• কবিতা

    চৈত্র শেষে

    চৈত্র শেষে
    -নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

     

    সলতে নিঃশেষিত। প্রদীপের বুক পুড়ে যায়।

    চৈত্র, তোমাকে তেমনি এক তীব্র দহনের শেষে
    রেখে যাই শূন্য ধানখেতে।
    বাড়ির চিলেকোঠায়
    হিংসাদ্বেষ রিরংসার বীজ
    সব পুঁটুলিতে বেঁধে রেখে দিয়ে যাই।
    যদি কখনো এ অর্বাচীন দেশে
    মানুষ হারায় পথ।যদি মৃত্যু এসে দাবি করে
    অকাল বর্ষণ কিংবা ঝড়ের বিস্তর পিপাসা
    অথবা মনুষ্যত্ব বিমূঢ়তায় কেঁদে কেঁদে মরে
    মানুষ হারায় পথ আপনার হৃদয়ের দোষে
    যদি দেখে পথ কোথাও নেই,শুধু দিক পড়ে আছে
    তখন নাহয় আর একবার বিমূঢ় বিস্ময়ে
    খুঁজতে খুঁজতে দাঁড়াবো কোনো জলসত্রতলায়।

    চৈত্রের ইচ্ছেগুলো লেপটে থাক বৈশাখের গায়
    আজকাল ইচ্ছেদের বড়বেশি জলতেষ্টা পায়।

  • কবিতা

    কথা ও কবিতা

    কথা ও কবিতা
    -নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

     

    হৃদয়-ফুসফুসের অলিন্দে থাকা এক দলা কথা
    সমস্ত বাঁধা পেরিয়ে যখন খই হয়ে ফোটে
    আননগ্রন্থের কৃপায় হয়তো তা কবিতা হয়ে ওঠে।

    যদিও কবিতার নাম শুনলেই
    আমার হৃদয়ের পায়ে ঘুঙুর বাজে
    কিন্তু ফুসফুস উশখুশ করে
    খুশখুশে কাশিতে সে জানিয়ে দেয় তীব্র অসন্তোষ
    তবু আমি কবিতার যত ফন্দিফিকির,
    যত অলিগলি, মায় নিষিদ্ধ পল্লীতক
    ঢুঁ মেরে দেখি—
    কবিতা হতে কথার আর কত কি.মি. বাকি!

  • কবিতা

    আমিও মূর্তি ভাঙতে চাই

    আমিও মূর্তি ভাঙতে চাই
    -নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

     

    আমিও মূর্তি ভাঙতে চাই।
    আমার কোনো অনুরক্তি নাই
    দুঃখ নাই,ক্ষোভ নাই কোনো
    দীর্ঘস্থায়ী দীর্ঘশ্বাস নাই
    কেবল নৈঃশব্দ আছে
    আছে বিষণ্ণতার অশরীরী ভয়
    যখন বেণুবনে অন্ধকারে ডেকে ওঠে পেঁচা
    নিষ্ঠুর কর্কশ গর্জনে কাঁপে হরিণ-হৃদয়।

    খসে যাক ঝরে যাক পাতা কিংবা ফল
    ঝলসে যাক স্বপ্নগুলো সব
    শুধু পাঁকে পাঁকে অথবা সিঞ্চিত ঝাড়ির জলে
    ঘাসে ঘাসে ফুটে থাক ফুল–
    আমি জ্যোৎস্নার শরীর থেকে সুতো খুলে নিয়ে
    প্রকৃতিকে বুনে দেবো শাড়ি
    তারপর ভাঙবো, ভাঙবো মূর্তি সব।

    চেয়ে দেখো–সব মূর্তি আমারই
    যাকে তোমরা ভাবমূর্তি বলো।

  • কবিতা

    মা এক তপস্যার নাম

    মা এক তপস্যার নাম
    -নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

     

    মা শুধু জননী নয়, মা এক সুদীর্ঘ ভ্রমণ
    মা এক প্রাগৈতিহাসিক পার্বত্যগুহাবাসী মন
    মা এক কামনা বাসনা প্রার্থনার বিশাল ভিয়েন
    যেখানে স্নেহ নির্গত হয় হৃদয়ের প্রচণ্ড উত্তাপে।

    মা মানে রান্না-বান্না ঝাড়পোঁছ জ্বরে জলপটি
    মা মানে সুঁই-সুতো কাথাকানি কাচাকাচি রোদ
    সংসারের বাঁধাদাসী বিশ্রাম ও বেতনরহিত
    দেবী নয়, বেদী নয়,এক অমর্ত্য গৃহকোণ।

    মা এক প্রাণীর নাম, যার নিজস্ব নাড়িছেঁড়াধন
    সন্তানেরা কেউ কেউ কষ্ট দেয় সমগ্র জীবন
    তারি মাঝে নির্দ্বিধায় সুখ খোঁজে সদাহাস্যমুখ
    সমগ্র অস্তিত্ব ব্যাপী সন্তানার্থে নিবেদিত প্রাণ।

    রাত্রির তপস্যা দিন–মা সেই তপস্যার নাম
    সন্তানের সুখ-সম্পদকামনার উচ্চতম চূড়া
    মা শুধু নারী নয়,নদী নয়,মৃত্তিকাও নয়
    মা এক নির্জন দ্বীপ,স্তব্ধতা,শুদ্ধ মনস্কাম।

  • কবিতা

    একুশের মঞ্চে

    একুশের মঞ্চে
    -নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

     

     

    আমি তো নিশ্চিত জানি
    হপ্তা খানেক পরেই একুশে ফেব্রুয়ারি।
    সে দিকেই যাবো বলে পথে বেরিয়েছি।

    চিরচেনা পথটাও আজ কেমন অচেনা লাগে
    যদিও জানি মাঝে মাঝে বহুরূপী সাজা
    তার পুরোনো অভ্যেস।

    এই পথটা বই-বাজার হয়ে বউ বাজারের দিকে গেছে
    পথিমধ্যে ঝলমলে সাজে বই আছে,বউ আছে
    গয়নাগাটি, সবজি- বেগুন,মায় ফরেন লিকার সব আছে।
    আছে নানান প্রযুক্তির খেলা–
    কৌশলে তাজারাখা সাতদিনের বাসি বেগুনের গায়ে
    লেগে থাকা মোহময় কৈশোর -যৌবন।
    আরও আছে নানা ‘-ওয়ালা’ ও ‘ওয়ালিদের বিচক্ষণ হাসি
    ছলচাতুরি ও বন্ধুত্বের মিশেলে
    দলা পাকানো এই বেগুনি হাসি আমি বিলক্ষণ চিনি।
    এরাই ফুল-মালা-ধূপকাঠির সমাবেশে
    দেঁতো হাসি হেসে
    একুশের মঞ্চে ছবি তুলে
    ফেসবুকে, খবরের কাগজে ছাপাবে।

  • কবিতা

    রোষের কারণ

    রোষের কারণ
    -নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

     

     

    কবিতা লিখতে বসে আমার হয়েছে যতো জ্বালা
    কথারা কুকুরছানা –হৃদয়ে দংশনবাসনা
    অবিরাম ঘেউ ঘেউ, সকলের কান ঝালাপালা।
    রোষে ফোঁসে নার্সিং পড়ুয়া যার হস্টেল ঠিকানা।

     

    আমার কবিতায় তাই মিল নাই শুধুই বিদ্রোহ
    ছন্দ মেলাতে গিয়ে অনর্থক বেড়ে যায় দেনা
    জুতসই শব্দের খোঁজে তোলপাড় আখর সমুদ্র
    দিশা নাই ঠকে যাই,একরত্তিও মেলেনা ব্যঞ্জনা।

     

    কবিতা লিখতে বসে আমার হয়েছে এই জ্বালা
    জোচ্চোর যোগানদার হাতে তার দুনম্বরি খাতা
    সেখানেও দাঁত বসায় ষোলো টি কুকুরের পোলা
    রুষ্ট সম্পাদক ; মুখে তাঁর গালি আসে যা তা।

     

    শব্দরা যেন তাই লা-ওয়ারিশ কুকুরের ছানা
    রুষ্ট কবি গৃহিণীও–কবিতা লিখতে তাঁর মানা।

  • কবিতা

    সব বৃথা

    সব বৃথা
    -নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

     

     

    একটি সুরেলা সকাল নষ্ট হয়ে গেছে
    উবে গেছে শিশিরসিক্ত রোদ
    কুঁড়েমির চিহ্নগুলো শুধু
    বাসি বিছানায় পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

    একটি দুপুর অনর্থক বসে ছিলে কুলিকের ঘাটে
    যে নৌকো ছাড়ার কথা ছিলো আজ
    গতকালই ছেড়ে চলে গেছে যাত্রীবিহীন
    যাদের আসার আশায় ছিলো আষাঢ়ের নদী।

    বড়শিতে টোপ গেঁথে বিকেলের সোনালি রোদ্দুরে
    তুমি মাছেদের ডেকে বলেছিলে :
    এসো খেলি।ভ্রান্তিবিলাস।
    মাছেরা ঘাই মেরে দূরে চলে গেছে।

    সন্ধ্যায় হা-পিত্যেশ করে কী আর হবে বলো!
    ওই দেখো,
    আকাশেতে পাল তুলে উড়ে যায় ভাদ্রের নদী।

  • কবিতা

    চেষ্টা জারি আছে

    চেষ্টা জারি আছে
    -নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

     

     

    চেষ্টা জারি আছে।
    শ্বাসকষ্ট সহ সমস্ত কষ্টের হাত থেকে
    মুক্তির চেষ্টা জারি আছে।

    কাঁটার আঘাত সয়ে ফুলের সুঘ্রাণ
    গ্রহণের মরিয়া চেষ্টাও জারি আছে।

    বিশ্বাসঘাতকতা সয়ে বিশ্বাস করার
    দুর্লভ শক্তি মানুষের মনে আজও জেগে আছে।

    চেষ্টা ও ইচ্ছার যুগল মিলনে
    চেষ্টা অব্যাহত রাখার ইচ্ছাশক্তি
    ধানক্ষেতে মুক্তি আনে কাস্তের ঘর্ষণে।

    অথচ কবিতা আটকে আছে
    জ্যামে–শ্যামবাজার চৌরাস্তার মোড়ে।
    কোথায় নাকি বেপরোয়া চালকের দোষে
    সব ভাব ও ভাবনা চাপা পড়ে গেছে।
    অনেকানেক শব্দের নিথর দেহ
    ইতস্তত পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

    তবু চেষ্টা জারি আছে।
    ফেসবুকের জরুরি বিভাগে
    ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে। 

  • কবিতা

    চৌকাঠ

    চৌকাঠ
    -নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

     

     

    গতকাল সে এসে বলেছিল: চলো!
    মুহূর্তে কেঁপে উঠেছিলাম শঙ্কায়
    তবু চৌকাঠ পেরোলাম অবলীলায়।

    সামনেই দীর্ঘ এক পথ
    যদিও তা দানবের পদপিষ্ট
    নেই তাতে মুক্তির শপথ।

    তবু পথ তো পথই হয়
    ধুলোবালি পাথর নুড়ি জল
    ঘাস মাটি উদ্ভিদ শ্বাপদ সরীসৃপসহ
    গমনের লক্ষ্যে অবিচল।

    এরই মধ্যে মৃণাল সেনের শরীর পুড়ে ছাই।

    একাত্তরের পরে তো ভাই
    সে কোলকাতা আর নাই।

    তবু আমি একা একা চৌকাঠ পেরোই

  • কবিতা

    গোষ্ঠীদ্বন্ধ

    গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব
    -নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

     

     

    বৃন্দাবন খুড়োর বয়স চারকুড়ি পেরোয়নি এখনো
    খুব বেশি পাকও ধরেনি তার চুলে
    যদিও পুরোপুরি দন্তহীন–ফোকলা যাকে বলে।
    তার প্রিয় খাদ্য –ভিজে নয়,ভাজা নয়,
    আস্ত গোটা চিড়ে।
    আমি জানতে চাই,”খুড়ো,এটা সম্ভব কী করে?”
    “ওরে,চিড়েরা নিজেরাই চ্যাপ্টা হয়ে থাকে
    আর আমাদের মুখে আছে এক শক্তি বৈনাশিক
    যা সবকিছু গ্রাস করে থাকে।”
    খুড়োর এসব ঘোলাটে কথার মানে বুঝি না সঠিক।
    বোঝার চেষ্টাও করি নে
    বন্যার ঘোলাজলে হারানো আংটির খোঁজে
    কে আর নদীতে নামে?
    তাই বলি,”খুড়ো,হেঁয়ালি ছাড়ো,
    গোদা বাংলায় উত্তর ঝাড়ো।”
    “কী অর্বাচীন তোরা! ‘খুড়ো ঝেড়ে কাশে,
    “আমি শুধু চিড়েদের ফেলে দেই মুখের গহ্বরে
    তারপর যা করার চিড়েরাই করে,
    পরস্পর গুঁতোগুঁতি করে ওরা মরে
    আমি শুধু গিলি অবশেষে।”

<p>You cannot copy content of this page</p>