-
কবিতা- স্বপ্নকুমারী, মেঘমালা
।। অমরনাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
স্বপ্নকুমারী, মেঘমালা
-সুনির্মল বসুসেদিন আকাশে মায়াময় চাঁদ ছিল, নক্ষত্রগুলো পৃথিবীর দিকে চেয়েছিল,সুপারি গাছের মাথা বাতাসে দুলছিল,রাতের শীতল নদী বয়ে যাচ্ছিল, আমার চোখে ঘুম নয়,ঘুমের আবেশ ছিল,
তখন তুমি স্বপ্নে এলে যেন,
আমার মেঘমালা,নীল জ্যোৎস্নার ঝাউ বন পেরিয়ে ঢেউ ঢেউ কেশরাশি দুলিয়ে তুমি এলে,
বেনারসী শাড়ির ঘোমটা সরিয়ে আমায় বললে, আমি এসেছি, আমি এসেছি।
কেউ কি এলো, কেউ কি এলো, জীবনে কার পদ সঞ্চার,এত সুন্দর জ্যোৎস্না ধোওয়া মুখ আমি জীবনে দেখি নি,
বললাম,বোসো, দুজনে জ্যোৎস্নায় ভিজি, সারারাত আকাশের তারা গুনি।
সে আমার পাশে বসলো।
বললাম,এত দেরি করে এলে কেন, আমি বড় ক্লান্ত।
সুখের দিনে সবাই আসে, আমি দুর্দিনে এলাম।
তুমি কি স্বপ্নকুমারী,
কি জানি, আমাকে তুমি যা ভাবো, যেভাবে পাও, সেই আমি।
রোজ রাতে আমি তোমার জন্য দরোজা খুলে রাখি।
যখন দখিনা বাতাস ভোর রাতে বয়, আমি তোমার কাছে আসি,
তুমি আমার মতো আকাশের তারা গোনো,
হ্যাঁ তো।
তুমি আমার মতো একা।
সৃষ্টিশীল মানুষ তো একাই। আমি স্বপ্ন দিই, তুমি কবিতা দাও।
তোমার বন্ধু কারা,
চাঁদের আলো, সূর্যতোরণ, নদী,গাছপালা।
আশ্চর্য,ওরা তো আমারো বন্ধু।
তাই বুঝি।
হ্যাঁ তো।
মেঘমালা বলল, আমি ভালো মানুষ খুঁজতে বেরিয়েছি, আমি তাদের স্বপ্ন বিলোই।
তুমি থাকো কোথায়,
অলোক বর্ষের ওপারে।
সেটা কোথায়,
তোমার মনে।
তাই।
মন ই তো সব। যে রঙে রাঙাবে, সেই রঙে দেখা দেবে।মন পরিস্কার না হলে, ভালো জিনিস দেখা যায় না।
ভোর হয়ে আসছিল,তখন। গাছের পাতায় শিশির ঝরছিল, ভোরের পাখি ডাকছিল।
মেঘমালা বলল,আজ যাই। কোনো ভালো মানুষের দুঃখী মানুষ হোতে নেই। মানুষের কাছে কখনো কাঁদবে না, মানুষের জন্য কাঁদবে।
আবার কবে আসবে।
তুমি চাইলেই আমি আসবো।
কথা দিচ্ছ।
তিন সত্যি করে বলছি।
তখন পদ্ম বনের ওপারে সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়লো,
আমার মেঘমালা বাতাসের নিরালম্ব ঢেউয়ের মতো মিলিয়ে গেল। -
রম্য- বেনারসের রস
।। অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
বেনারসের রস
-সুজিত চট্টোপাধ্যায়একটা বিশাল হলঘর । তার একেবারে শেষ প্রান্তে একটা অদ্ভুত দর্শন পিলারের উপর একটা বহুমূল্য হীরে রাখা আছে।
সেই হীরে চুরি করতে হবে। কিন্তু সেই হীরে অবধি যেতে হবে হেঁটে হেঁটে। অত সহজ নয় ব্যাপারটা।
প্রত্যেক পদক্ষেপেই মৃত্যু হতে পারে , কেননা মেঝেতে ল্যান্ড মাইন পোঁতা আছে।
মেঝেটা সাদা আর কালো টালি দিয়ে ঢাকা। কোন টালির তলায় মরণফাঁদ লুকিয়ে আছে কেউ জানেনা।
কিছু টালি আছে নিরাপদ। কিন্তু চেনার উপায় নেই। সেই নিরাপদ টালির ওপর পা রেখে রেখে, সম্পুর্ণ আন্দাজে মানে কপাল ঠুকে এগিয়ে যেতে হবে সেই হীরের দিকে। রুদ্ধশ্বাস দৃশ্য। একটু ভুলচুক হলেই মাইন ফেটে অবধারিত মৃত্যু ।
দৃশ্যটা অমিতাভ বচ্চন অভিনীত একটি সিনেমার।
কিন্তু কথা হলো বেমক্কা এই দৃশ্যের অবতারণা কেন ? সবুর করুন সব জেনে যাবেন ।নারায়নী , বেনারসে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি এসেছেন। সদ্যোজাত নাতনির মুখ দেখবেন বলে।
দেখলেন। কী সুন্দর , কী সুন্দর । মা দুর্গার ছবি দেওয়া লকেট শুদ্ধ সোনার চেন নাতনির গলায় পরিয়ে দিয়ে চুমু খেয়ে আদর করলেন।
বিনয় বাবুর চোখে জল। মুখে পবিত্র হাসি। বললেন,, দ্যাখো দ্যাখো কী সুন্দর হাসছে দ্যাখো।
ওরে, এই ফোকলা মুখের ভূবণ ভোলানো হাসিটুকু দেখবো ব’লে ছুটে এসেছি। দুহাত তুলে আশীর্বাদ করে বললেন ,,
বড়ো হও। অনেক অনেক বড়ো হও, মা আমার।পরের দিন সকালে , বেনারসী বেয়ান, নারায়ণী কে বললেন চলুন , বিশ্বনাথ দর্শন করে আসি , যাবেন?
নারায়নীর খুব যে ইচ্ছে ছিল তেমন নয়। কেননা এর আগের বারে যখন এসেছিলেন তখন দর্শন করে গিয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা যথেষ্ট মধুর নয়।
সরু সরু গলি। গলির দুপাশে সার সার দোকান। নানান পশরা সাজানো। অসম্ভব ভীড়। সেই ভীড়ের মাঝে আচমকা হাজির হয়ে যায় ইয়া দশাসই বেপরোয়া পালোয়ান মার্কা ষাঁড় । সিং এর বহর দেখেই পিলে চমকে ওঠে।
হাঁটার স্টাইল জমিদারের মতো। রাস্তা জুড়ে বসে থাকে মহারাজের মতো। খায় ভগবানের মতো , পরম আদরে ভক্তের প্রেম মিশ্রিত পবিত্র প্রসাদ।
সেই প্রসাদ , উদরে রাত কাটিয়ে প্রভাতে কিংবা সন্ধ্যায় দেহ নিঃসৃত হয়ে বিপুল আকারে সশব্দে পথিমধ্যে যেখানে সেখানে পতিত হয়ে পড়ে থাকে।
পথিক গন অবিচলিত ভাবে নিরুদ্বেগে সেগুলো পাশ কাটিয়ে নির্বিকার চলে যান। নিতান্তই স্বাভাবিক নিত্যকার ঘটনা।
কিন্তু নারায়নী কোলকাতার বেহালার মেয়ে। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে তার এবিষয়ে বিস্তর মানসিক ফারাক।
তাই তাকে পথ চলতে হয় , ঐ অমিতাভ বচ্চনের সিনেমার মতো। সাবধানে , চোখ খোলা রেখে। একটু অন্যমনস্ক হলেই কেলেংকারী । পায়ে গোবরে মাখামাখি হয়ে বিদিকিচ্ছিরি কান্ড হয়ে যাবে।
শুধু তো পা নয় শাড়ি বাঁচানোর ব্যাপারও আছে।
শাড়ির নিচের দিকে ঐ জিনিস লেপ্টে যাবার সম্ভাবনা প্রচুর। তাই শাড়ি গুটিয়ে প্রায় হাঁটুর কাছ বরাবর।
রাজকাপুর অভিনীত মেরা নাম জোকার ছবিতে একটা গান ছিল। সুপার হিট।
এ ভাই জারা দেখকে চলো উপর ভী নেহি , নিচে ভী ডাঁয়ে ভী নেহি , বাঁয়ে ভী,,,,
মনে মনে গুনগুন করতে করতে হাঁটলে নিরাপত্তা বোধ সজাগ থাকবে।
তাই দেখে বেনারসী বেয়ান হেসে বাঁচেন না। বলেন ,,
এ কি কান্ড। এইভাবে চললে তো রাত কাবার হয়ে যাবে।
নারায়নী নাক সিঁটকে বলেন ,,,
না রে বাবা ,, আমার বড্ড ঘেন্না করে।
শুধু কি এই ? এরপর আছে বাইক যন্ত্রণা। সংকীর্ন গলির মধ্যে ভয়ংকর বিরক্তির কারণ এই বাইক।
দুপাশে দোকান। সামনে দশাসই ষাঁড়। পিছনে বাইকের কর্কশ আওয়াজ।
বিশ্বনাথের গলি তো নয় , যেন মহাভারতের চক্রব্যূহ । একবার ঢুকলে বেরিয়ে আসার জন্যে সাধ্যসাধনা করতে হবে ।
প্রতি মুহূর্তে নারায়নীর মনে হচ্ছিল ,,
হে বিশ্বনাথ , তুমি মাথায় থাকো। আমাকে রেহাই দাও। এই গলির যন্ত্রণা থেকে আমাকে মুক্ত ক`রে দাও। আমি বাড়ি যাবো।মেয়ে ইন্দ্রাণী খুব খুশি। আনন্দে ডগমগ হয়ে বললো , মা তোমরা এসেছো খুব ভালো হয়েছে। হ্যাঁ গো মা , তোমরা এখন এখানে কিছুদিন থাকবে তো ?
নারায়নী নাতনি কে, এ ডি অয়েল মাখাতে মাখাতে বললেন ,,,
হ্যাঁ , কিছুদিন তো থাকতেই হবে। এতদূর থেকে এলুম। দু চার দিন না থাকলে হয়। তুইও একটু সামলে ওঠ।
মেয়ে আস্বস্ত হয়ে বললো সেই ভালো। আমি তো এখন কিছুই করতে পারছি না। সব কাজ শ্বাশুড়ি একা হাতে করে।
নারায়নী অবাক হয়ে বলেন ,,,
সে কী ! তোদের কাজের লোক , কী যেন নাম? কুন্তী,,, সে কোথায় গেল ?
শ্বাশুড়ি রান্নাঘরে ছিলেন। বেয়াই বেয়ান সেই কোলকাতা থেকে এসেছেন। আপ্যায়ন না করলে হয় ? কুটুম্বিতা জরুরি। তাই রান্নাঘরে ভীষণ ব্যাস্ত। পঞ্চব্যাঞ্জণের নিখুঁত আয়োজন।
শেষের কথাটা কানে গিয়েছিল। বললেন ,,
কুন্তীর কথা আরকি বলবো। সে ভেগেছে।
বলেই মুচকি হাসলেন ।
মেয়েরা মুচকি হাসিতে সর্বদাই রহস্যের গন্ধ পান। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না।
নারায়নী , দুজনের চোখ মুখ দেখে কিছু আন্দাজ করার চেষ্টা করলেন। কিছুই বুঝতে না পেরে বলেই ফেললেন ,,,
কী ব্যাপার ?
মেয়ে বললো,,
ওসব শুনে তুমি কী করবে ? ওরা ওই রকমই, বাদ দাওতো।
বাদ দাও বললেই কী বাদ দেওয়া যায় । কেমন যেন অন্যরকম স্মেল পাওয়া যাচ্ছে। মেয়েদের মনে কৌতূহল বাসা বাঁধলে তার নিরসন না হওয়া অবধি ভাত হজম হবেনা। বিশেষ করে তাতে যদি স্ক্যান্ডালের গন্ধ থাকে।
নারায়নী বললেন,, মানে প্রায় আবদার করে বললেন ,,,,
শুনি না , কী ব্যাপার ?
ইনু ( ইন্দ্রাণীর আদুরে নাম ) র শ্বাশুড়ি বেশ রসিক মানুষ । রসের কথা রসিয়ে বলতে পারেন । বললেন ,,,,
আরে , ভেগেছে মানে নতুন নাগর জুটিয়ে তার সঙ্গে ভেগেছে।
নারায়নী একটু কপাল কুঁচকে বললেন,,,
যতদুর শুনেছিলাম ,,, মানে,, ওর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল না ?
> ঠিকই শুনেছিলেন। তবে কী জানেন , ওর বরটারও একটা মেয়ের সঙ্গে নাকি লটঘট আছে ।
ইনু মাঝখানে বলে উঠলো ,,,
মেয়ে বলছো কেন , সেটাও তো একটা বউ।
নারায়নীর ঠোঁটের কোণেও এবার দুষ্টু দুষ্টু মুচকি হাসি । বললেন,,,
কী সব কান্ড রে বাবা । একটা সংসার করা বউ পালালো , আর একটা সংসার করা বরের হাত ধরে । লাও ঠ্যালা,,
তিন জনেই হৈ হৈ করে হেসে উঠলো।
বেনারসী বেয়ান চোখ মোটকে চাপা গলায় বললেন ,,,
জানেন তো আমাদের এই বেনারসে একটা প্রবাদ চালু আছে ,,,
বেনারসে , সিঁড়ি , ষাঁড় আর রাঁঢ় থেকে সাবধান।
আবারও বেদম হাসির ফোয়ারা ছুটলো ।বেনারসে এসে গঙ্গা আরতি দেখবেন না ?
সে কী কথা ? চলুন চলুন,, খুব ভালো লাগবে। চলুন ।
বেনারসী বেয়াই জোর তাগাদা দিলেন। কিন্তু বিনয় বাবুর তেমন উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না। বললেন ,,,
না,, মানে,, শরীরটা ঠিক নেই। ঐ আসবার সময়ে ট্রেনের মধ্যে পড়ে গিয়ে ,,
> ও, হ্যাঁ , তাওতো বটে । ব্যাথা ট্যাথা কোথাও হয়েছে নাকি ?
> হ্যাঁ , এই কোমরের কাছটা,,
> এইরে যন্ত্রণা আছে নাকি ?
> না,, তেমন কিছু নয়। তবে সামান্য একটু জ্বর এসেছে মনে হচ্ছে ।
> না না,, তবে তো অবহেলা করা চলে না, দাঁড়ান,, ডাক্তার কে একটা ফোন করি।
বিনয় বাবু , অপ্রস্তুত হয়ে বললেন ,,,
না না ,, আপনি ব্যাস্ত হবেন না। ও কিছু না। প্যারাসিটামল খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।
> ও,, আচ্ছা ,, ঘরে কি প্যারাসিটামল আছে ? ওগো ,, একবার এদিকে আসবে ? তাড়াতাড়ি ।
পড়ে গেলেন কীভাবে ? কী হয়ে ছিল কী?
বিনয় বাবু পরলেন ফ্যাঁশাদে। সব কথা কী সবসময় সব লোককে বলা যায় ? নাকি সেটা শোভনীয় ?
কীভাবে বলবেন জোরসে ছোটো বাইরে পেয়েছিল , বারবার টয়লেটে গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে , হালকা হওয়া যায়নি। প্যান্টের চেন আটকে গিয়েছিল। তাকে সাহায্য করতে মিডল সিট থেকে তার স্ত্রী নিচে নামতে গিয়ে বেসামাল হয়ে গড়িয়ে পড়ে যান। তাকে ধরতে গিয়ে তিনি নিজেও পড়ে যান শুধু নয় প্যান্টের মধ্যেই কম্ম সেরে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলেছিলেন ।
না না ধুস । এসব কেউ কুটুম বাড়িতে গল্প করে ? ছি ছি । প্রেশটিজের ব্যাপার।
বিনয় বাবু , কথা উরিয়ে দিয়ে বললেন ,,
না না ,, কিছু নয়। ওই একটু লেগে গিয়েছিল আরকি।
বিষয় কে আরও হালকা করবার জন্যে বললেন , আরে বাবা বুড়ো হাড়ে এসব একটু আধটু হয়েই থাকে । বলেই হা হা ক`রে একাই হেসে উঠলেন। সেই কৃত্রিম হাসি তে প্রাণ ছিলোনা ।
কিন্তু মজার কথা হলো , রিলে সিস্টেমের মাধ্যমে নারায়নী থেকে জামাই বাবাজী। জামাই বাবাজী থেকে ইনু। ইনু থেকে শাশুড়ী মা হয়ে শ্বশুর মশাই পর্যন্ত কথাটা রটে গিয়েছে । তবুও কেউ তা প্রকাশ করছেন না , নিতান্তই সৌজন্যের খাতিরে ।
ভদ্রসমাজে এটাই রীতি , ভদ্রতা ।পরদিন দুপুরে সর্ষে ইলিশ দিয়ে ভাত খেতে খেতে পরম তৃপ্তির সাথে বিনয় বাবু বললেন বাহ চমৎকার। এখানে এমন ভালো ইলিশ পাওয়া যায় জানতাম না তো। দারুণ।
বেনারসী শ্বশুর একগাদা হেসে মাছের কাঁটা ছাড়াতে ছাড়াতে বললেন ,,,
শুধু মাছের প্রশংসা করলে হবেনা মশাই । রাঁধুনির প্রশংসাও চাই ।
বেনারসী শ্বাশুড়ি তৎক্ষনাৎ কথাটা লুফে নিয়ে বললেন,,,
অবশ্যই । সকাল থেকে খেটেখুটে রান্না করলুম ,, তার একটা মূল্য নেই ?
নারায়নী সেই কথায় সায় দিয়ে বললেন,,,
ঠিকই তো। ইলিশ হোক বা যা-ই হোক , কাঁচা খেয়ে তো তারিফ করা চলেনা। তারিফ রান্নার। কী,, ঠিক কি-না ?
বেনারসী শ্বশুর বাঁহাত দিয়ে ডাইনিং টেবিল চাপড়ে বললেন ,,
ওয়েল সেড ম্যাডাম , ওয়েল সেড। চলুন , আজ সন্ধ্যারতি দেখতে যাবো সব্বাই মিলে। অবিশ্যি যদি মিষ্টারের শরীর ভালো থাকে ।
নারায়নী , কাউকে কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে বললেন ,,,
একদম । চলুন , সব্বাই যাবো।
বেনারসী শ্বাশুড়ি বললেন ,,,
না না,, ইনু বাচ্চাকে নিয়ে একা থাকবে কেমন করে। আমি যাবো না। তোমরা যাও। আমি তো বলতে গেলে প্রায় রোজই দেখি। ওনাদের ঘুরিয়ে নিয়ে এসো। খুব ভালো লাগবে।খাওয়াদাওয়া শেষ করে , বিনয় বাবু কাউকে কিছু না জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে পরলেন। এদিকে ওনাকে দেখতে না পেয়ে , নারায়নী একটু চিন্তিত হয়ে মেয়ে কে বললেন ,,,
হ্যাঁ রে ইনু , তোর বাবা কোথায় গেল বলতো! তোকে কিছু ব’লে গিয়েছে?
ইনু অবাক হয়ে বললো,,,
কই,, না তো ! এই দুপুরবেলা,, কোথায় গেল?
নারায়নী মাথা ঝাঁকিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে বললেন ,,
ভালো লাগেনা বাবা। যত্তো ঝামেলা,, ওফ্ফ।
ইনু হঠাৎ বললো , ও হ্যাঁ , মনে পরেছে। বাবা বলছিলো বটে , দুপুরে খাওয়ার পরে সকলকে চমকে দেবো।
নারায়নীর চোখ গোলগোল হয়ে উঠলো ।
বলিস কীরে? চমক! এ আবার কেমন কথা ! চমকে দেবার কী আছে , সারা জীবন ধরেই তো চমক আর ধমক দিচ্ছে । দ্যাখ কী খেল দেখায়। আর ভাল লাগেনা বাপু।
নারায়নীর কথা শেষ হতেনা হতেই , হাতে সবুজ পাতায় মোড়া বড়ো আকারের একটা ঠোঙ্গায় গুচ্ছের খানেক বেনারসী পান নিয়ে হাসতে হাসতে বিনয় বাবু এলেন।
নারায়নীর মেজাজ বিগড়ে ছিল। তারমধ্যে ওনাকে হাতে পানের খিলির ঠোঙ্গা নিয়ে হাসতে দেখে মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। চিৎকার ক`রে বললেন,,
কী ব্যাপার কী তোমার ,কাউকে কিছু বলা নেই , হুট ক`রে বাইরে চলে গেলে? অচেনা জায়গা,,, বুদ্ধিশুদ্ধি কবে হবে শুনি,,।
বিনয় বাবু সেসব কথায় কান না দিয়ে হঠাৎ নাচতে শুরু করে দিলেন , সঙ্গে গান,,,
খাইকে পান বনাও রসওয়ালা
খুল যায় বন্ধ আকল কা তালা।
সেই নাচ গানের দাপটে সব্বাই সেখানে এসে হাজির। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দেখার পরে , বেনারসী বেয়ান, বেয়াইও নাচতে শুরু করে দিলেন। সঙ্গে তারস্বরে ডন ছবির গান। তাতে মিশলো অমিতাভ বচ্চনের নাচের স্টাইল।
খাইকে পান বনাও রসওয়ালা,,,,
নাচগান যেমন হঠাৎ শুধু হয়েছিল , তেমনই হঠাৎ করে শেষ হলো ।
নারায়নীর ঠোঁটের আগায় মৃদু হাসির ঝিলিক বুঝিয়ে দিলো তিনিও খুব মজা উপভোগ করেছেন।
বিনয় বাবু, সকলের হাতে ম ম করা গন্ধ ছড়ানো বেনারসী পান বিলোতে বিলোতে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন ,,
যৌবনের বৃন্দাবন , বার্ধক্যের বারাণসী।
জয় হোক জয় হোক বাবা বিশ্বনাথের।
জয় হোক আমার নাতনির।
নাতনির নরম মাথায় , পরম স্নেহের হাত রেখে আপ্লূত গলায় বললেন,,,,
ওরে মা আমার , আবারও কতদিন পরে,
মনে এতো সুখ , এতো আনন্দের অনুভূতি পেলাম।
সে যে শুধু তোর জন্যে রে মা আমার ,, শুধু তোর জন্যে ।
শেষের কথা গুলোর মধ্যে কেমন যেন মন পাগল করা আবেগ লুকিয়ে ছিল , তাই
বিনয় বাবুর গলা সামান্য কেঁপে উঠল । সেই আবেগের দোলা ছড়িয়ে পড়লো সবখানে।
সকলেরই চোখের কোল চিকচিক করছিল , আনন্দে ।। -
গল্প- প্যালারাম
।। অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
প্যালারাম
-রাণা চ্যাটার্জী“পারবো না আর বাজার আনতে,যা জুটবে সেটাই ভাইকে রান্না করে খাওয়াবে”রেগে বলল প্যালারাম।যদিও আদুরী, স্বামীকে প্যাংলা ডাকতেই অভ্যস্ত, নয় নয় করে নয় বছরের প্রেম শেষে বিয়ে বলে কথা তাই কি এতদিনের অভ্যাস ছেড়ে ওগো হ্যাঁ গো করা যায়। তাছাড়া ওই আদরের ডাক ছাড়া আরনয়তো বলবে কি!ওই তো ছিরি,দু খানা হাড় ছাড়া শরীরে অবশিষ্ট কিছুই নেই!
বিয়ের পাকা কথা বলার সময় হবু জামাইয়ের চেহারা নিয়ে ঘোর আপত্তি ছিল বাবার, মেয়ের ওই ডাগর শরীরের পাশে জামাইকে যদি পাট কঞ্চির মতো লাগে কি করে লোকজনকে পরিচয় দেবে! মা খান্তা দেবী অবশ্য ছেড়ে দেবার নন, মেয়ের মুখ চেয়ে একহাত নিয়েছিলেন স্বামীকে!”বলি হ্যাঁ গা,আদুরীর বাপ,বলি বিয়ের সময় পাহাড় প্রমাণ হুমদো তুমিটা তো তখন পুঁচকে আমি টাকে পটাতে দুবেলা ঘুর ঘুর,ঘুর ঘুর করতে তার বেলা আর এখন কিনা ব্যাঘাত দিচ্ছ!
যাই হোক বেশ ধুমধাম করেই চার হাতের মিলন হয়ে গেলো প্যলা ওরফে সুদর্শন ও আদুরীর। প্যালারামের শরীরের জুত না থাকলে কি হবে নামের মধ্যে বেশ জৌলুশ ছিল ওর। সত্যিই যেন সুদর্শন শব্দটাকে ব্যঙ্গ করতো ওর শরীর!এর জন্য অকালেই এই সুন্দর নাম হারিয়ে “প্যালা”তেই ডাক আটকে যায়, এ যেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। হাড়ের ওপর চামড়া লাগিয়ে ছেড়ে দেওয়া দেখলে এটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক যেন ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট!ঠিক যেন ভগবান বড্ড তাড়াহুড়োয় শৈল্পিক হাতে ফিনিশিং টাচ দিতে ভুলে গেছে শ্রীমান প্যালাকে!আদুরীর ভাই অবশ্য বলে ছিল ওরে দিদি, এ যে জাম্বু তো এক্কেবারে কাক তাড়ুয়া !আড়ালে বললেও শ্যালক ও এক পাল শ্যালিকারা যে তাকে নিয়ে বেশ মজা পায় তা অল্প হলেও বোঝে দায়িত্ববান জামাই বাবাজীবন প্যালা।
” বাজার আনতে পারবে না মানে কি কথা শুনি? দশ টাকা সাইজের রসগোল্লার মতো চোখ পাকিয়ে ঝাঁজ নিয়ে বলল আদুরী। দিদির বাড়ি আসছে কিনা সাধের ভাই, আহারে আমার সোনাটা,ছটা বোনের পর হয়েছে। দশ টা নয় পাঁচটা নয় সাধের একটা মাত্র ভাই আমার, বাড়িতে কত আদর ওর জানো”?
“হম, হম আদরে বাঁদর করে ছেড়েছো ওটা কে আর এখন আমার পেছনে বাঁশ দিতে ঘটা করে কিনা অতিথি আপ্যায়ন..” ভেংচি কেটে থামলো প্যালা!কি বললে অতিথি!!আমার ভাই এবাড়ির ঘরের লোক তাকে এমন বেইজ্জত!কোমরে আঁচল গুঁজে দশাসই গিন্নি এগিয়ে আসতেই না জানি বিপদ বাড়বে ভেবে কাছ থেকে সরে দাঁড়ালো। মোক্ষম চড় যদি ভুল করে একটা ধেয়ে আসে বিছানায় শুয়ে সাতদিন গোঙাতে হবে এই দৃশ্য মনে ভাসতেই মুখ বেঁকিয়ে একখানা কটা চটা থলে ঝুলিয়ে বাজার চললো শ্রীমান প্যালা থুড়ি সাধের জাম্বো।বারান্দা থেকে ঘাড় ঝুঁকিয়ে আদুরী আবদারে “অ্যাই শোনো,ওপরে তাকাও একবার”,এরপর গালে পান ঠেসে হাসি মুখে বলল ,”কই গো বলছি কি, গলদা চিংড়ি,ইলিশ আর ওই স্পেশাল দই এক কেজি এনো কেমন ফেরার পথে”।
মাঝে মাঝে বর টাকে আদুরীর বর্বর মনে হয়,আর লাগবে নাই বা কেন যেটা সে বলবে উনি ঠিক তাল কেটে তার উল্টো পথে হাঁটবে! কত্তা বাজার যেতেই মনটা ফুরফুরে হলো আদুরীর।ঘরের চাদর গুলো পাল্টে আর কুইন্টাল খানেক ময়লা বসা পর্দা গুলো টেনে নামালো।ভাবলো যাক আজ বর কে যা বলবো শুনবে মনে হচ্ছে ঝাড় খেয়েছে যা!
বউয়ের সামনে কিছু বলতে না পারলেও ভেতরে ফুঁসছে প্যালা, এই তো সেদিন ভাইফোঁটায় এলো শ্যালক, গনডে পিনডে গিলে জামাইবাবুর বুক শুকনো করে পাঁচদিন কাটিয়ে গেল, আবার আসার কি আছে শুনি! যা হয় হোক বাড়িতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ লাগুক, কিছুই আনবো না বলে আড়াইশো চারা পোনা, কচু, লাউ শাক এইসব হাবিজাবি কিনে ব্যাগ ভরে ফিরলো।
বাথরুমে প্যালা হাত- পা ধুতে যেতেই বাজার দেখে তো আদুরীর চক্ষু ছানাবড়া। মাথায় ধিক ধিক করে আগুন জ্বলছে তার ,কিন্তু না ওর মতো বেয়াদপ লোককে চিৎকারে মোটেও শায়েস্তা করা যাবে না, দিতে হবে মোক্ষম দাওয়াই ভেবে চুপচাপ বেডরুমে খিল তুলে দিলো। আদুরী আজ কত সখ করে বসে ছিল ভাইয়ের জন্য দুপুরেই দুটো পদ বানিয়ে রাখবে! সন্ধ্যায় ইউটিউব দেখে শেখা স্পেশাল টিফিন এর আয়োজন চলছিলো সব দিলো পণ্ড করে মর্কটটা,কিন্তু রাগ তো প্রকাশ করা তার ওপরই সাজে যে গুরুত্ব দেয়!দুঃখ হলেও মনে মনে পরিকল্পনা সাজিয়ে নিলো আদুরী।
“কই গো রাঁধবে না,বেলা যে যায় যায় গো, ও আমার আদুরী,সুর নরম করে হেঁকে চলেছে কত্তা। ভেতরে ভেতরে বেশ বুঝছে প্যালা, এই রে বেশ তো হলো দুপুরে কি খাওয়া জুটবে না,তবে তো কপালে বেশ দুঃখ আছে!ওদিকে বিকাল হলেই নাকি শালা বাবু হাজির হবেন আর ওর সামনে হাসিখুশি সুখী দম্পত্তির অভিনয় করতে হবে ভেবেই মুখটা বাংলা পাঁচের মতো বেঁকে গেলো প্যালার। গিন্নির মুখ ঝামটা,অপমান যা কিছু সব হজম করতে পারলেও কিছুতেই খিদেটা সহ্য হয় না প্যালার কিন্তু উপায়ই আর কি তার!!
সব বুঝেও কিছুতেই সাড়া দিলো না আদুরী,দরজা তেমনই বন্ধ।যেমন হাড় জিরজিরে সোয়ামি তেমন হাড়কেপ্পন লোক ,নে এবার ঠ্যালা সামলা বলে বন্ধ ঘরে আগে থেকে মজুত রাখা চিড়ে,কলা, গুঁড়ো দুধ মেখে পেট পূজা সারলো আদুরী । মনে মনে ভাবলো যেমন হাবিজাবি জিনিস নিয়ে ফিরেছো আমায় জব্দ করতে এবার বোঝো কত ধানে কত চাল।বেকার চিৎকার ঝগড়া না করে এভাবেই শায়েস্তা করার রাস্তা বুদ্ধিমতীর মতো বেছেছে আদুরী।
খিদেতে পেট চুঁই চুঁই প্যালার।ধুস,মশার কামড় গোটা দুপুর জুড়ে,কেবল জল খেয়ে খালি পেটে কি ঘুম সম্ভব!একবার ভাবছে রান্না ঘরে যে কিছু বানিয়ে নেবে সে তো সামান্য গ্যাস পর্যন্ত জ্বালতে জানে না!পরক্ষনেই মায়া হচ্ছে আহারে আদুরী টা না খেয়ে পড়ে আছে অথচ কি আর সে করতে পারে ভেবে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগলো প্যালার!
“ও বউ খোলো দরজা, প্রমিস করছি,বাজার আনবো বিকালেই।এই বারটার মতো মাফ করো আমায়।কই গো,সাড়ে তিনটা যে বাজলো,সেই সাড়ে নটায় সামান্য শসা মুড়ি!তোমারও যে শরীর খারাপ হবে”!
তৃপ্তি করে খেয়ে ঘুমটা এসেছিল আদুরীর ,স্বপ্ন দেখছিল প্যালা এক খানা প্রিন্টেড লুঙ্গি কেটে ফতুয়া বানিয়ে নিজেকে ঘন ঘন আয়নায় দেখছে।ইস আদিখ্যেতা! একখানা হিরো হিরো লুক দিয়ে ঠোঁটের কোণে সে যে কি মুচকি হাসি!কিন্তু প্যা লা ওটা কি পড়েছে নিচে! খুব যেন চেনা লাগছে আদুরীর।কাছে গিয়ে যেই দেখছে তার হারিয়ে যাওয়া নতুন সায়াটাকে মহান প্যালারাম মাঝ বরাবর সেলাই করে পাজামা বানিয়েছে! দেখে তো আদুরীর মাথাটায় আগুনটা আবার জ্বলে উঠলো ! দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা বলে ঘুমের ঘোরেই ধরফর করে উঠে দরজা খুলে কলতলায় রাখা এক বালতি জল প্যালার মাথায় ঢেলে দেয় আদুরী।এই রে এ কি করলো সে, তার তো দরজা না খুলে তেজ দেখানোর পর্ব চলছিল! প্যালা তো তার কিনে দেওয়া বারমুডা তে !তবে কি ওটা স্বপ্ন দেখছিল আদুরী ভেবে লজ্জায় পড়লো।
খিদেতে কাতর ,ক্লান্ত আমআঁটির মতো শুকনো মুখে ঘুমিয়ে পড়া প্যালারাম রীতিমতো জলের ধাক্কায় ঘাবড়ে বাবাগো মেরে ফেললো আমায় বলে পাঁচিল টপকে দৌড়! বাইরে বেরিয়ে হকচকিয়ে ভাবছে প্যালা, বউ এই বুঝি আজ তাকে বালতি দিয়ে মাথা ফাটিয়েই দিতো!বড্ড অসহায় মুখে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কেঁদে উঠলো সে।পাশের বাড়ির রাঙা ঠাম্মা ইয়ার্কি ছলে বলে উঠলো,” আহারে নাত বৌমা ভালোবাসায় বুঝি ভিজিয়ে দিলো প্যালা রামকে..”! বলেই ফিক কিরে হেসে উঠলো।দূর ছাই জীবনটা আলু ভাতের মতো চটকে দিলো সব্বাই,এমন মুখ করে কেন্নর মতো গুটি সুটি মেরে উঠানে ঢুকলো। হাত জোড় করে দরজা থেকে বলে ওঠলো,” মারিস নি রে বউ, দয়া করে মারিস নে, আমি আজই বিকালে বাজার করে আনবো”।আদুরীর ঘুম তো একদম চলে গেছে,সে হাসবে না কাঁদবে কিছুই বুঝতে পারছে না।একটু হলেও এবার তার প্যালার ওপর মায়া যে হচ্ছে না, তা নয় কিন্তু এখনই বেশি নরম হওয়া বুমেরাং হয়ে না যায় তাই গম্ভীর ভাব বজায় রেখে ঘরে ঢুকলো।
রাগ পুষে আদুরী ঘুমিয়ে যেতে স্বপ্ন যে হানা দিয়েছিল তার মাথায় বিলক্ষণ বুঝে ফিক করে হেসে ফেললো আপন মনে।এমন এক
উদ্ভট ড্রেসে তাবলে প্যালা কে কিনা দেখবে কোনোদিন ভাবেনি যে!এরপর রান্না ঘরে ঢুকে স্বামীর জন্য একটু গরম সুজি বানালো,বিকেল তখন গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা নামার মুখে। প্যালা কোনো কথা না বাড়িয়ে সুরুৎ করে খেয়ে বাজারের ব্যাগ নিতে যাচ্ছিল দেখে চড়া গলায় আদুরী আদেশের সুরে বলে উঠলো:“ভাইকে তার পছন্দের যা যা খাবার খেতে চায় সেই মতো সব কিনে ঘর ঢুকতে বলেছি ,যা বিল হবে তোমার একাউন্ট থেকে অনলাইন ব্যাঙ্কিং করে আমি ওকে মিটিয়ে দেবো”
শুনে তো আত্মারাম খাচাঁছাড়া হওয়ার উপক্রম প্যালার! মনে মনে ভাবলো উফ কি জন্য যে অনলাইন ব্যাঙ্কিং না শিখে আদুরীর ওপর ভরসা করেছি,শুধুই শাড়ির অর্ডার আর লাইভ দেখার ধুম আর আজ কিনা আরও এক কদম ! অমনি চেনা গলায় ভূমিকম্পের মতো গম গম পুরুষ কণ্ঠের হাঁক,” দিদি, জাম্বো দরজা খোলো.”.!ওই শ্যালক হাজির তবে!…হাসি হাসি মুখের অভিনয় করে জাম্বো এক ছুটে দরজা খুলে দেখে একা নয়,তার সাধের ,পেছনে কাঠি দেওয়া শালা বাবু সঙ্গে মেয়েদের মতো এক মাথা ঘন লম্বা চুলে কানের দুলে সজ্জিত এক বন্ধুকেও দিদির বাড়ি হাওয়া বদল করাতে সটান হাজির করেছে।”উহু চোরের মতো মুখ করে ঘুরবে না একদম সামনে”আদুরী চাপা গলায় বলে ভাইয়ের কিনে আনা খাবারের বিল টা প্যালার হাতে গুঁজে দিলো।সারাদিন শসা মুড়ি আর বিকালে পাতলা সুজি খাওয়া প্যালার হৃৎপিন্ডটা বত্রিশ শো টাকার খাওয়ার বিল দেখে কেমন যেন চুপসে গেল!
-
গল্প- তরজা
।। অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
তরজা
-অঞ্জনা গোড়িয়াসেদিন ছিল আষাঢ় মাসের বিকাল। গল্পটা শুনে সবাই গম্ভীর মুখে বসে রইল। দত্ত গিন্নির পুকুর ঘাটে প্রতি বিকেলে বসে আড্ডার আসর।
বেলা শেষে পড়ন্ত রোদে বোস গিন্নী যা শোনালো। তা শুনে সবাই স্তম্ভিত। এযে রীতিমতো প্লান করে ঘটানো ।
শুনে প্রায় সকলের গা ঢিপ ঢিপ করে উঠল।
এমন টা যদি সত্যিই ঘটে থাকে। খুব চিন্তার বিষয়। প্রত্যেকের বাড়িতেই বউ- বাচ্চা আছে। এমন ঘটনা ঘটলে কেলেঙ্ককারীর শেষ থাকবে না।
আজকাল বিভিন্ন খবর চ্যানেল গুলো ও হয়েছে বটে। একটা কিছু খবর পেলেই ফলাও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিচ্ছে। কিংবা টিভি চ্যানেলে।
তাই খুব সাবধান। শক্ত হাতে বাড়ির চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নইলে উচ্ছন্নে চলে যাবে সুখের সংসার।
কথাগুলো একটানা বলে গেল ঘোষ গিন্নী।
মুখুজ্জে গিন্নী বলল, “আসল ঘটনাটা কি? সেটা তো বলো?বোস গিন্নী বলল, বলছি গো বলছি।
তবে শোনো।
বলতে শুরু করল, বোস গিন্নী। আমাদের পাশের বাড়ির দিদির সোনার সংসার। মাস ছয়েক হলো ছেলের বিয়ে হয়েছে। নতুন বৌ টি ও বেশ সুন্দর। হাসিখুশি মন। দিব্যি চলছিল সুখের সংসার।
কিন্তু এখন প্রায় চিৎকার চেঁচামেচি শুনি। আমি ভাবলাম,নতুন বউয়ের সাথে শ্বাশুড়ির হয়তো বনিবনা হয়নি। তাই এমন অশান্তি।পরে একদিন বউটার কান্নার আওয়াজ পেয়ে বাইরে এলাম। দেখি, নতুনবউ পাড়াসুদ্ধ লোকের সামনে বধূ নির্যাতনের কথা চিৎকার করে শোনাচ্ছে। ছেলে আর শ্বাশুড়ি মিলে নাকি রোজ মারধর করে। কারন হিসাবে জানায়,একটা দামী বাইক চেয়েছিল ছেলের মা। সঙ্গে দশ ভরি গহনা।
বাইক টা বিয়ের পরেই দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ এত দিন পরে দিতে পারবে না বলায়, বউয়ের ওপর নির্যাতন শুরু করেছে।
সবাই শুনে ছেলে মাকে ছি ছি করতে লাগল। সামান্য গাড়ির জন্য কেউ এমন করে? এত সুন্দর বৌমার গায়ে হাত তোলা?দুদিন হলো নতুনবৌ বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছে।
আজ শুনছি থানায় গিয়ে বধূ নির্যাতনের কেস করেছে স্বামী শ্বাশুড়ির নামে। দেখে এলাম।বাড়িতে পুলিশ এসে তুলে নিয়ে যাচ্ছে দুজনকে।
কি কেলেঙ্কারির কথা বলো তো।দত্ত গিন্নি শুনে বলে ওঠে, তা বেশ করেছে। রোজ রোজ বৌকে ধরে মারার সময় টনক নড়ে নি। এখন হাজত বাস করুক।
বোস গিন্নী এবার আসল কারন টা শোনালো। আরে আমার বিয়ের পর থেকে দেখে আসছি ও বাড়ির দিদি কত ভালো। আর ছেলেটাকে ও কোনো দিন ছোটো বড় কথা বলতে শুনিনি। তারা কিনা বৌয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে? কিছুতেই বিশ্বাস হয় নি। পরে শুনলাম সব।আসল কথা হলো বৌটি ইচ্ছে করে এদের ফাঁসিয়ে বিপদে ফেলেছে।
ঘর করার ইচ্ছে ছিল না। বাবা জোর করে বিয়ে দেওয়ায় এই পরিণতি। নিশ্চয় কোনো নাগর আছে বৌয়ের। যার জন্যই এমন কান্ড।
তাহলে ভেবে দেখো,একটা মেয়ে কিভাবে ফাঁসাতে পারে বাড়ির সবাইকে।গল্পটা সবাই শুনে কিছুক্ষন চুপ। সবাই কেমন গুমরে ওঠে।
এমন ই সব বিষয় আলোচনা হতো পাড়ার এই বয়স্কা মহিলা আসরে।
প্রতিদিন পাড়ার সমস্ত বয়স্কাদের একটা জমায়েত হতো এই দত্ত বাড়ির বড়ো পুকুর ঘাটে।
এই আসরে ওপাড়ার ঘোষ গিন্নী,এপাড়ার মুখুজ্জ্যে গিন্নী থেকে আরম্ভ করে পাড়ার বয়স্কাদের বেশ একটা জমাটি আলোচনা চোখে পড়ার মতো ছিল। প্রত্যেকে নিজ নিজ সুখ দুঃখ আনন্দ যন্ত্রনা ভাগ করে নিতো। কথা বলে একটু হাল্কা হতো।
বাড়ির বৌদের পিন্ডি চটকাতে ও এ আসর বেশ জমে উঠেছিল।
না না সব গিন্নী যে শুধু বউদের নিয়ে আলোচনা করে, তা বলতে পারব না। আরো অন্য বিষয় ও থাকতো। যেমন ধরো এখনকার মেয়েদের চলাফেরা। আচরণ। ছেলে ছকড়াদের নেশা করা। সিনেমা স্টাইলে চুল কাটা , অসভ্যতা সব ই ছিল আলোচনার বিষয়।সেই সঙ্গে ছেলেদের কি করে বউদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিজেদের হাতের মুঠোয় রাখতে হয়,তার কায়দা আলোচনা। আসল কথা হলো সমস্ত বিষয়ে ই ছিল মুখ্য আলোচনা ।
দিনে দিনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল আসর টা। হবে নাই বা কেন? সব বাড়িতে এক ই সমস্যা। বউদের সংসারে মন নেই। সারাক্ষণ ই হাতে ফোন নিয়ে ট্যাপ ট্যাপ করে ফোন টিপে যাচ্ছে। আর মুচকি মুচকি হাসে সারাক্ষণ। আরে বাবা এভাবে কি সংসার চলে? কিছু বললেই বলে ইউটিউবে রান্নার রেসিপি শিখছি মা। কাল ই নতুন একটা রান্না করে খাওয়াবো।মুখুজ্জে গিন্নী বলল, “আমরা কি রান্না জানি না। বলো তো ঘোষ গিন্নী। এর জন্য আবার ফোনে শিখতে হবে। যতসব বদ বুদ্ধি”।
ঘোষ গিন্নি বলল,আমার বৌমা তো বুঝিয়ে দিল আমাকে “এসব তুমি বুঝবে না মা। কত কি দেখার আছে ? শেখার আছে জানো তোমরা? ফোনে সব কিছু শেখা যায়। জানা যায়।আছে ফেসবুক ওয়াটস এপ আরও কত কি?
দত্ত গিন্নি বলল, আমার বৌমা সারাক্ষণ নাকি ফোনে কবিতা , গল্প লেখে। বলে কিনা সমাজের নারীর বিরুদ্ধে কলম ই হাতিয়ার। কি ছাইপাঁশ লেখে জানি না বাপু। বলে আমি লেখিকা হবে।বলি এসব লিখে হবে টা কি? কিছু রোজকার হবে কি? শুধু শুধু সময় নষ্ট। এভাবে কি সংসারে মন থাকে? বলো তো?
সবাই একবাক্যে বলে উঠলো। এর একটা বিহিত না করলে আর চলবে না।
সবার হাতে সারাক্ষণ স্মার্টফোন। এসব আর সহ্য হয় না।
সারাক্ষণ কি সব লিখছে বুঝিনা বাবা। আমাদের সময় তো এসব ছিল না। কই আমাদের তো কোনো কিছু শিখতে অসুবিধা হয় নি।এদের মধ্যে দত্ত গিন্নি ছিল তখনকার দিনে মাধ্যমিক পাস। তাই পেটে একটু বিদ্যেবুদ্ধি আছে। ফোনের কেরামতি একটু বোঝে। ছেলে বিদেশ যাবার সময় একটা স্মার্ট ফোন দিয়ে গেছে। তাই একটু শিখেছে ধীরে ধীরে। প্রতি দিন ভিডিও কলে ছেলের সাথে কথা বলে। মাঝে মধ্যে বাংলায় ম্যাসেজ ও করে।
ফেসবুক ওয়াটস এপ সম্পর্কে কিছু ধারণা ও হয়েছে।
তাই সবার হেড গিন্নী হয়ে বড়ো সড়ো ভাষন শুনিয়ে দেন সবাইকে।বলেন, আজকাল বউদের হাতে ফোন দিলে কত কি ঘটতে পারে? তোমরা জানো কি? খুব সতর্ক থাকবে সবাই।এই বলে সব গিন্নিদের সাবধান করে দেন।
সেদিন বিকালের আসরে দত্ত গিন্নি বলেই দিল, আমার বউমাকে সব সময় চোখে চোখে রাখি। ফোন নিয়ে সব সময় ঘাটাঘাটি করা চলবে না। আমি কিছুতেই বরদাস্ত করি না। মুখের ওপর বলে দিয়েছি, অসময়ে একটু সেলাই শেখো। কিংবা রামায়ণ পাঠ করো। গীতা পড়ো।
ফোন নিয়ে এত কি যে করো?বুঝি না ভেবোছো? যত সব অজানা ছেলে বন্ধুর সাথে গল্প আড্ডা। বৌ মানুষের আবার ছেলে বন্ধু কি? স্বামী ই সব।
ফোন দেখলেই গা জ্বলে যায়।
তা এক্থা শুনে তোমার বউমা কি করল? মেনে নিল?
মানবে না মানে? মানতে বাধ্য। কড়া শাসনে রেখেছি আমার বৌমাকে। বলে দিয়েছি, এসব এ বাড়িতে চলবে না।
সত্যি কথা বলতে, আমার বৌমা খুব লক্ষ্মীবন্ত মেয়ে। আমার কথায় টু শব্দ টা করে নি।
আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে।
এই তো দেখে এলাম, রামায়ণ পাঠ করছে।মুখুজ্জে গিন্নী মুচকি হেসে বলল, তবে যে সেদিন তোমার বাড়ি থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ পাচ্ছিলাম। তা বুঝি কানে ভুল শুনলাম?
দত্তগিন্নীর চোখ দুটো ভারী হয়ে আসে। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে বিষয় টা ঘুরিয়ে দিয়ে বলল, কই দেতো এক খিলি পান? তোর হাতে সাজানো পান টা বেশ মজে মুখে। মুখের একটু স্বাদ বদলায়।
বুঝতে কারোর বাকি রইল না বিষয় টা ঘুরিয়ে দিতে চায়ছে। আসলে বৌমা ই সাবধান করে দিয়েছে শ্বাশুড়ি কে।
“খবরদার আমি এখানে কি করি, তা যদি তোমার ছেলেকে নালিশ করো। যে এক মুঠো ভাত পাচ্ছো, তা ও জুটবে না।”
যে কদিন স্বামী জীবিত ছিল, নিজের প্রভাব আধিপত্য পূর্ণ দমে ছিল।
তারপর ছেলের বিদেশ চলে গেল। পরের বার ফিরে এসে বৌমাকে নিয়ে যাবে।
কি লাভ?অশান্তি করে? বিদেশ বিভূঁই থাকে ছেলে। সব কথা শুনে যদি কষ্ট পায়। কে দেখবে তাকে?ঘোষ গিন্নী আর চুপ করে থাকতে পারল না। আজ বলেই ফেলল, জানো দিদিরা আজ কি কান্ড করেছে আমার বৌমা?
সবাই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শোনার অপেক্ষায়।গল্প বলা শুরু করল,ঘোষ গিন্নী। আমি সবে একটু বসে মালা জপছি। ঠাকুরের নাম করছি।
কি যেন পোড়া পোড়া গন্ধ নাকে এলো।
ক্রমশ আরও তীব্র হলো।
আমি চেঁচিয়ে উঠি।
আরে এ যে দুধ পোড়া গন্ধ । “বলি ও বৌমা গেলে কোথায়? সব যে পুড়ে গেল। দুধের ছেলে টা খাবে কি?
এতক্ষনে টনক নড়ল বৌমার।হাতে দেখি ফোন। ফোন টা হাতে নিয়েই তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। গ্যাস টা বন্ধ করে দেখে , দুধের হাঁড়ি পুড়ে কালো ।
একেবারে মাথায় হাত।
দুচার কথা শুনিয়ে দিলাম।
বলি কান্ডজ্ঞান বলে কিচ্ছু নেই। দুধ বসিয়ে ফোন ঘাটা?এঘটনা শুধু আজ নয়। যেদিন থেকে নতুন স্মার্টফোন কিনে দিয়েছে ছেলে। সেদিন থেকে ই এই অবস্থা।
সংসারের কাজ করতে করতে সুযোগ পেলেই মোবাইল টা হাতে নিয়ে কি যে ট্যাপ ট্যাপ করে বুঝি না বাপু।মাথায় হাত দিয়ে মুখুজ্জে গিন্নী। তোমার তো শুধু দুধ পুড়ছে। আমার যে সংসার টা পুড়ে ছাই হচ্ছে। মাছ কড়াইয়ে ভাজতে দিয়ে কোথায় উধাও। ব্যস পুড়ে কালো।
এমন কত কি রোজ ই ঘটছে। সংসারটা পুড়ে ছাই হচ্ছে।
তারমানে? সবাই এক সাথে।
মানে আর কি বলব? সে লজ্জার কথা।সেদিন থেকে বৌমার চাল চলন চোখে পড়ল। যেদিন শাড়ি ছেড়ে বৌমা চুড়িদার,জিন্স টপ পরতে শুরু করেছে।
বিউটি পার্লার গিয়ে মেকাপ করছে। চুল কেটে কাঁধ পর্যন্ত করছে। জানো তোমরা এত সুন্দর চুল টা কাটতে একটু কষ্ট হলো না।প্রথম যেদিন আমার ছেলের এক বন্ধু বাড়ি এলো। কথায় বলতে চায় না বৌমা। জোর করে চা জলখাবার দিতে পাঠালাম।
আর আজকাল, নিজে টিফিন খাইয়ে গল্পে মজে আছে সেই বন্ধুর সাথে।এখন দেখি ছেলে না থাকলেও নানা অজুহাতে বাড়ি এসে হাজির। দুপুরে সকালে রাতে। আমার মোটেই ভালো ঠেকে নি চোখে। একদিন বৌমাকে বললাম। এসব গেরস্তের বাড়িতে রোজ রোজ আসার কি আছে? খোকাকে বলে বারন করতে পারো তো?
বলে কিনা, আপনার কি অসুবিধা হচ্ছে? আপনার ছেলের ই তো বন্ধু ।
অফিসের দরকারী কাগজ পত্র দিতে আসে। এসব আপনার ছেলে শুনলে কি ভাববে?
ব্যস আর কি বলি?
দত্তগিন্নী বলে উঠলো, “সময় থাকতে সাবধান হোও। এতো ভালো কথা নয়।
ছেলে বাড়ি ফিরলে সব খুলে জানিও।
তাতে যদি বৌমার কাছে খারাপ হোও তো, হবে।না গো দিদি। অন্য সব দিকে আমার খুব খেয়াল রাখে। টাইম মতো ওষুধ দেওয়া। আমার শাড়ি কাপড় পরিস্কার করে দেওয়া সব নিজে হাতে করে। এই তো সেদিন আমার জন্য বৌমা নেট থেকে ভালো গরদের শাড়ি এনে দিল।
শুধু একটু অন্য দিকে মন দিয়ে ফেলছে।যদি সংসারে মন থাকতো। আর কোনো কিছু চিন্তা থাকতো না।বুঝি গো সব। আজকাল বৌ দের ব্যাপার স্যাপার একটু অন্য রকম। একটু চোখে চোখে রেখো।
এমনি করেই প্রতিদিন ই কারোর না কারোর বৌমাদের নিয়েই চলত আলোচনার বিষয়।
প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পর মুখুজ্জে গিন্নীর আসা বন্ধ হয়ে গেল।প্রথম ভেবেছিল শরীর খারাপ বুঝি। তাই আসতে পারছে না। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ওনার বড় বৌমা এখানে আসা বারন করে দিয়েছে।
সব কথা কানে গিয়েছে বৌমার। এখানে নাকি শুধু বৌমাদের কি করে জব্দ করতে হবে? সে নিয়েই আলোচনা হয়।
তার বেশ কিছু দিন পর খবর ছড়িয়ে পড়ল মুখুজ্জে গিন্নী ঘুমের মধ্যে ই হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে।রাতে রোজ একগ্লাস গরম দুধ খেত মুখুজ্জে গিন্নী। সেদিন রাতে আদরের বৌমা ই গ্লাসে দুধ নিয়ে গিয়ে ছিল। ছেলে অফিসের কাজে বাইরে ছিল। সব শেষ হয়ে যেতে বাড়ি ফেরে ছেলে। মায়ের মুখাগ্নি দিতে।
দত্ত বাড়ির পুকুর ঘাটে এ ঘটনার পর থেকে আর আলোচনার আসর বসে না। আধুনিক বৌমাদের গুনকীর্তি নিয়ে আর কেউ সাড়া করে না। সবার ই বেঁচে থাকার আশা।
এই বয়সে কার সখ এভাবে ঘুমের ঘোরে মৃত্যু বরন করা।সেদিন যদি মুখুজ্জে গিন্নী বৌমার চরিত্র নিয়ে আলোচনা না করত। হয়তো এভাবে চলে যেত না।
ঘুমের টেবলেটের শিশিটা টিন -বোতল ব্যাপারির কাছে খুঁজলে হয়তো এখানো পাওয়া যেতে পারে কিছু প্রমাণ।মৃত্যুর ওপারে একটু শান্তিতে ঘুমাবে মুখুজ্জে গিন্নী। পাড়ার বয়স্কা আসর টা এভাবেই চাপা পড়ে গেল মুখুজ্জে গিন্নীর চিতার আগুনে।
-
কবিতা- প্রেম কথা
।। অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
প্রেম কথা
-শ্যামল কুমার রায়প্রেমিক প্রেমিকা বদলে যায় ,
প্রেম চিরন্তন , রয় অবিচল ;
যুগ যুগ ধরে অমর প্রেম ,
যেন সদ্য ফোটা শতদল ।নকল প্রেমের পলকা বাঁধন
ছিন্ন হয়ে যায় সহজে ,
খাতায় কলমে প্রেমের হিসাব
করে যারা প্রেম কাগুজে ।হৃদয়ে হৃদয়ে প্রেমের বন্ধন ,
দেহের কোষে কোষে নিহিত ,
কাটে না আঁচড় বিচ্ছেদ বিরহে ,
হয় না তো প্রেম পরাজিত ।প্রেমের ঠিকানা আছে লেখা ,
লায়লা মজনু , নকশী কাঁথায় ,
খুঁজলে পাবে আরো প্রেমকথা
ইতিহাসের পাতায় পাতায় । -
প্রবন্ধ- রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম
।। অমরনাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম
– শিলাবৃষ্টিসূচনা~
রাক্ষসী পলাশী গ্রাস করে নিয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা সূর্যকে। দীর্ঘ দু’শ বছর ধরে শত শত সংগ্রামী নিজের দেশকে ভালোবেসে নির্ভয়ে এগিয়ে গেছে রণক্ষেত্রে,হাসি মুখে বলি দিয়েছে নিজের প্রাণ।
তবে দেশপ্রেম মানেই যে কেবল জীবন বিসর্জন দেওয়া, তা নয়।দেশের প্রতি ভালবাসার প্রকাশ নানা ভাবে ঘটতে পারে।কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথও পরাধীন ভারতবর্ষ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র উদাসীন ছিলেন না।সংগীতে, কবিতায়, প্রবন্ধে এবং অন্যান্য রচনায় তিনি সেই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।বাল্যজীবন ও শিক্ষা
~~~~~~~~~~~
১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে যে বিস্ময়কর প্রতিভা জন্মগ্রহণ করেন- তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাতা সারদা দেবী। ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও ভোগবিলাসের মধ্যে যে তার জীবন কাটেনি–তা “জীবন স্মৃতি ” তে প্রকাশিত। বিভিন্ন নামী স্কুলের চার দেওয়ালের মধ্যে থেকে নিয়ম মাফিক শিক্ষা তাঁকে পীড়া দিয়েছিল। ঠাকুরবাড়ির উন্নত পরিবেশের মধ্যেই শুরু হয় তাঁর শিক্ষা গ্রহণ। শুধু লেখাপড়াই নয়, সেকালের ঠাকুর পরিবারে সাহিত্য, শিল্প ও সঙ্গীত চর্চার যে অনুকূল আবহাওয়া ছিল, সেই আবহাওয়ার মধ্যেই ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।সারস্বত সাধনা~
~~~~~~~~~~
“জল পড়ে পাতা নড়ে” দিয়ে যাঁর ছন্দের অনুরণন শুরু হয়,তা থেকেই নির্মিত হতে থাকে পরবর্তী কাব্য জগৎ।
বনফুল, প্রভাত সঙ্গীত, সন্ধ্যা সঙ্গীত,ভানু সিংহের পদাবলী দিয়ে যাত্রা শুরু করে মানসী, সোনার তরী, নৈবেদ্য, গীতালি, গীতাঞ্জলি , পূরবী,বলাকা, মহুয়া ইত্যাদি হয়ে শেষ লেখায় তিনি থামেন মৃত্যুর দেড় ঘণ্টা পূর্বে। কবি ছাড়াও
ঔপন্যাসিক, নাট্যকার,প্রবন্ধকার,চিত্রকার,সুরকার,গীতিকার রবীন্দ্রনাথকে আমরা সবাই চিনি কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় মানুষ রবীন্দ্রনাথ। তিনি লিখেছেন-“মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।”স্বদেশ চিন্তা
~~~~~~~
স্বদেশচিন্তা – সৃজনকর্মে সদা ব্যস্ত মানুষটি শুধু সাহিত্য শিল্পের নন্দনকাননে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি, প্রথম জীবন থেকেই তিনি দেশমাতাকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে চেয়েছেন – দেশবাসীর মনে চেতনা জাগাতে তুলে নিয়েছেন কলম। লিখেছেন একের পর এক স্বদেশী গান – “আমরা সবাই রাজা”, “এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি প্রান”, “এখন আর দেরি নয় ধরগো তোরা হাতে হাতে ধরগো”, “সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান”, “ও আমার দেশের মাটি”, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”। ভারতবাসীর মনে দেশপ্রেম জাগাতে “ভারততীর্থ”র মত লিখেছেন কতনা কবিতা!দেশপ্রেম ~
~~~~~~
সমকালীন বহু ঘটনা তাঁর মনে ঝড় তুলেছে – রুখে দাঁড়িয়েছেন – উদ্ধত, মত্ত বর্বরতার বিরুদ্ধে। মানুষের সুখ দুঃখের স্মারক হয়েছেন। নোবেল পুরস্কারের অর্থ তিনি দান করে দিয়েছেন। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদী আন্দোলনে তিনি স্বয়ং যোগদান করেছেন। তাঁর রচিত “বাংলার মাটি বাংলার জল” এই আন্দোলনের মূলমন্ত্র ছিল। ১৯১৯ খ্রী. জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে তিনি নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। ভাতৃত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে সৃষ্টি করেছেন “রাখীবন্ধন”। তাঁর রচিত “জনগণ মন” গানটি আজ স্বাধীন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত।উপসংহার ~
~~~~~~~
ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছিল ১৯৪৭-শে কিন্তু – তিনি সেদিন সে আনন্দে যোগদান করতে পারেননি, কারন তার মাত্র ৬ বছর আগে ১৯৪১-শে বাইশে শ্রাবণ তাঁর জীবনাবসান হয়। কিন্তু এ শুধু তাঁর মরদেহেরই অবসান। এই ভাবসাধক কবিশ্রেষ্ঠ খণ্ডকালের হয়েও সর্বকালের। ভারত-আত্মার এই বিগ্ৰহকে তাঁর বঙ্গভূমি, তাঁর ভারতবর্ষ তো ভোলেইনি, সমগ্ৰ বিশ্বের দরবারে তিনি সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত।। -
কবিতা- ঠিকানাহীন পথ
।। অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
ঠিকানাহীন পথ
-সোহিনী সামন্তমন যে চলে যায় ঠিকানাহীন পথের খোঁজে…
যে পথে কোন রেষারেষি নেই, নেই কোন বিদ্বেষ…
এমনই যে পথ চাই, এমন নির্লিপ্ত মনে…
কত বাহারি গাছের ছায়া পড়ে পথের চারিপাশে…
যেমন করে পথিক নেয় বিশ্রাম শান্ত ছায়ার নিচে,
তেমনভাবেই মন শীতল হবে অচেনা পথের দিশায়…
সংকীর্ণ মন পথ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর রূপ নেবে…
মনের মিলনে মানুষ জাতি ভেদ ভুলে গিয়ে এক হবে…
এমনই যে ঠিকানাহীন পথ খুঁজে বেড়াই,
পাব কি এমন পথ খুঁজে!
শুধু অদৃষ্টই জানে। -
কবিতা- আমি সেই মুখ
।। অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
আমি সেই মুখ
-কাজল দাসআমি সেই অপেক্ষারত মুখ!
আমি সেই অপেক্ষারত চোখ,
যার বিগত ইতিহাস গুলো জীবাশ্মের মতো আজো লেগে আছে ক্ষয়িষ্ণু পাথরের বুকে,
আমি সেই ক্ষুধার্ত বেদনার রঙে আবৃত-
এক মুখ,
অপেক্ষারত!
যুদ্ধের আগে ও পরে,
কাঁটাতারের এধারে বা ওধারে,
চটচটে রক্ত ঘ্রাণে লেগে থাকা ধানের শীষে আচ্ছন্ন সময়ের মতো সেই মুখ,
মেঠো রাস্তা থেকে রাজপথে,
মাটির ঘর থেকে অট্টালিকায় সাজানো সাঁওতালি রঙের মুখোশে ক্ষুধার্ত সেই মুখ।আমি সেই আস্তাকুঁড়ের যোদ্ধা,
যাকে আপনারা নাম দিয়েছেন স্বাধীনতা,
যাকে আপনারা নাম দিয়েছেন গণতন্ত্র,
পাতাবাহার গাছের মত গুছিয়ে রেখেছেন-
শহরের আনাচে কানাচে।
আমি সেই মুখ,
আমি সেই নীল বিদ্রোহীর উত্তরসূরী,
আমি সেই মহেঞ্জোদারোর ভগ্নাবশেষ,
আমি সেই দীর্ঘ মেয়াদী লংমার্চ।কখনো আমি আন্দোলন,
কখনো বা আমি আন্দোলনের বিষয়,
কখনো উৎসবে, কখনো রাস্তায়,
কখনো আবার ডাস্টবিনে।
জ্বলন্ত রজনীগন্ধার শরীরজাত ধূসরতার পোড়া ঘ্রাণে আমার পরিচয়।
আমি সেই মুখ,
যাকে ভুলতে চেয়েও ভোলা যায় না,আমি সেই ক্ষুধার্ততা।
-
কবিতা- দেবীপক্ষ
।। অমর নাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।।
দেবীপক্ষ
-সুশান্ত সিনহাআজ ভোর
ভোরের শিশির তোর
তোর ভুরুর মাঝে বাঁকা শিকলখানা
ঝাঁ চকচক্ ইলিশ মাছের আঁশশিউলি পাতায় উপচে পড়া রোদ
রোদ পিচ্ছিল পোস্তবাঁটা গাল
স্বর্ণপুরে লোলুপ শীতল বোধ
(তোর) মুষ্টি বোঝাই নপুংসকের ছালআজ রাত
রাতের পাখি তোর
তোর ঝাপসা চোখের দৃষ্টি আনমনা
শিকল ভেঙে আজ একটু হাস্(সেই) ইস্টিশানের ছাতিম গাছের তল
তল থেকে সেই উষ্ণ-মাতাল ভয়
গাছের ডালে নতুন পাতার ঢল
কাশ ফুটেছে সুদূর মাঠময় -
কবিতা- বিনিসুতোয় প্রেম
।। অমরনাথ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ।।
বিনিসুতোয় প্রেম
-প্রদীপ শর্ম্মা সরকারপ্রেমের ভাষ্যে যথারীতি মেদূরতা,
সঙ্কল্প, সেও ভীত চোখে চায়–
যুগোত্তীর্ণ প্রেম আসলে ব্যথা,
প্রেমের শপথ বুদবুদ হয়ে যায়।প্রেম বোঝে না বয়সের জটিলতা,
অনুপানে তার সংখ্যার সাথে সখ্য–
বিনোদনে তার আগ্রাসী মধুমিতা,
বিদ্যুল্লতা বেষ্টনে কাঁপে বক্ষ।অন্য সে প্রেম গলিপথে শুধু বিস্ময়,
নটরাজের তান্ডব সেও প্রেম–
হাতে হাত রেখে সাহসিনী আজ দুর্জয়,
নয় আদিসুখ ,প্রেম নিকষিত হেম।বিনিসুতো দিয়ে বুনে রাখা যত স্মৃতি
জলরঙে আঁকা একান্ত অভিসার–
ঘি এর সাথে অগ্নি শোধনে প্রীতি
সংখ্যাসখ্যে কুসুমিত সংসার।