী চিরদিনই দুহিতা, গ্রহীতা, অসহায়, অবলা। যে নারী সমস্ত সংসারের সহায় যার একটা দিনের অনুপস্থিতি সমস্ত সংসারকে এলোমেলো করে দেয় তাকেই পুরুষ ‘অসহায়’ আখ্যা দেয়। কি হাস্যকর তাই না! তবু নারী চিরকাল নিজের সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়ে নিজের আজন্ম লালিত চেনা পরিচিত গণ্ডীটুকু এমনকি নিজের জন্মকালীন পরিচয়টুকুও পরিত্যাগ করে অন্য এক অপরিচিত অনাত্মীয় পুরুষের সাথে একাত্ম হওয়ার সামাজিক রীতি হাসিমুখে স্বীকার করে। সারাজীবন সুখে দুখে সমস্ত পরিস্থিতিতে তার পাশে থাকার তাকে, বলা ভালো শুধুমাত্র তাকেই না তার সমস্ত পরিবারকে সুখী করার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়।
সেদিন সীতা মাতাও তাই করেছিলেন। কিন্তু যদি এইভাবে বলতে পারতেন সেদিন,
‘ভ্রাতৃ বিরোধ আশঙ্কাতে রাজ্যপাট ছেড়ে
মাতা কৈকেয়ীর অন্যায় দাবী মেনে নিলে পণ করে।
পিতৃসত্য রক্ষার নামে কাপুরুষের মতো নিজে বনে এলে,আমারে আনিলে বিপদের মাঝে শত!
কাপুরুষ সম বালিরে মারিলে পশ্চাৎ হতে তুমি,
তোমার মতো নপুংসকেরে কহিব না আর স্বামী।’মা সীতা নিজের সতীত্বের পরীক্ষায় ঊত্তীর্ণ হওয়ার জন্য অগ্নি প্রবেশ করেন নি। কারণ সেটা তো তার জানাই ছিলো। স্বামীর হৃদয়ে নিজের স্থানটুকু পুনর্বহাল করার তাগিদ ছিল। তিনি ঐ দুঃসহ অপমান লাঞ্ছনা মাথা পেতে গ্রহণ করেছিলেন শুধুমাত্র স্বামীর সাথে তার পরিবারের সাথে থাকার জন্য। আজও পুরুষ প্রতি মূহুর্তে কারণে অকারণে নারীকে ঐ ভাবেই অগ্নিনিক্ষেপ করে চলেছে। আক্ষেপ জাগে সেদিন কেন সীতা বলেন নি,
“তোমার সহিত ফিরিবো না কভু এ ভুল করিতে নারি,
সাথে লয়ে গিয়ে ফেলিবে ‘আগুনে’ ভালোই বুঝিতে পারি।
অগ্নিসাক্ষী করে তুমি মোরে দিলে মর্যাদা স্ত্রীর
অথচ পারোনি রক্ষতে মোরে হেথা আনিল রাবণ বীর।
হোক সে অসুর, তবু রাবনের বীরত্ব আছে ঢের
আমি সীতা, হেন সুন্দরী নারী প্রেমে পড়ি রাবণের।
শৌর্যে বীর্যে মজিয়াছি ওগো প্রেমে হাবুডুবু আমি..
ত্যাজিলাম আজি তোমারে হে রাম..! দশাননই মোর স্বামী’
না, বলতে পারেন নি সীতা, কুসংস্কারের বশবর্তী নারীমন। নিজের ক্ষমতা কোনো দিন জানতে দেওয়া হয়নি নারীকে। পরিবর্তে বোঝানো হয়েছে ‘একা তুমি কতো অসহায়..’ তাই প্রতিক্ষণেই নারীকে তার সতীত্বের, তার নারীত্বের, তার মাতৃত্বের, তার আনুগত্যের অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে যেতে হয়। আজও…… আজও…….. -
মেয়েরা- সেকাল একাল
মেয়েরা- সেকাল একাল
–জ্যোৎস্না ভট্টাচার্য (ত্রিবেদী)আমি যেদিন জন্মালুম দিনটা ছিলো কোজাগরী পূর্ণিমা, ভরসন্ধ্যে বেলা ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর।
আঁতুর ঘর থেকে সুতীব্র কান্নার আওয়াজ, সাথে সাথেই ঠানদির চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা– ও দাইমা, কি হয়েছে?সাথে পিসি ঠাম্মার ও একই জিজ্ঞাসা, ও দাই দিদি , বলো না,,, ছেলে হলো?
দাইমা সসংকোচে একটু গলা তুলে বললেন,-ঘরে নক্ষী এয়েছে গো —!!—- এবার ও..! গলায় নুন দিয়ে শেষ করো। আর কতো লক্ষী আসবে? অলুক্ষুণে অপয়া বৌ জুটেছে একখান ! বছর বছর মেয়েই বিয়োচ্ছে । কতোবার কইলুম বিশেরে, বাবা, আর এক খান বৌ আন। ওই শাঁখারি পাড়ার ভূবন চক্কোত্তির মেয়ে, আহা রূপে গুণে সাক্ষাৎ লক্ষী ঠাকরুন। ও মেয়ে দেখলিই বোঝা যায়, পুত্রবতী নিয্যস । কিন্তু, সে ছেলে আমার শুনলে তো..!
কয় কি, একটার বেশী বে করবো না, তাতে ছেলে হয় বেশ, না হয় তাও বেশ…শোনো দিকি ছেলের কতা,
আর এ বেটীরে দেখো ! এ তো বছর বছর… হায় আমার পোড়া কপাল…। এখন বংশ রক্ষে হবে কি করে গো..! মরে এক ফোঁটা জলও পাবোনি…!আমি মায়ের পঞ্চম কন্যা সন্তান, অবশ্য এখন আমরা সংখ্যায় চারজনই, কারণ আমার আগেরটিকে আঁতুড় ঘর থেকেই শেয়ালে টেনে নিয়ে গেছে, আমার অসুস্থ, দূর্বল মায়ের ক্ষণিক অসাবধানতায়।।
আর আজ সত্তর /৭০ বছর পর ও… একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের দোরে কড়া নাড়ছি যখন, তখনও সেই একই ছবি দেখি—
সেদিন পেপারে পড়লাম, এক মা তার সদ্যজাত কন্যা সন্তানকে গলা টিপে হত্যা করেছেন। অদ্ভুত আশংকায়,ঘৃণায় বুক কেঁপে উঠলো… এরা কি মা…!!
আরো শুনলাম, এক স্বামী, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে ডক্টর এর কাছে গিয়ে বলছেন, আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা, সোনোগ্রাফিতে জেনেছি গর্ভে কন্যা সন্তান, দয়া করে অ্যাবরশন…
ডাক্তার তো এই মারে কি সেই মারে। কিন্তু কারণ শোনার পর, তিনিও নিশ্চুপ ক্ষণিক।
তাদের বক্তব্য, মেয়ে হলে বড়ো সমস্যা, এই নির্মম পিশাচ সমাজ এর হাত থেকে তাকে রক্ষা করবো কেমন করে?
ছোটোবেলায় হয় তাকে কাকা, মামা, তুতো দাদারা, অথবা পাড়ার বড়ো কেউ আদরের ছুতোয় খোবলাবে। আর একটু বড় হলে, শহরে হায়নার অভাব নেই!আমি কর্মসূত্রে থাকি বাইরে, মাসে দু মাসে বাড়ি আসি। গৃহে আমার বৃদ্ধা মা আর স্ত্রী। কে সামলাবে ? রক্ষা করবে বলুন ওই কোমল,কচি প্রাণ ? তার চেয়ে অঙ্কুরেই বিনাশ …!
কিছুদিন আগে একটি মেয়েকে বলতে শুনেছি, মেয়ে সন্তান লালন করা যার তার কর্ম নয়। অনেক বুকের পাটা লাগে, প্রচুর সাহস না থাকলে….! কিন্তু সত্যি সাহস থাকলেই কি রক্ষা হয়..? আসলে দিন যতোই বদলাক সমাজ উন্নত থেকে উন্নততর হোক— কিন্তু মেয়েরা তো সেই একই আছে। নারী শরীর — নরম, লোভনীয়, সুস্বাদু–
কথায় আছে, “অপনা মাসে হরিনী বৈরী” — এতো তাই..
হরিণ যেমন নিজের সুস্বাদু মাংসের জন্যই শিকারীর লালসার শিকার হয়, মেয়েরাও তাই…! সুস্বাদু নারী মাংসের লোভেই তো যতো অপকীর্তি। তাই তো ছাড় পায় না সাত মাসের শিশু বা সত্তর এর বৃদ্ধাও। হোক না সে মাংস একটু কম স্বাদু, তবু নারী মাংস তো…!পায় না ছাড় H.S. Topper ও… হরিয়ানার শহরতলীর সেই রোগা,কালো,শান্ত,মেধাবী ছাত্রীটি,, সন্ধ্যেবেলা টিউশন পড়ে ফিরছিলো, মুখ চেপে মাঠে টেনে নিয়ে গিয়ে বারো জন মিলে —না না, এক বা দু ঘন্টা নয়, আটচল্লিশ ঘন্টা, পুরো দুটি দিন,
নরখাদকগুলো আঁচড়ে কামড়ে, চিবিয়ে চুষে খেলো…. কি আশ্চর্য, তাতেও সে জ্যান্ত…
কথায় আছে না, কৈ মাছের জান,, মেয়েরা নাকি তাই…! কি অসীম সহ্যশক্তি ওই ঊনিশ বছরের দুবলা পাতলা মেয়েটির । এতো কিছুতেও নিঃশেষ হয়নি তার প্রাণশক্তি।।আসলে আমরা মেয়েরা তো তাই ! অসীম সহ্যশক্তি নিয়েই আমরা আসি এই ধরায়, বিধাতা হয়তো এমন বিষম অত্যাচার সহ্য করার জন্যই এতো সহ্যশক্তি দিয়ে পাঠান। মোদ্দা কথা এই সত্তর বছর আগেও মেয়েরা যা ছিলো, আজ এই একবিংশ শতাব্দীর অতি আধুনিক, উন্নত, শিক্ষিত এক সমাজ ব্যবস্থায় দাঁড়িয়েও– মেয়েরা সেই একই অবস্থায়–অবাঞ্ছিত, দূর্বল, শুধুমাত্র সুস্বাদু লোভনীয় মাংসের তাল… পুরুষের চোখে আজ ও…
-
প্রতীক্ষায়
প্রতীক্ষায়
-জ্যোৎস্না ভট্টাচার্য ত্রিবেদীবলেছিলে আসবে সেদিন
ভর দুপুরে চৌমাথার বাস স্টপে পিচ গলানো ঝাঁ চকচক রোদের তেজালো আঁচ থেকে বাঁচতেআশ্রয় নিয়েছিলুম বুড়ো বটের আবছায়ায় —-
নিঝুম দুপুরের ক্লান্ত প্রহর ও একে একে পেরিয়ে যায়,
এগিয়ে চলে ঘড়ির কাঁটাও পাল্লা দিয়ে — দুই তিন চার…
নাহ! আজ ও না —-
রাখোনি কথা আজ ও, এমনি না রাখা কথার হিসাব আজ আর নিষ্প্রয়োজন।
দগ্ধ দুপুরে, রোদ ঝলসানো শরীর আর অর্ধ দগ্ধ মন —
কিছু কটূক্তি পথ চলতি আওয়ারা লম্পট যুবকের…
কিছু তীর্যক দৃষ্টি বয়স্ক পথচারী র—
সমস্ত ক্লেদ সর্বাঙ্গে মেখে, অবসন্ন ক্লান্ত দুটি পা ধীরে,
আরো ধীরে গৃহমুখী অবশেষে।
পুনরায় আশায় বুক বাঁধি
কাল, হয়তো বা পরশু কিংবা
তার ও পরে কোনো একদিন
আমার এই অসীম প্রতীক্ষা র হবে অবসান।
কথা দিয়ে না রাখা র এই অভ্যাস তোমার–
হয়তো বদলে যাবে একদিন ম্যাজিকের মতো।
সেই আশায় আরো একবার
তোমার কথা দেবার প্রতীক্ষায়….. -
কথা নেই
কথা নেই …
-জ্যোৎস্না ভট্টাচার্য্য ত্রিবেদী
কথারা সব হারিয়ে গেছে
গভীর আবেগের স্রোতে,
শুধু দুটি মন জেগে থাকে
পরস্পরের সাথে …..।
কথা যেখানে শেষ –
চাওয়া পাওয়া , দেওয়া নেওয়া র ….
অন্তহীন , অক্লান্ত ইচ্ছেরা
ডানা মেলে সুদূরে ।
শুধু দুটি মন ——- মূক ও বধির ….
ভাষা হীন অনন্ত ভালবাসায় পরিপূর্ণ ….।
ছুঁয়ে যায় একে ওপরের অন্তঃস্থল …..।
পূর্ণ হয় —- সার্থক হয়—— ‘ মনো মিলন ‘…..।
এক অনাবিল আনন্দে পরিপূর্ণ হয়….. চারপাশ —–
ছড়িয়ে যায় সুবাসিত তরঙ্গ …..
সৃষ্টি হয় আনন্দের ‘ অন্ত্যজ ‘ –‘ মনোজ ‘ ।
-
দুঃখ বিলাস
দুঃখ বিলাস
-জ্যোৎস্না ভট্টাচার্য্য ত্রিবেদী
চলেই যাবে যদি তবে এসেছিলে কেনো,
ছেড়ে ই দেবে হাত যদি ধরেছিলে কেনোসেদিন কেনো বলেছিলে আমায় শুধু চাও,
আজ কেনো সব ভুলে গিয়ে অন্য দিকে ধাও!!শুনতে ই যদি না চাও তবে জানতে চাওয়া কেনো
কেমন আছি? কি যায় আসে তোমার এখন তাতে …!!আমার এ মন নিয়ে আমি একলা ভালো থাকি
ভালোবাসার সুখ স্বপ্ন সে যে শুধুই ফাঁকি।।তোমায় ছাড়া বাঁচার যে সুখ, সুখের অন্তমিল
সুখের কথা বলো না আর, শুধুই গোঁজামিল।।দুঃখ আমার প্রানের সখা, তার ই সাথে বাস…
তোমায় ছেড়ে তার ই সাথে ভালোবাসার চাষ।।আমায় কভু যাবে না ছেড়ে, এই অঙ্গীকার
আমৃত্যু থাকবে সাথে,,, অনেক উপকার…
করেছো তুমি,,,আমায় ছেড়ে গিয়ে,, এমন বন্ধু পেলাম–
আমার একলা থাকার চির সাথী, দুঃখ তোমায় সেলাম।।