-
কবিতা- নিস্তব্ধ রাত
নিস্তব্ধ রাত
-পারমিতা চ্যাটার্জীহেমন্তের নিস্তব্ধ রাত,
আকাশে তাকিয়ে দেখি
নীরব তারারা আমার নীরব অন্তরে।
এককোণে বসে বাজিয়ে যাচ্ছে
আমার মনের বীণার সুর।
ওরা কেমন করে জানে
আমার মনের সুর?
ওরা তো জানবেই আমারি ভুল,
ওরা যে মনের চোরাবালি খুঁড়ে
আমার অন্তরাত্মাকে দেখে যায়।
আমার মনের গোপন কোণে
নীরবতার আলো ছড়ায়।
তাই আমার তারের বীণা স্তব্ধ হলেও
নীরব বীণা বেজে যায় মনের গোপন অন্দরে। -
কবিতা- কবিতার কথা
কবিতার কথা
– পারমিতা চ্যাটার্জীকবিতা কালজয়ী নিজস্ব গতিপথে হেঁটে চলে
অতীতের স্মৃতি নিয়ে বর্তমানের হাত ধরে
আগামী ভবিষ্যতের পথে পথ দেখিয়ে।
সবুজের মাঝখানে মেঠো আঁকাবাঁকা পথ ধরে লিখে চলে চলমান ইতিহাসের কথা।
কখনও বা সবুজ দিগন্ত, নীল আকাশের মাঝে একটি ধ্রুব তারা, ধূসর মরুভূমির পথ,দূরন্ত নদীর প্লাবনে ভেসে যাওয়া গ্রাম, সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস, অগুনিত ঢেউয়ের ওঠাপড়ার মাঝে একটি নীরব রাত্রি, পাহাড়ের অটুট গাম্ভীর্যের নিস্তব্ধতা, সন্ধ্যা আকাশের পূর্ণিমার চাঁদ, অমাবস্যার অন্ধকারে জীবনের চড়াই উৎরাই পথ ধরে কবির তুলি টানে রঙের তুলি।
প্রেমের আকুতি, বিরহ বিচ্ছেদ বেদনা, জীবন যুদ্ধের তীব্র যন্ত্রণার অনুভূতি, জীবনের মূর্ত অনুভব কবি এঁকে চলেন সাদা ডায়েরির পাতায়।
স্রষ্টার মৃত্যু হয়না তাই, স্রষ্টা থেকে যায় তার অনাবিল সৃষ্টির রাঙা আঙিনার মাঝে।
মাঝে মাঝে পাতা উল্টে পাঠক খুঁজে নেয় অনেকদিনের কবিতা যা আজও বেঁচে আছে।
উৎসারিত স্রোতস্বিনী ঝর্ণার ঝরঝর শব্দ বেজে ওঠে কবিতায়, মনে পড়ে ছিল কোনদিন কখনও
এক চঞ্চলা ঝর্ণার গতিপথ তার রিনরিন নূপুর ধ্বনি আজও চলেছে বেজে কবির খাতায়।
এক শ্রাবণের কবিতার বৃষ্টি বাঁধা থাকে বুকে,
দোলা দিয়ে যায় তাকে ফাগুন সমীরণ ।
হে কবি হে মহান স্রষ্টা তাই তুমি অমর মৃত্যুহীন পথের এক ক্লান্ত পথিক।
যুগ থেকে যুগান্তরে বয়ে যায় এই সৃষ্টি।
বলে যায় নরনারীর অন্তরের কথা, ভালোবাসা,
হাসির আড়ালে থাকা গোপন কান্না সবই কবি
লিখে যায় তাঁর সাদা ডায়েরির পাতায়।
মাঝে মাঝে মনে হয়, “এ যে আমার মনের কথা, এ যে সবার প্রেমের অনুভূতি, সুখ দুঃখের নিরবিচ্ছিন্ন হাতছানি”, কেমন করে জানলে কবি অন্তরের এ অনুভূতি!
তাইতো তুমি কবি তাইতো তুমি অমর স্রষ্টা
বলে যাও মানুষের কথা, জীবনের কথা, জীবনে চলার পথের কথা, আমার কথা, তোমার কথা এঁকে চলো জীবন-মরণের শেষ ছবি পর্যন্ত। -
গল্প- মোহর
মোহর
-পারমিতা চ্যাটার্জীমোহর বিদেশ থেকে শাশুড়ি মাকে ফোন করলো-
– কেমন আছো মা?
– এই আছি মা, চলে যাচ্ছে
– আমি জানি মা তোমার খুব একা লাগে তাইনা?
– হ্যাঁ রে একাকীত্ব বড়ো কষ্টকর, সব থেকেও যেন কিছু নেই, মাঝে মাঝে খুব অসহায় লাগে নিজেকে।
– আর অসহায় লাগবে না, আমার ওপর একটু ভরসা রাখো, আর সেই পুরানো সব সংস্কার থেকে তোমাকে আমি বের করে আনবোই। সব কর্তব্য তোমার হয়ে গেছে, এবার তোমাকে শুধু নিজের জন্য বাঁচতে হবে।
– মা সামনের মাসে আমি আসছি তোমার কাছে, অনেকদিন তোমাকে দেখিনি, খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, তুমি তো জানো সেই ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি, এখন মা বলতে তোমাকেই বুঝি।
অন্নপূর্ণা দেবী জানেন এই মেয়েটি নামেই তার পুত্রবধূ, কিন্তু তার ভালোবাসা, কোনো সন্তানের চেয়ে কিছু কম নয়।
তাঁর অন্তরের দুঃখ- বেদনা, নিত্য স্বামীর অপমান সে নিজে চোখে দেখেছে, একমাত্র সেই রুখে দাঁড়িয়ে ছিল শ্বশুরের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে।
আঙুল উঁচু করে বলেছিল, “আর যদি কোনদিন দেখি আপনি আমার মামনিকে কোনো অপমান করেছেন, তবে জেনে রাখবেন সেদিন আপনার কপালে অনেক দুঃখ আছে।”
আধুনিক মেয়ে মোহরের তীব্র চোখের দৃষ্টির সামনে সেদিন মাথা নীচু করতে বাধ্য হয়েছিল সেই লোকটা, যার নাম ছিল প্রদ্যোত, আজ তিন বছর হল তাকে সে মুক্তি দিয়েছে, কিন্তু একথা সত্যি যে তার মৃত্যুতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হয়নি অন্নপূর্ণাদেবীর বরং একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল তার।
সারাজীবন শিক্ষিতা স্বনির্ভর অন্নপূর্ণাকে সে মানসিক তো বটেই শারীরিক অত্যাচারও কম করেনি। রাতগুলো ছিল বিভীষিকা, রীতিমত ধর্ষিত হতেন তিনি স্বামীর হাতে প্রতি রাতে, একবার বড়ো ছেলেকে লজ্জার মাথা খেয়ে বলেছিলেন, “তোরা তো বড়ো হয়েছিস তাই বলছি, প্রতি রাতে তোর বাবার এ অত্যাচার আর তো আমি সহ্য করতে পারছিনা।” মায়ের ঘাড়ে দগদগে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট তখনও, সে তাড়াতাড়ি মায়ের ক্ষত জায়গায় ওষুধ লাগিয়ে দিল,তারপর মায়ের হাত ধরে বাপের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেছিল, এটা কি? নির্লিপ্ত উত্তর দিয়েছিল নির্লজ্জ লোকটা, আমি কি করবো? ওরকম সব মেয়েদেরই হয়,
ছেলে রুখে দাঁড়িয়ে আবার বলেছিল, না সবার হয়না, তোমার মতন পশুর সাথে যাদের ঘর করতে হয় তাদেরই হয়।
বাবার চিৎকারকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল একবার গলা তুলে দেখ, তোমার জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে দেব,আর আজ থেকে মা আলাদা শোবে, এই নিয়ে তুমি যদি কোন গণ্ডগোল কর তাহলে তোমাকে আমি টানতে টানতে পুলিশের কাছে নিয়ে যাব। চিৎকার চেঁচামেচিতে অন্য দুই ছেলেও এসে গেছে। ছোট ছেলে তো মায়ের আঘাত দেখে উত্তেজিত হয়ে বাবাকে মারতে উঠেছিল, অন্য ভাইয়েরা থামিয়ে দিয়ে বললো ছেড়ে দে।
সেই থেকে তার শোবার ঘর আলাদা, বউমারা এসেও দেখেছে শাশুড়ি মায়ের আলাদা শোবার ব্যাবস্থা। শ্বশুরের মুখে কুশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল শুনে আলাদা থাকার কারণটা তারা বুঝে নিয়েছিল।
মোহর শাশুড়ি মায়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল, তাকে অনেক মনের কথা বলেছিলেন অন্নপূর্ণা দেবী।
সেই সময় মোহরকে বলে ফেলেছিলেন, তার একান্ত মনের গোপন কথাটি।
কলেজে পড়বার সময় তাঁর খুব ভালো লাগতো তাঁদের প্রফেসর অমলেন্দু নাগকে, বোধহয় তাঁরও ভালো লেগেছিল স্বল্পভাষী মিষ্টি অন্নপূর্ণাকে, সবাই বলতো স্যার তো একজনের মুখের দিকে চেয়েই লেকচার দিয়ে যান, আর কোনদিকে তাকান না। লজ্জা পেতেন তিনি সহপাঠীদের কথায়, কিন্তু এ কথা সত্যি যে তিনি তার দিকে তাকিয়ে পড়িয়ে যান। কিন্তু কেউ কোনদিন মনের কথা কাউকে বলেন নি। কলেজ শেষ হবার পর মার্কশীট আনতে যেদিন অন্নপূর্ণা কলেজে গেলেন সেদিন তিনি নিজেই স্যারের সাথে দেখা করতে গেলেন, স্যারের ঘরে তখন নতুন ভর্তির জন্য বেশ কিছু লোকজন ছিল, তাকে দেখে তাদের একটু অপেক্ষা করতে বলে তিনি বাইরে এসে বলেন,”আমি জানতাম তুমি আসবে।”
অন্নপূর্ণা মাটির দিকে চোখ নামিয়ে নিয়েছিলেন লজ্জায়। তিনি ওর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, একটু বাইরে অপেক্ষা করতে পারবে? আমি এই কাজটা সেরেই আসছি –
অন্নপূর্ণা মাথা নামিয়েই সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বাইরে আসেন।
একটু পরেই উনি বেরিয়ে এলেন, বললেন চল-
অন্নপূর্ণার ইচ্ছে থাকলেও জিজ্ঞেস করতে পারলেন না কোথায়! নীরবে অনুসরণ করে চলতে লাগলেন। একটু পরেই একটা কফিশপে দু’জনে বসলেন, তারপর উনি খুব ধীর স্থির গলায় বললেন, বহুদিন থেকেই একটা কথা তোমাকে বলতে চাইছিলাম কিন্তু বলতে পারিনি, আজ তোমার কলেজ জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, আজ আর না বললে আর হয়তো বলাই হবে না তাই তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম-
– অন্নপূর্ণা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। উনি বললেন, কলেজে যখন তোমার মুখের দিকে চেয়ে পড়াতাম, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে তুমি আমাকে একটু অন্য ভাবে পছন্দ করো, মানে আমার প্রতি একটা ভালোলাগা তোমার মধ্যে কাজ করে। কি আমি ঠিক বলছি তো?
অন্নপূর্ণা তখন রীতিমতো ঘামতে শুরু করে দিয়েছেন। কোনোরকমে মুখ নামিয়ে বললেন, হ্যাঁ –তিনি তখন বললেন, ব্যাস আমি এই উত্তরটার জন্যে অপেক্ষায় ছিলাম, আচ্ছা! তুমি কি বুঝতে পেরেছিলে যে আমিও তোমাকে খুব পছন্দ করি।
অন্নপূর্ণা এবার একটু মুখ তুলে বলেছিলেন, আন্দাজ করেছিলাম, তাইতো আজ সাহসে ভর করে আপনার ঘরে এসেছিলাম, যদি কিছু বলেন তাই।
তিনি হেসে ফেলে বললেন, যতোটা ভালো মেয়ে ভেবেছিলাম ততোটা মোটেই নয় তাহলে দেখছি, বলেই হেসে উঠেছিলেন আর অন্নপূর্ণাও ওর টোল ফেলা গাল নিয়ে হেসে ফেলেছিলেন।
তারপর ওরা আরও দু’চারদিন দেখা করেছিলেন, দু’জনে মনের কাছাকাছি এসেছিলেন।
প্রায় একমাস ঘোরাঘুরির পর একদিন গঙ্গার ধারে তার হাতটা ধরে বলেছিলেন, তুমি তো এম এ পাশ করে এম ফিল করবে?
– হ্যাঁ সেই রকমই তো ইচ্ছে আছে।
– ইচ্ছে আছে না করতেই হবে। আর তার সাথে আর একটা জিনিসও করতে হবে।
-কি?
– অপেক্ষা.. পারবেনা আমার জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে? আমি একটা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ যাচ্ছি পোস্ট ডক্টরেটের জন্য, পাঁচটা বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে, তুমি পারলে পি এইচ ডি আরম্ভ করে দিও, আমি নিয়মিত তোমাকে নোটস পাঠাবো, চিঠিও লিখবো, দেখবে ঠিক সময় কেটে যাবে।
তিনি বলেছিলেন করতেই হবে, এখন তো আর কোন রাস্তা নেই, ভালোবেসেছি যে।
তিনি মৃদু হেসে সেদিন অন্নপূর্ণার মাথাটা বুকের কাছে টেনে এনে তার কপালে একটা আলতো চুম্বন দিয়ে বলেছিলেন, ভালোবাসার অপেক্ষা খুব মধুর হয়।
কিন্তু এমনই ভাগ্য যে এম ফিল শেষ হবার সাথে সাথেই বাবার ক্যান্সার ধরা পড়লো, তারা ধনে প্রাণে শেষ প্রায় শেষ হয়ে গেলেন। বাধ্য হয়ে তাকে কলেজের চাকরি নিতে হল, পি এইচ ডি করা আর হল না। ভেবেছিলেন একটু সামলে নিয়ে পি এইচ ডি আরম্ভ করবেন। তাদের বসতবাড়িও বাঁধা পড়েছিল বাবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে, বাধ্য হয়ে তাদের তিন ভাই বোন বোন সমেত মাকে কাকার বাড়ি আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
তখন কলেজের মাইনে এতো বেশি ছিলোনা, তাই দুই ভাইবোনের পড়া আর টিউশনির খরচ দিয়ে কাকার হাতে খুব কম টাকাই দিতে পারতেন, এতে কাকা কাকীমার অসন্তোষ টের পাচ্ছিলেন, তখন একাধিক টিউশন নিয়ে সাংসারিক ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছিল, তাতেও শান্তি ছিলোনা। এরকম অবস্থায় একদিন হঠাৎ জানতে পারে কাকা তার বিয়ে ঠিক করেছে, মায়ের কান্না, তার অনেক অনুনয় বিনয়কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে মূর্খ কিন্তু কিসব চামড়ার ব্যাবসা করে প্রদ্যোতের সাথে তার বিয়ে দিয়ে জীবনের চিত্রটাকে কাকা পুরো বদলে দিয়েছিল। অমলেন্দুকে সবই খুলে লিখেছিলেন তিনি তার অক্ষমতার কথা, অমলেন্দু চিঠিতে জানিয়েছিল, আর একটু আগে কেন জানালেনা? আমি চলে আসতাম
তিনি উত্তরে দিয়েছিলেন, মাত্র সাতদিন আগে তাকে জানানো হয়েছিল তার বিয়ের কথা, তখুনি চিঠি দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমার কাছে যখন চিঠি পৌছেছে তখন আমার যা হবার তা হয়ে গিয়েছে।
একমাত্র মোহরকেই এ সমস্ত কথা তিনি বলেছিলেন, মোহর ছয়মাসের ছুটি নিয়ে এলো। অন্নপূর্ণা দেবী আনন্দে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাকে, তুই এতোদিন থাকবি আমার কাছে।
– হ্যাঁ মা জীবনে অনেক কষ্ট করেছো, আর নয় এবার তোমার একটা ব্যাবস্থা করবো বলেই এসেছি।
– কি ব্যবস্থা?
– সেটা সারপ্রাইজ থাক।
মোহর অমলেন্দুর সাথে যোগাযোগ করে। শহর থেকে একটু দূরে একটি বিরাট বাড়ি কেনা হয়েছিল, অমলেন্দুই কিনেছেন, মোহর বহুদিন থেকে তাঁর সাথে যোগাযোগ করে এই ব্যবস্থা করেছিল, বাড়িটি হয়েছিল বৃদ্ধাশ্রম, শ্রীরামপুরে একদম গঙ্গার বক্ষে বাড়িটি ছিল, সেখানে ডাক্তার, হোম কিচেন সব ছিল, একটা ঘরওলা ছোট ফ্ল্যাট আবার দু’টো ঘরওলা ফ্ল্যাটও ছিল, বাড়ির সামনে ফুলের বাগান, পিছনে একটি সুন্দর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন সাজানো ঝিলকে ঘিরে সব্জির বাগান। অমলেন্দু তার নিজের জন্য দুই ঘরওলা একটা ফ্ল্যাট রেখেছিলেন, বাকি সব ফ্ল্যাটগুলোই ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির বাইরে বড়ো বড়ো করে একটি শ্বেতপাথরের প্লেটের ওপর লেখা ছিল অন্নপূর্ণা বৃদ্ধাশ্রম।
এসব কথা অন্নপূর্ণা কিছুই জানতেন না।
কিছুদিন পর মোহর তাকে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে বললো, চল আমার সাথে একটু বেরোতে হবে,
কোথায় রে?
গেলেই দেখতে পাবে।
যাবার পথে মোহর গাড়ি থেকে নেমে কিসব কিনলো যেন, তিনি দেখলেন দু’টো বড়ো ফুলের গোড়ের মালা দু’ তিনটি বিরাট বাক্স ভর্তি করে মিষ্টি।
– তোর মতলবটা কি বলতো? কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে?
– উফ্ বড়ো কথা বল তুমি, চল তো চুপচাপ।
এরপর তো আরও অবাক হবার পালা, একটি রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে দাঁড়ালেন দু’জনে, দেখলেন অমলেন্দু বেরিয়ে এলেন ধুতি পাঞ্জাবী পরে। পরের ঘটনা তো আর বলার দরকার নেই।
সেদিন বৃদ্ধাশ্রমের সবাই খুব আনন্দ করলো, অমলেন্দু সবার জন্য ছোট করে খাওয়ার আয়োজন করেছিলেন, তার সাথে মোহরের আনা মিষ্টি, মায়ের জন্য একটা সাদার ওপর লাল পার দেওয়া বেনারসি, আর অমলেন্দুর গরদের পাঞ্জাবী আর ধুতি। ওদের হাতে তুলে দিয়ে বললো এই নাও মেয়ের বাড়ি থেকে আনা ফুলশয্যার তত্ত্ব।
অন্নপূর্ণা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে বললেন তুই পেটে পেটে এতো কিছু করেছিস, আমাকে কিছু জানতে দিস নি!
– আমি তো কিছু করিনি মা শুধু দু’টো বহুদিন ধরে অপেক্ষাকৃত হৃদয়কে মিলিয়ে দিয়েছি, যা তোমার পাওনা ছিল আমি তাই করেছি শুধু এই বৃদ্ধাশ্রমে।
কাকুর কাছে যখন শুনলাম কাকু তোমার নামে এই বৃদ্ধাশ্রম করেছেন আর তিনিও একা কাউকে বিয়ে করতে পারেননি শুধু তোমাকে ভালোবেসে ছিলেন বলে, আমি এই বৃদ্ধাশ্রমে দু’টি ভালোবাসাকে এক করে দিলাম শুধু।
রাত্রি এলো,অমলেন্দু পরিপূর্ণ ভাবে তাকালেন তার যৌবনের ভালোবাসায় দিকে-তারপর দু’হাত বাড়িয়ে দিলেন,
অন্নপূর্ণা ধরা দিল সেই বহু প্রতীক্ষিত বাহুবন্ধনে।
এতদিনের অপূর্ণ ভালোবাসা মুক্তি পেল অবশেষে বৃদ্ধাশ্রমের একটি স্বল্প পরিসর ফ্ল্যাটে। -
কবিতা- সীমাহীন ভালোবাসা
সীমাহীন ভালোবাসা
-পারমিতা চ্যাটার্জীবিরহ বেদনার করুণ সুর ভাসছে আকাশে,
বাতাসও অচঞ্চল দীর্ঘশ্বাসের শ্বাস ফেলছে,
কেনো এতো দুঃখ!
দুঃখ তো মনের এক অজানা নদী,
সেই নদী দিয়ে তরী বাইতে বাইতে
পৌঁছে যাই কতো অজানা গন্তব্যে
তার নামই জানা নেই।
মনের জানালাটা খুলে দিলেই
প্রকৃতি এসে সামনে হেসে দাঁড়ায়।
সকালের নীল আকাশে উড়ে চলেছে
পাখিরা, তাদের ভয়হীন ডানা মেলে,
গোধূলি বেলায় ফিরবে নীড়ে,
নীড় ভেঙে গেলে বাঁধবে নতুন বাসা।
মৃত্যুভয় নেই তাদের, তারা যে স্বাদ পেয়েছে
এক অনন্ত অসীমের যেখানে বেদনা স্পর্শ করেনা।
মন কি বন্দী থাকতে পারে চারদেয়ালের মধ্যে!
বন্দী থাকে শুধু শরীরটা।
মনও ঘুরে ঘরে বেড়ায় ক্লান্তিহীন এক অনন্তে,
যেখানে চিন্তা আছে,ভয় আছে প্রিয়জনের জন্য আছে আকুলতা, আছে রোজকার নামচা কর্মব্যস্ততা।
তারই মধ্যে মন দেখে গাছে আজ কটা ফুল ফুটলো!
নিজে হাতে তৈরি বারান্দার একধারে যে ফুল ফুটিয়েছে, তাদের বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা
ক্লান্ত বিষণ্ণ মনে আনে অনাবিল সৃষ্টির আনন্দ।
গায়ক করে নতুন সুরের সৃষ্টি,
শিল্পীর তুলিতে ফুটে ওঠে মনের চিত্র,
কবির কলমে আনে ভাবের প্রকাশ।
মন বেঁচে থাকে ভালোবাসার এক অন্তহীন
যাত্রার মধ্যে দিয়ে।
মন তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে উড়ে যায়
অজানার রহস্য আস্বাদনে,
বিরামহীন চিন্তার মধ্যে ছড়িয়ে থাকে তার ভালোবাসা।
মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে ডাক্তার যুদ্ধ করে
একটি প্রাণকে বাঁচানোর জন্য।
সেবাময়ী সিস্টারের সেবায় মৃত্যুকে জয় করে
যখন রোগী ফিরে যায় তার গৃহে
তখন আনন্দে তার চোখের পাতা ভিজে ওঠে
একটি প্রাণ দানের আনন্দে,
সেখানেই তার ভালোবাসার আনন্দ।
ভালোবাসার আনন্দে মন ছড়িয়ে যায় দীর্ঘ ক্লান্তিহীন পথের বাঁকে বাঁকে, কখনও নদী হয়ে
বয়ে চলে, কখনও মরুদ্দান ফুল ফোটা দেখে।
তাই ভালোবাসা সীমাহীন বেদনাহীন এক প্রবাহমান নদী,
যা শুধুই বয়ে চলে নোঙর ফেলেনা কোথাও। -
গল্প- জননী
জননী
-পারমিতা চ্যাটার্জীআজ সকাল থেকে দময়ন্তীর মনটা একটু খারাপ হয়েই আছে। সবে নারায়ণ পুজো সেরে উঠে এসেছেন আর দেখেন যে ছেলে পাপুনের সাথে রহমানের সদ্য মাতৃহারা ছেলেটা আসিফ এসে বসে আছে। পাপুন বলছে, মাগো আমার আর আসিফের দু’জনেরই খুব খিদে পেয়েছে। আসিফ সকাল থেকে কিছু খায়নি।
দময়ন্তী যেন একটু বিরক্ত হয়েই বলেছিল, কেন খায়নি কেন?
ওর আম্মু যে মারা গেছে মা। ওর আব্বু ওর জন্য নাস্তা বানাতে পারেনি।
– যতসব..এসব আবার কোথা থেকে শিখেছ? নাস্তা আবার কি? বলো ব্রেকফাস্ট। ঠিক আছে দাঁড়াও। আমি আনছি।
একটু পরে দময়ন্তী দু’টো প্লেটে খাবার সাজিয়ে নিয়ে এসে বললো, পাপুন এদিকে এসো খাইয়ে দি। আর আসিফ তুমি এখানে বসো। মাটিতে একটা চাটাই পেতে কলাইয়ের থালা করে মাতৃহারা ছেলেটাকে সে খেতে দিল। পাপুন যখন বললো, ওকে ওখানে দিলে কেন মা? ও যে নিজে খেতে পারেনা।ওর আম্মু ওকে খাইয়ে দিত। তখনও সে পাথরের মতই শক্ত হয়ে নিজের সংস্কারকে ভেঙে বলতে পারে নি, তুই আয় বাবা আমার কাছে আয়। আমি তোকে খাইয়ে দিচ্ছি। এ কেমন মা সে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে।আজ তার স্বামী অনুপমের কথা খুব মনে হচ্ছে। সে সবসময় বলে, যেদিন জাতপাত এসব বিসর্জন দিয়ে সমস্ত শিশুর মা হতে পারবে সেদিনই তুমি হবে প্রকৃত জননী। তার আগে নয়।
বারবার চোখের সামনে আসিফের করুণ মুখটা ভেসে আসছে।
অনুপম ঘরে ঢুকে বললেন- কি হল আজ? মন খারাপ মনে হচ্ছে?
– হ্যাঁ গো আজ সত্যি আমার খুব মন খারাপ। নিজেকে বড়ো ছোটো মনে হচ্ছে। সত্যি আমি মা নামের কলঙ্ক।
অনুপম এগিয়ে এসে সস্নেহে স্ত্রীর মুখটা তুলে ধরে বলেন- আমাকে বলবে না কি হয়েছে?
দময়ন্তী আকুল কান্নায় ভেঙে পরে নিজেকে উজাড় করে স্বামীর কাছে সব বললেন।
অনুপম তার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ঠিক আছে কাল তুমি ভালো করে সুজির হালুয়া আর লুচি বানিয়ে পুপুনকে নিয়ে রহমানের বাড়িতে গিয়ে দু’জনকে একসাথে খাইয়ে এসো।
– যাবো? কিছু হবেনা তো?
– আমি বলছি কিছু হবে না। তোমার নারায়ণ শুধু তোমার ছোট্ট ঠাকুর ঘরে আবদ্ধ নেই।তিনি ছড়িয়ে আছেন বিশ্বব্যাপী। আসিফের মধ্যেও আছেন তিনি। আমরাই তো বলি শিশু নারায়ণ – কি বলিনা?
– হ্যাঁ বলি, ঠিক বলেছ তুমি, আমি কালই যাবো আর এবার থেকে আসিফ আমার কাছেই পাপুনের সাথে একসাথে খাবে ও যতদিন না বড়ো হয়।
অনুপম খুব খুশি হয়ে স্ত্রীকে কাছে টেনে বললেন এই তো এতদিনে আমি আমার দময়ন্তীকে খুঁজে পেয়েছি।
পরদিন সকালে দময়ন্তী দেখলো পাপুন মুখ ভার করে বসে আছে। একবারও বলছে না খিদে পেয়েছে। তিনি আড়চোখে দেখছেন আর মিটিমিটি হাসছেন। একটা টিফিন বক্সে সব খাবার গুছিয়ে নিয়ে পাপুনকে বললেন, চল আমার সাথে.
-কোথায়?
– চল ই না দেখতেই পাবি।
পাপুন অবাক হয়ে দেখল মা তাকে নিয়ে আসিফের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। তারপর দেখলো আসিফের দরজায় কড়া নাড়ছেন– কি ব্যাপারটা হচ্ছে ওর ছোট্ট মাথায় ঠিক ধরছেৎনা।
একটু পরে রহমান চাচু এসে দরজা খুলে তো অবাক- মা ঠাকরন আপুনি?
হ্যাঁ আমি, আসিফ কোথায়? এই যে মা ঠাকরন এইখানে বয়ে আছে আর কানদেছে খালি আম্মু আম্মু কইরা.. খাইছেনা কিচ্ছনা-
– এইবার আসিফ খাবে। দময়ন্তী ঘরে ঢুকলেন। রহমান ব্যস্ত হয়ে তাকে একটা কাঠের চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে– এইখানে বয়েন — কাঠে দোষ লাগেনা–
কিসের দোষ রহমান? কোন কিছুতেই দোষ নেই সবই আমাদের মনের ব্যাপার। তুমিও মানুষ আর আমিও মানুষ, মাঝের বিভাজনটা আমরা ইচ্ছা করে সৃষ্টি করি। আসলে কি জানো? যিনি রাম তিনি রহিম, যিনি কৃষ্ণ তিনি করিম। যাও এখন তুমি আমাকে দু’টো থালা এনে দাও তো। ছেলে দু’টোকে একটি খাইয়ে দি..
– হ্যাঁ এই যে দি মা..বড়ো সোন্দর কথাখ্যান বললেন– যিনি রাম তিনি রহিম।
আসিফ আয় বাবা আমার কাছে আয়।আজ আমি আমার দুই ছেলেকেই একসাথে খাইয়ে দেব।
আসিফের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আমায় তুমি খাইয়ে দিবে?
– হ্যাঁ তো দেবো তো? শুধু আজ নয় এবার থেকে রোজই আমি তোকে খাইয়ে দেব। দুই ছেলেকে আমার কোলে একসাথে বসিয়ে একথালা থেকে খাইয়ে দেব– কি এবার খুশি তো?
– হ্যাঁ আম্মু খুব খুশি।
– তবে আয়..
দময়ন্তী ওদের দু’জনকে দু’ কোলে বসিয়ে খাওয়াতে লাগলেন। দু’টো শিশুর কি আনন্দ। খুশিতে যেন মুখ দু’টো জল জল করছে। তার মনে হল দূর থেকে যেন তাঁর নারায়ণ দাঁড়িয়ে হাসছেন আর বলছেন- এবার তুই সত্যিকারের জননী হলি। জননী কথাটার অর্থ যে ব্যাপক। তা তো শুধু নিজের সন্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা। যিনি প্রকৃত জননী তিনি সবার জননী। এই দেশমাতার সব শিশু সন্তানদেরই তিনি জননী।
দময়ন্তী আজ এই নতুন মন্ত্রে নিজেকে দীক্ষিত করল। -
গল্প- যে পথ গেছে বেঁকে
যে পথ গেছে বেঁকে
-পারমিতা চ্যাটার্জীএকা মল্লিকা দাঁড়িয়ে আছে বারন্দায়। ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে কবে ঘর ছেড়ে চলে এসেছিল তখন থেকেই বসন্তের রঙ ফিকে হয়ে গিয়েছিল। বসন্তের পর বসন্ত কেটে গেছে একা – তার একাকীত্বে ঘরে বসন্ত আর ফুল ফোটায়নি। সে কিন্তু তার ছোট্ট বারন্দায় টবে টবে অনেক ফুল ফুটিয়েছে বিশেষ করে গোলাপ।
গোলাপ তার খুব প্রিয় ফুল বলে বিয়ের পর স্বামী কৌশিক তাকে নানা রঙের অনেক গোলাপ এনে দিয়েছিল তার সাথে ছিল একটা হীরে বসানো আংটি।
মল্লিকা বলেছিল, ফুলই তো অনেক আবার আংটি কেন?
ছিটকে সরে এসে কৌশিক বলেছিল, মধ্যবিত্ত আর কাকে বলে, এতো সাধারণ মানুষিকতা নিয়ে আমার সাথে কি করে থাকবে?
স্তম্ভিত মল্লিকা অবাক হয়ে চেয়ে থাকলো তার সদ্য বিবাহিত স্বামীর দিকে! এই রূপটা আজই প্রথম দেখলো। কাল রাতেও সে যখন স্বামীর অনুরোধে গান গেয়েছিল তখনও বলেছিল, এই টিপিকাল গানগুলো থেকে বেরিয়ে এসে একটু অন্য ধরনের গান গাও।
সে গেয়েছিল,’ যখন প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকা বনে’। তখনও সে অবাক হয়ে বলেছিল এতো রবীন্দ্রসঙ্গীত চিরকালীন গান…
— আমার ভালো লাগেনা মনে হয় যেন কেউ কানের কাছে মিনমিন করে কাঁদছে।
তখনও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল মল্লিকা এ মানুষ কি? রবীন্দ্রনাথের গানকে বলে মিনমিনে।
মল্লিকা লক্ষ করেছিল ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কৌশিক প্রায় তাকে অপমান জনক কথা বলে সেও নীরবে মেনে নেয়, সবে তো তিন মাস বিয়ে হয়েছে এখনও যে অনেকটা পথচলা বাকি এখনই অধৈর্য্য হলে চলবে কি করে?
মল্লিকা সাধারণ বাড়ীর সাধারণ বিয়ে পাশ করা মেয়ে। আর কৌশিক বড়লোকের বাড়ীর চাটার্ড অ্যাকাউন্টেট ছেলে, চেহারায় সুন্দর পয়সারও কোন অন্ত নেই। তার তুলনায় মল্লিকা সত্যি খুব সাধারণ।
কিন্তু মল্লিকার মধ্যে একটা শান্ত সুদর স্নিগ্ধ সৌন্দর্য ছিল। তার বড়ো বড়ো কাজল কালো চোখদুটো যেন কথা বলতো। আর ছিল ভালো গানের গলা, কবিতা সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ যা কোনটাই কৌশিককে আকর্ষণ করতে পারেনি। কৌশিকের পছন্দ ছিল উদ্যম উচ্ছল মেয়ে যে তার পার্টিতে এবং ঘরে সবেতেই স্বাচ্ছন্দ।
উগ্র আধুনিকতার সাথে মানিয়ে চলতে মল্লিকাকে বাড়ীর সবার কাছে পদে পদে লান্ছিত অপমানিত হতে হতো। তবু কান্নাকে লুকিয়ে রাখত হাসির আড়ালে।
মা যখন আঁচলে মুখ মুছিযে জিজ্ঞেস করত– তুই ভালো আছিস তো মা? সে হেসে উত্তর দিত ভালোই তো আছি মা চিন্তা কোরনা।
মল্লিকা জানে তাকে বড়লোকের বাড়ীতে বিয়ে দিতে গিয়ে তার সাধারণ বাবা মা ক্ষমতার অতিরিক্ত খরচ করেছে। মায়ের সব গয়নাগুলোই বোধহয় মেয়ের বিয়ে দিতে চলে গেছে।
বাবা একদিন বললেন – হ্যাঁ রে কৌশিক আসেনা কেন একদম, ওর কি শ্বশুরবাড়ীতে আসতে লজ্জা করে? জামাইষষ্ঠীতে এতো করে বললাম তোর মা নিজে হাতে এতো রান্না করলো আর ও এলোনা…
মল্লিকা শান্ত গলায় বলেছিল, ও খুব ব্যস্ত বাবা সময় পায়না।
মল্লিকা জামাইষষ্ঠীর দিন কৌশিককে বলেছিল, আজ একবার যাবে তো আমাদের বাড়ী? বলা নয় তো যেন অনুনয় করা ।
— কৌশিক বলেছিল কেন আজ কি আছে?
— আজ জামাইষষ্ঠী।
— দূর ওসব আমি মানি না, আমার পার্টি আছে, অফিস পার্টি ! কেরানীগিরি তো করিনা তাই ওসব জামাইষষ্ঠী নিয়ে মাতামাতি করার সময় আমার নেই। তোমার যেতে হয় তুমি যাও আমায় এসব থেকে দূরে রাখলেই আমি খুশী হবো।
— তোমার খুশীর জন্যেই তো চেষ্টা করে যাই আপ্রাণ সফল হচ্ছি কই?
— বেরোবার সময় এতো কথা আমার ভালো লাগেনা যেতে হলে যেও গাড়ী ড্রাইভার সব আছে, আর হ্যাঁ হাতে টাকা আছে তো? টাকা না থাকলে বলো শূণ্য হাতে যেওনা!বলে দুহাজার টাকার দুটো নোট বিছানায় ফেলে দিয়ে চলে গেল।
মল্লিকার মনে হলো যেন সে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে দাঁড়িয়েছিল আর তার স্বামী ভিক্ষা দিয়ে গেল। এইভাবে দূরত্ব বাড়তে থাকে দুজনের মধ্যে কথা বলার সময় কোন নেই। কৌশিক বাড়ী ফিরত অনেক রাতে, বাড়ীতে থাকলেও ফোনে ব্যস্ত থাকে ওর প্রিয় বান্ধবী শর্মিষ্ঠার সাথে। আগে মানুষিক নির্যাতন ছিল আসতে আসতে সেটা শারীরিকে গিয়ে দাঁড়ায়, মাঝরাতে গলা ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বার করে দেওয়া, মাঝে মাঝেই চর মারা এসব লেগেই থাকতো। কৌশিকের বাবা মাও নির্বিকার ছেলের কোন কাজে কোন প্রতিবাদ কখনো করেননি, উল্টে মল্লিকাকে বলেছেন, তুমি যদি একটু ওর মতন করে নিজেকে তৈরী করতে পারতে তাহলে আর এতো ঝামেলা হত না।
তারমধ্যেই জন্ম হলো পিকুর, মল্লিকার মেয়ে। মেয়েকে দেখে খুব খুশী হয়েছিল নিজেই নাম রাখলো মল্লিকার মেয়ে মালিনী। তারপর মল্লিকার থুতনিটা তুলে ধরে বলে কি খুশী তো?
এতোদিন পর স্বামীর আদর পেয়ে মল্লিকার চোখে ধারা শ্রাবণ।
— একি কাঁদার কি হলো? এতো আনন্দের দিনে কেউ কাঁদে নাকি?
মল্লিকা চোখে জল মুখে হাসি নিয়ে বললো- খুব খুশী।
তারপর একটা বছর ভালোই কাটলো, ঘটা করে মেয়ের অন্নপ্রাশন দিলো। মা মেয়ের অনেক ছবি তুললো, ওদের তিনজনেরও অনেক ছবি উঠলো তারপর আবার সেই একই ছবি ফিরে এলো।
মল্লিকাকে একদিন ডাকল। তারপর গলাটা পরিস্কার করে বললো- দেখো আমার মনে হয় আমাদের এবার আলাদা থাকাই ভালো। দুটো মানুষ সম্পর্কবিহীন হয়ে এক ছাদের তলায় থাকার কোন মানে হয়না। আমি শুধু পিকুর জন্য মেনে নিচ্ছিলাম কিন্তু আর সম্ভব নয়। আমি শর্মিষ্ঠাকে ভালোবাসি, ওই বা আর কতদিন অপেক্ষা করবে? মিউচুয়াল ডিভোর্সের কথাই ভাবছি। তোমার কোন ভয় নেই তোমার আর পিকুর জন্য ভালো টাকা আমি দিয়ে দেবো।
ডিভোর্সের দিন মল্লিকা কঠিন গলায় জানিয়ে দিল মেয়ে নিয়ে আমায় বেরিয়ে যখন আসতে হচ্ছে তখন মেয়ে তার মায়ের দায়িত্বেই থাকবে।
— মেয়ে আমারও, একা তোমার নয়, আমার মেয়ে কষ্টে থাকুক এ আমি চাইনা!
— তোমার চাওয়ার ওপর আরতো কিছু নির্ভর করেনা! এমন বাবার মেয়ে যে তাকে বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসতে হচ্ছে।
প্রথম প্রথম মেয়েকে মাসে একবার করে নিয়ে যেতো তারপর পিকু আর নিজেই কিছুতেই যেতে চাইতনা। কৌশিক অনেক অনুনয় বিনয় করে কিছুতেই মেয়েকে নিয়ে যেতে পারেনি।
মল্লিকা বাবার একটা মেয়ে তাই থাকার কোন অসুবিধা হয়নি, নাতনী আসায় বাড়ীটাকে নতুন করে সাজিয়ে ছিলেন মল্লিকার বাবা। আর এককতলায় একটা ঘরে মল্লিকার গানের স্কুল হলো, তাছাড়াও সে একটা নামকরা স্কুলে গানের টিচারের কাজ পেলো।ভালোভাবেই চলে যাচ্ছে, বাবাও বেশ কিছু টাকা রেখে গেছেন তার প্রভিডেন্টফাণ্ডের। বাড়ীর একটা দিক ভাড়া দেওয়া হয়েছে তাই মেয়েকে তার সবটুকু দিয়ে মানুষ করতে কোন অসুবিধা হয়নি।কৌশিকও মাঝে মাঝেই মেয়ের নাম করে টাকা পাঠিয়ে দিতো, মল্লিকা সেই টাকাগুলো ওর নামেই জমিয়ে রাখতো।
একদিন ওই টাকার সাথে একটা ছোট খাম এলো তাতে লেখা আছে সমুদ্রের উচ্ছাস উদ্যমতা দেখতে ভালো লাগে কিন্তু দিঘীর শান্ত স্নিগ্ধ জল একটা শীতল আশ্রয় দেয় সেটাই বোধহয় ভালোবাসার আশ্রয়।
মল্লিকা চিঠিটা পড়লো তারপর রেখে দিলো।
— ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো বৌদি কিছু উত্তর দেবেন না?
— আমি তোমাদের আর বৌদি নই মদন!
— আপনিই আমাদের চিরকালের বৌদি। উত্তর?মল্লিকা যেন একটু আনমনা হয়ে গিয়েছিল! চমকে উঠে বলল, হু কি বললে?
— উত্তর?
– না কিছু দেবার নেই আর
–না দাদা বলছিল বৌদি কোন চিঠি দিলে নিয়ে এসো।
— আমার কিছু দেবার নেই আর! বলে দিও তোমার দাদাকে।
এরপর মাঝে মাঝেই টাকা আসতে লাগলো। মল্লিকা দুবার ফিরিয়ে দিয়েছে।
আবার চিঠি এসেছে, তাতে লেখা ছিলো আমার সবই আছে শুধু ঘরটা খালি আছে, একটা কচি মেয়ের গলার আওয়াজ নেই আর আমার জন্য কারও অপেক্ষা নেই। মল্লিকা তারও কোন উত্তর দেয়নি।
আবার চিঠি এসেছে দোলে শান্তিনিকেতনে এসেছিলাম, চারিদিকে লাল পলাশ আর কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়ার ছড়াছড়ি। একা একা লাল মাটির রাস্তা দিয়ে আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম, কিসের যেন অভাববোধ আমার মনটাকে অশান্ত করে রেখেছিল। যে কৃষ্ণচূড়া লাল পলাশকে আমি নিজে হাতে ছিঁড়ে ফেলে রক্তাত্ব করেছিলাম সেই ফুলগুলোকে ফিরে পাবার জন্য এতো আকুলতা কেন বলতে পারো?
এরকম চিঠি মাঝে মাঝেই আসত। এবারের জন্মদিনে একটা রজনীগন্ধার স্তবক রবীন্দ্রনাথের ঘরেবাইরে এলো উপহার স্বরূপ। তাতে লেখা ছিলো, এটুকু ফিরিয়ে দিওনা প্লিজ। আচ্ছা একবার যদি পথ ভুল হয়ে যায় তাহলে কি আর ঠিক পথে ফেরার কোন উপায় থাকেনা?
মল্লিকা এ চিঠির উত্তরে লিখেছিল-
আপনার ঘরে এখন বৌ আছে তা সত্বেও অন্য নারীকে চিঠি লিখে বিব্রত করাটা অপরাধ। যে পথ আলাদা হয়ে বেঁকে যায় সে পথ আর এক হয়ে মেলেনা।
তারপর আর চিঠি আসেনি।
আজ বাড়ীর সামনে হঠাৎ অনেকদিন পর দেখলো কৌশিকের গাড়ী এসে দাঁড়ালো । হাত ভর্তি নানানরকম গোলাপ নিয়ে কে নামছে গাড়ী থেকে? কৌশিক না? একি? কি চেহারা হয়েছে ওর? মাথায় চুল নেই গালে খোঁচা দাড়ি! কোথায় গেল তার সোই উজ্জ্বল ঝকঝকে চেহারা?
সে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিলো। এই চেহারা দেখে অভিমান কোথায় চলে গেল যেন বরং উৎকণ্ঠায় ভরে গেল।
কৌশিক হাত বারিয়ে গোলাপগুলো হাতে দিয়ে বললো, আজ নিজেই এলাম, কারণ না এসে আর উপায় ছিলনা।
মল্লিকা অবাক বিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়ে কোনরকমে বললো, কি হয়েছে তোমার?
— কই কিছু না তো…
— তবে এমন দেখাচ্ছে কেন?
— ওই শরীরটা ভালো যাচ্ছেনা….
— সে তো বুজতেই পারছি….
— একটু চা খাওয়াবে তো?
— হ্যাঁ আনছি এখুনি।
–আর ফুলগুলো?
— মল্লিকা পরম যত্নে ফুলগুলো ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখলো।
-মিলু?
বহুদিন পর আবার এই ডাক শুনে চমকে উঠলো!
আজ কিন্তু তেমার কাছে দুটো আব্দার রাখবো, তা তোমায় রাখতে হবে। বলতে পারো এই আমার শেষ আব্দার আর তোমাদের জ্বালবনা…
— কি আব্দার? মল্লিকার গলাটা কেঁপে উঠল।
— আরে ভয় পেলে কেন? আজ ভালোবাসার দিন তাই ভালোবাসার মানুষটার কাছেই আব্দার রাখছি..
— আমি তোমার ভালোবাসার মানুষ? অবাক করলে?
— আসলে মানুষটা কাছে থাকলে তাকে বোঝা যায়না আর যাকে ভালোবাসা বলে ভুল করেছিলাম সেটা ছিলো মোহ আর কিছুনা। তোমরা চলে আসার কিছুদিন পর বুঝতে পারলাম আমার ঘরটা আর ঘর নেই সেটা একটা হোটেল হয়ে গেছে…
— কি আব্দার বললে না তো?
— আজ তোমার হাতে গরম ফুলকো লুচি খাবো আর তোমার গলায় সেই গানটা শুনব…
— কোন গান?
— আমার মল্লিকা বনে…
— সে গান তো তোমার…
— থাক না পুরানো কথা মিলু! অনেক শাস্তি পেয়েছি তাও কি তোমাদের আশ মিটছেনা? জীবনটাইতো শেষ হয়ে এসেছে…
— মানে?
— আমায় দেখে বুঝতে পারছনা আমার কেমো চলছে। কি বলছ তুমি? শাস্তি তো আমায় তুমিই দিয়ে গেলে সারাজীবন ! যেখানেই থাক তবু জানতাম মানুষটাতো আছে, সেটুকুও কেড়ে নিচ্ছো, আমি কি করবো বলতে পারো? না পারবো ওখানে গিয়ে তোমায় দেখতে না আমার কাছে এনে রাখতে, আমার সব অধিকার তুমি ছিনিয়ে নিয়েছ, এখন বলছো গান গাইতে এরপর আর গান হয়?
— বেশ তবে লুচি খাওয়াও…
লুচি খেয়ে কৌশিক একটা খাম দিয়ে বললো, এটুকু পিকুর জন্য বাঁচিয়ে রেখেছিলাম, পিকুকে বোল এটা তার জন্য তার হতভাগ্য বাবার উপহার। তোমাকে কিছুই দিয়ে যেতে পারলাম না সব আর একজন নিয়ে নিয়েছে। পারলে আমায় ক্ষমা করো।
চলে গেল কৌশিক তার শেষ কথাটা বলে দিয়ে। আর মল্লিকা অঝরধারে কেঁদে চলেছে আর বলছে , সারাজীবন তো দূরেই ছিলে তবে এতোদিন পর কেন এসে আবার আমায় কাঁদিয়ে গেলে।। -
কবিতা- স্বপ্নের আড়ালে
স্বপ্নের আড়ালে
-পারমিতা চ্যাটার্জীএমন একটা সকাল কেন আসে না
যেদিন আমার রোমান্টিক মনটায়
একটু ভালোবাসার স্পর্শ পায়।
জীবন অনেক কিছু দেয়
অভাব রাখে শুধু একটু ভালোবাসায়।
“তোমায় আমি খুব ভালোবাসি”
একথা হয়তো কেউ একদিন ভুল করে বলে ফেলেছিল,
তারপর শীতের কুয়াশার চাদরে তার ভালোবাসার উষ্ণতা ঢেকে গিয়েছিল কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারের আবরণে।
আর সে ভালোবাসা আসেনি ফিরে।
অনন্ত প্রতীক্ষা আমার ফিকে হতে হতে একদিন মিলিয়ে গেলো,
শুধু তার রেশটুকু বাঁধা থাকলো আমার তানপুরায় তারে।
ভালোবাসি বলা যত সহজ,ভালোবাসাটা কিন্তু অনেক কঠিন।
সত্যি কি কেউ ভালোবাসতে পারে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে!
না আজ সত্যি পৃথিবীতে ভালোবাসার বড়ো অভাব
তাই একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে ওঠে হুইস্কির গ্লাস,
আর নিদ্রাহীন চোখের ঘুমের জন্য চাই ডিপ্রেশনের ওষুধ।
আজ সত্যি মানুষ বড়ো একলা,
মানুষ বড়ো অসহায়,
বাঁচার জন্য ছটপট করে
অথচ বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পায় না।
প্রকৃতির রূপ রুক্ষ শীতের হাওয়ায় এখন ধূসর বেরঙা,
আমিও আজ বেরঙা হয়ে পরে আছি ঘরের এককোণে।
কবে যেন শিল্পী সেই কালজয়ী গান গেয়েছিলেন
“এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না যাতে মুক্ত আছে,
এমন কোন মানুষ খুঁজে পেলামনা যার মন আছে”।
তুমি আমি আজ সবাই তাই অন্ধকারে শক্তি খুঁজে ফিরি,
আলোর ঠিকানাটা যে হারিয়ে গেছে অনেক দিন,
এখন শুধু বিনিদ্র রাতের অন্ধকারকে বড়ো আপন মনে হয়,
নির্জন নিস্তব্ধ রাত বন্ধু হয়ে এসে দাঁড়ায় ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের আড়ালে। -
গল্প- তানপুরা
তানপুরা
– পারমিতা চ্যাটার্জীবহুদিনের পুরানো বাসস্থান বদল হচ্ছে, সমরের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে, কত পুরানো স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাসায়, আজ তা ভেসে উঠছে বুকের মধ্যে, অথচ সেই মানুষটা নীরবে এই বাসাটাকে বাঁচাবার জন্য যখন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যেত তখন এর কোন দাম দেননি, উল্টে কত বিদ্রুপ করে গেছেন। আজ চোখের জলটা যেন নিজের কাছেই নোনতা লাগছে।
কিছু বলছেন না তিনি চুপ করে দেখে যাচ্ছেন। ছেলে প্রদীপ আর বউমা কমলিকা সব পুরানো জিনিষগুলো বাতিল করে দিচ্ছে, তাদের নতুন সাজানো ফ্ল্যাটে এগুলো খুবই বেমানান হবে না কি! আজকালকার ছেলেমেয়ে কিছু বলার উপায় নেই, এতো আর জয়া নয় যে শাশুড়ির হাজার গঞ্জনা সহ্য করেও গানের টিউশনের পয়সা দিয়ে শাশুড়ির হাঁপানির ওষুধ কিনে আনবে।
প্রদীপ জিনিষগুলো এক ধার থেকে বাতিল করতে করতে এসে থমকে দাঁড়ালো মায়ের তানপুরাটার কাছে এসে। মনে পড়ে গেল তার বড় টিপ পরা সুন্দরী মায়ের মুখখানা, এই তানপুরা বাজিয়ে মা সেদিন জীবনের শেষ গানটা গেয়েছিলেন, ‘যখন জমবে ধূলা তানপুরাটার তার গলায়, তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে, তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে…’ শরীরটা খারাপ থাকায় মা সেদিন বিকেল বেলায় ছাত্রছাত্রীদের বাড়ীতে ডেকে ছিলেন, বাবা অফিস থেকে ফেরার আগেই যাতে ক্লাস নেওয়া হয়ে যায়, সেই বাবা তাড়াতাড়ি সেদিন বাড়ী ফিরলেন আর মায়ের ক্লাস দেখেই চিৎকার করে বলে উঠলেন- এখন দেখছি বাড়ীতেও গানের অত্যাচার আরম্ভ হল। মাকে সেদিন খুব ক্লান্ত লাগছিল, ছাত্রদের ছুটি দিয়ে বাইরে এসে বললেন এই গানটা আমি সখ করে শেখাই না।
– কেন আমি কি রোজগার করিনা না কি?
– হ্যাঁ, তাতে শুধু ডালভাতের খরচটুকু আর বাড়ীভাড়াটা আসে, আর ছেলে মেয়েদের স্কুল কলেজের পড়ার তাদের টিউশন তোমার মায়ের ওষুধের খরচ সব এই গান শিখিয়ে আসে, একটা কাজের লোক পর্যন্ত রাখতে পারিনা, সমস্ত কাজ নিজে হাতে করি এই শরীর নিয়ে সে খবর রাখো কখনও? ওইটুকু কথা বলতেই মা কেমন হাঁপিয়ে পড়লেন আর ঘামতে শুরু করলেন। প্রদীপ মাকে ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে বাবাকে বলল- কখনও কি একটা ভালো কথা বলতে পারোনা? যে মানুষটা সকাল থেকে রাত অবধি নিরলস পরিশ্রম করে যায় তার কি কিছুই পাওনা নেই? আর তোমাকেও বলি মা কতবার বলেছি একটা কাজের লোক রাখি, আমি টিউশন করি তুমি রাজি হওনি খালি একটা কথা বলে যাও তোরা শুধু ভালোভাবে দাঁড়া তাহলেই আমার সব পাওয়া হবে। যাক আর তোমার কষ্ট করতে হবেনা আমি চাকরী পেয়ে গেলাম, বলে প্রদীপ অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা মায়ের পায়ের কাছে রাখল। মা প্রদীপের মাথাটা নিজের কোলে টেনে নিয়েছিলেন। প্রদীপ মায়ের মুখের দিকে চেয়ে বলল, আমার এই ভালো চাকরী পাওয়ার পেছনে তোমার অনেক শ্রম আর ঘাম আছে মা, আর গান শিখিয়ে আমাদের শিক্ষিত করে তুলেছিলে বলে সংসার তোমায় দিয়েছে অনেক অপমান আর লাঞ্ছনা। আমি তোমায় কথা দিলাম মা তোমার সব অপমানের জবাব আমি দেব। মা হাতের ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিয়ে বলেছিলেন- মিষ্টি কিনে আন বাবা এতোবড় সুখবর, আর আসার সময় তোর ঠাকুমার হাঁপের ওষুধটাও নিয়ে আসিস।
প্রদীপ ভাবছিল মা শুধু দিয়েই গেলেন কিছু পাবার সুযোগ দিলেন না। সেই রাতেই মায়ের প্রচণ্ড বুকে ব্যথা আরম্ভ হল, বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন- তাড়াতাড়ি একটা ডাক্তার ডাক বাবু তোর মা কেমন করছে, ডাক্তার আসতে আসতেই সব শেষ হয়ে গেল।
প্রদীপ খুব যত্ন নিয়ে তানপুরার ধূলাগুলো ঝাড়ছিল আর তার দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরছে, আর মনে হচ্ছিল মা কেন শেষদিন ওই গানটা শেখাচ্ছিলেন, ‘যখন জমবে ধূলা তানপুরাটার তার গুলায় তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে’।
হঠাৎ কাঁধে কার হাতের স্পর্শে প্রদীপ চমকে তাকালো, দেখল স্ত্রী কমলিকা এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে বাবা, প্রদীপ জলভরা চোখে স্ত্রীর দিকে চেয়ে বলল, আর কিছু নয় শুধু এই তানপুরাটা নিয়ে যাবো। -
গল্প- মোহর
মোহর
-পারমিতা চ্যাটার্জীমোহর বিদেশ থেকে শাশুড়ি মাকে ফোন করলো-
– কেমন আছো মা?
– এই আছি মা, চলে যাচ্ছে
– আমি জানি মা তোমার খুব একা লাগে তাইনা?
– হ্যাঁ রে একাকীত্ব বড়ো কষ্টকর, সব থেকেও যেনো কিছু নেই, মাঝে মাঝে খুব অসহায় লাগে নিজেকে –
– আর অসহায় লাগবেনা, আমার ওপর একটু ভরসা রাখো, আর সেই পুরানো সব সংস্কার থেকে তোমাকে আমি বের করে আনবোই। সব কর্তব্য তোমার হয়ে গেছে, এবার তোমাকে শুধু নিজের জন্য বাঁচতে হবে।
– মা সামনের মাসে আমি আসছি তোমার কাছে, অনেকদিন তোমাকে দেখিনি, খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, তুমি তো জানো সেই ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি, এখন মা বলতে তোমাকেই বুঝি।
অন্নপূর্ণা দেবী জানেন এই মেয়েটি নামেই তার পুত্রবধূ, কিন্তু তার ভালোবাসা,কোন সন্তানের চেয়ে কিছু কম নয়।তাঁর অন্তরের দুঃখ বেদনা, নিত্য স্বামীর অপমান সে নিজে চোখে দেখেছে, একমাত্র সেই রুখে দাঁড়িয়ে ছিল শ্বশুরের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে।
আঙুল উঁচু করে বলেছিল, ” আর যদি কোনদিন দেখি আপনি আমার মামনিকে কোন অপমান করেছেন, তবে জেনে রাখবেন সেদিন আপনার কপালে অনেক দুঃখ আছে “।
আধুনিক মেয়ে মোহরের তীব্র চোখের দৃষ্টির সামনে সেদিন মাথা নীচু করতে বাধ্য হয়েছিল সেই লোকটা, যার নাম ছিল প্রদ্যোত, আজ তিন বছর হল তাকে সে মুক্তি দিয়েছে, কিন্তু একথা সত্যি যে তার মৃত্যুতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হয়নি অন্নপূর্ণাদেবীর বরং একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল তার।
সারাজীবন শিক্ষিতা স্বনির্ভর অন্নপূর্ণাকে সে মানুষিক তো বটেই শারীরিক অত্যাচারও কম করেনি। রাতগুলো ছিল বিভীষিকা, রিতীমত ধর্ষিত হতেন তিনি স্বামীর হাতে প্রতিরাতে, একবার বড়োছেলেকে লজ্জার মাথা খেয়ে বলেছিলেন, ” তোরা তো বড়ো হয়েছিস তাই বলছি, প্রতিরাতে তোর বাবার এ অত্যাচার আর তো আমি সহ্য করতে পারছিনা, ” মায়ের ঘাড়ে দগদগে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট তখনও, সে তাড়াতাড়ি মায়ের ক্ষত জায়গায় ওষুধ লাগিয়ে দিল,তারপর মায়ের হাত ধরে বাপের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেছিল, এটা কি? নির্লিপ্ত উত্তর দিয়েছিল নির্লজ্জ লোকটা, আমি কি করবো? ওরকম সব মেয়েদেরই হয়,
ছেলে রুখে দাঁড়িয়ে আবার বলেছিল, না সবার হয়না,তোমার মতন পশুর সাথে যাদের ঘর করতে হয় তাদেরই হয় – বাবার চিত্কারকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল একবার গলা তুলে দেখ, তোমার জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে দেব,আর আজ থেকে মা আলাদা শোবে, এই নিয়ে তুমি যদি কোন গণ্ডগোল কর তাহলে তোমাকে আমি টানতে টানতে পুলিশের কাছে নিয়ে যাব। চিতকার চেঁচামেচিতে অন্য দুই ছেলেও এসে গেছে ছোট ছেলে তো মায়ের আঘাত দেখে উত্তেজিত হয়ে বাবাকে মারতে উঠেছিল, অন্য ভাইয়েরা থামিয়ে দিয়ে বললো ছেড়ে দে।
সেই থেকে তার শোবার ঘর আলাদা, বউমারা এসেও দেখেছে শাশুড়ি মায়ের আলাদা শোবার ব্যাবস্থা। শ্বশুরের মুখে কুশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল শুনে আলাদা থাকার কারণ টা তারা বুঝে নিয়েছিল।
মোহর শাশুড়ি মায়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল, তাকে অনেক মনের কথা বলেছিলেন অন্নপূর্ণা দেবী।
সেই সময় মোহরকে বলে ফেলেছিলেন তার একান্ত মনের গোপন কথাটি।
কলেজে পড়বার সময় তাঁর খুব ভালো লাগতো তাঁদের প্রফেসর অমলেন্দু নাগকে, বোধহয় তাঁরও ভালো লেগেছিল স্বল্পভাষী মিষ্টি অন্নপূর্ণাকে, সবাই বলতো স্যার তো একজনের মুখের দিকে চেয়েই লেকচার দিয়ে যান, আর কোনদিকে তাকান না। লজ্জা পেতেন তিনি সহপাঠীদের কথায়, কিন্তু এ কথা সত্যি যে তিনি তার দিকে তাকিয়ে পড়িয়ে যান। কিন্তু কেউ কোনদিন মনের কথা কাউকে বলেন নি। কলেজ শেষ হবার পর মার্কশীট আনতে যেদিন অন্নপূর্ণা কলেজে গেলেন সেদিন তিনি নিজেই স্যারের সাথে দেখা করতে গেলেন, স্যারের ঘরে তখন নতুন ভর্তির জন্য বেশ কিছু লোকজন ছিল, তাকে দেখে তাদের একটু অপেক্ষা করতে বলে তিনি বাইরে এসে বলেন,” আমি জানতাম তুমি আসবে “,
অন্নপূর্ণা মাটির দিকে চোখ নামিয়ে নিয়েছিলেন লজ্জায়। তিনি ওর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, একটু বাইরে অপেক্ষা করতে পারবে? আমি এই কাজটা সেরেই আসছি – অন্নপূর্ণা মাথা নামিয়েই সম্মতিসূচক ঘাড়া নেড়ে বাইরে আসেন।একটু পরেই উনি বেরিয়ে এলেন, বললেন চল- অন্নপূর্ণার ইচ্ছে থাকলেও জিজ্ঞেস করতে পারলেননা কোথায়! নীরবে অনুসরণ করে চলতে লাগলেন। একটু পরেই একটা কফিশপে দুজনে বসলেন, তারপর উনি খুব ধীর স্থির গলায় বললেন, বহুদিন থেকেই একটা কথা তোমাকে বলতে চাইছিলাম কিন্তু বলতে পারিনি, আজ তোমার কলেজ জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, আজ আর না বললে আর হয়তো বলাই হবেনা তাই তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম-
অন্নপূর্ণা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন – উনি বললেন, কলজে যখন তোমার মুখের দিকে চেয়ে পড়াতাম, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে তুমি আমাকে একটু অন্য ভাবে পছন্দ কর,মানে আমার প্রতি একটা ভালোলাগা তোমার মধ্যে কাজ করে- কি আমি ঠিক বলছি তো?
অন্নপূর্ণা তখন রীতিমতো ঘামতে শুরু করে দিয়েছেন, কোনরকমে মুখ নামিয়ে বললেন, হ্যাঁ –
– তিনি তখন বললেন – ব্যাস আমি এই উত্তর টার জন্যে অপেক্ষায় ছিলাম, আচ্ছা! তুমি কি বুঝতে পেরেছিলে যে আমিও তোমাকে খুব পছন্দ করি ।
অন্নপূর্ণা এবার একটু মুখ তুলে বলেছিলেন, আন্দাজ করেছিলাম, তাইতো আজ সাহসে ভর করে আপনার ঘরে এসেছিলাম, যদি কিছু বলেন তাই !তিনি হেসে ফেলে বললেন, যতোটা ভালোমেয়ে ভেবেছিলাম ততোটা মোটেই নয় তাহলে দেখছি, বলেই হেসে উঠেছিলেন আর অন্নপূর্ণাও ওর টোল ফেলা গাল নিয়ে হেসে ফেলেছিলেন।তারপর ওরা আরও দুচারদিন দেখা করেছিলেন, দুজনে মনের কাছাকাছি এসেছিলেন।
প্রায় একমাস ঘোরাঘুরির পর একদিন গঙ্গার ধারে তার হাতটা ধরে বলেছিলেন, তুমিতো এম এ পাশ করে এমফিল করবে?
– হ্যাঁ সেই রকমই তো ইচ্ছে আছে –
– ইচ্ছে আছে না করতেই হবে – আর তার সাথে আর একটা জিনিসও করতে হবে-
-কি?
– অপেক্ষা – পারবেনা আমার জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে? আমি একটা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ যাচ্ছি পোস্ট ডক্টরেটের জন্য, পাঁচটা বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে,তুমি পারলে পি এইচ ডি আরম্ভ করে দিও, আমি নিয়মিত তোমাকে নোটস পাঠাবো, চিঠিও লিখবো, দেখবে ঠিক সময় কেটে যাবে –
– তিনি বলেছিলেন করতেই হবে, এখন তো আর কোন রাস্তা নেই, ভালোবেসেছি যে-
– তিনি মৃদু হেসে সেদিন অন্নপূর্ণার মাথাটা বুকের কাছে টেনে এনে তার কপালে একটা আলতো চুম্বন দিয়ে বলেছিলেন, ভালোবাসার অপেক্ষা খুব মধুর হয়-।
কিন্তু এমনই ভাগ্য যে এমফিল শেষ হবার সাথে সাথেই বাবার ক্যান্সার ধরা পড়লো,তারা ধনে প্রাণে শেষ প্রায় শেষ হয়ে গেলেন। বাধ্য হয়ে তাকে কলেজের চাকরি নিতে হল, পি এইচ ডি করা আর হল না। ভেবেছিলেন একটু সামলে নিয়ে পি এইচ ডি আরম্ভ করবেন। তাদের বসতবাড়িও বাধা পড়েছিল বাবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে, বাধ্য হয়ে তাদের তিন ভাই বোন বোন সমেত মাকে কাকার বাড়ি আশ্রয় নিতে হয়েছিল।তখন কলেজের মাইনে এতো বেশি ছিলোনা, তাই দুই ভাইবোনের পড়া আর টিউশনির খরচ দিয়ে কাকার হাতে খুব কম টাকাই দিতে পারতেন, এতে কাকা কাকীমার অসন্তোষ টের পাচ্ছিলেন, তখন একাধিক টিউশন নিয়ে সাংসারিক ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছিল, তাতেও শান্তি ছিলোনা। এরকম অবস্থায় একদিন হঠাৎ জানতে পারে কাকা তার বিয়ে ঠিক করেছে, মায়ের কান্না, তার অনেক অনুনয় বিষয়কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে মূর্খ কিন্তু কিসব চামড়ার ব্যাবসা করে প্রদ্যোতের সাথে তার বিয়ে দিয়ে জীবনের চিত্রটাকে কাকা পুরো বদলে দিয়েছিল। অমলেন্দুকে সবই খুলে লিখেছিলেন তিনি তার অক্ষমতার কথা, অমলেন্দু চিঠিতে জানিয়েছিল আর একটু আগে কেন জানালেনা-?
আমি চলে আসতাম ।
তিনি উত্তরে দিয়েছিলেন, মাত্র সাতদিন আগে তাকে জানানো হয়েছিল তার বিয়ের কথা, তখুনি চিঠি দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমার কাছে যখন চিঠি পৌছেছে তখন আমার যা হবার তা হয়ে গিয়েছে।
একমাত্র মোহরকেই এসমস্ত কথা তিনি বলেছিলেন, মোহর ছয়মাসের ছুটি নিয়ে এলো – অন্নপূর্ণা দেবী আনন্দে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাকে, তুই এতোদিন থাকবি আমার কাছে-
– হ্যাঁ মা জীবনে অনেক কষ্ট করেছ, আর নয় এবার তোমার একটা ব্যাবস্থা করবো বলেই এসেছি –
– কি ব্যবস্থা -?
– সেটা সারপ্রাইজ থাক-।
মোহর অমলেন্দুর সাথে যোগাযোগ করে শহর থেকে একটু দূরে একটি বিরাট বাড়ি কেনা হয়েছিল, অমলেন্দুই কিনেছেন, মোহর বহুদিন থেকে তাঁর সাথে যোগাযোগ করে এই ব্যবস্থা করেছিল, বাড়িটি হয়েছিল বৃদ্ধাশ্রম, শ্রীরামপরে একদম গঙ্গার বক্ষে বাড়িটি ছিল, সেখানে ডাক্তার, হোম কিচেন সব ছিল, একটা ঘরওলা ছোট ফ্ল্যাট আবার দুটো ঘরওলা ফ্ল্যাটও ছিল, বাড়ির সামনে ফুলের বাগান, পিছনে একটি সুন্দর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন সাজানো ঝিলকে ঘিরে সব্জির বাগান। অমলেন্দু তার নিজের জন্য দুই ঘরওলা একটা ফ্ল্যাট রেখেছিলেন, বাকি সব ফ্ল্যাট গুলোই ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির বাইরে বড়ো বড়ো করে একটি শ্বেতপাথরের প্লেটের ওপর লেখা ছিল অন্নপূর্ণা বৃদ্ধাশ্রম।এসব কথা অন্নপূর্ণা কিছুই জানতেন না।
কিছুদিন পর মোহর তাকে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে বললো, চল আমার সাথে একটু বেরোতে হবে,
কোথায় রে?
গেলেই দেখতে পাবে -।
যাবার পথে মোহর গাড়ি থেকে নেমে কিসব কিনলো যেনো, তিনি দেখলেন দুটো বড়ো ফুলের গোড়ের মালা দু তিনটি বিরাট বাক্স ভর্তি করে মিষ্টি,
– তোর মতলব টা কি বলতো? কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে?
– উফ্ বড়ো কথা বল তুমি, চল তো চুপচাপ।
এরপর তো আরও অবাক হবার পালা, একটি রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে দাঁড়ালেন দুজনে, দেখলেন অমলেন্দু বেরিয়ে এলেন ধুতি পান্জাবী পরে। পরের ঘটনা তো আর বলার দরকার নেই।
সেদিন বৃদ্ধাশ্রমের সবাই খুব আনন্দ করলো, অমলেন্দু সবার জন্য ছোট করে খাওয়ার আয়োজন করেছিলেন, তার সাথে মোহরের আনা মিষ্টি, মায়ের জন্য একটা সাদার ওপর লাল পার দেওয়া বেনারসি, আর অমলেন্দুর গরদের পান্জাবী আর ধুতি। ওদের হাতে তুলে দিয়ে বললো এই নাও মেয়ের বাড়ি থেকে আনা ফুলশয্যার তত্ত্ব।
অন্নপূর্ণা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে বললেন তুই পেটে পেটে এতো কিছু করেছিস, আমাকে কিছু জানতে দিস নি –
– আমি তো কিছু করিনি মা শুধু দুটো বহুদিন ধরে অপেক্ষাকৃত হৃদয়কে মিলিয়ে দিয়েছি, যা তোমার পাওনা ছিল আমি তাই করেছি শুধু এই বৃদ্ধাশ্রমে।
কাকুর কাছে যখন শুনলাম কাকু তোমার নামে এই বৃদ্ধাশ্রম করেছেন আর তিনিও একা কাউকে বিয়ে করতে পারেননি শুধু তোমাকে ভালোবেসে ছিলেন বলে, আমি এই বৃদ্ধাশ্রমে দুটি ভালোবাসাকে এক করে দিলাম শুধু।
রাত্রি এলো,অমলেন্দু পরিপূর্ণ ভাবে তাকালেন তার যৌবনের ভালোবাসায় দিকে-তারপর দুহাত বাড়িয়ে দিলেন,অন্নপূর্ণা ধরা দিল সেই বহু প্রতিক্ষিত বাহুবন্ধনে।এতদিনের অপূর্ণ ভালোবাসা মুক্তি পেল অবশেষে বৃদ্ধাশ্রমের একটি স্বল্প পরিসর ফ্ল্যাটে। -
গল্প- রুবি রায়
রুবি রায়
– পারমিতা চ্যাটার্জীঅতনুর আজ একজনের সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা। এখন সে দিল্লি নিবাসী, কলকাতায় এসেছে কয়েকদিনের জন্য, তারমধ্যে প্রধান আকর্ষণ বইমেলা, এবারের তার দুঊটো বই বার হচ্ছে, একটা গল্পের আর একটা কবিতার।
ঠিকানাটা হাতে নিয়ে দেখে অবাক হয়ে গেলো যেখানে তার যাবার কথা, সেটাতো তার ছোটবেলার পাড়া।
গাড়ি থেকে একটু আগেই নামলো, হেঁটে হেঁটে চলে এলো চেনা সেই গাছতলার কাছে।
এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো, অনেকদিন আগের একটা মিষ্টি অনুভূতি মনকে এক সুন্দর আবেশে ভরিয়ে দিল।
ঠিক এইখানেই স্কুলবাস থেকে সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দেওয়া দু’টো লম্বা বিনুনি দু’দিকে ঝুলিয়ে একটা ফুটফুটে মেয়ে স্কুলবাস থেকে নামতো।
সবে কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্র অতনুর ওই মেয়েটিকে গাছতলার থেকে একটু দেখার আকর্ষণে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো।
এইভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একদিন সুগায়ক অতনু গান গেয়ে ফেললো, “মনে পড়ে রুবি রায় কবিতায় তোমাকে একদিন কতো করে ডেকেছি, আজ হায় রুবি রায় ডেকে বল আমাকে, তোমাকে কোথায় যেন দেখেছি… “
মেয়েটির ছদ্ম কপট ভ্রূকুটির মধ্যে ছিল প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের ইঙ্গিত।
না না মেয়েটির সাথে আলাপ হওয়া তো দূরের কথা তার নামটাও জানা হয়নি, তাই সেই মেয়েটি তার হৃদয়ের গোপন কোণে আজও রুবি রায় হয়েই থেকে গেছে।
সে আজ প্রায় পঁচিশ বছর আগেকার কথা। এখন সে পৃথিবীর কোনখানে বা কোন দেশে আছে তার কিছুই সে জানেনা, আজ হয়তো দেখলেও তার সাধের রুবি রায়কে সে চিনতে পারবেনা। কিন্তু সেদিনের সেই রুবি রায়ের দুষ্টুমিষ্টি মুখচ্ছবি আজও ভুলতে পারেনি, পথ চলতি ওই বয়েসের কোন মহিলা দেখলেই সে ফিরে তাকায়, মনে হয় এই সেই রুবি রায় নয়তো!
একবার দোলের দিনের কথা মনে পড়ে গেলো অতনুর, নিজের অজান্তেই গাল দু’টো লাল হয়ে গেলো। সেবার পাড়ায় সবাই সবাইকে আবীর মাখাচ্ছে, রুবি রায়ের বাবা খুব কড়া ধাঁচের মানুষ ছিলেন বলে ও পাড়ায় বিশেষ মেলামেশা করার সুযোগ পেতোনা, একটাই ওর বন্ধু ছিল তার সাথে বাড়িতে বসে গল্প করতো তা নইলে ও বন্ধুর বাড়ি যেত তাও বাড়ির গাড়ি করে। তাই ওর নামটার সাথে কেউ পরিচিত ছিলোনা, সবার কাছে ওই রুবি রায় নামটাই অতনুর কল্যাণে চালু হয়ে গিয়েছিল।
সেবার দোলের দিন শিকে ছেঁড়ার মতন পাশের বাড়ির একটি মেয়ের ডাকে যে একসাথে ওর সঙ্গে মাধ্যমিক দেবে, তার সাথেই যা একটু ভাব হয়েছিল, আসলে রুবি রায় পাড়ায় নতুন এসেছিল, নিজেও লাজুক প্রকৃতির বিশেষ মিশুকে ছিলোনা। হঠাৎই সেদিন টুটুর ডাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো আবীর হাতে নিয়ে, সবার অলক্ষ্যে সেদিন অতনু ওর দু’গালে বেশ করে আবীর মাখিয়ে দিয়েছিল, মেয়েতো লজ্জায় লাল, আর মুখ তুলতেই পারেনা, অতনু তখন নিজেই উপযাচক হয়ে নিজের মুখটা বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, “আজকের দিনে আমাকে একটু আবীর দেবেনা?” সে কোনরকমে ওর কপালে একটু আবীর ছোঁয়ালো কি ছোঁযালো না, ওইটুকু করতেই ঘেমে উঠলো। এরমধ্যে টুটু একটা গোপন কথা ফাঁস করে দিল যে রুবি রায় নাকি খুব ভালো রবীন্দ্রসংগীত গায়, ব্যাস আর যাবে কোথায়, বিকেলে পাড়ার গানের আসর বসে প্রতি দোলের সন্ধ্যায়, বিকেলে ওকে আসরে গাইতে হবে বলে সবাই চেপে ধরলো, টুটু বললো, “আমি মেসোমশাইকে রাজি করিয়ে ওকে ঠিক নিয়ে আসবো” আরও একটা কথা সেদিন জানা গেলো ও নাকি খুব ভালো লেখে, স্কুলের ম্যাগাজিনে প্রতিবার লেখে এবং বাংলায় খুবই দক্ষতা আছে, অতনুর তো আরও মুগ্ধ হবার পালা। লেখা আর গান যে তারও নেশা, সেও তো কলেজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক, আর কলেজে গাইয়ে হিসেবে তারও বেশ সুনাম আছে।
সেদিন অবশ্য ওর নামটা জানা গিয়েছিল কিন্তু ওই রুবি রায় নামটা সবার মনে এমন ঢুকে গিয়েছিল যে ওর আসল নামটা সবাই ভুলেই গিয়েছিল।
সেদিন বসন্ত সন্ধ্যায় অতনু একটা রবীন্দ্রসংগীতই গেয়েছিল, যদিও সে সবরকম গানেই অভ্যস্ত, তবে সেদিন তার রবীন্দ্রসংগীতটা খুব ভালো হয়েছিল, সে গেয়েছিল, “একটুকু ছোঁয়া লাগে একটুকু কথা শুনে” এরপরই রুবি রায়ের পালা, সেও কম যায়না। সে গাইলো, “তোমার বীণায় গান ছিল, আর আমার ডালায় ফুল ছিল ” ওর শেষ লাইনটা অতনুর মনে এখনও দাগ কেটে আছে, শেষ লাইনটা ছিল, “ফাগুন বেলায়, মধুর খেলায়, কোনখানে হায় ভুল ছিল গো ভুল ছিল… “
সত্যি সেদিন ফাগুনবেলায় জীবনে প্রথম এবং শেষবারের মতন একটু মধুর খেলা হয়েছিল, তারপর আর সুযোগ হয়নি।
সেও দিল্লিতে চলে গিয়েছিল জে এন ইউ-তে মাস্টার্স করতে, শেষ হবার সাথে সাথেই পি এইচ ডি আরম্ভ করেছিল। যাবার সময়ও দেখা করার সুযোগ হয়নি, টুটু মারফত জানতে পেরেছিল, রুবি রায়ের নাকি সে চলে যাওয়াতে মনটা খুব খারাপ, দু’জনেই দু’জনকে ভালোবেসে ফেলেছিল প্রায় কোন কথা না বলেই। টুটুর হাতেই আসার সময় একটা ছোট্ট চার লাইনের চিঠি দিয়ে এসেছিল।
তাতে লিখেছিল, ভালোবাসা যে এতো সুন্দর মাধুর্য থাকে তা তোমার সাথে দেখা না হলে বুঝতে পারতামনা। আমি আশা করবো আমি ফিরে আসা অবধি তুমি অপেক্ষা করবে।
সেও একটা উত্তর দিয়েছিল, চিঠিটা বিষাদে ভরা।
চিঠিটা ছিল এইরকম,
“আমার বাবা রিটায়ার করবেন, তাই হয়তো খুব বেশিদিন অপেক্ষা করবেন না। আমি বাবার মুখের ওপর কথা বলতে পারিনা, তাই জানিনা আপনার অনুরোধ আমি রক্ষা করতে পারবো কি না।
আমার এই অক্ষমতাকে আপনি ক্ষমা করে দেবেন। কিছুদিনের জন্য এই ভালোলাগার সম্পর্কটুকু আমার জীবনে চিরকাল সঞ্চিত হয়ে থাকবে। আমার জন্যে গাওয়া আপনার গলায়, মনে পরে রুবি রায় গানটি আমার পাওয়া এক শ্রেষ্ঠ উপহার হয়ে থাকলো। খুব ভালো থাকবেন, আর অনেক সাফল্যে আপনার জীবনকে ভরিয়ে তুলুক এই কামনাই করি।
ইতি আপনার
রুবি রায় “।
চিঠিটা পেয়ে খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল অতনুর, একবার ভাবলো যাবেনা দিল্লিতে, কলকাতা ইউনিভার্সিটিতেই পড়বে, সেইমত চিঠিও দিল কিন্তু উত্তর এলো,
“জীবনে সুযোগ বারবার আসেনা, আমার জন্য এই সুযোগ ছেড়ে দিলে, আমি নিজেকে নিজেই ক্ষমা করতে পারবনা। আপনার উন্নতি আমার পাথেয় হয়ে থাকবে।”
এরপর আর যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকেনা, ভেবেছিল মাস্টার্সটা ওখান থেকে করে এসে, পি এইচ ডি যাদবপুর থেকে করবে, যা স্টাইপেন পাবে তাই দিয়েই রুবি রায়কে নিয়ে সংসার আরম্ভ করবে।
এরপর তার মাস্টার্সের ফাইনাল ইয়ারে এসে সে জানতে পারে তার বিয়ে হয়ে গেছে।
ও নাকি অনেক চেষ্টা করেছিল, বাবাকে বলেও ছিল যে,”বাবা আমার রেজাল্ট তো বেশ ভালো হয়েছে, কলেজের প্রফেসররা বলছেন, এখনি বিয়ে কেন! এম এ পড়বেনা”? কিন্তু তার বাবা বলেছিলেন, মা, আমারও তো ইচ্ছে ছিল যে তোমাকে আরও পড়াই, পড়াতামও যদি আমার আর তোমার মায়ের শরীর ভালো থাকতো, আমরা দু’জনেই হার্টের পেশেন্ট, তাছাড়া রিটায়ারমেন্টরও সময় হয়ে এসেছে তাই আর রিস্ক নিতে পারছিনা, আমার কিছু হয়ে গেলে তো তোমার মা অসুস্থ শরীর নিয়ে সবদিক সামাল দিতে পারবেনা। তাছাড়া তোমার যেখানে বিয়ে দিচ্ছি তারা আমায় কথা দিয়েছে যে তোমাকে পড়াবে, আর ওরা না পরালেও আমি কথা দিচ্ছি আমি তোমায় পড়িয়ে যাবো”। এরপর আর সে কিছু বলতে পারেনি।
বিয়ের দিন টুটুকে জড়িয়ে ধরে ভীষণ কেঁদেছিল, আর বলেছিল, তাকে বলে দিস, তার রুবি রায় কতটা অক্ষম, কিন্তু কোনদিনই সে আমার মন থেকে মুছে যাবেনা, আমার প্রথম ভালোবাসার ফুলটা যা অসময়ে ঝরে গেলো, সেই ঝরা ফুলের পাপড়িগুলো আমি চিরকাল বুকে আঁকড়ে রেখে দেবো।
অতনু আর তারপর কলকাতায় ফিরে আসেনি, পি এইচ ডি কমপ্লিট করে জে এন ইউয়ের প্রফেসর হয়েছে। অনেকদিন পর কলকাতায় এসে শুনেছিল ওর বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। বাবা মাও মেয়ের সাথে এই প্রবঞ্চনা মেনে নিতে না পেরে এক বছরের মধ্যে দু’জনেই মারা যান হার্ট অ্যাটাকে। ওর স্বামী নাকি খুবই দুশ্চরিত্র ছিল, ও বেরিয়ে এসে পৈতৃক বাড়ি বিক্রি করে স্বাধীন ভাবে একটা স্কুলে কাজ নিয়ে আছে আর লেখালিখি করে গানও গায়। টুটুর সাথে দেখা হবার পর ম্লান হেসে বলেছিল বেশ আছি এখন সেও প্রায় ১৮/১৯ বছর আগে। তারপর তার আর কোন খবর জানেনি।
আজ এই পুরানো গাছতলাটায় এসে অতনুর চোখে জল এসে গেল, “কোথায় আছে সে, কেমন আছে! সে কি জানে আমিও ঘরভাঙা এক পথিক হয়ে আছি, হয়তো আমার মনে তুমি আছো বলেই আর কাউকে মন দিতে পারিনি, ঘর বেঁধেও ঘরটা তাই ভেঙে গেছে।”
পাড়ায় ঢুকতে টুটুর সাথে দেখা, টুটু তার চিরাচরিত স্বভাবের উল্লসিত হয়ে উঠলো, অতনুদা তুমি!
– হ্যাঁ রে এ পাড়ায় একটা কাজে এসেছিলাম,
– জানি কাজ ছাড়া তো তুমি এখানে আসবেনা,
– দূর পাগলি, তুই এখনও একইরকম আছিস,
তারপর তোর কি খবর বল? তুই তো ডাক্তার হয়েছিস এখন-
– হ্যাঁ গো, আমার আর কি খবর হবে, এই ছেলে নিয়ে এখানেই থাকি,
– মানে! তোরও কি —
– না অতনুদা আমার বর খুব ভালো ছিলেন, তাই বোধহয় কপালে সইলো না – একদিন হঠাৎ বুকে ব্যথা বলতে বলতে আমার কোলের ওপরই ঢোলে পড়লো, কিছু সুযোগ দিলো না আমাকে –
– কতদিন হল?
– প্রায় দশ বছর কেটে গেলো দেখতে দেখতে।
অতনু কিছু বলতে পারলোনা, কেউ সুখ পায়না, কেউ সুখী হয়েও হারিয়ে ফেলে ভালোবাসার মানুষটাকে।
আচ্ছা অতনুদা আজ খবরের কাগজে একটা খবর বেরিয়েছে, তুমি দেখেছ না কি?
– কি বলতো?
– পরিচারিকাকে রেপ করার জন্য শহরের নামকরা ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
– হ্যাঁ পড়েছিলাম, আবার সেই খবরে এইকথাও লেখা ছিল যে, তার প্রাক্তন স্ত্রী শ্রীমতী অনুমিতা মুখার্জি কোর্টে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন যে, এই ঘটনায় তিনি কিছু আশ্চর্য হন নি কারণ তিনি বিয়ের পরই বুঝতে পেরেছিলেন যে তার স্বামী একজন চরিত্রহীন বর্বর, তাই বিয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায় ডিভোর্স নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয় তাকে।
-না রে পড়িনি, বোধহয় ভেতরের পাতায় ছিল, অত খবর আমি পড়িনা, ভালো লাগেনা, তা তুই এই নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিস কেন!
– কারণ আছে অতনুদা, অনুমিতা নামটা আমরা রুবি রায়ের আড়ালে রেখে দিয়েছিলাম তাই,
– তুই কি মনে করছিস…?
– হ্যাঁ অতনুদা অনেকটা মিলে যাচ্ছে যে..
– ভদ্রমহিলা এখন কোথায় থাকেন কি করেন, সেসব কিছু লেখা নেই?
– না অতনুদা, তা থাকলে তো আমি চলে যেতাম, কিন্তু এই বিশাল শহরে সে কোথায় আছে, কোথায় খুঁজে বেড়াবো তাকে?
অতনু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, কিন্তু আমাকে যে তাকে খুঁজে পেতেই হবে, আমি ঘর বেঁধেও ধরে রাখতে পারিনি শুধু ওই একজন আমার মনে এখনও বাসা বেঁধে আছে বলে।
– কিন্তু কোথায় খুঁজবে তাকে?
– দেখি, এখনও কিছু মাথায় আসছেনা, শুধু জানি খুঁজে তাকে পেতেই হবে, প্রথম লগনে যে ফুল ফুটেও ঝরে পড়ে গেছিল, গোধূলি লগনে তাকে যদি আবার নতুন করে ফোটানো যায়।
যে ভদ্রলোকের সাথে দেখা করতে এসেছিল তার সাথে কাজটা সেড়ে নিতে হবে, অতনু হাতের ঘড়িটা দেখলো।
টুটু বললো, তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে বোধহয়?
– না রে এখানে একজন প্রফেসর এসেছেন তন্ময় লাহিড়ী নামে। উনি আমার প্রফেসর, পি এইচ ডির সময় অনেক সাহায্যে পেয়েছি ওঁর কাছ থেকে তাই কলকাতায় এলাম যখন ভাবলাম একবার দেখা করে যাই।
– ও ওই যে সোমাদিদের বাড়িটা ভেঙে যে ফ্ল্যাট বাড়িটা তৈরি হয়েছে ওইখানে থাকেন –– তুই চলনা আমার সাথে, কতদিন পর দেখা একটু কথা বলি, পুরানো কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তোদের সাথে, তোর জন্যেই রুবি রায়ের ভালোবাসা তো পেয়েছিলাম।
– কাকীমা, কাকু কেমন আছেন?
কেউ নেই রে, আমিও ওর মতন একা এখন, এ সময়ে দু’জনের দেখা হওয়া খুব দরকার, একদিন যে ভালোবাসা আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম আজ হয়তো তার পূর্ণতা দিতে পারতাম।
– পারতাম মানে! পারতেই হবে, দেখি না কি হয়। আজ আমার চেম্বার আছে গো, আজ হবেনা, কাল বা পরশু আমরা একদিন বসবো কোথাও। আজ তুমি যাও ডঃ লাহিড়ীর কাছে,
– হ্যাঁ, কাল পরশুর বেশি দেরি করিস না আমাকে সামনের সপ্তাহে দিল্লি ফিরে যেতে হবে।
– সামনের সপ্তাহে দিল্লি যাচ্ছ? ওখানে তো এখন একাই থাকো তাই না?
– হ্যাঁ রে, ঘর তো বেঁধেছিলাম, ভেঙে গেলো, এখন আমার খালি বাড়ি।
– ঠিক আছে গো দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমার আবার চেম্বার আছে। আমি কাল পরশুর মধ্যেই তোমাকে ফোন করবো, নাম্বারটা দাও।
– হ্যাঁ, এই নে, ফোন করিস কিন্তু..হ্যাঁ রে তুই বইমেলা যাস না?
– না গো সময় পাইনা, অনেক দায়িত্ব যে আমার, তার ওপর হসপিটাল, চেম্বার তো আছেই, আর একজন তো সব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে চলে গেলো।
অতনু ওর মাথায় একটা হাত রাখলো, তারপর বললো, আসিস কিন্তু ।
অতনু তার প্রফেসরের সাথে দেখা করে, কিছুক্ষণ কথা বললো, চা খেলো তারপর ওঁকে প্রণাম করে বেরিয়ে এলো।
বইমেলার উদ্দেশ্য ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে নির্দেশ দিল।
এই নিয়ে তার সাত নম্বর বই বার হচ্ছে, প্রত্যেকটি বইতে কখনও রুবি রায়কে নিয়ে কবিতা, কখনও বা গল্প লিখেছে।
আজ যে তারজন্য এক বিস্ময় অপেক্ষা করছে তার জন্য প্রস্তুত ছিলো না।
দূর থেকে দেখতে পেলো তার বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছে এক মহিলা, মহিলার মুখটা দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু পেছন থেকে অতনুর চোখে পড়লো, পরণে হালকা গোলাপি রঙের তাঁতের শাড়ি পরা, লম্বা দীঘল চেহারা, উজ্জ্বল গৌরবর্ণা, ঘাড়ের কাছে একটা এলো খোঁপা। অতনুর বুকটা ধক করে উঠলো, কিরকম যেন চেনা লাগছে পেছন থেকে, এ সে নয়তো!
দুরুদুরু বক্ষে কাছে এলো কি এক অমোঘ আশা নিয়ে। কাছে আসতেই সে মুখ ফেরালো, অতনুর মনে হল ঈশ্বর আছেন, এই তো তার রুবি রায়, একটু গায়ে মেদ লাগলেও মুখের ভাব একইরকম আছে, অতনুর উজ্জ্বল চোখ দু’টো যেন কি এক হঠাৎ পাওয়ার আনন্দে ভেসে যাচ্ছে, তার চোখে জল এসে যাচ্ছে, সে কিন্তু কৌতুক করে সামনে দাঁড়িয়ে বললো, “তোমাকে কোথায় যেনো দেখেছি…”
অতনু তার দু’ কাঁধটা শক্ত করে ধরে বললো আর তোমাকে হারিয়ে যেতে দেবোনা, আমার ভাঙা ঘর শুধু তোমার পথ চেয়েই আছে।
– আমাকে তুমি খুঁজেছিলে?
ওরা মেলার প্রাঙ্গণ থেকে একটু একধারে সরে এলো, তারপর অতনু বললো, যেদিন থেকে টুটুর কাছে জানতে পারলাম যে তুমি একা হয়ে গেছো, সেদিন থেকে শুধু তোমাকেই খুঁজে গেছি। মা বাবার জবরদস্তিতে বিয়ে একটা করেছিলাম কিন্তু ভালোবাসতে পারিনি, তাই সে আমাকে মুক্তি দিয়ে চলে গেছে। আর আমি পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে গেছি।
বই বেরোবার সময় হয়ে গেছে, তার ডাক পড়লো, প্রধান অতিথিরা সব এসে গেছেন।
কোনরকমে মোড়ক উন্মোচন করে অতনু চলে এলো তার রুবি রায়ের কাছে, হাতে কয়েকটা নতুন প্রকাশিত বই নিয়ে, এসে তাকে বললো আমার নতুন বইয়ের নামটা দেখ..
– হ্যাঁ সেটা দেখেই তো দাঁড়িয়ে গেলাম, তাছাড়া শুনলাম তুমি এখনই আসছো, মনে একটু সংশয় থাকলেও পেছনে তোমার ছবি আর পরিচিতি দেখে আর কোন সংশয় রইলো না।
চল এখান থেকে বেরিয়ে পড়ি-
– কোথায় যাবে?
– যেদিকে দু চোখ যায়, এখন কোন বাধা নেই
– এবার আমরা মুক্ত বিহঙ্গ, কিন্তু কতক্ষণ?
– মানে?
– মানে সময় তো কমে এসেছে,
– না না এতদিনের অপেক্ষা আমাদের সময় অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে –
অতনু উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করলো, “ওরে বিহঙ্গ তবু বিহঙ্গ মোর এখনি অন্ধ বন্ধ কোর না পাখা”
অনুমিতা হেসে বললো চলো যাই ।
ওরা চলে এলো গঙ্গার ধারে। তখন গঙ্গার ধার এতো সাজানো গোছানো ছিলোনা।
এলোমেলো ছিল। রেললাইন পার হয়ে যেতে হত, তা হয়তো এখনও হয়, কিন্তু সাজানো গোছানোর চেয়ে এলোমেলো গঙ্গাধারটাতেই যেন প্রকৃতিকে বড়ো নিবিড় করে পাওয়া যেতো।
পারে দাঁড়িয়ে আছে একটা ফেরি, দূর আকাশে উজ্জ্বল চাঁদের আলো।
অনুমিতা বললো- আজ পূর্ণিমা দেখ, কেমন সুন্দর চাঁদ –
– হ্যাঁ দেখেছি, সেদিনও পূর্ণিমা ছিল –
– কবে?
– মনে নেই? দোল পূর্ণিমার দিন। যেদিন তোমাকে আবীর মাখানোর ছলে প্রথম স্পর্শ করেছিলোম আর আজ প্রায় পঁচিশ বছর পর আবার তোমাকে স্পর্শ করলাম।
– অনুভবটা একইরকম আছে শুধু সময়টা পেরিয়ে গেছে, বলে অনুমিতা হাসলো সুন্দর করে।
– এই সেই টোল ফেলা গালের মিষ্টি হাসি, অতনু নতুন করে আবেগে ভেসে গেলো।বললো আমার ইচ্ছে করছে এখনি গঙ্গা পার হয়ে দক্ষিণেশ্বরে চলে গিয়ে মায়ের মূর্তির সামনে সিঁদুর পড়িয়ে তোমাকে নিজের করে নি, তারপর ভেসে বেড়াই দু’জনে বাঁধা বন্ধনহীন এক ভালোবাসার সাগরে।
অনুমিতা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা কবিতা মনে মনে তৈরি করে বলে উঠলো,
” দেখো তো চেনো কি আমায়!
আমি তোমার সেই রুবি রায়,
রাস্তায় যার জন্য থাকতে অপেক্ষায়।
কতো যুগ গেলো কেটে
এতোদিনে সেই অপেক্ষার সুতোটা গেলো ছিঁড়ে।
এলো সেই মিলনের ক্ষণ,
মিলিত হোক দু’টি অপেক্ষারত প্রাণ।
অতনু এগিয়ে এসে দু’ হাতে ওর মুখটা তুলে ধরে গভীর চুম্বন এঁকে দিল ওর ঠোঁটে, মুখে, গালে গলায়, কেঁপে উঠলো অনুমিতার দেহ নিজেকে সঁপে দিল অতনুর বুকে, ওকে জড়িয়ে ধরলো অতনু। তারপর বললো, চল এবার যাওয়া যাক,
– কোথায়?
– কোথায় মানে দক্ষিণেরশ্বর, ঘর বাঁধবো না এবার। হ্যাঁ, বহু প্রতীক্ষিত আমাদের ভালোবাসার ঘর।
চাঁদটা আকাশে জ্বলজ্বল করছে, ওরা দু’জন ফেরিতে উঠলো মন্দিরে যাবে বলে।
গঙ্গবক্ষের উত্তাল হাওয়ায় অনুমিতার আঁচল চুল সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অতনু ওর আঁচলটা টেনে নিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে গাইলো, “মনে পড়ে রুবি রায় কবিতায় তোমাকে একদিন কতো করে ডেকেছি, আজ হায় রুবি রায় ডেকে বলো আমাকে, এবার অনুমিতা গাইলো, তোমাকে কোথায় যেন দেখেছি।